Showing posts with label ভ্রমন কাহিনী. Show all posts
Showing posts with label ভ্রমন কাহিনী. Show all posts

নীল নির্জনে...................সেমন্তী ঘোষ

নীল নির্জনে...................সেমন্তী ঘোষ
প্রকৃতির বিমূর্ত বিচিত্র রূপ। একদিকে তার সৃষ্টির মহিমান্বিত মধুর কলতান,অন্যদিকে প্রলয়হারিনি ধ্বংসের সুর।চতুর্দিকে কত বৈচিত্রের সমাবেশ -কল্পনার ইন্দ্রধনুর বর্ণালী। কোথায় মরুর বুকে উঠের সারি,কখনো অরন্যের বুগিয়ালী স্বপ্নসুখ।আবার কখনো সহস্য তুষারধবল শৃঙ্গরাশি উচ্চশির দণ্ডায়মান,কখনো বা দরিয়ার দিগন্ততটে শুভ্র ফেনায়িত তরঙ্গ রাশির উত্তাল সমীরন। প্রত্যেক রূপেই সে অনন্যা। কর্মসূত্রে 'ইনফরমেশন এন্ড টেকনোলজির সেন্টারে'র অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট ম্যানেজার,সহ অধ্যাপিকা হওয়ার জন্য এই অনন্ত চলার পথে বারংবার বিভিন্ন রূপে দেখা সেই প্রকৃতির সাথে__তার সৃষ্টির জলছবির কাহিনী তাই স্বপ্নের বিভোরতায় গল্পের পাহাড় বুনে হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা দখল করে নিয়েছে....

প্রকৃতির ক্যানভাসে স্বপ্নিল সুখ 
অনাহুত আবিলতা দরিয়ার রূপ
বিগলিত অশ্রুর মুখরিত ধ্বনি
"কলমের ডাকনামে" দিনমানে শুনি......

নীল দিগন্তের মাঝে উত্তাল সমুদ্রের শান্ত সমাহিত রূপের সন্ধানে এবারের যাত্রা আন্দামানে।বহুচর্চিত ঐতিহাসিক ও স্বদেশীদের সাক্ষ্য বহন করা পোর্টব্লেয়ারের 'সেলুলার জেল'আর নীল আইল্যান্ডের নিবিড় সমুদ্র তটে।কলকাতা থেকে সকালের বিমানে পোর্টব্লেয়ার। বিমানবন্দরে নামার আগেই বিমান থেকে দেখা যায় সবুজ বনানী ঘেরা বিভিন্ন আইল্যান্ড আর নীলরঙা সমুদ্র। ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপাসাগরের বুকে অবস্থিত ৫৭২ টি দ্বীপের সমষ্টি নিয়ে এই আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। যার মধ্যে যাওয়ার অনুমতি মেলে কেবল মাত্র ৩৮ টি দ্বীপে। এই দ্বীপ গুলির মধ্যে সবথেকে শান্ত সমাহিত রূপে বৈচিত্র্যে ভরা অথৈ নীলের অপার সাগর বেলা নীল আইল্যান্ড। কাজের সূত্রে বারবার আসার জন‍্য এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যাওয়ার সময় ২০১৪, ২০১৭ আর ২০১৯ পরিবর্তনটা বেশি করে যেন চোখে পড়ছিল। কালের নিয়মে পরিবর্তন আসবেই তবুও প্রকৃতির মায়াবী রূপের যে মনোহর ছটা আগে দেখেছিলাম আজ মানুষের ঢল, হোটেলাদি নির্মাণে অনেকটাই ম্লান মনে হল।

এসব দেখে মনে প্রশ্ন জাগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় 'সবুজ দ্বীপের রাজা' তার গৌরব হারিয়ে ম্লান হয়ে যাবে না তো যন্ত্রমানবের রূপায়নে!!!!যদিও পরবর্তী মুহূর্তেই নীলাভ প্রকৃতির সুরেলা ধ্বনি এই প্রশ্ন ভুলিয়ে হৃদয়ের আঙিনায় প্রশান্তির ঢেউ তুলে সব দ্বিধা দূর করে দিল তার অসীম রূপমাধুর্যে।হোটেলে পৌঁছে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে পৌঁছে গেলাম নিরালা নিভৃতে আকাশের নীল আর সমুদের নীলের নীল দরিয়ায়। নিরালা নির্জনে শ্বেতশুভ্র সৈকতবেলা 'করবাইনস কোভ'। প্রকৃতির পরম যত্নে কোমলতায় আচ্ছাদিত এখানকার ঢেউয়ের খেলায় একবার নামলে খুব কম মানুষ এখান থেকে সহজে উঠতে চান।মনে হয় যেন শান্ত বেলাভূমির কোলঘেঁষে চঞ্চল সমুদ্র শখার অনন্তকালের অবিশ্রান্ত খেলায় আরো কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে যাই। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে থেকে হোটেলে ফিরে এসে দ্বিপ্রাহরিক আহার শেষে যাওয়া হল ঐতিহাসিক সেলুলার জেলে।

স্বাধীনতা সংগ্রামের জীবন্ত দলিল। সাগরমুখী পাহাড়ের পিছনেও খাড়া পাহাড়। জানালাহীন সংকীর্ণ সেল। সাগরের রং কালো হোক বা না হোক রক্ত সংগ্রামের ইতিহাসে "কালাপানি"। পাশে রয়েছে ফাঁসি ঘর।উপরে টাওয়ার;যেখান থেকে পূর্বে নজর রাখা হত সমগ্র জেল চত্বরের। সেখান থেকে উন্মুক্ত প্রকৃতির রূপ বিস্মিত করে। বিকেলে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয় বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাস। যা এই অনন্ত সৌন্দর্যের মাঝেও মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া হলো মেরিন পার্কে। সাগরপারের মৃদুমন্দ নির্মল বাতাসের মনোরম পরিবেশ।চোখে পড়বে বিধ্বংসী সুনামির স্মারকরূপে' একটি স্মৃতিসৌধের স্তম্ভ। রাত্রি অতিবাহিত সুখস্মৃতি রোমন্থনে।পরের দিন সকালে যাত্রা করা হল নীল এর উদ্দেশ্য। পোর্টব্লেয়ার থেকে নীলের দূরত্ব প্রায় 37 কিলোমিটার।পোর্টব্লেয়ার বা হ্যাভলক থেকে জাহাজে চেপে আসা যায় নীল আইল্যান্ড। জাহাজের সামনের আর পিছনের ঢেউ খেলানো জলের তোড় ডেকে বসে দেখতে দেখতে আমরা পৌছে গেল নীল দ্বীপে। জাহাজ থেকে নেমে জেটি দিয়ে হেঁটে আস্তে আস্তে চোখে পড়ল স্বচ্ছ নীল জলের নীচে কোরালের রাজ্য। তটভূমি বরাবর সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে স্পিডবোট, গ্লাস-বটম র্বোট, ওয়াটার স্কুটার। সবদিক জুড়ে নারকেল সুপারি সহ বিভিন্ন গাছ গাছালি। সাথে আনা ব্যাগ হোটেলে রেখে বেরিয়ে পড়া হল নীলাভ্র জলের মায়ার টানে। আসমানী নীল আর জলতলের নীলে প্রকৃতির রূপের বাহার। জলের স্বচ্ছ রং এ যারা শুধুমাত্র পাহাড় প্রেমী তারাও এসে প্রেমে পড়ে যাবেন।এখানে বেশ কতকগুলি সমুদ্র সৈকত রয়েছে -ভরতপুর, লক্ষণপুর,সীতাপুর প্রভৃতি।প্রত্যেক জায়গাতেই নীল জলের স্বচ্ছ রূপ। জলের স্বচ্ছতা এতটাই যে গভীর জলে দাঁড়িয়ে নিজের পায়ের পাতা দেখা যায়।বেশ কয়েকজনকে দেখলাম 'স্নরকেলিং' এ যেতে।আমরা গেলাম 'গ্লাসবটমে' চেপে গভীর জলের তলদেশের কোরাল,স্টারফিশ দেখতে।বেশিরভাগই জীবিত কোরালের সমাগম। ফিরে আসার সময় সমুদ্রতটে কিছু শামুক,ঝিনুক,শঙ্খ জমে আছে দেখলাম। সেখান থেকে যাওয়া হলো রক ফাউন্ডেশন দেখতে। অসংখ্য কোরাল, কাঁকড়া,সামুদ্রিক ছোট ছোট প্রাণী,রঙিন মাছ আর পাথুরে বোল্ডারে পরিপূর্ণ অঞ্চল। মুহূর্তকে মুহূর্ত বন্দি করে সেখান থেকে ফিরে এসে সীতাপুর বীচে ঘুরে আসা হলো। চাইলে নীল জলতটৈ নিজেকে ভিজিয়ে নেওয়া যেতে পারে।নীল সবুজের চোখজুড়ানো জলছবি। 

আবারো ফিরে যাওয়া হল লক্ষণপুর বীচে। নীল নির্জন বালুচরে বসে মনে হল সমুদ্রের অসীম জলরাশি যেন সাদা বালির বুকে আলপনা এঁকে দিয়ে যাচ্ছে।প্রাত্যহিক ক্লান্তিময় শহুরে জীবন থেকে দূরে নিস্তব্ধতার মাঝে ঢেউয়ের তালে পৃথিবী যেন তার আপন সৌন্দর্য ছড়িয়ে রেখেছে এখানে। রুপমাধুরীর এক অমোঘ আকর্ষণে স্নিগ্ধ বাতাস অনির্বচনীয় নির্জনতা মুখর হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে সূর্য অস্তাচলে। সমুদ্রের জলে ক্ষণে ক্ষণে সেই রঙের পরিবর্তন। কখনো আবির রাঙালাল,কখনো কমলা,আবার কখনো হালকা লালে।ধীরে ধীরে দূর সমুদ্রের বুকে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম হাসিতে গোধূলি বেলার ঝিরঝিরে সমীরন। মধুর হাওয়া আর নীলাভ স্বপ্নকে সাথে নিয়ে হোটেলে ফিরে আসা হলো। পরেরদিন প্রভাতে একই ভাবে ক্রজে চেপে ফিরে আসা হল পোর্ট ব্লেয়ার।পোর্টব্লেয়ার এসে দেখে নেওয়া হলো এনথ্রপলজিকাল মিউজিয়াম,সামুদ্রিকা নাভাল মিউজিয়াম আর জুওলজিক্যাল মিউজিয়াম। এক মুঠো স্বপ্নসুখের স্মৃতি কে অবলম্বন করে পরের দিনের বিমানে ফিরে আসা হল কলকাতায়। তবুও চোখে লেগে রইল নীল মেঘতটে সাদা বালুকারাশিতে নীল আইল্যান্ডের মোহ........

(চলবে)

ছবি: পৃথ্বীশ ভদ্র

ইউরোপ ভ্রমন পর্ব ২ (ফ্রান্স)....................মনিরুল ইসলাম জোয়ারদার

ইউরোপ ভ্রমন পর্ব ২ (ফ্রান্স)....................মনিরুল ইসলাম জোয়ারদার
য়ারপোর্টের ভেতরে বাস থেকে নেমে চলন্ত সিড়ি দিয়ে উপরে চলে এলাম। চারিদিকে তাকিয়ে এয়ারপোর্টের সৌন্দর্য্য দেখছিলাম আর চমকিত হচ্ছিলাম। বিশাল বড় এই সিডিজি এয়ারপোর্ট। প্লেনের কমতি নেই যাত্রীরও কমতি নেই তবুও হৈ চৈ বিহীন অনেকটা নীরবে সমস্ত কার্যক্রম চলছে। চেকিংয়ের পর ইমিগ্রেশান পার হয়ে লাগেস বেল্টের কাছে দাড়ালাম, কিছুক্ষণ পর লাগেসগুলি পেলাম, দুটো ট্রলি নিয়ে এলো আনান। ব্যাগগুলো উঠিয়ে ইমিগ্রেশন পার হয়ে চলে এলাম এক্সিট এরিয়ায়। ওদের গাড়ি ছেড়ে দিলে আমি আর কাকা ছয় তলা থেকে তিন তলায় নেমে এয়ারপোর্টের বাইরে বেরিয়ে এলাম।রাস্তায় ছোট্ট কাঁচের এক রুমের টিকেট কাউন্টার থেকে কাকা একটা টিকেট কিনলো উনার টিকেট মাসিক হিসেবে আগেই কেনা। টিকেট দুটো ইলেকট্রনিক বক্সের মেশিনে এক দিকে ঢুকাতেই তা আরেক দিক দিয়ে বের হয়ে এলো। সে টিকেট দুটো হাতে নিয়ে আমরা কোমর সমান গেট পার হয়ে একে একে বের হয়ে এসে মাটির নিচে নির্মিত ট্রেন স্টেশানের ভেতরে ঢুকলাম। সে এক অদ্ভূত ব্যাপার বাস্তবে না দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো। মাটির উপর দিয়ে চলছে নানা ধরনের গাড়ি নিচ দিয়ে চলছে ট্রেন। স্টেশানগুলিও অত্যাধুনিক এবং কম্পিউটারাইজড। এখনে ঘড়ির সময় ধরেই চলছে যেন সব। এয়ারপোর্ট মেট্রো স্টেশানে ট্টেনের অপেক্ষায় থাকলাম। পাসাপাসি দুটো ট্রেন লাইনে দু মিনিট পরপর ট্রেন চলাচল করে।একটা আপ অন্যটি ডাউন। এই ট্রেন লাইন শহরের নানা দিকে ছড়ানো। সোজা গন্তব্য না হলে লাইন বদলাতে হয়। বিভিন্ন লাইনের নাম সংখ্যা দিয়ে উল্লেখ করা আছে যেমন লাইন ১,২,৩,৪। ট্রেন এলে অটো দরজা খুলে যাচ্ছে আবার ত্রিশ থেকে চল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যে দরজা লক হয়ে যায় তবে শুনলাম কখনো কখনো ড্রাইভার দরজা নিজের কন্ট্রোলে নিতে পারে। আগে যাত্রীদেরকে নামতে দিতে হয় পরে উঠে সবই শৃঙ্খলের সাথে। আমরা ট্রেনে চড়লাম সিট খালি নেই দাড়িয়েও আছে অসংখ্য মানুষ অগ্যতা আমরাও রড ধরে দাড়ালাম। ট্রেনের ভেতরটা বেশ ঝকঝকে এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। দরজার উপরে দুপাসেই ইলেকট্রনিক বোর্ডে প্রতিটা স্টেশনের নাম লেখা আছে যে স্টেশানে থামবে পাঁচ সেকেন্ড আগে থেকেই সেখানে লাইট জ্বলে এবং লাউড স্পীকারে ফ্রেন্স ভাষায় স্টেশানের নাম বলে।

হঠাৎ চোখ পড়লো এক জোড়া যুবক যুবতীর দিকে ওরা দুজন কথা বলতে বলতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে শুধু একবার না বারবার সেকি আবেগঘন চুম্বন আমিতো এসব দেখে অভ্যস্ত না ফলে মাথা ঘুরিয়ে কাকার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম কাকা বাংলায় বললো এসব এখানে ডালভাত দেখছেননা কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না আপনি চুপচাপ দেখতে থাকেন ভুলেও কিছু বলেন না কিন্তু। আমি আর ভুলেও তাকাইনি। ডান দিকে তাকিয়ে দেখি একটা মেয়ে দাড়িয়ে এক হাতে রড ধরে আছে অন্য হাতে এক মনে মোবাইল টিপছে বয়স বাইশ চব্বিশ হবে গায়ে হাতা কাটা ছোট্ট গেঞ্জি পায়ের দিকে দৃষ্টি গেল দেখি পরনেও জিন্সের একটা ছোট্ট হাফপ্যান্ট এত ছোট যে হিপের (বাংলায় যাকে বলে পাছা) উঁচু জায়গাটার নিম্নাংশ থেকে পুরো পা খোলা। আমি আবারো চোখ সরিয়ে নিলাম।দু এক জন হিজাবী মহিলাকেও দেখলাম। এরা সবাই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত কেউ কারো দিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না। অনেককে গভীর মনোযোগের সাথে বই পড়তে দেখলাম। একজন পাগলকে দেখলাম ট্রেনের এমাথা ওমাথা ঘুরে বেড়াতে। যাহোক কিছুদুর আসার পর লাইন চেঞ্জ করে আবার অন্যদিকে অন্য স্টেশানে ঢুকে অন্য ট্টেনে চড়ে গন্তব্যে পৌছালাম। লুমিয়া স্টেশানে এসে এস্কেলেটরে উঠে দাড়ালাম। এস্কেলটরের ডান দিক ঘেসে দাড়িয়ে থাকছে সবাই বাদিকে একজনের যাওয়ার পথ খালি রাখতে হয় যারা চলন্ত এস্কেলেটরেও দ্রুত যেতে চায় তাদের জন্য। স্টেশানের ভিতরে ল্যান্ডিং এবং লবিতে দেখলাম দু একজন হকার দ্রব্য বিক্রি করছে একজনকে দেখলাম গীটার বাজিয়ে গান গাইছে আমদের তাড়ার জন্য দ্রুত সরে এলাম কাকার কাছে শুনলাম গান শেষে অনেক শ্রোতা দু এক ইউরো দিয়ে যায়। এটা অনেকের পেশা তবে এরা আরো নামীদামি গায়ক হবার জন্য চেষ্টা করে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে মেট্রো ট্রেন বা বাসের টিকেট ঘন্টা হিসেবে বা মাস হিসাবে কিনতে হয়।সময় শেষ হয়ে গেলে টিকেট আবার কিনতে হয়। 
ঠিক বিকেল আটটায় হোটেলে পৌছালাম।
বড়সড় একটা রুম ভাড়া করেছে কাকা আমাদের চার জনের পরিবারের জন্য খুব একটা অসুবিধা হয়নি। দুটো বেড একটা ডাবল একটা সেমি ডাবল। বেশ সস্তার জন্য এই এক রুম নেওয়া। তবুও আমাদের টাকায় প্রতি চব্বিশ ঘন্টায় চার হাজার টাকা। 
প্যারিসে তখনো রাত হয়নি।আগষ্ট মাসের শেষ দিকে ওখানে সন্ধ্যে হয় সাড়ে নটায়। হোটেলে পৌছেই আনোয়ার কাকা বললো একটু রেষ্ট নিয়ে চলেন আইফেল টাওয়ার দেখে আসি। মেট্রোতে গেলে পনের মিনিট লাগবে। আমরা সুটকেসগুলো না খুলেই ঢাকা থেকে যে পোশাক পরে এসেছি সেভাবেই ফ্রেস হয়ে নটার দিকে বেরিয়ে পড়লাম


আইফেল টাওয়ার 
-----------
বিশ মিনিটের মধ্যেই আইফেল টাওয়ারের সামনে চলে এলাম মেট্রোতে করে। মনুমেন্টের মত কংক্রিটের তৈরি সামান্য উঁচু ট্রোকেডরো চত্বরের পাসেই মেট্রো স্টেশান 6 থেকে রাস্তার উপরে উঠলাম। মনুমেন্টের সামনে পাকা চত্ত্বরের উপর উঠে এলাম। এই চত্ত্বরের নামও ট্রোকেডরো আসলে ঐ এলাকার নামই এটা। ওখান থেকে একটু দূরে আইফেল টাওয়ার দেখা যাচ্ছে। তখন সন্ধ্যা হয় হয় লাইটগুলো এখনো জ্বলে উঠেনি।আইফেল টাওয়ার দূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমরা ছবি তুলতে ব্যস্ত হলাম।খানিকটা পর আলো জ্বলে উঠলো আইফেল টাওয়ারের সৌন্দর্য্য বাড়তে লাগলো। এই চত্তরে অনেক লোকের আনাগোনা। ফলে এখানে অনেক হকার দেখা গেল এরা বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে। দুজন বাংলাদেশীকেও দেখলাম। পুলিশের আগমন টের পেয়ে ওরা দৌড় দিল ফলে কথা বলতে পারলাম না। এই সব বাংলাদেশীরা দশ বারো লাখ টাকা খরচ করে এসে এই হকারি কেন করে আমি বুঝতে পারছি না। তবে কেন আসে এবং এত কষ্ট করে পরে বুঝেছিলাম তা অন্য পর্বে লিখব আশা করছি। সে যাই হোক 
ধীরে ধীরে ওখান থেকে নেমে আইফেল টাওয়ারের দিকে চললাম।
আইফেল টাওয়ার এলাকায় ঢুকতে ব্যাগ চেক করা হলো। আমরা টাওয়ারের চারদিক ঘুরে দেখলাম। বিংশ শতাব্দীর বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের এক আশ্চর্য ছিল এই আইফেল টাওয়ার।১৮৮৪- ১৮৮৯ সালে লোহার তৈরী টাওয়ারের নিচে দাড়িয়ে উর্দ্ধমুখি তাকিয়ে দেখলাম এর উচ্চতা, ঘাড় ব্যাথা হয়ে গেল। নিরেট লোহা দিয়ে তৈরী এর স্ট্রাকচার। নানা ধরনের অতি আশ্চর্যের আবিস্কারের ফলে এটি এখন আর আশ্চর্য নেই। অনেকে মনে করে আমাদের দেশের ইলেক্ট্রিক টাওয়ারের মতই এটা দেখতে এত আদিখ্যেতা কেন।আসলে এর সৌন্দর্য দেখতে হলে চলে যেতে হবে সোয়াশো বছর পূর্বে।সবে মাত্র ফ্রান্সে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছে এই সময় স্বল্প উন্নত যন্ত্র দিয়ে তৎকালীন সময়ে এই রকম একটা উচু টাওয়ার তৈরী করা ভাবলে অবাক হতে হয়। তাছাড়া এর আর্কিটেকচারাল ভ্যালু সাংঘাতিক রিচ।এই টাওয়ারে এখন নানা ধরনের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক যন্ত্রাংশ ও সার্ভার সেটিং করা হয়েছে। টিকেট কেটে লিফটে চড়ে আইফেল টাওয়ারের চুড়ায় উঠা যায়।ওখান থেকে সারা প্যারিসের সৌন্দর্য্য দেখে মুগ্ধ হওয়া সহজ ব্যাপার। আলোকছটায় প্রজ্জ্বলিত আইফেল টাওয়ার দেখে ফিরে এলাম হোটেলে তখন রাত বারটা।

চলবে.....।

স্বপ্নের স্বর্গরাজ্যে:স্মৃতিকথা...................সেমন্তী ঘোষ

স্বপ্নের স্বর্গরাজ্যে:স্মৃতিকথা...................সেমন্তী ঘোষ
কৃত্রিম হিমালয়,হিমবন্ত হিমালয়,দেবভূমি হিমালয়। দিগন্তপ্রসারী হিমাদ্রি তার সহস্র তুষারধবল শৃঙ্গরাশি নিয়ে উচ্চশিরে দণ্ডায়মান।ধ্যানমগ্ন এক তপস্বী -যুগ যুগ ধরে মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কখনো তার ভয়াল ভয়ার্ত রূপ কেড়ে নেয় অসংখ্য প্রাণ,আবার কখনও সেই অভ্রভেদী চূড়াই মানুষকে বাঁধে প্রাণের সুরে।এবারের পূজায় আকাশচুম্বী অট্টালিকার দৃষ্টিনন্দন থেকে দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে আমাদের যাত্রা মর্ত‍্যের সেই স্বর্গধামে।দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের এক অন্যতম অদ্বিতীয়ম কেদারনাথে।প্রকৃতির ক্রুদ্ধ অভিশাপে ২০১৩ সালে যেখানে হঠাৎই নেমে এসেছিল জলের তোড়,মৃত্যু মিছিলে পরিণত হয়েছিল পুন‍্য তীর্থভূমি ;ধীরে ধীরে দুঃখ দূরে সরিয়ে আজ আবার তা মাটির স্বর্গ হয়ে চোখ মিলেছে এক অনন্ত নন্দনের বুকে।

কেদারনাথে যেতে গেলে প্রথমে পৌঁছাতে হবে হরিদ্বার। হাওড়া থেকে প্রতিদিন হরিদ্বার যায় দুন এক্সপ্রেস। এছাড়াও প্রতি মঙ্গল আর শুক্রবার ছাড়ে হাওড়া দেরাদুন উপাসনা এক্সপ্রেস।এবং মঙ্গল ও শুক্র ছাড়া বাকি দিনগুলো চলে হাওড়া হরিদ্বার কুম্ভা এক্সপ্রেস।অথবা রাজধানী এক্সপ্রেসে চেপে বা বিমানে দিল্লি গিয়ে সেখান থেকে জনশতাব্দীতে চেপে বা গাড়ি ভাড়া নিয়ে পৌঁছানো যায় হরিদ্বার।সেদিনটা হরিদ্বারের 'হর কি পৌড়ি' ঘাট দর্শন করে বিশ্রাম নেওয়াই শ্রেয়। পরেরদিন প্রভাতে সীতাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা। কিলোমিটার হিসেবে যেতে ৮_৮.৩০ঘন্টা লাগার কথা হলেও রুদ্রপ্রয়াগের পর কেদারের দিকে যাওয়ার রাস্তা সরকার থেকে নির্মাণ করার জন্য এবং মাঝে মাঝেই ধ্বস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য রাস্তার গতি বেগতিক হলে তা ১২ থেকে ১৫ ঘন্টাও লাগতে পারে।সীতাপুর ছাড়াও উত্তরকাশী,শোনপ্রয়াগ থেকেও কেদারনাথ যাত্রা শুরু করা যায়।তবে কেউ যদি হেলিকপ্টারে কেদার দর্শনে যাবেন ঠিক করেন তারা অবশ্যই সীতাপুরে থাকতে পারেন কারণ ফাটা সেরসি সহ আরেকটি হেলিপ্যাড তিনটি সীতাপুর থেকে প্রায় সমদূরত্বে।
দিগন্তের নীলাভরণ প্রকৃতি আর মহাদেবের ধ্যানমগ্ন সৌন্দর্যের নিকেতন কেদারে এটা তৃতীয়বার যাত্রা।যতবারই আসি বারবার ফিরে আসার ইচ্ছা জাগে মনের কোণে।সীতাপুরে সেদিনের রাত্রি অতিবাহিত করে প্রকৃতির রূপ আস্বাদনে হাঁটাপথে আমাদের কেদার যাত্রা শুরু হলো। 

সীতাপুর থেকে এক কিলোমিটার শোনপ্রয়াগ। বাস বা প্রাইভেট গাড়ির দু'ই যায়-ব্যবস্থা রয়েছে সরকারি পার্কিংয়ের। আগে গৌরীকুণ্ড পর্যন্ত গাড়ি গেলেও ২০১৩-র বিধ্বংসীকতার পর তা বন্ধ হয়ে এখন শোনপ্রয়াগ পর্যন্ত যাওয়া যায়। শোনপ্রয়াগেই রয়েছে বায়োমেট্রিক পারমিশনের শেষ জায়গা।এছাড়া হরিদ্বার হৃষীকেশ থেকেও পারমিট পাওয়া যায়।শোনপ্রয়াগ থেকে গৌরীকুণ্ড ৫.৫/৬ কিলোমিটার।২০১৬ থেকে গৌরীকুণ্ডের হাফ্ কিলোমিটার আগে পর্যন্ত চলে লোকাল জিপ।গৌরিকুন্ড এর ৫০০ থেকে ৫৫০ মিটার যাওয়ার পর রয়েছে উত্তরাখণ্ড সরকারের কাউন্টার,যেখানে ঘোড়া,ডুলি,পালকির ব্যবস্থা রয়েছে।ঘোড়ার খরচ ২৫০০/ টাকা একপিঠ। ডুলি ৪০০০/ টাকা একপিঠ।আর যারা হেলিপ্যাডে যাবেন তাদের পড়বে ৪৭৫০/ টাকা উভয় পিঠ।প্রত্যেক ক্ষেত্রেই মানি রিসিট(স্লিপ) দেওয়া হয়। 

পৌরাণিক কাল থেকে কেদারনাথের উল্লেখ বিভিন্ন জায়গায়। কখনো মহাভারতে আবার কখনো দেবাদিদেব মহাদেব আর পার্বতীর বিবাহ প্রসঙ্গে-ভ্রাতৃহত‍্যার পাপস্খলনে পাণ্ডবরা এসেছিলেন কেদারধামে,আবার শোনপ্রয়াগ থেকে ৭-৭.৫ কিলোমিটার দূরে প্রাচীন মন্দির 'ত্রিযুগীনারায়নে'স্বয়ং নারায়ন কে সাক্ষী রেখে শিব পার্বতীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল।সেখানে রয়েছে একটি জ্বলন্ত ছোট্ট অগ্নিকুণ্ড 'অক্ষয়ধুনী'-অনন্ত কাল ধরে একইভাবে প্রজ্বলিত তার শিখা। 
গৌরীকুণ্ড থেকেই কেদারের আঁকাবাঁকা চড়াইপথের শুরু।এর ডান দিকে কুলুকুলু শব্দে প্রবাহিত মন্দাকিনীর জলধারা।২০১৩ -র ধ্বংসলীলার পর গৌরীকুণ্ড প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও এখানে থাকা উষ্ণপ্রস্রবণটি আজও প্রসারিত হয়ে মন্দাকিনী তে গিয়ে মিশেছে।ধ্বংসলীলা পারেনি তার গতিপথ রুদ্ধ করতে।২০১৩-র আগে গৌরীকুণ্ড থেকে কেদার ১৪ কিলোমিটার রাস্তা ছিল,সরকারি হিসাবে এখন তা পরিবর্তিত হয়ে প্রায় ১৭-১৮ কিলোমিটার।ঘোড়া সাড়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গিয়ে পৌঁছায় কেদারে।সাধারণ মানুষের হেঁটে যেতে প্রায় লাগে ৬ সাড়ে ৬ ঘন্টা। 
চড়াই রাস্তায় মন্দাকিনী কে ডান পাশে নিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর আসে চিরবাসা ভিউ পয়েন্ট।এখানে একটি হেলিপ্যাড ও আছে তবে তা সাধারণের জন্য ব্যবহৃত হয় না।এই হেলিপ্যাডের উপর দাঁড়ালে প্রকৃতির রূপ লাবণ্যে বিস্মিত হতে হয়।কখনো পাহাড় 
ছাপিয়ে কালো কাজল মাখা আকাশ,কখনো শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গরাশির মনোহরণ রূপ।এখান থেকেই প্রথমবারের জন্য কেদার মন্দিরের পশ্চাতের বরফাবৃত শৃঙ্গের দেখা মেলে।চড়াই পথে শীতল হাওয়ায় মেঘবালিকাকে সঙ্গী করে আরো কিছুদূর যাওয়ার পর বা'হাতে পড়ে চোখ জুড়ানো মিঠাপানি ওয়াটারফল্স।জলাধারে জল মাটির অর্ধেক ভিজা অর্ধেক শুষ্ক রাখলেও দুষ্টু মিষ্টু ঘোড়ার দলের জলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে নিজেদের আর দর্শনার্থীদের ভিজানোর মজাদার দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়।সারথির তাদের আয়ত্তে আনার শতচেষ্টা বিফলে যায়। 
আরো কিছুটা যাওয়ার পর গৌরীকুণ্ড আর কেদারের প্রায় মাঝ বরাবর ভীমবালি।সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে হাজার হাজার দর্শনার্থী অক্ষয় তৃতীয়ার পূজার দিন থেকে কালীপুজোর দিন পর্যন্ত মহাদেবের প্রার্থনায় শংকরের নাম নিয়ে এগিয়ে চলেন এই পথে।এখানে তাই সরকারি চেকপোস্টের সাথে বিশ্রাম নেওয়ার চা-নাস্তার বেশকিছু দোকান রয়েছে।ধ্বংসলীলার পর এই 
ভীমবালির পর থেকেই রাস্তা পরিবর্তিত হয়ে গেছে।পুরানো পথ চলে গেছে রামবারার দিকে,যেখান থেকে কিছুটা যাওয়ার পর স্বামী রামানন্দ সন্ত আশ্রম,কিছু ধর্মশালা রয়েছে।তবে প্রকৃতির তাণ্ডবে রুদ্ধ হয়েছে যাত্রাপথ আজ রামবারার সাথে কেদারের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। 

আমরা এগিয়ে চললাম নতুন পথ ধরে।ভীমবালির এক কিলোমিটার পর রাস্তা ভাগ হয়ে গেল। মন্দাকিনী নদীর ওপর নির্মিত নতুন মেটালব্রিজ অতিক্রম করতেই মন্দাকিনী চলে এলো আমাদের বামদিকে।বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর চোখে পড়ল উত্তরাখন্ড সরকারের নির্মিত রাত্রিযাপনের কটেজ।সাথে লিনচোলি হেলিপ্যাড,লিনচোলী ভিউ পয়েন্ট।সেখান থেকে মন্দিরের পশ্চাতের পর্বত শৃঙ্গ অনেক স্পষ্ট ও বৃহৎ দেখায়।আরো ৩-৪কিলোমিটার হাঁটার পর কেদারনাথ হেলিপ্যাড।মূলত যারা সীতাপুর থেকে হেলিকপ্টারে আসেন তারা এখানে এসে নামেন।তার থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে সরকারি তরফে অস্থায়ী হাসপাতাল।সেখান থেকে ৭০০-৮০০ মিটার দূরত্বে বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে কেদারনাথ মন্দির। 

অপূর্ব নৈসর্গিক শোভার মাঝে প্রস্তর নির্মিত সুশোভন কেদারনাথের মন্দির,যা যাত্রাপথের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই মুছিয়ে দেয়।প্রশান্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে মন্দিরময়।মন্দিরপ্রাঙ্গণে বিরাজমান নন্দীদেব,বেশকিছু ত্রিশূল মন্দিরের চারপাশে।ধ্যানে নিমগ্ন সাধুসন্তের দল।পাশেই পুণ্যার্থীদের সারিবদ্ধ লাইন।তাদের কারও হাতে পূজার ডালি কেউবা মনস্কামনা পূরণে করজোড়ে দাড়িয়ে।প্রবেশ করলাম মন্দিরের ভিতর।প্রস্তরখন্ড রূপে পূজিত মহাদেবেকে স্পর্শ করে জীবনের সব গ্লানি যেন দূর হয়ে গেল।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য পান্ডবদের ধরা দেবেন না বলেই তিনি মহিষ রূপ ধারণ করেছিলেন।সেই মহিষের পশ্চাৎভাগ এখানে মহাদেব রূপে পূজিত।মন্দিরের পশ্চাতে সজ্জিত ও পূজিত বিশালাকৃতির ভীমশিলা,যার জন্য ধ্বংসলীলার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল এই মন্দিরপ্রাঙ্গণ।মন্দির চত্বরে বেশকিছু বসার জায়গা,কেদার মন্দিরকে সামনে রেখে বাঁদিকে তাকালে মন্দাকিনী নদীর ওপারে পাহাড়ের গায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিস্থাপিত 'মেডিটেশন ক্যাম্প' যা লোকমুখে 'মোদি গুহা' নামেও পরিচিত। 

মন্দির চত্বরে বসে প্রাণভরে দেখলাম প্রকৃতিকে।নবারুণ আলোর নীলাকাশের প্রেক্ষাপটে একটু একটু করে অবগুণ্ঠন সরিয়ে উন্মোচিত তুষারগিরি।পড়ন্ত রোদের কিরণছটায় তার মহিমাদীপ্ত উপস্থিতি।সান্ধ্যকালীন ইলেকট্রিকের আলোয় প্রজ্বলিত মন্দিরপ্রাঙ্গণ।সন্ধ‍্যারতি শেষে কেদারের ধর্মশালায় রাত্রিযাপন।(বলে রাখা ভালো পারদ যত নিচে নামে অক্সিজেনের কিছুটা অভাব বোধ হয়)ভোরের প্রস্ফুটিত আলোয় কেদারজীকে প্রণাম জানিয়ে ফিরে আসার পালা. ......
''কতভাবে বিরাজিছ বিশ্বমাঝারে,মত্ত এ চিত তবু তর্ক বিচারে''
চিত্র সৌজন্যঃ পৃথ্বীশ ভদ্র।

ইউরোপ ভ্রমন ( ফ্রান্স -১ম পর্ব).....................মনিরুল ইসলাম জোয়ারদার

ইউরোপ ভ্রমন ( ফ্রান্স -১ম পর্ব).....................মনিরুল ইসলাম জোয়ারদার
প্রিয় শ্যালক তৌহিদ বললো দুলাভাই পর্তুগালে আর বেশি দিন নাই ইউরোপের বাইরে হয়তো অন্য কোথাও ট্রান্সফার করে দিবে সুতরাং আমি থাকতে থাকতেই পর্তুগাল বা পারলে ইউরোপের কয়েকটা দেশ ঘুরে যান। ঢাকায় তৌহিদের সাথে দেখা হলেই বলতাম তুমি শালা যেখানে যেখানে পোষ্টিং পাবে আমি সেখানে সেখানেই যাব। তোমার পিছু ছাড়বো না।ফলে তৌহিদের এই অফারটি এড়িয়ে যেতে মন চাইছিল না। বললাম ব্যবস্থা কর তোমার বুবু ভাগনে ভাগনি সহ যাব।

শেষ পর্যন্ত তৌহিদের ইনভাইটেশানে চারজনের পুরো পরিবারের সেনজেন ভিসাটা হয়েই গেল। অবশ্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ফ্রান্স এ্যামবেসিতে জমা দিয়েই ভিসা পেয়েছি। তৌহিদ যেহেতু পর্তুগালে অবস্থান করছে সেহেতু ওখানেই যেতে হবে। ভাবলাম সেনজেন ভিসা পেলাম ২৭টা দেশ ঘুরতে পরবো তবে কেন শুধু একটা দেশ ঘুরবো। এবার খোঁজা শুরু হলো কোন দেশে ঘনিষ্ট স্বজন বাস করে। পেয়েও গেলাম ভাস্তেকে। আমার কাজিনের ছেলে ইটালিতে বসবাস করছে স্ত্রী ও মাকে নিয়ে। ভাস্তেকে বললাম বাবা ইটালিতে আসতে চাই কদিনের জন্য তো হোটেল ভাড়াতো অনেক পড়বে তা তোমার বাসায় কি দু একদিন থাকা যাবে? ভাস্তে রেগে গিয়ে বললো কি বলেন কাকা দু এক দিনতো থাকা যাবে না আপনাকে কমপক্ষে দশদিন থাকতে হবে।আমিতো আপ্লুত। বললাম ভিসা পেয়েছি ৩০ দিনের শুধু ইটালিতে দশ দিন থাকলেতো হবে না। ভাস্তে বললো আগে আসেনতো তারপর দেখা যাক।
তৌহিদকে বলতেই সে বললো যেখানেই যান পর্তুগালে ১৫ দিন থাকতে হবে। এবার ভাবলাম তাহলে রওনা দেই প্রথমে ইটালি পরে পর্তুগাল।আমার বন্ধুবর শাহিদুলের ট্রাভেল এজেন্সি সিটিকম ট্রাভেলে যেয়ে টিকেট কিনলাম। শাহিদ ভাই সর্বোচ্চ ডিসকাউন্টে টিকেটের ব্যবস্থা করলো। টিকেট আনতে গেলে শাহিদ ভাইয়ের স্টাফ বললো এখন নিয়ম হয়েছে যে দেশের এ্যাম্বেসি থেকে ভিসা নিবেন সেই দেশ হয়ে অন্যদেশে যেতে পারবেন। শ্যালককে জিজ্ঞেস করতেই সে বললো না এমন কোন নিয়ম নেই। কিন্তু স্টাফ ভদ্রলোক অনড় । 

সেদিন শাহিদ অফিসে ছিল না। তো কি করা প্রায় একই মুল্যে প্যারিস হয়ে যেতে পারছি তাছাড়া আমার মেয়ে আরশীর প্রচন্ড ইচ্ছা প্যারিস দেখা আমারও ইচ্ছে তাই তো কেটে ফেললাম সামান্য কয়েকটা টাকা বেশি দিয়ে। রিটার্ন টিকেট নিলাম ঢাকা- প্যারিস, লিসবন -ঢাকা। এখন খোঁজা শুরু হলো ফ্রান্সে পরিচিত আত্মীয় কে আছে পেয়েও গেলাম আমার ভায়রা আরাফাতের ছোট কাকা মি.আনোয়ার ওখানে বাস করছে টানা দশ বছর। ফেসবুকে তাঁকে খুঁজে এড করে কথা বলা শুরু করলাম।আরাফাত বলেছিল অসাধারন ভাল মানুষ কথা বলে দেখলাম ভালোর সাথে অসাধারন আন্তরিকও। ভিসা পাবার পর থেকেই ফ্রান্সে আনোয়ার কাকা ইটালিতে সজীবের সাথে প্রতিদিনই ম্যাসেঞ্জারে কথা চলছে অবিরত আর তৌহিদের সাথে যখন তখন। যেহেতু প্যারিসে প্রথমেই যাব তাই আনোয়ার কাকাকে হোটেল বুকিং দিতে বললাম। প্যারিসে আনোয়ার কাকা ও কয়েকজন যুবক মিলে এক ফ্লাট ভাড়া করে বসবাস করে।ফলে আমাদের জন্য হোটেল ঠিক করলেন। 
তবুও আমি একটু আশন্কায় ছিলাম যদি হোটেল ঠিকমত না মেলে মহা বিপদে পড়ে যাব।আনোয়ার কাকা আমাকে আশ্বস্ত করলেন। আমরা ২০ আগষ্ট টার্কিশ এয়ারে রওনা দিলাম। ঢাকা এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পার হয়ে বোর্ডিং পাস নিয়ে অপেক্ষা করছি কখন প্লেনে উঠবো। ভোর পাঁচটায় প্লেনে উঠলাম প্লেন উড়লো ঠিক ছটা কুড়িতে। সিটে বসতেই আনান ঘুমিয়ে পড়লো।ছেলাটা গতরাতে একটুও ঘুমায়নি।আমরা কেউই ঘুমাইনি কিন্ত ওতো মাত্র আট বছরের ছেলে।উনিশ তারিখ রাত সাড়ে বারটায় বাসা থেকে বের হয়েছি ভ্রমনের উত্তেজনায় সারাদিন সারারাত ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেছে এখন সবাই গা এলিয়ে দিয়ে সিটে বসলো।সিট বেল্ট বেধে বসতেই প্লেন ছেড়ে দিল। একটু পর আকাশে উড়লো। জানালা দিয়ে দেখলাম নীচের বাড়ি ঘর ছোট ছোট কাগজের বক্সের মত। সামনের সিটের পেছনে আমার সামনে স্ক্রিনে দেখলাম সাত হাজার মিটার উপরে আছি। একটা সো সো আওয়াজ পাচ্ছি কানে। ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়লাম।একটু পর মেয়েলি কন্ঠে ইংরেজীতে কিছু কথা শুনে ঘুম ভাংলো। দেখি এয়ার হোস্টেস খাবার নিয়ে এসেছে।তাড়াতাড়ি সামনে ভাজ করে রাখা ট্রেটা মেললাম এয়ার হোস্টেস খাবারের প্যাকেট রেখে মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল। প্যাকেট খুলে হাইজেনিক খাবার দেখে মনটা ভরে গেল। খাওয়ার পর জুস খেলাম। খানিকটা পর কফি খেয়ে ঘুম। ঘন্টা চারেক পর আবার হালকা নাস্তা ও কফি খেলাম। স্থানীয় সময় চারটায় প্লেন ইস্তান্বুলে ল্যান্ড করলো। ছটা থেকে চারটা মোট দশ ঘন্টা প্লেন উড়েছে মনে হলেও আসলে সাত ঘন্টা উড়েছে। বাংলাদেশের সাথে তুরুস্কের সময়ের পার্থক্য তিন ঘন্টা এবং আটোমেটিকভাবে সময় এ্যাডজাস্ট হয়ে যায় বিশেষ করে মোবাইলে ও প্লেনের ঘড়িতে। ইস্তাম্বুলে চার ঘন্টা ট্রানজিট। ভিতরেই বসে থাকলাম। প্যারিসের প্লেন কত নাম্বার প্যাসেজ ওয়ে থেকে ছাড়বে জেনে নিয়ে লাউঞ্জে বসলাম।

এরপর আমি আর আনান ঘুরে ঘুরে সমস্ত এয়ারপোর্ট দেখলাম তারপর আমরা হ্যান্ড ব্যাগগুলো পাহারা দিলাম আর ডলি আরশী এয়ারপোর্ট ঘুরে দেখলো। বিশাল বড় এয়ারপোর্ট প্লেনের অভাব নেই যাত্রীরও অভাব নেই। এত যাত্রী তবুও হৈচৈ কম। ঠিক চার ঘন্টা পর প্যারিসের পথে বদলি প্লেন ছাড়লো। আবার প্লেনের ভিতর হোস্টেসের দেওয়া খাবার খেয়ে ঘুম।স্থানীয় সময় ছটা ত্রিশ মিনিটে প্যারিস সিডিজি এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম।ধীরে ধীরে প্লেন থেকে নেমে এয়ারপোর্টের বাসে উঠে চলে এলাম এক্সিট এরিয়ায়। সবচেয়ে অবাক লাগলো সারা এয়ারপোর্টে ইংরেজি লেখা নেই। ইংরেজি অক্ষরে ফ্রেন্স ল্যাঙ্গুয়েজ।শুধু এ্যারো চিহ্ন দেখে বের হলাম। এ্যারো চিহ্নের পাসে লেখা sorte পরে শুনেছি sorte অর্থ বাহির। ভিজিটর এলাকায় এসে দেখি আনোয়ার কাকা দাড়িয়ে সাথে আরো একজন। দেখে বুকের ভেতর আশ্বাসের চাঁদরটা লম্বা হয়ে গেল। আনোয়ার কাকার সাথে এই প্রথম সরাসরি দেখা এর আগে শুধুমাত্র মোবাইলে কথা ও দেখা হয়েছে।আনোয়ার কাকা জড়িয়ে ধরলো ও পাসের যুবকটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিল ও রতন। ওঁদের পাসে দেখি আরো দুজন দাড়িয়ে সামনে এসে পরিচয় দিল সে নির্ঝর অধিকারী ফ্রান্সে বাংলাদেশ দুতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি তৌহিদের কলিগ। আমার স্ত্রীকে চেনে ওঁর সাথে কথা বললো। নির্ঝর অধিকারী মোটর কার নিয়ে এসেছে। নির্ঝরের একটা বড় প্যাকেট ঢাকা থেকে আমরা নিয়ে এসেছি যার মধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসে বাংলা নববর্ষ পালনের সরঞ্জাম ছিল। ওঁর গাড়িতে লাগেস সহ আমি আনোয়ার কাকা বাদে সবাইকে উঠিয়ে দিলাম। আমরা দুজনে মেট্রো রেলে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মেট্রো রেলের কথা অনেক শুনেছি এবার চড়লাম।সে এক অন্যরকম অনুভুতি।

চলবে.…...।

দিনমানে দরিয়ায়..................সেমন্তী ঘোষ

দিনমানে দরিয়ায়..................সেমন্তী ঘোষ
শ্চর্য সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যে ভরা অথৈ-নীলের অপার সাগরবেলা প্রত্যেকবারই হৃদয়ের আঙিনায় প্রশান্তির ঢেউ তোলে।কখনো তার উত্তাল সৃষ্টির শৈল্পিক আদল আবার কখনো বা বিপুল বিশালতার মাঝে প্রাণবন্ত নির্মল রূপ। নারিকেল বীথিকায় ছাওয়া রূপালী বালুকাবেলায় কেরালার কোভালাম জলনিধি তেমনি এক শান্ত সমাহিত রুপমুগ্ধতা নিয়ে অভিসারী মনে কল্পকাহিনী রচনা করে। ভারতের দক্ষিণ ভাগের পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত কেরালা রাজ্যের, তিরুবনন্তপুরম জেলার দক্ষিণ ভাগের একটি কোস্টাল অঞ্চল কোভালাম। মূলত হাওয়া বিচ ও সমুদ্র বিচ এই দুটির একত্রিত নাম কোভালাম বিচ।শালিমার থেকে ত্রিবান্দম সাপ্তাহিক দুদিন ট্রেন চলাচল করে এছাড়াও হাওড়া থেকে চেন্নাই পৌঁছাতে পারেন করমন্ডল এক্সপ্রেস করে। সেখান থেকে ত্রিবান্দম।রেল স্টেশন বা শহর থেকে কোভালামের দূরত্ব আনুমানিক ১৪ কিলোমিটার। যারা বিমানে আসবেন কলকাতা থেকে ত্রিবান্দম এয়ারপোর্ট -সেখান থেকে দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার।
ছায়াসুনিবিড় বেলাভূমির শান্ত প্রশস্থ রূপের মাঝে ব্ল্যাক স‍্যান্ড -কালো বালির সাথে নীল জলরাশির স্বর্ণালী মেলবন্ধন। বিচ টিকে বেষ্টন করে রয়েছে সাধারন থেকে উচ্চতম মানের বিভিন্ন হোটেলাদি।সমুদ্রের জলের মোহিত করা রূপ।সারাদিনই চোখে পড়ল মৎস্যজীবীদের অবাধ আনাগোনা। গভীর সমুদ্র থেকে মাছ ধরে নৌকায় প্রত্যাগমনের মনোরম দৃশ্য। বিচের মাঝ বরাবর দ্বীপে Vizhinjam jama Masjid। বিচের উত্তর প্রান্ত ধরে হাঁটলে লাইটহাউস।
নির্দিষ্ট সময়ের ভিত্তিতে সুউচ্চ বাতিঘরের ওপর থেকে নীলকান্ত কোভালামের নীলাভ অনুভূতির মনকাড়া দৃশ্য।এর থেকে আনুমানিক ২০০ মিটার দূরে সামুদ্রা মেরিন একুরিয়াম এর অবস্থান।চারিদিকে ঘুরে এসে সমুদ্র সৈকতে বসে উপলব্ধি করলাম ২০১৮ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন কর্তৃক এটির পৃথিবীর সুন্দরতম বিচের মধ্যে একটির সম্মান পাওয়ার কারণ,এই দৃষ্টিনন্দন মোহিত রূপ আর ঢেউয়ের খেলা। শান্ত -অনুগত ঢেউ। বিচের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের জন্য চোরাবালি বা গভীর খাদ এখানে নেই। তাই সুখের ছোঁয়া লাগে ঢেউয়ের দোলায়। খুব বড় ঢেউ না হওয়ার জন্য ভাসিয়ে বা ডুবিয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ও থাকে না। জলকেলিতে ভরে ওঠে মন ও প্রাণ। নেত্র পল্লবে সুদূরের মায়াঞ্জন।নীল নির্জন বালুচরে সমুদ্রের অসীম জলরাশি যেন কালো বালির বুকে আল্পনা এঁকে দিয়ে যাচ্ছে।
তরঙ্গের নৃত্যচপল ভঙ্গীর বিচিত্র লীলারঙ্গ।প্রাত্যহিক ক্লান্তিময় শহুরে জীবন থেকে দূরে নিস্তব্ধতার মাঝে ঢেউয়ের তালে পৃথিবী যেন তার আপন সৌন্দর্য বিছিয়ে রেখেছে এখানে।রূপমাধুরীর সেই অমোঘ আকর্ষণে স্নিগ্ধ বাতাস অনির্বচনীয় নির্জনতা মুখর হয়ে উঠেছে। অনাদি অনন্ত সৌন্দর্যের রূপবৈভব দেখতে দেখতে সূর্যের ধীরে ধীরে সমুদ্র শায়ন।শেষ বিকেলের আলোর গোধূলিলগ্নে পশ্চিম কোলে সূর্যের ঢলে পড়ায় আবির রাঙা আকাশের রেশ। সমুদ্রের নীল রং কালো বালি সূর্যের আভায় এক মায়াময় জগতের সৃষ্টি। ক্ষণে ক্ষণে রঙ পরিবর্তন।কখনো আবির রাঙালাল,কখনো কমলা,আবার কখনো হালকা লাল। তবুও কিছু আলো যেন অবশিষ্ট রয়ে গেল ঈশান কোণে জমা হওয়া পুঞ্জীভূত মেঘের মতো। সিঁদুর রাঙা অস্তগামী সূর্যের রক্তিম হাসিতে গোধূলিবেলার ঝিরঝিরে সমীরণে প্রণয়ভিসারী হয়ে উঠল মন। হোটেলে ফিরে গিয়ে সেই রাত্রিটা এক মুঠো সুখ স্মৃতিকে অবলম্বন করে হোটেলেই কেটে গেল। নবপ্রভাতে প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচনের সাথে সূর্যোদয় দেখে আবার একই পথ ধরে ফিরে এলাম কলকাতায় . ..... তবুও চোখে লেগে থাকল সেই কদিনের সমুদ্রসৈকতের মাধুর্য.......
দিগন্তের বালুকাবেলায় উত্তাল হওয়া
অচেতন মনে তার রোজ আসা যাওয়া...

চিত্র :পৃথ্বীশ ভদ্র

ফাগুনের আগুন শিখা.................সেমন্তী ঘোষ

ফাগুনের আগুন শিখা.................সেমন্তী ঘোষ
দোল পলাশের পদাবলী, আবির রাঙা কেশ
অভিসারে মাদল সুরে ফাগুনেরই রেশ---

আগুনের সুরে পলাশের ডাকে মন চলে অভিসারে। প্রকৃতিতে লাগে মধুর বসন্তের সাজ সাজ রব। দখিনা বাতাসের সাথে ডানা মেলে ইচ্ছেরা পাড়ি দেয় স্বপ্ন সুখের সন্ধানে।গগনচুম্বী অট্টালিকার দৃষ্টিনন্দন থেকে তাই দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে প্রতিবছরই ফেব্রুয়ারি মার্চ মাস করে আমরা পৌঁছে যাই বড়ন্তি তে।একদিকে যেমন অরণ্যের অসীম রহস্যময়তা তার শান্ত শ্যামল সৌন্দর্য নিয়ে বিরাজমান ,অন্যদিকে তেমনি প্রশস্ত উপত্যকার মাঝে পাহাড়ে ঘেরা দৃষ্টিনন্দন লেক হৃদয়ের আঙিনায় নব নতুনের বার্তা বহন করে আনে। 
বাংলা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৫৬ সালের পহেলা নভেম্বর পূর্বতন বিহার রাজ্যের মানভূম জেলার সদর মহকুমা পুরুলিয়া জেলা নামে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত হয়।সেই পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর মহাকুমার সন্তুরি থানার অন্তর্গত একটি ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম বড়ন্তি। এখনও বেশ কিছু জায়গায় মানভূম লেখা টি চোখে পড়ে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রাতেও রয়েছে মানভূমের ছাপ।
পলাশের বর্ণ মিছিলে যোগদানের জন্য যাতায়াতের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো হাওড়া থেকে ট্রেনে আসানসোল । আসানসোল থেকে গাড়িতে আনুমানিক ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে বড়ন্তি।চারিদিকে সবুজের সমারোহ উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে বড়ন্তি আর মুরাডি পাহাড় দ্বারা আবৃত বড়ন্তি তে পৌঁছাতে আসানসোল থেকে লাগে প্রায় ঘন্টা দেড়েক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ১৬০০ ফুট উচ্চতায় বড়ন্তি পাহাড় ঘেরা রাঙ্গামাটি রাস্তায় চারপাশে রয়েছে ছোট-বড় বেশকিছু থাকার হোটেল।
রূপে রসে বৈচিত্রের লীলা চাঞ্চল্য নিয়ে বহু বিচিত্র সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র এই গ্রামটি।একদিকে শ্যামল গহন বনাঞ্চল অন্যদিকে আদিবাসী মানুষগুলির শিল্পকর্মে রঙিন জীবনের ছোঁয়া_

পাহাড়তলীতে ভূমিপুত্রদের মাটির বাড়ি
আলপনা আঁকা দেওয়াল সারি সারি...

যতবারই বড়ন্তি যাই গ্রাম্য পথের উদাসী হাওয়ায় যেন নিজেকে নতুন করে চিনতে পারি।ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে পলাশরাঙ্গা ফাগুনের মায়ায় চেনা- অচেনা পাখির সুরেলা ডাক কানে ভেসে আসে।মাঝে মাঝে ফ্রেমবন্দি হয় বুলবুলি ,ফ্রিঞ্চ,কোকিল কোয়েল,বি ইটার,ফিঙে ,টিয়া ,দোয়েলের দল।শাল, পলাশ, শিমূল, পিয়াল, মহুয়ার জঙ্গলের মাঝে মাঝে চোখে পড়ে আলপনা আঁকা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাটির বাড়ি।তবুও এত সৌন্দর্য এত আনন্দের মাঝেও গ্রামীণ মানুষগুলোর কষ্টের জীবন মনকে অস্থির করে তোলে।যদিও তাদের হাসিমাখা সরলতা মন ভরিয়ে দেয় ।তাদের রূক্ষ বৈচিত্রহীন জীবনে বসন্তের আগমনে ফাগের রং এর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পলাশের পদাবলী। 
তারা জানে নিজেদের সংস্কৃতিকে কিভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হয় তাই ইট কাঠ কংক্রিট এর জীবন থেকে দূরে আজও বড়ন্তি আপন মহিমায় সেজে রঙিন তানে রূপালী জল ছবি আঁকে। অরন্যের অগ্নিশিখার মাঝে লেকের জলে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি আর সিঁদুর রাঙ্গা অস্তগামী সূর্যের মায়াবী আভায় রচিত হয় স্বপ্নের কথকতা। বড়ন্তির সান্ধ্যকালীন রূপেও বিমোহিত হতে হয়।নিঝুম নিশ্চুপ আঁধার, হিম পড়া মায়াবী সন্ধ্যা।কখনো বা হোটেলের ব্যালকনি থেকে দেখা পূর্ণিমার আছড়ে পড়া জোছনার মোহময়ী বৈভব। দূর থেকে ভেসে আসা ধামসা মাদলের ড্রিম ড্রিম বোল।মাঝে মাঝে কিছু অচেনা-অজানা প্রতিধ্বনি। সারাদিনের স্বপ্নবিভোর বিষন্নতায় রঙিন একগোছা পলাশের ঝাঁজালো গন্ধে অদ্ভুত প্রশান্তি।রাত্রি অতিবাহিত স্মৃতির মননে।প্রভাতের স্বর্ণালী আলোয় নব দিগন্তের নবরূপে সুনির্মল নীলাকাশে ফিরে ফিরে আসার অনন্তের আহ্বান:
মায়াবিনি প্রকৃতির অনন্ত ডাক
পলাশের ফাগে ;আগুনের রাগ।

চিত্র সৌজন্যে :পৃথ্বীশ ভদ্র

রোমাঞ্চের হাতছানি (প্যাংগং লেক)..................সেমন্তী ঘোষ (কোলকাতা)

রোমাঞ্চের হাতছানি  (প্যাংগং লেক)..................সেমন্তী ঘোষ (কোলকাতা)
রোমাঞ্চকর,রোমহর্ষক...প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যে আচ্ছাদিত পৃথিবীর স্বর্গ।এক অপার্থিব মায়াজালে ঘেরা রং-বেরঙের বরফাবৃত পাহাড় আর শীতল মরুভূমির মায়াতান।প্রকৃতির নিরাভরণ রূপে অনুপম ঐশ্বর্যে অতুলনীয় মোহময়তা।কখনো তা মহাদেবের মতো ধ্যানগম্ভীর কখনো বা পার্বতীর মতো লাস্যময়ী। বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্যের মহনীয়তা,রূপের বিচিত্রতায় বৈচিত্র্যময়তা -স্বপ্নবিভোর প্যাংগং লেক।মায়াবী নেশায় চোখ ধাঁধানো নীলের বিচিত্র রং আর কিছু বালুকারাশি। খন্ড খন্ড নীল মেঘের আনাগোনা,রুক্ষতার মধ্যে অপরূপ সৌন্দর্য আর নিঃসঙ্গতার মিলনে নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ হৃদয়.....

"...পাষাণের স্নেহধারা তুষারের বিন্দু
ডাকে তোরে চিতরোল উতরোল সিন্ধু..."

একদিকে নীলাভ প্রকৃতি অন্যদিকে তুষারে ঢাকা গিরিশৃঙ্গ।সমগ্র রাস্তাজুড়ে কর্মরত বি.আর.ও। লে থেকে প্রায় 154 কিলোমিটার দূরত্ব।যেতে লেগে যায় সাড়ে 5 থেকে 6 ঘন্টা।বরফে আচ্ছাদিত রাস্তা অতিক্রম করে প্রথমে পড়ে বাংলা পাস চাংলা পাস।পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম গাড়ি চলার পাস। উচ্চতা
আনুমানিক 17668 ফুট।উচ্চতাজনিত কারণে অক্সিজেনের সমস্যা হয়,তাই বরফ দেখে বেশি উন্মাদনার প্রকাশ না করাই ভালো।রুক্ষ পাহাড়ের ঢাল আর পাহাড়ের চূড়া সবটাই এখানে বরফে মোড়া।রয়েছে সেনাবাহিনীর ক্যাফেটেরিয়া আর মেডিকেল চেকআপ ইউনিট। সেখান থেকে আবারও এগিয়ে চলা,পথে পড়বে তাং সে ;প্যাংগং এর পথে শেষ হেলথ সেন্টার এটি। 
অল্প কিছু গাছপালা থাকায় এখানে শ্বাসকষ্টের সমস্যা কম। যদি কেউ সেরূপ সমস্যায় পড়েন তারা এখানে থেকে পরের দিন এখান থেকেই প্যাংগং দেখে আসতে পারেন। তাং সে কে পিছনে ফেলে বেশ কিছুদূর অগ্রসর হলেই দেখা মিলবে ম্যারমেটের। ইঁদুরের থেকে আকৃতিতে বড় এবং খরগোশের তুলনায় ছোট ভারী সুন্দর দেখতে এক ভীতু প্রাণী। ক্যামেরাবন্দি করার আগেই গাড়ির আওয়াজে ঢুকে পড়ল গর্তের মধ্যে। অবশেষে পৌঁছানো স্বপ্নের প্যাংগং-এ। টেন্টে কর্মরতদের সাদর অভ্যর্থনা। সাজানো গোছানো সুন্দর টেন্ট। প্রবল শীতল বাতাস এখানে অক্সিজেন প্রায় নেই বললেই চলে। অক্সিজেন
সিলিন্ডার সঙ্গে রাখা শ্রেয়। লেকের একদম সামনেই টেন্ট। (যদিও এখন জায়গা পরিবর্তিত হয়েছে )অপূর্ব নীল আবরণের টলটলে জল।
 পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চতম লবণাক্ত জলের হ্রদ। মহীখাত তথ্য অনুযায়ী বর্তমান হিমালয় যেখানে সেখানে ছিল টেথিস সাগর একটি অগভীর সমুদ্র। প্রচণ্ড চাপে সাগরের বুকে পলি জমে হিমালয় পর্বত উত্থিত হয় । চিরকালের জন্য হারিয়ে যায় টেথিস সাগর। কিন্তু হিমালয় তার প্রাকৃতিক স্বভাব ভুলতে পারে না সে কারণেই হয়তো জলের স্বাদ নোনতা।স্বচ্ছ নীল
লেকের গায়েও নুন জমে থাকতে দেখা যায়।এই লেকের 35 শতাংশ ভারতে রয়েছে আর বাকি 65 শতাংশ তিব্বতে চীনাদের অধীনস্থ। বলিউডের বিখ্যাত সিনেমা থ্রি ইডিয়টস'-এর শেষভাগের শুটিং এখানেই হয়েছিল। লেকের জলে বেশ কিছু শিগূল পাখির আনাগোনা এক অন্যরকম মাত্রা বহন করে আনে।জায়গায় চোখে পড়ে আর্মি টহল। 
ধারাবাহিক রুক্ষতার মধ্যে নীলের মহিমা আচ্ছাদিত এই লেক সত্যিই অনন্য। তাই বাঁধা পথের বাঁধন ছেড়ে এক টুকরো স্বপ্ন খুঁজে নিতে 'বসন্তের বিনিদ্র রাত্রি' দূর আকাশের দুরন্ত সীমায় 'অভিসারে চলে _ভিজে শীতল পাহাড়ি হাওয়া কে সঙ্গী করে,মন ক্যামেরার সাথে হাতের ক্যামেরায় বন্দি হয় প্রকৃতির সংরাগের সেসব সুখকর স্মৃতি----

চিত্র ও তথ্য :পৃথ্বীশ।

পাহাড়ি গ্রাম নাকো.................সেমন্তী ঘোষ

পাহাড়ি গ্রাম নাকো.................সেমন্তী ঘোষ

...একি রহস্য ,একি আনন্দ রাশি!
জেনেছি তাহারে,পাই নি তবুও পেয়ে
তবু সে সহজে প্রাণে উঠে নিশ্বাসি,
তবু সে সরল যেন রে সরল হাসি।
পুরনো সে যেনএই ধরনের চেয়ে...

প্রকৃতি কখনো অধরা,কখনো ছলনাময়ী,কখনো মরীচিকা আবার কখনো মায়ামৃগ।একদিকে তার বিপুল সম্ভাব্য রাশি,অন্যদিকে সেই প্রকৃতিই আবার অমানিশা প্রলয়হারিনী।পাহাড়িয়া সুরে তার রোদ মেঘেদের খেলা,শ্বেতশুভ্র শিখর রাশিতে স্বর্ণালি আভা,অরণ্যের মাঝে বুগিয়ালী স্বপ্নসুখ আর নির্জন সাগরে উদাসী প্রেমের সুর।
ভারতবর্ষের উত্তর পূর্বভাগে হিমালয় পর্বতের উপরে অবস্থিত হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের কিন্নর জেলার অন্তর্গত একটি ছোট্ট সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম নাকো। সামান্য কিছু বাড়ি,তিনটি ছোট এবং একটি বড় মনাস্ট্রি ও নাকো লেক কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নাকো গ্রাম। হিমালয় পর্বতের 12,014ফুট উচ্চতায় ইন্দো চায়না বর্ডারে নাকো অবস্থিত। কিন্নর জেলার পূর্ব দিকে পু মহকুমার অন্তর্গত নাকোর জনসংখ্যা 2011 সালের জনগণনা অনুযায়ী 572 জন।কল্পা থেকে নাকোর দূরত্ব আনুমানিক 117 কিলোমিটার।কল্পা থেকে কাজা যাওয়ার প্রধান সড়ক পথ থেকে 7 কিলোমিটার ভিতরে এই নাকো গ্রাম। এখানে মূলত বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের বাস।চোখে পড়বে মাঝে মাঝে বেশ কিছু আপেল চাষ। দূর শৃঙ্গরাজি আর লেকের জলে পাহাড়- আকাশের ছায়া এখানে অকল্পনীয় সৌন্দর্য রচনা করেছে।
 প্রথম মনাস্ট্রিটি আকৃতিতে বড়। সেখানে একটি ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধ মূর্তি রয়েছে। সাথে রয়েছেন লামাদের জন্য প্রার্থনা গৃহ।মনাস্ট্রির সামনে গাড়ি রাখার জায়গা রয়েছে,সেখানে গাড়ি রেখে গলির মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেলে পাথর মাটি দিয়ে তৈরি করা বাসগৃহ আর আপেল গাছ দেখা যায়। এখানকার মূল আকর্ষণ নাকো লেক।ছোট্ট কিন্তু অপরিসীম সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এই লেক।লেক টিকে বেষ্টন করে রয়েছে উইলো আর পপলার গাছের সারি।পায়ের চিহ্ন আকারে এই লেক স্থানীয় মানুষদের কাছে 'পবিত্র ভগবানের দান'।নির্মল আকাশ তটে লেকের নীলাভ জলে দূরের বরফাচ্ছাদিত শৃঙ্গরাজি আর উইলো,পপলার গাছের ছায়া সুনিবিড় স্মৃতিপট তৈরি করে। যেন ক্যানভাসে আঁকা রং তুলির ছবি। অপার সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এই লেকের জল সারা বছরই একরকম থাকে। লেকের অপরপ্রান্তে শৃঙ্গগুলির পিছনেই তিব্বতের গ্রাম।শীতল হাওয়ায় এই লেকের ধারে দাঁড়িয়ে মন হারিয়ে যায় কোন সুদূরে।
 নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মোড়া পাহাড় জলে সবুজ নীলাভ মিতালী নাকোকে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু করে তোলে। সবুজ নীলের সেই আলিঙ্গন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়ে থাকে মন ক্যামেরায়।বিশ্বসংসারে অনন্ত ক্যানভাসে সেই রঙ আনে শুষ্কতার মাঝে পূর্ণতা। কল্লোলিনীর নীরবতা পৌঁছে দেয় এক অনন্ত অমৃতলোকে। স্বপ্ন বাস্তবতার অপূর্ব মেলবন্ধনে মন হারায় বন পাহাড়ের সেই অসীম সীমায় মাঝে মাঝে ভেসে আসা মেঘ গুলো ঘিরে ধরে আমাদের।। রোদ মেঘেদের খেলায় সোনা রাশি রাশি পাহাড় গুলো এক অনির্বচনীয় কল্পকথা তৈরি করে।জীবনের আঙিনায় হৃদয়ের পেলবতায় অমরগাথা হয়ে থাকে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সেসব সুখকর স্মৃতি -

"...তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি
শতরূপে শতবার।
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।......."

চিত্র: পৃথ্বীশ।

যেতে যেতে পথে....................সেমন্তী ঘোষ (কোলকাতা)

যেতে যেতে পথে....................সেমন্তী ঘোষ (কোলকাতা)
থ। মাত্র দুটো শব্দের মধ্যে ঘেরা কত রহস্য। মুক্তধারার অভিজিৎ যেমন বাঁধ ভেঙে বাঁধের জলে ভেসে গিয়ে শিবতরাই এর পথে জলের আশ্বাস এনে দিয়েছিল;তেমনি অপু ও দুর্গা পথেই খুঁজে পেয়েছিল জীবনের অনন্ত রহস্য।অশোক এনেছিলেন 'ধম্মের' পথে শান্তি,আবার পথিক খুঁজে পান পথের মাঝে তার ঠিকানা। কখনো হাজারো চিঠির বোঝা কাঁধে রানার ছুটে যায় এই পথে,আবার কখনও সেই পথ ধরেই চলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন।শুধু মানব জাতি নয় পশুদের রয়েছে অবাধ বিচরণের পথ। গহীন বনের পথ। এক বন থেকে আরেক বনে যাওয়ার পথ। পথেই আনন্দ,পথেই আহ্লাদ, পথেই শান্তি:

"পথ বেঁধে দেয় বন্ধনহীন গ্রন্থি 
আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী" 

যতবার উত্তরবঙ্গে এসেছি এই পথ আমায় আকর্ষণ করেছে তার রূপের খনি সাজিয়ে।গরুমারা থেকে জলদাপাড়া যাওয়ার সময় দেখেছি নির্জনতম মগ্ন পথের চকিত রূপকথা।জলদাপাড়া যাওয়ার পথে 31 নম্বর জাতীয় সড়কে খুনিয়া মোড় প্রকৃতির নেশায় সেখানে আদিমতার গন্ধ। গাছে গাছে শব্দ সমুদ্র তরঙ্গ তুলে জানিয়েছে প্রকৃতির আহ্বান।আকাশ-ছাওয়া গাছের তলে নিজেকে কখনো অসহায় লেগেছে আবার কখনও নতুন করে আবিষ্কার করেছি।কখনো আবার নিঝুম রাতের অন্ধকারে ঝিকিমিকি জোনাকি পথকে আলোকিত করে তুলেছে।
কিন্তু এত রূপের মহিমায় আচ্ছাদিত পথকে আমরাই দখল করে ফেলেছি তাই প্রকৃতির আপন সন্তানদের জীবন আজ বিপন্ন। নিজের খেয়ালে চলতে গিয়ে কখনো গাড়ির ধাক্কায় তাদের প্রাণনাশ হচ্ছে আবার কখনো সহজাত স্বভাব এ তারাই আক্রমণ করছে যানবাহনকে। 

শুধু তাই নয় গরুমারা ফরেস্ট এর বুক চিরে ন‍্যাওড়া নদীর উপর দিয়ে চলে গেছে এক রেললাইন। অরণ্য প্রকৃতির ধ্বংস করে প্রায় নির্মিত বিশালাকার ফ্লাইওভার। তবুও পশুদের বিচরণের নির্দিষ্ট পথ তো গভীর অরণ্যই। 
তাই যাতায়াতের পথে প্রকৃতির অঙ্গনে বোধের পালা আর হিমেল হাওয়ার মাঝে বেশ কয়েকবার ঘটেছে বাইসান,হরিণ,হাতির পালের সাথে অযাচিত সাক্ষাৎ..........











ছবি কপিরাইটঃ পৃথ্বীশ

দেবতাখুমের পথে..................শাহরিয়ার জাওয়াদ

দেবতাখুমের পথে..................শাহরিয়ার জাওয়াদ
বান্দরবান মূল শহর থেকে রোয়াংছড়ির বাস ছাড়ে সকাল আটটায়। এর আগের দিন বান্দরবানে এসে পৌঁছেছি বেলা বারটার দিকে- আমি, সালমান ভাই, অয়ন আর পান্থ। আমার ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে সতের তারিখ। আঠার তারিখ দুপুরে অয়ন যখন টেক্সট করলো, "ভাই, বান্দরবান চলেন কালকে, সালমান ভাই যাবেন। আপনিও চলেন।"
আমি তখন নিউমার্কেটে। বললাম, "বিকেলে বাসায় গিয়ে জানাচ্ছি।"
বিকেলে জানাবো বললেও আমাদের ট্যুর প্ল্যান ফাইনাল হলো সেদিন রাত ন'টার পরে। আমার হাতে জমানো কিছু টাকা ছিলো, বান্দরবানের জন্য ওটাই আমার একমাত্র সম্বল।
ঊনিশ তারিখ দুপুর বারটায় বান্দরবান পৌঁছে যে ব্যাপারটা আমাদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ালো সেটা- রাতে থাকবো কোথায়?
বাস স্টপেজের সামনে বান্দরবান শহরের সবচেয়ে বড় যে হোটেলটা- হিলভিউ, ওটাতে আগামী হপ্তাখানেকের মধ্যেও কোন রুম ফাঁকা পাওয়া যাবে না।
ডিসেম্বরের ধূসর আকাশের নিচে ভর দুপুরে চারজন ছেলে কাঁধে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে হাঁটছে আর ড্যাবড্যাব করে চাঁদের গাড়ির ড্রাইভারদের সাথে ট্যুরিস্টদের দর কষাকষি দেখছে।
শেষমেশ থাকার ব্যবস্থা হলো। হোটেলের নাম হিলবার্ড। তিন তলায় ডাবল বেডের পাশাপাশি দু'টো রুম পাওয়া গেল। প্রতি রুমের ভাড়া চারশ পঞ্চাশ টাকা করে।
হোটেল রুমে কোন টিভি নেই, অ্যাটাচড বাথরুম নেই। বাথরুম যা একটা আছে ওটা ফ্লোরের একপ্রান্তে। বাথরুম বা ওয়াশরুম না বলে এক্ষেত্রে পাবলিক টয়লেট টার্মটা ইউজ করা বেশি যুক্তিযুক্ত। পানির ট্যাপের কোন হাতল নেই। যেগুলো আছে সেগুলো কিছু মরচে পড়া স্ক্রু। বেসিনের ওপর আধখাওয়া সিগারেটের একগাদা ছাই ফেলে রাখা।

হোটেল রুমের প্রায় হলুদ হয়ে যাওয়া সাদা চাদর আর বালিশের কভার দেখে এক মুহূর্তের জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। এটুকু পেয়েই আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম, "থাকার জায়গাটা অন্তত পাওয়া গেলো। রাতে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে পথে পথে ঘুরতে হবে না অন্তত।"
হোটেলে ব্যাগপত্র নামিয়ে রেখেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে যাবো স্বর্ণমন্দির; বুদ্ধ ধাতু জাদি ক্যাং।
একটা মাহিন্দ্রা ভাড়া করা হলো। শহর পেরিয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে ছুটে চললো মাহিন্দ্রা।
অয়ন সাথে করে তার উকুলেলেটাও নিয়ে এসেছে। কিনে রাখা চিপস আর কেক চিবোতে চিবোতেই

অয়ন আর পান্থ উকুলেলের টুংটাং এর সাথে গলা মেলালো। মাহিন্দ্রা যেখানে এসে থামলো সেখান থেকে পিচঢালা পাহাড়ি পথ বেয়ে আরো কিছুদূর গিয়ে মন্দিরের সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠতে হয়। কিছুদূর ওঠার পর জুতা রাখার নিদৃষ্ট জায়গা আছে। নয় কী দশ বছরের একটা ছেলে গম্ভীর মুখে সেখানে বসে। প্রতি জোড়া জুতা রাখতে তার কাছে পাঁচ টাকা করে দেওয়া লাগে। ছেলেটার পাশে একটা সাইন বোর্ড, তাতে লেখা : মন্দিরে হাফ প্যান্ট বা থ্রি কোয়ার্টার পরে যাওয়া নিষেধ।
আমরা সিঁড়ি বেয়ে যত ওপরে উঠি বান্দরবানের স্বর্ণমন্দির আমাদের চোখের সামনে নিজেকে তত প্রকাশ করতে থাকে। আমরা অবাক হয়ে দেখি- কী তীব্র সেই সোনা রঙ!
সিঁড়ির শেষে মোজাইক করা বাঁধানো মেঝে। মূল মন্দিরের চারপাশে চক্রাকারে সাজানো পাথরের বেদিগুলোর ওপর মঙ্গল, বৃহষ্পতি কিংবা শনিদেবের মূর্তি। মূষিক আর গরুড় মূর্তি। মন্দিরের দেয়ালে তৈরি করা হয়েছে ছোট- বড় কুঠুরির মতো জায়গা যেখানে রাখা আছে সোনালী রঙের বেশ কয়েকটি মূর্তি। বোধ করি সেগুলো বুদ্ধেরই হবে। এ ব্যাপারে জ্ঞান স্বল্পতার কারণে মূর্তি বিষয়ক আলোচনা নাহয় তোলা থাকুক।

দু' হাজার সালে বার্মার স্থাপত্যবিদদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত মন্দিরটির পেছনের দিকে রয়েছে বড় একটি ধাতব ঘণ্টা। ঘণ্টার ফ্রেমের ওপর চারপায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে একটা ড্রাগন। মন্দিরের উঠোনে আরো আছে পৌরাণিক সিংহের মূর্তি।
মূল মন্দিরের ভেতর সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ। শুধু যারা পূজা- অর্চনার কাজে এসেছে তারাই প্রবেশ করতে পারে। তবে, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মন্দিরের ভেতরের অংশটা দেখা যায়।
মন্দিরের ভেতরে প্রায় অন্ধকার। আলো অন্ধকারের লুকোচুরি যেন কেমন একটা ইন্দ্রজাল তৈরি করেছে। সেই ইন্দ্রজালের মাঝে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বুদ্ধমূর্তিটা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।
"সালমান ভাই, কী পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে বুদ্ধের মূর্তি বানানো হয়েছে, দেখলেন!", আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম।
মন্দিরের দরজায় কিছু বয়স্কমতো লোক জটলা পাকিয়েছে। মন্দিরে কেন ঢুকতে দেওয়া হবে না, কেন তাদেরকে পঞ্চাশ টাকার টিকেট কেটে এখানে আসতে হলো- এই নিয়ে তারা মোটামুটি বিদ্রোহ ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা বৌদ্ধ ভিক্ষু অসহায়ভাবে মুখস্থ বুলির মতো আওড়ে যাচ্ছেন, "দেখুন... এটা একটা উপাসনালয়, একটু বুঝুন। সবাই ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না।"
দরজায় দাঁড়ানো প্রতিবাদী বুড়ো মানুষের দল একটু একটু করে ভারী হচ্ছে আর চেঁচামেচি বেড়ে চলেছে। তাদের কেউ কেউ আবার দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলছে, "মন্দিরেই যদি ঢুকতে না পারি, তাহলে টিকেট কেটে দেখতে আসার কোন মানে হয় না। টাকা ফেরত দেন।"

এত শোরগোল আর চেঁচামেচির মাঝেই আমরা তন্ময় হয়ে বুদ্ধকে দেখি- আহা, কী সুন্দর! আহা, কী অপূর্ব!
বান্দরবান মূল শহরে ফিরে 'কলাপাতা' রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। বেলা পড়ে এসেছে প্রায়। তবুও রেস্টুরেন্টে প্রচণ্ড ভীড়। আমাদের বসবার জায়গা হলো না। অগত্যা রেস্টুরেন্টের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। একজন ওয়েটার এসে চারটা চেয়ার দিয়ে গেলো বসবার জন্য।
আমাদের পাশেই এক দম্পতি দাঁড়িয়ে। স্বামী স্ত্রী ম্যাচিং করে একই ডিজাইনের হুডি পরেছেন। আর বাবার আঙ্গুল ধরে দাঁড়িয়ে আছে বছর চারেকের একটা মেয়ে। নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে দেখছে মানুষের ব্যস্ততা, মানুষের ছুটোছুটি। অয়ন আর সালমান ভাই তাদের দিকে তিনটে চেয়ার এগিয়ে দিলেন, "ভাইয়া, আপনারা বসেন।"
বেশ কিছুক্ষণ পর আমাদের খাবারের ব্যবস্থা হলো। অর্ডার দিলাম- ভাত, ডাল, আলুভর্তা আর মুরগির মাংসের। খাওয়ার সময় জানালার ওপাশে সেই দম্পতিকে আবার দেখতে পেলাম। স্ত্রী স্বামীর চুল ধরে টানাটানি করছেন আর স্বামী ব্যথা পাওয়ার মিথ্যা অভিনয় করছেন। বাবা- মা'র অনর্থক ভাঁড়ামি দেখে ছোট মেয়েটা হি হি করে হাসছে। বাচ্চাটার হাসি দেখে আমারও হাসি পেলো। হাসি বড় সংক্রামক। অকারণেই হাসি সংক্রমিত হয়। আমি ঠোঁট টিপে টিপে হাসছি। তাঁরা এখন জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোর একটা পার করছেন কীনা!

আমাদের বিকেলটা কাটলো নীলাচলে।
নীলাচল, বাংলাদেশের দার্জিলিং। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ছ' কিলোমিটার দূরে টাইগার পাড়ার পাহাড়চূড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে এই পর্যটন কেন্দ্র। যেখান থেকে মেঘ ছোঁয়া যায়। অবাক মেঘের বাড়ি- কথাটা নীলাচলের জন্য কোনরকম সন্দেহ ছাড়াই প্রযোজ্য।
পাহাড়চূড়ার অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি একটা অংশে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। পড়ন্ত বিকেলের নরম রোদ ছুঁয়ে

যাচ্ছে আমাদেরকে।
পাহাড়চূড়া থেকে যতদূর চোখ যায় জমাট বাঁধা কুয়াশা আর পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ। এর মাঝেই আবছা দেখা যায় পাহাড়, বান্দরবান শহর। এরপর বোধ করি সমুদ্র... দৃষ্টি অতটা পৌঁছায় না।পাহাড়ের সবুজ আর আকাশের নীল ছুঁয়ে ভেসে থাকা সাদা মেঘ, জমাট বাঁধা ধূসর কুয়াশা কী এক অদ্ভুত মোহ সৃষ্টি করে!
সালমান ভাই নীলাচল আগে একবার এসেছিলেন আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই একটা স্টাডি ট্যুরের সময়। উনি বললেন, "এখানেই থাকবা? আরো জায়গা আছে তো দেখার।"
আমি, অয়ন আর পান্থ সালমান ভাইয়ের পিছু পিছু হাঁটি। পথের মাঝে একটা ওয়াচ টাওয়ার। ওয়াচ টাওয়ারের সিঁড়ি ধরে একগাদা আণ্ডাবাচ্চা ঝোলাঝুলি করছে। অতএব, ওয়াচ টাওয়ারে ওঠার ইচ্ছাটা দমিয়ে রাখতে হলো।


নীলাচলে যে পার্কের মতো জায়গাটা আছে ওখানে বড় বড় দু'টো স্লাইড। ছেলে- বুড়ো সবাই বিপুল উৎসাহে স্লাইড বেয়ে নামছে আর হাত- পা ছুঁড়ে বাচ্চাদের মতো হাসছে। বছর পঞ্চাশেকের কাঁচাপাকা চুলের এক ভদ্রলোককে দেখলাম স্লাইডিং করতে গিয়ে নিচে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। আমরা ভাবলাম, উনি ব্যথা পেলেন কীনা। তারপর দেখি, উনি দু'পা ছড়িয়ে উঠে বসে হো হো করে হাসছেন।
বুড়ো বয়সে ছোট হয়ে যাওয়ার আনন্দ বোধহয় সবচেয়ে বেশি। যে আনন্দে কোন ফাঁক থাকে না, যে আনন্দ নির্ভেজাল হাসির মতোই ভীষণ সংক্রামক, নিমিষেই ছড়িয়ে পড়ে অন্যদের মাঝেও।
সেদিন আমরা সূর্যাস্ত দেখলাম সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ষোলশ' ফুট উঁচুতে, রেস্ট হাউজের রেলিং- এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। সোনালী- হলুদ সূর্যটা একদম পশ্চিমে পাহাড় আর কুয়াশা ছুঁয়ে অস্ত যাচ্ছে। দেখতে দেখতে হলুদ সূর্যটার রঙ হয়ে গেলো কমলা, এরপর আরো কমলা... তারপর টকটকে লাল। পশ্চিম আকাশে লাল আলো ছড়াতে ছড়াতে সূর্যটা যেন পাহাড়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়ছে। ঘুমে যেন দু' চোখ লেগে আসছে সারাদিনের ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত সূর্যটার। এরপর ঘুম, ঘুম, ঘুম। পাহাড়ের ওপাশে সূর্য হারিয়ে গেলো। আর আমি দেখলাম জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সূর্যাস্তগুলোর একটা।
সন্ধ্যায় হোটেলের সামনে যখন মাহিন্দ্রা থেকে নেমে ভাড়া পরিশোধ করছি, এমন সময় একজন পুলিশ অফিসার এসে মাহিন্দ্রা চালককে আটকালেন।
সাদ পোশাকের পুলিশ অফিসার। বিকেলে স্ত্রী- কে নিয়ে হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলেন।
প্রথমদিকে আমরা অতটা খেয়াল করি নি। একসময় দেখি, ভদ্রলোক চেঁচামেচি শুরু করেছেন। ড্রাইভারকে বললেন তার লাইসেন্স দেখাতে। লোকটা ভীত চেহারা নিয়ে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বের করে পুলিশ অফিসারের হাতে দিলো।
অফিসার সাহেব মাহিন্দ্রা চালককে কান ধরে উঠবস করাচ্ছেন; আমরা এগিয়ে গেলাম,
"আঙ্কেল, কী হইসে?"
এরপর অফিসার যা বললেন তার সারসংক্ষেপ মোটামুটি এরকম-
অন্ধকারে ছিলেন বলে আপনারা বোঝেন নি কিন্তু আমরা দেখেছি। খাঁদের পাশ দিয়ে বাঁক ঘুরবার সময় একটা বাস আপনাদের ঠিক গা ঘেষে চলে গিয়েছে। বাসের লুকিং গ্লাস ছিলো আপনাদের মাহিন্দ্রার ওপর। বাঁক ঘুরবার সময় আপনাদের মাহিন্দ্রার ড্রাইভার কোন সিগনালই দেয় নি। হর্ন দেয় নি। সে কোন সিগনাল না দিয়েই টার্ন নিতে চেয়েছিলো। আরেকটু হলেই আপনারা এখন খাঁদে পড়ে থাকতেন।

আমরা থমথমে মুখে নিজেদের রুমে ফিরে আসলাম। পান্থ বারবার বলছে, "আরেকটু হলে মরে যেতাম ভাই! এটা কিছু হলো?"
এরপরও অয়নদের রুমে আমরা তাস বের করে বসলাম। সালমান ভাই এ ব্যাপারে একদম আনাড়ি। তাঁকে পান্থ সময় নিয়ে কল ব্রিজ শেখালো। প্রথম খেলায় দান জিতে সালমান ভাইয়ের সে কী হাসি! কিছুক্ষণ আগে মনের মধ্যে জমে ওঠা ভয় ভয় মেঘ কেটে গেলো। আমরা তাসের কার্ডে মন দিলাম।
রাত সাড়ে আটটার দিকে আমরা রাতের খাবারের জন্য বেরোলাম। বাসস্ট্যান্ড ফেলে কিছুদূর সামনে এগোলেই বাজার। সাঙ্গুর তীরে একটা হোটেলে খাওয়া- দাওয়া হলো : সাদাভাত, মুরগি, সবজি, টাকি মাছের ভর্তা, শিম ভর্তা আর ডাল। আমাদের পেটে তখন রাজ্যের ক্ষুধা।

পৃথিবীর সকল শহর যেন রাতের জন্যই তৈরি। এত রঙের আলো, এত ব্যস্ততা শহরগুলোকে অপার্থিব করে তোলে। বাজারের পরই সাঙ্গু ব্রিজ। ব্রিজের ওপাশে বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট।
সাঙ্গু ব্রিজের নিচে টিন আর কাঠের ছোট ছোট খুপড়ি মতো ঘর। খুব সম্ভবত বস্তির বিকল্প কিছু একটা। এই ট্যুরে শুরু থেকেই অয়ন বলে চলেছে, "ভাই, বান্দরবান আসলাম কিন্তু বান্দর তো দেখি না কোথাও।"
অয়নের ইচ্ছা পূরণ হলো। আমরা হোটেল থেকে খেয়ে বেরিয়েছি এমন সময় ওই খুপড়ি বাসাগুলোর একটা থেকে একটা বানর ছুটে বেরিয়ে এলো। পোষা বানর। বানরটার পেছনে হৈহৈ করতে করতে ছুটে বেরিয়ে এলো বানরের মালিক। ছিপছিপে গড়নের এক কিশোর। তখন ইচ্ছেপূরণের আনন্দে অয়নের হাসি দু' কান ছুঁয়েছে।
সাঙ্গু ব্রিজের ওপর লাল- সবুজ- নীল- হলুদ স্ট্রিট লাইট। আর সাথে জাঁক দিয়ে পড়ছে কুয়াশা। আমরা সাঙ্গু ব্রিজে দাঁড়িয়ে সাঙ্গু নদী দেখি, আলো ঝলমলে বান্দরবান শহর দেখি।

শহরের শহীদ মিনারটা লাল- সবুজ বাতি দিয়ে সাজানো। আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর শহীদ মিনারগুলোর একটা। আমরা শহীদ মিনারের বেদির সামনে কুয়াশাভেজা দূর্বাঘাস মাড়িয়ে হাঁটি। হোটেলে ফিরতে হবে। সামনে একটা বড় দিন অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য।

খুব ভোরে আমার ঘুম ভাঙ্গলো। ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯, শুক্রবার। পাশের বেডে সালমান ভাই মুখ ভোঁতা করে বসে আছেন৷ ব্যাপারটা হলো, গতরাতে হোটেলের কোন এক রুমে মধ্যবয়স্ক কোন লোক মাতলামি করেছে৷ চেঁচামেচি, অশ্রাব্য গালাগাল করে পুরো হোটেল মাথায় তুলেছে। আর ওদিকে আমি আর পান্থ মড়ার মতো ঘুমিয়েছি। সালমান ভাই আর অয়ন দু'চোখের পাতা এক করতে পারেন নি কোনভাবেই।
আমি বিছানায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছি, ঘুমের রেশ তখনো কাটে নি। এর মাঝেই দেখলাম, সালমান ভাই গোসল সেরে আসলেন। মাথা মুছতে মুছতে বললেন, "বইসা আছো কেন ব্রো? রেডি হইয়া নাও।"

সকাল ছ'টার কিছু পরে হোটেলের রিসিপশনে চাবি জমা দিয়ে চেক আউট কমপ্লিট করে বেরোলাম। পুরু লেদারের জ্যাকেটেও আমার শীত মানছে না। সেলফোনে দেখলাম, টেম্পারেচার নয় ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ব্রেকফাস্ট শেষ করে আমি আর অয়ন সালমান ভাই আর পান্থকে পেছনে রেখে এগিয়ে গেলাম। রোয়াংছড়ির বাসের টিকেট কনফার্ম করতে হবে। সাঙ্গুর দু'ধারে ঘন কুয়াশা। আমরা ভোরের সাঙ্গু নদী দেখে আরো একবার অবাক হলাম। পাহাড়ি নদীগুলো এত মায়াময় হয় কেন?
বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি।
পাহাড় কেটে তার মাঝ দিয়ে রাস্তা বানানো। রাস্তার দু'পাশে পাহাড়ের ঢালে বড় বড় গাছগুলো কেমন সবুজ একটা টানেল তৈরি করেছে। কাটা পাহাড়ের শেষে একটা ছোট বাসস্ট্যান্ড। একটা টিনের তৈরি বাস কাউন্টার আর তার সাথে লাগোয়া একটা ছোট চা- সিগারেটের দোকান। সামনে একটুখানি খোলা জায়গা। ওখানেই বাস থামে। চারটা টিকেট কনফার্ম করা হলো।

ছোট্ট বাসস্ট্যান্ড থেকে সকাল ঠিক আটটা বাজে বাস ছাড়লো। আমরা আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে রোয়াংছড়ির উদ্দেশ্যে ছুটছি। রাস্তার দু'পাশে কখনো গভীর খাঁদ, কখনো পাহাড়। আকাশে ধূসর মেঘ আর পাহাড়ের বুক চিড়ে বেরিয়ে আসছে যেন মাঝারি ধরণের কুয়াশা। এর মাঝেই আমাদের বাস ছুটে চলেছে। কখনো খাড়া ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে আবার কখনো সোজা নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। আর আমরা বড় বড় চোখে পাহাড় দেখছি, মেঘে ঢাকা ধূসর আকাশ দেখছি।

রোয়াংছড়ি বাসস্ট্যান্ড পেরোলেই টেরেক খাল। এই খালের একটা দিক গিয়ে মিশেছে সাঙ্গু নদীতে, আরেকটা দিক মিশেছে দেবতাখুমে।
রোয়াংছড়ি বাজারে আমাদের সাথে আমাদের গাইডের দেখা হলো। গাইডের নাম মং মারমা। হাসিখুশি, আন্তরিক একজন মানুষ। একটা হোটেলে বসে দু'টো ফরমে আমরা আমাদের ব্যাসিক ইনফোগুলো পূরণ করলাম। প্রতিটা ফরমের সাথে একটা করে আইডি কার্ডের ফটোকপি। এগুলোর একটা জমা পড়বে পুলিশ চেকপোস্টে। আরেকটা জমা দিতে হবে কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্পে।
রোয়াংছড়ি বাজার থেকে একটা মাহিন্দ্রা ঠিক করা হলো। এখানেও সেই পাহাড়ি পথ। আমরা নিজেদের নিঃশ্বাস চেপে চোখ বড় বড় করে মাহিন্দ্রায় বসে আছি। উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ ধরে আমাদের মাহিন্দ্রা ছুটে চলেছে।

দেবতাখুমের একটা গল্প আছে। পৌরাণিক গল্প বলতে পারেন খানিকটা। 'খুম' শব্দের অর্থ জলাশয়। দেবতাখুম বলতে বোঝায় দেবতার জলাশয়। কচ্ছপতলী থেকে টেরেক খালের অববাহিকা ধরে ট্র‍্যাকিং করতে করতে পৌঁছাবেন শিলাবদ্ধ পাড়ায়। এখানে স্থানীয় মারমা উপজাতির বাস। তাদের নিজস্ব মোড় আছে, নিজেদের স্বকীয় কিছু আচার- ব্যবহার আছে। এই মানুষগুলো মনে করে : দেবতাখুমের কোন তল নেই, খুমের নিচে মাটি নেই। খুমের গভীরে দু'টো 'স্বর্ণ মাছ' বাস করে খুম সৃষ্টির পর থেকেই। মাঝে মাঝে তাদের দেখা যায়। তারা গ্রামবাসীর সৌভাগের প্রতীক, শক্তির প্রতীক, মাছগুলো তাদের মৎস দেবতা।
মানুষগুলো শিকার করে, মাছ ধরে, পাহাড়ের ঢালে কৃষিকাজ করে পুরো জীবনটা কোন রকম ঝুট ঝামেলা ছাড়াই পার করে দেয়।
ওহ.. হ্যাঁ, দেবতাখুমের গভীরতা মোটামুটি ত্রিশ ফুট।

কচ্ছপতলী পৌঁছে আমরা নিজেদের জামা- কাপড় বদলে নিলাম। ভারী জ্যাকেট আর জিন্স বদলে টিশার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার ট্রাউজার। টেম্পারেচার তখন বারো থেকে চৌদ্দ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে।
আর্মি ক্যাম্পে সব ধরণের ব্যাসিক ইনফো আর কাগজপত্র জমা দেওয়া হলো। পুলিশ ফাঁড়িতে কাগজপত্র আগেই জমা দেওয়া হয়েছে। কচ্ছপতলীর একটা আদিবাসী পাড়ার মধ্য দিয়ে কিছুদূর এগিয়েই আবার টেরেক খাল। ওখান থেকেই আমাদের ট্র‍্যাকিং- এর শুরু।
দু'টো বড় পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে টেরেক খাল। পাহাড়ের গায়ে জন্মেছে পত্রঝরা আর চিরহরিৎ বৃক্ষ, বিশালাকৃতির ফার্ন আর পাহাড়ি কলাগাছ। আমরা কিছুক্ষণ খালের পানিতে পা ডুবিয়ে হাঁটছি আবার কিছুক্ষণ পাহাড়ের গা বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।
একটা জায়গায় এসে পান্থ দাঁড়িয়ে গেলো, "ভাই, এই গাছগুলা দেখেন তো?"
আমি একটু ঝুঁকে এলাম। ফার্নের মতো দেখতে কিছুটা। পপি গাছ। আফিম।

পৌনে দুই ঘণ্টা ট্র‍্যাকিং- এর পর আমরা এসে পৌঁছলাম শিলাবদ্ধ পাড়ায়। এই সেই আদিবাসী গ্রাম। এটা পেরোলেই খুমের শুরু।
ছোট্ট গ্রামটাকে ঘিরে আছে নারিকেল গাছ। একটা বাঁশের টংঘরে বসে এক বৃদ্ধা গাছের ছায়ায় আয়েশ করে পাইপ টানছেন। দু'জন বাচ্চা আবার পোষা কুকুরের পিঠে ওঠা নিয়ে ঝগড়া বাঁধিয়েছে। আদিবাসী নারীদের কেউ তাঁত বোনায় ব্যস্ত আবার কেউ রান্না বান্নার কাজে ব্যস্ত। শিলাবদ্ধ পাড়ার শেষ প্রান্তে একটা বাঁশের মাচা। মাচায় বসে দেবতাখুমের পাহাড় দু'টোকে দেখতে দেখতে বোধ করি কয়েকটা বছর ক্লান্তিহীনভাবে অনায়াসে পার করে দেওয়া যায়। কিন্তু এরকম ভয়ানক সৌন্দর্যের কাছে বেশিক্ষণ থাকতে হয় না। আমরা শিলাবদ্ধ পাড়া থেকে নিচে নেমে এলাম।

শিলাবদ্ধ পাড়া থেকে নিচে নেমে আসতে গিয়ে বিপত্তি বাঁধালাম আমি। আমার অ্যাক্রোফোবিয়া আছে। সহজ বাংলায় যেটাকে বলে 'উচ্চতায় ভয়'। সরু একটা পাথর খোঁদাই করে বানানো লম্বা সিঁড়িটা বেয়ে নিচে নেমে আসতে বেশ কসরত করতে হলো আমাকে। আমার সীমাবদ্ধতা আমি এখানে অকপটে স্বীকার করছি।
নিচে, ভেজা ভেজা বালির ওপর একদল আদিবাসী ছেলে- মেয়ে খেলছে। আমাদের ইচ্ছা হলো, বাচ্চাগুলোর সাথে ছবি তুলবো। মং আঙ্কেল মারমা ভাষায় তাদেরকে ডাকলেন। ওরা আমাদের চারপাশে এসে জড়ো হলো। মং আঙ্কেল 'রে' বলেন আর ওরা খিলখিল করে হেসে ওঠে। আর আমরা ছবি তুলি। পরে মং আঙ্কেলের কাছ থেকে জেনেছিলাম, 'রে' মানে হলো হাসি।
ওখান থেকে দুই- তিন মিনিট হাঁটলেই একটা ঝুপড়ি মতো খাবার দোকান। সাথে ভেলা আর লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থাও তারাই করে। আমরা খাবারের অর্ডার দিলাম। চারজনের জন্য লাইফ জ্যাকেট নিলাম। লাইফ জ্যাকেট পরে মং আঙ্কেলের সাথে হাঁটছি। এখান থেকে আরো কিছুদূর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এগিয়ে যেতে হবে৷ তারপর টেরেক খাল ধরে নৌকায় চড়ে দেবতাখুম।
এই জায়গাটাতে টেরেক খালের পানির রঙ সবুজ আর নীলের মাঝামাঝি। খালের দু'পাশে পাহাড়। পাহাড়ের পাথুরে শরীরে জমে আছে শ্যাওলা। এই জায়গাটাকে খাল না বলে গিরিখাঁদের শুরু বললে বেশি উপযোগী হয়।
এখানেও পাহাড়ের গায়ে জন্মে আছে বিশালাকার ফার্ন আর পাহাড়ি কলাগাছ। এখানে ওখানে পাথুরে মাটি ভেদ করে ওঠা কিছু মাঝারি আকৃতির চিরহরিৎ বৃক্ষ। এর মাঝ দিয়ে চলতে চলতেই আমাদের নৌকা মূল খুমের সামনে একটা পাথুরে জায়গায় এসে ভিড়লো। এখান থেকে ভেলা নিয়ে এগোতে হয়।


আমরা যখন পৌঁছলাম, তখন সেখানে ভেলার সঙ্কট চলছে। একটা ভেলাও সেই পাথুরে ডাঙ্গায় ভেড়ানো নেই। আমাদের চারজনের পিছু পিছু সেখানে এসে পৌঁছলো ছয়জনের আরো একটা গ্রুপ। দুই জন নারী আর চারজন পুরুষ। পুরুষদের মধ্যে একজন বয়স্ক। লোকটা তার মাথার টাক কাউবয় হ্যাট দিয়ে ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। আমার কেন জানি খুব হাসি পেলো। দেবতাখুমের সাথে কাউবয় হ্যাট বেমানান কিন্তু মাথার টাক বেমানান নয়। নিজের অপূর্ণতাকে স্বীকার করতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু মানুষ কোন এক বিচিত্র কারণে নিজের অপূর্ণতাকে মেনে নিতে চায় না। তার দলের বাকি পাঁচজন যুবক- যুবতী। কিছুক্ষণ পর যখন পাথুরে ডাঙ্গায় একটা- দু'টো ভেলা ভিড়তে শুরু করলো তখন সেই ছয় জন তাড়াহুড়ো করে ছুটে গিয়ে ভেলাগুলো দখল করলো। আমরা হাসলাম।
অবশেষে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পরে আমরা নিজেদের জন্য দু'টো ভেলা পেলাম। সালমান ভাই আর অয়ন উঠলেন একটাতে। আমি আর পান্থ অন্যটায়।
আমাদের চারজনের মধ্যে আমার জন্য এটা ভেলা চালানোর প্রথম অভিজ্ঞতা। আমি একদমই আনাড়ি। অয়ন আর পান্থ ভেলা না চালালেও তাদের কায়াকিং করার অভিজ্ঞতা আছে। আর সালমান ভাই এদিকে বেশ পুরোনো মানুষ। ছোটবেলায় কলাগাছের ভেলা বানিয়ে তাকে সেই ভেলায় চড়ে বর্ষাকালে স্কুলে যেতে হতো কীনা!

ভেলায় আমি বসেছি সামনে আর পান্থ পেছনে। প্রথম দশ পনেরো মিনিট আমাকে দাঁড় বাওয়ার ব্যাসিক শেখাতেই পার হয়ে গেলো। দাঁড় হিসেবে আমাদের হাতে আছে একটা করে চার ফুট লম্বা কাঁচা বাঁশ। ওগুলো দিয়েই খুমের শান্ত নীল পানি কেটে এগিয়ে চলেছি আমরা। আমাদের ওপর দেবতাখুমের দু'পাশের বিশাল পাহাড়দু'টোর ছায়া এসে পড়েছে।
খুমের শুরুর দিকের একটা প্রশস্ত অগভীর অংশে সবসময়ই ভেলার জ্যাম লেগে থাকে। কিছুটা এলাকার মোড়ের বাস স্টপেজের মতো অবস্থা। কেউ ভেলা থামিয়ে ছবি তুলছে। কেউ ফিরতি পথে ভেলা ঘোরাচ্ছে আবার কেউ আমাদের মতো খুমের ভেতরে প্রবেশ করছে।
আমার আর পান্থ- র ভেলা দুইবার অগভীর জায়গায় নিচের পাথরে আটকে গেলো। বেশ ধাক্কাধাক্কি করে, বেশ কায়দা করে ভেলার এই সমস্যা দূর করা হলো।

ভেলা এগিয়ে চলেছে দেবতাখুমের শান্ত নীল পানি কেটে। আমার আর পান্থ'র তখন অদ্ভুত নেশা পেয়ে বসেছে- সবুজের নেশা, স্বচ্ছ নীল পানির নেশা। আমরা দুইজন ভেলায় বসে হাঁটু অব্দি পা ডুবিয়ে দিয়েছি খুমের বরফশীতল পানিতে। খুমের শেষপ্রান্তে দুই পাহাড়ের মাঝে শেষ বাঁকটা অপার্থিব সুন্দর। এই সৌন্দর্য লিখে বা বলে প্রকাশ করা অসম্ভব। কিছু সৌন্দর্য শুধু দেখেই বোঝা যায়, উপলব্ধি করা যায়। সেইসব সৌন্দর্যকে লিখে বা বলে প্রকাশ করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা মানুষকে দেন নি।
আমি আর পান্থ সালমান ভাইদের সাথে দেবতাখুমের শেষ বাঁকটার কাছে গিয়ে একসাথে হলাম। দু'টো ভেলা পাশাপাশি রেখে চারজন একসাথে সামনে এগিয়ে যাই আর মুগ্ধ চোখে দেবতাখুম দেখি।

খুমের শেষ প্রান্তে গিয়ে সালমান ভাই পাথরে ভেড়ানো আরেকটা ভেলা নিলেন। আমি আর পান্থ একটা ভেলায় আর অয়ন- সালমান ভাই ভিন্ন দু'টো ভেলায়। আমাদের গাইড মং আঙ্কেল অন্য ভেলা থেকে তাড়া দিচ্ছেন বারবার। আমাদের ফিরতে হবে।
ভেলা থেকে পাথুরে ডাঙ্গায় নামবার পর আমি আর পান্থ বুঝতে পারলাম কী ভুলটা করেছি! ঠাণ্ডা পানিতে দীর্ঘক্ষণ ডুবিয়ে রাখায় আমাদের দুই জনের পা অসাড় হয়ে গিয়েছে। আমি দাঁড়াতেই পারছিলাম না। নৌকায় টেরেক খালের অংশটুকু পেরোবার পর খাবারের দোকানে পৌঁছানোর পথটুকুতেই আমি আবার বিপত্তি বাঁধালাম। ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া পা আর চলে না। মং আঙ্কেল আমাকে ধরে ধরে পাহাড়ের ঢালটুকু পার করালেন।

খাবারের দোকানটায় পৌঁছে লাকড়ির চুলার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের ভেজা জামাকাপড় শুকোলাম। আগুনের কাছে যাওয়ার পর আমার পায়ের স্নায়ু কাজ করতে শুরু করেছে৷ আমরা হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসলাম। খাবারের অর্ডার ছিলো- সাদাভাত, সেদ্ধ ডিম, সবজি, ডাল আর আলুভর্তার। খাবার যখন সার্ভ করা হলো টেবিলে, আমরা চারজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। দেশি মুরগি তো আমাদের অর্ডারে ছিলো না। তখন মং আঙ্কেল মুচকি হাসলেন, "ভাইয়া, এগুলা আপনারা খান। এগুলা আমার পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য ছোট্ট গিফট। আপনারা ভালো মানুষ।"
মানুষটার কথা শুনে আমরা হাসলাম। খেতে বসে আমাদের আড্ডা জমে উঠলো। মং আঙ্কেলের সালমান ভাইকে খুব পছন্দ হয়েছে। তিনি হাসছেন আর আবদুল্লাহ সালমান নামের গোলগাল থলথলে মানুষটাকে কিছুক্ষণ পরপর 'ইস্পাত ভাই' বলে ডাকছেন।

আমরা যখন কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্পে ফিরে এলাম তখন সন্ধ্যা পৌনে ছয়টা। ডিসেম্বরের বিকেল খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়। হঠাৎ করেই বঙ্গদেশে অন্ধকার নামে। ট্র‍্যাকিং এর কিছু পথ আমাদেরকে মোবাইলে ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। ক্যাম্পে বসে থাকা মিলিটারি আমাদের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, "ফিরে আসার সময় কখন ছিলো আপনাদের?"
মং আঙ্কেল কাচুমাচু মুখে বললেন, "সাড়ে পাঁচটা।"
"পনেরো মিনিট লেইট কেন?"
সালমান ভাই হাসি হাসি মুখে বললেন, "আমরা ঠিকঠাক পাহাড় বাইতে পারি না তো..."
চেকপোস্টে বসে থাকা গোমড়ামুখো আর্মি সদস্য হো হো করে হাসতে শুরু করলেন।
আমাদের ফিরতে হবে। কচ্ছপতলী থেকে বান্দরবান। সেখান থেকে কোন একটা বাস ধরে চট্টগ্রাম। রোয়াংছড়ি থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে শেষ বাসটা অনেক আগেই ছেড়ে গিয়েছে। মং আঙ্কেল আমাদেরকে কচ্ছপতলী থেকে বান্দবান শহর পর্যন্ত একটা মাহিন্দ্রা ঠিক করে দিলেন।

আমরা যখন মাহিন্দ্রায় চড়ে বসবো তখন আমি মং আঙ্কেলকে জিজ্ঞেস করলাম, "আঙ্কেল, তারা'কে মারমা ভাষায় কী বলে?"
"ক্রে।"
আমি এক লাফে মাহিন্দায় উঠে বসলাম।
মাহিন্দ্রা ছেড়ে দিয়েছে৷ মং আঙ্কেল এক আকাশ তারার নিচে দাঁড়িয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে নেড়ে চোখ মুছছেন, "ভাইয়া, আবার আসবেন পারলে। ভালো থাকবেন খুব।"
কেন জানি না, মাত্র একদিনের পরিচিত মধ্যবয়ষ্ক মানুষটার জন্য আমার চোখের কোণ ভিজে উঠলো। মানুষের মন বড় অদ্ভুত। এই মনে কোন যুক্তি খাটে না। যুক্তিতে সবকিছু হয় না বোধহয়!
এবার বাড়ি ফিরতে হবে।