Showing posts with label আশিকুর রহমান বিশ্বাস. Show all posts
Showing posts with label আশিকুর রহমান বিশ্বাস. Show all posts

রংমহল..............................আশিকুর রহমান বিশ্বাস

রংমহল..............................আশিকুর রহমান বিশ্বাস
কটু পর রাত নামে। জহির ভাবে, সে হয়তো কাউকে খুঁজে পাবে, কিন্তু নিকটবর্তী কাউকে দেখতে পায় না সে। সন্ধ্যা রাতে শহরাঞ্চলে কোলাহল থাকে। মানুষ অবসর নিয়ে খুচরা আলাপে লিপ্ত হয়, চায়ের কাপে টুংটাং আওয়াজ দেয়, হকারদের দৌড়ঝাঁপ লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু এখানে সে- সবের কিছুই নেই। যদিও প্রত্যন্ত গ্রামদেশে কোলাহল খোঁজাটা বড় অবান্তর। তবে সে শুনেছিল, এখন গ্রাম আগের মতো একেবারে অবহেলিত নয়, মানুষ শিক্ষিত হয়ে গেছে, রাস্তাঘাট উন্নত, শিল্পায়নের প্রভাবে তাদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে, হতদরিদ্র মানুষ আজকাল আর চোখে পড়ে না বললেই চলে, তারাও গভীর রাত অবধি দোকানপাটে পড়ে থাকে, বলা যায় গ্রাম এবং শহরের পার্থক্যটা কমে এসেছে। জহিরের চশমা ঢাকা চোখে সে চিত্র এখনও পড়েনি। সে সন্তর্পণে একটা বাঁশ ঝোপের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যায়। বস্তুত এটাই যাবার রাস্তা। জহির শব্দ করে না, কিন্তু কেনো জানি বাঁশ ঝোপে লুকিয়ে থাকা পাখিরা বুঝে ফেলে তাকে এবং গলা ছেড়ে বাকিদের জানান দেয়, তারপর জোটবদ্ধ চিৎকারে লিপ্ত হয় তারা।

আকস্মিক সেই চিৎকারে জহিরের গা টা ছমছম করে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণে আবার ভালো লাগে তার, এবং ভাবে, আহারে যদি আরেকবার অমন ডাকতো ওরা! কিন্তু পাখিরা আর চিৎকার করে না। জহির অপেক্ষা করে তবু, দপদপ শব্দ করে পা ফেলে, কিন্তু পাখিরা নিশ্চুপই। এবার সে হাঁটা শুরু করে; ঘোলাটে অন্ধকারে পচা কাদায় তার পা খপ করে আটকে যায়। কাঁধের ব্যাগটা সামলাতে ঢের কষ্ট হয় তার। তারপর সে পায়ের জুতা জোড়া খুলে হাতে নেয় এবং পুনরায় হাঁটতে থাকে। কয়েক পা হেঁটে গেলে জহিরের ডান পায়ের তলে পিচ্ছল অনুভূতি হয়। ঠিকমত বুঝতে পারে না সে, অতএব তাকে অনুমান করে নিতে হয়; তখন সে অস্ফুটে মুখে বলে, পাখির পায়খানা হবে বোধহয়। ঐ সময় কোনো এক কারণে যেন একটু ঘেন্না লাগে তার কিন্তু আশপাশে বাড়িঘর কিংবা পরিষ্কার পানির সন্ধান এখুনি মিলবে না এমন সান্ত্বনায় তাকে মানিয়ে নিতে হয়। একটা লাল শেয়াল তাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়, জহির হিস্ হিস্ শব্দ করে তাকে তাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করে। শেয়ালটি তার দিকেই তেড়ে আসতে থাকে, জহির ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে এবং তাকে চলে যাবার রাস্তা করে দিতে একটু পার্শ্বে সরে গিয়ে নীরবে দাঁড়ায়। কেননা এই জাতীয় আক্রমণাত্মক প্রাণীগুলো দল বেঁধে খাবারের সন্ধানে রাতে ঘুরতে থাকে। জহির অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে আশপাশ তাকিয়ে দেখে এবং স্বস্তি পায় এই আশায় যে নিকটবর্তী এই শেয়ালটি ছাড়া একটা ইঁদুরও দেখে না সে। শেয়ালটি তার কোল ঘেঁষে অত্যন্ত ভদ্রভাবে হেলেদুলে গন্তব্যে চলে যায়। জহিরের গা থেকে ঘাম ছাড়ে। 

এবার পূর্বের ন্যায় আপেক্ষিক আরো অনুন্নত একটা রাস্তায় পৌঁছে যায় সে। জহির অবাক হয় এবং আক্ষেপও হয়, অতঃপর অস্ফুটে বলে, এই রাস্তায় মানুষ চলে! কিন্তু তারপর সে আরো কঠিন বাস্তবতায় পৌঁছে যায় এবং ডিপটয়েলের আলো এসে রাস্তায় পড়ে তখন, অতঃপর সেই আলোয় সে অস্পষ্ট দেখে রাস্তার অসংখ্য জায়গায় গোবর পড়ে আছে। থিতিয়ে আছে গোবর কাদামাটির সাথে। এখন এই গোবর ডিঙিয়ে তাকে যে গ্রামের ভিতর যেতে হবে এটা পুরোপুরি নিশ্চিত। তখন তার মনে হয় এই গ্রামের মানুষ খুব পরিশ্রমী হবে নিশ্চয়। তারা গরু পোষে, ক্ষেতখামারে কাজ করে, বস্তুত অত্যন্ত সহজসরল জীবনযাপন তাদের। সেই সাথে একটু তৃপ্তিও হয় বটে, কেননা যতদিন সে এখানে থাকবে নিশ্চয়ই টাটকা সবজি, গাভীর দুধ, অন্ততপক্ষে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে এই ভাবনায়। শহরে হাশেম নামে যে লোকটি তাকে রোজ সকালে দুধের জোগান দিতো, সে দুধ মোটেও খাঁটি নয়। তবুও লোকটি কী অবলীলায় একশত একটা মিথ্যা একজায়গায় করে আত্মশুনানি করে চলতো। সে ইঙ্গিত করতো, তার সেই দুধের মতো নির্ভেজাল সুস্বাদু দুধ অত্রাঞ্চলে নেই, তার গরু শুধুই কাঁচাঘাস-খড়-খৈল-ভুষি এবং পরিষ্কার পানি ব্যতীত আর কিছুই খায় না, এমনকি আধুনিক খাদ্যখাবার মোটাতাজাকরণ ঔষধ পর্যন্ত সে কখনওই গরুকে দেয়নি, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সে যাই বলে না কেনো দুধ জ্বাল দেবার পর জহির মুখে নিয়ে দেখতো তা কেমন যেন বিস্বাদ, টকটক, বস্তুত অখাদ্য বলা চলে। এখন তার মন বলে ঐ কাজটি এখানে নিশ্চয় হবে না। তারপর কিছুক্ষণ হেঁটে গেলে একটা বাড়ি দেখতে পায় জহির। খোলামেলা ঐ বাড়িতেই একটা নীল রঙ করা টিউবওয়েল তাকে অভ্যর্থনা জানাতে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হয় তার। জহির কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রেখে হাত পা ধুয়ে নেয়। ঐ সময় একজন স্ত্রীলোক তার কাছে এসে দাঁড়ায় এবং তার সম্পর্কেই বিস্তারিত জানতে চায়। জহির নিজের পরিচয় প্রায় একদমে বলে যায় এবং একটু থেমে তার এখানে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে চলে। স্ত্রীলোকটি এবার ভরসা পায় এবং অনুনয় করে তাকে ভিতরে যেতে বলে। জহির অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করে এবং হেসে বলে বেশি বিলম্ব হলে নিশ্চয় তার গন্তব্যস্থানের লোকেরা দুশ্চিন্তা করতে পারে। তখন স্ত্রীলোকটি তার গন্তব্যস্থান ও তাদের নামধাম জানতে ব্যগ্র হয়। জহির এবার ইতস্তত বোধ করে কেননা তার গন্তব্যস্থান এখনও ঠিক হয় নি, এবং তার ধারণা আজ রাতটা সে কোনোরকমভাবে মসজিদ কিংবা অন্য যে কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে ঘুমিয়ে কাটাতে পারবে। স্ত্রীলোকটি তার মনোভাব বুঝতে পারে এবং তার ছেলেদের বাইরে দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে ডাক দেয়, অতঃপর তাদেরকে বলে তাদেরই এই বাড়িতে সে যেন আজকের রাতটা আতিথেয়তা গ্রহণ করে। কিন্তু জহির দ্বিতীয় বারের মতো তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করে এবং তখন তাদের এক ভাই এখানে থাকার পক্ষে অনেকগুলো যুক্তি দাঁড় করিয়ে দেয়। জহির এ পর্যায়ে এসে সম্মতি না দিয়ে পারে না, এবং পরবর্তীতে সে ভিতরে গিয়ে বসে। তাদের আন্তরিকতায় সে সত্যিই মুগ্ধ হয়ে যায়, এই মানুষগুলো এত সহজসরল কেনো? এই জাতীয় প্রশ্ন মাথায় আসে তার। তারপর সে একটা ব্যথার অনুভব করে। কাদাভরা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে তার পায়ে মুহূর্তে ব্যথা করতে থাকে এবং সে পায়ের পাতা মাটিতে রাখতে ব্যর্থ হয়। অতঃপর জহির বিছানায় নিরুপায় হয়ে শুয়ে থাকে এবং কীসব যেন চিন্তা করতে করতে তার ঘুম ঘুম ভাব চলে আসে। 

তখন জহির প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিল। তার সরু লম্বা নাকটা অত্যন্ত স্বেচ্ছাচারিতার মতো ভারী গর্জন করছে এমনটা একবার মনে হয়েছিল তার, কেননা, নিশ্বাস ভারী বোঝাচ্ছিল। এমতাবস্থায় একটা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর সে শুনতে পায়। আপনি কি সজাগ আছেন? -এই সাদৃশ্য কণ্ঠ তার কানে এসে লাগে। জহির ধসমস করে উঠে বসে, একটু স্বাভাবিক হয়, অবশেষে দরজার কপাট খুলে দেয়। এবং আচমকা তখন সে অনুভব করে তার পায়ে আর অতটা ব্যথা নেই। যে লোকটির ডাকে সে ঘুম থেকে জাগে, এ পর্যায়ে সেও আবিষ্কার হয় এবং জহির দেখে, সে আসলে নতুন কেউ নয় বরং ঐ যুক্তিবাদী লোকটিই- যার কথামত সে এখানে রয়ে গেছে। জহির- আসুন ভিতরে আসুন, বসুন- নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে বলে। লোকটি তার পাশে চুপটি বসে থাকে কিছুসময়। এরপর সে আচমকা উৎকণ্ঠিত গলায় ইঙ্গিত করে যে, অদূরে কোথাও গানের আসর বসেছে, এখন সে যদি আগ্রহী হয় তবে তাকে নিয়ে যেতে পারে। জহির বিস্তারিত জানতে চায়,অতঃপর লোকটি ভেঙে বলে। লোকটির বর্ণনা থেকে জহির যা বুঝতে পারে তা এমন: এই অঞ্চলে এখনও লোকসংগীত টিকে আছে এবং প্রায়শ রাতে আসর জমে। মধ্যরাত অবধি সেই আসর চলে এবং সকলে তা খুব মুগ্ধ হয়ে শ্রবণ করে। তখন হঠাৎই তার মনে হয় যে, একটু সচেতন হলে নিশ্চয়ই আমরা আরো কিছু লালন, হাছন, শাহ্ আব্দুল করিম খুঁজে পেতাম। এরপর জহির মৌন সম্মতি দেয় এবং যেহেতু সে শুধু লুঙ্গি পরেই শুয়েছিলো সুতরাং তাকে এবার পূর্বের পোশাকে ফিরতে হয়। অতঃপর একটা প্রাথমিক গোছগাছের পর তারা দু'জনে বেরিয়ে পড়ে। 

গানের আসর শেষ হলে জহির ফিরে এসে কখন যে আবার শুয়েছিল তা আর মনে করতে পারে না সে। বস্তুত সকাল হয়ে যায় কিন্তু সে আশপাশ তাকিয়ে কাউকে খুঁজে পায় না। এমনকি যার সাথে প্রায় মধ্যরাত অবধি গানের আসর জমিয়েছিলো, তাকেও সে খুঁজে পায় না। জহির হাঁটতে বের হয় কেননা তার মন বলে নিশ্চয় হাঁটতে বেরুলে পথিমধ্যে কাউকে না কাউকে খুঁজে পাবে এবং সেখান থেকে এই নাটকীয়তার বিস্তারিত জেনে নিবে সে। গ্রামের একাংশ ঘুরে শেষ করে জহির, এবং কয়েকজন লোক তাকে এমনি ইঙ্গিত দেয় যে, আজ এনজিও থেকে তাগাদা দিতে পারে যেহেতু তারা বেশ কিছু টাকা নিয়েছিলো সেখান থেকে, এবং সাধারণত তারা খুব কড়া ভাবেই তাগাদা দিয়ে থাকে, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে, অবশেষে ঘরের বাসনকোসন পর্যন্ত ছিনিয়ে নিতে দ্বিধাবোধ করে না। এবার সে বুঝতে পারে যে, নিশ্চয় কিস্তির টাকা আজ বন্দোবস্ত হয় নি তাদের, কেননা কয়েকদিন ভারী বর্ষণে কর্মশূন্য তারা -এমনটা বোঝাও যাচ্ছিল রাতে, অতএব সাময়িক ভিটেমাটি ছাড়তে হয়েছে ঝামেলা এড়াতে। কিন্তু জহিরকে না বলে তারা চলে গেলো কেনো? তাকে তো তারা বুঝিয়ে বলতেও পারতো। সে তো দুধের শিশু নয় যে বললে বুঝবে না। ফিরে এসে নিশ্চুপ বসে থাকে সে এবং ভাবে। পালিয়ে তারা কতদিনই বা বাঁচতে পারবে? পরক্ষণে আবার তার মনে হয়, এটাকে আদৌ পালানো বলা ঠিক নয়, কেননা তারা ফিরবে এবং টাকার বন্দোবস্ত করেই ফিরবে। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও তারা যে তাকে আপ্যায়ন করলো, আশ্রয় দিলো, এমনকি একটু বুঝতেও দিলো না - এতে করে সে এই রংমহলে নিজেকে একজন অপদার্থই মনে করলো। কেননা গানের আসরে যাবার পথে লোকটির সাথে নানান কথোপকথন হয়েছিলো রাতে, লোকটি তাদের অসহায়ত্বের ছাপ রেখে যাচ্ছিল প্রতিটি কথায়, অথচ জহির তা আমলেই নেয় নি। একে ঠিক অপদার্থই বলা চলে। ভীষণ স্বার্থপরতা। অনেকক্ষণ বসে থাকতে থাকতে একসময় ঘুম আসে জহিরের। এই অসময়ে কিছুসময় ঘুমায়ও সে, কিন্তু সেই ঘুম ভাঙে আকস্মিক অপরিচিত একটি কণ্ঠস্বরে। অতঃপর সে ঘুমঘুম আবছা চোখে তার দিকে তাকায় এবং দেখে ভদ্র পোশাকে একজন লোক তার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে। আপাতদৃষ্টিতে ভদ্র মনে হলেও সে কিন্তু অতটা ভদ্র নয়, তা বোঝায় যাচ্ছে। জহির তার সম্পর্কে বিনীত জানতে চায়, তখন ভদ্রলোকটি খুলে বলে। কিন্তু সে মহা ঝামেলার ভিতরে পড়ে অতি শীঘ্র। কেননা, ভদ্রলোকটি তার থেকে কিছু শুনতে না চেয়েই বরং পাওনা টাকার দাবি করে বসে। জহির আচমকা হকচকিত হয়। সে কিছু বলতে চায় অথচ লোকটি বড় বাচাল প্রকৃতির হওয়ায় জহির তা পেরে ওঠে না। এক পর্যায়ে দু'জনার ভিতর কথা কাটাকাটি হতে থাকে। উচ্চস্বরে কথোপকথনের একপর্যায় জহির বলে ফেলে সে কেবলই একজন আগন্তুক বই কিছু নয়, এমনকি গতকাল রাতের ঘটনাটাও কখনও স্পষ্ট, কখনওবা অস্পষ্ট করে বলে ফেলে সে, কিন্তু লোকটি তার কথা বিশ্বাসই করতে পারে না। দুজনার মধ্যকার এই বাকবিতণ্ডা থেকে একসময় হাতাহাতি শুরু হয়। দেখতে লোকটি ভদ্রবেশী হলেও গায়ে শক্তি ছিলো বেশ কাজেই জহির তার সাথে আর পেরে ওঠে না। প্রচণ্ড একটা আঘাত আচমকা জহিরের মাথায় এসে লাগে এবং সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তারপর সে আবছা দেখতে শুরু করে। এই রংমহল যার রং আজ সকাল অবধিও ছিলো উজ্জ্বল তা এখন ফিকে মনে হয় তার। তারপর জহির ক্রমশ জ্ঞান হারাবার পথেই এগিয়ে যায়।

অনাবৃত কর..............আশিকুর রহমানের কবিতা

অনাবৃত কর..............আশিকুর রহমানের কবিতা
অনাবৃত করো সেই জ্বলন্ত
আবরণ
পৃথিবী মহা অসুখে
আজ, নিদারুণ অন্ধকার চারিদিক;

একদিন সরফুদ্দিন ও তার বউ............আশিকুর রহমান বিশ্বাস

একদিন সরফুদ্দিন ও তার বউ............আশিকুর রহমান বিশ্বাস

'আমাকে বলতে বলবেন না
              আমি বলতে শুরু করলে
              প্রকাশ্য সভায় আপনারা নগ্ন হয়ে যাবেন।'
           (প্রদীপ বালা)

গ্রীষ্মে এই ছায়াটুকু বড়ই মনোহর। পথিকের ক্লান্ত শরীরে প্রশান্তি বয়ে আনে বটে। তখন চোখদুটো পাথরের মতো ভারি হয়ে আসে; শরীর ক্রমশ ভেঙে এসে জড়ো হয়; আর ভাবনাচিন্তার পরিধি ছোট হতে থাকে। সূর্য তখনও ঠিক উলম্ব কিরণ দেয়। পাখিরা ভঙ্গুর শরীরে ডানা ছেড়ে হাঁপাতে থাকে, নদ নদীর পানি শুকাতে থাকে, সবুজ গাছেরাও বিবর্ণ হয়, বালুকাময় এই শহর মনুষ্য বসবাসের একেবারেই অনুপযোগী হয়। ঠিক তখন এই ছায়াটুকু কি প্রশান্তির নয়? কিন্তু কখনও আবার সে ছায়া কুকুরের দখলে। মৃদুমন্দ বাতাসে ছায়া নড়ে আর কুকুরের দল খেলা করে। ঘেউঘেউ। উঁচু চিমনি চূড়া অনর্গল কালো ধোঁয়া বমি করে তার কিছুটা ছিটকে আকাশের গায়ে লাগে, স্কেচ তৈরি হয়।অথচ আজ ছায়া নেই তাই কুকুরের খেলাও নেই। আছে শুধু আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। ধোঁয়া। আবর্জনা। আঁশটে গন্ধ। সরফুদ্দিন আর ওর বউ শেফালী ভেবেছিল বৃষ্টির আগেই ওরা ভালোই ভালোই কেটে পড়তে পারবে, তখন না হয় দু'দণ্ড জিরিয়ে নিতে পারবে ছায়ায়। আগেও নিয়েছিল। সেবার নতুন বিয়ে করেছিল সরফুদ্দিন, ছায়ায় দাঁড়িয়ে দু'জন দু'টো আইসক্রিম চেটে সাবাড় করেছিল ওরা। লম্বা ঘোমটার ভিতর থেকে খেতে বড় অস্বস্তিই লাগছিল। সরফুদ্দিন বার বার বলছিলো-
- ঘোমটা ছাড়ো বউ, কে আছে আমি ছাড়া?
আসলে ওর বড় দেখতে ইচ্ছে করছিলো বউকে। এভাবে নানা ছলচাতুরী করে যাচ্ছিল ও, আর শহরের মর্ডান মেয়েদের গল্প। সে-গল্প শেফালীর সব জানা তবু অদ্ভুত কৌতূহলে শুনে যাচ্ছিল ও। হেসে ঢুলে পড়ছিলো সরফুদ্দিন। শেফালীও হাসছিলো। সেই হাসি বড় দেখতে ইচ্ছে করছিল সরফুদ্দিনের কিন্তু ঘোমটা ছাড়ে নি বউ। এই অবাধ্যতাটুকু একসময় মনে ক্রোধ বয়ে এনেছিল সরফুদ্দিনের। শেফালী বুঝতে পারে নি। কিন্তু আজ সরফুদ্দিন খেয়াল করেছে ওর বউ ঘোমটা টানে নি। ভিড়, গা ঘেঁষাঘেষি, অশ্লীলতা, তবুও। বউকে সে ইতোমধ্যে বারকয়েক বলে ফেলেছে-
- ঘোমটা টানো বউ। আহা ঘোমটা টানো বউ।
টানে নি শেফালী। চুপ থেকেছে। শেফালী আজ ঘোমটা তলে আবদ্ধ থাকতে চায় না, ও বেরুতে চায়, জরাজীর্ণতার দেয়াল
টপকাতে চায় ও। সবার মুখোশ খুলে দিতে চায়। সরফুদ্দিন যে হলুদের মিলে কাজ করতো ওখানে অগোচরে আটা মেশানো হতো রাতে, জেনে গেছে শেফালী। সবাইকে বলে দিতে চায় সে। সরফুদ্দিন সতর্ক করেছিলো-
- চুপ বউ, সাবধান! কাউকে বলবা না এ-কথা।
- কেন বলবো না?
- যা বলি তাই শোনো। তোমার কথা কেউ শুনবে
না, কেউ বিশ্বাস করবে না ওরা বরং হেসে 'পাগলি' বলবে। অশ্লীল গালি দিবে।
- বলেই দেখি না?
মুখ চেপে ধরেছিল সরফুদ্দিন। দম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ও-কথা সবাইকে বলে দেবে সে। সরফুদ্দিন প্রায়শ মিছিলে যেত। লম্বা মিছিলের সামনে থাকতো ও, স্লোগান দিতো। বাসায় ফিরে ঘন চা চাইতো, গলা বসে যেত ওর। খেতে পারতো না, শরীরে ব্যথা করতো, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসতো। লেপ মুড়ে নিতো শরীরে, প্রলাপ বকতো। কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারতো না সে, সেই সরফুদ্দিন একদিন বউকে ডেকে বললো-
- আজ নির্ঘাত মারা পড়তাম বউ।
- ওমা কেনো! পুলিশ তাড়া করছিলো বুঝি?
- আরে পুলিশের ভয় এই সরফুদ্দিন করে না।
- তবে?
- অপজিশনের হামলা। কোনোমতে বেঁচে ফিরছি।
- এই আজি শেষ আর যেতে পারবা না বললাম। দরকার হলে না খেয়ে থাকবো, তবুও।
সেই মিছিলের সব খবর জেনে গেছে শেফালী, সবাইকে জানিয়ে দিতে চায় ও।
- খবরদার বউ। হুশিয়ারি দিয়েছিল সরফুদ্দিন।
- আর ক'দিন মুখ বন্ধ রাখবা তুমি? সবাই জানুক, সবাই চিনুক ওদের।
- খামখা একটা ঝামেলা কেন ক্রিয়েট করতে চাও বউ। এগুলো হলো পলিটিক্স বুঝেছ।
- তোমাকে যে ওরা টাকা দিয়ে ভাড়া করে নিয়ে যায় এটা জানুক সবাই। প্রেসক্লাবে ভাড়া করা লোক থাকে, রাস্তায় ভাড়া করা লোক থাকে, অনশনে থাকে, জনসভায় থাকে, এটা সবাই জানুক। সবাই বুঝুক। চিনুক ওদের। -আকুতি জানিয়েছিল শেফালী।
- চিনলে কী হবে? জানলে কী হবে? বুঝলে কী হবে? জিজ্ঞেস করেছিল সরফুদ্দিন। পরপর। সপ্রশ্নে তাকিয়েছিল ওর দিকে।
- জেগে উঠবে সবাই। -খুব সরল গলায় বলেছিল শেফালী।
সরফুদ্দিন বিকৃত হেসেছিল। সে জানে ওদের কিচ্ছু হবে না। ওদের কিছু হয় না। কেউ জেগে ওঠে না। ওদের চেতনার মৃত্যু
ঘটেছে তাই ওরা এখন আর জেগে ওঠে না। নিশ্চুপ ঘুমিয়ে থাকে। বস্তুত জেগে ওঠেনি হাসপাতালের কোনো একজন রোগী আর তাদের স্বজনরা। শেফালী প্রাইভেট হাসপাতালে
ছিলো অনেকদিন, ওদের ব্যাবসা জেনে গেছে সে। সেবা? ঘেঁচু, টাকা সব। কশাইখানা। ওদের অনিয়ম শেফালী আজও ভুলতে পারেনি তাই হয়ত ঘৃণা ধরে গেছে। সবকিছু স্পষ্ট চোখে ভাসে ওর। ঘুমোলে আরও স্পষ্ট
হয়। বুঝতে পারে সরফুদ্দিন। ঘুমোতে পারে না শেফালী, স্রেফ হত্যা বলে ও। মানুষগুলোর চাপা আর্তনাদ শুনতে পারে আজও। হত্যা, তোমরা হত্যা করেছো, তোমরা একেকজন মস্তবড় একেকটা হত্যাকারী- প্রলাপ বকে চলে শেফালী। ঘুমিয়েও বকে ও।
সরফুদ্দিন ধমক দেয়। শেফালী এই শেফালী, কী যা তা বলছো?
ঘন শ্বাস নেয় শেফালী, তখন ওর বুক ওঠানামা করে, শরীর ঘাম ছাড়ে। তারপর ধীরে চোখ মেলে ও। উঠে বসে।
- হত্যা! কে কাকে হত্যা করলো বউ? কার কথা বলছো?
- হত্যা করে ওরা। ওরাই করলো। এইতো আমার সামনে করলো।
- কারা? তারা কারা বউ।
শেফালী যেন হোঁচট খেয়ে ওঠে। সামলে নিয়ে বলে, পানি, আমাকে একটু পানি দাও। আমি পানি খাবো।
সরফুদ্দিন দৌঁড়ে গিয়ে পানি আনে। ও ঢকঢক করে মুখে টেনে নেয় সবটুকু। হাঁপিয়ে ওঠে। তারপর ধীরে শান্ত হয়। সরফুদ্দিন ওকে শুইয়ে দেয়, শিশুদের মতো শুয়ে থাকে ও। সরফুদ্দিন ও'কে আদর করে, কপালে চুমু এঁকে দেয়, ঠোঁটে দেয়, তারপর সমস্ত শরীরে। নিভাঁজ সুখে ভরিয়ে তোলে ও'কে। যে সুখের নেশায় একদিন সব ছেড়ে চলে এসেছিল ও। কিন্তু সরফুদ্দিন কি সুখী করতে পেরেছে ও'কে? আজ সে হিসাব নয়, শেফালী মাথা নাড়ে। ভুলে যায় সবকিছু; সুখে ভুলে থাকে ও, কিন্তু তা সীমিত সময়ের জন্য। শেফালীর ওর বাচ্চাটার কথা মনে হয় তখন। ডুকরে কেঁদে ওঠে ও। হঠাৎ বাচ্চাটার কী যেন হলো! পায়খানা, জ্বর, বমি, তারপর চোখ উল্টে গেল, মুখটা নীল হয়ে এলো। দৌঁড়ে হাসপাতালে নিয়েছিল শেফালী, কত পয়সা যে ওই কসাইখানায় ঢাললো ওরা অথচ শেষমেশ বাঁচলো না। বাঁচতো ও, কিচ্ছু হতো না, থাকলে অনেক বড় হতো আজ- শেফালী বিশ্বাস করে। সেই কথাগুলি বলে দিতে চায় ও। কী ঘটেছিল সেই রাতে সব জানে শেফালী শুধু একবার চিৎকার করে জানিয়ে দিতে চায় সবাইকে।
হয়তো মানুষ কখনও জাগবে না।
হয়তো ওদের কিচ্ছু হবে না; ওরা বেঁচে যাবে; ওরা তো এভাবেই বেঁচে যায়; রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, মুদ্রানীতি ওদের বাঁচিয়ে রাখে; আর বাঁচিয়ে রাখে দুর্ভিক্ষ, মহামারি, বন্যা, সাইক্লোন। তবু একবার শেফালী জানিয়ে দিতে চায় সবাইকে।
সরফুদ্দিন বলল, ঘোমটা টানো বউ।
শেফালী টানলো না।
সরফুদ্দিন আবার বলল, ঘোমটা টানো বউ।
এবার শেফালী অস্ফুটে বলল, না।
- কী করতে চাও তুমি?
- বলতে চাই। আমি সব বলতে চাই।
- কাকে বলবা?
- যারা শুনবে। যাদের এখনও মৃত্যু হয় নি।
- যদি তারা আর কেউ না থাকে?
- তবুও বলবো।
- কাদের সাথে?
- ফুটপাতে বলবো, গাছেদের সাথে বলবো, পাখিদের সাথে, বিদ্যুৎ পিলারের সাথে, আর ঐ ময়লার বাক্সের সাথে।
- ওরা কি শুনবে?
- অবশ্যই শুনবে। আমি চেঁচিয়ে বলবো। ওদের শুনতেই হবে। আমি চেঁচিয়ে গলা চিরে
ফেলবো, তারপর হড়হড় করে রক্ত বমি করবো, আর সেই রক্তবমি যারা শুনবে না, যারা শুনতে চাইবে না, যারা চির-বধির, যারা চির-অন্ধ, যারা চির-মৃত একে একে তাদের গায়ে ছুড়ে মারবো। রক্তে ডুবিয়ে ফেলবো ওদের।
- তারপর?
- তারপর মরে যাবো।
সরফুদ্দিন স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে। বৃষ্টি তখনও থামেনি, সরফুদ্দিন ও তার বউ ভিজে গেছে। কিন্তু এ বৃষ্টি তাদের রক্তমাংসের শরীর ভেদ করে ভিতরে যে একটা দাবানল সৃষ্টি হয়েছে সেখান অবধি পৌঁছাতে পারে নি। ভেতরটা দাউদাউ করে পুড়ছে তখন। গনগন করছে আগুন। চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে। কিন্তু পুড়ছেই।
সরফুদ্দিন বলল, গাড়িতে ওঠো বউ।
- যাবে?
- চলো যাই।
- কোথায় যাবে?
- প্রেসক্লাবে।
- সেখানে যদি কেউ না আসে?
- তবে রাস্তায় দাঁড়াবো।
- তখনও কেউ যদি না শোনে।
- তবে আবাসিক এলাকায় যাবো, কলকারখানার সামনে, প্রয়োজনে চায়ের দোকানে, লঞ্চ ঘাটে, টার্মিনালে, স্টেশনে।
- চলো যাই।
সরফুদ্দিন ও তার বউ একসময় প্রেসক্লাবে হাজির হলো। একে একে হাজির হলো সাংবাদিক, সুশীল, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক, শিল্পী, কবি, সেবিকা, ক্যামেরাম্যান, গোয়েন্দা, কেরানি আর যারা রাস্তায় শুয়ে থাকে তারাও। কী বলে সরফুদ্দিনের বউ?
কী বলতে চায় সে? চারিদিক চাপা গুঞ্জন। সরফুদ্দিন চুপটি দাঁড়িয়ে রইলো একটি কথাও বললো না। শেফালী মুখ খুলতে শুরু করলো। ও হলুদ মিলের আটা ভেজালের খবর জানিয়ে দিলো সবাইকে। মিছিলে লোক ভাড়া করার খবর দিলো।হাসপাতালের খবর দিলো।
চেঁচিয়ে বললো শেফালী, চাপা আক্ষেপ থেকে বললো, হয়ত অন্তরের দাবানল থেকে বললো শেফালী। কিন্তু সেই দাবানলে আর কারো অন্তর পুড়লো কিনা তা জানা গেলো না। সবাই চুপ শুনে গেলো। 

"আশিকুর রহমান বিশ্বাস যশোরের ছেলে। বর্তমানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসন বিভাগে অধ্যয়নরত আছেন। আগামী বইমেলাতে তার ‘এক নক্ষত্রের নিচে’ নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হবার কথা রয়েছে।”

এক নক্ষত্রের নিচে..............................আশিকুর রহমান বিশ্বাস (ঈদ সংখ্যা ২০২০)

এক নক্ষত্রের নিচে..............................আশিকুর রহমান বিশ্বাস (ঈদ সংখ্যা ২০২০)


আশিকুর রহমান বিশ্বাস


অতঃপর সন্ধ্যা নেমে গেল
পৃথিবীর সব ভূখণ্ডে
এইখানে -
এখুনি।
আমরা রয়ে গেছি উত্তরসূরি হয়ে
রয়ে গেছি ক'জন মিলেমিশে।
ঢের পথ আছে বাকি এখনো - এইখানে
শ্যামল - ধূসর - বালুকাময়;
আমরা রয়ে গেছি উত্তরসূরি হয়ে
রয়ে গেছি ক'জন বেদনার নীড়ে
এক নক্ষত্রের নিচে।
অথচ আমাদের কত ব্যবধান
কতটা পথ রয়েছে বাকি
চিনি নাকো কিছু, জানি নাকো আর
বিপুলা এ পৃথিবী, বিস্ময় কত, কে আছে কার!

মনা চোর...............................আশিকুর রহমান বিশ্বাস (ঈদ সংখ্যা ২০২০)

মনা চোর...............................আশিকুর রহমান বিশ্বাস (ঈদ সংখ্যা ২০২০)
না'র বয়স বেড়েছে ঢের। বয়সের ভারে তার লিকলিকে শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকিয়ে এসেছে। দিনের চকচকে আলোয় সে এখন ঝাপসা দেখে। দিঘলীর মরা কপোতাক্ষ দেখলেও তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভয়ে ধুক-ধুক করে ওঠে। অথচ একসময় সে এই কপোতাক্ষ একদমে পার হতো সাঁতরিয়ে। নদ পার হলেই হরিপুর গ্রাম। হরিপুর গ্রামের পূর্ব পাড়ায় ঠিক নদের কোল ঘেঁষে মনার বাস। ভাঙা বাঁশের চাটাইয়ের একটা পুরনো ঘরে সে এখন একা থাকে। বউটা গলায় ফাঁস দিয়ে মরেছিল তাও বছর দশের আগের কথা। তার মাস দুয়েক পর খুব শক্ত ভাবেই বিয়ের ঝুল তুলেছিল সে, উঠেপড়ে লেগেছিল সেবার। কিন্তু তার সাথে মেয়ে দিবে কে? অত্রাঞ্চল জুড়ে লোকে তাকে ডাকে মনাচোর নামে। একমাত্র ছেলে সেও তো মায়ের মৃত্যুর পর তাকে ছেড়ে চলে গেছে গ্রামবাসীদের গঞ্জনা সইতে না পেরে। মনার এখন কোনো উপার্জন নেই; এমনকি তার দিকে কেউ সাহায্যের হাতও বাড়িয়ে দেয় না। অথচ কীভাবে যে তার দিন চলে সেই প্রশ্নে উৎসুক জনতা আবার চায়ের দোকান মাতিয়ে রাখে তাও গভীর রাত অবধি। কেউ বলে: তার ঘরের নিচে থরে থরে সোনাদানা, এমনকি নগদ টাকা পয়সা পর্যন্ত পোঁতা আছে, এখন সেগুলো সে মাটি খুঁড়ে তোলে আর খরচ করে। কেউবা বলে: ওগুলো বড্ড বাড়িয়ে বলা তোমাদের। মনার সাথে রয়েছে অদৃশ্যবাদীদের কারবার, তারাই তাকে পালে।
অবশ্য সেসব কথা ফেলে দেবার মত নয়। মনা তার দীর্ঘ চোর জীবনে কখনও কোনোদিন পাবলিকের হাতে ধরা পড়েনি। এমনকি তাকে চুরির মাল ঘরে আনতেও দেখি নি কেউ। এই পেশায় তার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় নি। সে মাটিতে খেঁজুর পাতার মাদুর বিছিয়ে শোয়। চোখে পড়ার মতো তেমন কিছু তার ঘরে নেই। পিতলের থালাটা, টিনের একটা গ্লাস, মাটির দুটো হাড়ি আর ভাঙা কড়াইটা নিয়ে তার সংসার। একটা ঘুণেধরা আলনা ছিলো তাও বছর দুই আগে ভেঙে পড়েছে। অথচ সে এক প্রতিষ্ঠিত চোর। কয়েক দশকের চুরির অভিজ্ঞতা তার। 'মনাচোর' নামটা ছোট বড় সবার মুখে মুখে।
এ নেহায়েত অদৃশ্যবাদীদের কাণ্ডকারখানা। লোকে তাই বলে। বিস্ময়, গুঞ্জন, আর অতিকথা মনা'কে পিছু ছাড়ছে না যেন।

এই অঞ্চলের ভয়ংকর সিঁদেল চোর ছিলো মনা। হ্যাঁ ভয়ংকরই বটে, বাঘা বাঘা সব লোকজনের বাড়ি থেকে সে চুরি করে নিয়ে গেছে নিঃশব্দে। কেউ জানতে পারে নি কোনোদিন। ঘুটঘুটে অমাবস্যায় তার কাজকারবার, জোছনায় পূর্ণ বিশ্রাম। জোছনা রাতে তার চোখ ভেঙে আসে ঘুমে। অমাবস্যায় হাত পা কামড়ায়, চুলকায়, অদ্ভুত এক অস্থিরতায় সারারাত এপাশ ওপাশ করে সে, একদম ঘুম হয় না। তখন ঘর ছেড়ে সে বেরিয়ে আসে বাইরে। চোখদুটি জ্বল জ্বল করে ওঠে তার। আবার কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে।
মনার নাতনিটা তার কাছে থাকতো। মনা তাকে বড় করেছে, কয়েক ক্লাস স্কুলে পাঠিয়েছে, এমনকি যৌবনের শুরুর দিকে বনিয়াদি ঘর দেখে বিয়ে অবধি দিয়েছে তাকে। ছেলেকে তার ভার বইতে হয় নি কখনও। এই নাতনিটাকে বড্ড ভালোবাসে সে। মেয়েটির কিছু হলে যেন আর বাঁচে না মনা। মেয়েটিও দাদার নেওটা। তার সব আবদার এই বুড়ো দাদাটির কাছে। যা কিছু শখ, যা কিছু আহ্লাদ তাও কিনা একসময় দাদার ঘাড়েই চেপে বসে নিঃশব্দে এসে। একবার সে শ্বশুর বাড়ি থেকে এসে কড়া আবদার করে বসল, 'দাদাজান আপনাকে এবার চুরি ছাড়তে হবে।'
মনার চোখ কপালে উঠলো। লাফিয়ে উঠে সে বলল, 'অ্যাঁ, বলিস কী রে! মনাচোর চুরি ছাড়বে!'
মেয়েটি কাঁদো গলায় বলল, 'যদি না ছাড়েন তয় আমি আর ওখানে যাবো না।'
মনা বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। সে তার হাতদুটো চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলল, 'তোকে কি ওরা কিছু বলে?'
ডুকরে কেঁদে উঠলো মেয়েটি। জড়ানো গলায় বলল, 'বলে না আবার? সবাই বলে। বলে, ঐ দেখ চোরের জাত। আরো বলে।'
মনা হাসলো।
'দাদাজান আপনি হাসছেন?'
'সত্যিই তো বলে ওরা।'
মনা আবার হাসে। তার বড় হাসি পায়। চুরিতে তার একটুও অপরাধবোধ জেগে ওঠে না। তার বিশ্বাস সবার সম্পত্তিতে তাদের একটু হলেও হক আছে। সেই হক থেকে সে খানিকটা অংশ দুই-একবছর পর গিয়ে নিয়ে আসে মাত্র।
এখানে দোষের কী হলো? তার শক্ত যুক্তি। এককালে তাদের অনেক সম্পত্তি ছিলো, এখন কিছুই নেই। মামলা মোকদ্দমা, দখলদারিত্ব, রেষারেষি আর দলাদলিতে সব ছেড়ে চলে গেছে একে একে। তার দৃঢ় বিশ্বাস এখন সবাই তাদের সেই সম্পত্তিগুলোই ভোগ করে খাচ্ছে। অবশ্য তার এই বিশ্বাস ভিত্তিহীন। সে যখন গাঁয়ে এই জাতীয় কথাবার্তা প্রচার করে লোকে তখন তার উপর চটে যায়। মারমুখো হয়ে বলে, 'গেলি না তুই এখান থেকে মনা? চোর কোথাকার।'
মনা হাসে। হাসিতেই যেন তার আত্মতৃপ্তি। এই হাসি প্রতিবাদের। এই হাসি তার সব বিশ্বাসের শক্ত ভিত্তি। রাতে ঘুম না এলে গাঁয়ের বউরা যখন স্বামীদের মৃদু তিরস্কার ভাঙ্গিতে বলে, ' আজ এখনও ঘুমাও নি কেনো?'
'ঘুম যে আসে না বউ।'
'মনা এসে ভর করেনি তো? যাবা নাকি একটা দান মারতে?'
মনা তখনও হাসে। হাসতে হাসতে ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হাঁপিয়ে ওঠে সে। হাঁপানিটাই এখন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল সে সামান্য হাঁটলে হাঁপিয়ে ওঠে, উচ্চস্বরে কথা বললে হাঁপিয়ে ওঠে, এমনকি হাসলেও।
মনা তার অবস্থান থেকে সরে এলো। নাতনির কথা না রেখে পারলো না সে। একদিন সকালে সে তার নাতনিকে কথা দিলো, আজ থেকে আর চুরি করবে না। নাতনি খুশিতে কেঁদে ফোললো সেদিন। মনা তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,'তোকে যে আমি কত ভালোবাসি জানিস?'
'জানি।'
মনা ম্লান হেসে বলল, 'জানিস না। তুই সেটা জানিস না।'
মেয়েটি বিস্ময়ে তাকালো দাদার দিকে। মনা বলল, 'আমিও জানি না। পাল্লায় কি তা মাপা যায়? যায় না।' মনা মৃদু মাথা নাড়লো বারকয়েক।
মেয়েটি এবার ফিক করে হেসে দিলো। মনার মুখেও হাসির রেখা দেখা দিলো।

কিন্তু মনাকে শেষ বয়সে এসে সংগ্রাম করতে হলো। এক শানকি ভাতের জন্য সংগ্রাম, একদিন বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম। এক জীবনে সে চুরি ছাড়া আর কিছুই শেখেনি। কিন্তু নাতনিকে সে কথা দিয়েছে চুরি করবে না। কখনো না, কোনোদিনই না। সংগ্রাম সে করবে, দিনরাত সংগ্রাম করবে। মনার ঘুৃম হয় না রাতে। সারারাত সে নিজের সাথে কথা বলে। সে-ই বক্তা, সে-ই আবার শ্রোতা। নিজেকে সে জিজ্ঞেস করে, 'মনারে চুরিটা তুই ছেড়েই দিলি?'
'নাতনি যে শোনে না। লোকে মন্দ বলে।'
'তোর সারাজীবনের সাধনা। ছাড়লি। পেট পোড়ে না?'
'পোড়ে। সারারাত পেট পোড়ে আমার।'
বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে মনা। এরপর অনেকক্ষণ বাইরে হাঁটাহাঁটি করে সে। ঘরের কাঁথা কম্বল, পিতলের থালা, মাটির কলসটা একবার বাইরে - একবার ঘরে, আবার বাইরে, আবার ঘরে- এভাবেই করে সে। কিন্তু তৃপ্তি তার কিছুতেই আসে না। এভাবে তার অতৃপ্ত আত্মা ধীরে ধীরে ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো হয়ে উঠে। তামাম দুনিয়াটা সে চুরি করতে চায় একদিন।

এক অমাবস্যায় তার বড্ড চুরির সাধ জাগে। চোখে সেই রাতে সে স্পষ্টই দেখতে পায়। গায়ে শক্তি ফিরে আসে। মনার মন বলে সে যৌবনকালের মত আজও সাঁতরে পার হতে পারবে কপোতাক্ষ। চিন্তা করে জীবনের শেষ চুরিটা আজ সে করবে। নাতনিটা তার কাছেই আছে। সন্তানসম্ভবা সে। অসুস্থ শরীরে সে বেরিয়ে এসে দাদাকে বাঁধা দেয়। পূর্বের প্রতিজ্ঞা মনে করিয়ে দিয়ে বলে, 'দাদাজান আপনি কথা দিয়েছিলেন।'
'আজ তুই বাধা দিস না। আমি কারো কথা শুনবো না আজ।'
'আমার কথাও না?'
'না।'
মনার শক্ত গলায় নাতনি হতভম্বের মতো হয়ে যায়। সে সত্যিই জানেনা তার দাদাজান তাকে কতটা ভালোবাসে। পাল্লা থাকলে আজ সে মাপতে পারতো। মেপে দেখতে পারতো। সেদিনের কথা মনে হয় তার, মনা বলেছিল, 'জানিস না, তুই সেটা জানিস না'।
মনা বেরিয়ে পড়ে। হরিপুর ছাড়িয়ে কপোতাক্ষ সে পার হয়। সাঁতরিয়েই পার হয় সে, কিন্তু একদমে পারে না, হাঁপিয়ে ওঠে।

অমাবস্যার অন্ধকারে জোনাকিপোকার দলও যেন ভয়ে পালিয়েছে আজ রাত্রে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না চারিদিক। শুনশান নীরবতা। মনা দেখতে পাচ্ছে, স্পষ্টই দেখছে সবকিছু। আজ সে বেঁকিয়ে হাঁটছে না, যৌবনে যেমন হাঁটতো আজও তেমন হাঁটছে। হেঁটেই চলেছে সে। দিঘলী ছাড়িয়ে কাংশারীপুর গ্রামে ঢুকলো মনা। মাঝ রাত তখন। হঠাৎ তার গা টা ভয়ে ছমছম করে উঠলো। পেছন ফিরে তাকালো সে। একবার। কিছুপর আরো একবার। নীরবতা, অন্ধকার, গুমোট বাতাস চারিদিক। কিছুই দেখলো না।
মনার ভয় বাড়ছে। বুকের ভেতরটা ধুক-ধুক করে উঠছে তার। কেনো উঠছে কে জানে! মনা আবার হাঁটে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। একটা পায়ের আওয়াজ শুনতে পারে সে। তারপর ধীরে ধীরে চোখের সামনে একজন মানুষ স্পষ্ট হয়।
কিন্তু তার মতই দেখতে। একই চেহারা, একই পোশাক। মনা অবাক হয়। ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
'কে তুমি?'
লোকটি গম্ভীর গলায় জবাব দেয়, 'আমি মনা। তুমি?'
'আমিও মনা।'
লোকটি হাসে। হাসতে হাসতে সে বলে, 'মানুষের কি কোনো নাম হয়? হয় না। নাম হয় আত্মার। আত্মা চলে গেলে মানুষ হয় লাশ।'
মনা নির্বিকার ভঙ্গিতে শুধু শুনে যায়। এমন কথা তাকে আগে কেউ শোনায় নি কখনও। কী গাম্ভীরতা বচনে! বাণীতে কী এক আদি সত্য! সে একসময় মুখ ফুটে বলে ফেলে, 'কোথায় যাবে?'
লোকটি বলে, 'তুমি কোথায় যাবে?'
'কোথাও না।'
'আমিও কোথাও না।' তারপর লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, 'আমরা কেউ কোথাও যাবো না জানো।'
মনা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। লোকটি উচ্চস্বরে হেসে আবার বলে, 'অথচ আমরা সবাই মনা। চোর মনা। সবাই আমরা একেক জন মস্ত বড় চোর। তুমি হলে বাইরের, আর আমি ভিতরের টা।' মনা কিছুই বুঝতে পারলো না, শুধুই হতভম্বের মতো লোকটির দিকে তাকিয়ে রইলো। লোকটি আরো আওয়াজ করে হাসছে।
আর কেউ শুনতে পাচ্ছে না।