Showing posts with label রাকিব সামছ শুভ্র. Show all posts
Showing posts with label রাকিব সামছ শুভ্র. Show all posts

অনেক মায়ের এক সন্তান........রাকিব শামছ শুভ্র

অনেক মায়ের এক সন্তান........রাকিব শামছ শুভ্র

মি কার ঔরসজাত সন্তান, সেটা মা কখনোই বলতে পারেনি। পারার কথাও না। আমার জন্মটাই যে এক আশ্চর্য! আমি একটা সময় পর্যন্ত মাকে প্রচন্ড ঘৃণা করতাম। নিজেকে অস্পৃশ্য মনে হতো। সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতাম। মায়ের পরিচয় দিতেও লজ্জা পেতাম। কেন আমার সাথেই এমন হলো?

স্বাধীনতার পরপরই মা আমাদের গ্রাম থেকে রাতের আঁধারে পালিয়ে শ্রীমঙ্গল চলে যায়। আমি তখন মাত্র কয়েক মাসের বাচ্চা। মা ওখানে চা বাগানে কাজ নেয়। আমার মায়ের গায়ের রং শ্যামলা কিন্তু চোখা নাক খুব সুন্দর। খুব মায়াময় চেহারা। সহজেই সবার চোখে পরতেন। আর আমার চেহারা? একেবারে ফর্সা, লম্বা ছয় ফুট। দেখলে যে কেউ ভাবে পাঠান!!

আমার বাবা করিম উদ্দিন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সাথে সাথেই এপ্রিলের শুরুতে পালিয়ে ভারত চলে যান ট্রেনিং নিতে। রমিজ চাচা বাবার খুব কাছের বন্ধু ছিলেন। এক সময় মাকে খুব পছন্দ করতেন। মায়ের বিয়ে হয় বাবার সাথে, তখন থেকেই তার হিংসা ছিলোই। বাবা যুদ্ধে যাবার পর থেকেই তার আমাদের বাড়িতে আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিলো। মায়ের কাছ থেকে বাবার খোঁজ জানতে চাইতেন। মা কখনোই বলেনি বাবা কোথায় গিয়েছে। রমিজ চাচা ধারণা করতে পেরেছিলেন বাবা যুদ্ধে গেছেন। একদিন রাতে দরজা ঠকঠকালো। মা ভয়ে ভয়ে দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন কে? বাহির থেকে উত্তর এলো, ভাবি আমি রমিজ দরজা খুলেন। আমার মা সরল বিশ্বাসে দরজাটা খুলে দিয়েছে। দরজা খুলতেই তিন চারজন পাকিস্তানি আর্মি ঘরে ঢুকলো। এরপর টানা সাত মাস আমার মায়ের উপর দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চলেছে। আর এরই ফসল হচ্ছি আমি। নিজেকে ভালোবাসার কোন কারণ আছে কি?

আমি এসব কিছুই জানতাম না। মা নিজের পরিচয় লুকিয়ে চা বাগানে কাজ নিয়েছে। সেখানেও মা খুব শান্তিতে ছিল তা না! বড় বাবু ছোট বাবু সহ আরো অনেকেই মায়ের একা থাকার সুযোগটা নিয়েছে। মা সব সহ্য করেছে শুধু আমার জন্য। মায়ের একটাই ব্রত ছিল, আমাকে মানুষ করতে হবে। আমি মাকে বাবার কথা জিজ্ঞেস করলেই মা এড়িয়ে যেতো। যখন আমার ১১ বছর বয়স! একদিন মা আমাকে ডেকে অনেক কথা বলল। তখন সব কথার মানে বুঝিনি। বরং মায়ের উপর আমার ঘৃণা জন্মেছে রাগ, অভিমান। মনে আছে অনেকদিন মার সাথে কথা বলা বন্ধ রেখেছিলাম।

আমার বাবার পরিচয় না কি মায়েরও জানা নেই। মা মাঝে মাঝে বলতো, মায়ের উপর কতজন যে অত্যাচার করেছে কোন হিসেব নেই। শুধু একজনের কথা আলাদা করে বলতে পারে মা। ইয়াসির খান। সবার মতো সেও মাকে ভোগ করেছে কিন্তু কোথায় যেন তার একটা টান ছিল মায়ের প্রতি। মাঝে মাঝে নিজের খাওয়া থেকে কিছু খাওয়া উঠিয়ে রাখতো মায়ের জন্য। সবাই যখন অত্যাচার করতো, একমাত্র ইয়াসির খানে সে মাঝে মাঝেই ওষুধ খাইয়ে যেত। মায়ের কেন যেন মনে হয়, আমার মধ্যে মা ইয়াসির খানের ছায়া দেখতে পায়। আমার শারীরিক গড়ন রং চেহারার আদল নাকি ইয়াসির খানের সাথে মিলে যায়। আমি বুঝতে পারিনা লোকটাকে কি আমি মায়ের অত্যাচারী হিসেবে ঘৃণা করবো নাকি নিজের বাবা হিসেবে মেনে নিবো? নিজেকে জারজ সন্তান ভাবতে খুব কষ্ট হয়। সবকিছু ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করে।

মা আমাকে কতোটা ভালোবেসেছে তা এখন উপলব্ধি করি। আমি যখন হতবিহ্বল হয়ে যেতাম কিংবা হতাশায় ভুগতাম! মা বলতো, তোর বাবা কে আমি জানি না কিন্তু তুই আমারই ছেলে এটা জানি। তোর কি আমার পরিচয়ে বড় হতে সমস্যা আছে? আমি মেনে নিতাম আবার নিতাম না।

মায়ের আগ্রহে আর পরিশ্রমের ফল আমি আজ পড়াশোনা শেষ করে বড় চাকুরে। এখন আর আমার অতীত কেউ জানতে চায় না। আমার পরিচয়েই আমি পরিচিত। একটা সময় মাকে আমি অভিমানে দূরে সরিয়েছি আর এখন? আমি সারাদিন আমার হারিয়ে যাওয়া মাকে খুঁজি অন্য মায়েদের মাঝে। আমার মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন এগারো বছর আগে। আমি বিয়ে থা করিনি। সারাদেশে চষে বেড়াই আর সেই মায়েদের খুঁজে বের করি, যারা ১৯৭১ এ পাকিস্তানিদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছে এবং এখন কষ্টে দিনাতিপাত করছে। আমি তাদের আমার কাছে নিয়ে আসি। আমার এক মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন এখন আমার কাছে আরো চার মা আছেন। একদিন হয়তো আমার কাছে হাজারো মা থাকবেন। আমি আমার মায়েদের মাঝেই আমার হারিয়ে যাওয়া মাকে পাই। নিজেকে এখন আর একা মনে হয় না। হাজারো বীরাঙ্গনা মায়েদের আদরের সন্তান হয়েই এদেশে আমার বেঁচে থাকা।


বিঃদ্রঃ এটা সত্য ঘটনা না। তবে অনেক সত্য ঘটনা আমরা হয়তো জানিও না।

সমুদ্র বিলাস................রাকিব সামছ শুভ্র

সমুদ্র বিলাস................রাকিব সামছ শুভ্র
'গরীব মিসকিন আত্মীয় বাসায় আসা মানেই টাকা ধার চাইতে আসা' ফুপার শুনিয়ে জোরে বলা কথাটা হয়তো অপমান সূচক। কিন্তু আমি শুনেও না শোনার ভান করলাম। পাশে বসা ফুপুর চেহারার দিকে তাকাতে সাহস হচ্ছে না। না তাকিয়েও আমি বেশ বুঝতে পারছি, তার বড় ভাইয়ের এই ছেলেটার জন্য দুয়েক ফোটা অশ্রুজল ভালোবেসে গড়িয়ে পরছে।
ঢাকা শহরে আমার এই একজনই আত্মীয় যে কিনা নিঃস্বার্থভাবে আমাদের ভালোবাসেন। নিজেদের প্রয়োজনে হলেও এখানে আমরা মাঝে মাঝেই আসি। বাসার সবাই খুব আনন্দচিত্তে আমাদের আসাকে পছন্দ করে বললে ভুল বলা হবে। তারপরও আপন ভাইয়ের ছেলে তাই হয়তো মেনে নেয়।

আমি আব্দুর রহমান, বিএ। মফস্বলের কলেজ থেকে পড়াশোনা করে ঢাকায় এসেছিলাম দশ বছর আগে। এই ফুপুর বাসাতেই উঠেছিলাম। ডুপ্লেক্স বাড়ির গেস্ট রুম সারা বছর খালি পরে থাকে, তারপরেও আমার জায়গা হয়েছিলো ড্রাইভারের থাকার ঘরে। রুমটা বাসা লাগোয়া গ্যারেজের উপরে। অনেকটা দেড়তলা উচ্চতায়। আমার তাতে অবশ্য আপত্তি ছিলোনা। ফুপু কষ্ট পেতেন কিন্তু আমার হাসিমুখ তাকে একটু দম ছাড়ার সুযোগ করে দিতো। পড়ালেখায় মোটামুটি হলেও সততায় একশোতে কানা কড়ি নাম্বারো কেউ আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। এবাসায় এসে আমার উপর প্রথম দায়িত্ব পরলো বাজার করবার। আমি প্রায় একবছর এ দায়িত্ব পালন করেছি এবং একদিনের জন্যেও একটা টাকা এদিক ওদিক করিনি। ফুপা উঠতে বসতে অপমান করলেও ঝানু ব্যবসায়ী। মানুষ চিনতে কখনো ভুল করেন না। বাজারের খরচ কমে যাওয়াতেই ফুপুকে একদিন বললেন, তোমার ভাইপো আব্দুর নাজানি আব্দুল! ওকে আমার অফিসে পাঠিয়ে দিও। ওকে অফিসে একাউন্ট সেকশনে বসিয়ে দেবো। পরের দিন থেকেই আমার ফুপার অফিসে এসিস্ট্যান্ট একাউন্টেন্ট এর চাকুরি শুরু। বেতন ধরলেন সাড়ে ছয় হাজার টাকা।

চারবছর মনপ্রাণ দিয়ে চাকুরি করারপর একদিন ফুপু ঘরে ডেকে পাঠালেন। ফুপার চাচাতো ভাইয়ের এক মেয়ের জন্য আমাকে প্রস্তাব করতে চান। আমি না বলে দিলাম। আমার যা সামর্থ্য! বিয়ে করাটাই বোকামি হবে তাও আবার ফুপার ভাইয়ের মেয়ে! ফুপু অনেক করে বোঝালেন, এই ভাই পয়সা ওয়ালা না। প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক, পাঁচটা মেয়ে। মেয়েরা বড় হচ্ছে পয়সার অভাবে বিয়ে হচ্ছে না। ফুপা কোন প্রকারের দায়িত্ব নেন না। যদিও ফুপা নাকি এই ভাইয়ের কাছে থেকেই পড়ালেখা করেছেন প্রাইমারী স্কুলে। ফুপু ভাইয়ের ঋণ শোধ করতে চান মেয়েকে ভালো পাত্রস্থ করে। আমাকে মেয়ে পক্ষ কিছুই দিতে পারবে না আর আমারও তাদের কিছুই দেওয়া লাগবে না। ফুপু আমাকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, আমার মিয়াভাই গরীব হতে পারেন কিন্তু আমার জন্য জীবনে জান দেয়া ছাড়া সব করেছেন হয়তো চাইলে জানটাও দিয়ে দিতেন। তার ছেলে তুইও হয়েছিস বাবার মতোই। আর আমার ভাসুরের মেয়ে নিতুও খুব লক্ষ্মী। তোরা খুব সুখী হবি রে। আমি কিছু বলতে পারিনি। ফুপুর পা ছুঁয়ে সালাম করে শুধু বললাম, ফুপু তুমি দোয়া কর এবং যেটা ভালো মনে হয় কর। আমার আপত্তি নেই। ফুপু আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বিড়বিড় করে বললেন, মা মরা মেয়েটা ভালো একটা ঠিকানা পেলো।

নিতু আর আমার বিয়ে হয়ে গেলো মাস খানেকের মধ্যেই। কাজী সাহেবকে ডেকে আমার বাবা মা, বোনেরা আর ওদের পরিবারের চারজন সবমিলিয়ে দশ বারোজন। শুধু এই একটা দিন ফুপাকে দেখলাম বেশ হাসিখুশী। ফুপুই পোলাও কোরমা রাঁধালেন। ওনার বাসাতেই খাওয়া দাওয়া হলো। নিতুকে আমার এক রুমের বাসায় তুললাম। মিরপুর এক নাম্বার মাজারের পেছনে একরুম সাবলেট নিয়েছি। 
তখন সর্বসাকুল্যে বেতন পেতাম দশ হাজার টাকা। ঘর ভাড়া দিতাম সাড়ে তিন হাজার সাথে গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল আটশো টাকা। অফিসে যেতে আসতে খরচ হতো চারশো টাকার মতো। দুজনে খেয়ে পড়ে কিছু টাকা জমানো যেতো। তা সে দুশো টাকাই হোক কিংবা পাঁচশো টাকা। নিতু খুব বেশী লক্ষ্মী মেয়ে। কোনদিন মুখ ফুটে কিছু চায় না। আমি যা এনে দেই তাই হাসিমুখে গ্রহন করে। পাঁচ সাতশো টাকার শাড়ী পড়ে যখন সামনে আসে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রই! এই মেয়েটা আমার বউ? এতো অল্পতেই এতো খুশী কিভাবে থকে মানুষ! ওর শুধু একটা প্রিয় জিনিস আছে আমি তা জানি। বাসায় ফ্রিজ নেই নয়তো আমি কষ্ট হলেও বাক্স ভরে নিয়ে আসতাম। আইসক্রিম খেতে খুব পছন্দ করে। অবশ্য ও কমলা রঙের ললি আইসক্রিম ছাড়া অন্য আইসক্রিম কখনো খায় না। অনেকবার জোর করেছি কিন্তু রাজি হয় না। ও অদ্ভুত ভাবে আইসক্রিম খায়। মুখে নিয়ে টেনে চুষে আইসক্রিমের রস আর কালারটুকুন খেয়ে নেয়। আইসক্রিমটা তখন একেবারে সাদা হয়ে যায়, শুধুই বরফ। সেই বরফটাই কামড়ে কামড়ে খাবে। আমার কাজ হচ্ছে ওই সময়টা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে দেখা। আমি আইসক্রিম খাই না। একটা খেলেই সাতদিন গলা ব্যথা করে। টনসলের সমস্যা ছোট বেলা থেকেই। 

পাঁচ বছরে আমাদের সংসারের পালে খুব একটা পরিবর্তনের হাওয়া লাগেনি। বেতন বেড়েছে আমার। এখন চোদ্দ হাজার পাচ্ছি। নিতুও পাশের একটা কিন্ডারগার্টেনে পড়াচ্ছে। বেতন শুনলে হাসবেন। দেড় হাজার টাকা। স্কুলের আয়ার বেতন চার হাজার টকা! জিজ্ঞেস করে জেনেছি ওদের প্রিন্সিপাল বলেন, আয়াতো আর টিউশনি করে আয় বাড়াতে পারবে না কিন্তু নিতুতো টিউশনি করলে হাজার টাকা কামাতে পারবে! নিতু একটা টিউশনি করায় বেতন নির্ধারণ করে দেয় নি। আয়ার মেয়ে বাসায় এসে পড়ে যায়। যখন যেমন পারে দেয়। কখনো দুইশো কোন মাসে তিনশো। আমি বলেছিলাম তুমি ফ্রি পড়ালেই পারো এই দুশো তিনশো টাকা না নিলেই হয়। ও উত্তরে বলেছিলো ফ্রি পড়ালে গুরুত্ব দিবে না। এখন টকা দিতে হচ্ছে বলেই নিজে থেকে বাচ্চাকে পড়তে দিয়ে যায়। ওর যুক্তিতে কিছু বলার পাইনি। 
আমরা সাবলেট থেকে বেড়িয়ে নিজেরা একটা দেড়রুমের বাসা নিয়েছি। একটা বেডরুম সাথে আধাখানা ডাইনিং, একটা ছোট্ট রান্নাঘর। একটা বাথরুম আর আমাদের প্রিয় জায়গা একটা চার ফিট বাই আড়াই ফিটের বারান্দা। নিতু খুব সুন্দর করে সাজিয়ে নিয়েছে ঘর। বারান্দায় কয়েকটা গাছও লাগিয়েছে। নীল অপরাজিতা, একটা গোলাপ আর দুটো ঝুলন্ত গাছ শোভা বাড়াচ্ছে আমাদের বারান্দার। ছোট দুটো টুল পেতে মাঝে মধ্যেই আমরা চা পান করি আর দুজনে স্বপ্নের কথা বলি। বিয়ের পরে একটা আব্দার করেছিলো নিতু। যদি কোনদিন আমাদের টাকা হয় তাহলে যেনো ওকে একবার সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাই! সত্যি কথা বলতে কি! আমি নিজেও কখনো সমুদ্র দেখিনি। আমার খুব ইচ্ছে করে এক গোধুলিবেলায় নিতুর হাত ধরে সমুদ্র জলে পা ভিজাবো। ও নীল রঙের শাড়ী পড়বে, ওর আঁচল বাতাসে উড়বে। আমি একদিকে পড়ন্ত সূর্যকে দেখবো অন্যদিকে আমার জীবনের জ্বলজ্বলে সূর্যকে সাথে নিয়ে। 
হিসেব করে দেখেছি যাওয়া আসা, হোটেলে থাকা খাওয়া সব মিলিয়ে দশ বারো হাজার টাকা লাগবেই। এই টাকাটা কতবার চেষ্টা করেছি যোগাড় করতে। কোননা কোন ভাবেই টাকাটা খরচ হয়ে যায়। একটা কথা বলা হয়নি। চার বছর আগে নিতু আর আমার ভালোবাসার ফসল অনির জন্ম। এরপর থেকে আমাদের জীবন এবং জীবনের গল্প অনিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। পাওয়া না পাওয়া সব ওকে নিয়েই।
প্রতিবার টাকা জমাতে জমাতে দশ হাজারের কাছে গেলেই একটা বিপদ কিংবা প্রয়োজন এসে সামনে দাঁড়ায়। একে এড়িয়ে টাকাটা ধরে রাখা আর হয় না। গত দুই বছর ধরে প্রতিমাসে বেতন থেকে পাঁচশত টাকা আলাদা করে আলমারিতে রাখা ছোট বক্সে রেখে দেই। এবার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছি এই টাকা ভাঙবো না। নিতু আর অনিকে নিয়ে সমুদ্র দর্শনে যাবোই। গতমাসে দশ হাজার টাকা পূর্ণ হয়েছে। মাঝে মাঝে লুকিয়ে গুনে দেখি সাথে দিবা স্বপ্নে হারিয়ে যাই। এখন অবশ্য স্বপ্নে দুজন দুজনের হাত ধরিনা বরং দুজনে মিলে অনির দুহাত ধরে সমুদ্র জলে পা ভিজাই। 
মনে মনে ঠিক করেছি ওদের চমকে দেবো সবকিছু ঠিক করে। ছুটি নেয়ার চেষ্টা করছি। নিতুকে বলতেই ওর মুখে খুশীর ঝলক দেখতে পেলাম। আর চার বছরের অনিটা! পুরো বাসা জুড়ে প্রজাপতির মতো উড়ছে আর বলছে, কি মজা সমুদ্দ দেখতে যাবো, সমুদ্দ দেখবো (ও এখনো সমুদ্র বলতে পারে না। সমুদ্দ বলে।) ওর আনন্দ দেখে আমাদের চোখে পানি চলে এসেছে। আমি নিতুকে আমার বাহুডোরে টেনে নিলাম। ও আমার বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে। আর আমাদের পাকনা পাখিটা এসে দুজনকে জড়িয়ে ধরেছে। এরচেয়ে বেশী সুখ আর কি বা চাওয়ার আছে?

নিতু জামাকাপড় গুছাচ্ছে। আমাদের ভালো কোন ব্যাগ নেই। দুজনে মার্কেটে গিয়ে একটা ব্যাগ কিনলাম। বিয়ের পর এই প্রথম বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও বেড়াতে যাবো। দুজনের মধ্যেই খুব এক্সাইটমেন্ট কাজ করছে। অকারণেই আমরা হাসছি, দুজনের চোখে চোখ পরলেই। অনিতো আশেপাশের বাসায় গিয়ে এরইমাঝে বলে এসেছে আমরা কক্সবাজার বেড়াতে যাচ্ছি। 
আমি ভয়ে ভয়ে আছি। সামনে কোন অযাচিত বিপদ বা প্রয়োজন সামনে এসে দাঁড়ায় কিনা! আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্তদের সাধ আর সাধ্য কখনোই এক সুতোতে গাঁথা হয়ে উঠে না। অবশ্য এখনকার পরিবেশে নিজেদের নিম্ন মধ্যবিত্ত ভাবার চাইতে মধ্যে মধ্য বাদ দিয়েই ভাবতে হয়।
চারদিন বাদে আগামী বৃহস্পতিবার রাতে আমাদের কক্সবাজার যাবার কথা। সব গোছগাছ শেষ। অফিসের এক কলিগের কাছ থেকে একটা ক্যামেরাও ধার করে এনেছি। 

অফিস থেকে এসে হাত মুখ ধুয়ে চা মুড়ি খাচ্ছি। এমন সময় দরজায় শব্দ। সাথে কলিং বেলের মুহুর্মুহ বেজে ওঠা। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললো নিতু। পাশের বাসার রিতা ভাবি কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকলেন। ভাবি আমার হৃদয়কে বাঁচান। ও সিড়িতে পরে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছে, এখন বমি করছে। শুনে আমি হন্তদন্ত হয়ে গিয়ে বললাম, ভাবি এক মূহুর্ত সময় নষ্ট করবেন না, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। পাঁচ বছরের হৃদয়ের বাবা বোকার মতো তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। মাসের শেষ পকেট খালি। এখন চিকিৎসার টাকা পাবেন কোথায়? ওনারাও আমাদের মতোই স্বল্প আয়ের পরিবার। 
একবার ভেবেছিলাম চুপ থাকি। কিন্তু নিতুর চোখে চোখ পরতেই যা বোঝার বুঝে নিলাম। আমি ঘরে গিয়ে আলমারি থেকে কক্সবাজারের যাবার জন্য রাখা টাকাটা এনে নিতুর হাতে দিলাম। নিতু টাকাটা নিয়ে ভাবির হাতে দিয়ে বললো, ভাবি এটা রাখুন এরচেয়ে বেশি দেবার ক্ষমতা আমাদের নেই। 
ভাবি জানতেন আমাদের কক্সবাজার যাবার কথা। টাকাটা ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন। নিতুর জোড়াজুড়িতে টাকাটা নিতে বাধ্য হলেন।

ভাই সহ আমি হৃদয়কে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলাম। তিনদিন পর হৃদয়কে নিয়ে বাসায় ফিরলে আমরা ওকে দেখতে গেলাম।
অনি আর হৃদয় খেলতে শুরু করেছে। ওদের নিষ্পাপ প্রাণবন্ত হাসির আওয়াজে আমরা সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন অনুভব করছিলাম। সবার অলক্ষ্যে আমি নিতুর হাত হাতে নিলাম। ওর গভীর স্পর্শ আমাকে অনেক কথাই বলে দিলো।

বাজারের লিস্টি..............রাকিব সামছ শুভ্র

বাজারের লিস্টি..............রাকিব সামছ শুভ্র
মি আছি দারুন জ্বালায়। আমার বউ ভীষন ভুলো মনা। এই মাত্র বলে একটা একটু পরেই জিজ্ঞেস করলে বলে আরেকটা। এই ভুলে যাওয়া নিয়ে যে কি দিগদারিতে আছি, তা আর বলতে!

এইতো সেদিন বাহিরে যাচ্ছিলাম। একটা লম্বা লিস্ট ধরিয়ে দিলো, সব্জি, সদাই, মাছ, মাংস মিলিয়ে গোটা বিশেক আইটেম। আমাকে বলবে না, বাজার করে আনতে! ও ভুলেই গেছে আর আমিও লিস্ট নিয়ে পাড়ার লাইফ ফার্মেসির ছেলেটাকে দিয়ে বললাম ওষুধ গুলো মিলিয়ে প্যাক করে রাখতে আমি অফিস থেকে যাবার সময় নিয়ে যাবো। ছেলেটা কত লক্ষ্মী! লিস্ট নিলো কিন্তু বলতে ভুলেই গেলো, স্যার আজতো শুক্রবার অফিস বন্ধ...
আমি কষ্ট করে বাস ধরে অফিসের সামনে এসে দেখি কলাপসিবল গেটে তালা। মেজাজ কেমন খারাপ হয় বলেন! প্রায় দশটা বাজছে এখনো পিয়নটা অফিসে আসেনি? ফোন দিচ্ছি কিন্তু ধরছেই না। আমি আবার বাসা থেকে বেরহবার সময় আমার অফিসের ব্যাগটা আনিনি আজ। ওটাতে তালার চাবি ছিলো। কি আর করা, ঘন্টা খানেক দাঁড়িয়ে থেকে মেজাজ খারাপ করে ফিরছি। সবগুলাকে কালই চাকুরি নট করে দেবো। ব্যাটারা লাটসাহেব হয়েছে এগারোটা বাজে অথচ অফিসে আসে না।

একটা রিক্সা নিলাম, অনেকটা সময় ফ্রি আছি, যাই কিছুমিছু বাজার করে নিয়ে গিয়ে বউকে চমকে দেবো। লিস্ট ছাড়াই আজ কেনাকাটা করবো। রাস্তায় যেতে যেতে হার্ডওয়্যার এর দোকান দেখে মনে পরলো ওষুধ গুলাতো নেয়া হয় নি। দোকানে ঢুকে আমার প্যাকেট চাইতে কি আশ্চর্য! দোকানী ছেলেটা হা করে তাকিয়ে আছে। দিলাম একটা রাম ধমক। এই ছোকরা সকালে যে লিস্ট দিয়ে গেলাম, তো আমার জিনিস কই? দোকানী আমতাআমতা করছিলো। বকাঝকা করে বের হবার আগে বলে আসলাম, এতো ভুলো মনা সেলসম্যান রাখলে ওদের ব্যবসা লাটে উঠবে। দোকানী বেচারা ধমক খেয়ে চুপসে গেছে, কিছুই বললো না। 

বাহিরে বের হয়ে দেখি আমি যে সিএঞ্জিতে এসেছিলাম! আমার দেরী দেখে ভাড়া না নিয়েই চলে গেছে। কি দিনকাল পরেছে? একটু অপেক্ষা করবে না প্যাসেঞ্জারের জন্য! মনে হয় বেশী ভাড়ার ট্রিপ পেয়েছে আর আগের জনের কথা ভুলে গেছে। আমি হাটতে শুরু করেছি এমন সময় এক রিক্সাওয়ালা পেছন থেকে ডাক দিচ্ছে স্যার স্যার বলে। কি তাজ্জব এখন কি রিকশাওয়ালারাও ভিক্ষাকে সাইড বিজনেস করে নিয়েছে নাকি। হাত বাড়িয়ে আছে! যাক কি আর করা গরীব মানুষ তাই বিশ টাকা দিয়ে দিলাম। কি আশ্চর্য ব্যাপার! সে দেখি উল্টা আমায় পাঁচ টাকা ফেরত দিলো! এখন কি ভিক্ষারও রেট ফিক্সড করে দিয়েছে নাকি? পনেরো টাকা!
আমি বাসার নীচে এসে দারোয়ানকে বললাম, বাজারের জিনিসগুলা উপরে উঠিয়ে দিয়ে আসতে। দারোয়ান কথা শুনেও রা করেনা। এই বেদ্দপ কথা কানে যায় না? সে হা করে তাকিয়ে আছে। 
স্যার আপনি যান আমি দিয়ে আসবো নে। 
লিফটে উঠে আরেক সমস্যা.. বাটনের পাশে লিখে রাখবে না? কোন ফ্লোরে কে থাকে? নাহ এদের আর শেখানো গেলো না। সবগুলো ফাঁকিবাজ। 

চারতলায় উঠে কলিংবেল টিপলাম। বাসার সামনের জুতার রেকটা কবে আবার চেঞ্জ করলো? বউ যে কখন কি কেনে আর কি ফেলে দেয় ওই জানে। নতুন জুতার রেকটা ফেলে দিছে কি অদ্ভুত?
দরজা খুলে দিলেন রহমান ভাবী। আরে ভাইসাব আসেন আসেন। কি আদিখ্যেতা! আমার বাসায় বেড়াতে এসে দরজা খুলে এমন ভাব যেনো আমি বেড়াতে এসেছি ওনার বাসায়! ঢুকে একি বউ দেখি এরই মধ্যে আমাদের সোফাটাও বদলিয়েছে। বুঝলাম না এসব কি সকালে দেখে যাই নি? ভাবী বললেন ভাইসাব বসেন চা দেই। রহমান ভাই এলেন হাত মিলালেন। আমি একটু কনফিউজড ওনারা সবাই আমার বাসায় কি করে? তাও আবার বেডরুম থেকে বের হলেন! মনে হয় কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে পাঁচ তলায় এলাম। ভয়ে ভয়ে বেল টিপলাম। বউ দরজা খুলতেই হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। জুতার রেক, সোফা সব আগেরটাই আছে। 
বউ কিছু বলার আগেই দিলাম ঝাড়ি। তুমি বাসার ফ্লোর বদলেছো আমাকে জানাও নি কেন? আমিতো আমাদের বাসা ভেবে দোতলার রহমান ভাইয়ের বাসায় চলে গেছিলাম। কি একটা বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা হচ্ছিলো বলোতো।
বউকে বললাম, আচ্ছা তোমার হলোটা কি? সেই সকাল থেকে বলছি বাজারে যাবো! এখন পর্যন্ত বাজারের লিস্টিটাই দিলে না। তোমার তো আবার ভুলোমন। এখন বলবে এটা আনো পরে বলবে এটা আনলে কেন? আনতে বলেছি ওটা।
লিস্টিটা দাও... বউ দেখি বাজারের লিস্ট না এনে মনের ভুলে পাকেরঘর থেকে খুন্তি নিয়ে আমার দিকে আসছে। বলেন তো এই ভুলো মনা বউকে আমি কিভাবে সামলাই?

ফিরে আসা......................রাকিব সামছ শুভ্র

ফিরে আসা......................রাকিব সামছ শুভ্র
তেতাল্লিশ বছরপর ক্যাটকেটে কমলা রঙের খামটা হাতে নিতেই রহমান সাহেবের কেমন অস্থির লাগছিলো। ঘেমে নেয়ে একাকার, হাত কাঁপছে। কুরিয়ারের ছেলেটা কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। বারবার জিজ্ঞেস করছে, স্যার শরীর ঠিক আছে তো?
রহমান সাহেব উত্তরে শুধু মাথাটা একটু উপর নিচ করলেন। ছেলেটার দেখানো জায়গায় প্রাপকের ঘরে কোনরকমে সিগনেচার করে দিলেন। দরজা বন্ধ করে বসার ঘরের সোফায় ধপাস করেই বসে পরলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেইসব দিনগুলোর কথা। কতো স্মৃতি! কতো ভালোলাগা! 
তন্বী ঘরে ঢুকে রহমান সাহেবের এভাবে চুপচাপ বসে থাকা আর ঘর্মাক্ত মুখ দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। দৌড়ে কাছে এসে রহমান সাহেবের কপালে হাত দিয়ে জানতে চাইলো, বাবা তোমার শরীর খারাপ লাগছে? বাবা কী হয়েছে? প্রেশার বেড়েছে? দাঁড়াও আমি বিপি মেশিনটা নিয়ে আসছি। 
মেয়েটা বাবার কিছু হলেই এতো অস্থির হয়ে পরে! উল্টো রহমান সাহেবকেই তাকে সামলাতে হয়। এবারও তাই হলো। আমার কিচ্ছু হয়নি, আমি ঠিক আছি। পারলে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খাওয়া।
তন্বী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। চার বছর আগে ডাক্তার ঠান্ডা পানি খেলে শরীরের ক্ষতি হয় বলার পর আর কোনদিন এক গ্লাস ঠান্ডা পানি পান করেন নি। আর আজ ঠান্ডা পানি চাচ্ছে? নিশ্চয়ই কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। চিন্তিত মুখে ঠান্ডা পানি আনতে গেলো।


চার ভাই বোনের মধ্যে সবার বড় রহমান সাহেব। বাবা ছিলেন স্কুল মাস্টার। সারাজীবনের সঞ্চয় জমিয়ে প্রায় চল্লিশ বছর আগে ঢাকা থেকে বেশ দূরে উওরায় একটা তিন কাঠার জমি কিনেছিলেন। সময়ের পরিবর্তন সেই দূরের জমিকে আজ এই ক্রমশ বড় হতে থাকা মেগা সিটির মধ্যে নিয়ে এসেছে তাদের। বাবার রেখে যাওয়া টিনশেডের বাড়িটাকে ভেঙে বছর পনেরো আগে রহমান সাহেব পাঁচতলায় রূপ দিয়েছেন। নিজে তিন তলায় থাকেন, মেজোকে দিয়েছেন চার তলা, ছোটকে পাঁচ তলাটা আর একমাত্র বোনকে দোতলাটা। ভাইবোন সবাই একই বাসাতেই থাকেন। এখনো চার ভাইবোন প্রতিদন বিকেলে-সন্ধ্যায় একসাথে চা খান। কোনদিন দোতলায়, কোনদিন চার তলায়! তলা চেঞ্জ হয় তাদের একসাথে চা-নাস্তা খাওয়া চেঞ্জ হয়না। 
তন্বী ঠান্ডা পানির গ্লাসটা বাবার হাতে ধরিয়ে দিতে গিয়ে সবুজ খামটায় চোখ আটকে গেলো। বাবা কার চিঠি? তোমার? কে দিয়েছে?
পরপর বেশ কয়েকটা প্রশ্ন করলেও কোন উত্তরই পেলো না। বাবাকে দেখে মনে হচ্ছে এ জগতে নেই। অন্য কোন জগতে, অন্য কোন সময়ে বিচরন করছেন। 

বহুদিনপর রহমান সাহেব মনের দরজা খুলে দিলেন। হুহু করে পুরনো বাতাস বইতে লাগলো। রহমান সাহেবদের পাশের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে এলো পুতুলরা। রহমান সাহেব তখন ক্লাস ওয়ান কি টুয়ে পড়েন! পুতুল মাত্র স্কুলে যাওয়া আসা শুরু করেছে। পাশের পাড়ায় স্কুল, প্রায় প্রতিদিনই একসাথে যেতো। বিকেলে বাসার সামনের মাঠে সবাই মিলে খেলতো। রহমান সাহেব হাফপ্যান্ট আর পুতুল ফ্রক পরতো। হঠাৎ করেই রহমান সাহেব খেয়াল করলেন গোল্লাছুট, টিলোএক্সপ্রেস, বরফ-পানি, খেলতে খেলতে তিনি ফুলপ্যান্ট পরছেন আর পুতুল ফ্রক থেকে সালোয়ার কামিজ! পুতুল তখন নতুন নতুন ওড়না পরাও শুরু করেছে। এই পুতুলকে দেখে রহমান সাহেব নতুন পুতুলকে আবিষ্কার করলেন। নিজের মধ্যেই তুলু (পুতুলকে আদর করে তুলু ডাকতেন) কে অনুভব করা শুরু করলেন। তখন পুতুল ক্লাস সিক্সে আর উনি ক্লাস এইটে। খেলার সাথী কখন মনের সাথী হয়েছে টের না পেলেও নিজের ভিতরের পরিবর্তনটা বেশ টের পেলেন। এক বিকেলে খেলার ফাঁকে পুতুলের হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিয়ে দেছুট। কিছুটা অস্বস্তি এবং কিছুটা ভয়! ওদিক থেকে কী প্রতিক্রিয়া আসে? কাগজটা দেবার পর বেশ কদিন পুতুল খেলতে এলো না। রহমান সাহেবের ঘুম শেষ! রাতে ঘুমাতে পারে না, বিকেলে মাঠে এলে চোখ এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে তুলুকে। পাঁচদিনের দিন তুলু এলো কিন্তু তার চোখ মুখে সম্পূর্ণ ভিন্ন আভা! রহমান সাহেবের সামনে পরতেই কেমন লজ্জায় গুটিসুটি মেরে রইলো। "কিরে তুই কয়দিন এলিনা কেন? আর জবাবও দিলিনা?"
পুতুল কোন উত্তর দেয়নি। সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে হাতে বানানো একটা চোখ জ্বালাকরা কমলা রঙের খাম ধরিয়ে দিলো। সাথে বললো, বাসায় গিয়ে পড়বে প্লিজ, এখানে না।
রহমান সাহেব সেদিন খেলতে নামলেন না, একছুটে বাসায়। ঘরে গিয়ে খুব সাবধানে লুকিয়ে লুকিয়ে খামটা খুললো। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা একটা চিঠি। 

‘কিভাবে চিঠি লিখতে হয় জানিনা। শুধু এটুকুই জানি তোমার চিঠি পাবার পর থেকে আমার পৃথিবী বদলে গেছে। সবকিছুতেই তুমি! আমি রাজি কিন্তু এক শর্তে। আমাকে তুইতোকারি করা যাবে না। তুমি করে বলতে হবে এবং কচুরিপানার ফুল এনে দিতে হবে।’

চিঠিতে শুরু এবং শেষে কোন সম্বোধন ছিলো না। এরপর প্রায় প্রতিদিনই ক্যাটকেটে কমলা খাম পাওয়া এবং তার উত্তর দেয়া রহমান সাহেবের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে তাদের প্রেম ভালোবাসা ভালোই চলছিলো। সমস্যা দেখা দিলো যখন রহমান সাহেব ইন্টার পাশ করে বিএ তে ভর্তি হলো। 

পুতুলের বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লো। ওদের সহায় সম্বল সব বিক্রি করেও শেষ রক্ষা হলোনা। বাবা মারা যাবার পর ওর মামারা ওদেরকে এখান থেকে তাদের বাড়ি নিয়ে যায়। এর মাস ছয়েক পরেই এক লন্ডনি ছেলের সাথে মামারা একরকম জোর করেই বিয়ে দিয়ে দেয়। রহমান জানতে পেরে ছুটে গিয়েছিল পুতুলের কাছে। কিন্তু সংসারের অভাব আর পারিবারিক সম্মান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজের চাওয়াকে বিসর্জন দিলো পুতুল। ওর ছোট আরও চার ভাইবোন আছে। মামারা তাদের দেখভাল করবেন, পড়াবেন এই শর্তেই পুতুল রাজি হয়েছিলো। তাছাড়া রহমান তখনো ছাত্র, ওকে পালিয়ে বিয়ে করাটা দুই পরিবার মেনে নেবে না। পুতুলের উপায় ছিলোনা।
বিয়ের মাস চারেক পরই ওর স্বামী ওকে লন্ডন নিয়ে যায়। তিন চার বছর পরপর একবার দেশে এলেও কখনো রহমানের সাথে দেখা করার চেষ্টা করেনি। রহমানও খোঁজ পেতেন তুলু দেশে এলেই। কিন্তু অভিমানে কখনোই সামনে যাওয়া হয়নি। 
তেরো বছর আগে একবার দেশে এসেছিলো পুতুল। তন্বীর বয়স তখন বারো। বাবা মেয়ে একসাথে শপিং এ গিয়েছিলো সেখানেই পুতুলের সাথে তিন যুগ পর রহমানের দেখা হয়ে যায়। রহমান বরফ পানি খেলায় ছুঁয়ে বরফ বললে যেমন মূর্তি হয়ে যায় ঠিক তেমনি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। পুতুলও কিছুই বলতে পারছিলো না। তন্বীই পাশ থেকে রহমান সাহেবকে ধাক্কা দিয়ে বললো, বাবা তোমার কী হয়েছে? এই আন্টিকে দেখে স্ট্যাচু হয়ে গেলে!
রহমান তাকিয়ে দেখছে, সেই একই চোখ, সেই একই হাসি! নাকের নিচের সেই প্রিয় তিলটা সব একই রকম আছে শুধু একটু ওজন বেড়েছে সেই ছিপছিপে ভাবটা নেই। আর সিঁথির দুপাশের কিছু চুলে কালো সরে গিয়ে সাদার দেখা মিলছে। কী বলবে খুঁজে পাচ্ছিলো না। পুতুলই প্রথমে জিজ্ঞাসা করলো কেমন আছ? উত্তর পায়নি একটা হাসি ছাড়া। হাসিটার মানে ভালো আবার খারাপ দুটোই হয়। তন্বী কে আদর করে দিলো, মাশা আল্লাহ অনেক সুইট হয়েছে তোমার মেয়েটা। এর উত্তরেও সেই একই হাসি ফেরত পেলো। কথা জমেনি আর। দুজনই তাড়া আছে বলে নিজেদের ভীড়ে আড়াল করলো।
তন্বী বাসায় এসে বাবাকে হাজারটা প্রশ্ন করে কিন্তু উত্তরে শুধুই নিরবতা দেখেছে। তন্বী ফুফুর কাছে শুনেছে, বাবা একজনকে খুব বেশী ভালোবাসতো, এখনো মনে হয় বাসে। তার হঠাত করে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বাবা সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। তাহলে ইনিই কী সেই তিনি? যার জন্য বাবার নিজেকে গুটিয়ে নেয়া? অনেক চেষ্টা করেও বাবার মুখ থেকে তার নামটা জানা গেলোনা। ফুফুর কাছে ছুটে গেলো, বর্ননা দিতেই ফুফুর মুখ উজ্জ্বল হয়েও আবার নিভে গেলো। শুধু বললো, হুম উনিই পুতুল যার জন্য তোর বাবা সবকিছুই ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু আমাদের আঁকড়ে ধরে আছেন আজ তেতাল্লিশটা বছর।
আজ বাবার হাতে কমলা খামটা দেখে তন্বীর মন ছটফট করে উঠলো। বাবা চিঠিটা নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিলেন। তন্বী দরজায় কান পেতে শুনতে পেলো বাবার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ। বাবা সন্ধ্যায় ছোট চাচার বাসায় চা খেতে গেলে তন্বী একটা অনুচিত কাজ করে ফেললো। বাবার চিঠিটা খুঁজে বের করে পড়লো।

যদি পারো আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমাকে দেয়া কষ্ট গুলো অনেক বছরপরে হলেও আমাকেই ছুঁয়ে যাচ্ছে। তুমি জানো কিনা জানিনা? আমাদের একমাত্র সন্তান রোপেন দুই বছর আগে রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। আমি মা হয়ে শোকটা সামলে নিয়েছিলাম কিন্তু ওর বাবা তা আর পেরে উঠেনি। দেড়টা বছর অস্থিরতা নিয়ে দিন কাটিয়ে আট মাস আগে সেভিয়ার হার্ট এটাক করে। অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারলাম না। এই কদিনেই আমি উপলব্ধি করেছি কাছের মানুষ হঠাত করেই দূরে চলে গেলে কেমন লাগে! 
আমি ইচ্ছে করে তখন তোমায় ছেড়ে আসিনি। মামারা শর্ত দিয়েছিলেন যদি আমি বিয়েতে রাজি হই তাহলেই ওনারা মাকে এবং আমার ভাইবোনদের ওনাদের বাড়িতে থাকতে দিবেন, পড়ালেখা করাবেন। আমি রাজি না হলে সবাইকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে। তুমিই বলো আমি আমার ভালোবাসা রক্ষা করতে গিয়ে পুরো পরিবারকে নিয়ে পথে কীভাবে নামতাম? তুমিও তখন ছাত্র। এতোটা বোঝা তোমার উপরেই কি করে চাপিয়ে দিতাম? তাই ভেবেছিলাম আমি একাই সব হারিয়ে আমার মা আর ছোট ভাইবোনদের ভালো ভাবে বেঁচে থাকাটা নিশ্চিত করি। হ্যাঁ আমি এটুকু বলতে পারি, সারাজীবন আমি কিসের মধ্যে দিয়ে পার করেছি কেউ জানে না কিন্তু আমার ওই বড় ত্যাগটুকুর জন্যই আমার ভাই বোনেরা সবাই আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। সবাই ভালো আছে। 
তোমাকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিলো। সেবার তোমার মেয়েকে দেখে অনেক ভালো লেগেছে। অনেক শান্তি পেয়েছি তোমাকে সংসার করতে দেখে। তুমি ভালো থাকো এই দোয়া করি। আমারও বয়স হচ্ছে ষাটে পৌঁছে গেছি৷ ভাবছি একা না থেকে কোন ওল্ড হোমে চলে যাবো। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও পারলে দোয়ায় রেখো।
ইতি 
তুলু।


বাবাটা এত্তগুলো বছর এতো কষ্ট চেপে রেখেছে। তন্বী রহমান সাহেবের মেয়ে না। তার মেঝো ভাইয়ের মেয়ে। কিন্তু ছোট বেলা থেকেই তার নেওটা ছিলো। একটু বড় হয়ে বাবার কাছেই চলে এসেছে। ওর বাবা-মা ও আপত্তি করে নাই। একই বিল্ডিংয়েই সবাই৷ চিঠি পড়ে অনেক্ক্ষণ কাঁদলো তন্বী। চিঠিটা জায়গামতো রাখার আগে পুতুলের পোস্টাল এড্রেস টুকে নিলো। 
প্রায় মাস দুয়েক পর আবারো একটা কমলা খাম এলো রহমান সাহেবের ঠিকানায়। এবার অবাক হলেও আগের মতো অস্থির হলেন না রহমান সাহেব। হয়তো মনে মনে উনিও অপেক্ষা করছিলেন আরেকটা চিঠির! হাতে নিয়ে অনেকটা সময় বসেই থাকলেন। খুলে পড়লেন না। ভিতরে না জানি কী লিখা আছে? বরং চিঠি হাতে নিয়ে নিজের মতো ভেবে নেয়াটা অনেক বেশি নিরাপদ। 

রুমে গিয়ে চিঠি খুলে পড়তে বসলেন।
আজ চিঠিতে সম্বোধন আছে। 

প্রিয়.....
নামটা লিখতে গিয়েও লিখলাম না৷ যদি কোনদিন দেখা হয়! তখনই ডাকবো। তুমি আমায় ভালোবাসো তা জানি তবে এতোটা আশা করিনি। একটা জীবন কাটিয়ে দিলে একেবারেই একা! আমি এটা শোনারপর থেকে কোন ভাবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিনা। কান্নার দমকে সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আমি যাকে নিজের করে পাইনি সে কিনা নিজেকে আমার করেই রেখে দিয়েছে।
এখন বলাটা অন্যায় তারপরও মানুষ কতো ভুল করেও সুধরে নেয়। আমার জীবনের প্রথম সময়টুকু জুড়ে ছিলে তুমি। আমার শেষ সময়টুকু জুড়ে কী তুমি থাকতে পারো না?
তোমার কিংবা আমাদের ভালোবাসার উপরে এখন আর আমার কোন দাবী নেই। তবু খুব ইচ্ছে হচ্ছে বারান্দায় তোমার সাথে বসে চা খেতে। বাগানে তোমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে ছোট্ট কাগজ মুঠোয় গুঁজে দেবার সৌভাগ্য কি হবে? আমি নেক্সট উইকে দেশে আসবো। যদি তুমি আমাকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে আসো, খুব খুশি হবো। আর না এলেও মন খারাপ করবো না। সময়টাকে তার মতো করেই এগিয়ে যেতে দিতে চাই। 
তন্বীকে আমার আদর দিও। ও খুবই ভালো মেয়ে।
ইতি
তুলু।

রহমান সাহেব হাসছেন সেই হাসিটা! যার অর্থ হ্যাঁ কিংবা না দুই ই হতে পারে। তন্বী দূর থেকে বাবার হাসিটার মানে খুঁজছে। বুদ্ধি করে মেয়ে হয়ে মায়ের কাজটা করে দিলো তন্বীই।

আম্মার বিয়ের শাড়ি...........রাকিব শামছ শুভ্র

আম্মার বিয়ের শাড়ি...........রাকিব শামছ শুভ্র

বুবুর উচ্ছ্বসিত হাসি দেখে খুশী হলেও কেমন একটা কষ্টও অনুভব করছি। আম্মা বুবুর জন্য জামা সেলাই করছে। আর আমি, আঁখি আর পাখি হা করে তাকিয়ে আছি। একটা না দুইটা না একসাথে তিন তিনটা জামা বানিয়ে দিচ্ছে।

মরা চারবোন, ভাই নেই আমাদের। ভাইয়ের আশায় চার সন্তানের মা-বাবা হয়েছেন কিন্তু ছেলে হয়নি। বুবু রাখি, আমি সাখি, আমার পরে আঁখি আর পাখি। আমরা মফস্বলে বসবাস করি। বাবা সরকারি চাকুরি করেন। দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা তবে তার সততার জন্য খুবই সম্মানিত ব্যাক্তি। আমার মা আমাদের দেখাশোনা করে, সংসার এর সকল কাজ সামলায়। আমরা চার বোন, বাবা-মা, আমার দাদু এই নিয়ে আমাদের সংসার। বাবার একার আয়ে সবার পড়ালেখাসহ অন্যান্য খরচ জোগানো খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাদু কৃষিকাজ করতেন। বাবা নিজে লজিং থেকে বিএ পাশ করে চাকুরিতে ঢুকেছেন। আম্মা নাইন পর্যন্ত পড়েছে। এরপর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আর পড়া হয়ে উঠেনি। আম্মাদের বড় গৃহস্থ পরিবার। শয়ে শয়ে বিঘা জমি, ধান, পাটের কারবারি। নানার অনেক পয়সা ছিলো কিন্তু মানুষ হিসেবে খুব বড় মনের ছিলেন না। দুইটা বিয়ে করেছেন, একগাদা ছেলেমেয়ের বাপ হয়েছেন। আম্মার প্রেম মেনে নেননি, আর আম্মাও ছিলেন প্রচন্ড জেদি। বাবার হাত ধরে পালিয়ে চলে আসেন। বাবাই ছিলেন আম্মাদের বাসায় লজিং মাস্টার। বাবা পালিয়ে বিয়ে করতে রাজি ছিলেন না কিন্তু মায়ের জেদের কাছে নতি স্বীকার করে নিলেন। নানা এই বিয়ে মেনে নেননি, আম্মাও কখনো আর ওই বাড়িতে যাননি। আমাদের পরিবারে এসে বাবার পাশে যোগ্য স্ত্রী হিসেবে পাশে ছিলেন এবং আছেন। বাবার স্বল্প আয়ে সংসার সামলে যাচ্ছেন। কোন রকম বিলাসিতা আমাদের সংসারে একেবারে অপরিচিত শব্দ। 

মা নানার বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার সময় তার শখের সেলাই মেশিনটা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। সিঙ্গার মেশিনটার বয়স প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেছে। আম্মার যত্ন এবং ভালোবাসায় এখনো একেবারে নতুন মেশিনের মতোই ছুটে। আম্মার এই শখের জিনিসটাই কখন যে সময়ের আবর্তে আমাদের সবার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে! খরচ বাঁচাতে আম্মার এই মেশিন এখন পরিবারের বড় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। মেশিনের ঘরঘর শব্দ শুনলেই আমরা বুঝি আম্মা নতুন কিছু সেলাই করছেন! আমরাও প্রতি রোজার ঈদে একসেট করে মোটামুটি ভালো জামা পাই। আর বাসায় পরার জন্য সবার মিলিয়ে ঝিলিয়ে কয়েকসেট কাপড় আছে। আমাদের চার বোনের সব জামাকাপড় আম্মার সেলাই করা। আমরা কখনো দোকানে গিয়ে জামা কিনিনি। আম্মার বানানো জামাগুলো অবশ্য দোকানের জামার চেয়ে ঢের সুন্দর। 

আজ বুবুর জন্য আম্মা তিনটা কাপড় এনেছেন। এখন বসে বসে সেলাই করছেন আর আমরা বুভুক্ষুর মতো আম্মার চারপাশে ঘিরে আছি। বুবুর ভাগ্যকে হিংসা হচ্ছে খুব। বুবু এবার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা পাশ করেছে। এতোদিন বুবুরও আমাদের মতো একটা ভালো জামা ছিলো আর আজ থেকে চারটা বেড়ানোর জামা! আম্মার উপর খুব জিদ হচ্ছে। 

বুবু পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। মেডিক্যাল কলেজে টিকেছে। আগামী সপ্তাহে শহরে যাবে বাবার সাথে। এতোদিন কলেজ ড্রেস পরেই কাজ সারতো কিন্তু এখন না-কি মেডিক্যাল কলেজে ইউনিফর্ম নাই। বুবুর তো ভালো জামা মাত্র একটা! তাই আম্মা কাল কাপড় কিনে এনেছেন। বাসার সবাই খুব খুশি বুবুর রেজাল্টে। কিন্তু আমার খুশি লাগছে না। বুবু নতুন তিনটা জামা পাচ্ছে তার মানে এবার হয়তো ঈদে আমাদের আর নতুন জামা পাওয়া হবে না! বুবু বাড়ি ছেড়ে যাবে এতে যতটা না মন খারাপ হচ্ছে তারচেয়ে বেশী মন খারাপ নতুন জামার শোকে।

দুপুরে মন খারাপ নিয়ে খেতে বসেছি। পাতে মাছের টুকরার সাইজ ছোট দেখে মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেছে। আমাকেই শুধু সব মেনে নিতে হবে? আমি মুখ ফুলিয়ে বসে আছি। আম্মা খেয়াল করলেন আর বকা দিলেন। তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠ। আমি ভাত নাড়াচাড়া করছি কিন্তু খাচ্ছি না। আম্মা কিছুই বললেন না। না খেয়ে উঠে পরলাম। চারটার দিকে আম্মা আমাকে ডাকলেন, রনির মা (আমাদের বাসায় আম্মাকে কাজে সাহায্য করে) এর সাথে তার বাসায় যেতে। রনির মা আমাকে নিয়ে তার ঘরে গেলো। পাশেই এক বস্তিতে থাকে ওরা। রনিরা তিন ভাই। বড়টার বয়স আট বছর, মেঝটা ছয় আর ছোটটা তিন বছর। একটা ছোট্ট ঘরে ওরা থাকে। ঘরটা অন্ধকার ঘুপচি মতোন। ভেড়ানো দরজা টেনে খুলতেই তিনভাই এক সাথে চেচিয়ে উঠলো, মা এসেছে, মা এসেছে। 

দরজার বাহিরে বসলো তিনজন। রনির মা কোচরে শাড়ী দিয়ে ঢেকে রাখা থালাটা বের করলো। আমার না খাওয়া মাছের টুকরা, সাথে ঝোল দুই টুকরা আলু আর এক থালা ভাত। তিনজনই প্লেটের উপর ঝাপিয়ে পরলো। ওই এক টুকরা ছোট মাছটা দিয়ে খাচ্ছে আর বলছে, মা অনেকদিন পর এত্ত বড় মাছ আনলা! আমি অবাক হয়ে দেখলাম রনির মা দু নালা ভাত মুখে দিয়ে আর দিলোনা। তার চোখের কোনে পানি অথচ মুখে কি সুন্দর হাসি! রনি মাছের কাটা বেছে নিজে না খেয়ে ছোট দুই ভাইয়ের মুখে তুলে দিচ্ছে। গপগপ করে খাচ্ছে আর খুনসুটিতে মাতছে।

আমি চুপ করে ওদের খাওয়া শেষ করা দেখলাম। বাসায় এসে দৌড়ে গেলাম আম্মার কাছে। গিয়ে আম্মার বুকে মুখ গুজে অঝোরে কাঁদতে লাগলাম। আম্মা কিছুই বলছেন না। শুধু আমার মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আমি আম্মার বুক থেকে মুখ তুলে গলা জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, আম্মা আমি আর কোনদিন খাওয়া নিয়ে নকতা করবো না। ওদের প্রতিদিন তুমি একটুকরা মাছ দিও। 
আম্মা হেসে বললেন, তোদেরই প্রতিদিন দিতে পারিনা। চেষ্টা করবো যেদিন বেশী থাকবে, সেদিন দিতে। 
আমার টুকরার অর্ধেক ওদের দিয়ে দিও। 
আম্মা আমার চুলের বেনি ধরে হালকা টান দিয়ে বললেন, থাক থাক আর পন্ডিতি করতে হবে না। ভালো করে পড়াশোনা করে বুবুর মতো ডাক্তারি পড়তে চেষ্টা কর। নিজে যখন আয় করবি এমন দশজনকে খাওয়াতে পারবি। 
আমি মাথা দুলিয়ে জানিয়ে দিলাম, আমিও বেশী করে পড়ে বুবুর মতোই হবো।

রাতে ঘুমানোর আগে বুবু সব নতুন জামা নিয়ে ঘুমুতে এলো। এটা আমাদের চার বোনেরই অভ্যাস। নতুন জামা পেলে না পরা পর্যন্ত সেটা কাছ ছাড়া করিনা। বুবুর জামা গুলো ধরে দেখছিলাম। নতুন জামায় কি সুন্দর গন্ধ থাকে! শুকে দেখছিলাম। 
তোর খুব পরতে ইচ্ছে করছে তাইনারে সাখি? ইচ্ছে হলে পরতে পারিস।
আমার অনেক ইচ্ছে ছিলো কিন্তু বুবুকে জড়িয়ে ধরে বললাম, আমি যখন তোর মতো ভালো রেজাল্ট করবো তখন তোর জামা চেয়ে নিয়ে পরবো।
বুবু আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো, আমাদের সব্বাইকে পারতেই হবে। আম্মা-বাবার কষ্টকে স্বার্থক করতেই হবে। আমরা চারজন ওনাদের সব না পাওয়া পূরণ করে দেবো। আমিও হ্যাঁ হু করতে করতে বুবুর হাতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। 

সকালে উঠে স্কুলে ছুটলাম। দুপুরে বাসায় এসে তাড়াহুড়া করে খেয়ে উঠতেই আমাদের চার বোনকে ঘরে ডাকলেন। চার বোন ঘরে যেতেই আম্মা প্রথমে পাখিকে খুব সুন্দর একটা জামা দিলো। এরপর আঁখি তারপর আমি, শেষে বুবু। আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি৷ আম্মা বললেন, আমার বিয়ের শাড়িটা কেটে তোমাদের জন্য ড্রেস বানিয়েছি। আমারতো আর এই শাড়ি পড়াই হয়না। তাই ভাবলাম আমার রাজকন্যাদের একটা করে জামা বানিয়ে দেই। চারটা জামাতো এক শাড়ীতে হয় না তাই সবার জামার সামনে আমার শাড়ী আর পেছনে অন্য কাপড় জোড়া দিয়েছি।তোমরা চারজন এই ড্রেস পরে যখন একসাথে দাঁড়াবে আমার সব পাওয়া হয়ে যাবে। 
আমরা চারবোন মাকে জড়িয়ে ধরে বোকার মতো কেঁদেই যাচ্ছি। আর আমাদের আম্মাটা সেই চিরচেনা হাসিটা হাসছেন।