Showing posts with label সেরা গল্প. Show all posts
Showing posts with label সেরা গল্প. Show all posts

মৃত্যু চুম্বন (সেরা গল্প) ..................মনিরুল ইসলাম জোয়ারদার

মৃত্যু চুম্বন (সেরা গল্প) ..................মনিরুল ইসলাম জোয়ারদার
সময়টাতে রিক্সা পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাড়ায়। সকাল নটা থেকে দশটা সাড়ে দশটা এগারোটা পর্যন্ত রাস্তায় সব ধরনের কর্মজীবিরা নেমে আসে ফলে রিকশা কিংবা সিএনজি পাওয়া খুবই দুষ্কর। দেরি হলে ক্লাশ মিস হয়ে যাবে ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়লো অনুরাধা ব্যানার্জী।ঠিক দশটা চল্লিশে ক্লাশ শুরু,উদ্বিগ্ন হয়ে এদিক ওদিক দেখলো একটা রিকশাও খালি নেই এদিকে দশটা পনের বাজে হঠাৎ মাথায় ঢুকলো পাঠাওয়ের মোটরসাইকেলের কথা কদিন আগে ওর ক্লাশফ্রেন্ড মলির কাছে শুনেছিল সে মাঝে মাঝে পাঠাও এর মোটর বাইকে ভার্সিটিতে আসে।সেদিনই অনুরাধা পাঠাও এ্যাপটি ডাউনলোড করে নেয়,ভাবলো এসময় কি আর বাইক ফ্রী থাকবে তাছাড়া ভাড়া বাইকে চড়তে ওর সঙ্কোচ বোধ হয় ভয়ও লাগে কি জানি কে কি মনে করে কিংবা কোন বিপদে পড়ে যায় কিনা।আজ সে উপায়ান্ত না দেখে কল করলো এবং প্রায় সাথে সাথে কল পেল ওপাস থেকে বললো আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আসছি।ঠিক সাত মিনিটের মধ্যেই মোটরবাইক চলে এলো বললো হেলমেটটা পরে নিন স্পষ্ট আকর্ষনীয় স্বর শুনে মন্ত্রমুগ্ধের মত দুপা একদিকে দিয়ে বাইকারের পেছনে বসলো,বাইকার এবার সেই একই স্বরে বললো প্লিজ দু'দিকে পা দিয়ে বসেন পুলিশ ঝামেলা করে অনুরাধা ইতস্তত করছে দেখে বাইক চালক বললে ঠিকাছে একদিকেই পা দিয়ে বসেন অনুরাধা দু'পা একদিকে দিয়ে বসে পড়লো ঠিক ক্লাশের দশ মিনিট পূর্বেই ক্যাম্পাসে চলে এলো।নেমেই বললো কত দিতে হবে চালক মুচকি হেসে বলে কেন ম্যাডাম এ্যাপসেতো ভাড়া শো করছে দেখে নিন আর আমাকে একশো দশ টাকা দিন।অনুরাধা সরি আমি এখনো অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি তাই দেখা হয়নি।একটা দুশো টাকার নোট বের করে দিলো।চালক বহু কষ্টে মানিব্যাগ এবং এ পকেট ও পকেট হাতড়ে ভাংতি বের করে নব্বই টাকা ফেরত দিলো।অনুরাধা ভেবেছে পঞ্চাশ টাকা ফেরত দিলেই হবে কিন্তু পুরো নব্বই টাকা ফেরত দেওয়াতে অবাকই হয়ে বললো আমাকে পঞ্চাশ টাকা দিন বাকিটা রেখে দিন চালক আবারো মৃদু হেসে দৃঢ় কন্ঠে বলে ম্যাডাম উহু এটা আমি নেইনা আপনি টাকাটা রাখুন বলে নব্বই টাকাই ফেরত দিলো। অনুরাধা টাকাটা হাতে নিয়েই ছুটতে শুরু করলো আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি আছে অর্থাৎ বেশ দ্রুতই চলে এসেছে,ভাবছে রিক্সায় এলে তিন তিন বার রিক্সা বদল করতে হতো ভাড়া পড়তো একশো কুড়ি টাকা আর সিএনজিতে এলে পুরো দুশো টাকা তবেতো মোটার বাইকে আসা বেশ সাশ্রয়ী।
জুনায়েদ সাইড স্ট্যান্ড নামিয়ে বাইকটাকে কাত করে দাড় করিয়ে হেলমেটটা খুলে মেয়েটির গমন পথের দিকে এক পলক দেখেই তার গলা দিয়ে অপুর্ব শব্দ বের হয়ে এলো ঠিক তখনি আরেকটা কল এলো,বাইক নিয়ে সেদিকে চলে গেল জুনায়েদ।
কিরে রাধা কার বাইকে এলি শুরু হয়ে গেল নাকি?ছেলেটা বেশ হ্যান্ডসাম কেমনে কি খুলে বল দেখি। ধ্যাত কি শুরু করলি ওতো পাঠাওয়ের বাইক চালক দ্রুত আসার জন্য ভাড়ার বাইকে চলে এলাম।ও আচ্ছা বলে রিমি বললো চল ক্লাশে ঐ যে স্যার আসছে।
ক্লাশ শেষে মলির সাথে দেখা মলি সবসময় ক্লাশের সামনের বেঞ্চে বসে ওর বাসা ভার্সিটি থেকে দু কিমি হবে তাছাড়া মলি নিজেদের গাড়িতেই আসা যাওয়া করে ফলে বেশ আগে আগেই ক্লাশে এসে সামনের বেঞ্চে বসতে পারে এমনিতেই মলি দারুণ স্মার্ট ও ভার্সাটাইল,ভার্সিটির যে-কোন কার্যক্রমে তাকে থাকতেই হবে।এদিকে অনুরাধার বাসা বেশ দূরে থাকায় ওর আসতে প্রায়ই দেরি হয়ে যায় 
ফলে তাকে পেছনের বেঞ্চেই অধিকাংশ সময়ই বসতে হয়।আজ ক্লাশ শেষে অনুরাধা পেছন থেকে এসে মলিকে জড়িয়ে ধরতেই মলি তাকে প্রশ্ন করে কিরে রাধা কি শুনলাম? রাধা অবাক হয়ে মলিকে বলে কেন কি হয়েছে? খুলে বল। শুনছি তুই নাকি কারো প্রেমে পড়ে তার বাইকে ঘুরছিস? অনুরাধা হো হো করে হেসে উঠে বললো তুই যেমন মাঝে মাঝে প্রেমে পড়িস তেমনি। ও আচ্ছা তাহলে এই বিষয় এদিকে ক্লাশের সবার মুখে রটে গেছে তুই প্রেমিকের বাইকে ঘুরসিছ হা হা হা!
মলি অনুরাধার বেস্ট ফ্রেন্ড দূজনে দু'জনার মনের কোনের সব কথাই শেয়ার করে এরা দু'জন ছাড়াও রিমি ছন্দা আলিশা শোয়েব রুপম এরাও ওদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তবুও মলি আর অনুরাধার ঘনিষ্ঠতা সবারই জানা।ক্লাশ শেষে খানিকটা আড্ডা মেরে ওরা ফিরে গেল।
পরদিন একই অবস্থা রিক্সা সিএনজি কোনাটাই খালি পাওয়া যাচ্ছে না আজ মনে হয় আরো ভিড় বেশি, আজ অনুরাধা সাড়ে ন'টায় বের হয়েছে তাই ভাবলো রিক্সা নেবে কিন্তু একটা রিক্সাও খালি নেই একটু দূরে একটা খালি রিক্সা দেখে ডাক দিতেই আরেক ভদ্রলোক লাফ দিয়ে চড়ে বসলো কি আর করা আবার অপেক্ষা কিন্তু যেই প্রায় দশটা বাজে বাজে অবস্থা তখনি তার হুঁশ হলো ফলে আজো পাঠাওয়ের শরণাপন্ন হলো একটু পর কল দিলে দু'মিনিট আমি আসছি আপনি কি কৃষ্ণ চুড়া গাছের নিচে আছেন?জি আমি ওখানেই আছি। ঠিক দু মিনিটের ভেতর বাইক হাজির,ম্যাডাম হেলমেটটা পরে নিন।কোন কথা না বলেই হেলমেট মাথায় দিয়ে পেছনে বসে পড়লো অনুরাধা সময়ের বেশ আগেই পৌছে গেল ক্যাম্পাসে বাইক থেকে নেমেই মোবাইলে এ্যাপস দেখলো একশো তিন টাকা সে ব্যাগ থেকে একশো তিন টাকাই বের করে চালকের হাতে দিয়েই ছুটলো ক্লাশের দিকে বাইক চালক আজ আর না থেমেই ঘুরিয়ে চলে গেল।অনুরাধা যখন বাইকে উঠে তখনই বুঝেছিল এ লোকটাই গতকালের একই চালক।এভাবেই কয়েকদিন একই মোটর বাইকে যাবার পর অনুরাধার মনে হলো প্রতিদিন একই চালকের বাইকে চড়া ঠিক হচ্ছে না।পরেরদিন সকাল সকাল বের হয়ে একটা সিএনজি নিয়ে ভার্সিটিতে চলে এলো।
আজো কোন কল না পেয়ে জুনায়েদ ভাবলো মেয়েটির কি কোন অসুখ হলো! ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা অনুভব করছে সে। এভাবেই তিনটে দিন কেটে গেল চতুর্থ দিনে জুনায়েদ মেয়েটির কল না পেয়ে নিজেই কল করলো মেয়েটি ইতস্তত করেও কলটি ধরলো।নাম্বারটা অনুরাধার মুখস্থই হয়ে গেছে ও বুঝতে পেরেও জিজ্ঞেস করলো কে বলছেন
-আমি পাঠাও এর বাইক চালক 
-ও আচ্ছা আমিতো ভার্সিটিতে চলে এসেছি
-ও কাল কি যাবেন?
-কালকের বিষয় কালকে আচ্ছা প্রতিদিন আপনি একাই আসেন কেন শুনেছি অনেক বাইক রাস্তায় থাকে?
-না মানে আমিতো পাসেই থাকি তাই। 
-ও আচ্ছা তবে আপনি কি আর কোন প্যাসেঞ্জার নেন না।
-নিই তবে তিন চারটা এর বেশি না। 
ও আচ্ছা ঠিকাছে, বাই।
পরেরদিন রাস্তায় বেরুতে দেরি করে ফেললো অনুরাধা তাড়াতাড়ি যাবার জন্য পাঠাওয়ে কল করলো দ্রুতই চলে এলো জুনায়েদ বাইকের পেছনে বসে চলে এলো ভার্সিটিতে। অনুরাধা বাইক থেকে নেমে হাত ঘড়ি দেখলো এখনো পঁচিশ মিনিট বাকি প্রথম ক্লাশের।প্যান্টের পকেট থেকে লম্বা ছয় ইঞ্চি পার্সটা বের করে দুশো টাকার নোটটা বাইক চালক জুনায়েদের হাতে দিলো।জুনায়েদ ইতস্তত করে বললো 
-আমার কাছে ভাংতি নেই ঠিকাছে আপনি একশো টাকা দেন। 
-আমার কাছেতো একশো টাকার নোট নেই। 
-ও ঠিকাছে তাহলে কাল দিবেন।
-আমি কারো কাছে ঋণী থাকতে চাই না। 
-ও 
-আপনি ভাংতি নিয়ে বের হন নাই?
-আসলে গতকাল বের হয়নি তাই,হাতে যা ছিল খরচ হয়ে গেছে।
-তো দুতিনটে ভাড়াতে আপনার সংসার চলে?
জুনায়েদ তবুও এ পকেট সে পকেট খুঁজতে লাগলো। 
-আসলে আমার এত পয়সার দরকার নেই পড়াশোনা শেষে করেছি এখন কাগজপত্র জোগাড় হলেই দেশের বাইরে চলে যাবো। তাই ভাবলাম যে কদিন আছি পকেট খরচটা উঠিয়ে নিই বারবার বাবার কাছে টাকা চাইতে লজ্জা লাগে তাছাড়া বাইরে যেয়েতো অডজব করে চলতে হবে সেই কারণে লজ্জটাকে জলাঞ্জলি দিতে প্রাকটিস করছি। 
অনুরাধা তন্ময় হয়ে যুবকটির কথা শুনছে আর মনে মনে প্রশাংসা করছে।অনুরাধা তাকে জিজ্ঞেস করলো
-কোন ভার্সিটিতে পড়েছেন?
-আপনার এই ভার্সিটিতেই।
-বলেন কি কোন সাবজেক্টে? 
-মাইক্রোবায়োলজিতে।
-কবে শেষ করলেন?
-এইতো গত বছর।আপনি কোন সাবজেক্টে?
-বিবিএ,ম্যানেজমেন্টে এবার সেকেন্ড ইয়ারে। 
-তাহলে যাই আপনি টাকাটা পুরোই রেখে দেন কাল চড়লে শোধ হয়ে যাবে।
-এটা কেমন দেখায় না?
-কি এমন দেখাবে যেহেতু কারো কাছেই নেই তাছাড়া আপনি আমাদের ভার্সিটির সিনিয়র ভাই একটু সুযোগতো দিতেই হয় মুচকি হেসে আসি বলে হাটা দিলো।দুপা হেটেই ঘাড় কাত করে জিজ্ঞেস করলো আপনার নামটা বলবেন প্লিজ? 
-জুনায়েদ।
অনুরাধা আর একমুহূর্ত না থেমে হনহন করে হাটতে লাগলো ওদিকে রিমি মলি ছন্দা অপেক্ষা করছে।
জুনায়েদ টাকাটা নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবলো আজ হাজার খানেক টাকার খউব দরকার। টাকাটা পকেটে রেখে বাইক স্ট্রাট দিলো।
অনুরাধা জুনায়েদের সাথে ভাড়া নিয়ে কথা বলছিল যখন, তখন দূর থেকে শোয়েব ছন্দা রিমি অনুরাধার দিকে তাকিয়ে ছিল।অনুরাধা কাছে আসতেই ওকে ছেকে ধরলো কিরে বাইকওয়ালার সাথে এত কথা বলছিলি কি ব্যাপার।নারে উনার কাছেও ভাংতি নেই আমার কাছেও নেই তাই ব্যাগে খুজঁতে খুঁজতে দেরি হলো। ক্লাশ শেষে মলিকে বললো চলতো সাইন্স ফ্যাকাল্টিতে মলি বললো কেনরে যাবি ওখানে?একটু কাজ আছে বলেই হাঁটতে হাঁটতে মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্টের অফিসে ঢুকে চেয়ারে বসে থাকা অফিসারকে জিজ্ঞেস করলো গত বছর পাস করে বের হয়েছে এমন স্টুডেন্টের খোঁজ কিভাবে পেতে পারি ম্যাডাম? মহিলাটি বললো এখানেই, কেন? বলেই গত বছরের রেজিস্ট্রার খাতা বের করে জিজ্ঞেস করলো নাম কি? অনুরাধা বললো জুনায়েদ। মলি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে অনুরাধার দিকে চেয়ে রইলো।অফিসারটি খাতাটা বন্ধ করে বললো ও জুনায়েদ সেতো দারুণ মেধাবী ছেলে ফার্স্ট ক্লাশ সেকেন্ড হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান স্কলারশিপও যোগাড় হয়ে গেছে তাঁর এ ডিপার্টমেন্টের সবারই প্রিয় সে, টিচারদের ফেবারিট স্টুডেন্ট আবার হেভি হ্যান্ডসামও বলে মুচকি হাসি দিয়ে অনুরাধার দিকে চেয়ে বললো বিয়েটিয়ের ব্যাপার নাকি? এরকম ছেলে কিন্তু লাখে একটা হয়। অনুরাধা হ্যা এরকমই বলে তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে মলির হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে এলো মলিতো বিশ্ময়ে কিছুই জিজ্ঞেস করতে ভুলেই গেছে যেন।
পরদিন কল দিলেই জুনায়েদ চলে এলো বাইকে উঠতে উঠতেই অনুরাধা জিজ্ঞেস করলো অস্ট্রেলিয়ার কোন ভার্সিটিতে স্কলারশিপ পেয়েছেন?জুনায়েদ বাইক স্ট্রাট দিলেও হ্যান্ডব্রেক চেপে ধরে পেছন ফিরে অনুরাধার দিকে বিশ্ময়ে চেয়ে বললো আপনি জানলেন কিভাবে?
-হুম জানতে পারলাম।
-গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করেন নাকি?
-ধরুন তাই। 
-ওরে বাবা তাইলে তো আমার সবই জেনে গেছেন?
-তা অনেক কিছুই জেনেছি বটে তবে এখন চলেনতো।জুনায়েদ বাইক ছেড়ে দিল পনের মিনিটের মধ্যেই ক্যাম্পাসে চলে এলো।আজ বেশ খানিকটা আগেই এসেছে অনুরাধা, এখনো প্রায় এক ঘন্টা বাকি ক্লাশের। এখনো বন্ধুরা কেউ আসেনি।বাইক থেকে নেমেই জুনায়েদকে জিজ্ঞেস করলো কই বললেন নাতো কোন ভার্সিটিতে পড়তে যাবেন?
-অস্ট্রেলিয়ার কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে। 
-বাহ্ ওটাতো খুউবই ভালো ইউনিভার্সিটি তা কবে যাচ্ছেন? 
-সব রেডি হলে সামনের মাসে বলে জুনায়েদ বাইক স্ট্রাট দিলো চলে যেতে যেতে অনুরাধা বললো বারে টাকাটা নিবেন না?
-গতকাল বেশি নিয়েছি আজ নিবো না।চলে যায় জুনায়েদ। অবাক হয়ে মোহগ্রস্তের মত তাকিয়ে থাকে।
এখন প্রায় প্রতিদিনই জুনায়েদের বাইকে ভার্সিটিতে যায় গল্প করে এভাবেই ওদের মধ্যে ধীরে ধীরে ভালবাসা জন্মায় তা প্রেমে গড়িয়ে যায় ভুলে যায় ওরা দু'জন দু ধর্মের মানুষ।ভুলে যায় ওদের পারিবারিক সংস্কৃতি। কিছুই ভাবেনা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি।ভালবাসায় মনের আরো কাছে চলে আসে দুজনে।ওরা সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার এবং দু’তিনজন বন্ধুদেরকে নিয়ে কাজী অফিসেই বিয়েটা সেরে ফেলে তবে বিয়ের খবর কেউ ফাঁস করে না।ওরা সিদ্ধান্ত নেয় চেষ্টা করবে দুজনেই অস্ট্রেলিয়ায় যাবে একত্রে যদি অনুরাধা ভিসা না পায় তবে জুনায়েদ যাবার পর অনুরাধা দ্রুত যাবার চেষ্টা করবে। জুনায়েদের যাবার সময় হয়ে এলো দু সপ্তাহ পর ফ্লাইট। সব রেডি অনুরাধার মন ভীষণ ভীষণ খারাপ এর মধ্যেই বিভিন্ন দেশে করোনা দেখা দিয়েছে লকডাউন শুরু হয়েছে বাংলাদেশেও লকডাউন শুরু হলো জুনায়েদের যাওয়া হলো না।দুজনের দেখাও হয় না প্রতিদিন তবে মোবাইলে কথা চলে ঘন্টার পর ঘন্টা হঠাৎ একদিন জুনায়েদ কল করেও পায়না অনুরাধাকে জুনায়েদ বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় পরদিন ফোন করে কেউ ধরে না তবে কি অনুরাধার পরিবার জেনে গেছে বিয়ের কথা আর তাই তাকে মোবাইল থেকে দূরে রাখছে! তৃতীয় দিন ফোন করতেই রিসিভ হলো ওপাস থেকে কথা বলার আগেই জুনায়েদ অবিরাম বলতে লাগলো কেন ফোন ধরছো না,কেন দুদিন কথা বললে না তুমি জাননা তোমার কন্ঠ না শুনলে আমর মরে যেতে ইচ্ছে করে হঠাৎ মনে হলো ওদিক থেকে চাপা কান্নার শব্দ হ্যালো হ্যালো কি ব্যাপার কাঁদছো কেন অনু কি হয়েছে রাধা? ফুপানো শব্দে ওপাস থেকে বললো আমি রাধার মা বলেই আবার কান্না কয়েক সেকেন্ড পর আবার কান্না জড়িত কণ্ঠে বললো বাবা রাধাকে গতকাল ভোরে হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে ওর অবস্থা ভালো না ও না বাঁচলে আমি কি নিয়ে বাঁচবো!তুমি জুনায়েদ? জি বলে জুনায়েদ জিজ্ঞেস করে কোন হসপিটালে? রাধার মা হসপিটালের নাম বলতেই জুনায়েদ কল কেটে দিয়ে মোটর বাইক নিয়ে সোজা হসপিটালে।রিসিপশনে জিজ্ঞেস করলো অনুরাধা নামে একটা মেয়ে ভর্তি হয়েছে কোন ওয়ার্ডে।ছয় ফিট দূরত্বে কাচ দিয়ে ঘেরা নতুন রিসিপশনের ভেতর থেকে পুরো শরীর পিপিই দিয়ে ঢাকা লোকটি বললো ডান দিকে যেয়ে পেছনে করোনার জন্য আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে তবে ওখানে কাওকে যেতে দেওয়া হয় না।জুনায়েদের কানে কোন কথা ঢুকলো না সে সোজা করোনা ওয়ার্ডে চলে এলো ওখানে দু'জন গার্ড দাড়িয়ে সে কাছে যেতেই ওরা হই হই করে উঠলো বললো দূরে যান দূরে যান যদিও ওর হাতে গ্লাভস মুখে ডাবল মাক্স তবু্ও। জুনায়েদ তার হাতের গ্লাভস খুলে গেটের দিকে যেতেই গার্ড দু'জন ইলেকট্রক শক খাবার মত ওর কাছ থেকে দূরে ছিটকে সরে গেলো ও ভেতরে ঢুকে খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেল অনুরাধাকে কাছে যেতেই একজন নার্স দৌড়ে এলো বললো এখানে ঢোকা নিষেধ ঢুকলেন কিভাবে নার্সের কথা না শুনে বসে পড়লো অনুরাধার বেডে।অক্সিজেন চলছে প্রায় নির্জীব শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে কারো বসার অনুভবে চোখ মেলে চাইলো অনুরাধা।ইতোমধ্যে একজন ডাক্তার ও দু'জন নার্স ওর দুদিকে পাঁচ ফিট দূরে ওকে ঘিরে দাড়িয়ে আছে। জুনায়েদ অনুরাধার দিকে একটু ঝুকলো ইয়াং ডাক্তার কড়া ধমক দিয়ে বললো আপনি সরে যান এক্ষুনি নইলে পুলিশ ডাকবো সিনিয়র নার্স বললো সরে যান প্লিজ আপনারও নিশ্চিত করোনা হবে। হলে হোক বলে অনুরাধার করুণ মুখের দিকে আরেকটু ঝুকলো জুনায়েদ। অনুরাধার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে দুহাত দিয়ে জুনায়েদকে জড়িয়ে ধরে কাঁপছে সে তার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে ।আর সহ্য করতে পারছে না জুনায়েদ ভাবছে অনুরাধার কষ্টটা ভাগ করে নেবে নিজে। সে এক হাতে একটানে নিজের মাক্স টেনে ছুড়ে ফেলে দেয় তা দেখে অনুরাধাও নিজের মুখে লাগানো অক্সিজেন মাক্সটি খুলে ফেলে,জুনায়েদ ঝটকরে অনুরাধার ঠোটে ঠোট লাগিয়ে গাঢ় চুম্বনে তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়।ইতোমধ্যে তাদের চারিদিকে আরো দু'জন গার্ড এসে দাড়িয়েছে নবীন ডাক্তারটি গার্ডদ্বয়কে যুবকটিকে টেনে আনতে বলে গার্ডদ্বয় একটু এগুতেই সিনিয়ার নার্স হাতের ইসারায় ডাক্তারকে না করে মুখে বলে থাক এখন আর লাভ নেই যা হবার হয়ে গেছে ছেলেটি অলরেডি এফেক্টেড।জুনায়েদ চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দিলো অনুরাধাকে তার চোখেও পানি গড়িয়ে পড়ছে অনুরাধাকে বলছে তোমাকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকা নিষ্ফল মরলে দু'জনে এক সাথে মরবো বাঁচলে একসাথে।সিনিয়র নার্সের চোখেও জলের ধারা নেমে আসছে তাঁর মনে পড়লো হার্ট এ্যাটাকে আক্রান্ত তাঁর স্বামী তাঁকে এভাবেই শেষ চুম্বন দিয়েছিলো।
এরপর যুবক যুবতীটির কি হয়েছিল কেউ খোঁজ করেনি কেউ তাঁদের খবর রাখেনি এই প্যান্ডামিকের সময় প্রতিদিন অসংখ্য লোকের মৃত্যু হচ্ছে কে কার খবর রাখে হয়তো তাঁরা দু'জন মৃত লাশের গননায় পড়েছে কিংবা সুস্থতার তালিকায়ও পড়তে পারে লেখক সে খোঁজ নিতে পারেনি।

বন্ধু আমার..............................নাজমুল জুবায়ের (সেরা অনুগল্প)

বন্ধু আমার..............................নাজমুল জুবায়ের (সেরা অনুগল্প)

কেমন আছ প্রিয়,

মাত্র ২৪ টা পূর্নিমা তিথিতে তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছে কথা হয়েছে। বাকি দিনগুলো আমাবস্যার রাতের মতোই আমার কাছে অন্ধকার ছিল। অন্ধকারে তোমাকে খুজতে খুজতে কখন যে অন্ধকার ই আমার কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে তা জানা নেই। যে জগতে তোমার বিচরণ সেই জগতে আমি নেই, যে জগতে আমার বিচরণ সেই জগতে তুমি নেই। অথচ পূর্নিমা তিথি আসলেই আমার জগতে তোমার আনাগোনা। ব্যাপারটা যে ইলিউশনস তা আমি জেনেও না জেনে থাকি। তবে আমি এটাও জানি যে এটাকে বলা হয় Self created Reality যেখানে তুমি না থাকা সত্তেও মনে হবে এইত তুমি আমার পাশেই। একটি বছর হয়ে গেল অচিনপুরে তোমার। ওয়াও ট্রিট কি দিবে না নাকি?
সেইদিনটাও ছিল বৃহস্পতিবার। ঘড়ির কাঁটায় ১টা ছুই ছুই, এমন সময়ে অচেনা নাম্বার থেকে কল এসে জানান দিল যে চন্দ্রলোকের অচিনপুরে তুমি আমাকে না জানিয়েই চলে গেছ। তুমি তো দেখি ভারি দুষ্ট একটাবার বল্লেও তো পারতে হাসপাতালে এসে আমাকে দেখে যাও,আমি না হয় তোমার উপর অভিমান করেছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে বললে না কেন তুমি লাস্ট স্টেজে আছ?
আমাকে না বলে চলে যাওয়ার প্ল্যান করেছিলে বুঝতে পেরেছি।
বাহ রে তোমার অনেক কথাই তো দেখি এখন সত্যি, তুমি বলেছিলে আমার কোন প্রকৃত বন্ধু থাকবে না তাই হচ্ছে দেখি। সবাই মনে করেছে আমি তোমাকে ভুলে গেছি, কিন্তু তারা তো জানে না পূর্নচাদের দিনে তোমার আমার দেখা হয়, বকুল তলায় তোমার কাধে মাথা রেখে সারারাত গল্প হয়।
আচ্ছা তাড়াতাড়ি একটা সিমকার্ড নিয়ে নাও না ওখানকার, তারপর আমাকে রোজ রাতে কল দিবে আমি নির্ঘুম রাত তোমার সাথে কথা বলব।
ধ্যাত আজকে তোমাকে আর কিছু বলতে পারতেছি না, বড্ড ঘুম পাচ্ছে। আচ্ছা শোন সামনের পূর্নিমায় আসবে কি?
আসলে আমাকে বলে যেও কিন্তু আমি কবে আসতে পারব তোমাদের চন্দ্রলোকের অচিনপুরে।এই জগতে না আমার আর ভালো লাগতেছে না। সবাই কেমন যেন পর হয়ে যাচ্ছে। আমি কারো চেহারা চিনতে পারতেছি না, মনে হচ্ছে চোখের সামনে কিসের যেন একটা পর্দা টানানো। তবে এবার আসলে কিন্তু আমাকে নিয়ে যেতেই হবে তা না হলে কিন্তু আমি রাগ করব। তোমার হাতটি ধরে কোন এক অন্ধকার রাতে আমিও চলে আসব অচিনপুরে। কেউ আর এই জগতে আমাকে খুঁজে পাবে না।
আচ্ছা আমি তৈরি হয়ে থাকব। এখন তবে একটু ঘুমুতে যাই।
ভালো থেকো বন্ধু।


গুপ্তধন................................রাকিব সামছ শুভ্র (সেরা গল্প)

গুপ্তধন................................রাকিব সামছ শুভ্র (সেরা গল্প)

হু কাঙ্ক্ষিত আম্মার ট্রাংকটা আজ খোলা হবে। আমরা চার ভাইবোন আম্মার ঘরে জড়ো হয়েছি। সবাই ভীষণ উত্তেজিত এবং অস্থির বোধ করছি। একান্ন বছরের পুরনো ট্রাংক তবে তালাটা এতো পুরনো না। তালার বয়স বড়জোড় বছর চারেক হবে। ছোটদা লুকিয়ে তালা ভাঙতে গিয়ে আগের তালাটা নষ্ট করে ফেলেছে। কিন্তু ট্রাংক খোলার আগেই ধরা পড়ে গিয়েছিলো। তখন নতুন তালা লাগানো হয়।

আমরা চার ভাইবোন। আমি সবার ছোট। বড়দা তারপর আপা এরপর ছোটদা। বড়দা বেশ গোবেচারা টাইপের। মাস্টার্স করে আমাদের শহরেই একটা কলেজে পড়াচ্ছেন। সবাই প্রফেসর আজিম নামেই ডাকে তাকে। বড়দা দুই মেয়ের বাবা, রুনু ভাবি স্কুলে পড়ান। আলো আপা ভয়ঙ্কর সুন্দরী একেবারে আম্মার ডুপ্লিকেট। মাঝে মাঝে ভাবি আপা কী ডাবল পার্ট করছেন নাকি? দুলাভাই ব্যবসায়ী,পয়সাওয়ালা বাড়ি গাড়ির অভাব নাই। আপারা এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে থাকেন কুমিল্লায়। ছোটদাও ব্যবসা করে কিন্তু কেন যেন খুব একটা ভালো করতে পারে না। দু-দিন লাভ করলে পাঁচ দিন লস করে। ঝুমু ভাবি ডাক্তার তাই ছোটদার উঠানামায় ভারসাম্য ধরে রাখেন। ছোটদাদের এক মেয়ে।

আর আমি? আমার নাম আঁখি। স্বামী হাসিব আর্মিতে মেজর। হাসিবের পোস্টিংয়ের জন্য আমার নির্দিষ্ট কোন শহরে থাকা হয়না। কখনো খাগড়াছড়ি আবার কখনো সিলেট এখন অবশ্য কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে আছি। হয়তো বছর খানেক এখানে থাকবো তারপর আবার তল্পিতল্পা গুটিয়ে নতুন জায়গায়। আমাদের একটাই ছেলে নাম রুদ্র।

আমাদের দাদাবাড়ী মাদারীপুর হলেও আব্বা তার চাকুরী জীবনের প্রায় পুরোটাই কাটিয়েছেন চাঁদপুরে। ডিসি অফিসে হেডক্লার্ক ছিলেন। আম্মা চাঁদপুরেরই মেয়ে তবে বড় হয়েছেন চট্রগ্রামে। ১৯৬৯ সালে আম্মা আব্বার বিয়ে হয়। আব্বা মারা গিয়েছেন প্রায় এগারো বছর। আম্মা আমাদের ছেড়ে গেছেন মাত্র একচল্লিশ দিন আগে। আম্মার চল্লিশা আয়োজন করতেই আমরা সবাই চাঁদপুরে এসেছি।

আব্বা আম্মার বিয়েটাও হয়েছিলো অদ্ভুত ভাবে। নানাজান কোন এক কাজে ডিসি অফিস (তখন অবশ্য সাব ডিভিশনাল অফিস ছিলো) এসেছিলেন। আব্বার ব্যবহার আর চেহারা দেখে সরাসরি নিজের মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেন। নানাজান অবশ্য বলেছিলেন তার মেয়ে শিক্ষিত, ভদ্র, সংসারী তবে গায়ের রঙ বেশ চাঁপা। আব্বা আম্মাকে না দেখেই বিয়েতে রাজি হয়ে যান। বিয়ের রাতে বাসর ঘরে আম্মাকে প্রথম দেখে আব্বা নাকি ভুত দেখেছেন। ভয়ংকর রূপবতী একজন মানুষ তার বিছানায় বসা! তার চিৎকারে বাসার সবাই বন্ধ দরজার সামনে হাজির। আব্বা দরজা খুলে দাদীকে নাকি বলেছিলেন, ওই বাড়ির লোকেরা ভুল করে অন্য মেয়ে দিয়ে গেছে! এক যাচ্ছেতাই অবস্থা। গভীর রাতে নানাজানকে খবর দেয়া হয়। লোকজন সমেত উনি আমাদের বাড়িতে আসেন। সব বুঝিয়ে বলার পর আব্বা ঠান্ডা হন। নানাজান আব্বাকে পরীক্ষা করার জন্য মেয়ে কালো বলেছিলেন। আসলে আম্মার গায়ের রঙ ছিলো দুধে আলতা। 

আব্বার বেতন খুব বেশী ছিলোনা কিন্তু সবসময়ই চাইতেন আম্মা সেজেগুজে পরিপাটি থাকুক। আম্মাও নিজের মতো করে সংসারটা গুছিয়ে নিয়েছিলেন। আব্বার কেনা শহরের এক কোনে বাস স্ট্যান্ডের পাশে পাঁচ শতাংশের জমিটায় তিনরুমের বাসা আব্বা আম্মার সারাজীবনের সঞ্চয়ে গড়ে উঠা ভালোবাসার প্রাসাদ। 

বিয়ের কদিন পরেই আব্বা আম্মাকে একটা কালো রঙের ট্রাংক কিনে দিলেন। আম্মা সযতনে তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলো ওই ট্রাংকে রেখে দিতেন। আম্মা কখনো আমাদের সামনে ট্রাংক খুলতেন না। ঘরের দরজা বন্ধ করে ট্রাংক খুলতেন আবার তালা লাগিয়ে চাবি সড়িয়ে রাখতেন। ছোটবেলায় বহুবার জিজ্ঞেস করেছি, আম্মা ট্রাংকে কি আছে একবার দেখাবে? কখনোই দেখাতে রাজি হয়নি৷ খুব চাপাচাপি করলে বলতো, গুপ্তধন, মহামূল্যবান  জিনিস এর মধ্যে রাখা আছে। আমার সারা জীবনের সবচেয়ে দামী সঞ্চয় এর মধ্যে রক্ষিত আছে। 

আমাদের চার ভাইবোনের কেমন যেন একটা আকর্ষন অথবা লোভও বলা যায় ছিলো ট্রাংকটার উপরে। আব্বাও আম্মাকে বলতেন, তোমার এই যক্ষের ধন তুমি না থাকলে সামলাবে কে? 

আম্মা কোন উত্তর দিতোনা। অদ্ভুত একটা হাসি দিতো আর আমাদের গা জ্বলতো। আম্মা গহনা তেমন পরতোনা তাই আমাদের সবার ধারণা, ট্রাংকে নিশ্চয়ই আম্মা সব গহনা রেখে দিয়েছে। আরো না জানি কতো কিছু আছে?

আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে যাবার পর আম্মার ট্রাংকের প্রতি দরদ আর যত্ন আরো বেড়ে গিয়েছিলো। দরজা আটকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রাংক নিয়ে বসে থাকতো। আমরা এমনকি নাতিনাতনিরাও ওই সময় ঘরে ঢুকতে পারতাম না। এতে আমাদের ধারণা আরো বদ্ধমূল হলো, ট্রাংকে অমূল্য ধনরত্ন আছে। শুনেছিলাম নানাজান আম্মাকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর অনেক দামী উপহার দিয়েছিলেন। সেসবও মনে হয় ওই ট্রাংকেই রাখা। 

চার বছর আগে ছোটদার ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ যাচ্ছিলো। একদিন আম্মা পাশের বাসায় গিয়েছে এমন সময় ছোটদা আম্মার ঘরে খাটের নীচ থেকে ট্রাংক বের করে তালা ভাঙার চেষ্টা করছিলো। ঠিক ওই সময় ভাবি চলে আসায় আর ভাঙতে পারেনি। আম্মা বাসায় এসে খুব কেঁদেছিলো। ছোটদাও খুব লজ্জা পেয়েছিলো। আম্মার পা ধরে কান্নাকাটি করায় ক্ষমা পেয়েছিলো সাথে আম্মার কোলে আশ্রয়। ছোটদা ছোটকাল থেকেই একটু ডানপিটে ধরনের। একমাত্র আম্মা ছিলো ওর শেষ আশ্রয়স্থল। যত ঘটনাই ঘটাক আম্মার কোলে ঠিকই জায়গা করে নিতো। মানুষ হিসেবে কিন্তু ছোটদা অসম্ভব দিলখোলা। খরচের হাতও বেশ বড়। ধুমধাম খরচ করতে ওর চেয়ে পারঙ্গম কেউ নেই।

আব্বা মারা যাবার কিছুদিন আগেই তার রেখে যাওয়া বাড়ি এবং জমি চার ভাইবোনের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে দিয়ে গেছেন। এতে অবশ্য কারো কোন আপত্তি ছিলো না। কিন্তু সবারই চোখ রয়ে গেছে আম্মার ট্রাংকের জিনিসের দিকেই। আম্মা মারা যাবার আগের রাতে বড়দাকে ডেকে বললো, বাবা আমি চলে গেলে তোমরা ট্রাংকটা খুলে তোমাদের যার যা পছন্দ নিয়ে নিও। ট্রাংকটা ফেলে দিওনা, ঘরের এক কোনে কোথাও ফেলে রেখো। আমার খুব প্রিয় এবং ভালোলাগার সম্পদ। 

আম্মা হুট করেই চলে গেলেন। আমরা কেমন হঠাৎ করেই এক বিশাল শূন্যতায় আবদ্ধ হলাম। আমাদের সব কিছু আছে আবার কিছুই নেই। অদ্ভুত একটা বিষয় হলো, যেই ট্রাংকের ভেতরের জিনিসের জন্য আমরা বুভুক্ষু ছিলাম, আম্মা চলে যাওয়ার পর সেই ট্রাংক খোলবার কথা কারো মনেও আসলো না। আমরা চার ভাইবোন কান্না পেলেই ট্রাংকটা ছুঁয়ে আম্মার ছোঁয়া নিতে চাই। 

যে যার মতো নিজেদের শহরে চলে গিয়েছিলাম। আম্মার চল্লিশা আয়োজন করতে বাড়ির সবাই আবার চাঁদপুরে এসেছি। খাওয়াদাওয়ার পরে সবাই আম্মার ঘরে বসে কথা বলছি। এমন সময় হাসিব কথাটা পারলো। আম্মাতো অনুমতি দিয়েছেন তার ট্রাংক খুলতে, আমরা খুলে দেখতে পারি না? কেউই আগ্রহ প্রকাশ করলো না। অথচ এর ভিতরে কী আছে তা নিয়ে গত চল্লিশ বছরের অপেক্ষা আজ কেমন হালকা হয়ে গেছে। তারপরও সবাই একমত হলাম, খুলে অন্তত দেখি!

পরদিন নাস্তারপর সবাই আম্মার ঘরে জড়ো হয়েছি। বড়দা খাটের নীচ থেকে ট্রাংক বের করলো। চাবি হাতে নিয়ে তালায় ঢোকানোর সময় হাত কাঁপছে। আমরা ভিতরে অস্থিরতা বাহিরে প্রকাশ করছিনা। ট্রাংকের ঢাকনা খুলতেই দেখতে পেলাম ছোট ছোট কাগজের অনেকগুলো প্যাকেট। বড়দা প্রথম প্যাকেট নিয়ে তা খুলতেই যা বের হলো তার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না।

একটা বহু পুরনো আলতার শিশি। আলতা নেই শুধু লালচে দাগ রয়ে গেছে শিশিতে। সাথে ছোট্ট একটা কাগজে লেখা ওর দেয়া প্রথম উপহার। একান্ন বছর আগের একটা তারিখ।
আরেকটা প্যাকেট খুলতেই বের হলো একটা টিপের পাতা যাতে একটাই টিপ অবশিষ্ট রয়েছে। বিয়ের তারিখ লেখা সাথের কাগজে।
পরের প্যাকেটে পাওয়া গেলো একটা মেরুন রঙের পার্কার কলম। কাগজে লেখা বাবার দেয়া সবচেয়ে দামী উপহার। ম্যাট্রিকুলেশনে ভালো ফলাফলের পরে পাওয়া।
বের হলো বড়দার প্রথম জুতো জোড়া, আপার প্রথম জামা, ছোটদার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মার্বেল (বাবার হাতে কতো মার খেয়েছে এই মার্বেল খেলার জন্য), আমার কাঁচের ফিডার, বাবার বিয়ের রুমাল, দাদার টুপি, নানিজানের পানের বাটা, আমাদের চার ভাইবোনের প্রথম পরে যাওয়া দাঁত। আরো অনেক কিছুই বের হলো ট্রাংক থেকে।

আরেকটা জিনিস পাওয়া গেলো, যা আমাদের সবচাইতে বেশী অবাক করেছে, একটা মলাট বদ্ধ খাতা। সেটা ছিলো আম্মার লেখা একটা কবিতার খাতা! আমাদের অতি চেনা আম্মার নতুন আরেকটা দিক আমাদের সামনে উন্মোচিত হলো।

আম্মার এতো প্রিয়রা এই ছোট্ট ট্রাংকে এতোদিন চাপাচাপি করেছিলো! ঐ মূহুর্তে আম্মার রেখে যাওয়া গুপ্তধনেরা আমাদের চার ভাইবোনকে অদ্ভুত ভালোবাসায় জড়িয়ে নিলো। হঠাৎ করেই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী সম্পদের মালিক হয়ে গেলাম আমরা।

কুমারী মা ও একটি ভ্রুন ...............................রহিমা আক্তার মৌ (সেরা গল্প)

কুমারী মা ও একটি ভ্রুন ...............................রহিমা আক্তার মৌ (সেরা গল্প)
রপর বিশ থেকে পঁচিশটা কল করে সাড়া না পেয়ে নাবিলা কয়েকটা খুদেবার্তা পাঠায়।

"প্লিজ রাকিব কল ধরো।"
"প্লিজ রাকিব কল ধরো, জরুরী কথা আছে।"
রাকিব কল ও ধরেনি খুদেবার্তার জবাব ও দেয়নি। গতমাসের ৯ তারিখে নাবিলার পিরিয়ড হয়, এর আগের মাসে ১১ তারিখে, তার আগের মাসে ১৪ তারিখে। এই ভাবে প্রতি মাসে দুদিন করে এগিয়ে আসে বিশেষ দিনটা। কখনও আবার তিনদিনও এগিয়ে আসে। কিন্তু আজ ১০ তারিখেও পিরিয়ড না হওয়ায় চিন্তায় পড়ে ও। আর সে জন্যেই কল করে যাচ্ছে রাকিবকে।
রাকিব রায়হান একসময় রঙিন পর্দার মানুষ ছিলো, এখন সে ব্যবসায়ী। মাঝে মাঝেই ব্যবসা লাটে উঠে, আবার সময় সময় জোয়ারে ভাসে। রাকিবকে দেখলেই বুঝা যায় কখন তার ব্যবসার কি অবস্থা। নাবিলার অফিসের একটা কাজে দুজনের পরিচয়। পরিচয়ের পর প্রেম ভালোবাসা। দুই পরিবারের সবাই জানে ওদের সম্পর্কের কথা। রাকিবের পরিবারের একটা নিয়ম আছে। ছেলেদের অধিক বয়সে বিয়ে করানো। ওর বয়স ২৮ হলেও তার বড় দুই ভাই এখনো অবিবাহিত।

পরিবারের নিয়ম অনু্যায়ী বড় দুজনের বিয়ে হলেই রাকিব বিয়ে করতে পারবে। একজনের বিয়ে ঠিক হয়েছে, অন্যজনের জন্যে দেখাশুনা চলচ্ছে। রাকিবের জন্মদিন ছিলো গতমাসের ২৪ তারিখে। কয়েকজন বন্ধু আর নাবিলা সহ জন্মদিন পালন করে। জন্মদিনের আনন্দ শেষে রাকিব নিজেই নাবিলাকে বাসায় পৌছে দেবার জন্যে বের হয়, ঠিক তখনি মন এলোমেলো হয়ে যায়। পাশের এক আবাসিক হোটেলে চলে যায় দুজন। সারারাত সেখানে কাটিয়ে বাসায় আসে নাবিলা। এদিকে সারারাত নির্ঘুম কাটে ওর বিধবা মায়ের।
ছোট বেলায় ওদের দুই ভাই বোনকে আর ওর মাকে ছেড়ে বাবা নিরুদ্দেশ হয়। তখন ওদের বয়স মাত্র সাত আর পাঁচ। দুই সন্তান নিয়ে নাহার আক্তার গ্রামে চলে যান। সন্তানদের কথা ভেবেই আবার আসেন রাজশাহী শহরে। প্রায় পরেনো বছর পর ওরা বাবার সন্ধান পায়, কিন্তু কেউ কারো দায়িত্ব নিতে রাজি নয়, বা পরিচয় দিতেও রাজি নয়। এভাবে পার হয়ে যায় বছর তিন। গতবছর নাবিলার বাবা মারা যায়, খবর শুনে ওর মা বিধবার পোষাক পরেন। নাকের ফুল খুলে ফেলেন। বলতেই হয় হায়রে বাঙ্গালী নারী, যে স্বামী সন্তান জন্ম দিয়েই নিরুদ্দেশ সেই স্বামী মরার পর নিজেকে বিধবা পরিচয় দিচ্ছো। নাবিলার ভাই বিয়ে করেছে, চাকরির কারণে বউকে নিয়ে অন্য শহরে থাকে। বিকেল বেলায় রাকিব অন্য নাম্বার দিয়ে কল দেয় নাবিলাকে।

-- হ্যালো নাবিলা কেমন আছো?
নাবিলার মুখে কথা নেই, হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। ওপাশ থেকে রাকিব কিছুই বুঝতে পারছে না। বারবার জিজ্ঞেস করে
-- নাবিলা কি হয়েছে তোমার, তুমি এমন করছো কেনো?
জবাব না পেয়ে রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। নাবিলা কাঁদতেই থাকে প্রায় মিনিট তিন। আস্তে কান্না থেমে আসে।
-- নাবিলা এবার বলো কি হয়েছে, খালাম্মার কোন সমস্যা।
-- না, আম্মা ভালো আছে। তুমি কই ছিলে, তোমার মোবাইল কোথায়? সকাল থেকে আমি কত কল দিয়েছি তুমি ধরোনি কেনো?
-- আস্তে বলো। আমায় তো কিছু বলতে দিবে। সকাল ভোরে বের হয়েছিলাম ব্যবসার কাজে। ছিনতাইকারী আমার সব নিয়ে যায়। সেই থেকে আমি বাইরে, প্রয়োজনীয় কিছু কাগজ হারাই, সে জন্যেই দৌড়াচ্ছি। মোবাইলের সিম গুলো ও তোলা হয়নি। আচ্ছা তোমার কি হয়েছে বলো, এমন করে কি কেউ কাঁদে?
-- রাকিব তোমার সাথে আমার জরুরী কথা আছে প্লিজ কালকেই দেখা করো।
-- তুমি বলো কি হয়েছে, কাল তো আমি সিমগুলো তুলতে যাবো। তুমি তো জানোই আমাদের কাস্টমার কেয়ার গুলোর যে অবস্থা। একটা সিম তুলতে দিনের অর্ধেক পার হয়ে যায়।
-- রাকিব তোমার সিমের চেয়ে ও এই বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
-- বলবে তো কি হয়েছে।
-- রাকিব পিরিয়ডের তারিখ তিনদিন পার হয়ে গেছে, আমার পিরিয়ড হয়নি এখনো।
-- পাগল তুমি, কি বলো এসব, হবে না কেন? দেইখো আজ রাতেই হয়ে যাবে। আচ্ছা তুমি কি আমার নাম্বারে কোন খুদেবার্তা দিয়েছো?
-- দিয়েছি, আচ্ছা এখন যে নাম্বার দিয়ে কথা বলছো এটা কার নাম্বার।
-- এটা আম্মুর নাম্বার। তুমি আবার এই নাম্বারে কল দিও না।
-- আচ্ছা তা না হয় দিবো না, কিন্তু আমি কি করবো।
-- তুমি আরো দুদিন অপেক্ষা করো।

এই ভাবে কথা বলে দুজন বিদায় নিলো। একদিকে রাকিব ব্যস্ত নিজের ব্যবসার কাগজপত্রের খোঁজে, অন্যদিকে কঠিন দিন পার করছে নাবিলা। এমন এক বিষয়, কারো সাথেই শেয়ার করতে পারছে না। এক একটা ঘন্টা যেনো এক একটা দিন পার হচ্ছে নাবিলার। কোথাও যাচ্ছে না, খাওয়া দাওয়া করছে না। যে রাতে পিয়ালী বাইরে ছিলো সে থেকেই মা ওর সাথে অন্যরকম আচরন করছে। দুদিন এই ভাবেই কাটিয়ে দেয়। অফিসেও যায়নি। দুদিন পর ঘন্টাখানেকের জন্যে বের হয়। এলাকার বাইরে গিয়ে দোকার থেকে একটা স্টিক কিনে আনে। ১৩ তারিখ ভোরে টেস্ট করে। কিন্তু কোন রেজাল্ট পায় না। রাকিবের সাথে কথা হয়েছে, তবে আগের মতো নয়। ওর একই কথা," হয়ে যাবে হয়ে যাবে"।
১৩ তারিখে অফিস যায়, দুপুর বেলায় লাঞ্চ করতে গিয়ে হঠাৎ শরীর খারাপ হয়, কেমন জানি লাগছে। তবুও অফিসে থাকে। সন্ধার আগে আগে বাসায় আসে। রাকিবকে জানায়।
-- নাবিলা তুমি দুদিন পর আবার টেস্ট করে দেখো।

দুদিন পরে নাবিলা ঘরে টেস্ট করে, রেজাল্ট পজেটিভ। রাকিবকে কল--
-- ঘরের এমন রেজাল্ট ভুল ও হতে পারে নাবিলা, তুমি হাসপাতালে পরীক্ষা করাও।
-- রাকিব আমার কখনো ২/৪ দিন পিছিয়ে যায় না, বরং এগিয়ে আসে। তুমি বলছো আমি করাবো, তুমি আসবে?
-- আমার আসাটা কি ঠিক হবে?
কথাটা নাবিলাকে কষ্ট দেয়। পরে ভেবে দেখে এই সময়ে ওর না আসাই ভালো। আশেপাশের হাসপাতালে গেলে সমস্যা আছে। দুরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে।
হাসপাতালে পরীক্ষা করতে দিয়ে আসে নাবিলা। আজ রিপোর্ট দিবে, রাকিবকে আসতে বলেছে নাবিলা। ঠিক সময়ে রাকিব চলে আসে। একটা ফাস্টফুডের দোকানে ওরা বসবে বলে ঠিক করা আছে। নাবিলা রিপোর্ট নিয়ে এসেছে। দুজন মুখোমুখি বসা। রাকিব তাকিয়ে আছে নাবিলার মুখের দিকে, আর নাবিলা তাকিয়ে আছে নিজের হাতে থাকা হাসপাতালের খামের দিকে।

এটা এখন শুধু একটা খাম নয়, একটা ভ্রূণের আগমনের খবর। পৃথিবীর এক অনাগত নবজাতকের খবর। রাকিব কি কথা দিয়ে শুরু করবে আজ ভেবে পাচ্ছে না। নাবিলার চোখ থেকে টপ করে একফোঁটা পানি পড়ে খামের মাঝে। রাকিব দেখতে পেয়ে বলে উঠে--
-- নাবিলা রেজাল্ট কি?
-- পজেটিভ।
-- কি করবে ভেবেছো?
-- আমি একা কি ভাববো, আমি জানতাম এমনি কিছু হবে। সেজন্যেই তোমায় ডাকা। রাকিব আমি ঘরে থাকতে পাচ্ছি না, অফিস যেতে পারছিনা। মায়ের মুখোমুখি হতে পারছিনা। সেদিনের পর থেকে মা আমার সাথে ঠিক মতো কথাও বলছে না। তুমি বলো আমি এখন কি করবো।
-- নাবিলা তুমি তো জানো এই মুহূর্তে বিয়ের কথা বাসায় বলা যাবে না। আর এমন খবর জানলে আমাকে বাড়ি থেকেই বের করে দিবে। কোথায় গেলে এই কাজ করা যাবে খোঁজ নাও। প্রয়োজনে আমিও যাবো তোমার সাথে। যে ভাবে হোক বেশিদিন পার হবার আগেই----
নাবিলা খামটা ব্যাগে ঢুকিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। রাকিব একবার ও ভাবেনি নাবিলা এখন চলে যাবে। নাবিলা কিছুই বলছেনা। সোজা বেরিয়ে আসে। রাকিব পেছন পেছন আসে, কিন্তু নাবিলা একবার ও পেছনে তাকায় নি।

ভাবছে রাকিবের মা কে কল করে সব বলে দিবে, আগত সন্তানকে সমাজে পরিচয় দিবে। কিন্তু রাকিব যে এমন করছে। দুদিনে নাবিলা একবার ও কল করেনি রাকিবকে। রাকিব অনেকবার কল করেছে, কল ধরেনি ও। অফিসের নাম্বারে কল করছে, অফিস থেকে জানিয়েছে নাবিলা অফিসে যায় নি। মা ওকে অনেক ধরণের প্রশ্ন করে, কোন জবাব নেই ওর মুখে। ২০ তারিখে নাবিলা একটা হাসপাতালে যাবে, আগে হাসপাতালের নার্সের সাথে কথা হয়েছে। একটা আল্ট্রাসোনোগ্রাম করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। নার্স বলে দিয়েছে সব। রাতে নাবিলা কল করে রাকিবকে--
-- কাল সকাল ১১ টায় তুমি ওভারব্রিজ এর পাশে এসো, আমি তোমায় নিয়ে হাসপাতালে যাবো।

-- কালকেই যেতে হবে নাবিলা, তোমায় কত কল করেছি, তুমি ধরো নি। আমি ব্যবসার জন্যে শহরের বাইরে। প্লিজ তুমি কালকে একাই যাও, আমি পরশু চলে আসছি, তখন যা করার আমি করবো।
নাবিলা কথা বাড়ায় না, কল কেটে দেয়। অফিসে যাবার সময়েই বাসা থেকে বের হয়, মাসের ৩ তারিখে বেতন পেয়েছিলো। বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে সব বকেয়া পরিশোধ করেছে। হাতে যে টাকা তা দিয়ে যাতায়াত খরচ আর টুকটাক সারতে হবে বেতন পাওয়া পর্যন্ত। এতো কিছু হিসাব করলে এখন হবে না। হাসপাতালে পৌছানোর আগেই নার্সের সাথে আবার কথা হয়।ডাক্তার দেখানো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে আজ আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়ে গেলো। ডাক্তার তারিখ দিয়েছে ২২ তারিখে এসে কাজ সারতে হবে। সব মিলিয়ে দশ হাজার টাকা লাগবে। ২২ তারিখে করতে হলে আজই ওকে একটা ইনজেকশন দিতে হবে। সব মিলিয়ে সেদিন ঘন্টা চার ওকে হাসপাতাল থাকতে হবে। নাবিলা ইনজেকশনটা দিয়ে সোজা পার্কে যায়। পাকা একটা বেঞ্চিতে বসে থাকে বিকেল পর্যন্ত। অফিস ছুটির সময় বাসায় ফেরে। আজ ওকে অন্য রকম লাগছে। চেহারায় কোন উচ্ছ্বাস নেই, মলিন এক অন্য নাবিলা। ঘরে ঢুকতেই মা ওকে আগলে ধরে।

-- তোর কি হয়েছে, আমায় বল।
কোন কথা না বলে নিজের রুমে চলে যায় নাবিলা। রাতে খাওয়ার সময় রুম থেকে বের হয়। টেবিলে খাবার রাখা, মা বারান্দায় গিয়ে বসে আছে। নাবিলা মায়ের কাছে যায়।
-- মা মরিচ পিয়াজ বেশি করে দিয়ে আমায় একটা ডিম ভেজে দিবে। খুব খেতে ইচ্ছে করছে।
মা ডিম ভেজে দেয়, নাবিলা আজ অনেক গুলো ভাত খেয়ে মায়ের পাশে ঘুমাতে যায়। মাঝে মাঝেই ওরা একসাথে ঘুমায়। নাবিলার একটা হাত মায়ের পেটের উপর দেয়া, অন্য হাত নিজের পেটে দেয়া। সারারাত কল্পনা করে কাটিয়ে দেয় ও।

সকালে অফিস যাবার আগে রাকিবকে কল দিয়ে সব জানায়। রাকিব সব শুনে চিন্তা করতে নিষেধ করে। টাকার কথা জানালেই রাকিব বলে--
-- আপাতত তুমি কারো কাছ থেকে হাওলাত নাও, আমি পরে দিয়ে দিবো।
-- আমি কোথায় পাবো টাকা, তুমি টাকাটাও দিতে পারবে না। রাকিব সব কি আমার দায়?
বলেই লাইন কেটে দেয়। মিনিট ১০ পরে ওর মোবাইলে খুদেবার্তা আসে-
"আমি কাল ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় থাকবো। পুরোটা সময় তোমার পাশেই থাকবো। "

ঘর থেকে বের হবার আগে মায়ের কাছে যায় নাবিলা। নিজেই জানে মায়ের কাছে কোন টাকা থাকে না। নাবিলার ছোট বেলার দুটি আংটি আর দুই জোড়া কানের দুল আছে মায়ের কাছে। শত অভাবে এই জিনিসটুকু আগলে রেখেছেন মা।
-- মা আমায় একজোড়া কানের দুল দিবে। সময় হলে আমি আবার তোমায় দিয়ে দিবো।
মা কোন কথা না বলে রুমে যায়, এক জোড়া দুল এনে মেয়েকে দেয়।
-- এগুলো তোর, তোর জিনিস তোকে দিতে আমার কোন আফসোস বা সংকোচ নেই। ভালো কাজে লাগাস, এটুকুই বলবো।
নাবিলার খুব ইচ্ছে করছিলো মা কে জড়িয়ে ধরে বলতে--
"মা এর চেয়ে ভালো বা খারাপ কাজ পৃথিবীতে আছে কিনা আমার জানা নেই।"
পাথরের মূর্তির মতো নাবিলা জিনিসটা নিয়ে বের হয়। অফিসে কল করে জানিয়ে দেয় আসতে একটু দেরি হবে। আগে যায় জিনিস বিক্রি করতে। বিক্রি করে সাড়ে এগারো হাজার টাকা পায়। এরপর অফিস যায়। বিকেলে অফিস থেকে সোজা বাসায় আসে। আজো ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খায়। আজ নাবিলা একা ঘুমায়। মাঝরাতে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে, স্বপ্নে দেখে ওরা মা মেয়ে হাত ধরে সাগরের পাড়ে হাটছে। বড় বড় ঢেউ আসে, ও মায়ের হাত শক্ত করে ধরে। জেগে গিয়ে নাবিলা ভাবনায় বসে, তার মানে ওর গর্ভের অনাগত সন্তান এক কন্যা শিশু। সাথে সাথে রাকিবকে খুদেবার্তা পাঠায়--

"তুমি কি এই শহরে এসেছো। কাল দশটায় ওভারব্রিজ এর পাশে দাঁড়াবে, আমি তোমায় তুলে নিয়ে যাব।"
মিনিট খানেকের মাথায় ফিরতি বার্তা আসে-
"আমি এসেছি ঠিক সময়ে আমি থাকবো।"
নাবিলার খুব ইচ্ছে করছে রাকিবের পাশে যেতে, ওর কোলে মাথা রেখে একটু ঘুমাতে। মুহূর্তে ইচ্ছেটা মরে যায়, বুঝতে পারে না কি থেকে কি হতে যাচ্ছে। এই সময়ে নিজেকে শান্ত রাখতে হবে এটা বুঝতে পারছে।

সকাল সকাল উঠে রেডি হয়, মা নিজেই ডিম ভাজি করে নাবিলাকে গরম গরম ভাত দেয়। খেয়েদেয়ে বের হবার সময় মা বলেন--
-- আজ এতো তাড়াতাড়ি বের হচ্ছিস। আচ্ছা যা, ভালো ভাবে ফিরে আসিস। আমি জানি তুই খারাপ কিছু করতে পারিস না, আমি আছি তোর সাথে সুখে দুঃখে।
কিছু না বলে বের হয়ে যায় নাবিলা। ভাবে, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ কাজ। মনে মনে বলে -

"মা এই মুহূর্তে দোয়া ছাড়া আর কিছুই চাই না। ভালোবেসে এক মুহূর্তের আবেগকে আয়ত্বে রাখতে না পেরে আমি যে খারাপ কাজটি করেছি। তাকে মাটিচাপা দিতে পরিবার সমাজ আর এই পৃথিবীর মাঝে নিজেকে ভালো মেয়ে হিসাবে পরিচয় দিতে আর রাখতেই আজ আমি অজানার পথে পা বাড়াচ্ছি মা। যে সন্তানের পিতৃত্বের পরিচয় নেই সমাজে, যে সন্তানকে সমাজ অবৈধ বলে মা, সে সন্তানকে আমি রাখবো কি করে বলতে পারো মা। যাকে ভালোবেসে সব দিয়েছি সে ও আজ অনেক দুরে, বুঝতে পারছিনা এটা কি ওর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নাকি সে পরিস্থিতির স্বীকার।"
ঠিক সময়ে রাকিব আসে, দুজন একসাথে যায় হাসপাতালে। যে পথটুকু একসাথে ছিলো, কেউ কারো সাথে কিছুই বলেনি। হাসপাতালে গিয়ে নার্সের সাথে রাকিবকে পরিচয় করিয়ে দেয়। রাকিব ওর স্বামী নাকি অন্যকিছু হয় তা বলেনি। কাজ খুব দ্রুত হচ্ছে। নার্স বলেছে দুই ঘন্টা নাবিলাকে ভেতরে থাকতে হবে, রাকিব বাইরে অপেক্ষা করবে ততক্ষণ। অতীত আর ভবিষ্যতের কথা ভাবার সময় নেই নাবিলার। নার্সের সাথে ভেতরে চলে যায়।

চোখ খুলে দেখতে পায় একটা এসি রুমে শুয়ে আছে নাবিলা। মনে পড়ে স্কুল জীবনের কথা, তখন ও গ্রামে থাকতো। উপরের ক্লাসের বিথীর পেট বড় দেখে অনেকে অনেক কথা বলেছে। এক পর্যায়ে দশ মাসের সন্তান প্রসব করার জন্যে বিথীর মা দুরের এক আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে যায় বিথীকে। জীবিত হয়ে জন্ম নেয়া শিশুকে ওরা গলা টিপে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়েছে। ঘটনা দুরে হলেও পরে সবাই জেনে যায়।
মনে পড়ে পাশের বাড়ীর ইয়াসমিনের কথা। দাম্পত্য জীবনে কলহ বলে ইয়াসমিন থাকতো নানার বাড়ীতে। একরাতে ওর স্বামী বাবর এসে ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে মিলিত হয়। হবার সময় প্রতিরোধক হিসাবে কনডম ব্যবহার করে। সেই মিলনে ইয়াসমিনের গর্ভে সন্তান আসে। গর্ভের সন্তান যখন আট মাস তখন সব জানাজানি হয়। বাবর সেদিনের ঘটনা অস্বীকার করে। সমাজ ইয়াসমিনকে চরিত্রহীন বলে, সে আঘাত সইতে না পেরে ইয়াসমিন আত্মহত্যা করে। ইয়াসমিনের মৃত্যুর পর বাবর স্বীকার করে সে সন্তান তার নিজের ছিলো। সে রাতে বাবর ইয়াসমিনের সাথে মিলিত হয়েছে। ইয়াসমিন জানে ওরা কনডম ব্যবহার করেছে, আসলে বাবর কনডম ব্যবহার করলেও তা নিজে ফুটো করে নেয়।

একটা ঠান্ডা রুমে শুয়ে কত কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে না রাকিবের মুখটা। নার্স আসে কিছু কথা বলে ওদের বিদায় দেয়। বের হয়েও রাকিবের সাথে কোন কথা নেই নাবিলার। বাসায় আসে দুপুরের পর। দিনের বাকি সময় রুমেই থাকে নাবিলা। নিজের বর্তমানের হিসাব মিলায়, বিথীর মতো অবস্থায় তাকে পড়তে হয়নি। ইয়াসমিনের মতো অকালে নিজেকে শেষ করতে হয়নি। সমাজ কখনোই জানবে না আজ নাবিলা একটা ভ্রুণকে হত্যা করে এসেছে। এই পৃথিবীর আলো দেখার আগে, বাতাস অনুভব করার আগেই তাকে হাসপাতালের ডাস্টবিনে ফেলে এসেছে। কোন কুকুর নিশ্চই বুঝবেনা এটা এক মানব সন্তানের ভ্রুণ ছিলো। কেউই জনতে পারবে না আজ এক কুমারী মা হওয়া থেকে বেঁচে গেলো।