Showing posts with label কিশোর গল্প. Show all posts
Showing posts with label কিশোর গল্প. Show all posts

মাতৃত্ব..................তুহিন রহমান

মাতৃত্ব..................তুহিন রহমান
রকারী অফিসের পেছনের ডুমুর গাছের পাতা বুনে ছোট্ট একটা বাসা বানিয়েছে দুটো টুনটুনি পাখি। টোনা আর টুনি। টোনার নাম চিরিং। আর টুনির নাম রুরু। দু’জনেই বেশ দুরে থাকে। তাদের জায়গাটা নিরাপদ নয় তাই তাদের জঙ্গল থেকে বেশ দুরের এই সরকারী এলাকার গাছে বাসা বেঁধেছে চিরিং আর রুরু। গাছের ওপরের অংশে, যেখানে মানুষ নাগাল পাবেনা সেখানে কয়েকটা পাতা এক করে তুলোর চিকন বুনট দিয়ে বাসা বানিয়েছে দু’জন। বাসা বানাতে লেগেছে পুরো দুটো সপ্তাহ। ওপর থেকে যা’তে বৃষ্টির পানি না পড়ে সেজন্য বাসার ওপর সেলাই করে দিয়েছে একটা কচুপাতা। 

বাসা বানানো যখন শেষ তখন রুরু বললো,‘এবার আমি ডিম পাড়তে পারি।’
চিরিং বললো,‘আরেকটু অপেক্ষা করো। এই মাসটা যাক। পরের মাসে পেড়ো।’
‘তা ঠিকই বলেছো।’ রুরু বললো।‘এই মাসটা আমরা বিশ্রাম নেবো। সামনে তো আবার বাচ্চা বড়ো করার কষ্ট আছে।’
‘ঠিক বলেছো। এই মাসটা আমরা শুয়ে বসে কাটিয়ে দেবো।’
ওরা একটা মাস শুয়ে বসে কাটিয়ে দেয়। কোন খাবার দাবারের ভাবনা নেই। খেলে খেলাম নাহলে না খেলাম এমন একটা ভাব। বাচ্চা হলে তো এসব চলবেনা। তখন তাকে বড়ো করার চিন্তা। শুধু তাকে বড়ো করলে চলবেনা। তাকে পাখির মতো পাখি বানাতে হবে। তাকে উড়তে শেখাতে হবে। পোকা শিকার করতে শেখাতে হবে। বিপদ চেনাতে হবে। আরও কতো কি। তারপর তার পড়ালেখার চিন্তা।
পরের মাসে রুরু ডিম পাড়ে। ছোট ছোট দুটো ডিম। ডিমের গায়ে নীল নীল ছোপ ছোপ। রুরুর চোখে অনেক স্বপ্ন। ডিম ফুটে কি টোনা হবে নাকি টুনি হবে এটাই সে চিন্তা করে। ডিমদুটো পাশাপাশি থাকলেও মাঝখানে কিছুটা তুলো গুঁজে দিয়েছে রুরু। যদি জোরে বাতাস বয় আর গাছটা জোরে জোরে দোলে তাহলে ডিম দুটো একে অন্যের সাথে বাড়ি লেগে ভেঙ্গে যেতে পারে। দু’দিন পর চিরিং কোন গাছের আঠা এনে ডিমের ওপর দেয়। এর ফলে নাকি তার ডিম্বজাত সন্তান আরও শক্তিশালী হবে। রুরু আবার কোথা থেকে একটা সবুজ পাতা নিয়ে ঘষে দেয় ডিমের ওপর যা’তে তার ডিমদুটোর খোসা আরও শক্ত হয়। ডিমের খোসা শক্ত হওয়া মানে ভেতরের বাচ্চার হাড্ডি শক্ত হওয়া।
এভাবে প্রায় চারদিন চলে গেল। রুরু সারাক্ষন বসে থাকে ডিমের ওপর। তা দেয়। চিরিং উড়ে যায়। কোথা থেকে যেন পোকা নিয়ে আসে। গুঁজে দেয় রুরুর মুখে। বলে,‘তোমার জন্যও নিয়ে এলাম। তুমি তো সেই সকাল থেকে কিছু খাওনি।’
‘ঠিকই বলেছো।’ রুরু বলে। ‘পেটটা চোঁ চোঁ করছিলো।’
সাতদিন যায়। ডিমদুটোর ওপরের নীল রং ধুসর হতে থাকে। যেন আকারেও কিছুটা বড়ো হয়েছে। মা রুরু তার বুকের সব উষ্মতা দিয়ে দিতে চায় ডিমদুটোকে। চিরিংকে ডেকে রুরু বলে,‘দেখো দেখো এই ডিমটা নিশ্চয়ই মেয়ে হবে।’
‘তুমি কিভাবে বুঝলে?’ চিরিং জিজ্ঞেস করে রুরুকে।
‘এই ডিমটা একটু ছোট তাইনা? ছোট ডিম হলে মেয়ে হয়।’
‘আমিও চাই আমার একটা মেয়ে হোক।’ চিরিং হাসিমুখে বলে। 
রুরু দশটা দিন একটানা কাটিয়ে দেয় ডিমের ওপর বসে। একটানা দশ দিন ডিমের ওপর বসে থাকার পর সে একবারের জন্য উড়ে যায় কাছের আম গাছের ডালে। হাত পা আর ডানা মেলে শরীরের আড়মোড়া ভেঙ্গে নিতে চায়। এই সুযোগে বাবা মানে চিরিং বসে তা দেয় ডিমে। একটানা বসে থেকে একটু শুকিয়ে গেছে রুরু। ঠিকমতো খাওয়া হয়না তার। যতোটুকু চিরিং যোগান দেয় ততোটুকুই খায় সে। আরও একটা সপ্তাহ বসে থাকতে হবে ডিমের ওপর।
বারোদিনের মাথায় আকাশ কালো হয়ে এলো। এমন কালো যে কাছের জিনিষও দেখা যায়না। রুরু বললো,‘ঝড় আসবে। তুমি ভিতরে চলে এসো।’
‘অতোটুকু ঘরে তোমার বসার জায়গাই হয়না আবার আমি বসবো?’ চিরিং বললো। ‘আমি এই ডালেই থাকি।’
‘কিন্তু ঝড় আসছে তো!’ রুরু বাতাসের ভেতর চিৎকার করে বললো।
‘আমাকে নিয়ে ভেবোনা। আমি ভেতরে গেলে ডিমের ওপর চাপ লাগতে পারে। তা’তে বাচ্চাদের ক্ষতি হতে পারে। আমি এখানেই থাকি। সারাজীবনই তো বৃষ্টি আর ঝড়ে কষ্ট পেয়েছি। আমার বাচ্চাদের যেন কষ্ট না হয়।’
দেখতে দেখতে হুড়মুড় করে বৃষ্টি নামলো। সেই সাথে প্রচন্ড ঝড়। মাথার ওপর কচুপাতাটা থাকাতে বাসার ভেতর পানি ঢুকলোনা। তবে কচুপাতার জন্যে রুরুও দেখতে পেলোনা চিরিংকে। চিরিং ওপরের ডালে বসে ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করছে। ছোট্ট একটা পাখি আর কতোক্ষন যুদ্ধ করতে পারে? আর ঝড়টাও ছিলো প্রচন্ড। এমন ঝড় জীবনেও দেখেনি চিরিং। ঝড়ে ডালপালা ভেঙ্গে উড়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষন পর একটা বড়ো ডাল এসে ওর মাথার ওপর পড়লো। যখন ঝড়বৃষ্টি থামলো রুরু চিৎকার করে চিরিংকে ডাকলো। এরপর ডাকতেই থাকলো। চিরিং এর সাড়া নেই। বাধ্য হয়ে রুরু ডিম থেকে উঠে এলো বাইরে। দেখলো চিরিং গাছের নিচে পড়ে আছে। অনেক আগেই মারা গেছে পাখিটা।
রুরু কাঁদতে থাকলো। পাখিটা কতো কষ্টই না করেছিলো জীবনে। বাচ্চাদের জন্য নিজের জীবনটাও উৎস্বর্গ করে দিলো। দিন যায় আর রুরু উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে ডিমদুটোর ব্যপারে। ডিমদুটো ঠিক আছে তো? বাচ্চা বেরুবে তো? একদিকে মরে যাওয়া চিরিং এর কষ্ট আবার অন্যদিকে ডিমদুটোর ভাবনা। কে যেন বলেছিলো ডিমের ওপর যদি গলা থেকে বের করা রক্ত দেয়া যায় তবে ডিম থেকে সুস্থ দেহে বাচ্চা বের হয়। যেই চিন্তা সেই কাজ। দিন রাত উচ্চস্বরে চিৎকার করতে লাগলো রুরু। একদিন সত্যিই ওর গলা থেকে রক্ত বেরুলো। আর সেই রক্ত সে ঢেলে দিলো ডিমদুটোর ওপর। 
দুই দিন পর সত্যিই ডিম ফুটে দুটো ছানা বের হয়ে এলো। রুরু তখন খুবই দুর্বল। গলা দিয়ে আর কোন স্বরই বেরুলোনা। কিচির মিচির করার ক্ষমতা হারিয়েছে ও চিরদিনের জন্য। বোবা হয়ে গেছে পাখিটা। শরীর এতোটাই দুর্বল যে উড়ে গিয়ে খাবে এমন শক্তিও নেই। দু’দিন মরার মতো পড়ে রইলো রুরু। তিনদিনের মাথায় উড়ে যেতে পারলো কাছের একটা গাছে। দানাপানি খেয়ে একটু শক্তি সঞ্চয় করে নিলো। তারপর ছোট ছোট দানা মুখে তুলে নিলো। মরে গেলেও ওকে ওর বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দিতে হবে। ওর বাচ্চারা না জানি কতো কাঁদছে খাবার জন্যে। উড়ে যাবার শক্তি নেই তবুও বহু কষ্টে উড়ে এলো ডুমুর গাছের ডালে, তার বাসায়। বাচ্চাদুটোর মুখের ভেতর গুঁজে দিলো দানা।
এভাবে দিন যায়। রুরু দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। বাচ্চারা বড়ো হতে থাকে। দুটো বাচ্চাই বেশ শক্তিশালী। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। মোটাসোটা ঠোঁট, রাগী চেহারা। বোঝাই যায়, চিরিং এর কেটাল গাছের আঠা, রুরুর গচু পাতার কষ আর গলার রক্ত কাজে লেগেছে-ছেলেমেয়ে দুটো সুস্থ সুন্দর দেহের হয়েছে। রুরুর স্বপ্ন সার্থক হয়েছে। শুধু দুঃখ যে চিরিং ছেলেমেয়েদুটোকে দেখে যেতে পারলোনা। বাচ্চারা বড়ো হয়ে গেল খুব তাড়াতাড়ি। রুরু দুর্বল দেহে ওদের ওড়ার ট্রেনিংও দিতে পারলোনা। ওরা নিজেরা খেলতে খেলতে একদিন উড়তে শিখে গেল। রুরু বাসাটাকে আরেকটু বড়ো করেছে যা’তে দু’তিনজন আরাম করে বসতে পারে। ওর শরীর ভেঙ্গে যাওয়াতে ও নড়াচড়াও করতে পারেনা তেমন। ডালের কাছাকাছি কোন পোকা এলে ধরে খায় নাহলে উপোষ থাকে। বাচ্চাদুটো মাসদুয়েক বাদে বড়োসড়ো হয়ে যায়। উড়ে উড়ে যায়। খেয়ে দেয়ে পেট মোটা করে আসে। এদিকে মা না খেয়ে পড়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে বাচ্চাদের দিকে। যদি দুটো দানা এনে দেয় ওরা। ওরা কিছুই আনেনা মায়ের জন্যে। একদিন ছেলেটা বলে,‘দেখ মা, এই বাড়িতে আমরা আর থাকবোনা। এই বাড়িটা ছোট। আমরা দুজন মিলে বড়ো করে বাড়ি বানাবো। আর তুমি এখানেই থাকবে। তুমি তো বোবা। তোমাকে নিয়ে আরেক ঝামেলা বাধবে। তারচেয়ে এখানেই থাকো। আর আমরাও তোমার জন্য কোন খাবার দাবার আনতে পারবোনা। এতো সময়ও নেই আমাদের। বাসা বুনতে হবে, সংসার করতে হবে। কতো কাজ।’
রুরু তাকিয়ে থাকে বোবার দৃষ্টি মেলে। ছেলেমেয়েদুটোকে ও অত্যন্ত ভালোবাসে। ওরা যাতে সুখে থাকে সেটাই কামনা করে সে। রুরু জানে ও এতো দুর্বল যে যদি ওরা ওকে খাবার এনে না খাওয়ায় তবে ও না খেয়ে মারা যাবে। তারপরও নীরব দৃষ্টিতে সম্মতি জানায় সে। ছেলে পাখিটা মেয়ে পাখিটাকে বলে,‘এই ঝামেলাটাকে সাথে করে নিয়ে কি লাভ? বয়সও শেষ। এখানেই রেখে যাই। এমনিও মরবে ওমনিও মরবে।’
মেয়ে পাখিটা মায়ের দিকে তাকায়।‘ঠিকআছে মা, তুমি থাকে তাহলে। তুমি তো বোবা। ঠিকমতো কথা বলতে পারোনা। এখানেই থাকো। মাঝেমধ্যে এসে দেখে যাবো।’
রুগ্ন অসুস্থ মাকে পেছনে ফেলে উড়ে চলে গেলো পাখি দুটো।

...............অনেক ছোটবেলায় মা বাবাকে হারিয়েছি। মা দিবসে মা বাবা দু’জনকেই এই গল্পটা উৎসর্গ করছি।

কুকু ও সবুজ ব্যাঙ................তুহিন রহমান

কুকু ও সবুজ ব্যাঙ................তুহিন রহমান
সারাদিন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। কুকু আজ স্কুলে যেতে পারেনি। আর স্কুলে গিয়েই বা কি হবে? দু’দিন পর তো স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে দেড় মাসের জন্যে। তখন খালি খেলা আর আনন্দ। কিন্তু এ কি অবস্থা? গরমকালে কি এমন বৃষ্টি হয় নাকি? উঠোনে যে খেলতে যাবে তার উপায় নেই। উঠোনে ঘাস আছে। সবুজ ঘাস। শুকনো দিনে ঘাসের ওপর বসে থাকে কুকু। কিন্তু আজ আর তা হবেনা। যেতে হবে ছাতা মাথায় দিয়ে।
কুকু মায়ের অনুমতি নিয়ে একটা নীল রঙা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে উঠোনে। এমন মুষলধারে বৃষ্টি যে মনে হচ্ছে ছাতা ফুটো করে বুঝি গায়ে এসে লাগবে পানির ফোঁটাগুলো। ঠান্ডা বাতাসও বুঝি বিঁধে যাচ্ছে শরীরে। সবুজ ঘাসের ওপর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কি সুন্দর লাগছে! সবুজ ঘাসের লনের আশেপাশে বেশ কিছু ঝোঁপ ঝাড় আছে। সেসব ঝোঁপ ঝাড়গুলো বাতাসে নুয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন বৃষ্টির বেগ বাড়ছে।
কুকু এগিয়ে যায় ঝোঁপ ঝাড়গুলোর দিকে আর তখনই সেগুলোর ভেতর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসে একটা সবুজ রঙ্গা ব্যাঙ। কুকু চমকে ওঠে ব্যাঙটাকে দেখে। কিন্তু ব্যাঙটা ভয় পায়না। বরং সে লাফিয়ে লাফিয়ে আসতে থাকে কুকুর দিকে।
কুকু আরেকটু হলেই ভয়ে দৌড় দিতো। কিন্তু ব্যাঙটা হঠাৎ মানুষের ভাষায় কথা বলে উঠলো। বললো,‘কুকু তোমাকে আমি চিনি। তুমি রোজ ঐ জানালার ধারে বসে পড়ো। আর তোমার মা তোমার মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দেয়।’
কুকু দাঁড়িয়ে পড়লো। অবাক হয়ে বললো,‘ওমা তুমি কথা বলতে পারো?’
‘পারি পারি। আমি শুধু না, আমার বাচ্চারাও পারে। তুমি কি আমার বাচ্চাদের সাথে কথা বলতে চাও?’ সবুজ ব্যাঙ বললো।
‘তোমার বাচ্চা?’ কুকু অবাক হয়ে বললো,‘ওদের তো আমি দেখতেও পাবোনা। ওরা তো অনেক ছোট।’
‘তা তুমি ঠিকই বলেছো। ওরা এখন ঝোঁপের পেছনে বৃষ্টির ভেতর খেলছে। ওরাও কিন্তু তোমাকে চেনে। তোমাকে দেখলে খুব খুশী হতো ওরা।’ ব্যাঙ বললো।
কুকু অবাক হয়ে বললো.‘আজ থাক অন্যদিন দেখা হবে ওদের সাথে।’
সবুজ ব্যাঙ বললো,‘আমি অনেকদিন থেকে তোমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি। পরিচিত হতে চাচ্ছি।’
‘নিশ্চয় কোন কারন আছে, তাইনা?’
সবুজ ব্যাঙ কুকুর পায়ের নীল জুতো জোড়ার দিকে তাকালো। একটু হাসি ফুটলো ওর মুখে। বললো,‘কথাটা যে কিভাবে বলি।’
কুকু তাড়াতাড়ি বললো,‘আরে কোন সমস্যা নেই। তুমি নির্ভয়ে বলতে পারো।’
সবুজ ব্যাঙ তার লম্বা জিভ দিয়ে নিজের বাম দিকের চোখটা চেটে নিলো। একটু গম্ভীরভাবে বললো,‘আমাদের তো বাড়ি নেই। ব্যাঙরা বাড়ি বানাতে পারেনা ইঁদুরের মতো, গর্ত করতে পারেনা বেঁজির মতো। ব্যাঙদের অনেক সমস্যা। পানিতে থাকতে পারেনা আবার শুকনোতেও থাকতে পারেনা। এইযে দেখ এখন বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু তোমার মতো একটা ছাতাও আমাদের নেই। আমাদেরও কিন্তু ঠান্ডা লাগে। আমার বাচ্চাদের সেদিন নিউমোনিয়া হয়ে গিয়েছিলো। চুচু গাছের রস খাইয়ে শেষ পর্যন্ত রেহাই পেয়েছে।’
কুকু মাথা নেড়ে বললো,‘অনেক বড়ো সমস্যা দেখছি তাহলে!’
‘সত্যি অনেক বড়ো সমস্যা।’ সবুজ ব্যাঙ বললো,‘তোমার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে।’
‘হ্যাঁ বলে ফেলো।’ কুকু বললো। বৃষ্টিতে দাঁড়াতে তার বেশ সমস্যা হচ্ছে। ছাতাটা বাতাসে নুয়ে পড়ছে বারবার।
‘তোমার পায়ের নীল জুতোটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। তুমি কি আমাকে তোমার একটা জুতো দিতে পারো?’ ব্যাঙ বলেই মাথাটা নিচু করলো।
‘আমার জুতো?’ ঢোক গিলে বললো কুকু। ‘এটা তো তোমার পায়ে লাগবেনা। অনেক বড়ো হবে।’
‘না না, ওটা আমি পরবোনা।’
‘তবে?’
‘আমাদের তো বাড়ি নেই তাই ওটাকে বাড়ি বানিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবো। চমৎকার জুতো, আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’ সবুজ ব্যাঙ বললো।
কুকু একটু চিন্তায় পড়ে গেল। এই জুতোজোড়া তার বাবা গত পরশু দিন কিনে এসেছে। যদি জানে এটা একটা ব্যাঙকে  দিয়েছে কুকু তাহলে অনেক রাগ করবে। আবার এই চিন্তা করেও খারাপ লাগছে যে একটা ব্যাঙ তার পরিবার নিয়ে খোলা মাঠে রোদ বৃষ্টিতে দিন পার করছে।
ব্যাঙ বললো,‘এটা বাড়ি হিসাবে পেলে আমার বাচ্চারা খুব খুশি হবে। দেবে কুকু ওটা আমাদের? দুটো দিতে হবেনা। একটা দিলেই হবে।’
কুকু জানে একটা দেয়া আর দুটো দেয়া একই কথা। কেননা একটা দিলেও অন্য পায়েরটা কোন কাজে আসবেনা। তাই ও মাথা নাড়ে।‘ঠিক আছে এই নাও।’ বলে ও পায়ের জুতোটা খুলে বাড়িয়ে দেয় ব্যাঙের দিকে। ব্যাঙের চেহারাটা ভরে যায় আনন্দে। মনে হচ্ছে এতোটা খুশি ও কোনদিন হয়নি। বলে,‘ধন্যবাদ কুকু। একদিন আমি তোমার উপকার করবো।’
কুকু হাসে,বলে,‘আমার উপকার করার দরকার নেই। তুমি খুশি হয়েছো তাতেই আমি খুশি হয়েছি। এবার তুমি আরামে ঘুমোতে পারবে রাতে।’
‘ধন্যবাদ কুকু।’ বলে জুতোটা টানতে টানতে জঙ্গলের দিকে জেতে লাগলো সবুজ ব্যাঙ। কুকু বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। ওর খুব ভালো লাগছে দৃশ্যটা। একটা ব্যাঙ একটা জুতো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে পিঠে করে।

তাসমিদের টিয়া পাখি.....................মোহাম্মদ শাব্বির হোসাইন

তাসমিদের টিয়া পাখি.....................মোহাম্মদ শাব্বির হোসাইন
খুব ছোট্ট বেলা থেকেই তাসমিদের পাখির প্রতি অন্য রকমের এক দুর্বলতা রয়েছে। যখনই সময় পায় বারান্দার গ্রীলে দাঁড়িয়ে পাশের বড় নিম গাছে পাখির লাফালাফি দেখে। অনেক সময় কোনো চড়ুই পাখি ফুরুৎ করে গ্রীল দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লে সে খুশিতে টগবগ করতো।

শরু দ্যা গ্রেট গ্রীন গ্রাসহপার-----------------তুহিন রহমান (১ম খন্ড)

শরু দ্যা গ্রেট গ্রীন গ্রাসহপার-----------------তুহিন রহমান         (১ম খন্ড)
এই বইটা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০০ সালের বইমেলা উপলক্ষে। নামটার কারনে হয়তঃ বইটা তেমন চলেনি তবে এর যে সাহিত্যমান সেটা আপনি নিজে পড়লে বুঝতে পারবেন। পান্ডুলিপি পড়ে প্রখ্যাত প্রবীন লেখক বুলবুল চৌধুরী বলেছিলেন,‘আমি এই বাংলায় এমন শিশুসাহিত্য কল্পনাও করতে পারিনা। এটা শিশু ও বয়স্ক উভয়কেই টার্গেট করে লেখা হয়েছে। আলমগীর যদি এটা প্রকাশ না করে তবে আমি এটা প্রকাশ করবো।’ উল্লেখ্য আরো প্রকাশনীর আলমগীর ভাই তার কথা শুনে তাড়াতাড়ি করে বইটা প্রকাশ করেছিলেন। বইটার দুটি সংস্করন হয়েছে। একটি ২০০০ সালে, আরেকটি ২০০৮ সালে। এখানে বইটার ১ম খন্ড দেয়া হলো। টাইপ করার ঝামেলাই যাইনি। সরাসরি বইটাই স্ক্যান করে দিয়ে দিয়েছি।

কভার



























পৃষ্ঠা ১



























পৃষ্ঠা ২



























পৃষ্ঠা ৩



























পৃষ্ঠা ৪



























পৃষ্ঠা ৫



























পৃষ্ঠা ৬



























পৃষ্ঠা ৭



























পৃষ্ঠা ৮



























পৃষ্ঠা ৯



























পৃষ্ঠা ১০



























পৃষ্ঠা ১১



























পৃষ্ঠা ১২



























পৃষ্ঠা ১৩



























পৃষ্ঠা ১৪



























পৃষ্ঠা ১৫



























পৃষ্ঠা ১৬



























পৃষ্ঠা ১৭



























পৃষ্ঠা ১৮



























পৃষ্ঠা ১৯



























(চলবে........)
আগামী পর্বে আরও চমৎকার ঘটনার সমাহার রয়েছে। অপেক্ষা করুন। শীঘ্রই আসছে।

চড়ুই পাখির ভালবাসা.................................শাহানা ফেরদৌসী (অনুগল্প)

চড়ুই পাখির ভালবাসা.................................শাহানা ফেরদৌসী (অনুগল্প)
ড়ুই পাখিটা একা একা বসে আছে। সঙ্গীকে খুঁজছে। সকাল থেকেই তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। খাবারের সন্ধানে কোথাও গেছে, নাকি পথ হারিয়ে সেও তার মতো একা কোথাও বসে চিৎকার করে ডাকছে তাকে, জানেনা সে। সব সময়ই তারা একসাথে ছিল। এক মূহুর্তের জন্যও তারা আলাদা হয়নি। কিন্তু আজ কি হয়ে গেল!
বাসাটা খালি পড়ে আছে। মেয়ে চড়ুইটা হারিয়ে গেছে। তাই আজ তার খাওয়াও হয়নি। সে একা বসেই আছে। আর মনে মনে ভাবছে এই বুঝি মেয়ে চড়ুইটা ফিরে এলো। কিন্তু না, সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, বিকেল হলো, সন্ধ্যে নেমে এলো তাও মেয়ে চড়ুইটার কোন খোঁজ পাওয়া পাওয়া যাচ্ছেনা। 
এদিকে মেয়ে চড়ুইটা আটকা পড়ে আছে এক শিকারীর জালে। ধান ক্ষেতে আটকা পড়ে আছে। অনেক চেষ্টা করেও সে তার পা ছাড়াতে পারছেনা। সে চিন্তায় শেষ। ছেলে চড়ুইটা তার জন্য কতো চিন্তা করছে। তাকে না পেয়ে সে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে নিশ্চয়ই। মনে মনে সে ধরেই নিয়েছে সে আর মুক্তি পাবেনা। হঠাৎ ধান ক্ষেতের পাশ দিয়ে একজনকে আসতে দেখলো সে। ওমনি মেয়ে চড়ুইটা চিৎকার শুরু করলো। চড়ুইয়ের চিৎকার শুনে পথিক এগিয়ে গেল। তার মনে দয়া হলো। সে চড়ুইটাকে জাল থেকে ছাড়িয়ে দিল। ছাড়া পেয়ে মেয়ে চড়ুইটা মনে মনে অনেক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। আর পথিকও পাখিটাকে ছাড়িয়ে দিতে পেরে খুব খুশি হল। ছাড়া পেয়েই মেয়ে চড়ুইটা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার পথ ধরলো। 
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল তার।এদিকে মেয়ে চড়ুইকে ফিরে পেয়ে ছেলে চড়ুইটার সে কি আনন্দ! সে আনন্দে আত্মহারা। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল সে তাকে জিজ্ঞেস করলো। মেয়ে চড়ুইটা সব ঘটনা খুলে বললো। তারপর দু’জনে শপথ করল আর কারো ফসলের ক্ষেতে তারা আর যাবেনা। মেয়ে চড়ুইটা ছেলে চড়ুইকে জিজ্ঞেস করল কিছু খেয়েছে কিনা। ছেলে চড়ুইটা বলল সে কিছুই খায়নি। ‘তাহলে চলো ঘরে কিছু খাবার আছে দু’জনে মিলে ভাগাভাগি করে খাব। আজ রাতে আর কিছু খেতে হবেনা। কাল আবার খাবারের সন্ধানে বের হব।’ পরে দু’জন খেয়ে একসাথে ঘুমিয়ে পড়ল। এই হল চড়ুই পাখির ভালবাসা।

ইউশা ও পেঙ্গুইন.................................মোহাম্মদ শাব্বির হোসাইন (ঈদ সংখ্যা ২০২০)

ইউশা ও পেঙ্গুইন.................................মোহাম্মদ শাব্বির হোসাইন (ঈদ সংখ্যা ২০২০)
ক রাতে ঘুমাতে যাবার আগে ইউশা তার বাবার সাথে বসে বসে টিভিতে ডিসকোভারী চ্যানেলে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখছিলো। এটা সম্পূর্ণটাই ছিলো বিভিন্ন প্রাণীদের নিয়ে একটা প্রামাণ্য অনুষ্ঠান। সে অবাক বিস্ময়ে দেখছিলো যে, একেকটা প্রাণী কতো জটিল এবং প্রতিকুল পরিবেশে সংগ্রাম করছে বেঁচে থাকার জন্য।যখন সে বিছানায় ঘুমাতে গেলো, শুয়ে শুয়ে চিন্তা করছিলো যা দেখলো সে সম্পর্কে। কল্পনায় সে তাকে ঐ প্রাণীদের মাঝে দেখলো। তখন হঠাৎ করেই তার মনে হলো, সে এমন এক জায়গায় রয়েছে যেখানে তার চারপাশে তুষারে ভর্তি। সে উদ্দেশ্যহীনভাবে চারদিকে ঘুরতে লাগলো।একটু পরেই সে সুন্দর, কোমল ও মিষ্টি একটা সম্ভাষণ শুনতে পেলো। ‘স্বাগতম ইউশা। আমাদের ভূবনে তোমাকে স্বাগতম।’তুমি কে? ইউশা জিজ্ঞেস করলো।সে উত্তর দিলো, আমি পেঙ্গুইন।যে প্রাণীটি উত্তর দিলো তাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছিলো এবং মনে হচ্ছিলো যেনো সে আইনজীবিদের গাউনের মতো কালো সুন্দর ডিজাইন করা পোশাক পরিধান করে আছে। ইউশা মনে করার চেষ্টা করলো, আসলে কী ঘটেছিলো। তার পরিষ্কার মনে পড়লো আজ রাতে শোয়ার আগে যখন সে বাবার সাথে বসে টিভিতে ডকুমেন্টারী দেখছিলো সেখানে পেঙ্গুইনদের নিয়ে একটি অংশ ছিলো। হ্যাঁ, হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছো, ইউশা খুশির সাথে জবাব দিলো। আমি আজ রাতেই টিভিতে তোমাদের লাইফ নিয়ে একটা অনুষ্ঠান দেখলাম। এটা আসলেই খুব একটা ঠান্ডা জায়গা। তোমাদের কী শীত লাগে না?পেঙ্গুইনটি হেসে জবাব দিলো, এটা দক্ষিণ মেরু। এখানে তাপমাত্রা কমতে কমতে এতো নিচে নামে যে তা মাইনাস ১৩০ ডিগ্রী ফারেনহাইট (- ৮৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস) পর্যন্ত পৌঁছায়। এতো কনকনে ঠান্ডা আবহাওয়া অনেক প্রাণীকে মেরে ফেলে অর্থাৎ, অতিরিক্ত ঠান্ডার জন্য অনেক প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। কিন্তু দেখো, কী অবাক করা ব্যাপার! আমাদের কোনো সমস্যাই হয় না। খুব অবাক হচ্ছো, তাই না?আসলেই তাই। আমি ভাবছি এটা কীভাবে সম্ভব?শোনো, এটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে বিশেষ কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন সে জন্য। আমাদের চামড়ার নিচে চর্বির মোটা ও পুরু একটা স্তর আছে। এই চর্বিই আমাদেরকে অতিরিক্ত ঠান্ডার মধ্যেও সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখে, যেটা অন্য অনেক প্রাণীর নাই। যখন শীত আসে তখন আমরা উপকূল বরাবর আরো দক্ষিণে চলে যাই।ইউশার মনে পড়লো, তার মানে তোমরা তখন মাইগ্রেট করে অন্য জায়গায় চলে যাও? আচ্ছা, তোমাদের আর অন্য কী কী আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে যেটা আমি এখনও জানি না? এই যেমন ধরো, আজকে আমি যে ডকুমেন্টারী দেখলাম সেখানে বললো, তোমাদের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার আগে পর্যন্ত তোমরা ডিমের খুব বেশি । যত্ন নাও। তুমি কী এ ব্যাপারে আমাকে কিছু বলবে?পেঙ্গুইনটি হেসে বললো, অবশ্যই। অন্য কিছু প্রাণীর মতোই পুরুষ প্রজাতির পেঙ্গুইন বেশির ভাগ সময় ডিমে তা দেয়। জানো, তারা স্ত্রী পেঙ্গুইনের চেয়েও বেশি সময় ডিমে তা দেয়। তারা এ কাজটা করে দীর্ঘ ৬৫ দিন ধরে মাইনাস ২২ ডিগ্রী ফারেনহাইট (মাইনাস ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস) তাপমাত্রায়। শুধু তা-ই নয়, এ দীর্ঘ সময় তারা এক মুহুর্তের জন্যেও ডিম ছেড়ে যায় না। আর নতুন যে বাচ্চাটা জন্ম নেবে তার জন্য এ সময়ে মা পেঙ্গুইন যায় খাবারের খোঁজে।জন্ম নেয়ার পর প্রথম এক মাস বাচ্চা পেঙ্গুইন তারা বাবা-মায়ের পায়ের ওপর থাকে। যদি তারা তাদেরকে দুই মিনিটের জন্যেও রেখে অন্য কোথাও যায় তাহলে তারা বরফে জমে মারা যাবে।ইউশা ঘাড় নেড়ে বললো, কী সাংঘাতিক! তার মানে এ সময়টা তোমাদেরকে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হয়। কিন্তু এতোটা কীভাবে সম্ভব? যিনি সৃষ্টি করেছেন সেই আল্লাহই সকল প্রাণীকে সে জ্ঞান দিয়ে দিয়েছেন যে, তাকে কীভাবে কী করতে হবে। আমরা শুধু সেটুকুই করি যা আল্লাহ আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন। ইউশা বললো, তুমি ঠিক বলেছো। আমাদের মহান স্রষ্টা তাঁর প্রত্যেকটা সৃষ্টিকে ঠিক ততোটুকুই জ্ঞান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যেটুকু তার জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজন। সে কোথায় থাকবে আর কীভাবে তার খাবারের খোঁজ করবে সবই তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন। তোমাদের জীবনের দিকে তাকালেই এ বিষয়টা খুব ভালো করে বুঝা যায়।পেঙ্গুইনটা এবার ঘুরে দাঁড়ালো। তুমি অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যেও আরো অনেক অদ্ভুত এবং মজার মজার সব উদাহরণ দেখতে পাবে। তারা প্রত্যেকেই কিন্তু আল্লাহর দেয়া এসব জ্ঞানের জন্য তাঁর কাছে শুকরিয়া জানায়।আমি আজ আর দেরি করতে পারছি না। অনেকক্ষণ হয়ে গেলো। এবার আমাকে অবশ্যই যেতে হবে। আমার পরিবারের সদস্যরা সব আমার জন্য অপেক্ষা করছে। হঠাৎ ইউশা সুন্দর একটা মিউজিক শুনতে পেলো। পরক্ষণেই বুঝতে পারলো, এখন সকাল হয়েছে এবং তার টেবিল ঘড়িতে এ্যালার্ম বাজছে। তার মনে হলো, ঘুমের মাঝেই সে খুব সুন্দর একটা ভ্রমণ করে এসেছে।

বাঘা মামার হিমালয় অভিযান (পর্ব -১) .................তুহিন রহমান

বাঘা মামার হিমালয় অভিযান (পর্ব -১) .................তুহিন রহমান
‘উহ্, কি ভয়ংকর কান্ড। কারেন্ট পোকা নামের একধরণের পোকা সব ধান টান খেয়ে ফেলছে। উহ্ বাবা, বাদামী গাছ ফড়িংও আছে! ঢ্যাপ্ আবার কি জিনিস? একর প্রতি ফলন হয়েছে মাত্র তিনমন ধান ! হায়, আমরা খাব কি তাহলে! এতো দেখছি পোকদের বিরুদ্ধে মিলিটারি পাঠাতে হবে। প্রয়োজন হলে জাতিসংঘ বৈঠক বসাতে হবে, এরতো একটা সুরাহা করা দরকার,তাইনা?’
‘ জ্বি, মামা। আমার মনে হয় একটা পুরস্কার ঘোষনা দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, মামা।’
মামা এমন ভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন কড়মড় করে চিবিয়ে ফেলবেন আমাকে, কিংবা আমাকেই তিনি “কারেন্ট পোকা” ভেবে বসে আছেন। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘তোকে পড়াতে পড়াতে জুতোর তলা ক্ষয় করে ফেললাম তাও এখনো সরল শিখতে পারলিনা আবার কথা বলছিস! ”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম মামার দিকে।
মামা বললেন, ‘জুতোর তলা কিভাবে ক্ষয় করলাম বুঝতে পারিসনি? তোকে জুতো পেটা করে করে আমার জুতো ক্ষয় হয়ে গেছে, হারামজাদা। ঠিক করে মনোযোগ দিয়ে পড়; আবার বলে পাইলট হবে! পাইলট হওয়া এতো সোজা? তারচে’ গফুরের রিকসার গ্যারেজে আরেকটা নতুন রিকসা নামাচ্ছে গফুর, তাকে বলে দিলেই তোকে রিকসা চালাতে দেবে। রিকসা নিয়ে সোজা চলে যাবি সিলেটে। ওখানে রিকসাআলাকে পাইলট ডাকে , তোর পাইলট হবার শখ মিটে যাবে।’
মামার কথা শুনে আমার কান্না পেয়ে গেল কিন্তু কাঁদা টাঁদা হচ্ছে মেয়েলি অভ্যাস তাই কাঁদলাম না, বরং গোঁ গোঁ করে বললাম, ‘আমি কি করেছি,তুমিই তো ট্যাগ্ কোশ্চেন জুড়ে দিলে তোমার কথার সাথে। তুমি বললে এই সমস্যার সুরাহা করা দরকার,তাইনা? তাইনা শব্দটা না বললে আমিও কথা বলতাম না।’
মামা বললেন, ‘এটা আমার একটা অভ্যাস। তাই বলে তুই ভাবিসনা আমি তোর সাথে কথা বলছি। তুই পড়।’
আমি মনে মনে বললাম --- অভ্যাস নয় , বল এটা তোমার বদঅভ্যাস। বড়রা সব কিছু করলে অভ্যাস হয় আর ছোটরা করলে হয় বদঅভ্যাস, বাহ্ কি চমৎকার আইন কানুন। যাই হোক, একটা আইন যখন সংবিধানে ঢুকে যায় তখন সেটা ভালো হোক আর মন্দ হোক প্রচলিত হয়ে যায়- কারো করার কিছু থাকে না। যেমন মামা গতবারে সুন্দরবনে বাঘের বাচ্চা সংগ্রহ করতে গেলেন। শাহানার আব্বু আমাদের একটা বাঘের বাচ্চাও দিলেন, মামাকে বলে দিলেন যেন ওটাকে আবার ফিরিয়ে দিয়ে যাই বছর খানেক পরে। সবকিছু ঠিকঠাক মতোই চলছিল, বাঘের বাচ্চার জন্য খাঁচাও বানান হলো। তিনদিন দু’টাকা করে প্রায় চারশো টিকিট বিক্রি হয়ে গেল। উঠে এলো আমাদের খরচের টাকা। কি›তু চতুর্থ দিনের মাথায় বাঁধলো গন্ডগোল। আব্বু মামাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, ‘এসব পেয়েছিস কি, বাড়ির মধ্যে চিড়িয়াখানা বানানো হয়েছে, না ?’
‘জ্বিনা, বড় দুলাভাই। এটা চিড়িয়াখানা নয়, একটা দর্শনীয় প্রাণী আনা হয়েছে, ওটাকে মানূষ দেখতে আসছে, ব্যাস।’
‘ব্যাস,না ? পরিবর্তে দর্শনী নিচ্ছিসনা ?’
‘দর্শনী?’
‘মানে টিকিট, গাড়ল।’
‘হ্যাঁ, নিচ্ছি। তাতে কি।’ মামা বললেন। ‘এটাকে পাওয়ার জন্যে কষ্ট করতে হয়নি আমাদের? টাকা খরচ হয়নি ? সেই টাকা ওঠাতে হবেনা? সব ভালো কাজের একটা দাম থাকে।’
‘এই তোর ভালো কাজ? বাঘের বাচ্চা ধরে এনে টাকা কামাচ্ছিস। এরচেয়ে মধুমিতা হলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকে টিকিট বিক্রি কর, আরো বেশী টাকা কামাতে পারবি।’
মামা কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলেন আব্বার মুখের দিকে, তারপর গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে এলেন। এসেই আমাদের সবাইকে ডেকে ঘোষনা দিলেন, এ বাড়িতে এই মানবকল্যাণমুখী কাজ কারবার হবেনা। এ বাড়িতে যতোসব হুতোম প্যাঁচাদের রাজত্ব। তাই যতোদিন পর্যন্ত আলাদা একটা বাড়ি নেয়া হচ্ছে না ততদিন পর্যন্ত নীরব সংঘের তহবিল সংগ্রহের কাজ বন্ধ থাকবে। আর বাঘের বাচ্চাটাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসা হবে সুন্দরবনে। ব্যস “নীরব সংঘ বালিকা বিদ্যালয়” মাচায় উঠে গেল।


সন্ধ্যার দিকে মামা আমাকে ডেকে বললেন,‘তোর ল,সা,গু গুলো শেষ হয়েছে?’
‘জ্বি, মামা।’ আমি মামার রুমের দরজার ওপর দাঁড়িয়ে পড়লাম, ‘ওগুলো নিয়ে আসবো?’
‘দরকার নেই।’ মামা মোটা একটা বই পড়ছিলেন। সেটা নামিয়ে রাখলেন। ‘নিতু আর জ্যোতি কোথায়?’
‘মনে হয় দাবা খেলছে।’
‘মাশারকে পাওয়া যাবে?’
‘যাবে মনে হয়, একটু আগে বাপের হাতে ধোলাই খেয়েছে। এখন ছাদে থাকতে পারে।’
‘যা, সবাইকে ডেকে আন।’ মামা বললেন। ‘নীরব সংঘের জরুরী মিটিং।’
আমি ছুটলাম মামার নির্দেশ মতো। নিতুকে পাওয়া গেল পড়ার টেবিলে। আমাদের বাড়ির সবার  ভেতর নিতুই একমাত্র ব্যাক্তি যার পড়ার আগ্রহ অসীম। গল্পের বই পেলেই হয়েছে , ওটা শেষ করতে না পারা পযর্ন্ত শান্তি নেই। এজন্য ওর জ্ঞানও বেশি সবার চাইতে। ওর পড়ার টেবিলে যতনা পাঠ্য বই তার চেয়ে বেশি গল্পের বই। আব্বু এতে বাধা দেননা। তিনি বলেন গল্পের বই মানুষকে শান্ত হতে শেখায়, ভদ্র করে, জ্ঞান বাড়ায়। পড়ার বই পড়লে যে জ্ঞান বাড়ে তা কিন্তু নয়। ক্লাসের একটা বই আমরা সারা বছর ধরে পড়ি। যা শিখি তার চেয়ে বেশি মুখস্ত করি। কিন্তু গল্পের বই ছাড়াও নানা ধরণের বই পড়তে পারি আমরা। ভ্রমণ কাহিনী, সায়েন্স ফিকশন, জীবনী,রূপকথা, উপকথা, এগুলো একবছরে একশোর বেশি পড়া যায়। ফলে দেখা যায় একবছরের একজন ছাত্র পাঠ্যবই থেকে যা শিখেছে তার দশগুণ বেশি শিখেছে গল্পের বই থেকে। নিতুকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়-- বলতো “স্ট্যাচু অব লিবাটি” কোন নদীর তীরে অবস্থিত? ও চট্ করে বলে দেবে“হ্যাডসন।”কিন্তু মাশার কিংবা শিশিরকে যদি বলা হয় বলতো বাংলাদেশে কোথায় চা- বাগান আছে? ওরা দু’জন বলবে,এতোদিন জানতাম ফুলের বাগান,ফলের বাগান,এখন দেখছি চায়ের বাগানও হয়,এই যাহ্, তমাল,তুই আমাদের সাথে ফাজলামী করছিস; চা কি গাছে হয় নাকি? আমি দৌড়ে দোতলায় গেলাম নিতুকে মামার কাছে যেতে বলে। গিয়ে দেখি শিশির আর জ্যোতি চুল ছেঁড়াছেঁড়ি খেলছে। কে কার কতো চুল ছিঁড়তে পারে তার প্রতিযোগিতা। শিশিরের মাথায় চুল কম, জ্যোতি হাত দিলেই তেলে হাত পিছলে যাচ্ছে। কিন্তু জ্যোতির শ্যাম্পু করা লম্বা চুলগুলো শিশির মজা করে চড়চড় করে ছিঁড়ছে ঠিক যেন ঘাস ছিঁড়ছে মাটি থেকে। জ্যোতির মাথা থেকে একগাদা চুল ছিঁঁড়েছে শিশির সেগুলো ও আমাকে উঁচু করে দেখালো,‘তমাল, শিগগির এদিকে আয়। দেখ কত চুল ছিঁড়েছি। তুই ছিঁড়বি, আয় এই শয়তানটাকে চেপে ধরে আছি।’
শিশির বিছানায় জ্যোতিকে ফেলে ধরে রেখেছে পা দিয়ে আর দু’হাতে ছিঁড়ছে জ্যোতির চুল। আমি বললাম, ‘মামা তোমাদের ডাকছে।’
‘কেন?’ চুল ছেঁড়া থামিয়ে  ভ্রু পাকালো শিশির । ওর গাল বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। ‘মামার বার্লি খাবার ইচ্ছে হয়েছে বুঝি?’
‘কি?’
‘কিছুনা, চল যাচ্ছি।’ শিশির লাফিয়ে জ্যোতির বুকের ওপর থেকে নেমে গেল। মুঠো করে জ্যোতির ছেঁড়া লম্বা লম্বা চুল গুলো তুলে নিল। একগাদা চুল। সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে আবার থমকে দাঁড়ালো ও , ‘দাঁড়া, আসল নষ্টামীটাই করা হলোনা। একটু দাঁড়া।’
সিঁড়ির নামার মুখেই শিশিরদের রান্না ঘর। আজ খালা রান্না ঘরে নেই। খালুকে নিয়ে গেছেন কোথায় যেন। রান্না ঘরে চুলোয় হাঁড়ি চড়িয়েছে গোবর বুড়ি। শিশিরদের রান্না বান্না করার জন্য এই বুড়িটাকে অল্প কিছুদিন হলো রাখা হয়েছে। এর আগে কাজ করতো ইন্দ্রানীর মা নামে এক হিন্দু মহিলা। সে থাকা কালে শিশির অর জ্যোতির জন্য রান্না ঘরটা ছিল সাক্ষাৎ স্বর্গ। খালা গোসল খানায় ঢুকলে কিংবা কোথাও গেলে দু’জন হামলে পড়তো রান্না ঘরে। রান্না ঘরে থাকতো গুঁড়ো দুধের টিন, কনডেন্সড্ মিল্ক, আচারের বৈয়ম, জলপাই-এর মিষ্টি সস্, পনিরের ডিব্বা,আরও কতো কি। ইন্দ্রানীর মা কিছুই বলতোনা কেবল মুচকি মুচকি হাসতো। দেখতে দেখতে সাবাড় হয়ে যেত দুধের টিন, আচারের বৈয়ম। কি›তু এই গোবর বুড়ি আসার পর থেকে শিশির আর জ্যোতির সুখের দিন গেছে। গোবর বুড়ি এক চোখে দেখে আর নিজ দায়িত্বে সামলে রাখে পুরো রান্না ঘরটা।
শিশির রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়াতেই গোবর বুড়ি খ্যানখ্যানে গলায় জিজ্ঞেস করলো,‘কি চাই এখানে?’
শিশির বললো,‘ গোবর বুড়ি, আমাকে একটু লবন দাওতো।’
‘ও দিয়ে আবার কি বদমায়েশি করবে?’ একই রকম গলায় বললো গোবর বুড়ি।‘ আমি বাপু পারবোনা তোমাকে লবন দিতে।’
‘আহা, একচিমটি। পেয়ারা খাবো।’
বুড়ি এক চোখে কুটকুট করে তাকালো শিশিরের দিকে তারপর উঠে গিয়ে মিটসেফ খুললো। এই সুজোগে চট্ করে রান্না ঘরে ঢুকে পড়লো শিশির। চুলোয় বসানো তরকারির হাঁড়ির ভেতর জ্যোতির চুলগুলো ছেড়ে দিল, লাফিয়ে ফিরে এলো আবার দরজার কাছে। বুড়ি এক চিমটি লবন এনে শিশিরের হাতে দিতে ও হেঁটে চলে এলো সিঁড়িতে। ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিল লবন টুকু। তারপর হি হি হাসিতে ফেটে পড়লো,‘আজ গোবর বুড়ি বাপের হাতে ধোলাই খাবে,উহ্,! কি যে আনন্দ হবে আমার! একেবারে ঈদের আনন্দ!’

মামা বললেন,‘গোল হয়ে বোস, একেবারে পৃথিবীর মতো গোল।’
আমি বললাম,‘তোরা সব কমলালেবুর মতো গোল হয়ে বোস, কারণ পৃথিবী কমলা লেবুর মতো।’
নিতু বললো,‘পৃথিবী কমলা লেবুর মতো নয়। ওটা হবে ঊখখওচঞওঈ. ’
মামা বললেন,‘চড়িয়ে দাঁত ফেলে দেবো একেবারে! এটা কোন বিজ্ঞান ক্লাস নয়। এখানে তোমাদের পন্ডিত গিরি দেখাতে ডাকা হয়নি। ’
ঝম্ করে নীরবতা নামলো ঘরের ভিতরে। সবার ঘাড় একে বারে নুইয়ে পড়েছে বুকের উপর। যেন আমাদের চেয়ে ভালো মানুষ আর একটিও নেই পৃথিবীতে। মামা মোটা বইটা বুকের উপরে থেকে নামালেন। সোজা হয়ে বসলেন বিছানার ওপর,  অদ্ভুত ব্যপার তার কানটা নড়ছে। অনেক দিন পর মামার এই কান নড়া দেখতে পেলাম। মামা যখন কোন বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে ভাবেন তখন তিনি কানটা মাঝে মধ্যে নাড়ান। অনেক দিন হলো এমনটা ঘটতে দেখিনি। আজ এটা দেখে বুঝতে পারলাম নতুন কিছু ঘটতে যাচ্ছে আবার। আরেকটা এ্যাডভেন্চার?
মামা নড়ে চড়ে বসলেন। বালিশের তলা থেকে আজকের খবরের কাগজ বের করে “গ্রাম বাংলা” পাতাটা খুললেন। এই পাতাতে গ্রামের সব খবরাখবর ছাপা হয়। মামা বললেন, ‘আমি পড়ছি Ñ তোরা শুনে যাবি খালি। ’ একটু থেমে কাশি  দিয়ে গলা পরিস্কার করে নিলেন; তারপর পড়তে লাগলেন,‘ ”উত্তরবঙ্গের ধান ক্ষেত গুলোতে পোকার দারুণ উপদ্রব। এই বছর উত্তরবঙ্গের জেলা গুলিতে ব্যাপক হারে ধানের ফলন দেখা দিলেও পোকার দারুন উপদ্রবের কারণে চাষীরা মহা বিপাকে পড়িয়াছে। বছরের এই সময়ে যখন চাষীরা ধান পাকার আশায় ক্ষেতগুলির দিকে তাকাইয়া অপেক্ষার প্রহর গুনিতেছে ঠিক তখনই কারেন্ট পোকার ব্যাপক উপদ্রবের কারণে সেই আশাও তাদের নস্যাৎ হইয়া যাইতেছে। কারেন্ট পোকা ছাড়াও মাজরা পোকা, বাদামী গাছফড়িং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করিতেছে। ইতিপূর্বে গত দু’বছর ঢ্যাপের আক্রমনে চাষীরা বিপাকে পড়িয়াছিল কিন্ত এবছর কারেন্ট পোকার আক্রমন অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করিয়াছে। বাজারে কিটনাশক গুলির মান অতি নিু। চাষীরা অভিযোগ করিয়াছে যে, এসব কীটনাশক ব্যবহারে পোকা গুলির কিছু হয়না কেবল পোকারা খানিক সময় মাথা ঘুরিয়া পড়িয়া থাকে এবং পরবতীতে তাহারা আবার উঠিয়া খাদ্যান্বেষনে প্রবৃত্ত হয়। এমতাবস্থায় এগুলিকে কীটনাশক না বলিয়া কীটঘুমপাড়ানীয়া বলা উচিৎ এবং ..।’ মামা থেমে খবরের কাগজটা সরিয়ে রাখলেন। একএক করে সবার মুখের উপর দিয়ে ঘুরে এলো তার দৃষ্টি, ‘হ্যাঁ তার মানে হলো এটাই যে, বাজারে ভালো কোন কীটনাশক পাওয়া যাচ্ছে না। যা পাওয়া যাচ্ছে সেটাও হয়তঃ নকল কারণ এখানে সব কিছুতেই নকল। চাষীরা যা চাচ্ছে তা হলো খাঁটি কিছু। যা দিলে সব পোকা বাপ বাপ বলে পালিয়ে যাবে’ আবার থামলেন তিনি। পাশ থেকে লাল কাভারের মোটা বইটা তুলে নিলেন হাতে , ‘এই বইটা ফ্লাওয়ার ক্যাটালগ। এখানে পৃথিবীর নানা ধরণের ফুলের নাম,ধরণ এবং তাদের আদিবসতির নাম আছে।’ মামা পৃষ্ঠা উল্টে দুটো ফুলের ছবি বের করলেন। একটা ফুল হলুদ অন্যটা সাদা। মামা বললেন,‘এই ফুলটা তোমরা দেখছো এটার গোত্রের নাম প্যাপাভেরাসি এবং এটার নাম মার্ক এরিনতোলিয়া সংক্ষেপে ইনসেকটিটার। এই ইনসেকটিটারের একমাত্র কাজ হলো এটা তার চমৎকার হলুদ বর্ন দিয়ে পোকাদের আকর্ষন করে এবং পোকা ফুলের উপর বসলেই গপ্ করে খেয়ে ফেলে। এজন্যেই এর নাম ইনসেকটিটার। আর এই সাদা যে ফুলটা দেখছো এটার নাম হচ্ছে স্পারক্স স্টিংকার। এই ফুল যখন ফোটে তখন এমন ভয়ংকর গন্ধ বের হয় য়ে, চারপাশের যত পোকামাকড় সব উড়ে পালিয়ে যায়। স্পারক্স স্টিংকার এবং ইনসেকটিটার হচ্ছে একেবারেই দূর্লভ প্রজাতি এবং এই বইতে যে ছবিটা তোমরা দেখেছো সেটা আসল ছবি নয়।’    
 আমরা সবাই একসাথে বললাম, ‘তবে?’
‘এই ছবিটা হচ্ছে একটা স্পেশাল ইফেক্ট বা কম্পিউটারে তৈরী করা একটা ছবি। লেখক একবারই এই দুটো ফুল দেখেছেলেন এবং এরপরে কোন বই ঘেঁটে এই দুটোর কোন ছবি বা বর্ননা কিছুই পাননি। ফলে তিনিই এই ফুল দুটোর নাম  দিয়েছিলেন ইনসেকটিটার এবং স্পারক্স স্টিংকার। তিনি কল্পনা থেকে কম্পিউটারের মাধ্যমে ছবি দুটো বানিয়েছেন ঠিক যেরকম দেখেছিলেন প্রায় দশবছর আগে। ’
‘বুঝেছি!’ মাশার লাািফয়ে উঠলো। ‘আমরা বন থেকে ওসব ফূল তুলে আনবো, তাইতো?’
মামা বাঘের মতো মাশারের দিকে চেয়ে থেকে বললেন, ‘ তারপর ফুলটা তোমার শার্টের ভেতর ঢুকিয়ে দাও যাতে তোমার বাপ বাপ বাপ বলে পোকার মতো ছুটে পালিয়ে যায়। এ ফুলতো আর কদমফুল নয় যে বন বাদাড় থেকে ছেঁড়ে নিয়ে এলে।’
‘তবে ?’ আমি বললাম।
‘ লেখক দশ বছর আগে হিমালয়ে এই ফুল দুটো দেখে এসেছিলেন। তাও দুটো ফুল এক জায়গায় ছিলনা। লেখক তার বইয়ের একস্থানে লিখেছিলেন এই স্পারক্স কেবল পোকদের তাড়ায় না এটার আশে পাশে সাপও ঘেঁষতে পারেনা , সাপেরা এক মাইল দুর থেকে এর গন্ধ পায়। নিতু, তুমি বলো আমাদের প্রসপেক্ট কতো খানি।’
“প্রসপেক্ট ”শব্দটা বুঝতে বেশ কিছুটা সময় নিল নিতু, এর মধ্যেই সুজোগ পেয়ে নাক গলিয়ে দিও মাশার, ও বললো,‘ আরে গাধা, ফসপেট ,ফসপেট Ñ ফসপেট চিনিস না? ইউরিয়া, ফসপেট এগুলো হচ্ছে গাছের সার। মামা জানতে চাচ্ছেন কতখানি ফসপেট দিলে গাছ ভালভাবে বেড়ে উঠবে।’
‘মাশার।’ মামা ডাকলেন।
‘জ্বি, মামা?’
‘ টেবিলটা দেখতে পাচ্ছো সামনে?’
‘জ্বি মাম্’া
‘ ওটার  নিচে গিয়ে আধবসা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, যাও। তোমার শরীরটা হতে হবে দ- এর মতো, বসাও নয় দাঁড়ানোও নয়। এটাই হচ্ছে তোমার শাস্তি। ’
মাশার অবিশ্বাসে মামার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। মামা যে তাকে কোন কারণে শাস্তি দিতে পারেন এটা তার কল্পনার বাইরে ছিল।
মামা বললেন , আজ থেকে নীরব সংঘের বিধানে শাস্তির বিধান রাখা হলো। কেউ অপরাধ যোগ্য কোন অপরাধ করা মাত্রই তাকে টেবিলের তলায় চলে যেতে হবে।’
‘দ্বিতীয়বার বলার আগেই মাশার বিছানা থেকে নেমে গেল। সবার সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়ে টেবিলের তলায় ঢুকলো। মামা এবার মনোযোগ দিলেন আমাদের দিকে। নিতুকে আবার জিজ্ঞেস করলেন,  ‘হ্যাঁ, বলো। এসবের ভেতর আমাদের প্রসপেক্ট মানে আমাদের আশা কতোটুৃকু।’
‘আমরা ঐ দুটো ফুলের গাছ সংগ্রহ করবো। যেহেতু বাজারে ভালো কোন কীটনাশক নেই তাই আমরা ইনসেকটিটার আর স্পারক্স স্টিংকার এদেশে আমদানী করতে পারি। এভাবে আমরা আমাদের নীরব সংঘ বালিকা বিদ্যালয়ের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে পারি।’  নিতু মুচকি হাসলো।
মামা দুহাতে নিতুকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘এইতো, এমনই তো চাই। এই হচ্ছে নীরব সংঘের একজন কৃতী সদস্যা। নিতুকে আমি এই সংঘের ভাইস প্রেসিডেন্ট বানিয়ে দিলাম, হাততালি।’
সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো । আবাহনী আর মোহামেডানের খেলাতেও বুঝি এতো হাততালি পড়েনা, আমার কান ঝাঁ - ঝাঁ করতে লাগলো হাততালির শব্দে। মাশার পর্যন্ত হাততালি দিচ্ছে টেবিলের তলা থেকে কিন্তু হাততালির পাশাপাশি মুখ ভ্যাংচাচ্ছে।
   ‘ এখন দেখতে হবে ঐ সব ফুলের গাছ কোথায় পাওয়া যায়। লেখকের লেখায় আমরা দেখেছি ইনসেকটিটার আর স্পারক্স স্টিংকার একমাত্র পাওয়া যায় হিমালয়ে। তিনি সাতাশি সালের দিকে হিমালয়ের ঐ পাহাড়ে উঠেন। তখন সেখানে অক্টোবর চলছিল। লেখক দেখেন যে এই অসম্ভব ঠান্ডার মধ্যেও হিমালয়ের ঐ অংশে তখনও বরফ জমা শুরু হয়নি। তিনি ধারণা করেন হিমালয়ের ঐ অংশে সহজে তুষার পড়েনা , ফলে মাটিতে জন্ম নেয় নানা ধরণের উদ্ভিদ। এর ভেতর ঐ দুটো প্রজাতির ফুল গাছ ছাড়াও নানা ধরণের ফুল গাছ আছে যাদের মধ্যে ক্ষমতাবান কোন গাছ গাছড়াও থাকতে পারে।’ মামা বললেন। ‘ নানা ধরণের গাছ পালা লেখক দেখেছেন যাদের কাঁটার ভেতর “ ফ্লু” Ñ এর নিয়ামক রয়েছে। একটা গাছের পাতা থেকে এমন এক ধরণের রস পাওয়া গেছে যা খেতে পারলে কোনদিন শরীরে খোঁস পাচড়া হবেনা। তবে আমরা ঐ সব গাছ গাছড়ার ব্যপারে ততোটা অগ্রহী নই যতটা ইনসেকটিটার এবং স্পারকস্ স্টিংকার Ñ এর ব্যপারে আগ্রহী। কারণ হচ্ছে লাভ। যে গাছ বা ফুল আমাদের দেশের বিরাট এক সমস্যার সমাধান করবে আমরা সেটাই আনবো এদেশে। তোমরা কি বলো ?
আমরা তখনও বুঝতে পারিনি মামার মতলবটা কি তাই চুপ করে থাকলাম। ভুল জবাব দিয়ে মাশারের পাশে যেতে চাইনা। মামা বললেন, ’আমরা গাছ দুটো সংগ্রহ করবো। ঐ গাছ দুটোর চাষ করবো আমাদের বাগানে। এটাই হবে ইনসেকটিটার আর স্পারকস্ স্টিংকার Ñ এর একমাত্র চাষাগার ও পাইকারী বিক্রির একমাত্র স্টল। আমরাই ওগুলোর চাষ করবো এবং আমরাই ওগুলো বিক্রি করবো।’
‘ কিন্তু মামা .. .. ..।’ আমি বললাম। থেমে গেলাম মাঝপথে। মামা শব্দটা বলার সাথে সাথে মামার রক্ত চক্ষু আমার দিকে ঘুরে গেছে। এখন যদি আমি চুপ করে থাকি তাহলে নির্ঘাত ডিসটার্ব করার দায়ে আমাকেও টেবিলের নিচে গিয়ে দ ডাউন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। তাড়াতাড়ি বললাম, ‘ কিন্তু মামা, হিমালয় থেকে আমরা কিভাবে আনবো ওগুলো ? তাছাড়া ওগুলোকে চেনার ব্যবস্থা না হয় করা গেল কিন্তু ঠিক কোন খানটায় ওগুলো জন্মায় তা বইতে বলা হয়নি।’
‘ কোন সমস্যা নেই । ওই জায়গা খুঁজে বের করা যাবে।’ মামা বললেন।‘  যদি বরফের তলায় চাপা থাকে তাহলেও ওটাকে বের করা হবে। যদি চারাগাছটা মরে গিয়ে থাকে তবে ওটার বীজ থাকবে। আর বীজ যদি মাটিতে পড়ে থাকে তবে ওটার আরও চারা জন্ম নেবে। ইনসেকটিটার না থাকলেও স্পারকস্ স্টিংকার থাকবে। স্পারকস্ স্টিংকার না থাকলে ইনসেকটিটার থাকবে। একটাকে আমরা পাবোই।’
‘ কিন্তু হিমালয় থেকে আমাদের গাছ গুলো পাঠাবে কে ?’ এতোক্ষন চুপ করে থাকার পর জ্যোতি মুখ খুললো।
‘ কে আর পাঠাবে ? আমরা যাবো। ’মামা গম্ভীর ভাবে বললেন , ‘ আমি ঠিক করে রেখেছি সব কিছু। টিকিট কনফার্ম করা হলেই কাজ ফিনিশ। এখন শুধু পান্নালালকে ডেকে বলতে হবে টিকিট কনফার্ম করতে। হ্যাঁ, আগামী পরশু যাচ্ছি আমরা। নেপালে।’
..........................................চলবে