Showing posts with label অকটোবর ২০. Show all posts
Showing posts with label অকটোবর ২০. Show all posts

আনন্দ বৃদ্ধাশ্রম...................শাহানা জাবীন সিমি

আনন্দ বৃদ্ধাশ্রম...................শাহানা জাবীন সিমি
২০৫০ সাল, জানুয়ারী মাস। শীতের এক দুপুরে শামসুর রাহমানের লেখা কবিতা পড়েছিলেন শায়লা বারী।
'যেদিন মরবো আমি, সেদিন কি বার হবে বলা মুশকিল।
শুক্রবার? বুধবার? শনিবার? নাকি রবিবার?
যে বারই হোক,
সেদিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর,
যেন ঘিনঘিনে কাদা না জমে গলির মোড়ে।
সেদিন ভাসলে পথঘাট,
পূন্যবান শবানুগামীরা বড়ো বিরক্ত হবেন।'

এই পর্যন্ত পড়ে বইটি বন্ধ করে রাখলেন তিনি। কি অসাধারণ অভিব্যক্তি কবির! কত চিন্তা শবানুগামীদের জন্য। সত্যিই তো আমার মৃত্যুর দিনই বা কি বার হবে? কাঠফাটা রোদে তপ্ত হবে এই শহর নাকি শীতের হাওয়ায় ঝড়া পাতার মড়মড়ে আওয়াজে ঢেকে যাবে আমাকে বহন করে নিয়ে যাওয়া শবানুগামীদের চাপা কান্না....কে আর কাঁদতে আসবে? বছর তিনেক হলো বারী সাহেব মারা যাবার পর নিজের ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়ে অনেকটা নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে আর নিরাপত্তার কথা ভেবে এই বৃদ্ধাশ্রমে এসে উঠেছেন সত্তর বছরের শায়লা বারী। স্কুল টিচার ছিলেন। অসংখ্য ছাত্র এই হাতে পার করেছেন। এদের মধ্যেই সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কিছু ছাত্রছাত্রী সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে তার মতো বৃদ্ধ মাতাপিতাদের জন্য ঢাকার পূর্বাচলে এই বৃদ্ধাশ্রমটি তৈরী করেছে। এর উদ্দোক্তরা অবশ্য একে বৃদ্ধাশ্রম বলতে নারাজ। সার্ভিস এপার্টমেন্টের আদলে তৈরি এর নাম 'আনন্দ আশ্রম'। আসলেই তাই....সারাদিন যেন হাসি আনন্দে কেটে যায় এই আনন্দ আশ্রমের মানুষগুলোর। এখানে থাকতে হলে দুটো শর্ত অবশ্য পূরণ করতে হয়। এক; বয়স হতে হবে ৬৫র উপরে কারণ ৬৫বছর পর্যন্ত এখন মধ্যবয়স্ক তরুণ হিসেবে গণনা করা হয়। দুই; নিঃসন্তান বা অবিবাহিত পুরুষ বা মহিলা অথবা এমন বাবা মা যাদের সন্তানরা সবাই বিদেশে অবস্থানরত।

এই যেমন একটি মাত্র পুত্র সন্তান শায়লা আর বারী সাহেবের। ছেলে আমেরিকায় চাকরি ও পরিবার নিয়ে সেটেল। বহুবার মাকে কাছে নিয়ে রাখতে চেয়েছে সে কিন্তু শায়লাই রাজি হননি। এমনি বছরে দুবছরে ছেলের কাছে ঘুরতে যাওয়া হয় কিন্তু এদেশের মাটি ছেড়ে একবারে সেখান যে থাকতে শান্তি পান না তিনি। পাঁচ বিঘা জমির উপর তৈরী এই আনন্দ আশ্রম। বারো তলা বিল্ডিং স্টুডিও এপার্টমেন্ট। ইচ্ছে করলে একা থাকা যায় সেক্ষেত্রে পেমেন্ট একটু বেশি আবার কেউ চাইলে শেয়ারও করতে পারে। কমপ্লেক্সের মধ্যে আছে জিম, সুইমিং পুল, লাইব্রেরি, মসজিদ, গেস্ট হাউস এবং ইমারজেন্সি মেডিকেল সার্ভিস দেয়ার জন্য একটা ছোট ক্লিনিক। আরো আছে একটি বড়মাঠ যেখানে প্রাতঃভ্রমণ ও সান্ধ্যভ্রমণের পাশাপাশি চলে নির্মল আড্ডা, গল্প ও খুনসুটি। বিল্ডিং এর ছাদে যে ছাদকৃষি আর সামনে পেছনের খালি জায়গায় যে আঙিনা কৃষি রয়েছে তাতে অনেকেই সকাল বিকাল মালির সাথে হাত লাগান। তাদের পরিচর্যার কারণে আনন্দ আশ্রমে সবজি অনেক সময় বাজার থেকে কিনতেই হয়না।

খাবারের ব্যাপারে খুবই কঠিন আনন্দ আশ্রমের ডাইটেসিয়ান। বয়সে তরুণী মেয়েটি একটা বড় হাসপাতালের পুষ্টিবিদ আবার পার্ট টাইম এই বুড়ো বুড়িদের দেখভাল না করলে নাকি তার ভালো লাগেনা। তার নির্দেশে মাসে দুবার রেডমিট আর বাকি দিন মেডিটেরেনিয়ান ডায়েটের আদলে তৈরি বাংলাদেশী ডায়েট। রুচি পরিবর্তনের জন্য মাসে একবার থাই,জাপানিজ,কোরিয়ান বা কন্টিনেন্টাল কুজিন। তারপরও তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে অনিয়ম যে চলে না তা নয়! যখন যার ইচ্ছা দেদারসে চলছে অনলাইন খাবারের অর্ডার আর ডেলিভারি। ১২তলার এই স্টুডিও এপার্টমেন্টে রয়েছে দুটি ডাইনিং হল। সাধারণত তিনবেলার খাওয়া দাওয়া সবাই একসাথে ডাইনিং হলে করে থাকে। তবে চাইলে রুমেও ডেলিভারি নিতে পারে। শ'খানেক বোর্ডার কে দেখা শোনা করার জন্য এখানে রয়েছে দশজন উদ্যম ও চৌকষ তরুণ তরুণীর একটি দল। যারা লনড্রী থেকে শুরু করে সব কাজ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা এমনকি সবাই ঔষধ ঠিকমতো খেলো কিনা সবকিছুর খবর রাখে। মাঝে মাঝে খাওয়া দাওয়ার পরে শুরু হয় জম্পেশ আড্ডা। এই যেমন আজকের বিষয় পূর্বাচল সিনেপ্লেক্সে ২০২০ এর করোনা মহামারী নিয়ে আবীর ফয়সালের 'করোনা ২০২০' নামের যে মুভিটা রিলিজ হয়েছে সেইটা নিয়ে। অসাধারণ নাকি স্টোরিলাইন আপ, সিনেমাটোগ্রাফী আর ডিরেক্শন। অনেকেই দেখতে যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু শায়লা কে ফিসফিস করে নাবিলা বললো... এই ফিল্ম দেখার মতো মানসিক শক্তি আমার আর এখন নেই। কি দুঃসহ দিনগুলি গেছে! সারা পৃথিবী জুড়ে ছিল মৃত্যুর মিছিল। এক ঝটকায় ধনী ও ক্ষমতাবানদের নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল গরীব আর ক্ষমতাহীনের কাতারে। তোমার হাতে টাকা আছে কিন্তু আইসিইউ র বেড খালি নাই। তোমার প্রাইভেট জেট প্লেন আছে বিদেশে গিয়ে চিকিত্সা নেয়ার ক্ষমতা আছে অথচ এয়ারপোর্ট বন্ধ। ২০২০ এর করোনায় বাবা মা দুজনকেই হারিয়েছিলেন নাবিলা।

আজ মর্নিং ওয়াকে রাইয়ান সাহেবকে খুব খুশি মনে হচ্ছে। তিন বছর পর কানাডা থেকে ওনার মেয়ে জুহি বাবার সাথে দেখা করতে এসেছে। উঠেছে আনন্দ আশ্রমের গেস্টহাউসে। সকালে অনেকের সাথে পরিচিত হয়ে ওর খুব ভালো লাগছে। কতগুলো অপরিচিত মানুষ শুধু দেশের শেকড়ের টানে, মাটির কাছাকাছি থাকবে বলে আজ একটা পরিবার; একথা ভাবলেই বারবার চোখ ভিজে আসছে জুহির। কিন্তু বাবাকে নিয়ে একটা সমস্যা অনুভব করছে সে। মনে হচ্ছে বাবা অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছে। এমন কি জুহির নামটাও মাঝে মাঝে মনে করতে পারছে না। কিছুটা ডিমেনশিয়া দেখা দিয়েছে। একটু উদগ্রীব হয় সে। বিদেশে তো এখন পার্কিনসন, এলজেইমার, ডিমেনশিয়া এগুলোর জন্য অনেক রিহ্যাব সেন্টার রয়েছে। এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আজ বিকেলে একজন নিউরোলজিস্ট এর সাথে এপয়েন্টমেন্ট করে জুহি।

এলজেইমার ডিজিস ডায়াগনসিস হয় জুহির বাবার। এটা এমন একটা রোগ যেখানে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজের ক্ষমতাও হ্রাস পায়। হঠাত্ করে কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না জুহি। যদিও বাবা কানাডার সিটিজেন তবুও কি তিনি দেশ ছাড়তে রাজি হবেন? এখানে বা কার ভরসায় রেখে যাবো আমি...এধরনের নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে জুহির মাথায়। সবকিছু শুনে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেন নিউরোলজিস্ট ডাঃ আশফাক জামিল।
--- কিছু মেডিসিন লিখে দিয়ে বলেন একদম চিন্তা করবেন না; আমাদের দেশেই এখন এলজেইমার পার্কিনসন রিহ্যাব সেন্টার গড়ে উঠেছে....একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিয়ে বলেন;
--- একবার হলেও প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে আসুন।
হোমে ফিরে পরের দিন জুহি শায়লা আর নাবিলার সাথে বাবার ব্যাপারটা শেয়ার করে ।
---আন্টি তোমরা কেউ কি আমার সাথে রিহ্যাব সেন্টার টা দেখতে যাবে? এক কথায় রাজি হয়ে যায় ওরা দুইজন।
পরের দিন একটা গাড়ী নিয়ে ওরা চলে যায় পূর্বাচল থেকে দুই ঘণ্টার পথ টাংগাইলের দেলদুয়ার। রাজধানী ঢাকা এখন ডিসেনট্রালাইজ হতে হতে গাজীপুর ছাড়িয়ে টাংগাইলের দিকে।

রিহ্যাব ক্লিনিকের এমডি র সাথে কথা হয় জুহিদের।
--- আসলে কি ম্যাডাম মানুষের লাইফ এক্সপেকটেন্সি বাড়াতে এই ধরনের ওল্ড এজ প্রবলেম গুলো বেশি ফিল হচ্ছে। যদিও বিদেশে মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব; কিন্তু এদেশে যেহেতু এটা সম্ভব না তাই অনেক শিল্পোদ্দক্তাই এখন দেশের বিশাল মানবসম্পদ কে কাজে লাগিয়ে এই সেবাখাত গুলোতে এগিয়ে আসছে। সত্যি অবাক হয় শায়লা একেবারে বিদেশের রিহ্যাব সেন্টারের মতো এদের কর্মযজ্ঞ। যেহেতু এধরনের অসুখে মানুষ শিশুর মতো হয়ে যায় তাই এদের খাওয়া দাওয়া, গোসল, ঘুম থেকে শুরু করে সব কাজেই অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন। যাদের পরিবার এই ধরনের সেবা দিতে অক্ষম তাদের জন্য এখানে সেবা দিয়ে যাচ্ছে একদল মানবদরদী অভিজ্ঞ স্টাফ। অবশ্য প্রতিষ্ঠানটির ফাইনান্সিং এর অর্ধেক অর্থ আসে রোগীদের কাছে থেকে। দুই একদিনের মধ্যেই আনন্দ আশ্রমের গভর্নিংবডির সাথে একটা এপয়েন্টমেন্ট করে জুহি। বাবার সমস্যাগুলো খুলে বলে তাদের। রিহ্যাব সেন্টারটার কথা শুনে তাদের কাজের ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখান ওনারা। অভয় দেন জুহি কে। কয়েকদিনের মধ্যে আনন্দ আশ্রম ওল্ডহোমের সাথে রিহ্যাব সেন্টারটির একটা সমঝোতা চুক্তিও হয়।

কালকে রাইয়ান সাহেব তাঁর ঠিকানা বদল করবেন। পূর্বাচলের আনন্দ আশ্রম থেকে টাংগাইলের এলজেইমার রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। ওনাকে সেখানে রেখে জুহি ফিরে যাবে কানাডায়। এই প্রথম আনন্দ আশ্রম থেকে কেউ এভাবে বিদায় নিচ্ছে। এই উপলক্ষে রাতে সবাই কে ডিনারে ইনভাইট করেছে জুহি। আজকে ওনার পরিবর্তন যেন স্পষ্টতই সবার চোখে পড়ছে। রাইয়ান সাহেব আবেগপ্রবণ হয়ে কখনো বা খুব আনন্দিত হচ্ছেন আবার কখনো বা কেঁদে ফেলছেন। খাওয়া দাওয়া ও আড্ডা শেষে যে যার মতো বিদায় নিল সেদিন।

ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে আছে পুরো আনন্দ আশ্রম। শুধু ঘুম নেই জুহির চোখে। সুইমিং পুলের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে একমনে ভাবছে সে। কত স্মৃতি...মা বাবা আর সে! একদিকে তার চাকরি, সংসার আরেক দিকে বাবা। সে কি একা ফিরে যাবে? নাকি বাবা কে নিয়ে ফিরবে? অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত বদল করে জুহি। ভোর হয়ে আসে আনন্দ আশ্রমের মসজিদ থেকে ভেসে আসে আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাউম। আজ বুধবার। রৌদ্রজ্বল এক শরতের বিকেলে মেয়ের হাত ধরে রাইয়ান সাহেব কানাডার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। আনন্দ আশ্রমের সব বোর্ডাররা অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বিদায় জানায় তাদের কিছুদিনের সঙ্গী একজন ওল্ডহোম মেট কে।


লেখক: এমবিবিএস চিকিৎসক
অধ্যাপক বায়োকেমিস্ট্রি
আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

ফিরে আসা......................রাকিব সামছ শুভ্র

ফিরে আসা......................রাকিব সামছ শুভ্র
তেতাল্লিশ বছরপর ক্যাটকেটে কমলা রঙের খামটা হাতে নিতেই রহমান সাহেবের কেমন অস্থির লাগছিলো। ঘেমে নেয়ে একাকার, হাত কাঁপছে। কুরিয়ারের ছেলেটা কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। বারবার জিজ্ঞেস করছে, স্যার শরীর ঠিক আছে তো?
রহমান সাহেব উত্তরে শুধু মাথাটা একটু উপর নিচ করলেন। ছেলেটার দেখানো জায়গায় প্রাপকের ঘরে কোনরকমে সিগনেচার করে দিলেন। দরজা বন্ধ করে বসার ঘরের সোফায় ধপাস করেই বসে পরলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেইসব দিনগুলোর কথা। কতো স্মৃতি! কতো ভালোলাগা! 
তন্বী ঘরে ঢুকে রহমান সাহেবের এভাবে চুপচাপ বসে থাকা আর ঘর্মাক্ত মুখ দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। দৌড়ে কাছে এসে রহমান সাহেবের কপালে হাত দিয়ে জানতে চাইলো, বাবা তোমার শরীর খারাপ লাগছে? বাবা কী হয়েছে? প্রেশার বেড়েছে? দাঁড়াও আমি বিপি মেশিনটা নিয়ে আসছি। 
মেয়েটা বাবার কিছু হলেই এতো অস্থির হয়ে পরে! উল্টো রহমান সাহেবকেই তাকে সামলাতে হয়। এবারও তাই হলো। আমার কিচ্ছু হয়নি, আমি ঠিক আছি। পারলে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খাওয়া।
তন্বী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। চার বছর আগে ডাক্তার ঠান্ডা পানি খেলে শরীরের ক্ষতি হয় বলার পর আর কোনদিন এক গ্লাস ঠান্ডা পানি পান করেন নি। আর আজ ঠান্ডা পানি চাচ্ছে? নিশ্চয়ই কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। চিন্তিত মুখে ঠান্ডা পানি আনতে গেলো।


চার ভাই বোনের মধ্যে সবার বড় রহমান সাহেব। বাবা ছিলেন স্কুল মাস্টার। সারাজীবনের সঞ্চয় জমিয়ে প্রায় চল্লিশ বছর আগে ঢাকা থেকে বেশ দূরে উওরায় একটা তিন কাঠার জমি কিনেছিলেন। সময়ের পরিবর্তন সেই দূরের জমিকে আজ এই ক্রমশ বড় হতে থাকা মেগা সিটির মধ্যে নিয়ে এসেছে তাদের। বাবার রেখে যাওয়া টিনশেডের বাড়িটাকে ভেঙে বছর পনেরো আগে রহমান সাহেব পাঁচতলায় রূপ দিয়েছেন। নিজে তিন তলায় থাকেন, মেজোকে দিয়েছেন চার তলা, ছোটকে পাঁচ তলাটা আর একমাত্র বোনকে দোতলাটা। ভাইবোন সবাই একই বাসাতেই থাকেন। এখনো চার ভাইবোন প্রতিদন বিকেলে-সন্ধ্যায় একসাথে চা খান। কোনদিন দোতলায়, কোনদিন চার তলায়! তলা চেঞ্জ হয় তাদের একসাথে চা-নাস্তা খাওয়া চেঞ্জ হয়না। 
তন্বী ঠান্ডা পানির গ্লাসটা বাবার হাতে ধরিয়ে দিতে গিয়ে সবুজ খামটায় চোখ আটকে গেলো। বাবা কার চিঠি? তোমার? কে দিয়েছে?
পরপর বেশ কয়েকটা প্রশ্ন করলেও কোন উত্তরই পেলো না। বাবাকে দেখে মনে হচ্ছে এ জগতে নেই। অন্য কোন জগতে, অন্য কোন সময়ে বিচরন করছেন। 

বহুদিনপর রহমান সাহেব মনের দরজা খুলে দিলেন। হুহু করে পুরনো বাতাস বইতে লাগলো। রহমান সাহেবদের পাশের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে এলো পুতুলরা। রহমান সাহেব তখন ক্লাস ওয়ান কি টুয়ে পড়েন! পুতুল মাত্র স্কুলে যাওয়া আসা শুরু করেছে। পাশের পাড়ায় স্কুল, প্রায় প্রতিদিনই একসাথে যেতো। বিকেলে বাসার সামনের মাঠে সবাই মিলে খেলতো। রহমান সাহেব হাফপ্যান্ট আর পুতুল ফ্রক পরতো। হঠাৎ করেই রহমান সাহেব খেয়াল করলেন গোল্লাছুট, টিলোএক্সপ্রেস, বরফ-পানি, খেলতে খেলতে তিনি ফুলপ্যান্ট পরছেন আর পুতুল ফ্রক থেকে সালোয়ার কামিজ! পুতুল তখন নতুন নতুন ওড়না পরাও শুরু করেছে। এই পুতুলকে দেখে রহমান সাহেব নতুন পুতুলকে আবিষ্কার করলেন। নিজের মধ্যেই তুলু (পুতুলকে আদর করে তুলু ডাকতেন) কে অনুভব করা শুরু করলেন। তখন পুতুল ক্লাস সিক্সে আর উনি ক্লাস এইটে। খেলার সাথী কখন মনের সাথী হয়েছে টের না পেলেও নিজের ভিতরের পরিবর্তনটা বেশ টের পেলেন। এক বিকেলে খেলার ফাঁকে পুতুলের হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিয়ে দেছুট। কিছুটা অস্বস্তি এবং কিছুটা ভয়! ওদিক থেকে কী প্রতিক্রিয়া আসে? কাগজটা দেবার পর বেশ কদিন পুতুল খেলতে এলো না। রহমান সাহেবের ঘুম শেষ! রাতে ঘুমাতে পারে না, বিকেলে মাঠে এলে চোখ এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে তুলুকে। পাঁচদিনের দিন তুলু এলো কিন্তু তার চোখ মুখে সম্পূর্ণ ভিন্ন আভা! রহমান সাহেবের সামনে পরতেই কেমন লজ্জায় গুটিসুটি মেরে রইলো। "কিরে তুই কয়দিন এলিনা কেন? আর জবাবও দিলিনা?"
পুতুল কোন উত্তর দেয়নি। সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে হাতে বানানো একটা চোখ জ্বালাকরা কমলা রঙের খাম ধরিয়ে দিলো। সাথে বললো, বাসায় গিয়ে পড়বে প্লিজ, এখানে না।
রহমান সাহেব সেদিন খেলতে নামলেন না, একছুটে বাসায়। ঘরে গিয়ে খুব সাবধানে লুকিয়ে লুকিয়ে খামটা খুললো। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা একটা চিঠি। 

‘কিভাবে চিঠি লিখতে হয় জানিনা। শুধু এটুকুই জানি তোমার চিঠি পাবার পর থেকে আমার পৃথিবী বদলে গেছে। সবকিছুতেই তুমি! আমি রাজি কিন্তু এক শর্তে। আমাকে তুইতোকারি করা যাবে না। তুমি করে বলতে হবে এবং কচুরিপানার ফুল এনে দিতে হবে।’

চিঠিতে শুরু এবং শেষে কোন সম্বোধন ছিলো না। এরপর প্রায় প্রতিদিনই ক্যাটকেটে কমলা খাম পাওয়া এবং তার উত্তর দেয়া রহমান সাহেবের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে তাদের প্রেম ভালোবাসা ভালোই চলছিলো। সমস্যা দেখা দিলো যখন রহমান সাহেব ইন্টার পাশ করে বিএ তে ভর্তি হলো। 

পুতুলের বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লো। ওদের সহায় সম্বল সব বিক্রি করেও শেষ রক্ষা হলোনা। বাবা মারা যাবার পর ওর মামারা ওদেরকে এখান থেকে তাদের বাড়ি নিয়ে যায়। এর মাস ছয়েক পরেই এক লন্ডনি ছেলের সাথে মামারা একরকম জোর করেই বিয়ে দিয়ে দেয়। রহমান জানতে পেরে ছুটে গিয়েছিল পুতুলের কাছে। কিন্তু সংসারের অভাব আর পারিবারিক সম্মান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজের চাওয়াকে বিসর্জন দিলো পুতুল। ওর ছোট আরও চার ভাইবোন আছে। মামারা তাদের দেখভাল করবেন, পড়াবেন এই শর্তেই পুতুল রাজি হয়েছিলো। তাছাড়া রহমান তখনো ছাত্র, ওকে পালিয়ে বিয়ে করাটা দুই পরিবার মেনে নেবে না। পুতুলের উপায় ছিলোনা।
বিয়ের মাস চারেক পরই ওর স্বামী ওকে লন্ডন নিয়ে যায়। তিন চার বছর পরপর একবার দেশে এলেও কখনো রহমানের সাথে দেখা করার চেষ্টা করেনি। রহমানও খোঁজ পেতেন তুলু দেশে এলেই। কিন্তু অভিমানে কখনোই সামনে যাওয়া হয়নি। 
তেরো বছর আগে একবার দেশে এসেছিলো পুতুল। তন্বীর বয়স তখন বারো। বাবা মেয়ে একসাথে শপিং এ গিয়েছিলো সেখানেই পুতুলের সাথে তিন যুগ পর রহমানের দেখা হয়ে যায়। রহমান বরফ পানি খেলায় ছুঁয়ে বরফ বললে যেমন মূর্তি হয়ে যায় ঠিক তেমনি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। পুতুলও কিছুই বলতে পারছিলো না। তন্বীই পাশ থেকে রহমান সাহেবকে ধাক্কা দিয়ে বললো, বাবা তোমার কী হয়েছে? এই আন্টিকে দেখে স্ট্যাচু হয়ে গেলে!
রহমান তাকিয়ে দেখছে, সেই একই চোখ, সেই একই হাসি! নাকের নিচের সেই প্রিয় তিলটা সব একই রকম আছে শুধু একটু ওজন বেড়েছে সেই ছিপছিপে ভাবটা নেই। আর সিঁথির দুপাশের কিছু চুলে কালো সরে গিয়ে সাদার দেখা মিলছে। কী বলবে খুঁজে পাচ্ছিলো না। পুতুলই প্রথমে জিজ্ঞাসা করলো কেমন আছ? উত্তর পায়নি একটা হাসি ছাড়া। হাসিটার মানে ভালো আবার খারাপ দুটোই হয়। তন্বী কে আদর করে দিলো, মাশা আল্লাহ অনেক সুইট হয়েছে তোমার মেয়েটা। এর উত্তরেও সেই একই হাসি ফেরত পেলো। কথা জমেনি আর। দুজনই তাড়া আছে বলে নিজেদের ভীড়ে আড়াল করলো।
তন্বী বাসায় এসে বাবাকে হাজারটা প্রশ্ন করে কিন্তু উত্তরে শুধুই নিরবতা দেখেছে। তন্বী ফুফুর কাছে শুনেছে, বাবা একজনকে খুব বেশী ভালোবাসতো, এখনো মনে হয় বাসে। তার হঠাত করে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বাবা সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। তাহলে ইনিই কী সেই তিনি? যার জন্য বাবার নিজেকে গুটিয়ে নেয়া? অনেক চেষ্টা করেও বাবার মুখ থেকে তার নামটা জানা গেলোনা। ফুফুর কাছে ছুটে গেলো, বর্ননা দিতেই ফুফুর মুখ উজ্জ্বল হয়েও আবার নিভে গেলো। শুধু বললো, হুম উনিই পুতুল যার জন্য তোর বাবা সবকিছুই ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু আমাদের আঁকড়ে ধরে আছেন আজ তেতাল্লিশটা বছর।
আজ বাবার হাতে কমলা খামটা দেখে তন্বীর মন ছটফট করে উঠলো। বাবা চিঠিটা নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিলেন। তন্বী দরজায় কান পেতে শুনতে পেলো বাবার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ। বাবা সন্ধ্যায় ছোট চাচার বাসায় চা খেতে গেলে তন্বী একটা অনুচিত কাজ করে ফেললো। বাবার চিঠিটা খুঁজে বের করে পড়লো।

যদি পারো আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমাকে দেয়া কষ্ট গুলো অনেক বছরপরে হলেও আমাকেই ছুঁয়ে যাচ্ছে। তুমি জানো কিনা জানিনা? আমাদের একমাত্র সন্তান রোপেন দুই বছর আগে রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। আমি মা হয়ে শোকটা সামলে নিয়েছিলাম কিন্তু ওর বাবা তা আর পেরে উঠেনি। দেড়টা বছর অস্থিরতা নিয়ে দিন কাটিয়ে আট মাস আগে সেভিয়ার হার্ট এটাক করে। অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারলাম না। এই কদিনেই আমি উপলব্ধি করেছি কাছের মানুষ হঠাত করেই দূরে চলে গেলে কেমন লাগে! 
আমি ইচ্ছে করে তখন তোমায় ছেড়ে আসিনি। মামারা শর্ত দিয়েছিলেন যদি আমি বিয়েতে রাজি হই তাহলেই ওনারা মাকে এবং আমার ভাইবোনদের ওনাদের বাড়িতে থাকতে দিবেন, পড়ালেখা করাবেন। আমি রাজি না হলে সবাইকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে। তুমিই বলো আমি আমার ভালোবাসা রক্ষা করতে গিয়ে পুরো পরিবারকে নিয়ে পথে কীভাবে নামতাম? তুমিও তখন ছাত্র। এতোটা বোঝা তোমার উপরেই কি করে চাপিয়ে দিতাম? তাই ভেবেছিলাম আমি একাই সব হারিয়ে আমার মা আর ছোট ভাইবোনদের ভালো ভাবে বেঁচে থাকাটা নিশ্চিত করি। হ্যাঁ আমি এটুকু বলতে পারি, সারাজীবন আমি কিসের মধ্যে দিয়ে পার করেছি কেউ জানে না কিন্তু আমার ওই বড় ত্যাগটুকুর জন্যই আমার ভাই বোনেরা সবাই আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। সবাই ভালো আছে। 
তোমাকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিলো। সেবার তোমার মেয়েকে দেখে অনেক ভালো লেগেছে। অনেক শান্তি পেয়েছি তোমাকে সংসার করতে দেখে। তুমি ভালো থাকো এই দোয়া করি। আমারও বয়স হচ্ছে ষাটে পৌঁছে গেছি৷ ভাবছি একা না থেকে কোন ওল্ড হোমে চলে যাবো। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও পারলে দোয়ায় রেখো।
ইতি 
তুলু।


বাবাটা এত্তগুলো বছর এতো কষ্ট চেপে রেখেছে। তন্বী রহমান সাহেবের মেয়ে না। তার মেঝো ভাইয়ের মেয়ে। কিন্তু ছোট বেলা থেকেই তার নেওটা ছিলো। একটু বড় হয়ে বাবার কাছেই চলে এসেছে। ওর বাবা-মা ও আপত্তি করে নাই। একই বিল্ডিংয়েই সবাই৷ চিঠি পড়ে অনেক্ক্ষণ কাঁদলো তন্বী। চিঠিটা জায়গামতো রাখার আগে পুতুলের পোস্টাল এড্রেস টুকে নিলো। 
প্রায় মাস দুয়েক পর আবারো একটা কমলা খাম এলো রহমান সাহেবের ঠিকানায়। এবার অবাক হলেও আগের মতো অস্থির হলেন না রহমান সাহেব। হয়তো মনে মনে উনিও অপেক্ষা করছিলেন আরেকটা চিঠির! হাতে নিয়ে অনেকটা সময় বসেই থাকলেন। খুলে পড়লেন না। ভিতরে না জানি কী লিখা আছে? বরং চিঠি হাতে নিয়ে নিজের মতো ভেবে নেয়াটা অনেক বেশি নিরাপদ। 

রুমে গিয়ে চিঠি খুলে পড়তে বসলেন।
আজ চিঠিতে সম্বোধন আছে। 

প্রিয়.....
নামটা লিখতে গিয়েও লিখলাম না৷ যদি কোনদিন দেখা হয়! তখনই ডাকবো। তুমি আমায় ভালোবাসো তা জানি তবে এতোটা আশা করিনি। একটা জীবন কাটিয়ে দিলে একেবারেই একা! আমি এটা শোনারপর থেকে কোন ভাবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিনা। কান্নার দমকে সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আমি যাকে নিজের করে পাইনি সে কিনা নিজেকে আমার করেই রেখে দিয়েছে।
এখন বলাটা অন্যায় তারপরও মানুষ কতো ভুল করেও সুধরে নেয়। আমার জীবনের প্রথম সময়টুকু জুড়ে ছিলে তুমি। আমার শেষ সময়টুকু জুড়ে কী তুমি থাকতে পারো না?
তোমার কিংবা আমাদের ভালোবাসার উপরে এখন আর আমার কোন দাবী নেই। তবু খুব ইচ্ছে হচ্ছে বারান্দায় তোমার সাথে বসে চা খেতে। বাগানে তোমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে ছোট্ট কাগজ মুঠোয় গুঁজে দেবার সৌভাগ্য কি হবে? আমি নেক্সট উইকে দেশে আসবো। যদি তুমি আমাকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে আসো, খুব খুশি হবো। আর না এলেও মন খারাপ করবো না। সময়টাকে তার মতো করেই এগিয়ে যেতে দিতে চাই। 
তন্বীকে আমার আদর দিও। ও খুবই ভালো মেয়ে।
ইতি
তুলু।

রহমান সাহেব হাসছেন সেই হাসিটা! যার অর্থ হ্যাঁ কিংবা না দুই ই হতে পারে। তন্বী দূর থেকে বাবার হাসিটার মানে খুঁজছে। বুদ্ধি করে মেয়ে হয়ে মায়ের কাজটা করে দিলো তন্বীই।

ইউরোপ ভ্রমন ( ফ্রান্স -১ম পর্ব).....................মনিরুল ইসলাম জোয়ারদার

ইউরোপ ভ্রমন ( ফ্রান্স -১ম পর্ব).....................মনিরুল ইসলাম জোয়ারদার
প্রিয় শ্যালক তৌহিদ বললো দুলাভাই পর্তুগালে আর বেশি দিন নাই ইউরোপের বাইরে হয়তো অন্য কোথাও ট্রান্সফার করে দিবে সুতরাং আমি থাকতে থাকতেই পর্তুগাল বা পারলে ইউরোপের কয়েকটা দেশ ঘুরে যান। ঢাকায় তৌহিদের সাথে দেখা হলেই বলতাম তুমি শালা যেখানে যেখানে পোষ্টিং পাবে আমি সেখানে সেখানেই যাব। তোমার পিছু ছাড়বো না।ফলে তৌহিদের এই অফারটি এড়িয়ে যেতে মন চাইছিল না। বললাম ব্যবস্থা কর তোমার বুবু ভাগনে ভাগনি সহ যাব।

শেষ পর্যন্ত তৌহিদের ইনভাইটেশানে চারজনের পুরো পরিবারের সেনজেন ভিসাটা হয়েই গেল। অবশ্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ফ্রান্স এ্যামবেসিতে জমা দিয়েই ভিসা পেয়েছি। তৌহিদ যেহেতু পর্তুগালে অবস্থান করছে সেহেতু ওখানেই যেতে হবে। ভাবলাম সেনজেন ভিসা পেলাম ২৭টা দেশ ঘুরতে পরবো তবে কেন শুধু একটা দেশ ঘুরবো। এবার খোঁজা শুরু হলো কোন দেশে ঘনিষ্ট স্বজন বাস করে। পেয়েও গেলাম ভাস্তেকে। আমার কাজিনের ছেলে ইটালিতে বসবাস করছে স্ত্রী ও মাকে নিয়ে। ভাস্তেকে বললাম বাবা ইটালিতে আসতে চাই কদিনের জন্য তো হোটেল ভাড়াতো অনেক পড়বে তা তোমার বাসায় কি দু একদিন থাকা যাবে? ভাস্তে রেগে গিয়ে বললো কি বলেন কাকা দু এক দিনতো থাকা যাবে না আপনাকে কমপক্ষে দশদিন থাকতে হবে।আমিতো আপ্লুত। বললাম ভিসা পেয়েছি ৩০ দিনের শুধু ইটালিতে দশ দিন থাকলেতো হবে না। ভাস্তে বললো আগে আসেনতো তারপর দেখা যাক।
তৌহিদকে বলতেই সে বললো যেখানেই যান পর্তুগালে ১৫ দিন থাকতে হবে। এবার ভাবলাম তাহলে রওনা দেই প্রথমে ইটালি পরে পর্তুগাল।আমার বন্ধুবর শাহিদুলের ট্রাভেল এজেন্সি সিটিকম ট্রাভেলে যেয়ে টিকেট কিনলাম। শাহিদ ভাই সর্বোচ্চ ডিসকাউন্টে টিকেটের ব্যবস্থা করলো। টিকেট আনতে গেলে শাহিদ ভাইয়ের স্টাফ বললো এখন নিয়ম হয়েছে যে দেশের এ্যাম্বেসি থেকে ভিসা নিবেন সেই দেশ হয়ে অন্যদেশে যেতে পারবেন। শ্যালককে জিজ্ঞেস করতেই সে বললো না এমন কোন নিয়ম নেই। কিন্তু স্টাফ ভদ্রলোক অনড় । 

সেদিন শাহিদ অফিসে ছিল না। তো কি করা প্রায় একই মুল্যে প্যারিস হয়ে যেতে পারছি তাছাড়া আমার মেয়ে আরশীর প্রচন্ড ইচ্ছা প্যারিস দেখা আমারও ইচ্ছে তাই তো কেটে ফেললাম সামান্য কয়েকটা টাকা বেশি দিয়ে। রিটার্ন টিকেট নিলাম ঢাকা- প্যারিস, লিসবন -ঢাকা। এখন খোঁজা শুরু হলো ফ্রান্সে পরিচিত আত্মীয় কে আছে পেয়েও গেলাম আমার ভায়রা আরাফাতের ছোট কাকা মি.আনোয়ার ওখানে বাস করছে টানা দশ বছর। ফেসবুকে তাঁকে খুঁজে এড করে কথা বলা শুরু করলাম।আরাফাত বলেছিল অসাধারন ভাল মানুষ কথা বলে দেখলাম ভালোর সাথে অসাধারন আন্তরিকও। ভিসা পাবার পর থেকেই ফ্রান্সে আনোয়ার কাকা ইটালিতে সজীবের সাথে প্রতিদিনই ম্যাসেঞ্জারে কথা চলছে অবিরত আর তৌহিদের সাথে যখন তখন। যেহেতু প্যারিসে প্রথমেই যাব তাই আনোয়ার কাকাকে হোটেল বুকিং দিতে বললাম। প্যারিসে আনোয়ার কাকা ও কয়েকজন যুবক মিলে এক ফ্লাট ভাড়া করে বসবাস করে।ফলে আমাদের জন্য হোটেল ঠিক করলেন। 
তবুও আমি একটু আশন্কায় ছিলাম যদি হোটেল ঠিকমত না মেলে মহা বিপদে পড়ে যাব।আনোয়ার কাকা আমাকে আশ্বস্ত করলেন। আমরা ২০ আগষ্ট টার্কিশ এয়ারে রওনা দিলাম। ঢাকা এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পার হয়ে বোর্ডিং পাস নিয়ে অপেক্ষা করছি কখন প্লেনে উঠবো। ভোর পাঁচটায় প্লেনে উঠলাম প্লেন উড়লো ঠিক ছটা কুড়িতে। সিটে বসতেই আনান ঘুমিয়ে পড়লো।ছেলাটা গতরাতে একটুও ঘুমায়নি।আমরা কেউই ঘুমাইনি কিন্ত ওতো মাত্র আট বছরের ছেলে।উনিশ তারিখ রাত সাড়ে বারটায় বাসা থেকে বের হয়েছি ভ্রমনের উত্তেজনায় সারাদিন সারারাত ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেছে এখন সবাই গা এলিয়ে দিয়ে সিটে বসলো।সিট বেল্ট বেধে বসতেই প্লেন ছেড়ে দিল। একটু পর আকাশে উড়লো। জানালা দিয়ে দেখলাম নীচের বাড়ি ঘর ছোট ছোট কাগজের বক্সের মত। সামনের সিটের পেছনে আমার সামনে স্ক্রিনে দেখলাম সাত হাজার মিটার উপরে আছি। একটা সো সো আওয়াজ পাচ্ছি কানে। ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়লাম।একটু পর মেয়েলি কন্ঠে ইংরেজীতে কিছু কথা শুনে ঘুম ভাংলো। দেখি এয়ার হোস্টেস খাবার নিয়ে এসেছে।তাড়াতাড়ি সামনে ভাজ করে রাখা ট্রেটা মেললাম এয়ার হোস্টেস খাবারের প্যাকেট রেখে মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল। প্যাকেট খুলে হাইজেনিক খাবার দেখে মনটা ভরে গেল। খাওয়ার পর জুস খেলাম। খানিকটা পর কফি খেয়ে ঘুম। ঘন্টা চারেক পর আবার হালকা নাস্তা ও কফি খেলাম। স্থানীয় সময় চারটায় প্লেন ইস্তান্বুলে ল্যান্ড করলো। ছটা থেকে চারটা মোট দশ ঘন্টা প্লেন উড়েছে মনে হলেও আসলে সাত ঘন্টা উড়েছে। বাংলাদেশের সাথে তুরুস্কের সময়ের পার্থক্য তিন ঘন্টা এবং আটোমেটিকভাবে সময় এ্যাডজাস্ট হয়ে যায় বিশেষ করে মোবাইলে ও প্লেনের ঘড়িতে। ইস্তাম্বুলে চার ঘন্টা ট্রানজিট। ভিতরেই বসে থাকলাম। প্যারিসের প্লেন কত নাম্বার প্যাসেজ ওয়ে থেকে ছাড়বে জেনে নিয়ে লাউঞ্জে বসলাম।

এরপর আমি আর আনান ঘুরে ঘুরে সমস্ত এয়ারপোর্ট দেখলাম তারপর আমরা হ্যান্ড ব্যাগগুলো পাহারা দিলাম আর ডলি আরশী এয়ারপোর্ট ঘুরে দেখলো। বিশাল বড় এয়ারপোর্ট প্লেনের অভাব নেই যাত্রীরও অভাব নেই। এত যাত্রী তবুও হৈচৈ কম। ঠিক চার ঘন্টা পর প্যারিসের পথে বদলি প্লেন ছাড়লো। আবার প্লেনের ভিতর হোস্টেসের দেওয়া খাবার খেয়ে ঘুম।স্থানীয় সময় ছটা ত্রিশ মিনিটে প্যারিস সিডিজি এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম।ধীরে ধীরে প্লেন থেকে নেমে এয়ারপোর্টের বাসে উঠে চলে এলাম এক্সিট এরিয়ায়। সবচেয়ে অবাক লাগলো সারা এয়ারপোর্টে ইংরেজি লেখা নেই। ইংরেজি অক্ষরে ফ্রেন্স ল্যাঙ্গুয়েজ।শুধু এ্যারো চিহ্ন দেখে বের হলাম। এ্যারো চিহ্নের পাসে লেখা sorte পরে শুনেছি sorte অর্থ বাহির। ভিজিটর এলাকায় এসে দেখি আনোয়ার কাকা দাড়িয়ে সাথে আরো একজন। দেখে বুকের ভেতর আশ্বাসের চাঁদরটা লম্বা হয়ে গেল। আনোয়ার কাকার সাথে এই প্রথম সরাসরি দেখা এর আগে শুধুমাত্র মোবাইলে কথা ও দেখা হয়েছে।আনোয়ার কাকা জড়িয়ে ধরলো ও পাসের যুবকটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিল ও রতন। ওঁদের পাসে দেখি আরো দুজন দাড়িয়ে সামনে এসে পরিচয় দিল সে নির্ঝর অধিকারী ফ্রান্সে বাংলাদেশ দুতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি তৌহিদের কলিগ। আমার স্ত্রীকে চেনে ওঁর সাথে কথা বললো। নির্ঝর অধিকারী মোটর কার নিয়ে এসেছে। নির্ঝরের একটা বড় প্যাকেট ঢাকা থেকে আমরা নিয়ে এসেছি যার মধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসে বাংলা নববর্ষ পালনের সরঞ্জাম ছিল। ওঁর গাড়িতে লাগেস সহ আমি আনোয়ার কাকা বাদে সবাইকে উঠিয়ে দিলাম। আমরা দুজনে মেট্রো রেলে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মেট্রো রেলের কথা অনেক শুনেছি এবার চড়লাম।সে এক অন্যরকম অনুভুতি।

চলবে.…...।

হাসপাতাল রহস্য...................শাহরীন মৌন

হাসপাতাল রহস্য...................শাহরীন মৌন
আগের পর্বের রেশ ধরে....

সে ফিরে তাকাতেই দেখলো তারই সহকারী শুভ।
: ওহ্, তুই! আমি ভাবলাম আবার এখানে কে আমাকে চিনে ফেললো।
: (সামান্য হেসে) তা ছদ্মবেশে এলেই পারতে!
: হ্যাঁ, তাই ভাবছি। এখন যখন প্রায়ই এখানে আসতে হবে তখন ছদ্মবেশ নিতেই হবে। তো তোর কাজটা হয়ে গেছে?
: হ্যাঁ, বেশ কিছু তথ্য আমি জোগাড় করেছি। ফিরে গিয়ে বলছি, চলো।
: দাঁড়া, নার্সটা সেই কখন ভেতরে গেছে, এখনো আসার নাম নেই।
: কেনো? ঢুকতে দিচ্ছে না ভেতরে?
: নাহ, এখন নাকি ভেতরে ঢোকা যাবে না। কিন্তু আমি ভাবছি যদি ঢুকতে না দেয়, তাহলে কীভাবে আমি ভেতরে যাবো।
: উমমম, আবির ভাই, নার্সটাকে হাত করা যায় না? মানে যদি কোনো ভাবে ওকে আমরা ম্যানেজ করতে পারতাম তাহলে ব্যাপারটা সহজ হতো না? এরা তো টাকার জন্যই খাটে।
: না, না। এটা করা যাবে না। এই হাসপাতালের সাথে জড়িত কাউকে কিচ্ছু জানানো যাবে না শুভ। কারণ, এরা হতেও পারে এই অপরাধের সাথে যুক্ত। তাই এই রিস্কটা নেয়া যাবে না।
: হ্যাঁ, কিন্তু যদি আমাদের ঢুকতে না দেয়, তবে আমরা কীভাবে কেবিনগুলো দেখবো বলো?
: একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে। দেখি না, আগে নার্সটা আসুক। কি বলে শুনি।
: হুম।
ওরা দু’জন হাসপাতালের এক কোণায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকে। এরই মধ্যে নার্স ফোনে কথা শেষে ওদের কাছে চলে আসে। শুভকে দেখে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আবির বুঝতে পেরে বলে,
: ও আমার ভাই, শাকিব। ইচ্ছা করেই আসল নামটা গোপন করে আবির। আচ্ছা, আমাদের যেতে দেবেন না ভেতরে? আমাদের তো খুবই দরকার।
: দেখেন, আমি তো সাধারণ নার্স। আমাকে যেমন নির্দেশ দেয়া হয় আমি তেমনই করি। আমি ওপর মহল থেকে অনুমতি নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাঁরা অনুমতি দিলেন না। আপনারা জিনিসগুলোর মায়া ছেড়ে দিন। আর এমনিতেও আপনারা ওগুলো পেতেন না। কারণ, ডেডবডি সরানোর পরে কেবিন ভালোভাবে পরিষ্কার করে ফেলা হয়। কিছু জিনিস থাকলে তা তাদের বাড়ির লোকই নিয়ে যায়, নয়তো আমরা ফেলে দেই। তাই বলছি, আপনাদের জিনিসও আপনারা পাবেন না।
: এমন বলবেন না। আমাদের যে ওগুলো খুব দরকার। একটু দেখেন না যদি ব্যবস্থা করতে পারেন ।
: আহা! আপনাদের বলছি না অনুমতি নেই! কেনো বায়না করছেন? আর কি এমন জিনিস যেটা না হলেই নয়? মানুষটাই তো মারা গেলো। আর কি চান বলেন তো। আমার কাজ আছে। আমাকে যেতে দিন। এই বলে নার্স ওখান থেকে চলে গেলো।
: আবির ভাই, কি ভাবছো? কি করবে এবার?
: বুঝতে পারছি না। তবে গণ্ডগোল যে বড় সড় সেটা আন্দাজ করতে পারছি ভালোভাবে।
: আমাদের অন্য রাস্তায় হাঁটতে হবে বুঝলে?
: হুমম, তাই ভাবছি। চল, আজকের মতো ফিরে যাই। কিন্তু কাল আবার আসবো।

আবির আর শুভ হাসপাতাল থেকে চলে আসে। শুভ, আবিরের সহকারী। ছোট ভাইও বলা যায়। একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে ল পড়ছে। আর আবিরকে কাজে সহায়তা করছে। এরই মধ্যে আবিরের সাথে বেশ কিছু কেস সল্ভও করেছে। তাই আবির তাকে অনেক ভরসা করে। গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কাজের দায়িত্ব শুভ পালন করে। এইতো, এই কেসেও আবিরকে সাহায্য করছে।
শুভর বাবা, মা গ্রামে থাকেন। আর আবিরের বাবা মা অনেক আগেই মারা গেছেন। চাচার কাছেই মানুষ হয়েছে আবির। বেশ কিছুদিন হয়েছে চাচাও মারা গেছেন। এখন আবির বলতে গেলে একাই। তাই আবির আর শুভ একসাথেই থাকে। ভালোই হয়েছে একদিক দিয়ে। বাসায় তারা ছাড়া আর কেউ থাকে না, এতে তাদের কাজে সুবিধা হয়। বেশ কয়েকদিন হলো ওরা বাসায় ছুটা বুয়া রেখেছে। সকালে এসে কাজ করে দুপুরে চলে যায়। বুয়া অবশ্য জানে না যে ওরা গোয়েন্দা। বাড়তি সতর্কতা নিতেই হয়। কারণ শত্রুরা সব সময় তথ্য চায়, আর তাই এদেরকেই আগে হাত করে।

হাসপাতাল থেকে ফিরে শুভ আর আবির বারান্দায় বসে চা নিয়ে। শুভ আলাপ শুরু করে,
: এই নিয়ে মোট ৯টা সুইসাইডাল কেস হয়েছে এই হাসপাতালে।
: ৯ টা !!
: হুমম, ৯ টা। আর সবচেয়ে বড় আশ্চর্যজনক কি জানো? এই ৯ জনই কিছু না কিছু রোগ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এসেছিলো।
: হাসপাতালে সবাই তো চিকিৎসার জন্যই আসে।কিন্তু এই ৯ জনই কেনো?
: আরেকটা কথা। সবারই মৃত্যু রাত ১ টা থেকে ৩ টার মধ্যে।
: অদ্ভুত তো। দেখো আবির ভাই,আমার যতো দূর ধারণা হাসপাতালে কিছু একটা ঘটনা আছেই।
: তা তো আছেই শুভ। বড় ধরণের খেলা চলছে ওখানে। কিন্তু,
: কিন্তু?
: আমি ভাবছি, এই যে মানুষগুলো সুইসাইড করেছে তাদের পরিবারের কেউ কেনো থানায় জানায়নি?
: তুমি গিয়েছিলে থানায়?
: হ্যাঁ,আগে থানায় গিয়েছিলাম। অফিসার বললেন যে,উনি এমনটা শুনেছেন কানাঘুষা কিন্তু কেউই নাকি উনার কাছে অভিযোগ দায়ের করেননি।
: এটা কীভাবে সম্ভব? না,মানে মানছি যে হাসপাতাল এই মৃত্যুগুলোর সাথে হয়তো জড়িত। কিন্তু তাই বলে ভিক্টিমের পরিবারও? উনাদের কি স্বার্থ?
: দেখ, কার কী স্বার্থ, কে কেনো কী করেছে এগুলোর উত্তর জানতে হলে আমাদের আগে হাসপাতালের ভেতরে যাওয়াটা খুব জরুরি। মারা যাবার আগে তারা যে কেবিনগুলোতে ছিলো সে জায়গাগুলো দেখা দরকার একবার।
: কিন্তু আমাদেরকে কোনো কারণ ছাড়া ওরা ঢুকতে দেবে না। ছদ্মবেশ নিতেই হবে।
: সেটাই ভাবছি। শুভ, তুই একটু থাক। আমি চট করে আসছি। বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো আবির।
(চলবে........)