Showing posts with label চিন্তাগল্প. Show all posts
Showing posts with label চিন্তাগল্প. Show all posts

চিরবসন্ত........মুশফিকুর রহমান আবীর

চিরবসন্ত........মুশফিকুর রহমান আবীর

মানুষের সম্পর্কগুলো অনেকটা ফুটন্ত গোলাপের মতো। গোলাপ দূর থেকে তার স্বজীবতার চিরন্তন নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু মানুষ সেই সৌন্দর্যের আলিঙ্গন লাভ করার জন্যে গাছ থেকে সংগ্রহ করে প্রসাদময়  অট্টালিকার সবচেয়ে সুন্দর ফুলদানিতে গোলাপটিকে স্থান দেয়। তাতে গোলাপটির সৌন্দর্য যেন আরো বৃদ্ধি পায়। গোলাপটির সৌন্দর্য দেখে তার উপর ভ্রমর এসে বিচরণ করে।

এতো কিছু দেখে মানুষ তখন ভাবতে শুরু করে গোলাপটিকে গাছ থেকে তার আরো আগে এই ফুলদানিতে রাখা উচিত ছিলো।  আহ!  কি না ভুল করে ফেলেছে সে!

পর দিন তারা দেখতে পায় ফুলটি একটু মলিন হয়ে পড়েছে হঠাৎ করে। কালকের মতো আজ আর ভ্রমররা গোলাপটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেনি। পরের দিন দেখলো ফুলদানির সব সুন্দর জিনিস গুলোকে গোলাপটি কেমন যেনো বিবর্ণ করে রেখেছে। পরের দিন গোলাপটির পাতা গুলো শুকিয়ে মাটিতে পরে গিয়ে ফুলদানিটা সহো আসে পাশের জায়গাটা ময়লা করে দিতেছে। তখন মানুষ ভাবে এই সুন্দর ফুলদানিটার ভিতোর এই গোলাপটা রাখলে ফুলদানিটা অসুন্দর হয়ে যাচ্ছে। তাই তাকে ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। গোলাপটা যেনো সময় যাওয়ার সাথে সাথে তার সব সৌন্দর্য হারিয়ে আজ তার আশেপাশের সব সৌন্দর্যের জন্যে বিশাদময় হয়ে উঠেছে।


মানুষে মানুষে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তার সম্পর্ক গুলোও যেনো একই সূত্রে গাঁথা।  সম্পর্ক গুলোতে আপনজনদের সন্নিকটে পাওয়াটা অনেক বেশি মধুর মনে হয়।একটা সময় যখন সে তাদের সান্নিধ্য লাভ করে এবং ভাবতে থাকে, কতো না ভালো হতো, যদি এই কাছের মানুষগুলোকে আগে কাছে পাওয়া যেতো। তখন নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে খুশি মানুষ মনে হয় আপন ভালোবাসার মানুষগুলোকে কাছে পাওয়ার জন্যে। মনে হয় এই সুখ যেনো চিরস্থায়ী, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও এ ভ্রাতৃত্ব ভালোবাসার বন্ধন যেনো শেষ হওয়ার নয়।


কিন্তু মানুষের স্বভাব এমনই যে, তুমি যদি তোমার ভালোবাসা, ভাতৃত্বের বন্ধনের  দুয়ার ভালোবাসার মানুষগুলোর জন্যে যতটুকু উন্মোচিত করবে, তারা তোমাকে দিন যাওয়ার সাথে সাথে ঠিক ততোটুকুই বা হয়তো তার চেয়ে বেশি তোমাকে হেয়ো করবে। ভালোবাসার প্রতিদানে তারা কষ্ট, হিংসা,গৃণা, অবহেলা, তাচ্ছিল্যতা ছাড়া আর কিছুই দিবে না। 


সময় যাওয়ার সাথে সাথে এই পরিচিত মানুষগুলোই যেনো খুব অপরিচিত হয়ে পড়ে। কাছের সবাইকে পেয়েও যেন নিঃসঙ্গ দ্বীপের কোনো এক বাসিন্দা হয়ে পড়তে হয়।  আজ তারাই যেন তোমাকে সব থেকে একা করে দিয়েছে। কাছে আসার জন্যে আজ তারা সবচেয়ে দুরে চলে গিয়েছে। শেষ পান্তে এসে মানুষ গুলোর সাথে  সম্পর্কটায় তিক্ততা ছাড়া আর কিছুই বাকি থাকে না। মনে হয় তখন,

সম্পর্কটা তো দুর থেকে চিরস্থায়ী মধুর ছিলো। তখন তো সম্পর্কের ভিতর কোনো তিক্ততা ছিলো না। সবাই থেকেও আজ যেনো তুমি একা কোনো এক জনসমুদ্রের মাঝখানে। 


মানুষকে বিশ্বাস আর ভালোবাসলেই মানুষ সে বিশ্বাস আর ভালোবাসার অমর্যাদা, অবহেলা করবেই। এটাই মানুষের আসল পরিচয়।

বন্ধুত্ব.............আরিফা সানজিদা

বন্ধুত্ব.............আরিফা সানজিদা
পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নাই যে জীবনে বন্ধু শব্দটির সাথে পরিচিত হয়নি। জগতের সব থেকে সুন্দর,মধুরতম, গভীর এবং আত্মীক সম্পর্ক বলে যদি থাকে সেটা বন্ধুত্ব। বন্ধু শব্দটায় ই কেমন প্রাণ জুড়িয়ে আসে, ভেঙ্গেচূড়ে খুচরো পয়সার মত নিজেকে জমা রাখা যায় তো বন্ধুর কাছেই। তীরবিদ্ধ হওয়ার দিনে যে ঢাল হয়ে যায় সামনে সে একজন সত্যিকার বন্ধু, রক্তাক্ত হওয়ার দিনে যে মলম লাগিয়ে দেয় ক্ষতস্থানে সেই একজন বন্ধু। জগতে মানুষ যত দ্রুতই স্বার্থপর হয়ে উঠুক না কেন একজন সত্যিকার বন্ধু বোধকরি ততটাই আপন হতে থাকে। পুঁচকি মেয়েটাকে সেই একযুগ আগে স্কুলের মাঠে গোল্লাছুটের সার্কেলে পেয়েছিলাম, কাঁধের উপর বেণুনি নাচিয়ে ভোঁ দৌড়ে যেতেই হিঁচকে টেনে ফেলে দিয়েছিল যে মেয়েটি সেই মেয়েটির সাথে কোমড় বেঁধে ঝগড়ায় নেমেছিলাম, ওর চোখ দিয়ে তখন জলের ফোয়ারা নেমে কপোল ভিজিয়ে মুখ ফুলিয়ে দিয়েছিল, তখন শক্ত করে হাত মুঠোয় বন্দি করে খেলার মাঠ ছেড়েছিলাম।সেই মুঠোয়বন্দী শক্ত হাতদুটি অবিকল তেমন ই আছে। সময়ের পরিক্রমায় কত বন্ধু এসে গেছে, স্বার্থের খেলায় জিতে গেছে, পাটকেল ও ফিরিয়ে দিয়েছে প্রতিদানে কিন্তু এই একজোড়া হাত শত হার-জিতের, মান-অভিমানের,দুঃখ-সুখের, উল্লাস-বিপত্তিতেও ফারাক হয়নি। শৈশবের বন্ধুটি হারিয়ে যায় কৈশোরে,কৈশোরের বন্ধুটি হারিয়ে যায় যৌবনে,কিংবা কখনো যৌবনের বন্ধুটি হারিয়ে যায় বৃদ্ধকালে। কিন্তু এমন ও হয় শৈশবের বন্ধুটি কৈশোরে,যৌবনে এবং বৃদ্ধকালের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানোর দিনেও থাকে এমন বন্ধুত্ব ঠিক কতটাই না অমর হয়? স্কুলের বেঞ্চিতে যার পাশে বসতে না পারলে স্যারের লেকচারে মন দিতে পারতাম না, একদিন ক্লাসে যে কোন একজন উপস্থিত না হলে মন ভেঙ্গে আসতো সেই বন্ধুটিকেই ভালবাসি আমি, ক্লাসের নোটখাতা যার ব্যাগে তুলে দিতাম তার সাথে আমার নিঃস্বার্থ ভালবাসা। কৈশোরের নানানরকম ভুলের দিনে যে দুজন দুজনের দিকে নজর রাখতাম সেই আমার এই বন্ধুটি। যার সাথে থাকলে ভরসা পায় পরিবার, চোখবুঝে বলতে পারে 'ওর সাথে আছে ও' সেই আমার বিশ্বস্ত বন্ধু। অজস্র দিনে বলা হয়না কখনো ভালবাসি বন্ধু তোকে, যে বন্ধুর ভালবাসা পাওয়ার জন্যে প্রেমিকের মত হাহাকার জমাতে হয়না তার মত আপন জগতে কেই বা আছে! মা-বাবার পরে যদি কাউকে জায়গা দিতে বলা হয় এই মানুষটিকেই দিব আমি। উচ্চশিক্ষার জন্যে যখন মা-বাবার কোল ছাড়ি তখন এই একজোড়া হাত ই ছিল সবসময়ের জন্যে, মা-বাবাও নিশ্চিন্তে থাকে ওরা দুজন একসাথে আছে! শহরের ইট-পাথর-কংক্রিটের রাস্তায় অজস্রবার হোঁচট খেয়ে দিনশেষে গল্প জোড়া হয় এই মানুষটির সাথেই। অজস্রবার ভেঙ্গে পড়ার দিনে এই মানুষটির কাঁধে মাথা রেখেই আমি সাহস নিতে পারি। সবাই যখন ফিরিয়ে দেয় এই বন্ধুটির কাছে গিয়ে বলি তুই তো আছিস! 

কোন এক হিম-শীতল দিনে, কুয়াশার চাদরে যখন আকাশের একপ্রান্ত ঢাকা, প্রকৃতি সকল দহন, বর্ষা আর নীল ঝরিয়ে ক্লান্ত ঠিক তখন শীতের জমে যাওয়া দিনে সমস্ত দাবানল,রোদ বরফের ঠিক এমন দিনে এই পৃথিবীতে তোর আগমন! সকল কুয়াশা ভেদ করে প্রভাতের কিরণ উঁকি দিয়েছিল খুশিতে তোদের জানালায়। জীবনে যতই খরতা,দাবানল, বর্ষা আসুক যাক তুই থাকবি কোমল, উষ্ম রোদের মত। সেদিনের কান্নার আওয়াজ ধ্বনিতে উল্লাসে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল আপনজনেরা, হাঁটিহাঁটি পা পা করে যতই বড় হওয়া শুরু প্রতিবছর জন্মদিনে কত আনন্দ! 

এই জন্মবার্ষিকীতে ঘুম নেই আপনজনদের চোখে, হাসপাতালের এ মোড়ক থেকে অন্য মোড়কে ছুটে বেড়াচ্ছে! আমার কলিজায় ও ভেদ হয় তোর বিনিদ্র-মৃত্যু যন্ত্রণার কষ্টের ভাগীদার না হতে পেরে। একাকাশ, একসমুদ্র আর এক পৃথিবী সমান ভালবাসা উজাড় করে দিলে তুই সুস্থ হবি তো? আমার সমস্ত যাচনা, সমস্ত প্রার্থনা, সমস্ত ত্যাগ, সমস্ত ভালবাসা তোর নামে উজাড় করে দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালাম। এই বদ্ধদিন একদিন শেষ হয়ে যাবে প্রিয়, এই একলা থাকার দিন, এই যন্ত্রণা, ক্রন্দনের দিন, এই শ্বাসকষ্টে আটকে থাকা দিন তারপর আমরা আর কোনদিন আটকে থাকবোনা, গাঙচিলের বেশে উড়ে বেড়াবো মুক্ত-আকাশে। আমাদের প্রতিবন্ধকতার দিন সামলে নিব সুনিপুণভাবে! বন্ধু তুই ছিলি, তুই আছিস, তুই থাকবি সমস্ত জায়গা জুড়ে, সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে, সমস্ত মায়া জুড়ে আর যোজন যোজন মুহুর্ত জুড়ে থাকবে আমাদের অমর-বন্ধুত্ব! 

' একচিলতে মিষ্টি উষ্ম রোদের কিরণ ছড়িয়ে থাকুক জীবন জুড়ে'!!

আনন্দ বৃদ্ধাশ্রম...................শাহানা জাবীন সিমি

আনন্দ বৃদ্ধাশ্রম...................শাহানা জাবীন সিমি
২০৫০ সাল, জানুয়ারী মাস। শীতের এক দুপুরে শামসুর রাহমানের লেখা কবিতা পড়েছিলেন শায়লা বারী।
'যেদিন মরবো আমি, সেদিন কি বার হবে বলা মুশকিল।
শুক্রবার? বুধবার? শনিবার? নাকি রবিবার?
যে বারই হোক,
সেদিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর,
যেন ঘিনঘিনে কাদা না জমে গলির মোড়ে।
সেদিন ভাসলে পথঘাট,
পূন্যবান শবানুগামীরা বড়ো বিরক্ত হবেন।'

এই পর্যন্ত পড়ে বইটি বন্ধ করে রাখলেন তিনি। কি অসাধারণ অভিব্যক্তি কবির! কত চিন্তা শবানুগামীদের জন্য। সত্যিই তো আমার মৃত্যুর দিনই বা কি বার হবে? কাঠফাটা রোদে তপ্ত হবে এই শহর নাকি শীতের হাওয়ায় ঝড়া পাতার মড়মড়ে আওয়াজে ঢেকে যাবে আমাকে বহন করে নিয়ে যাওয়া শবানুগামীদের চাপা কান্না....কে আর কাঁদতে আসবে? বছর তিনেক হলো বারী সাহেব মারা যাবার পর নিজের ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়ে অনেকটা নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে আর নিরাপত্তার কথা ভেবে এই বৃদ্ধাশ্রমে এসে উঠেছেন সত্তর বছরের শায়লা বারী। স্কুল টিচার ছিলেন। অসংখ্য ছাত্র এই হাতে পার করেছেন। এদের মধ্যেই সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কিছু ছাত্রছাত্রী সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে তার মতো বৃদ্ধ মাতাপিতাদের জন্য ঢাকার পূর্বাচলে এই বৃদ্ধাশ্রমটি তৈরী করেছে। এর উদ্দোক্তরা অবশ্য একে বৃদ্ধাশ্রম বলতে নারাজ। সার্ভিস এপার্টমেন্টের আদলে তৈরি এর নাম 'আনন্দ আশ্রম'। আসলেই তাই....সারাদিন যেন হাসি আনন্দে কেটে যায় এই আনন্দ আশ্রমের মানুষগুলোর। এখানে থাকতে হলে দুটো শর্ত অবশ্য পূরণ করতে হয়। এক; বয়স হতে হবে ৬৫র উপরে কারণ ৬৫বছর পর্যন্ত এখন মধ্যবয়স্ক তরুণ হিসেবে গণনা করা হয়। দুই; নিঃসন্তান বা অবিবাহিত পুরুষ বা মহিলা অথবা এমন বাবা মা যাদের সন্তানরা সবাই বিদেশে অবস্থানরত।

এই যেমন একটি মাত্র পুত্র সন্তান শায়লা আর বারী সাহেবের। ছেলে আমেরিকায় চাকরি ও পরিবার নিয়ে সেটেল। বহুবার মাকে কাছে নিয়ে রাখতে চেয়েছে সে কিন্তু শায়লাই রাজি হননি। এমনি বছরে দুবছরে ছেলের কাছে ঘুরতে যাওয়া হয় কিন্তু এদেশের মাটি ছেড়ে একবারে সেখান যে থাকতে শান্তি পান না তিনি। পাঁচ বিঘা জমির উপর তৈরী এই আনন্দ আশ্রম। বারো তলা বিল্ডিং স্টুডিও এপার্টমেন্ট। ইচ্ছে করলে একা থাকা যায় সেক্ষেত্রে পেমেন্ট একটু বেশি আবার কেউ চাইলে শেয়ারও করতে পারে। কমপ্লেক্সের মধ্যে আছে জিম, সুইমিং পুল, লাইব্রেরি, মসজিদ, গেস্ট হাউস এবং ইমারজেন্সি মেডিকেল সার্ভিস দেয়ার জন্য একটা ছোট ক্লিনিক। আরো আছে একটি বড়মাঠ যেখানে প্রাতঃভ্রমণ ও সান্ধ্যভ্রমণের পাশাপাশি চলে নির্মল আড্ডা, গল্প ও খুনসুটি। বিল্ডিং এর ছাদে যে ছাদকৃষি আর সামনে পেছনের খালি জায়গায় যে আঙিনা কৃষি রয়েছে তাতে অনেকেই সকাল বিকাল মালির সাথে হাত লাগান। তাদের পরিচর্যার কারণে আনন্দ আশ্রমে সবজি অনেক সময় বাজার থেকে কিনতেই হয়না।

খাবারের ব্যাপারে খুবই কঠিন আনন্দ আশ্রমের ডাইটেসিয়ান। বয়সে তরুণী মেয়েটি একটা বড় হাসপাতালের পুষ্টিবিদ আবার পার্ট টাইম এই বুড়ো বুড়িদের দেখভাল না করলে নাকি তার ভালো লাগেনা। তার নির্দেশে মাসে দুবার রেডমিট আর বাকি দিন মেডিটেরেনিয়ান ডায়েটের আদলে তৈরি বাংলাদেশী ডায়েট। রুচি পরিবর্তনের জন্য মাসে একবার থাই,জাপানিজ,কোরিয়ান বা কন্টিনেন্টাল কুজিন। তারপরও তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে অনিয়ম যে চলে না তা নয়! যখন যার ইচ্ছা দেদারসে চলছে অনলাইন খাবারের অর্ডার আর ডেলিভারি। ১২তলার এই স্টুডিও এপার্টমেন্টে রয়েছে দুটি ডাইনিং হল। সাধারণত তিনবেলার খাওয়া দাওয়া সবাই একসাথে ডাইনিং হলে করে থাকে। তবে চাইলে রুমেও ডেলিভারি নিতে পারে। শ'খানেক বোর্ডার কে দেখা শোনা করার জন্য এখানে রয়েছে দশজন উদ্যম ও চৌকষ তরুণ তরুণীর একটি দল। যারা লনড্রী থেকে শুরু করে সব কাজ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা এমনকি সবাই ঔষধ ঠিকমতো খেলো কিনা সবকিছুর খবর রাখে। মাঝে মাঝে খাওয়া দাওয়ার পরে শুরু হয় জম্পেশ আড্ডা। এই যেমন আজকের বিষয় পূর্বাচল সিনেপ্লেক্সে ২০২০ এর করোনা মহামারী নিয়ে আবীর ফয়সালের 'করোনা ২০২০' নামের যে মুভিটা রিলিজ হয়েছে সেইটা নিয়ে। অসাধারণ নাকি স্টোরিলাইন আপ, সিনেমাটোগ্রাফী আর ডিরেক্শন। অনেকেই দেখতে যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু শায়লা কে ফিসফিস করে নাবিলা বললো... এই ফিল্ম দেখার মতো মানসিক শক্তি আমার আর এখন নেই। কি দুঃসহ দিনগুলি গেছে! সারা পৃথিবী জুড়ে ছিল মৃত্যুর মিছিল। এক ঝটকায় ধনী ও ক্ষমতাবানদের নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল গরীব আর ক্ষমতাহীনের কাতারে। তোমার হাতে টাকা আছে কিন্তু আইসিইউ র বেড খালি নাই। তোমার প্রাইভেট জেট প্লেন আছে বিদেশে গিয়ে চিকিত্সা নেয়ার ক্ষমতা আছে অথচ এয়ারপোর্ট বন্ধ। ২০২০ এর করোনায় বাবা মা দুজনকেই হারিয়েছিলেন নাবিলা।

আজ মর্নিং ওয়াকে রাইয়ান সাহেবকে খুব খুশি মনে হচ্ছে। তিন বছর পর কানাডা থেকে ওনার মেয়ে জুহি বাবার সাথে দেখা করতে এসেছে। উঠেছে আনন্দ আশ্রমের গেস্টহাউসে। সকালে অনেকের সাথে পরিচিত হয়ে ওর খুব ভালো লাগছে। কতগুলো অপরিচিত মানুষ শুধু দেশের শেকড়ের টানে, মাটির কাছাকাছি থাকবে বলে আজ একটা পরিবার; একথা ভাবলেই বারবার চোখ ভিজে আসছে জুহির। কিন্তু বাবাকে নিয়ে একটা সমস্যা অনুভব করছে সে। মনে হচ্ছে বাবা অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছে। এমন কি জুহির নামটাও মাঝে মাঝে মনে করতে পারছে না। কিছুটা ডিমেনশিয়া দেখা দিয়েছে। একটু উদগ্রীব হয় সে। বিদেশে তো এখন পার্কিনসন, এলজেইমার, ডিমেনশিয়া এগুলোর জন্য অনেক রিহ্যাব সেন্টার রয়েছে। এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আজ বিকেলে একজন নিউরোলজিস্ট এর সাথে এপয়েন্টমেন্ট করে জুহি।

এলজেইমার ডিজিস ডায়াগনসিস হয় জুহির বাবার। এটা এমন একটা রোগ যেখানে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজের ক্ষমতাও হ্রাস পায়। হঠাত্ করে কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না জুহি। যদিও বাবা কানাডার সিটিজেন তবুও কি তিনি দেশ ছাড়তে রাজি হবেন? এখানে বা কার ভরসায় রেখে যাবো আমি...এধরনের নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে জুহির মাথায়। সবকিছু শুনে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেন নিউরোলজিস্ট ডাঃ আশফাক জামিল।
--- কিছু মেডিসিন লিখে দিয়ে বলেন একদম চিন্তা করবেন না; আমাদের দেশেই এখন এলজেইমার পার্কিনসন রিহ্যাব সেন্টার গড়ে উঠেছে....একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিয়ে বলেন;
--- একবার হলেও প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে আসুন।
হোমে ফিরে পরের দিন জুহি শায়লা আর নাবিলার সাথে বাবার ব্যাপারটা শেয়ার করে ।
---আন্টি তোমরা কেউ কি আমার সাথে রিহ্যাব সেন্টার টা দেখতে যাবে? এক কথায় রাজি হয়ে যায় ওরা দুইজন।
পরের দিন একটা গাড়ী নিয়ে ওরা চলে যায় পূর্বাচল থেকে দুই ঘণ্টার পথ টাংগাইলের দেলদুয়ার। রাজধানী ঢাকা এখন ডিসেনট্রালাইজ হতে হতে গাজীপুর ছাড়িয়ে টাংগাইলের দিকে।

রিহ্যাব ক্লিনিকের এমডি র সাথে কথা হয় জুহিদের।
--- আসলে কি ম্যাডাম মানুষের লাইফ এক্সপেকটেন্সি বাড়াতে এই ধরনের ওল্ড এজ প্রবলেম গুলো বেশি ফিল হচ্ছে। যদিও বিদেশে মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব; কিন্তু এদেশে যেহেতু এটা সম্ভব না তাই অনেক শিল্পোদ্দক্তাই এখন দেশের বিশাল মানবসম্পদ কে কাজে লাগিয়ে এই সেবাখাত গুলোতে এগিয়ে আসছে। সত্যি অবাক হয় শায়লা একেবারে বিদেশের রিহ্যাব সেন্টারের মতো এদের কর্মযজ্ঞ। যেহেতু এধরনের অসুখে মানুষ শিশুর মতো হয়ে যায় তাই এদের খাওয়া দাওয়া, গোসল, ঘুম থেকে শুরু করে সব কাজেই অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন। যাদের পরিবার এই ধরনের সেবা দিতে অক্ষম তাদের জন্য এখানে সেবা দিয়ে যাচ্ছে একদল মানবদরদী অভিজ্ঞ স্টাফ। অবশ্য প্রতিষ্ঠানটির ফাইনান্সিং এর অর্ধেক অর্থ আসে রোগীদের কাছে থেকে। দুই একদিনের মধ্যেই আনন্দ আশ্রমের গভর্নিংবডির সাথে একটা এপয়েন্টমেন্ট করে জুহি। বাবার সমস্যাগুলো খুলে বলে তাদের। রিহ্যাব সেন্টারটার কথা শুনে তাদের কাজের ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখান ওনারা। অভয় দেন জুহি কে। কয়েকদিনের মধ্যে আনন্দ আশ্রম ওল্ডহোমের সাথে রিহ্যাব সেন্টারটির একটা সমঝোতা চুক্তিও হয়।

কালকে রাইয়ান সাহেব তাঁর ঠিকানা বদল করবেন। পূর্বাচলের আনন্দ আশ্রম থেকে টাংগাইলের এলজেইমার রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। ওনাকে সেখানে রেখে জুহি ফিরে যাবে কানাডায়। এই প্রথম আনন্দ আশ্রম থেকে কেউ এভাবে বিদায় নিচ্ছে। এই উপলক্ষে রাতে সবাই কে ডিনারে ইনভাইট করেছে জুহি। আজকে ওনার পরিবর্তন যেন স্পষ্টতই সবার চোখে পড়ছে। রাইয়ান সাহেব আবেগপ্রবণ হয়ে কখনো বা খুব আনন্দিত হচ্ছেন আবার কখনো বা কেঁদে ফেলছেন। খাওয়া দাওয়া ও আড্ডা শেষে যে যার মতো বিদায় নিল সেদিন।

ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে আছে পুরো আনন্দ আশ্রম। শুধু ঘুম নেই জুহির চোখে। সুইমিং পুলের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে একমনে ভাবছে সে। কত স্মৃতি...মা বাবা আর সে! একদিকে তার চাকরি, সংসার আরেক দিকে বাবা। সে কি একা ফিরে যাবে? নাকি বাবা কে নিয়ে ফিরবে? অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত বদল করে জুহি। ভোর হয়ে আসে আনন্দ আশ্রমের মসজিদ থেকে ভেসে আসে আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাউম। আজ বুধবার। রৌদ্রজ্বল এক শরতের বিকেলে মেয়ের হাত ধরে রাইয়ান সাহেব কানাডার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। আনন্দ আশ্রমের সব বোর্ডাররা অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বিদায় জানায় তাদের কিছুদিনের সঙ্গী একজন ওল্ডহোম মেট কে।


লেখক: এমবিবিএস চিকিৎসক
অধ্যাপক বায়োকেমিস্ট্রি
আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

তোমাদের মাঝে আমিও ছিলাম..........................সাকিব প্রধান অনিক

তোমাদের মাঝে আমিও ছিলাম..........................সাকিব প্রধান অনিক




পৃথিবী একটা প্রতীযোগীতার স্থান। একটি নবজাতকের জন্মের সময়ও তাকে ৩০০ মিলিয়ন প্লিহার সাথে প্রতিযোগিতা করতে হয়। কিন্তু সেই প্রতিযোগি তার গন্তব্য পৃথিবী নামক এই গ্রহটিতে আদৌ আসতে পারবে কিনা বা এসে পড়লেও সে তার সঠিক স্থান স্বরূপ বাবা মায়ের কোল বা তাদের পরিচয় পাবে কিনা সেটা নিশ্চিত নয়। কারন আজকাল একটি জীবনের অস্তিত্বের প্রমান দিতে তাকে মরে গিয়ে বলতে হয় আমি ছিলাম এই তোমাদের মাঝেই। 
শিশুটি যখন জন্ম নেয় তার প্রতিযোগীতা হলো নিশ্বাস ফেলা, সেই নিশ্বাস সে এসির বাতাসেও নিতে পাড়ে আবার কোন এক ময়লার স্তুপে। এই কথাটাই বলে দেয় তাকে পিতা মাতা কতখানি স্বীকার করেছে! মনের সাথে মন মিল হলে প্রেম জন্ম নেয় আর দেহের সাথে দেহ মিললে সন্তান জন্ম নেয়। আসলে আজকাল গর্ভে সন্তান আসলেই মা হওয়া যায় না, কারন পতিতা আর ধর্ষিতার গর্ভেও সন্তান আসে। কিন্তু তাদের কোন স্বামী থাকে না, থাকে খদ্দের নাইলে ধর্ষনকারী। 

কোন খদ্দের বা ধর্ষনকারী কি—
আজো স্বীকার করেছে তাদের ভুল? 
তাহলে এরা  বাবা কীভাবে হবে? 
আর তারাই বা কীভাবে মা হয়? 

কিন্তু ওই পতিতা বা ধর্ষিতার মধ্যেও কোমল একটা মা লুকিয়ে আছে। সেও চায় ওই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আসা শিশুটিকে নিজের শিশু বলে লালন পালন করতে কিন্তু কে দেবে পিতৃ পরিচয়? 
একজন নিজের ব্যবসা ঠিক রাখতে আর আরেকজন সমাজকে মুখ দেখানোর ভয়ে ওই ভ্রুনটিকে হত্যা করে ফেলে একটা টিপসই অথবা একটা স্বাক্ষরে। প্রসেসটা খুব পরিচিত যার নাম "এবরশন"। সেই প্রসেস করিয়ে দেয় ডাক্তার। সেই নারী-পুরুষ আর ডাক্তারাও অনিচ্ছায় বা ইচ্ছায় খুনী। যে খুনের বিচার শুধুই হাশরের আদালতে সম্ভব। তবে শিশুটির কি দোষ? সে তো সন্তান, হোক পতিতার বা হোক ধর্ষিতার। সে তো তাকে মা মনে করে তার গর্ভেই থাকে।

আর সে ভাবে আমি দেখবো পৃথিবীর আলো, যে আলোতে আমার মা আছে। কিন্তু সব শিশুর মা হয় না, কারো ময়লার স্তুপ হয়, কারো এতিমখানা হয়, কারো এবরশন হয়। শিশুরা বড় অসহায়, সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস আর নির্ভরতার ক্ষমতা এদের। তারা বাবা বলতে বললে বাবা বলে মা বলতে বললে মা। আবার অনেক সময় এমনো হয় ডাক্তার নবজাতকের জন্মের সময় এমন এক কন্ডিশন দেয় যে, হয়তো মাকে বাচাতে পাড়বে নয়তো শিশুকে। তখন এমন হয় যে শিশুর পিতার স্বাক্ষরে ডাক্তাররা মাকে বাচাতে গিয়ে শিশুকে বাচাতে পাড়ে না, আবার শিশুকে বাচালে মাকে বাচাতে পাড়েনা। 

এতে কি হয়? পুরুষ সত্ত্বা নিজের অজান্তেই হয়তো খুনী হয়ে যায়। হিসাব তো সোজা, শিশু বাচলে স্বামী হয় স্ত্রীর খুনী আর নয়তো স্ত্রী বাচলে বাবা হয় সন্তানের খুনী। কারন তার স্বাক্ষরই তো ঠিক করে দিচ্ছে যে, কে বাচবে? আসলে জীবন টা জিতে যাওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, সয়ে যাওয়ার অথবা  সইতে না পেরে হেরে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। আজকাল বন্ধুদের আড্ডায় কে কত ছ্যকা খেয়েছে তারও হিসেব হয়। হিসেব হয় কে কতবার আত্মহত্যা করতে গিয়েও পাড়েনি! জীবন বড় অদ্ভুত! জীবন মরনের খেলা খেলার জন্যই হয়তো জীবিত।