Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

মন অরণ্যের শূন্যতা ( পর্ব ২)........জান্নাতুল ফেরদৌসী

মন অরণ্যের শূন্যতা ( পর্ব ২)........জান্নাতুল ফেরদৌসী

নীলাম্বরীদের বাসাটা খুবই সাদামাটা। একতলা বাসার দেয়ালগুলো বেশ পুরোনো আর রঙ উঠে গেছে বেশ খানিকটা। স্যাঁতসেঁতে একটা ভাব পুরো বাসার মেঝেতে। জরাজীর্ণ আঙিনায় একটা বিশাল বড় আমগাছ। সেই গাছে গ্রীষ্মের সময় বেশ আম ধরে আর কাল বৈশাখী ঝড় হলে তো কথাই নেই। নীলাম্বরী, তার ছোটভাই শ্যামল আর ওদের মা বাবা একসাথে সবাই আম কুঁড়োতে ছুটে যেত। সে যে কি আনন্দের সময় ছিলো ভাবতেই নীলাম্বরীর খুব আফসোস হয়, কেনো যে সেই দিনগুলো আবার ফিরে আসেনা! এখন আর সেই স্বর্ণযুগ নেই ওদের। নীলাম্বরীর বাবা ছিলেন সরকারি কর্মচারী, বেশ কয়েকবছর আগেই রিটায়ার করেছেন। মা দু'বছর ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। বাকি রইল এক ভাই, সে পড়ছে ক্লাস নাইনে। পেনশনের স্বল্প টাকা দিয়ে ওদের সংসার চলে গেলেও, নীলুর মায়ের চিকিৎসার খরচ চালাতে বেশ বেগ পেতে হয় ওদের।
তাই নীলাম্বরী নিজের পড়াশুনার পাশাপাশি কিছু ছাত্রছাত্রী পড়ায়। কিন্তু মাঝে মাঝে তার মনে হয় সে যেন তার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলছে। সংসারের একটা অদৃশ্য কঠিন বোঝা যেন ওকে দিন দিন কোনঠাসা করে দিচ্ছে। তার এমন ছকে বাঁধা জীবন ভালো লাগেনা। তার ইচ্ছে করে একটা দুরন্ত,মুক্ত,উচ্ছ্বাসের জীবন পেতে। মন চায় নীল আকাশের নীচে খোলা প্রান্তরে প্রানভরে গান গাইতে। মাঝে মাঝে কেন যেন তাই নীলাম্বরী কণিকার জীবনটা পেতে চায় কারন কণিকা তো একাই, ওর নেই কোন বাঁধা, নেই কোন পিছুটান! রয়েছে কেবল বিশাল বড় প্রাসাদ আর প্রাচুর্য। কাঁধের ব্যাগ টা নামিয়ে নীলাম্বরী হাতমুখ ধুয়ে এলো। তার মনে পড়লো মায়ের ওষুধটা দেবার কথা। সে ব্যাগ খুলে মায়ের ওষুধটা বের করতে গিয়ে খেয়াল করলো তার ব্যাগে পাঁচশো টাকার বেশক'টি নোট। এতো টাকা কোথা থেকে এলো?! পরক্ষনেই তার মনে হলো এটা কণিকার কাজ। সে এমন এর আগেও করেছে। কিভাবে যেন কণিকা বুঝে যায় যে নীলুর মন কখন কেনো খারাপ থাকে বা তার আসলে কি সমস্যা। এই যেমন আজ! নীলু এই টাকার অভাবেই মায়ের কিছু টেস্ট করাতে পারছিলোনা বলেই মন খারাপ করে পুকুরপাড়ে বসে ছিলো, সেটা কণিকা বুঝে গেছিলো আর তাই সে এতোকিছু করে নীলুকে তার বাড়িতে নিয়ে গেছিলো। নীলাম্বরীর খুব লজ্জা হয়। সে এর আগেও এভাবে কণিকার দেয়া টাকা ফেরত দিতে চেয়েছিলো এমনকি ওকে বলেছিলো এভাবে না চাইতে টাকা না দিতে। কিন্তু কণিকা কখনোই একবার দেয়া টাকা ফেরত নেয়নি। বারবার বলেছে "আজ আমার মা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই এটাই করতেন আর আমি চাইনা আমার মত তুইও মা হারা হয়ে পড়!" নীলু ভাবে সত্যিই তো! তার তো এখন মাকে বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, কি দরকার এতোসব ভেবে! নীলুদের ক্যাম্পাসটা অনেক বড়। অনেকবছরের পুরোনো গাছ আর বিল্ডিং এর জন্য ক্যাম্পাসের চেহারাটাই কেমন যেন একটু গম্ভীর গম্ভীর লাগে দেখতে। কিন্তু আসলে দেখতে গুরুগম্ভীর হলেও ওদের ক্যাম্পাসটা ভীষণ প্রানবন্ত আর উদ্দীপনায় ভরপুর। তারুণ্যের যেই উচ্ছ্বাস এখানে আসলে দেখা যায় তা হয়তো অনেক ক্যাম্পাসেই নেই বলে ধারণা নীলুর। যদিও তার অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দেখার সুযোগ হয়নি। তবুও ক্যাম্পাসে আসলেই নীলুর মন যেন প্রান খুঁজে পায়। 
-কিরে রিচি কেমন আছিস? গতকালের লেকচারটা আমাকে দিস তো! বললো নীলু। 
-হুম আছি বেশ ভালোই। এই শোন, গতকাল যা দারুণ একটা নিউজ দিয়েছে না স্যার আমাদের! রিচির চোখগুলো জ্বলজ্বল করে উঠলো। 
-কি নিউজ? 
-আমাদের ক্যাম্পাস থেকে ৭ দিনের শিক্ষা সফরে যাওয়া হবে! জানিস কোথায়? বান্দরবানে! ওখানের সবগুলো ঝর্ণা আর পর্যটনকেন্দ্র গুলো ঘুরানো হবে! শুনেই আমার কি যে আনন্দ লেগেছে জানিস না! আমিতো এখনই সব গুছানো শুরু করে দিয়েছি, তুইও শুরু করে দে নীলু! 
রিচি, নীলুদের বন্ধুমহলের একজন। হাসিখুশি মেয়েটা খুব অল্পতেই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে শিশুদের মত বেশ শোরগোল তৈরি করে ফেলে। যদিও ব্যাপারটা নীলু খুব পছন্দই করে। জীবনে অল্পতেই খুশি থাকতে পারাটাও যে অনেক বড় গুণ! আর এই শিক্ষাসফরের বিষয়টা তো রীতিমতো খুশিরই খবর! নীলু কখনোই তার জেলার বাইরে দূরে কোথাও ঘুরতে যায়নি। ঝর্ণা দেখার তার খুব ইচ্ছে ছিলো, এবার মনে হয় সেই স্বপ্ন পূরণ হবে। ভাবতেই নীলুর খুশিতে মনটা ভরে গেলো। 
এরইমধ্যে কণিকাও চলে এলো। তাকেও শিক্ষাসফরের খরবটা দিতেই সেও বেশ উল্লাসে মেতে উঠলো। তারা সবাই ঠিক করলো যে ক্লাস শেষে তারা একটা লিস্ট করবে যে তাদের এই ট্যুরে কি কি নিতে হবে আর তারা কি কি আনন্দ করবে! ক্লাস শেষে তারা সেই লিস্ট করতে তাই সোজা বড় মাঠে গিয়ে বসলো। ওদের ক্যাম্পাসে দুইটা মাঠ, একটা ছোট আর আরেকটা বেশ বড়। ওরা সাধারণত বড় মাঠটাতেই আড্ডা দেয়। বড় মাঠে বিভিন্ন সংগঠন, পলিটিকাল পার্টি ও সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের বৈঠক বসে। ছোট মাঠটা অঘোষিতভাবে ক্যাম্পাসের কপোত-কপোতীদের দখলে চলে গেছে। 
সেখানে গেলে নাকি সবচেয়ে নীরস কর্কশ মানুষেরও মনে প্রেম ভুত ভর করে, এমনই কথার প্রচলন রয়েছে। তাই সবাই অলিখিতভাবেই ছোট মাঠের নাম দিয়েছে "প্রেমনগর"। কিন্তু সবচেয়ে মজার বিষয় হলো নীলুদের আরেক বন্ধু সুব্রত প্রায়ই সেই প্রেমনগরে গিয়ে শুয়ে বসে থাকে, এই আশায় যে তার কাছেও একদিন সেই স্বপ্নের রমনী আসবে, প্রেমময় হবে তার জীবন আর সেই প্রেমবোধ থেকে সে লিখে ফেলবে গদ্য, পদ্য, কাব্য, মহাকাব্য! কিন্তু হায়! এতোদিনেও তার কোন গতিই হলোনা, তবুও সে হাল ছাড়েনা। রোজ ক্লাসের পরে সে ওখানে যায় আর কোন একা মেয়ে দেখলেই কথা বলার চেষ্টা করে। এভাবে দুই একবার সে মারও খেয়েছে বটে! তবুও সে "একবার না পারিলে দেখো শতবার" মন্ত্রে দীক্ষিত যোদ্ধা!

নীলুরা বসে গল্প করছিলো এমন সময় শুভ্র এসে বসলো ওদের পাশে। ওদের আলোচনা শুনে সে হুট করে বলে ফেললো, -হুম আমিও যাবো তোমাদের ট্যুরে। 
সাথে সাথেই কণিকা চটাং করে বললো, -আপনি? আপনি কেনো যাবেন আমাদের সাথে? আপনার কি নিজের কোন বন্ধু নেই? তাদের সাথে বেড়াতে যান! 
-হুম আমার বন্ধু আছে আর ওরাও যাবে তোমাদের সাথে। আমি যতদূর জানি এই ট্যুরটা ওপেন ফর অল মানে ভার্সিটির যেকোন ব্যাচের যে কেউ যেতে পারবে। 
-আহ! বাদ দে না কণিকা! যেতেই যখন চাচ্ছে শুভ্র ভাই, তাহলে চলুক না! বরং আরো বেশি মানুষ হলে মজাও হবে বেশ! বললো নীলু। 
নীলুর উচ্ছ্বাস দেখে কণিকা নিশ্চুপ হয়ে গেলো।


আজ সকাল থেকেই নীলুর মায়ের শরীরটা বেশ খারাপ। নীলু মায়ের ঔষুধ খাইয়ে ক্লাসের জন্য বের হবে, রাতে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে ভেবেছে। বাসার সামনে নীলু রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে হঠাৎ শুনতে পেলো কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে। 
- নীলু, এই নীলু! এই যে এইদিকে! 
- আরে শুভ্র ভাই আপনি! এখানে কি কাজে? 
- এই একটু কাজ ছিলো এদিকটায়, তুমি কি ক্যাম্পাসে যাচ্ছো? 
- জি। 
- ও তাহলে চলো একসাথে যাই আমিও ক্যাম্পাসেই যাচ্ছিলাম। 
নীলু শুভ্রর কথা ফেলতে পারলোনা। শুভ্রর সাথে নীলুর যেদিন প্রথম দেখা হয়, সেইদিনের কথা নীলুর এখনো স্পষ্ট মনে আছে। ভার্সিটিতে ভর্তির পর সেইদিনই প্রথম ক্লাস ছিলো। আনন্দ, উত্তেজনার একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে নীলু প্রথম ক্লাস শেষ করে বের হয়েছিলো, ঠিক তখনই প্রায় ৭-৮ জন ছেলে নীলুকে ডাক দিয়েছিলো। - এই মেয়ে, হ্যা তুমিই, এদিকে এসো! 
নীলু একটু অবাক হলো অপরিচিত এতোগুলো ছেলে কেনো ওকে ডাকছে ভেবে। 
- হুম কি নাম তোমার? একজন দুষ্টু হাসি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো। 
- নীলাম্বরী 
- ওরে বাবা! নীলাম্বরী! এতো দেখছি কবিতার বা গল্পের নায়িকাদের নাম! তুমি জানো এই নামের অর্থ? 
- হুম জানি। নীল রঙের শাড়ি। একটু অস্বস্তিভরে নীলু বললো। 
- কিন্তু আমরা তো দেখছি তুমি একটা শ্যামলা রঙের মেয়ে। নীল রঙের শাড়ি না! তাহলে এই নাম কেনো? 
বাকি সব ছেলেগুলো হো হো করে হেসে উঠলো। 
নিলু খুব অপমানবোধ করেছিলো কিন্তু সে কিছুই বলতে পারছিলোনা কারন সে একা ও নতুন এখানে। অন্যদিকে ওরা ছিলো নীলুর সিনিয়র ও সংখ্যাগরিষ্ঠ। নীলু এটাও বুঝেছিলো যে ওরা তাকে অপমান করতে বা র‍্যাগিং দিতেই ডেকেছে। হঠাৎ করে বিকটশব্দে গোলাগুলি শুরু হয়ে গেলো! সবাই দিকবিদিকশুন্য হয়ে দৌড়াতে লাগলো। যে যেদিকে পারছে দৌড়ে পালাচ্ছে। নীলু দেখলো ওর সামনের একটা ছেলেও নেই সবাই নিমিষেই পালিয়েছে। কিন্তু নীলু আতংকে আর ঘটনার আকস্মিকতায় পুরোই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীলু খেয়াল করলো হুট করে কে যেন ওর হাতটা ধরে একটা হেঁচকা টান দিলো তারপর দৌড়াতে লাগলো। নীলুও কিছু না বুঝে পিছে পিছে দৌড়াচ্ছে। কিছুদূর দৌড়িয়ে যাওয়ার পর ওরা একটা নিরাপদ জায়গায় দাঁড়ালো। 
দুইজনই বেশ হাঁপাচ্ছে। নীলু দেখলো একটা লম্বা, সুঠামদেহী, শ্যামবর্ণের সুদর্শন ছেলে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। 
- তুমি কি পাগল নাকি? এমন পরিস্থিতিতে কেউ ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকে নাকি বোকার মত? আরেকটু হলে তো মরতে বসেছিলে! ছেলেটি হাঁপাতে হাঁপাতে বললো। 
- না মানে ইয়ে... নীলুর মুখ দিয়ে আর কথা বের হয়না। 
- শোন, ক্যাম্পাসে মাঝে মাঝে এমন ঘটনা ঘটে, পলিটিকাল পার্টিদের মধ্যে গোলাগুলি হয়, তখন নিজের সেফটি নিজেকেই বুঝতে হবে। যাই হোক, আমি শুভ্র আর তুমি? নীলু কেবল তাকিয়েই থাকে আর ভাবে সে এখন নিরাপদে আছে। এমন নিরাপদ বোধ তার আগে কখনো হয়নি। এটা আসলে নিরাপত্তা নাকি অন্যকিছু? নীলু ভেবে পায়না। এরপর থেকে মাঝে মাঝেই ক্যাম্পাসে তাদের দেখা, কথা হতে থাকে। নীলুর ভালো লাগে শুভ্রর সঙ্গ। তার জানতে ইচ্ছে করে শুভ্ররও কি একই অনুভূতি হয়?

(চলবে....)

মন অরণ্যের শূণ্যতা........জান্নাতুল ফেরদৌসী

 মন অরণ্যের শূণ্যতা........জান্নাতুল ফেরদৌসী
পর্ব এক
পুকুরের স্বচ্ছ জলে আকাশচুম্বী নারিকেল গাছগুলোর ছাঁয়া ভাসছে। নীল আকাশে তুলতুলে সাদা মেঘগুলো দলবেঁধে ছুঁটছে অজানায়। হালকা মিষ্টি বাতাসে জলে একটা অদ্ভুতরকম কম্পনের সৃষ্টি হয়েছে আর সেই টলটলে জলে গভীরভাবে তাকিয়ে আছে নীলাম্বরী। আজ তার মন ভালো নেই। মন খারাপের সময়টা সে এই পুকুরপাড়েই একা বসে থাকে। বসে বসে সে এটা ওটা আরো কত কি যে ভাবে! এই যেমন আজ তার মনে হলো সে পুকুরে ঝুপ করে একটা লাফ দিবে তারপর সেই শীতল শ্যামল বারিতে সে মৎস্যকন্যার মত উথাল-পাথাল সাঁতার কাটবে এপাশ থেকে ওপাশ। গল্প করবে মাছেদের সাথে, জানবে তাদের জীবন কেমন। তাদেরও কি এই উষ্ণতাহীন পাতালপুরী থেকে ক্ষনিকের জন্য হলেও সূর্যালোকের তপ্ত জগতে আসতে ইচ্ছে করে? কিন্তু নীলাম্বরীর আর তা জানা হয়না কারন সে যে সাঁতার জানেনা। তাই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাঁকালো আর ওমনি তার মনে হলো সে ওই পাখিগুলোর মত উড়তে চায়। যখন যেখানে খুশি উড়ে বেড়াবে, মন্দ কি! এলোমেলো এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ নীলাম্বরী খেয়াল করলো জলে কার যেন একটা ছায়া পড়েছে। -কিরে নীলু এখনো এখানে বসে আছিস? বললো কণিকা।
কণিকা, ভীষণ মেধাবী আর বুদ্ধিমতি মেয়ে। ধনাঢ্য পরিবারের একমাত্র মেয়ে, যেমন সুন্দরী তেমন চটপটে। ওরা স্কুলজীবন থেকে একসাথেই বড় হয়েছে, বলতে গেলে বেস্ট ফ্রেন্ড। অথচ দুইজনের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য একদমই যেন দুই মেরুর! তাই বন্ধুমহলে প্রায়ই সবাই ওদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করে কিন্তু ওরা যেন সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকেই দলিলে সই করে ওদের বন্ধুত্বের একশো ভাগ সত্তাধারী হয়ে এসেছে। পরিস্থিতি যেমনি হোক না কেনো ওরা সবসময় একে অপরের পাশে থাকবেই! 
নীলাম্বরী চুপ করে রইল। কণিকা তার পাশে এসে বসলো। 
-নীলু মন খারাপ করিসনা। 
-আমার যে মন খারাপ তোকে কে বললো? নীলাম্বরীর শীতল কন্ঠ। 
-এতো বছর পরও এই একই প্রশ্ন তুই প্রতিবারই করিস। তোর মন খারাপ আর আমি জানবোনা! কণিকার উত্তর। নীলাম্বরী এবার একটু হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করে বললো, -ইশ এতো বছর পরও যদি সবকিছু একটু বদলাতে পারতাম তাহলে হয়তো আজ এই প্রশ্নই করতে হতোনা। 
-কি দরকার এসব ভেবে? মানুষের হাতে কি আর সব থাকে? তাছাড়া তুই তো তোর জায়গা থেকে অনেক চেষ্টা করছিস, আর কত? বললো কণিকা। 
-থাক এসব কথা। চল ক্লাসে যাই। নীলাম্বরী উঠে দাঁড়ালো। 
-না আজ ক্লাসে যাবোনা, আজ আমরা দুইজন সারাদিন রিকশায় ঘুরবো, ফুচকা খাবো, আর রাতে তুই আমার বাসায় থাকবি। কণিকার আবদার নীলাম্বরী ফেলতে পারেনা কারন সে জানে কণিকা কেন এসব করে। সে জানে পৃথিবীতে তার সবচেয়ে কাছের মানুষদের মধ্যে কণিকা অন্যতম।


রিকশায় এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করে ক্যাম্পাসে এলো নীলাম্বরী আর কণিকা। ক্যাম্পাসের করিম মামার দোকানের ফুচকা চটপটি তাদের খুব পছন্দ। শুধু তাদেরই না বরং সবার কাছেই বেশ নামডাক আছে মামার দোকানের। নরম আলু আর গোল গোল গরম ডাবরির উপর মামা কি যেন একটা চটপটে মসলা ছিটিয়ে দেয় যা তাদের কাছে অমৃতের মত লাগে! তেতুলের টক মিষ্টি স্বাদ যেন তাদের মনের ক্ষুধা আরো বাড়িয়ে দেয়, তাই তারা প্রায়ই এখানে আসে সেই অমৃতের স্বাদ নিতে। 
-আরে কণিকা দেখি! কেমন আছো? আজ তোমরা ক্লাসে আসোনি কেনো? বললো শুভ্র। 
শুভ্র ওদের দুই বছর আগের ব্যাচের ছাত্র কিন্তু ওদের সাথে বেশ খাতির। মাঝে মাঝেই শুভ্র ওদের বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠে। তবে কেন জানি শুভ্রর এই অযাচিত অনুপ্রবেশ কণিকার ভালো লাগেনা। 
-আজ আমাদের ক্লাসে যেতে ইচ্ছে করেনি তাই আর যাওয়াও হয়নি! বললো নীলাম্বরী। 
-আমরা ক্লাসে গিয়েছি কিনা সেটা আপনার জেনে কি হবে? আর তাছাড়া আপনি জানলেনই বা কিভাবে? আপনি কি তাহলে ২ বছর লস দিয়ে আমাদের ব্যাচের সাথে ক্লাস শুরু করলেন নাকি? বলেই একটা দুষ্টু হাসি হাসলো কণিকা। 
একটু বিব্রতবোধ করলো শুভ্র, সে বোঝে না কণিকা কেন তার সাথে এমন টিপ্পনী কেটে কথা বলে। তাকে অপদস্ত করে কণিকা কি মজা পায়? -না মানে রিচির সাথে দেখা হয়েছিলো, সে বললো তোমরা নাকি আজ ক্লাসে আসোনি। তাই ভাবলাম তোমরা ঠিক আছো কিনা! ইনিয়েবিনিয়ে শুভ্র বললো। 
-আচ্ছা শুভ্র ভাই, আমরা আজ আসি। আরেকদিন কথা হবে কেমন? ভালো থাকবেন। বলেই কণিকা নীলাম্বরীর হাতটা ধরে হনহন করে হাঁটতে শুরু করলো। 
কিছুদূর যেতেই নীলাম্বরী কণিকাকে বললো, -কণি তুই সবসময় শুভ্র ভাইয়ের সাথে এভাবে কথা বলিস কেন? সে তো আমাদের খারাপ কিছু বলেনি কখনো! 
কথাটা শুনে কণিকার মনে হলো সত্যিই তো! কেন সে এমন করে শুভ্রর সাথে আর কেনই বা তার ওকে ভালো লাগেনা? শুভ্র ওদের ২ বছর বড় তারপরও এতো বেশি সখ্যতা চায়, তাই বলে কি কণিকার সন্দেহ হয়? শুভ্র কোনদিন কোন ক্ষতি করবেনা তো ওদের বা ওদের বন্ধুত্বের? এসব ভাবতে ভাবতেই কণিকা নীলাম্বরীর প্রশ্নের উত্তর দিতে ভুলে যায় বা দিতে চায়না।

কণিকাদের বাড়িতে আসলেই নীলাম্বরীর মনে হয় সে কোন সাধারণ ইট পাথরের বাড়িতে নয় যেন একটা সোনাখচিত বিশাল রাজপ্রাসাদে বেড়াতে এসেছে। ডুপ্লেক্স এই বাড়িতে কেবল দেশি নয় বরং বিদেশি আধুনিক সব সরঞ্জামাদি আর সুযোগ সুবিধাও রয়েছে। জীবনকে সহজ ও সুন্দর করতে কোনরকম কমতি নেই এখানে। একাধিক চাকর বাকরের টুয়েন্টি ফোর সেভেন পরিচর্যা ও সেবায় বাড়ির চারপাশটা একদম স্বর্ণের খনির মত চকচক করে। খালি একটাই সমস্যা। বাড়িতে মমতাময়ী মা নেই। কণিকার বয়স যখন ৫ বছর তখন তার মা মারা যায়। মা ছাড়া বাড়িতে যে শুন্যতা বিরাজ করে তা নীলাম্বরীর ভালো লাগেনা। হয়তো কণিকাও তাই বাড়িতে থাকার চেয়ে বাইরে থাকতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কণিকার বাবা অনেক বড় ব্যবসায়ী। নাহ ব্যবসায়ী বললে ভুল হবে, ব্যবসায়ী তো আলু, পেঁয়াজ বিক্রেতাকেও বলা হয় অথবা মোড়ের মুদি দোকানদার সেও তো ব্যবসায়ী! কণিকার বাবাকে বিজনেস ম্যাগনেট বললে হয়তো তার উপযুক্ত পরিচয় দেয়া হবে। তিনি ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। বাড়িতে তাকে দেখাই যায়না। আজ দেশে তো কাল বিদেশে।বাড়িতে ফেরেনো বেশ রাত করে তাই কণিকার সাথে তার দেখাও হয় কয়েকদিনে একবার। কণিকা পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধন থেকে অনেক বেশি বঞ্চিত বলে নীলাম্বরীর খুব মায়া হয়। যদিও কণিকা কখনোই তার একাকিত্বের অনুভূতি প্রকাশ করেনা। সে খুব শক্ত মানসিকতার যে! আজ কোন এক কারনে কণিকার বাবা মিস্টার রায়সুল কবির বাড়িতে একটু আগেই ফিরেছেন। দরজা দিয়ে ঢুকতেই নীলাম্বরীর সাথে তার দেখা হয়ে গেল। 
-আসসালামু আলাইকুম আংকেল। কেমন আছেন আপনি? 
নীলাম্বরীকে দেখেও না দেখার ভান করে মোবাইল টিপতে টিপতেই রায়সুল সাহেব ভেতরে চলে যান। ব্যাপারটা নীলাম্বরী খেয়াল করে তবে অবাক হয়না কারন এমন এর আগেও হয়েছে তার সাথে। সে বোঝে যে তার এ বাড়িতে আসা কণিকার বাবা পছন্দ করেন না। এদিকে টেবিলে রাতের খাবার তৈরি বলে কণিকা নীলাম্বরীকে ডাক দেয়। দু'জনে টেবিলে বসতেই রামু কাকা কণিকাকে বলেন, -কণি মনি স্যার আপনারে ডেকে পাঠাইসেন। 
রামু কাকা হলেন এ বাড়ির সবচেয়ে পুরোনো সেবক। কণিকার পুরো শৈশব যেন তার হাতেই বোনা। ভীষণ স্নেহ করেন কণিকাকে। 
-এখন যেতে পারবোনা বলে দাও। খেতে বসেছি দেখছোই তো! গম্ভীর গলায় বলে কণিকা। 
-কিন্তু স্যার যে এখনই ডেকে পাঠাইসেন! একটুখানি শুইনা আসো লক্ষী মামনি আমার! 
বেশ বিরক্তি নিয়েই কণিকা উঠে তার বাবার রুমে যায়। 
-আমাকে ডেকেছো বাপি? 
-হুম কেমন আছো তুমি? দিনকাল কেমন যাচ্ছে? 
-এটা জানতেই কি ডেকেছো! যাই হোক, আসল কথাটা বলে ফেলো বাপি আমি শুনছি। খুব দৃঢ়ভাবে বললো কণিকা। -আসল কথাতো তুমি জানোই কণিকা! তোমাকে না কতবার বলেছি তুমি ওই মেয়েটার সাথে মিশবেনা। তোমাকে আর কতবার বুঝাবো যে তুমি আমার মেয়ে, মিস্টার রায়সুল কবিরের মেয়ে! তুমি যার তার সাথে বন্ধুত্ব করতে পারোনা। তোমাকে স্ট্যাটাস মেইনটেইন করে চলতে হবে। তোমার বন্ধু হবে আমাদের মতই বড়লোক ঘরের ছেলেমেয়েরা আর তুমি কিনা ওই রিটায়ার্ড সরকারি চাকুরীজীবি একটা হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ের সাথে টইটই করে ঘুরে বেড়াও! একবারও কি তোমার আমার মান সম্মানের কথা মনে হয়না? 
প্রতিবারের মতই এবারো কথাগুলো শুনে কণিকার রাগে শরীরে জ্বালা দিয়ে ওঠে। ক্ষিপ্ত কন্ঠে সে আবারও বলে ওঠে, -বাপি তোমাকে আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি, নীলু আমার খুব কাছের বন্ধু তার ব্যাপারে আমি এসব অবান্তর কথা আর শুনতে চাইনা। তাছাড়া বন্ধুত্বে আবার স্ট্যাটাস কিসের? স্ট্যাটাস দিয়ে আর যাই হোক বন্ধুত্ব হয়না বাপি আর যদি হয়েও থাকে তাহলে সেটা বন্ধুত্ব নয়, সেটা কেবল স্বার্থের আদান-প্রদান। স্বার্থ ফুরোলে সেই বন্ধুত্বও ফুরিয়ে যায়। যাই হোক, তুমি এসব বুঝবেনা, তার চেয়ে বরং তুমি তোমার বিজনেসের হিসাবের বইটা দেখো! 
বলেই কণিকা দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেলো আর রায়সুল সাহেব বিরক্তিভরে তাকিয়ে রইলো। ফিরে এসে কণিকা দেখলো নীলাম্বরী দাঁড়িয়ে আছে মেইন গেটের সামনে। -কিরে কই যাচ্ছিস নীলু? 
-বাসা থেকে ফোন এসেছিলো মায়ের শরীরটা আবার খারাপ করেছে। আমাকে যেতে হবে রে! 
-কিন্তু রাতের খাবারটা খেয়ে যা! 
-না রে আজ থাক, অন্য কোনদিন। বলেই নীলাম্বরী বেরিয়ে যায়। 
কণিকা জানে যে নীলু সবই বোঝে। তার খুব কষ্ট হয় নীলুর জন্য। একইসাথে ভীষণ রাগ হয় এই ভেবে যে একটা ছোট্ট জীবনে "স্ট্যাটাস মেইনটেইন" এর নামে মানুষের এই রঙ তামাশা কবে বন্ধ হবে? আসলেই কি বেঁচে থাকতে এতোকিছুর প্রয়োজন, নাকি সবই মানুষের বানানো নাটক? জীবনে যদি সুখই না থাকে তবে কি হবে এই "স্ট্যাটাস" দিয়ে!

(চলবে........)

আকস্মাৎ একজন...............................................তুহিন রহমান (মেঘ অরণ্য বই থেকে)

আকস্মাৎ একজন...............................................তুহিন রহমান (মেঘ অরণ্য বই থেকে)
র সাথে যেদিন দেখা হলো সেদিন কোন জাতের গোলাপ ফুটেছিলো তা জানিনা তবে সেদিন ছিলো শনিবার এই ব্যপারটা আমি নিশ্চিত। পল্টনের মোড়ে কিছু ঈদ কার্ড খোঁজার জন্য গিয়েছিলাম। ঈদের বাকি চার দিন। অফিস থেকে চেক পেয়েছি বেতন বোনাসের। চেক নিয়ে প্রাইম ব্যাংকের পল্টন শাখা থেকে পঁচিশ হাজার টাকা তুলে বেরিয়ে আসলাম বাইরে তারপর ঈদ কার্ড কিনে এক প্লেট গরম গরম মোরগ পোলাও আর এক গ্লাস হিম শীতল পেপসি মেরে দিয়ে যখন বাইরে বেরুলাম তখন আকাশ কালো করে টপ টপ করে বৃষ্টি ঝরা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম যাত্রীরা টপাটপ রিকসায় উঠে পড়ছে। কেউ কেউ আগেভাগেই প্লাস্টিক পেপার গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছে। আমি খালি রিকসা না পেয়ে দ্রুত গতিতে হাঁটতে লাগলাম আজাদ প্রোডাক্টস এর পাশ দিয়ে নয়া পল্টনের দিকে। কিন্তু বিধি বাম। কয়েক পা যেতে না যেতেই মুষলধারে বৃষ্টি নামলো। এতোটাই হঠাৎ করে যে আমি সামনে দৌড়াবো নাকি পেছনে দৌড়াবো বুঝতে না পেরে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম একটা হোটেল ধরনের জায়গা খোলা রয়েছে। সাধারনত: গরীব লোকদের খাওয়ার জন্য এ ধরনের হোটেল করা হয় ফুটপাথের ওপর। কোন মানুষজন নেই, একেবারে খালি। সেদিকেই ছুটলাম। হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। ছোট হোটেল, উপরে টিনের ছাউনি। একটা  মাত্র টেবিল। সিগারেট বিক্রির টংকে ম্যানেজারের কাউন্টার ধরনের কিছু একটা বানানো হয়েছে। সেখানে বসে আছে টেকো মাথার একটা বুড়ো। কিছুটা ভিজে গেছি আমি। পকেট থেকে রুমাল বের করে সবেমাত্র টেবিলে বসতে যাবো কেউ একজন হুড়মুড় করে আমার গায়ের ওপর এসে পড়লো। রেগেমেগে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে যাবো ফ্রিজ হয়ে গেলাম। একটা অনিন্দ সুন্দরী মেয়ে আমার গায়ের ওপর এসে পড়েছে। বাইরের প্রচন্ড বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য দৌড় দিয়ে ভেতরে ঢুকে সম্ভবত: আমার গায়ের ওপর টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেছে। 
মেয়েটা আমার গায়ের ওপর পড়ে গিয়ে হতবাক হয়ে গেছে। তার সারা শরীর বৃষ্টির পানিতে চপচপে ভেজা। মাথার চুল বেয়ে গড়িয়ে নেমে ভ্রু টপকে গলার কাছে পড়ছে পানি। মনে হচ্ছে এই মাত্র শাওয়ার সেরে বেরিয়ে এসেছে। পরনে হালকা নীল রঙের একটা শাড়ী। বাম হাতে একটা চিকন ঘড়ি যেন তার কবজিতে বসার অপেক্ষাতেই ছিলো। মেয়েটা ঢোক গিলে বললো,‘আমি আসলে এতো জোরে ঢুকেছি...।’ 
আমি তাড়াতাড়ি হাত নাড়লাম,‘ইট’স অলরাইট।’
মেয়েটা নাছোড়বান্দা,‘আমি সত্যি বলছি আমি স্কিড করে একেবারে আপনার ওপর এসে পড়েছি। আসলে বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচার জন্য...।’
আবার হাত তুলে তাকে থামালাম আমি। ‘আহা আমি বললাম তো যে আমি কিছু মনে করিনি।’
‘আপনার কি খুব  জোরে লেগেছে?’গলায় একই সুর বজায় রেখে মেয়েটা বললো। ‘আমার কনুই তো আপনার পিঠের ওপর আঘাত করেছে।’
‘আমার গন্ডারের চামড়া।’ বলে হেসে উঠলাম আমি। মেয়েটাও হাসিতে যোগ দিলো কিন্তু তার ভেতর কেমন এক আড়ষ্ঠতা। হয়ত: আমাকে আঘাত দিয়ে ফেলেছে বলে।
এবার পরিপূর্নভাবে আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। অদ্ভুত সুন্দর একটা মেয়ে। যাকে বলে ন্যাচারাল বিউটি। সবচেয়ে সুন্দর তার ভ্রুদুটো। এমনভাবে বাঁকানো যেন ছিলায় টান খাওয়া দুটো ধনুক তার কপালের ওপর বসানো। আম কাট মুখমন্ডল একেই বলে বোধহয়। চেহারায় কোথাও কোন খুঁত নেই। ঠোঁটদুটোকে এক করলে হয় তাকে প্রজাপতির মতো লাগবে নাহয় দুটো কমলালেবুর কোষা। আমার সবচেয়ে বড়ো দোষ হলো আমি মেয়েমানুষের শরীরের দিকে তাকাইনা। আমার সব কাব্য তার চেহারাকে কেন্দ্র করেই, তাই অন্য কেউ হলে যেখানে তার দেহকেন্দ্রিক রূপ লাবণ্যে বিমোহিত হয়ে কবিতা লিখতো বা তাকে তানপুরার সাথে তুলনা করে মহাকাব্য লিখে ফেলতো সেখানে আমি তার শরীরের দিকে তাকালামনা একপলকের জন্যও। 
আমি তাড়াতাড়ি বললাম,‘আপনি তো একদম ভিজে গেছেন। নিন এই রুমাল দিয়ে চুলটা মুছে ফেলুন।’
মেয়েটা আমার হাত থেকে রুমালটা নিয়ে তার চুলগুলো ঘষে ঘষে মুছতে লাগলো।
আমি টেবিলে বসে পড়লাম। এমন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে যে আমার কাছে মনে হচ্ছে এই বৃষ্টি জীবনেও থামবেনা। সেই সাথে ঠান্ডা বাতাস আসছে দক্ষিন দিক থেকে।
ভিতরে বৃষ্টির ছাঁট আসছে দেখে বুড়ো লোকটা গিয়ে চাটাই এর ছাউনিটা একটু নামিয়ে দিয়ে ফিরে এলো। আমি দেখলাম মেয়েটা তালপাতার মতো কাঁপছে। বৃষ্টিতে পুরোপুরি ভিজে না গেলেও তার উপরের অংশ বেশি ভিজেছে। 
আমি আমার শার্টটা খুলে বাড়িয়ে দিলাম মেয়েটার দিকে,‘আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে। এটা গায়ে চাপিয়ে নিন।’
‘না না ঠিক আছে। আমার ঠান্ডা লাগছেনা।’
‘আমি দেখতে পাচ্ছি আপনি ঠকঠক করে কাঁপছেন আর বলছেন যে আপনার ঠান্ডা লাগছেনা। নিন পরে নিন।’
সলজ্জ ভঙ্গিতে মেয়েটা শার্টটা পরে নিলো। তার আসলেই বেশ ঠান্ডা লাগছে। বৃষ্টি ভেজা শরীরে ঠান্ডা বাতাসের যে কি কামড় তা আমি বুঝি। 
আমি বুড়ো লোকটাকে বললাম,‘ভাই চা হবে?’
দেখলাম লোকটা আমার দিকে বড়বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। কি যেন বলার অপেক্ষায় আছে। আমার সাথে চোখাচোখি হতে কি যেন বলতে চাইলো, তার আগেই মেয়েটা ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে চেয়ে বললো,‘নিতান্ত বাধ্য হয়েই আমি এখানে বসেছি ভাইয়া। তা নাহলে এখানে ঢুকতামনা।’
আমি তাড়াতাড়ি তাকালাম মেয়েটার দিকে। তার চেহারাটা লাল দেখাচ্ছে। ‘আমি ঠিক বুঝতে পারিনি কি বলতে চাইছেন আপনি।’
‘সবার চরিত্র তো এক রকম নয় ভাইয়া। আপনি একবারও আমার দিকে তাকাননি আর ওই বুড়ো ভাম ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে চোখ সরাতে ইচ্ছেই করছেনা। মানুষ এতো বেহায়া হয় কি করে?’
আমি চোখে রাগ ফুটিয়ে লোকটার দিকে তাকাতে লোকটা চোখ সরিয়ে নিলো। আমি নিচু স্বরে বললাম,‘সব আলুর দোষ বুঝলেন, সব আলুর দোষ।’
মেয়েটা অবাক হয়ে বললো,‘কিসের দোষ বললেন?’
আমি হেসে উঠলাম,‘না কিছুনা। আপনি বুঝবেননা।’
‘বুঝবোনা কেন অবশ্যই বুঝবো।’ মেয়েটা তার সুন্দর ভ্রু দুটো পাকালো।‘আলুর দোষ মানে কি?’
‘তাহলে তো ঠিকই শুনেছেন, না শোনার ভান করছেন কেন?’ আমি বললাম।
‘আচ্ছা থাক বলার দরকার নেই। এভাবে এখানে ভিজে শাড়ি পরে বসতে চাইনি আমি যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে যাই বা কোথায়।’ মেয়েটা বললো। ‘আশেপাশে তো কোন ভালো জায়গাও নেই যে বসবো।’
‘ঠিক বলেছেন একদম।’ একটু চুপ থেকে আমি বললাম,‘আপনার নামটাই তো জানা হলোনা।’
‘আমার নাম বর্ষা।’
আমার আনন্দে হাততালি দিতে ইচ্ছা হলো এমন কোইন্সিডেন্স দেখে। উল্লসিত গলায় বললাম,‘আরে কি আশ্চর্য! বর্ষায় ভিজে বর্ষা বসে আছে আমার সামনে!’
মেয়েটা হেসে ফেললো,‘এখন আপনি যদি বলেন আপনার নাম বিদ্যুৎ তবে বেশী অবাক হবোনা আমি।’
‘হা: হা: হা: হা:।’ অট্টহাসি দিয়ে উঠলাম আমি।‘আরে না, এতো তেজ নেই আমার। নাম হচ্ছে বখতিয়ার।’
মেয়েটা নাক সিঁটকালো,‘সত্যি বলছেন আপনি? এমন নাম মানুষের হয়? আপনার চেহারা দেখে তো মনে হয়না এরকম উদ্ভট একটা নাম দিয়েছেন আপনার বাবা।’
‘তবে কেমন হবে বলে আপনার ধারনা?’
‘এই ধরুন রায়ান, জিয়ান, সায়হাম, কিংবা হিন্দী সিনেমার ঐ বস্তাপচা রাহুলই হোকনা কেন অন্তত: আপনার ঐ সদরঘাট মার্কা নাম থেকে তো ভালো।’
আরেকবার আমি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম,‘আসলেই আমার ভালো নাম বখতিয়ার। তবে কলিং নেম একটা আছে যেটাকে আপনি মোটেও সদরঘাট মার্কা বলতে পারবেননা।’
‘কি সেটা?’
‘তিয়া।’
‘তিয়া?’
‘হ্যাঁ তিয়া। কেন বিশ্বাস হচ্ছেনা?’
‘বিশ্বাস হচ্ছে কারন পৃথিবীতে কেউ যদি তার নাম তেলাপিয়া বা তেলাপোকা রাখে তবে আমার করার কি আছে তিয়া ভাই।’
‘দেখুন আর হাসতে পারছিনা। চা খাবেন বর্ষা আপা?’
‘কি? বর্ষা আপা? আপনি কি আমাকে আপনার চেয়ে বয়স্ক ভাবছেন নাকি?’
‘আরে কিছুই ভাবছিনা। চা খাবেন?’
‘খাবো।’
আমি চায়ের কথা বলতে যাচ্ছি দেখলাম টেকো বুড়ো আগেই চা বানিয়ে ফেলেছে। বাইরের বাতাস থেকে বাঁচতে আমার দিকে আরেকটু চেপে এলো বর্ষা। আমার দিকে চেয়ে বললো,‘আপনার শার্টটা না থাকলে কিন্তু আমি একদম ঠান্ডায় জমে যেতাম।’
‘থাক ধন্যবাদ দেয়ার দরকার নেই।’
বুড়ো দু’কাপ চা দিয়ে গেল আমাদের সামনে। চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,‘পড়াশোনা শেষ করেছেন?’
‘না এখনও করিনি।’ বর্ষা বললো। ‘থার্ড ইয়ার ফাইনাল দিয়েছি।’
‘ভাইবোন ক’জন আপনারা?’
‘চার ভাই বোন।’
‘বাবা কি করেন?’
বর্ষা একটু মাথা নিচু করলো। ‘কিছু করেননা।’
‘রিটায়ার্ড?’
‘না।’
‘তবে?’
‘পঙ্গু। অসুস্থ। প্যারালাইসিসে পড়ে আছেন পাঁচ বছর ধরে।’
থমকে গেলাম কথাটা শুনে। মেয়েটা এতো সহজ সরলভাবে তার অসহয়াত্বের কথাটা বলে ফেলবে ভাবতে পারিনি। অন্তত: আমি হলে এভাবে বলতামনা। মুখে বললাম,‘সরি বর্ষা। এখন তাহলে আপনাদের পরিবার কিভাবে চলে?’
বর্ষা মাথা নিচু করে রাখলো। চায়ে চুমুক দেবার কথা বেমালুম ভুলে বসে আছে। আমি বললাম,‘তোমার কোন ভাই নেই?’
বর্ষা এপাশ ওপাশ মাথা দোলালো। নেই।
 ‘এদিকে এসেছিলেন কেন?’
‘সামনে ঈদ তো তাই একটা জিনিষ বিক্রি করতে এসেছিলাম।’ বর্ষা বললো।‘এভাবে বাড়ির জিনিষপত্র বিক্রি করে কোনমতে বাজার করতে হয়। আমি একটা টিউশনি করি। আমার আরেক বোনও টিউশনি করে। এভাবে সংসার চালানো যায়না ভাইয়া। বাবার অনেক ওষুধ লাগে। সামনে ঈদ। কিভাবে কি করি বুঝতে পারিনা। মা বললো তার একটা নেকলেস বিক্রি করে দিতে। গত সপ্তাহে আমার বোনের একটা আংটি বিক্রি করেছি।’
বিশ্ময় বাঁধ মানছেনা আমার। আমি এতো অসহায় একটা মেয়েকে দেখছি অথচ কি অসম্ভব রূপসী সে! ভাবতেও পারছিনা যে হয়ত: এখনও না খেয়ে আছে। পেটে খিদে কিন্তু টাকা নেই ব্যাগে। তাড়াতাড়ি বললাম,‘কিছু খেয়েছেন?’
‘খেয়েছি।’ মেয়েটা শুকনো মুখে বললো।
‘মিথ্যে বলছেন। আপনি কিছু খাননি।’
‘বাসায় গিয়ে ভাত খাবো।’
‘তাতো খাবেনই। কিন্তু যে বৃষ্টি যাবেন কিভাবে?’
‘আমি এখন যাবোনা। অপেক্ষা করবো একজনের জন্যে।’ বর্ষা বললো।
অজান্তেই বুকের ভিতর একটা খোঁচা লাগলো। কার জন্য অপেক্ষা করবে বর্ষা? নিশ্চয় তার ভালোবাসার কেউ আছে। আহ্ কি ভাগ্যবান পুরুষ সে। এমন সুন্দরী এক নারীর মন পেয়েছে সে। জিজ্ঞেস করলাম,‘সে কখন আসবে?’
‘জানিনা।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো বর্ষা। ‘আমাকে ফোনে বললো দুপুরে যেতে। আমি সেই বারোটা থেকে অপেক্ষা করতে করতে বিকাল হয়ে গেল।’
‘আশ্চর্য তো! কেমন মানুষ সে?’ আমি রেগে উঠলাম। ‘আপনি যে বৃষ্টিতে ভিজে বসে আছেন খেয়াল নেই তার?’
‘খেয়াল রাখার প্রয়োজনটাই বা কি? সেতো আমার কেউ নয়। আমাকে বসিয়ে রাখতে পারলে আরো কম দামে ছেড়ে দেবো তারই অপেক্ষায় আছে সে।’
‘কি ছেড়ে দেবেন?’
‘বললামনা ঐ নেকলেসটা। দেড় ভরি আছে ওতে। এখন পঞ্চাশ হাজার টাকা ভরি। আর সে দিতে চায় মাত্র তিরিশ হাজার। মানে আমার লস পঁয়তাল্লিশ হাজার। তারপরও অপেক্ষা করছে যদি আরেকটু দাম কমাই। আজ আমার টাকার খুব দরকার তাই তার কাছে এসেছি।’
আমার কথা বলার ভাষা নেই। প্রথম দেখায় আমি বুঝতেই পারিনি মেয়েটা এতো নিডি। আমি বললাম,‘আমি কি কিছু করতে পারি আপনার জন্য?’ তারপরও মনে একটা আনন্দ, যাক সে তার বয়ফ্রেন্ডের জন্য অপেক্ষা করছেনা।
আর তার বয়ফ্রেন্ড হয়ত: এখনও নেই। চট করে নিজেকে সামলে নিলাম আমি। বললাম,‘আচ্ছা, কোথায় তার দোকান, আমি কি কিছু করতে পারি আপনার জন্য?’
বর্ষা বাইরের দিকে তাকালো। বৃষ্টি আর বাতাসের গতি মনে হয় বাড়ছে। সন্ধ্যার মতো অন্ধকার হয়ে গেছে আশপাশটা। মাথা নাড়লো সে,‘না এই বৃষ্টির মধ্যে অপেক্ষা করতে পারেন আমার সাথে। যতক্ষন সে না আসে।’
‘আচ্ছা বোকা মেয়ে তো তুমি!’ রেগে উঠলাম আমি অনেকটা।‘কোন মেয়ে কি এতোটা বোকা হয়?’
বর্ষা চুপ করে থাকলো।
‘আমার কাছে অবাক লাগছে। এতো বড়ো একটা জিনিষ যার দাম অনেক বেশী সেটা তুমি এতো কম দামে ছেড়ে দিতে চাইছো। তুমি শুধু তার জন্যে কেন অপেক্ষা করছো? অন্য কোন সোনার দোকান নেই? আরও কোন দোকান ঘুরে দেখ তারা তোমাকে আরও বেশী দাম দিতে পারে।’ আমার স্মরন নেই কখন যে আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছি আমি।
মেয়েটা মাথা নিচু করে থাকলো।‘ভাইয়া আমার জায়গায় আপনি হলেও তাই করতেন। এই জিনিষ নিয়ে দোকানে দোকানে ঘোরা সম্ভব নয় আমার জন্য।  আর এভাবে ঘুরতে ঘুরতে যদি আমার পেছনে ছিনতাইকারী লেগে যায়? তাহলে তো সব হারাবো আমি।’
‘সেটা ঠিক।’ আমি চায়ে চুমুক দিলাম। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম মেয়েটাকে সাহায্য করবো আমি। কিন্তু কিভাবে করবো সেটা ভেবে বের করতে পারলামনা। বললাম,‘এক কাজ করুন আমাকে জিনিষটা দিন, আমি ওটা বিক্রি করার চেষ্টা করি।’
এক কথায় রাজি হয়ে গেল মেয়েটা। হাতের ব্যাগটা খুলে ভেতর থেকে নেকলেসটা বের করলো। চমৎকার ডিজাইনের সোনার নেকলেস। একনজর দেখলেই বোঝা যায় পুরাতন আমলের অথচ বাইশ ক্যারেটের সোনা। আমার যদিও এসব ব্যাপারে অভিজ্ঞতা কম তারপরেও অনভিজ্ঞ চোখে যতটুকু চিনলাম তাতেই বুঝলাম যে নেবে জিনিষটা তার পোয়াবারো। বর্ষা নেকলেসটা তুলে দিলো আমার হাতে। আমি তার সরলতায় বিশ্মিত ও হতভম্ব হলাম। বোকা মেয়ে, চেনেনা জানেনা একটা মানুষকে কিভাবে এতো টাকা দামের জিনিষটা দিয়ে দিতে পারে। আমি নেকলেসটা আমার প্যান্টের পকেটে রাখলাম।
মেয়েটা ওটা নিয়ে একবারও কোন কথা বললোনা। রবং সে প্রসঙ্গ বদলে ফিরে গেল তার পরিবারের কথায়। জানাল কতো কষ্টে তার বোন পরীক্ষা দিচ্ছে। তার বাবা তাকে কতো নৈতিকতা শিক্ষা দেয় প্রতি দিন। ‘বাবা বলে কাউকে কখনো মিথ্যা আশ্বাস দিতে নেই।’ বর্ষা বলে চলে। ‘বাবা বলে তোমার চলাফেরায় আরও সাবধানী হতে হবে যেন তোমাকে দেখে অন্য কোন মানুষ ভুল মেসেজ না পায়। বাবা আরও বলে এই বয়সটা ভুল করার বয়স। কিন্তু এই বয়সে ভুল করলে সারা জীবনে শোধরানো যায়না।’
‘আপনার বাবা একদম ঠিক কথা বলেন।’ আমি বললাম।‘আমার মা আপনার বাবার মতোই কথা বলেন।’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ। যাবে আমাদের বাড়িতে?’
‘যাবো। অন্যদিন। আজ তো বুঝতেই পারছেন কি বড়ো বিপদে পড়েছি।’
‘এটা কোন বিপদ নয়। আমি আছি না!’ আমি উঠে দাঁড়ালাম। ‘তুমি বসে বসে চা খাও আরেক কাপ, দেখবে আমি বিশ মিনিটে কাজ সেরে চলে আসবো।’
উঠে দাঁড়াতে দেখলাম মেয়েটা কেমন যেন একটু উশখুশ করছে। করাটাই স্বাভাবিক। এতো দামের একটা জিনিষ দু’মিনিটের পরিচয়ে একজনের কাছে তুলে দিয়েছে যার বাড়িও সে চেনেনা। আমি হাসলাম,‘কোন চিন্তা করোনা। ঢাকায় আমি নতুন নই। আমি তোমার এটা নিয়ে পালিয়ে যাবোনা। আচ্ছা ঠিক আছে এই নাও।’
পকেটে থাকা বেতনের পঁচিশ হাজার টাকা বের করে বাড়িয়ে দিলাম বর্ষার দিকে। ‘এটা রাখো। আর যা বিক্রি করতে পারবো সবটাই তোমাকে দিয়ে দেবো। এটা সিকিউরিটি হিসাবে তোমার কাছে রাখো।’
মেয়েটার চেহারা লাল হয়ে উঠেছে।‘কি যে বলেন ভাইয়া। আমি আপনাকে কেন বিশ্বাস করবোনা?’
‘না না ঠিক আছে এটা রাখোনা তোমার কাছে। দেখবে এটা এক লাখ টাকায় বিক্রি করে দেবো আমি। তুমি পারবেনা কারন ওরা তোমাকে দেখলেই বুঝে ফেলবে তোমাকে ঠকানো সহজ হবে।’ 
মেয়েটা ইতঃস্তত করে টাকাটা নিলো। বাইরে বৃষ্টি কমেছে। আমার গায়ে শার্ট নেই। ভেতরের গেঞ্জিটায় কয়েকটা ফুটো হয়ে আছে। মা বেশ ক’দিন বলেছেন সেলাই করে দেবার জন্য। আমাকে প্রতিদিন বাইরে যেতে হয় তাই আর সেলাই করা হয়নি। এখন মনে হলো কি ভুলটাই না করেছিলাম সেদিন। মা যদি সেলাই করে দিতো তাহলে মেয়েটার সামনে ছেঁড়া গেঞ্জি পরে বসে থাকতে হতোনা। আমাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে বর্ষা নিজের গা থেকে শার্টটা খুলে দিলো। এছাড়া আর করার কিছুই নেই আমার। এখান থেকে বেরুতে গেলে আমাকে শার্ট পরতে হবে। 
আমি শার্ট পরে নিলাম। বর্ষা অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভীষন মায়া হলো আমার মেয়েটার জন্য। সে হয়তো ভাবছে আমি ওকে পঁচিশ হাজার টাকা দিয়ে বাকি টাকাগুলো মেরে দেবো আমি। কিন্তু আমাকে বিশ্বাস করা ছাড়া তার আর কিছু করারও নেই। আর বিশ্বাস না করলে তার হয়ত: আজ রাতে পেটে ভাতও জুটবেনা।
‘যত তাড়াতাড়ি পারি আমি চলে আসছি। তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো।’ শেষবারের মতো তার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির মধ্যে নেমে পড়লাম আমি।



আমার শার্টের ভেতর কেমন যেন এক উষœতা, কেমন এক সুবাস। মেয়েটা কিছু সময়ের জন্য আমার শার্টটা পরেছিলো তাতেই...।
আমি অনেক কষ্টে অন্যদিকে মনোযোগ দিলাম। হেঁটে নেমে এলাম পুরানা পল্টন এর মেইন রোডে। উল্টো দিকে বায়তুল মোকাররম। সারি সারি স্বর্নের দোকানগুলো যেন রূপকথার রাজকন্যার মতো হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে আমার অপেক্ষায়। রাস্তা পার হয়ে আমি মার্কেটের সামনে এলাম। একটা স্বর্নের দোকানে ঢুকে পড়লাম। বৃষ্টিতে আটকা পড়া মানুষজন মার্কেট ছেড়ে নেমে পড়েছে রাস্তায়। দোকানে কাস্টমার নেই। তিন চারজন সেলসম্যান বসে বসে চা খাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে কাউন্টারের পিছনে। 
‘আমি একটা নেকলেস বিক্রি করবো।’ আমি বললাম। 
লোকগুলো তেমন কোন আগ্রহ দেখালো না আমার কথায়। আমি ভেবেছিলাম একথাটা শোনার সাথে সাথে তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর। তারা আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে এসব তারা প্রতিদিন শুনে দেখে অভ্যস্ত। একজন বয়স্ক সেলসম্যান আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো। তারমানে দেখতে চাইছে জিনিষটা। আমি পকেট থেকে বের করলাম বর্ষার নেকলেসটা। লোকটা আমার হাত থেকে নেকলেসটা নিলো তারপর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বললো,‘আপনার বাড়ি কি বগুড়া ভাই?’
আমি অবাক হলাম। ‘না তা হবে কেন?’ ভ্রু কুঁচকে বললাম।
লোকটা মাথা নাড়লো।‘অনেক দিন পর এই জিনিষ দেখলাম। কতো টাকা নিয়েছে আপনার কাছ থেকে?’
‘কতো টাকা মানে?’
‘মানে এটা তো সোনার নেকলেস নয়। ইমিটেশনের। তবে খুব যতœ করে বানানো যাতে আসল না নকল চেনা না যায়। দেখলেন না আমার চিনতেও কতো সময় লাগলো।’
‘পাগল নাকি? এটা একজনের মানে খুব গরিব এক পরিবারের শেষ সম্বল। এটা বিক্রি করে তাদের সংসার চলবে।’
‘তাদের সংসার যে এবার খুব ভালোই চলবে তা খুব বুঝতে পারছি।’ লোকটা দাঁত বের করে হাসলো। ‘আপনার চেহারা দেখেই বিষয়টা অনুমান করে নিয়েছি আমি। এসব তো কম ডিল করিনা রে ভাই। আপনি বড়া ঠকা ঠকে গেছেন এবার।’
আমি হতবাক, বিশ্মিত ও হতভম্ব। কি বলবো বুঝতে পারছিনা। বড় ঠকা বলতে কি মিন করতে চাইছে লোকটা? 
লোকটাও বুঝতে পারলো আমি তার কথা ঠিকমতো গিলতে পারিনি। সে বললো,‘মানে যে আপনাকে এটা দিয়েছে সে কতো টাকা রেখে দিয়েছে আপনার কাছ থেকে?’
‘না টাকা রাখবে কেন? আমি নিজে...।’ আমার কথা আটকে গেল মাঝপথে। লোকটার হাত থেকে নেকলেসটা ছোঁ মেরে নিয়েই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলাম বাইরে। ছুটলাম যেদিক থেকে এসেছিলাম সেদিকে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিটা আবার বাড়তে শুরু করেছে। আমার কোনদিকে হুঁশ নেই। পাগলের মতো ছুটলাম পুরানা পল্টনের গলির দিকে। 

হোটেলের লোকটা আমার দিকে বোবার মতো তাকিয়ে থেকে বললো,‘আমি কিন্তু আপনাকে ইশারা করতে চাইছিলাম ভাইজান। সে আমার ইশারা বুঝতে পাইরা আপনারে অন্য কথায় নিয়া গেল, কইল আমার চোখ খারাপ। আপনে বুঝবার পারেন নাই।’
আমি হাঁপাচ্ছি,‘কোনদিকে গেছে সে?’
লোকটা উল্টোদিকে ইশারা করলো,‘হ্যার গাড়ি দাঁড়াই ছিলো ওদিকে। আপনি যাইতেই হ্যায় গাড়িতে উইঠাই চইল্লা গেল।’
আমি পকেট থেকে নেকলেসটা বের করলাম,‘ও যেসব কথা বললো সব কি মিথ্যা?’
‘কইতে পারুমনা ভাইজান। হ্যাদের গ্রুপ অনেক বড়ো আর শক্তিশালী। আপনে ওরে কতো দিসেন ভাইজান?’
‘পঁচিশ হাজার।’
‘ইশ ঈদের আগে আপনেরে এক্কেরে খালি কইরা দিয়া গেসে।’লোকটা মাথা নাড়লো।‘আমার সন্দেহ হইসিলো হ্যার কথা হুইনা। আমি বেশি কথা কইলে হয়ত: আপনে আমারে মাইর দিতেন। তাই কিছু কইতে সাহস পাই নাই।’
আকাশ তো অনেক আগেই আমার মাথায় ভেঙ্গে পড়ে আছে। ওটাকে সরানো দরকার। মনে মনে চিন্তা করলাম কোথায় যাই। এতো টাকা বোকার মতো হারালাম। চুপচুপে ভিজে ঝড়ো কাকের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। বাড়ি গিয়ে মায়ের সামনে পড়ার মতো সাহস রইলোনা বুকে। আগামীকাল ঈদের শপিং করতে যাবার কথা। তাছাড়া পাত্রী পক্ষ আসবে আমাকে দেখার জন্য। কোথায় পাবো টাকা? মায়ের জন্য একটা শাড়ী কেনার কথাও আছে। বর্ষার জন্য কিছু একটা করতে চাইছিলাম অথচ বর্ষার মতো আমার নিজেরই অবস্থা এখন। রাস্তায় নেমে এলাম আমি। বৃষ্টি আবার কমেছে। ভেজা শার্ট পরে হাঁটতে লাগলাম বাড়ির দিকে। এখন মনে হচ্ছে সুবাস নয়, পচা দুর্গন্ধ আসছে শার্টটা থেকে। মেয়েটা আমার পঁচিশ হাজার টাকা নিয়ে নকল সোনার একটা গহনা ধরিয়ে দিয়ে গেছে আমাকে। যাই হোক, ধরা একটা খেয়ে গেছি। এটা নিয়ে বেশিক্ষন ভাবা যাবেনা। টাকা হাতের ময়লা। এখন কোথাও থেকে ঈদের শপিং করার টাকা ম্যানেজ করতে হবে। একটা রিকসা ডেকে উঠে বসলাম আমি।


আমি চলে যাবার পর পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করলো হোটেলের বুড়ো লোকটা। বাইরে বেরিয়ে এদিক সেদিক তাকালো তারপর একটা নম্বরে ডায়েল করলো। আরেকটা বাড়ির ভেতর থেকে বর্ষা হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসে ঢুকলো বেড়ার হোটেলটাতে। হাতব্যাগ থেকে রাবার ব্যান্ডে বাঁধা নোটগুলো তুলে দিলো লোকটার হাতে,‘এসব আমি আর করতে পারবোনা বাবা।’ রাগ দেখিয়ে বললো সে। ‘তোমার বানানো কথা বলে মানুষকে এভাবে ঠকানো পছন্দ করিনা আমি।’
‘কি করবো রে মা? এই ছোট্ট জায়গার দাম হইলো বিশ লাখ টাকা। মাসে দিতে হয় পনেরো হাজার টাকা। তোদের পড়াশোনা,খাওয়া দাওয়া এসব কোত্থেইকা চালাই?’
‘এটাই শেষ। আর পারবোনা।’ গজ  গজ করতে করতে বললো বর্ষা। পা বাড়ালো রাস্তায়।
‘মা তানিয়া।’ পেছন থেকে ডাকলো বুড়ো।
‘বলো?’
‘এই পাঁচশো টাকা তোর কাছে রেখে দে। এতো কষ্ট করলি।’
‘লাগবেনা। বাড়ি ফেরার সময় আমার জন্য কিছু ফুল কিনে এনো। আজ আমার জন্মদিন।’

সাদৃশ্যকরন...................................তুহিন রহমান (ঈদ সংখ্যা ২০২০)

সাদৃশ্যকরন...................................তুহিন রহমান (ঈদ সংখ্যা ২০২০)
‘শালা একটা কুত্তার বাচ্চা!’
‘আরে কাকে বলছিস?’
‘তোকে না।’
‘আমাকে না তো বুঝলাম কিন্তু কাউকে না কাউকে তো বলছিস।’
‘হ্যাঁ বলছি একজনকে। আমার পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে এখন দিতে চায়না। বলে এগুলো নাকি এখন দিতে পারবে না।’
‘তা তুই কি বলেছিস?’

লাড্ডু জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সবাই রাস্তা ছেড়ে পালাচ্ছে যেদিকে পারছে। একটু ঝড়ো হাওয়াও আছে সাথে। সামনের গাছগুলো দুলছে। সামনের মোটা ইলেকট্রিক তারের ওপর কয়েকটা কাক বসেছিল। বৃষ্টি নামতেই উড়ে পালালো। ‘আমি কিছু বলিনি। একটা কুত্তার বাচ্চাকে কি বলবো আমি?’
‘তোর উচিত ছিল তাকে সামনে থেকে এই গালিটা দেয়া যাতে সে নিজেকে ঘৃনা করতে শেখে।’ বললো চপল। ‘তুই গিয়ে কথাটা তাকে বলবি।’
‘ঠিক আছে, দেখা যাক।’ লাড্ডু আরামদায়ক সোফাটার ওপর বসলো। ‘এক কাপ চা আনতে বল তোর কাজের মেয়েটাকে। যে বৃষ্টি শুরু হলো যাবো কিকরে তাই ভাবছি।’
চপল কাজের মেয়েটাকে ডেকে দু’কাপ চা দিতে বললো। তারপর আপনমনে নিজের কাজ করতে লাগলো টেবিলে। দশ মিনিট পর কাজের মেয়েটা দু’কাপ চা রেখে গেল টেবিলে।
লাড্ডু নিজের চায়ে চুমুক দিল। হঠাৎ রাস্তার ট্রান্সফর্মারটা বিকট শব্দে আর্তনাদ করে উঠলো। একই সাথে রুমটা অন্ধকার হয়ে গেল। কারেন্ট চলে গেছে।
‘এই যা, এই অন্ধকারে কাজ করি কিভাবে?’ চপল উঠে পড়লো টেবিলটা থেকে। ‘আচ্ছা তুই বস, আমি গোসলটা সেরে আসি।’
লাড্ডু মাথা নাড়লো। চায়ের কাপটা শূন্য করে নামিয়ে রাখলো টেবিলে। খোলা জানালা দিয়েঠান্ডা বাতাস আসছে হু হু করে। ও আরামে চোখ বন্ধ করে সোফায় হেলান দিয়ে বসলো। এই গরমে যে এসি ছাড়া এমন ঠান্ডা বাতাস পাওয়া গেছে সেই তো অনেক। উফ, গরমে প্রানটা একেবারে গলার কাছে উঠে এসেছিল। পকেটে হাত দিতে সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে ঠেকলো। খুশি মনে প্যাকেটটা বের করে দেখলো একটাও সিগারেট নেই তার ভেতর। মনে মনে একই রকম একটা গালি ঝেড়ে লাড্ডু প্যাকেটটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দিল বাইরে। তারপর মাথার পেছনে হাত রেখে চোখ বন্ধ করলো। কিন্তু পেটটা টনটন করছে। সেই সকালে বাথরুম সেরে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিল, এখন পর্যন্ত বাথরুম সারা হয়নি। প্রশ্রাব জমে পেটটা একেবারে ফুলে উঠেছে। অস্থির লাগছে ভীষন। চপলের রাথরুমটায় যাওয়া যেত! মনে পড়লো চপল বাথরুমে গোসল করছে। ওদের বাড়িতে একটাই বাথরুম। যে করে হোক চেপে বসে থাকতে হবে।
কি আর করবে, উপায় নেই। লাড্ডু প্রশ্রাব চেপে সোফায় হেলান দিয়ে বসে থাকে বাইরের দিকে তাকিয়ে। গতরাতে ভালো ঘুম হয়নি। এখন চোখ বেশ ভার ভার বোধ হচ্ছে। বাড়ি গিয়ে আচ্ছা করে ঘুম দিতে হবে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। খোলা জানালা দিয়ে দুরের গাছগুলোর হেলে পড়া দেখতে ভীষন ভালো লাগছে।
বৃষ্টি থেমে যাবার পর আধাঘন্টা পেরিয়ে গেছে। চপল এখনও বেরুচ্ছে না বাথরুম থেকে। লাড্ডুও চেঁচিয়ে ডাকতে পারছেনা। ভেতরের ঘরে ওর মা, ওর দুটো বোন আছে। চপলের ছোট বোনটার প্রতি আবার লাড্ডুর একটু দুর্বলতা আছে। তাই এখানে জোরে কথা বলা বা কোন উদ্ভট আচরন করা যাবেনা। এদিকে পেট ফেটে যাচ্ছে।
‘দুর! উঠে পড়লো লাড্ডু। এখানে প্রশ্রাব করার দরকার কি? বাড়ি যাবার পথে সেরে নেয়া যাবে। চপল এসে দেখবে সে নেই। তাতে কোন সমস্যাও নেই। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করার সিস্টেম আছে। সেই সিস্টেম মেনে দরজাটা বন্ধ করে লাড্ডু সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। ভেজা পিচঢালা রাস্তাটা চকচক করছে একেবারে। কি সুন্দরভাবে প্রকৃতি সব পরিস্কার করে দিয়ে গেছে!
লাড্ডু বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু প্রতি পদে তার পেটটা মুচড়ে উঠছে। মনে হচ্ছে পেটের ভেতর থেকে প্রশ্রাবগুলো ফেটেই বেরিয়ে আসতে চাইছে। আল্লাই জানেন কিভাবে মেয়েমানুষগুলো দশ মাস দশ দিন বাচ্চা পেটের ভেতর চেপে রাখে।
চারপাশে তাকাতে লাগলো লাড্ডু। কোথায় যাওয়া যায়। আশেপাশে কোন পাবলিক টয়লেট নেই যে সে সেখানে গিয়ে প্রাকৃতিক কাজটা সারবে। শেষ পর্যন্ত পেয়ে গেল সে জায়গাটা। একটা ডাস্টবিনের ঠিক পেছনে চমৎকার একটা দেয়াল। একেবারে নতুন রঙ করা হয়েছে দেয়ালে। সম্ভবত কোন রাজনৈতিক পার্টি তাদের কলাম লিখবে এখানে। একেবারে ফাস্টক্লাস প্রশ্রাব করার জায়গা, মনে হয় খোদা মিলিয়ে দিয়েছে তাকে। একটা শান্তির দম ছেড়ে সেদিকে এগিয়ে গেল লাড্ডু। প্যান্টের চেইনটা খুললো। তারপর আস্তে ধীরে ছাড়তে লাগলো নতুন রঙ করা দেয়ালের ওপর। আহ কি শান্তি! পৃথিবীতে এর চেয়ে শান্তির কিছু আছে নাকি কে জানে। একই সাথে একটা ডিজাইন আঁকাও হয়ে যাবে দেয়ালটার ওপর। লাড্ডু একটা মুখ আঁকতে চাইলো সেখানে।

আচমকা পাশ থেকে কেউ ঘেউ করে উঠলো। লাড্ডু পাশে তাকিয়ে চমকে উঠলো একেবারে। একটা হলুদ রঙের ঘেয়ো কুকুর এক ঠ্যাং তুলে তার ঠিক পাশে দাঁড়িয়েই প্রশ্রাব করছে একই দেয়ালের ওপর। লাড্ডু আরও অবাক হলো যখন দেখলো কুকুরটা তার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসছে।
কোনমতে প্রশ্রাব শেষ না করেই তার যন্ত্রটা চেইনের ভেতর ঢোকালো লাড্ডু। সরতে যাবে কুকুরটা তার পথরোধ করে দাঁড়ালো। তারপর মানুষের গলায় বললো,‘প্রশ্রাব যে করলা, চাইয়া দেহ তোমার প্রশ্রাব গড়াইয়া রাস্তায় চইলা আসছে। এহান দিয়া মানুষ চলবো না? তাকায় দেহ আমি কেমনে করসি। আমারে তো কুত্তা বইলা গালি দাও। তুমি আর আমি তো একই জাগায় হিসি করলাম। তাইলে তুমিও আমার লাহান কুত্তার বাচ্চা।’
আঁৎকে উঠে ঢোক গিলল লাড্ডু। তাই দেখে কুকুরটা আরো জোরে হাসলো,‘হুনো মিয়া, তোমরা হইলা গিয়া মানুষের বাচ্চা। রাস্তায় মুতবা কেন? তোমাগো কত সুন্দর টয়লেট আসে, বাথরুম আসে হেইহানে এইসব কাম করবা। এইটা হইলো আমার মুতনের জাগা। ঠিক আছে তুমি আমার জাগায় তোমার কাম করসো ভালা কথা। দুই ট্যাকা দ্যাও।’
লাড্ডু ঢোক গিলে বললো,‘টাকা দিয়ে তুমি কি করবে?’
‘ওই মিয়া ট্যাকা দিয়া কি করে তোমারে শিখাই দ্যাওন লাগবো? তুমি আমার জাগায় মুতবা আর ট্যাকা দিবানা হেইডা কেমুন কথা?’ কুকুরটা আরো জোরো জোরে বললো।
লাড্ডু পকেট হাঁতড়ে দেখে তার কাছে কোন টাকাই নেই। তাই দেখে কুকুরটা যেন মজা পায় আরো। বলে,‘হুনো মিয়া, তুমি আজ থেইকা আর কোন মানুষরে কুত্তার বাচ্চা বইলা গালি দিবানা, ঠিকআসে?’
লাড্ডু ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ে। ‘তুমি দেহ,’ কুকুরটা আবার বলে,‘আমরা না খাইয়া থাহি। তোমরা কতো মজার মজার জিনিষ খাও। আর আমরা সারাদিন খালি পেটে ঘুরি। তোমরা দিলে খাই নাইলে খালি পেটে রাইতে ঘুমাইতে হয়। তুমি চিন্তা করসো কুকুরই হইলো একমাত্র প্রানী যে মানুষের উপরে পুরাপুরি নির্ভরশীল। অন্য সব প্রানীই নিজের খাবার নিজে খুঁইজা নিতে পারে, কিন্তু মানুষ না দিলে কুকুর নিজে কোন খাবার খাইতে পারেনা। মানুষের উচ্ছিষ্টের উপরে কুকুররা বাঁইচা থাকে। তোমরা ‘কতো বড়ো বড়ো কথা কও, অথচ দেহ তোমরা কি কখনও চিন্তা করসো তোমরা যহন লাখ লাখ টাকার জুয়া খেলতাসো, কোটি টাকার গাড়ি চড়তাসো, মদ খাইতাসো, শত কোটি টাকা দিয়া পঞ্চাশ তলা বাড়ি বানাইতাসো তহন একটা কুকুর তোমার সামনের রাস্তায় না খাইয়া শুইয়া আসে?’
লাড্ডু মাথা নাড়ে। না, সেও কখনও এমন করে চিন্তা করেনি।
‘তোমাগো রাজনীতিবিদরা চিল্লায় গলা ফাটাইয়া ফেলায়।’ কুকুরটা দাঁতে দাঁত চিপে বললো,‘হ্যারা তোমাগোরে মিথ্যা সান্তনা দিয়া দ্যাশের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে। হ্যারা যেমনে ট্যাকা চিবায় তেমনে আমরা হাড্ডিও চিবাইতে পারিনা। আর তোমরা মানুষরে কও কুত্তার বাচ্চা। আরে তোমগো তো কওন উচিৎ রাজনীতিবিদের বাচ্চা। গালি দিবা ঘুষখোরের বাচ্চা, মিথ্যাবাদীর বাচ্চা, মানুষের বাচ্চা, চোরের বাচ্চা, ডাকাতের বাচ্চা। তা না কইরা তোমরা গালি দাও আমাগোর জাতিকে নিয়া। এইটা কি ঠিক?’
লাড্ডু মাথা নাড়ে এপাশ ওপাশ। একদম ঠিক নয়।
দেহ, বিলাইরে তোমরা অনেক উপরে তুইলা রাখসো। কিন্তু বিলাই কি করে? তোমগো খাবার চুরি কইরা খায়। বিলাই তোমগোরে অভিশাপ দেয় য্যান তোমরা অন্ধ হইয়া যাও আর হ্যায় তোমগো খাওন চুরি কইরা খাইতে পারে। হ্যার পরও তোমরা মানুষরে বিলাইয়ের বাচ্চা বইলা কঠিন গালি দাওনা। তোমগো কঠিন গালি হইলো কুত্তার বাচ্চা, ক্যান উত্তর দাও?’
লেজ নাড়তে ইচ্ছে হলো লাড্ডুর। অন্তত সে যদি লেজ নাড়তে পারতো তবে এই কুত্তাটা তাকে কামড় না দিয়ে ছেড়ে দিতে পারতো। এখন তো এমনভাবে দাঁত খিচোচ্ছে যে ভাব কামড় দিয়ে বসবে পাছায়।
‘পারবানা, কোন উত্তর দিতেই পারবানা। কারন তোমরা মানুষরা খুব স্বার্থপর বুঝলা? কুকুরকে তোমরা কও কুত্তা। আরে কুত্তা তো হিন্দী উর্দু শব্দ। তোমরা দেশ স্বাধীন করসো বাংলার কথা ‘বলবা বইলা, অহন হিন্দী উর্দু কও ক্যান। কইবা কুকুরের বাচ্চা। যখন তোমরা কুত্তা কও তখন আয়নার মইদ্যে তাকাইয়া দেহ তোমার মুখটা কেমুন দেহায়। দেখবা মুখটা বাঁইকা গুলিস্থানের পাবলিক টয়লেটের লাহান লাগতাসে।’
লাড্ডু অনেক কষ্টে বলে,‘জ্বি স্যার।’
কুকুরটার মুখটা আনন্দের হাসিতে ভরে যায়। লেজ নাড়তে থাকে সে সুখে। বলে,‘এতোদিন পর একটা সুন্দর শব্দ শুনলাম। এইবার আমার মুখ দিয়ে শুদ্ধ কথা বেরুবে। লাড্ডু বাবাজি, আমার কাছে গতকালের একটা গরুর শুকনো হাড্ডি আছে, খাবে?’
লাড্ডুর গলা দিয়ে বমি উঠে আসে প্রায়। কোন মতে মাথা নাড়ে সে।
‘ওহ তোমরা তো আবার কুকুরের মুখের জিনিষ খাওনা।’ শুদ্ধ ভাষায় বলে কুকুরটা।‘ঠিকআছে, যাও বাকি প্রশ্রাবটা সেরে নাও। আমি জানি আমাকে দেখে তোমার প্রশ্রাব আবার ভেতরে ঢুকে গেছে। এবার শান্তিমতো বাকি কাজ সারো তো।’
লাড্ডু এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার আগের স্থানে ফিরে যায়। তারপর প্যান্টের চেইন খুলে আরামে ছাড়তে থাকে দেয়ালের ওপর। ওদিকে কুকুরটা সুখের হাসি হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে। আবার বৃষ্টি শুরু হলো নাকি? মুখের ওপর পানি পড়ছে কিসের?
আচমকা কানের কাছে আজানের শব্দ শুনে সচেতন হলো লাড্ডু। আরেনা, আজান নয়, কেউ চিৎকার করছে ক্রমাগত,‘ভাইয়া, ও ভাইয়া, একি করছে দেখে যাও!’


লাড্ডু যেন অচেতন থেকে সচেতন হলো। তার মুখের ওপর পানি ঢালছে কে? ঘুমঘুম আবেশে চোখ খুললো লাড্ডু। পায়ের দিক থেকে পিচকারী দিয়ে পানি এসে ওর চোখ মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে, সেই সাথে ভিজছে চপলের সোফা, দরকারী কাগজপত্র, ল্যাপটপ, মোবাইল, টেবিল। এক নিমিষে পুরোপুরি ঘুম থেকে জেগে উঠলো লাড্ডু গরম পানির ফোয়ারায়। তার প্যান্টের চেইন খোলা। সেখান দিয়ে পিচকারীর মতো পানি বেরিয়ে এসে সোজা ওর মুখ ভেজাচ্ছে। আর ওর সামনে মুখে হাত চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চপলের দু’দুটো বোন। তাদের চোখে লজ্জা আর মহা বিশ্ময়।
বৃষ্টি আর ভেজা বাতাসে কখন যে ও ঘুমিয়ে পড়েছিল আর স্বপ্নে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করছিল। আসলে তখন সে চপলের সোফায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চেপে রাখা প্রশ্রাব আরাম করে ছাড়ছিল।






আম্মার বিয়ের শাড়ি...........রাকিব শামছ শুভ্র

আম্মার বিয়ের শাড়ি...........রাকিব শামছ শুভ্র

বুবুর উচ্ছ্বসিত হাসি দেখে খুশী হলেও কেমন একটা কষ্টও অনুভব করছি। আম্মা বুবুর জন্য জামা সেলাই করছে। আর আমি, আঁখি আর পাখি হা করে তাকিয়ে আছি। একটা না দুইটা না একসাথে তিন তিনটা জামা বানিয়ে দিচ্ছে।

মরা চারবোন, ভাই নেই আমাদের। ভাইয়ের আশায় চার সন্তানের মা-বাবা হয়েছেন কিন্তু ছেলে হয়নি। বুবু রাখি, আমি সাখি, আমার পরে আঁখি আর পাখি। আমরা মফস্বলে বসবাস করি। বাবা সরকারি চাকুরি করেন। দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা তবে তার সততার জন্য খুবই সম্মানিত ব্যাক্তি। আমার মা আমাদের দেখাশোনা করে, সংসার এর সকল কাজ সামলায়। আমরা চার বোন, বাবা-মা, আমার দাদু এই নিয়ে আমাদের সংসার। বাবার একার আয়ে সবার পড়ালেখাসহ অন্যান্য খরচ জোগানো খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাদু কৃষিকাজ করতেন। বাবা নিজে লজিং থেকে বিএ পাশ করে চাকুরিতে ঢুকেছেন। আম্মা নাইন পর্যন্ত পড়েছে। এরপর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আর পড়া হয়ে উঠেনি। আম্মাদের বড় গৃহস্থ পরিবার। শয়ে শয়ে বিঘা জমি, ধান, পাটের কারবারি। নানার অনেক পয়সা ছিলো কিন্তু মানুষ হিসেবে খুব বড় মনের ছিলেন না। দুইটা বিয়ে করেছেন, একগাদা ছেলেমেয়ের বাপ হয়েছেন। আম্মার প্রেম মেনে নেননি, আর আম্মাও ছিলেন প্রচন্ড জেদি। বাবার হাত ধরে পালিয়ে চলে আসেন। বাবাই ছিলেন আম্মাদের বাসায় লজিং মাস্টার। বাবা পালিয়ে বিয়ে করতে রাজি ছিলেন না কিন্তু মায়ের জেদের কাছে নতি স্বীকার করে নিলেন। নানা এই বিয়ে মেনে নেননি, আম্মাও কখনো আর ওই বাড়িতে যাননি। আমাদের পরিবারে এসে বাবার পাশে যোগ্য স্ত্রী হিসেবে পাশে ছিলেন এবং আছেন। বাবার স্বল্প আয়ে সংসার সামলে যাচ্ছেন। কোন রকম বিলাসিতা আমাদের সংসারে একেবারে অপরিচিত শব্দ। 

মা নানার বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার সময় তার শখের সেলাই মেশিনটা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। সিঙ্গার মেশিনটার বয়স প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেছে। আম্মার যত্ন এবং ভালোবাসায় এখনো একেবারে নতুন মেশিনের মতোই ছুটে। আম্মার এই শখের জিনিসটাই কখন যে সময়ের আবর্তে আমাদের সবার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে! খরচ বাঁচাতে আম্মার এই মেশিন এখন পরিবারের বড় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। মেশিনের ঘরঘর শব্দ শুনলেই আমরা বুঝি আম্মা নতুন কিছু সেলাই করছেন! আমরাও প্রতি রোজার ঈদে একসেট করে মোটামুটি ভালো জামা পাই। আর বাসায় পরার জন্য সবার মিলিয়ে ঝিলিয়ে কয়েকসেট কাপড় আছে। আমাদের চার বোনের সব জামাকাপড় আম্মার সেলাই করা। আমরা কখনো দোকানে গিয়ে জামা কিনিনি। আম্মার বানানো জামাগুলো অবশ্য দোকানের জামার চেয়ে ঢের সুন্দর। 

আজ বুবুর জন্য আম্মা তিনটা কাপড় এনেছেন। এখন বসে বসে সেলাই করছেন আর আমরা বুভুক্ষুর মতো আম্মার চারপাশে ঘিরে আছি। বুবুর ভাগ্যকে হিংসা হচ্ছে খুব। বুবু এবার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা পাশ করেছে। এতোদিন বুবুরও আমাদের মতো একটা ভালো জামা ছিলো আর আজ থেকে চারটা বেড়ানোর জামা! আম্মার উপর খুব জিদ হচ্ছে। 

বুবু পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। মেডিক্যাল কলেজে টিকেছে। আগামী সপ্তাহে শহরে যাবে বাবার সাথে। এতোদিন কলেজ ড্রেস পরেই কাজ সারতো কিন্তু এখন না-কি মেডিক্যাল কলেজে ইউনিফর্ম নাই। বুবুর তো ভালো জামা মাত্র একটা! তাই আম্মা কাল কাপড় কিনে এনেছেন। বাসার সবাই খুব খুশি বুবুর রেজাল্টে। কিন্তু আমার খুশি লাগছে না। বুবু নতুন তিনটা জামা পাচ্ছে তার মানে এবার হয়তো ঈদে আমাদের আর নতুন জামা পাওয়া হবে না! বুবু বাড়ি ছেড়ে যাবে এতে যতটা না মন খারাপ হচ্ছে তারচেয়ে বেশী মন খারাপ নতুন জামার শোকে।

দুপুরে মন খারাপ নিয়ে খেতে বসেছি। পাতে মাছের টুকরার সাইজ ছোট দেখে মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেছে। আমাকেই শুধু সব মেনে নিতে হবে? আমি মুখ ফুলিয়ে বসে আছি। আম্মা খেয়াল করলেন আর বকা দিলেন। তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠ। আমি ভাত নাড়াচাড়া করছি কিন্তু খাচ্ছি না। আম্মা কিছুই বললেন না। না খেয়ে উঠে পরলাম। চারটার দিকে আম্মা আমাকে ডাকলেন, রনির মা (আমাদের বাসায় আম্মাকে কাজে সাহায্য করে) এর সাথে তার বাসায় যেতে। রনির মা আমাকে নিয়ে তার ঘরে গেলো। পাশেই এক বস্তিতে থাকে ওরা। রনিরা তিন ভাই। বড়টার বয়স আট বছর, মেঝটা ছয় আর ছোটটা তিন বছর। একটা ছোট্ট ঘরে ওরা থাকে। ঘরটা অন্ধকার ঘুপচি মতোন। ভেড়ানো দরজা টেনে খুলতেই তিনভাই এক সাথে চেচিয়ে উঠলো, মা এসেছে, মা এসেছে। 

দরজার বাহিরে বসলো তিনজন। রনির মা কোচরে শাড়ী দিয়ে ঢেকে রাখা থালাটা বের করলো। আমার না খাওয়া মাছের টুকরা, সাথে ঝোল দুই টুকরা আলু আর এক থালা ভাত। তিনজনই প্লেটের উপর ঝাপিয়ে পরলো। ওই এক টুকরা ছোট মাছটা দিয়ে খাচ্ছে আর বলছে, মা অনেকদিন পর এত্ত বড় মাছ আনলা! আমি অবাক হয়ে দেখলাম রনির মা দু নালা ভাত মুখে দিয়ে আর দিলোনা। তার চোখের কোনে পানি অথচ মুখে কি সুন্দর হাসি! রনি মাছের কাটা বেছে নিজে না খেয়ে ছোট দুই ভাইয়ের মুখে তুলে দিচ্ছে। গপগপ করে খাচ্ছে আর খুনসুটিতে মাতছে।

আমি চুপ করে ওদের খাওয়া শেষ করা দেখলাম। বাসায় এসে দৌড়ে গেলাম আম্মার কাছে। গিয়ে আম্মার বুকে মুখ গুজে অঝোরে কাঁদতে লাগলাম। আম্মা কিছুই বলছেন না। শুধু আমার মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আমি আম্মার বুক থেকে মুখ তুলে গলা জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, আম্মা আমি আর কোনদিন খাওয়া নিয়ে নকতা করবো না। ওদের প্রতিদিন তুমি একটুকরা মাছ দিও। 
আম্মা হেসে বললেন, তোদেরই প্রতিদিন দিতে পারিনা। চেষ্টা করবো যেদিন বেশী থাকবে, সেদিন দিতে। 
আমার টুকরার অর্ধেক ওদের দিয়ে দিও। 
আম্মা আমার চুলের বেনি ধরে হালকা টান দিয়ে বললেন, থাক থাক আর পন্ডিতি করতে হবে না। ভালো করে পড়াশোনা করে বুবুর মতো ডাক্তারি পড়তে চেষ্টা কর। নিজে যখন আয় করবি এমন দশজনকে খাওয়াতে পারবি। 
আমি মাথা দুলিয়ে জানিয়ে দিলাম, আমিও বেশী করে পড়ে বুবুর মতোই হবো।

রাতে ঘুমানোর আগে বুবু সব নতুন জামা নিয়ে ঘুমুতে এলো। এটা আমাদের চার বোনেরই অভ্যাস। নতুন জামা পেলে না পরা পর্যন্ত সেটা কাছ ছাড়া করিনা। বুবুর জামা গুলো ধরে দেখছিলাম। নতুন জামায় কি সুন্দর গন্ধ থাকে! শুকে দেখছিলাম। 
তোর খুব পরতে ইচ্ছে করছে তাইনারে সাখি? ইচ্ছে হলে পরতে পারিস।
আমার অনেক ইচ্ছে ছিলো কিন্তু বুবুকে জড়িয়ে ধরে বললাম, আমি যখন তোর মতো ভালো রেজাল্ট করবো তখন তোর জামা চেয়ে নিয়ে পরবো।
বুবু আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো, আমাদের সব্বাইকে পারতেই হবে। আম্মা-বাবার কষ্টকে স্বার্থক করতেই হবে। আমরা চারজন ওনাদের সব না পাওয়া পূরণ করে দেবো। আমিও হ্যাঁ হু করতে করতে বুবুর হাতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। 

সকালে উঠে স্কুলে ছুটলাম। দুপুরে বাসায় এসে তাড়াহুড়া করে খেয়ে উঠতেই আমাদের চার বোনকে ঘরে ডাকলেন। চার বোন ঘরে যেতেই আম্মা প্রথমে পাখিকে খুব সুন্দর একটা জামা দিলো। এরপর আঁখি তারপর আমি, শেষে বুবু। আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি৷ আম্মা বললেন, আমার বিয়ের শাড়িটা কেটে তোমাদের জন্য ড্রেস বানিয়েছি। আমারতো আর এই শাড়ি পড়াই হয়না। তাই ভাবলাম আমার রাজকন্যাদের একটা করে জামা বানিয়ে দেই। চারটা জামাতো এক শাড়ীতে হয় না তাই সবার জামার সামনে আমার শাড়ী আর পেছনে অন্য কাপড় জোড়া দিয়েছি।তোমরা চারজন এই ড্রেস পরে যখন একসাথে দাঁড়াবে আমার সব পাওয়া হয়ে যাবে। 
আমরা চারবোন মাকে জড়িয়ে ধরে বোকার মতো কেঁদেই যাচ্ছি। আর আমাদের আম্মাটা সেই চিরচেনা হাসিটা হাসছেন।

অজ্ঞাতনামা কিশোর..........................সাকিব প্রধান অনিক

অজ্ঞাতনামা কিশোর..........................সাকিব প্রধান অনিক

পৃথিবীটা গ্রহ, উপগ্রহ, মহাকাশের কণা; এসব বৈজ্ঞানিক কথাবার্তা। আমার কাছে পৃথিবী অনেকগুলো গল্পের উপর টিকে থাকা গ্রন্থমালা। এই পৃথিবীর বুকে বাস করা প্রতিটা মানুষের গল্প আছে। কিন্তু সবসময় মানুষ নিজের গল্পের প্রধান চরিত্র হতে পাড়েনা। অন্য আরেকজনের গল্পের মধ্যেও সে প্রধান চরিত্র হয়ে উঠে। এই সুযোগটা সে পায় কারন, যার গল্প সে উপলব্ধি করতে পাড়ে না যে, তারও একটা গল্প আছে। 


স্মাইল নারায়নগঞ্জ শাখা একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠন। এটি  যখন যাত্রা শুরু করে তখন তাদের ইচ্ছের দেয়াল ও মে দিবসে পথচারিদের শরবত বিতরন কর্মসূচি পালনের পরে আবিরের স্মাইলে যোগ দেওয়া। যেদিন প্রথম এই সংগঠনটির কথা জানতে পেড়েছিল আবির সেদিনই রাজি হয়েছিল। আসলে অন্যদের মতন করে বলব না যে, আবির খুব আগে থেকেই এমন কাজ করতে চেয়েছিল। যখন জানল স্মাইল এমন একটা সংগঠন, যারা পথশিশুদের নিয়ে কাজ করতে চায়, তখন শুনে ভালো লাগল। কারন শহরতলীর রাস্তা গুলোতে যখন সে দেখত এই পথশিশুগুলো ফুল বিক্রি করছে, ময়লা টোকাচ্ছে, মানুষ ওদের গাল মন্দ করছে, ভিক্ষা করছে বা তার কাছেই এসে বলছে —"ভাইয়া কিছু খাই নাই টাকা দেন। কিছু খামু।" বড় কষ্ট লাগত। সে কষ্টে বুকে হা হা কার না জমলেও ওদের জন্য কিছু না করতে পাড়ার অসহায়ত্ব ভেতরটাকে কুড়িয়ে দিত। তাই নিজেকে আর আটকে রাখেনি, স্মাইলের সদস্য হয়ে গেল। 

স্মাইল একে একে ইচ্ছের হাসি স্কুল,বৃক্ষরোপণ কর্মসুচি, এতিম ছেলেপুলের সাথে ইফতার করা,ঈদ প্রসাধনি বিতরন, গ্রীষ্মের ফল বিতরন ; ইভেন্টগুলো করল। আবিরের ভেতর থেকে মনে হচ্ছিল,সে শুধু সাক্ষী হল এসবের। তখনো পর্যন্ত এটা বলার সাহস পায়নি যে— "আমিও কিছু করেছি।" অন্তত নিজের কাছে বলার মতন গল্প সে তখনো স্মাইলে থেকে তৈরী করতে পাড়েনি। কিন্তু নিজের গল্প না হোক অন্য কারো গল্পে নিজেকে জুড়ে দিয়ে যে, নিজের একটা গল্প হতে পাড়ে সেটা আবির বুঝল সেদিন, যেদিন স্মাইল নারায়ণগঞ্জ শাখা একটা ক্ষতবিক্ষত কিশোরকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেল। আর নগরীর অন্যতম বৃহৎ ৩০০ শয্যা হাসপাতাল, খানপুরে নিয়ে এলো। কিশোরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো, আর তার অভিভাবক তখন স্মাইল নারায়ণগঞ্জ শাখা। আর স্মাইল যেহেতু তার অভিভাবক তার মানে প্রতিটি সদস্যই তার অভিভাবক। কিশোর তার নাম ঠিকানা কিছুই বলে না। যে তার কাছে যায় সে তার দিকেই ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে, তার চাহনিতে একটা নির্ভরতা খোজার চেষ্টা সারাক্ষন!

তার শরীর জুরে ক্ষত। চামড়া ছিলে গেছে পিঠের, কোমড়ের,পায়ের। ভেতরের শ্বেত মাংশপেশী দেখা যাচ্ছে আর শরীরটা যেন বাকলাহীন খসে পড়া নিম গাছের মতন হয়ে গেছে। নিম গাছের যেমন বাকলা খসে পড়লে কষ বেড় হয় তেমন করে তার শরীরেও লাল রক্ত জমাট বেধে বসে আছে। ধরলেই টপটপ করে গড়িয়ে পড়বে। আবিররা আন্দাজ করে নিল হয়তো সে ভিক্ষা করত। তার বয়সের ছেলেরা এ কাজই করে। আর তার পড়নে ভিক্ষুক ছেলেদের গায়ে যেমন ছেড়া ময়লা পাতলা পোশাক থাকে সেরকম পোশাক ছিল। আঙ্গুলের খোচায় সে জামা প্যান্ট ছিড়ে যাবে। ডাক্তার বলেছিল তার শরীরের যে ক্ষত, তা রাস্তার কংক্রিটের পীচের ওপর আছড়ে পড়ার ক্ষত। হয়তো কোন গাড়িতে ঝুলে পড়েছিল আর ছিটকে পড়েছে। 

প্রায় ১৫ দিনের মতন তার ট্রিটমেন্ট চলেছে।  এক এক দিন স্মাইল নারায়ণগঞ্জ শাখার এক একজন সদস্য যেত। কারন ডাক্তার বলেছিল তার শরীরের ব্যান্ডেজ দুই দিন অন্তর অন্তর বদলাতে হবে। এমনি একদিন এলো যেদিন অভিভাবক এর সেই ফাকা জায়গা পুর্ন করতে আবির আর শুভ ভাইয়ের যাওয়ার পালা। সেদিনের অভিজ্ঞতায় আবিরের জন্য তিনটি বিষয় ছিল নতুন।

প্রথমত, খানপুর হাসপাতালে তার প্রথম অন্দর প্রবেশ। হরেক রকমের রোগী গিজ গিজ করছে। আমরা মানুষেররা হাসপাতালে আর জেলখানায় পোকার মতন বিচরন করি। এর আগে কখনো সে এই হাসপাতালে আসেনি। 

দ্বিতীয়ত, আবির সেইদিন প্রথম কোন এমন রোগীকে এত কাছ থেকে দেখেছিল, যার শরীরের সব জায়গা ক্ষতবিক্ষত। সাদা মাংস দেখা যাচ্ছে। লাল জমাট বাধা রক্ত। সে এমন কিছু এর আগে এত কাছ থেকে দেখিনি। কাউকে বুঝতে দেয়নি যে, তার লোম কাটা দিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু কেন জানি সামনে গেল কিশোরের। কিশোরের চোখ আবিরের দিকে ড্যাব ড্যাব করে চেয়েছিল। সে হয়তো আবারো নির্ভরতা খুজচ্ছিল। আবির তার সমস্ত শরীর দেখে হা করে বসে রইল, কিভাবে ও এখনো শান্ত নয়নে বসে আছে? সে তো সামান্য ব্লেডের পোচেই কাতরায়। ওই কি আবিরের থেকেও বেশি শক্তিশালী! ওর দুনিয়াতে কি ব্যাথাকে সহ্য করার এত সাহস আল্লাহ দিয়ে দিয়েছে! 
আবির কিশোরের নাম জিজ্ঞেস করল কয়েকবার, প্রতিবারেই নিজের ভিন্নভিন্ন নাম সে বলে গেল। ওর ঠিকানা জিজ্ঞেস করলেই বলে শুধু ট্রেন এর কথা। শুভ ভাই বলল, খুব সম্ভবত কমলাপুর রেলস্টেশনে ওর বেড়ে উঠা হয়েছে। শুভ ভাই জিজ্ঞেস করলেন— "আর কে কে আছে তোর পরিবারে?", ও এই কঠিন প্রশ্নের জবাব আঊরাতে লাগল, তখন পাশের সিটের একজন রোগী বলল, নাস্তা করাতে। আবির সেদিন প্রথম কোন পথশিশুকে নিজের হাতে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছিল। না আনন্দ হচ্ছিল, না দুঃখ! বেনামী অনুভূতি ছিল তা। ছেলেটি ভাইয়া বলে সম্বোধন করল খাওয়া শেষে। আর আবিরের তার প্রতি বাড়িয়ে দেওয়া প্রতিটা লোকমা সে মুখে তুলে নিল। আর এক সময় হঠাৎ কেদে দিল। মনে হয় মায়ের কথা বা যার কাছে বড় হয়েছে তার কথা মনে পড়েছিল। আবির ওর কাছ থেকে চোখ সড়িয়ে নিল। শুভ ভাইকে বলল বাকী খাবার খাইয়ে দিতে। 
তারপর দুপুরে ডাক্তার বলল— "ব্যান্ডেজ চেঞ্জ করাতে হবে, যারা এসেছেন একটু ওকে ধরে বসান আর ওকে ধরে রাখেন। ও হাত পা নাড়া চাড়া বেশি করে।" 

আবির কিশোরের উঠে বসার পর পিঠের অংশ দেখে হা করে রইল। ধরবে কোথায়? হাত রাখবে কোথায়? সাদা মাংস দেখা যাচ্ছে। নির্মম দৃশ্য! 
শুভ ভাই জোর করল। আবির ওর কাধ চেপে ধরল ঠিকই কিন্তু ওর দিকে তাকায়নি। কারন সে ড্রেসিং করার সময় কিশোরের চিৎকার সহ্য করতে পাড়ছিল না। ডক্তার মেডিসিন দিচ্ছে আর কিশোর ছেলেটি চিৎকার করে বলছে — "ভাইয়া, ভাইয়া।" 
আবির তার এতটুকু আর্তনাদে এটা বুঝল যে, ছেলেট কখনো তার মাকে দেখেনি। যে মায়ের ভালোবাসা পায় না, তারা ভীষন ভয়েও মায়ের নাম মুখে নেয় না। কারন তাদের মানসপটে মা নামের কোন অস্তিত্বই নেই। আসলে সব শিশুর পৃথিবীতে প্রথম স্থান মায়ের কোল হয় না, কারো কারো জন্মের পর ডাস্টবিন, ময়লার ঝোপ, ট্রেনস্টেশন হয় আলো বাতাসের ঠিকানা। তাহলে মায়ের শরীরের ওম ছাড়াও শিশু বাচে, কিন্তু সে মানুষের মতন বাচে না আবার পশুর মতনও বাচে না। কারন পশুরাও নিজের সন্তানকে জন্মের পর ছেড়ে যায় না যতক্ষন পর্যন্ত না সে নিজের খাবার যোগার করা  শিখে। তারা বাচে  ঝড়া পাতার মতন। কেউ তা কুচি কুচি করে ছিড়ে ফেলে বা আগুনে পোড়ায়, কেউ হাতে তুলে নিয়ে তাতে কবিতা লিখে রাখে। তারা ঝড়া পাতা!

তৃতীয়ত, সেদিন প্রথমবারের মতন আবির বুঝেছিল সম্পর্ক রক্তের, বন্ধুত্বের, ভালোবাসার নয় শুধু। সম্পর্ক ক্ষনিকের জন্য হলেও নিখাত সত্য। বরঞ্চ দির্ঘ সম্পর্কগুলোই আধা সত্য আর ভাড়ি মিথ্যের। আর ক্ষনিকের এই অজ্ঞাতনামা শিশুটির সাথে আবিরের সম্পর্কটা মানবতার। 

ছেলেটি যখন হাটাচলা শুরু করে তারপর ছেলটিকে তার নিজ জায়গায় ছেড়ে আসে স্মাইল নারায়ণগঞ্জ শাখা। তাকে আমরা বিদায় দেইনি সেদিন।  সেটাকে আদৌ কি বিদায় বলে? তাকে ছেড়ে দিয়ে এসেছিলাম। আসলে বিদায় দেই তাদের যাদের ফিরে আসার পিছুটান থাকে। ওর পিছুটান নেই, যা তার সেই জন্মলগ্ন থেকেই নেই। হয়তো আজ সে রেললাইন এর টোকাই হয়ছে কোন অজানা সেইদিনের কারো ছেড়ে আসা বা ফেলে আসার কারনেই। 

হৃদি..............................নাজমুল জুবায়ের

হৃদি..............................নাজমুল জুবায়ের

- আব্বু মানুষ মরে গেলে কি হয়? 
- আকাশের তারা হয়ে যায়। 
- আব্বু আকাশের ঐ তারাটা সব চেয়ে উজ্জ্বল কেন? 
- ঐ টা সবচেয়ে ভালো মানুষের তারা মা-মণি। 
- আচ্ছা আব্বু ঐ তারাটার নাম কি? 
- হৃদি । 
- উনি কি খুব ভালো ছিলেন ,তাই না আব্বু? 
- হ্যা মামণি। 
- আচ্ছা আব্বু আমার নাম হৃদি রাখলে কেন? 
- তুমি আমার রাজকন্যা তাই। 
- আচ্ছা আব্বু রাজকন্যার গল্পটা বল। 
- এক দেশে এক রাজকন্যা ছিল।রাজকন্যার নাম ছিল হৃদি।রাজ্যের অনেক আদরের রাজকন্যা ছিল হৃদি, সবাই অনেক ভালবাসত।আর রাজকন্যাও ছিল অনেক ভাল। একদিন এক রাক্ষস এসে রাজকন্যাকে তুলে নিয়ে যায়।তারপর রাজকন্যাকে মেরে ফেলে,আর তখন থেকে আকাশের সবচেয়ে বড় তারা হয়ে যায় হৃদি। 
- আমাকেও যদি রাক্ষস তুলে নিয়ে মেরে ফেলে? 
আবির সাহেব বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন উনার ৫ বছরের মেয়ে হৃদিকে তারপর আস্তে আস্তে বলেন 
- না রে মামণি। আমি একটা হৃদিকে হারিয়ে ফেলেছি আরেকটা হৃদিকে হারাতে দেব না। 
একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মাঝারি মানের একটা পোস্টে চাকরি করে আবির। স্ত্রী অবন্তী আর ৫ বছরের মেয়ে হৃদিকে নিয়ে তার সংসার। অফিস থেকে ফিরে রাতের খাবার খেয়ে আকাশের দিকে উদাস হয়ে চেয়ে থাকা ওর নিয়মিত কাজ। দূর থেকে দেখলে যে কেউ মনে করবে ও যেন আকাশের দিকে চেয়ে কারো অপেক্ষা করেছে। 
মা-বাবা যখন মারা যান তখন সে কলেজে পড়ে। ছোট বোন ছাড়া আর আপন বলতে কেউ ছিল না পৃথিবীতে।সপ্ন ছিল বুয়েটে পড়বে কিন্তু সংসার আর হৃদিকে দেখাশুনা করতে গিয়ে কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয় নি।বোনকে নিয়ে সব সপ্ন ছিল, বোনও নিরাশ করে নি।নিজে পড়তে পারে নি বলে যে আক্ষেপ ছিল হৃদি বুয়েটে সুযোগ পেয়ে সেই আক্ষেপ গুছিয়ে দিয়েছে।সব ঠিকমত চলছিল হৃদি ভর্তি হওয়ার ৬ মাস পর থেকে কেমন যেন বদলে গেল।ঠিকমত বাসায় যোগাযোগ করত না,বাসায় গেলে কেমন যেন ছটফট করত। আবির বোনের এমন আচরণে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল।খুজ নিয়ে জানতে পারল বড়লোক বাবার বখে যাওয়া ছেলে পলাশের সাথে প্রেম করছে হৃদি। সব শুনে আবির সিদ্ধান্ত নেয় হৃদির পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়ার।পরের সপ্তাহে হৃদি বাসায় আসার পর আবির ওর পড়া বন্ধ করে দেয়ার কথা বলে সেই সাথে বলে দেয় হৃদি যেন বাসার বাইরে না যায় । হৃদির অনেক কান্নার পরও আবির তার সিদ্ধান্ত বদল করে না। একদিন সবার অজান্তে হৃদি পলাশের হাত ধরে বাসা থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। এরপরের ৬ মাস ছিল হৃদির জন্যে অনেক কষ্টের। একদিকে মা-বাবার আদর দেয়া ভাই আর অন্যদিকে তার ভালবাসা।সে চেয়েছিল পলাশকে অন্ধকার জগত থেকে ফিরিয়ে এনে তার ভাইয়ের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে।পলাশের উন্নতি দেখে নিশ্চয় তার ভাই তাকে ফিরিয়ে দিবে না। ৬ মাস পর পলাশকে ঠিকই আলোর রাস্তায় ফিরিয়ে এনেছিল,পলাশ নিজ যোগ্যতায় ভাল একটা চাকরী পায়। হৃদি মনে করে এখনই তার ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার উপযুক্ত সময়।কিন্তু ওর ভাগ্যটাই খারাপ। দুইবার ভাইয়ের বাসায় যায় কিন্তু গেটের বাইরে থেকে ফিরে আসতে হয় হৃদিকে।অনেক কান্নাকাটির পরও কেউ গেট খুলে নি।এরপরের সপ্তাহে চট্টগ্রাম বেড়াতে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রান হারায় হৃদি ও পলাশ। বোনের লাশ পর্যন্ত দেখতে যায় নি অভিমানী আবির। একসময় নিজের দাম্ভিকতার জন্যে নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হয় আবিরের।বোনের স্মৃতি মনে রাখার জন্যে নিজের মেয়ের নাম রাখে হৃদি। এরপর থেকে প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পর আকাশের দিকে থাকিয়ে থাকে আবির শুনতে পায়, দূর আকাশ থেকে কে যেন খুব করুন সুরে বলছে " প্লিজ, ভাইয়া আমাকে ক্ষমা করে দে,ভাইয়া আমি তোকে অনেক ভালবাসি" 
আজও আবিরের চোখ বেয়ে পড়ছে পৃথিবী হারানোর সেই অশ্রু

গুপ্তধন................................রাকিব সামছ শুভ্র (সেরা গল্প)

গুপ্তধন................................রাকিব সামছ শুভ্র (সেরা গল্প)

হু কাঙ্ক্ষিত আম্মার ট্রাংকটা আজ খোলা হবে। আমরা চার ভাইবোন আম্মার ঘরে জড়ো হয়েছি। সবাই ভীষণ উত্তেজিত এবং অস্থির বোধ করছি। একান্ন বছরের পুরনো ট্রাংক তবে তালাটা এতো পুরনো না। তালার বয়স বড়জোড় বছর চারেক হবে। ছোটদা লুকিয়ে তালা ভাঙতে গিয়ে আগের তালাটা নষ্ট করে ফেলেছে। কিন্তু ট্রাংক খোলার আগেই ধরা পড়ে গিয়েছিলো। তখন নতুন তালা লাগানো হয়।

আমরা চার ভাইবোন। আমি সবার ছোট। বড়দা তারপর আপা এরপর ছোটদা। বড়দা বেশ গোবেচারা টাইপের। মাস্টার্স করে আমাদের শহরেই একটা কলেজে পড়াচ্ছেন। সবাই প্রফেসর আজিম নামেই ডাকে তাকে। বড়দা দুই মেয়ের বাবা, রুনু ভাবি স্কুলে পড়ান। আলো আপা ভয়ঙ্কর সুন্দরী একেবারে আম্মার ডুপ্লিকেট। মাঝে মাঝে ভাবি আপা কী ডাবল পার্ট করছেন নাকি? দুলাভাই ব্যবসায়ী,পয়সাওয়ালা বাড়ি গাড়ির অভাব নাই। আপারা এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে থাকেন কুমিল্লায়। ছোটদাও ব্যবসা করে কিন্তু কেন যেন খুব একটা ভালো করতে পারে না। দু-দিন লাভ করলে পাঁচ দিন লস করে। ঝুমু ভাবি ডাক্তার তাই ছোটদার উঠানামায় ভারসাম্য ধরে রাখেন। ছোটদাদের এক মেয়ে।

আর আমি? আমার নাম আঁখি। স্বামী হাসিব আর্মিতে মেজর। হাসিবের পোস্টিংয়ের জন্য আমার নির্দিষ্ট কোন শহরে থাকা হয়না। কখনো খাগড়াছড়ি আবার কখনো সিলেট এখন অবশ্য কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে আছি। হয়তো বছর খানেক এখানে থাকবো তারপর আবার তল্পিতল্পা গুটিয়ে নতুন জায়গায়। আমাদের একটাই ছেলে নাম রুদ্র।

আমাদের দাদাবাড়ী মাদারীপুর হলেও আব্বা তার চাকুরী জীবনের প্রায় পুরোটাই কাটিয়েছেন চাঁদপুরে। ডিসি অফিসে হেডক্লার্ক ছিলেন। আম্মা চাঁদপুরেরই মেয়ে তবে বড় হয়েছেন চট্রগ্রামে। ১৯৬৯ সালে আম্মা আব্বার বিয়ে হয়। আব্বা মারা গিয়েছেন প্রায় এগারো বছর। আম্মা আমাদের ছেড়ে গেছেন মাত্র একচল্লিশ দিন আগে। আম্মার চল্লিশা আয়োজন করতেই আমরা সবাই চাঁদপুরে এসেছি।

আব্বা আম্মার বিয়েটাও হয়েছিলো অদ্ভুত ভাবে। নানাজান কোন এক কাজে ডিসি অফিস (তখন অবশ্য সাব ডিভিশনাল অফিস ছিলো) এসেছিলেন। আব্বার ব্যবহার আর চেহারা দেখে সরাসরি নিজের মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেন। নানাজান অবশ্য বলেছিলেন তার মেয়ে শিক্ষিত, ভদ্র, সংসারী তবে গায়ের রঙ বেশ চাঁপা। আব্বা আম্মাকে না দেখেই বিয়েতে রাজি হয়ে যান। বিয়ের রাতে বাসর ঘরে আম্মাকে প্রথম দেখে আব্বা নাকি ভুত দেখেছেন। ভয়ংকর রূপবতী একজন মানুষ তার বিছানায় বসা! তার চিৎকারে বাসার সবাই বন্ধ দরজার সামনে হাজির। আব্বা দরজা খুলে দাদীকে নাকি বলেছিলেন, ওই বাড়ির লোকেরা ভুল করে অন্য মেয়ে দিয়ে গেছে! এক যাচ্ছেতাই অবস্থা। গভীর রাতে নানাজানকে খবর দেয়া হয়। লোকজন সমেত উনি আমাদের বাড়িতে আসেন। সব বুঝিয়ে বলার পর আব্বা ঠান্ডা হন। নানাজান আব্বাকে পরীক্ষা করার জন্য মেয়ে কালো বলেছিলেন। আসলে আম্মার গায়ের রঙ ছিলো দুধে আলতা। 

আব্বার বেতন খুব বেশী ছিলোনা কিন্তু সবসময়ই চাইতেন আম্মা সেজেগুজে পরিপাটি থাকুক। আম্মাও নিজের মতো করে সংসারটা গুছিয়ে নিয়েছিলেন। আব্বার কেনা শহরের এক কোনে বাস স্ট্যান্ডের পাশে পাঁচ শতাংশের জমিটায় তিনরুমের বাসা আব্বা আম্মার সারাজীবনের সঞ্চয়ে গড়ে উঠা ভালোবাসার প্রাসাদ। 

বিয়ের কদিন পরেই আব্বা আম্মাকে একটা কালো রঙের ট্রাংক কিনে দিলেন। আম্মা সযতনে তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলো ওই ট্রাংকে রেখে দিতেন। আম্মা কখনো আমাদের সামনে ট্রাংক খুলতেন না। ঘরের দরজা বন্ধ করে ট্রাংক খুলতেন আবার তালা লাগিয়ে চাবি সড়িয়ে রাখতেন। ছোটবেলায় বহুবার জিজ্ঞেস করেছি, আম্মা ট্রাংকে কি আছে একবার দেখাবে? কখনোই দেখাতে রাজি হয়নি৷ খুব চাপাচাপি করলে বলতো, গুপ্তধন, মহামূল্যবান  জিনিস এর মধ্যে রাখা আছে। আমার সারা জীবনের সবচেয়ে দামী সঞ্চয় এর মধ্যে রক্ষিত আছে। 

আমাদের চার ভাইবোনের কেমন যেন একটা আকর্ষন অথবা লোভও বলা যায় ছিলো ট্রাংকটার উপরে। আব্বাও আম্মাকে বলতেন, তোমার এই যক্ষের ধন তুমি না থাকলে সামলাবে কে? 

আম্মা কোন উত্তর দিতোনা। অদ্ভুত একটা হাসি দিতো আর আমাদের গা জ্বলতো। আম্মা গহনা তেমন পরতোনা তাই আমাদের সবার ধারণা, ট্রাংকে নিশ্চয়ই আম্মা সব গহনা রেখে দিয়েছে। আরো না জানি কতো কিছু আছে?

আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে যাবার পর আম্মার ট্রাংকের প্রতি দরদ আর যত্ন আরো বেড়ে গিয়েছিলো। দরজা আটকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রাংক নিয়ে বসে থাকতো। আমরা এমনকি নাতিনাতনিরাও ওই সময় ঘরে ঢুকতে পারতাম না। এতে আমাদের ধারণা আরো বদ্ধমূল হলো, ট্রাংকে অমূল্য ধনরত্ন আছে। শুনেছিলাম নানাজান আম্মাকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর অনেক দামী উপহার দিয়েছিলেন। সেসবও মনে হয় ওই ট্রাংকেই রাখা। 

চার বছর আগে ছোটদার ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ যাচ্ছিলো। একদিন আম্মা পাশের বাসায় গিয়েছে এমন সময় ছোটদা আম্মার ঘরে খাটের নীচ থেকে ট্রাংক বের করে তালা ভাঙার চেষ্টা করছিলো। ঠিক ওই সময় ভাবি চলে আসায় আর ভাঙতে পারেনি। আম্মা বাসায় এসে খুব কেঁদেছিলো। ছোটদাও খুব লজ্জা পেয়েছিলো। আম্মার পা ধরে কান্নাকাটি করায় ক্ষমা পেয়েছিলো সাথে আম্মার কোলে আশ্রয়। ছোটদা ছোটকাল থেকেই একটু ডানপিটে ধরনের। একমাত্র আম্মা ছিলো ওর শেষ আশ্রয়স্থল। যত ঘটনাই ঘটাক আম্মার কোলে ঠিকই জায়গা করে নিতো। মানুষ হিসেবে কিন্তু ছোটদা অসম্ভব দিলখোলা। খরচের হাতও বেশ বড়। ধুমধাম খরচ করতে ওর চেয়ে পারঙ্গম কেউ নেই।

আব্বা মারা যাবার কিছুদিন আগেই তার রেখে যাওয়া বাড়ি এবং জমি চার ভাইবোনের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে দিয়ে গেছেন। এতে অবশ্য কারো কোন আপত্তি ছিলো না। কিন্তু সবারই চোখ রয়ে গেছে আম্মার ট্রাংকের জিনিসের দিকেই। আম্মা মারা যাবার আগের রাতে বড়দাকে ডেকে বললো, বাবা আমি চলে গেলে তোমরা ট্রাংকটা খুলে তোমাদের যার যা পছন্দ নিয়ে নিও। ট্রাংকটা ফেলে দিওনা, ঘরের এক কোনে কোথাও ফেলে রেখো। আমার খুব প্রিয় এবং ভালোলাগার সম্পদ। 

আম্মা হুট করেই চলে গেলেন। আমরা কেমন হঠাৎ করেই এক বিশাল শূন্যতায় আবদ্ধ হলাম। আমাদের সব কিছু আছে আবার কিছুই নেই। অদ্ভুত একটা বিষয় হলো, যেই ট্রাংকের ভেতরের জিনিসের জন্য আমরা বুভুক্ষু ছিলাম, আম্মা চলে যাওয়ার পর সেই ট্রাংক খোলবার কথা কারো মনেও আসলো না। আমরা চার ভাইবোন কান্না পেলেই ট্রাংকটা ছুঁয়ে আম্মার ছোঁয়া নিতে চাই। 

যে যার মতো নিজেদের শহরে চলে গিয়েছিলাম। আম্মার চল্লিশা আয়োজন করতে বাড়ির সবাই আবার চাঁদপুরে এসেছি। খাওয়াদাওয়ার পরে সবাই আম্মার ঘরে বসে কথা বলছি। এমন সময় হাসিব কথাটা পারলো। আম্মাতো অনুমতি দিয়েছেন তার ট্রাংক খুলতে, আমরা খুলে দেখতে পারি না? কেউই আগ্রহ প্রকাশ করলো না। অথচ এর ভিতরে কী আছে তা নিয়ে গত চল্লিশ বছরের অপেক্ষা আজ কেমন হালকা হয়ে গেছে। তারপরও সবাই একমত হলাম, খুলে অন্তত দেখি!

পরদিন নাস্তারপর সবাই আম্মার ঘরে জড়ো হয়েছি। বড়দা খাটের নীচ থেকে ট্রাংক বের করলো। চাবি হাতে নিয়ে তালায় ঢোকানোর সময় হাত কাঁপছে। আমরা ভিতরে অস্থিরতা বাহিরে প্রকাশ করছিনা। ট্রাংকের ঢাকনা খুলতেই দেখতে পেলাম ছোট ছোট কাগজের অনেকগুলো প্যাকেট। বড়দা প্রথম প্যাকেট নিয়ে তা খুলতেই যা বের হলো তার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না।

একটা বহু পুরনো আলতার শিশি। আলতা নেই শুধু লালচে দাগ রয়ে গেছে শিশিতে। সাথে ছোট্ট একটা কাগজে লেখা ওর দেয়া প্রথম উপহার। একান্ন বছর আগের একটা তারিখ।
আরেকটা প্যাকেট খুলতেই বের হলো একটা টিপের পাতা যাতে একটাই টিপ অবশিষ্ট রয়েছে। বিয়ের তারিখ লেখা সাথের কাগজে।
পরের প্যাকেটে পাওয়া গেলো একটা মেরুন রঙের পার্কার কলম। কাগজে লেখা বাবার দেয়া সবচেয়ে দামী উপহার। ম্যাট্রিকুলেশনে ভালো ফলাফলের পরে পাওয়া।
বের হলো বড়দার প্রথম জুতো জোড়া, আপার প্রথম জামা, ছোটদার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মার্বেল (বাবার হাতে কতো মার খেয়েছে এই মার্বেল খেলার জন্য), আমার কাঁচের ফিডার, বাবার বিয়ের রুমাল, দাদার টুপি, নানিজানের পানের বাটা, আমাদের চার ভাইবোনের প্রথম পরে যাওয়া দাঁত। আরো অনেক কিছুই বের হলো ট্রাংক থেকে।

আরেকটা জিনিস পাওয়া গেলো, যা আমাদের সবচাইতে বেশী অবাক করেছে, একটা মলাট বদ্ধ খাতা। সেটা ছিলো আম্মার লেখা একটা কবিতার খাতা! আমাদের অতি চেনা আম্মার নতুন আরেকটা দিক আমাদের সামনে উন্মোচিত হলো।

আম্মার এতো প্রিয়রা এই ছোট্ট ট্রাংকে এতোদিন চাপাচাপি করেছিলো! ঐ মূহুর্তে আম্মার রেখে যাওয়া গুপ্তধনেরা আমাদের চার ভাইবোনকে অদ্ভুত ভালোবাসায় জড়িয়ে নিলো। হঠাৎ করেই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী সম্পদের মালিক হয়ে গেলাম আমরা।

রংমহল..............................আশিকুর রহমান বিশ্বাস

রংমহল..............................আশিকুর রহমান বিশ্বাস
কটু পর রাত নামে। জহির ভাবে, সে হয়তো কাউকে খুঁজে পাবে, কিন্তু নিকটবর্তী কাউকে দেখতে পায় না সে। সন্ধ্যা রাতে শহরাঞ্চলে কোলাহল থাকে। মানুষ অবসর নিয়ে খুচরা আলাপে লিপ্ত হয়, চায়ের কাপে টুংটাং আওয়াজ দেয়, হকারদের দৌড়ঝাঁপ লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু এখানে সে- সবের কিছুই নেই। যদিও প্রত্যন্ত গ্রামদেশে কোলাহল খোঁজাটা বড় অবান্তর। তবে সে শুনেছিল, এখন গ্রাম আগের মতো একেবারে অবহেলিত নয়, মানুষ শিক্ষিত হয়ে গেছে, রাস্তাঘাট উন্নত, শিল্পায়নের প্রভাবে তাদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে, হতদরিদ্র মানুষ আজকাল আর চোখে পড়ে না বললেই চলে, তারাও গভীর রাত অবধি দোকানপাটে পড়ে থাকে, বলা যায় গ্রাম এবং শহরের পার্থক্যটা কমে এসেছে। জহিরের চশমা ঢাকা চোখে সে চিত্র এখনও পড়েনি। সে সন্তর্পণে একটা বাঁশ ঝোপের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যায়। বস্তুত এটাই যাবার রাস্তা। জহির শব্দ করে না, কিন্তু কেনো জানি বাঁশ ঝোপে লুকিয়ে থাকা পাখিরা বুঝে ফেলে তাকে এবং গলা ছেড়ে বাকিদের জানান দেয়, তারপর জোটবদ্ধ চিৎকারে লিপ্ত হয় তারা।

আকস্মিক সেই চিৎকারে জহিরের গা টা ছমছম করে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণে আবার ভালো লাগে তার, এবং ভাবে, আহারে যদি আরেকবার অমন ডাকতো ওরা! কিন্তু পাখিরা আর চিৎকার করে না। জহির অপেক্ষা করে তবু, দপদপ শব্দ করে পা ফেলে, কিন্তু পাখিরা নিশ্চুপই। এবার সে হাঁটা শুরু করে; ঘোলাটে অন্ধকারে পচা কাদায় তার পা খপ করে আটকে যায়। কাঁধের ব্যাগটা সামলাতে ঢের কষ্ট হয় তার। তারপর সে পায়ের জুতা জোড়া খুলে হাতে নেয় এবং পুনরায় হাঁটতে থাকে। কয়েক পা হেঁটে গেলে জহিরের ডান পায়ের তলে পিচ্ছল অনুভূতি হয়। ঠিকমত বুঝতে পারে না সে, অতএব তাকে অনুমান করে নিতে হয়; তখন সে অস্ফুটে মুখে বলে, পাখির পায়খানা হবে বোধহয়। ঐ সময় কোনো এক কারণে যেন একটু ঘেন্না লাগে তার কিন্তু আশপাশে বাড়িঘর কিংবা পরিষ্কার পানির সন্ধান এখুনি মিলবে না এমন সান্ত্বনায় তাকে মানিয়ে নিতে হয়। একটা লাল শেয়াল তাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়, জহির হিস্ হিস্ শব্দ করে তাকে তাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করে। শেয়ালটি তার দিকেই তেড়ে আসতে থাকে, জহির ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে এবং তাকে চলে যাবার রাস্তা করে দিতে একটু পার্শ্বে সরে গিয়ে নীরবে দাঁড়ায়। কেননা এই জাতীয় আক্রমণাত্মক প্রাণীগুলো দল বেঁধে খাবারের সন্ধানে রাতে ঘুরতে থাকে। জহির অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে আশপাশ তাকিয়ে দেখে এবং স্বস্তি পায় এই আশায় যে নিকটবর্তী এই শেয়ালটি ছাড়া একটা ইঁদুরও দেখে না সে। শেয়ালটি তার কোল ঘেঁষে অত্যন্ত ভদ্রভাবে হেলেদুলে গন্তব্যে চলে যায়। জহিরের গা থেকে ঘাম ছাড়ে। 

এবার পূর্বের ন্যায় আপেক্ষিক আরো অনুন্নত একটা রাস্তায় পৌঁছে যায় সে। জহির অবাক হয় এবং আক্ষেপও হয়, অতঃপর অস্ফুটে বলে, এই রাস্তায় মানুষ চলে! কিন্তু তারপর সে আরো কঠিন বাস্তবতায় পৌঁছে যায় এবং ডিপটয়েলের আলো এসে রাস্তায় পড়ে তখন, অতঃপর সেই আলোয় সে অস্পষ্ট দেখে রাস্তার অসংখ্য জায়গায় গোবর পড়ে আছে। থিতিয়ে আছে গোবর কাদামাটির সাথে। এখন এই গোবর ডিঙিয়ে তাকে যে গ্রামের ভিতর যেতে হবে এটা পুরোপুরি নিশ্চিত। তখন তার মনে হয় এই গ্রামের মানুষ খুব পরিশ্রমী হবে নিশ্চয়। তারা গরু পোষে, ক্ষেতখামারে কাজ করে, বস্তুত অত্যন্ত সহজসরল জীবনযাপন তাদের। সেই সাথে একটু তৃপ্তিও হয় বটে, কেননা যতদিন সে এখানে থাকবে নিশ্চয়ই টাটকা সবজি, গাভীর দুধ, অন্ততপক্ষে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে এই ভাবনায়। শহরে হাশেম নামে যে লোকটি তাকে রোজ সকালে দুধের জোগান দিতো, সে দুধ মোটেও খাঁটি নয়। তবুও লোকটি কী অবলীলায় একশত একটা মিথ্যা একজায়গায় করে আত্মশুনানি করে চলতো। সে ইঙ্গিত করতো, তার সেই দুধের মতো নির্ভেজাল সুস্বাদু দুধ অত্রাঞ্চলে নেই, তার গরু শুধুই কাঁচাঘাস-খড়-খৈল-ভুষি এবং পরিষ্কার পানি ব্যতীত আর কিছুই খায় না, এমনকি আধুনিক খাদ্যখাবার মোটাতাজাকরণ ঔষধ পর্যন্ত সে কখনওই গরুকে দেয়নি, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সে যাই বলে না কেনো দুধ জ্বাল দেবার পর জহির মুখে নিয়ে দেখতো তা কেমন যেন বিস্বাদ, টকটক, বস্তুত অখাদ্য বলা চলে। এখন তার মন বলে ঐ কাজটি এখানে নিশ্চয় হবে না। তারপর কিছুক্ষণ হেঁটে গেলে একটা বাড়ি দেখতে পায় জহির। খোলামেলা ঐ বাড়িতেই একটা নীল রঙ করা টিউবওয়েল তাকে অভ্যর্থনা জানাতে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হয় তার। জহির কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রেখে হাত পা ধুয়ে নেয়। ঐ সময় একজন স্ত্রীলোক তার কাছে এসে দাঁড়ায় এবং তার সম্পর্কেই বিস্তারিত জানতে চায়। জহির নিজের পরিচয় প্রায় একদমে বলে যায় এবং একটু থেমে তার এখানে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে চলে। স্ত্রীলোকটি এবার ভরসা পায় এবং অনুনয় করে তাকে ভিতরে যেতে বলে। জহির অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করে এবং হেসে বলে বেশি বিলম্ব হলে নিশ্চয় তার গন্তব্যস্থানের লোকেরা দুশ্চিন্তা করতে পারে। তখন স্ত্রীলোকটি তার গন্তব্যস্থান ও তাদের নামধাম জানতে ব্যগ্র হয়। জহির এবার ইতস্তত বোধ করে কেননা তার গন্তব্যস্থান এখনও ঠিক হয় নি, এবং তার ধারণা আজ রাতটা সে কোনোরকমভাবে মসজিদ কিংবা অন্য যে কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে ঘুমিয়ে কাটাতে পারবে। স্ত্রীলোকটি তার মনোভাব বুঝতে পারে এবং তার ছেলেদের বাইরে দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে ডাক দেয়, অতঃপর তাদেরকে বলে তাদেরই এই বাড়িতে সে যেন আজকের রাতটা আতিথেয়তা গ্রহণ করে। কিন্তু জহির দ্বিতীয় বারের মতো তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করে এবং তখন তাদের এক ভাই এখানে থাকার পক্ষে অনেকগুলো যুক্তি দাঁড় করিয়ে দেয়। জহির এ পর্যায়ে এসে সম্মতি না দিয়ে পারে না, এবং পরবর্তীতে সে ভিতরে গিয়ে বসে। তাদের আন্তরিকতায় সে সত্যিই মুগ্ধ হয়ে যায়, এই মানুষগুলো এত সহজসরল কেনো? এই জাতীয় প্রশ্ন মাথায় আসে তার। তারপর সে একটা ব্যথার অনুভব করে। কাদাভরা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে তার পায়ে মুহূর্তে ব্যথা করতে থাকে এবং সে পায়ের পাতা মাটিতে রাখতে ব্যর্থ হয়। অতঃপর জহির বিছানায় নিরুপায় হয়ে শুয়ে থাকে এবং কীসব যেন চিন্তা করতে করতে তার ঘুম ঘুম ভাব চলে আসে। 

তখন জহির প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিল। তার সরু লম্বা নাকটা অত্যন্ত স্বেচ্ছাচারিতার মতো ভারী গর্জন করছে এমনটা একবার মনে হয়েছিল তার, কেননা, নিশ্বাস ভারী বোঝাচ্ছিল। এমতাবস্থায় একটা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর সে শুনতে পায়। আপনি কি সজাগ আছেন? -এই সাদৃশ্য কণ্ঠ তার কানে এসে লাগে। জহির ধসমস করে উঠে বসে, একটু স্বাভাবিক হয়, অবশেষে দরজার কপাট খুলে দেয়। এবং আচমকা তখন সে অনুভব করে তার পায়ে আর অতটা ব্যথা নেই। যে লোকটির ডাকে সে ঘুম থেকে জাগে, এ পর্যায়ে সেও আবিষ্কার হয় এবং জহির দেখে, সে আসলে নতুন কেউ নয় বরং ঐ যুক্তিবাদী লোকটিই- যার কথামত সে এখানে রয়ে গেছে। জহির- আসুন ভিতরে আসুন, বসুন- নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে বলে। লোকটি তার পাশে চুপটি বসে থাকে কিছুসময়। এরপর সে আচমকা উৎকণ্ঠিত গলায় ইঙ্গিত করে যে, অদূরে কোথাও গানের আসর বসেছে, এখন সে যদি আগ্রহী হয় তবে তাকে নিয়ে যেতে পারে। জহির বিস্তারিত জানতে চায়,অতঃপর লোকটি ভেঙে বলে। লোকটির বর্ণনা থেকে জহির যা বুঝতে পারে তা এমন: এই অঞ্চলে এখনও লোকসংগীত টিকে আছে এবং প্রায়শ রাতে আসর জমে। মধ্যরাত অবধি সেই আসর চলে এবং সকলে তা খুব মুগ্ধ হয়ে শ্রবণ করে। তখন হঠাৎই তার মনে হয় যে, একটু সচেতন হলে নিশ্চয়ই আমরা আরো কিছু লালন, হাছন, শাহ্ আব্দুল করিম খুঁজে পেতাম। এরপর জহির মৌন সম্মতি দেয় এবং যেহেতু সে শুধু লুঙ্গি পরেই শুয়েছিলো সুতরাং তাকে এবার পূর্বের পোশাকে ফিরতে হয়। অতঃপর একটা প্রাথমিক গোছগাছের পর তারা দু'জনে বেরিয়ে পড়ে। 

গানের আসর শেষ হলে জহির ফিরে এসে কখন যে আবার শুয়েছিল তা আর মনে করতে পারে না সে। বস্তুত সকাল হয়ে যায় কিন্তু সে আশপাশ তাকিয়ে কাউকে খুঁজে পায় না। এমনকি যার সাথে প্রায় মধ্যরাত অবধি গানের আসর জমিয়েছিলো, তাকেও সে খুঁজে পায় না। জহির হাঁটতে বের হয় কেননা তার মন বলে নিশ্চয় হাঁটতে বেরুলে পথিমধ্যে কাউকে না কাউকে খুঁজে পাবে এবং সেখান থেকে এই নাটকীয়তার বিস্তারিত জেনে নিবে সে। গ্রামের একাংশ ঘুরে শেষ করে জহির, এবং কয়েকজন লোক তাকে এমনি ইঙ্গিত দেয় যে, আজ এনজিও থেকে তাগাদা দিতে পারে যেহেতু তারা বেশ কিছু টাকা নিয়েছিলো সেখান থেকে, এবং সাধারণত তারা খুব কড়া ভাবেই তাগাদা দিয়ে থাকে, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে, অবশেষে ঘরের বাসনকোসন পর্যন্ত ছিনিয়ে নিতে দ্বিধাবোধ করে না। এবার সে বুঝতে পারে যে, নিশ্চয় কিস্তির টাকা আজ বন্দোবস্ত হয় নি তাদের, কেননা কয়েকদিন ভারী বর্ষণে কর্মশূন্য তারা -এমনটা বোঝাও যাচ্ছিল রাতে, অতএব সাময়িক ভিটেমাটি ছাড়তে হয়েছে ঝামেলা এড়াতে। কিন্তু জহিরকে না বলে তারা চলে গেলো কেনো? তাকে তো তারা বুঝিয়ে বলতেও পারতো। সে তো দুধের শিশু নয় যে বললে বুঝবে না। ফিরে এসে নিশ্চুপ বসে থাকে সে এবং ভাবে। পালিয়ে তারা কতদিনই বা বাঁচতে পারবে? পরক্ষণে আবার তার মনে হয়, এটাকে আদৌ পালানো বলা ঠিক নয়, কেননা তারা ফিরবে এবং টাকার বন্দোবস্ত করেই ফিরবে। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও তারা যে তাকে আপ্যায়ন করলো, আশ্রয় দিলো, এমনকি একটু বুঝতেও দিলো না - এতে করে সে এই রংমহলে নিজেকে একজন অপদার্থই মনে করলো। কেননা গানের আসরে যাবার পথে লোকটির সাথে নানান কথোপকথন হয়েছিলো রাতে, লোকটি তাদের অসহায়ত্বের ছাপ রেখে যাচ্ছিল প্রতিটি কথায়, অথচ জহির তা আমলেই নেয় নি। একে ঠিক অপদার্থই বলা চলে। ভীষণ স্বার্থপরতা। অনেকক্ষণ বসে থাকতে থাকতে একসময় ঘুম আসে জহিরের। এই অসময়ে কিছুসময় ঘুমায়ও সে, কিন্তু সেই ঘুম ভাঙে আকস্মিক অপরিচিত একটি কণ্ঠস্বরে। অতঃপর সে ঘুমঘুম আবছা চোখে তার দিকে তাকায় এবং দেখে ভদ্র পোশাকে একজন লোক তার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে। আপাতদৃষ্টিতে ভদ্র মনে হলেও সে কিন্তু অতটা ভদ্র নয়, তা বোঝায় যাচ্ছে। জহির তার সম্পর্কে বিনীত জানতে চায়, তখন ভদ্রলোকটি খুলে বলে। কিন্তু সে মহা ঝামেলার ভিতরে পড়ে অতি শীঘ্র। কেননা, ভদ্রলোকটি তার থেকে কিছু শুনতে না চেয়েই বরং পাওনা টাকার দাবি করে বসে। জহির আচমকা হকচকিত হয়। সে কিছু বলতে চায় অথচ লোকটি বড় বাচাল প্রকৃতির হওয়ায় জহির তা পেরে ওঠে না। এক পর্যায়ে দু'জনার ভিতর কথা কাটাকাটি হতে থাকে। উচ্চস্বরে কথোপকথনের একপর্যায় জহির বলে ফেলে সে কেবলই একজন আগন্তুক বই কিছু নয়, এমনকি গতকাল রাতের ঘটনাটাও কখনও স্পষ্ট, কখনওবা অস্পষ্ট করে বলে ফেলে সে, কিন্তু লোকটি তার কথা বিশ্বাসই করতে পারে না। দুজনার মধ্যকার এই বাকবিতণ্ডা থেকে একসময় হাতাহাতি শুরু হয়। দেখতে লোকটি ভদ্রবেশী হলেও গায়ে শক্তি ছিলো বেশ কাজেই জহির তার সাথে আর পেরে ওঠে না। প্রচণ্ড একটা আঘাত আচমকা জহিরের মাথায় এসে লাগে এবং সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তারপর সে আবছা দেখতে শুরু করে। এই রংমহল যার রং আজ সকাল অবধিও ছিলো উজ্জ্বল তা এখন ফিকে মনে হয় তার। তারপর জহির ক্রমশ জ্ঞান হারাবার পথেই এগিয়ে যায়।