Showing posts with label শাহানা জাবীন সিমি. Show all posts
Showing posts with label শাহানা জাবীন সিমি. Show all posts

আনন্দ বৃদ্ধাশ্রম...................শাহানা জাবীন সিমি

আনন্দ বৃদ্ধাশ্রম...................শাহানা জাবীন সিমি
২০৫০ সাল, জানুয়ারী মাস। শীতের এক দুপুরে শামসুর রাহমানের লেখা কবিতা পড়েছিলেন শায়লা বারী।
'যেদিন মরবো আমি, সেদিন কি বার হবে বলা মুশকিল।
শুক্রবার? বুধবার? শনিবার? নাকি রবিবার?
যে বারই হোক,
সেদিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর,
যেন ঘিনঘিনে কাদা না জমে গলির মোড়ে।
সেদিন ভাসলে পথঘাট,
পূন্যবান শবানুগামীরা বড়ো বিরক্ত হবেন।'

এই পর্যন্ত পড়ে বইটি বন্ধ করে রাখলেন তিনি। কি অসাধারণ অভিব্যক্তি কবির! কত চিন্তা শবানুগামীদের জন্য। সত্যিই তো আমার মৃত্যুর দিনই বা কি বার হবে? কাঠফাটা রোদে তপ্ত হবে এই শহর নাকি শীতের হাওয়ায় ঝড়া পাতার মড়মড়ে আওয়াজে ঢেকে যাবে আমাকে বহন করে নিয়ে যাওয়া শবানুগামীদের চাপা কান্না....কে আর কাঁদতে আসবে? বছর তিনেক হলো বারী সাহেব মারা যাবার পর নিজের ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়ে অনেকটা নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে আর নিরাপত্তার কথা ভেবে এই বৃদ্ধাশ্রমে এসে উঠেছেন সত্তর বছরের শায়লা বারী। স্কুল টিচার ছিলেন। অসংখ্য ছাত্র এই হাতে পার করেছেন। এদের মধ্যেই সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কিছু ছাত্রছাত্রী সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে তার মতো বৃদ্ধ মাতাপিতাদের জন্য ঢাকার পূর্বাচলে এই বৃদ্ধাশ্রমটি তৈরী করেছে। এর উদ্দোক্তরা অবশ্য একে বৃদ্ধাশ্রম বলতে নারাজ। সার্ভিস এপার্টমেন্টের আদলে তৈরি এর নাম 'আনন্দ আশ্রম'। আসলেই তাই....সারাদিন যেন হাসি আনন্দে কেটে যায় এই আনন্দ আশ্রমের মানুষগুলোর। এখানে থাকতে হলে দুটো শর্ত অবশ্য পূরণ করতে হয়। এক; বয়স হতে হবে ৬৫র উপরে কারণ ৬৫বছর পর্যন্ত এখন মধ্যবয়স্ক তরুণ হিসেবে গণনা করা হয়। দুই; নিঃসন্তান বা অবিবাহিত পুরুষ বা মহিলা অথবা এমন বাবা মা যাদের সন্তানরা সবাই বিদেশে অবস্থানরত।

এই যেমন একটি মাত্র পুত্র সন্তান শায়লা আর বারী সাহেবের। ছেলে আমেরিকায় চাকরি ও পরিবার নিয়ে সেটেল। বহুবার মাকে কাছে নিয়ে রাখতে চেয়েছে সে কিন্তু শায়লাই রাজি হননি। এমনি বছরে দুবছরে ছেলের কাছে ঘুরতে যাওয়া হয় কিন্তু এদেশের মাটি ছেড়ে একবারে সেখান যে থাকতে শান্তি পান না তিনি। পাঁচ বিঘা জমির উপর তৈরী এই আনন্দ আশ্রম। বারো তলা বিল্ডিং স্টুডিও এপার্টমেন্ট। ইচ্ছে করলে একা থাকা যায় সেক্ষেত্রে পেমেন্ট একটু বেশি আবার কেউ চাইলে শেয়ারও করতে পারে। কমপ্লেক্সের মধ্যে আছে জিম, সুইমিং পুল, লাইব্রেরি, মসজিদ, গেস্ট হাউস এবং ইমারজেন্সি মেডিকেল সার্ভিস দেয়ার জন্য একটা ছোট ক্লিনিক। আরো আছে একটি বড়মাঠ যেখানে প্রাতঃভ্রমণ ও সান্ধ্যভ্রমণের পাশাপাশি চলে নির্মল আড্ডা, গল্প ও খুনসুটি। বিল্ডিং এর ছাদে যে ছাদকৃষি আর সামনে পেছনের খালি জায়গায় যে আঙিনা কৃষি রয়েছে তাতে অনেকেই সকাল বিকাল মালির সাথে হাত লাগান। তাদের পরিচর্যার কারণে আনন্দ আশ্রমে সবজি অনেক সময় বাজার থেকে কিনতেই হয়না।

খাবারের ব্যাপারে খুবই কঠিন আনন্দ আশ্রমের ডাইটেসিয়ান। বয়সে তরুণী মেয়েটি একটা বড় হাসপাতালের পুষ্টিবিদ আবার পার্ট টাইম এই বুড়ো বুড়িদের দেখভাল না করলে নাকি তার ভালো লাগেনা। তার নির্দেশে মাসে দুবার রেডমিট আর বাকি দিন মেডিটেরেনিয়ান ডায়েটের আদলে তৈরি বাংলাদেশী ডায়েট। রুচি পরিবর্তনের জন্য মাসে একবার থাই,জাপানিজ,কোরিয়ান বা কন্টিনেন্টাল কুজিন। তারপরও তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে অনিয়ম যে চলে না তা নয়! যখন যার ইচ্ছা দেদারসে চলছে অনলাইন খাবারের অর্ডার আর ডেলিভারি। ১২তলার এই স্টুডিও এপার্টমেন্টে রয়েছে দুটি ডাইনিং হল। সাধারণত তিনবেলার খাওয়া দাওয়া সবাই একসাথে ডাইনিং হলে করে থাকে। তবে চাইলে রুমেও ডেলিভারি নিতে পারে। শ'খানেক বোর্ডার কে দেখা শোনা করার জন্য এখানে রয়েছে দশজন উদ্যম ও চৌকষ তরুণ তরুণীর একটি দল। যারা লনড্রী থেকে শুরু করে সব কাজ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা এমনকি সবাই ঔষধ ঠিকমতো খেলো কিনা সবকিছুর খবর রাখে। মাঝে মাঝে খাওয়া দাওয়ার পরে শুরু হয় জম্পেশ আড্ডা। এই যেমন আজকের বিষয় পূর্বাচল সিনেপ্লেক্সে ২০২০ এর করোনা মহামারী নিয়ে আবীর ফয়সালের 'করোনা ২০২০' নামের যে মুভিটা রিলিজ হয়েছে সেইটা নিয়ে। অসাধারণ নাকি স্টোরিলাইন আপ, সিনেমাটোগ্রাফী আর ডিরেক্শন। অনেকেই দেখতে যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু শায়লা কে ফিসফিস করে নাবিলা বললো... এই ফিল্ম দেখার মতো মানসিক শক্তি আমার আর এখন নেই। কি দুঃসহ দিনগুলি গেছে! সারা পৃথিবী জুড়ে ছিল মৃত্যুর মিছিল। এক ঝটকায় ধনী ও ক্ষমতাবানদের নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল গরীব আর ক্ষমতাহীনের কাতারে। তোমার হাতে টাকা আছে কিন্তু আইসিইউ র বেড খালি নাই। তোমার প্রাইভেট জেট প্লেন আছে বিদেশে গিয়ে চিকিত্সা নেয়ার ক্ষমতা আছে অথচ এয়ারপোর্ট বন্ধ। ২০২০ এর করোনায় বাবা মা দুজনকেই হারিয়েছিলেন নাবিলা।

আজ মর্নিং ওয়াকে রাইয়ান সাহেবকে খুব খুশি মনে হচ্ছে। তিন বছর পর কানাডা থেকে ওনার মেয়ে জুহি বাবার সাথে দেখা করতে এসেছে। উঠেছে আনন্দ আশ্রমের গেস্টহাউসে। সকালে অনেকের সাথে পরিচিত হয়ে ওর খুব ভালো লাগছে। কতগুলো অপরিচিত মানুষ শুধু দেশের শেকড়ের টানে, মাটির কাছাকাছি থাকবে বলে আজ একটা পরিবার; একথা ভাবলেই বারবার চোখ ভিজে আসছে জুহির। কিন্তু বাবাকে নিয়ে একটা সমস্যা অনুভব করছে সে। মনে হচ্ছে বাবা অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছে। এমন কি জুহির নামটাও মাঝে মাঝে মনে করতে পারছে না। কিছুটা ডিমেনশিয়া দেখা দিয়েছে। একটু উদগ্রীব হয় সে। বিদেশে তো এখন পার্কিনসন, এলজেইমার, ডিমেনশিয়া এগুলোর জন্য অনেক রিহ্যাব সেন্টার রয়েছে। এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আজ বিকেলে একজন নিউরোলজিস্ট এর সাথে এপয়েন্টমেন্ট করে জুহি।

এলজেইমার ডিজিস ডায়াগনসিস হয় জুহির বাবার। এটা এমন একটা রোগ যেখানে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজের ক্ষমতাও হ্রাস পায়। হঠাত্ করে কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না জুহি। যদিও বাবা কানাডার সিটিজেন তবুও কি তিনি দেশ ছাড়তে রাজি হবেন? এখানে বা কার ভরসায় রেখে যাবো আমি...এধরনের নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে জুহির মাথায়। সবকিছু শুনে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেন নিউরোলজিস্ট ডাঃ আশফাক জামিল।
--- কিছু মেডিসিন লিখে দিয়ে বলেন একদম চিন্তা করবেন না; আমাদের দেশেই এখন এলজেইমার পার্কিনসন রিহ্যাব সেন্টার গড়ে উঠেছে....একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিয়ে বলেন;
--- একবার হলেও প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে আসুন।
হোমে ফিরে পরের দিন জুহি শায়লা আর নাবিলার সাথে বাবার ব্যাপারটা শেয়ার করে ।
---আন্টি তোমরা কেউ কি আমার সাথে রিহ্যাব সেন্টার টা দেখতে যাবে? এক কথায় রাজি হয়ে যায় ওরা দুইজন।
পরের দিন একটা গাড়ী নিয়ে ওরা চলে যায় পূর্বাচল থেকে দুই ঘণ্টার পথ টাংগাইলের দেলদুয়ার। রাজধানী ঢাকা এখন ডিসেনট্রালাইজ হতে হতে গাজীপুর ছাড়িয়ে টাংগাইলের দিকে।

রিহ্যাব ক্লিনিকের এমডি র সাথে কথা হয় জুহিদের।
--- আসলে কি ম্যাডাম মানুষের লাইফ এক্সপেকটেন্সি বাড়াতে এই ধরনের ওল্ড এজ প্রবলেম গুলো বেশি ফিল হচ্ছে। যদিও বিদেশে মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব; কিন্তু এদেশে যেহেতু এটা সম্ভব না তাই অনেক শিল্পোদ্দক্তাই এখন দেশের বিশাল মানবসম্পদ কে কাজে লাগিয়ে এই সেবাখাত গুলোতে এগিয়ে আসছে। সত্যি অবাক হয় শায়লা একেবারে বিদেশের রিহ্যাব সেন্টারের মতো এদের কর্মযজ্ঞ। যেহেতু এধরনের অসুখে মানুষ শিশুর মতো হয়ে যায় তাই এদের খাওয়া দাওয়া, গোসল, ঘুম থেকে শুরু করে সব কাজেই অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন। যাদের পরিবার এই ধরনের সেবা দিতে অক্ষম তাদের জন্য এখানে সেবা দিয়ে যাচ্ছে একদল মানবদরদী অভিজ্ঞ স্টাফ। অবশ্য প্রতিষ্ঠানটির ফাইনান্সিং এর অর্ধেক অর্থ আসে রোগীদের কাছে থেকে। দুই একদিনের মধ্যেই আনন্দ আশ্রমের গভর্নিংবডির সাথে একটা এপয়েন্টমেন্ট করে জুহি। বাবার সমস্যাগুলো খুলে বলে তাদের। রিহ্যাব সেন্টারটার কথা শুনে তাদের কাজের ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখান ওনারা। অভয় দেন জুহি কে। কয়েকদিনের মধ্যে আনন্দ আশ্রম ওল্ডহোমের সাথে রিহ্যাব সেন্টারটির একটা সমঝোতা চুক্তিও হয়।

কালকে রাইয়ান সাহেব তাঁর ঠিকানা বদল করবেন। পূর্বাচলের আনন্দ আশ্রম থেকে টাংগাইলের এলজেইমার রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। ওনাকে সেখানে রেখে জুহি ফিরে যাবে কানাডায়। এই প্রথম আনন্দ আশ্রম থেকে কেউ এভাবে বিদায় নিচ্ছে। এই উপলক্ষে রাতে সবাই কে ডিনারে ইনভাইট করেছে জুহি। আজকে ওনার পরিবর্তন যেন স্পষ্টতই সবার চোখে পড়ছে। রাইয়ান সাহেব আবেগপ্রবণ হয়ে কখনো বা খুব আনন্দিত হচ্ছেন আবার কখনো বা কেঁদে ফেলছেন। খাওয়া দাওয়া ও আড্ডা শেষে যে যার মতো বিদায় নিল সেদিন।

ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে আছে পুরো আনন্দ আশ্রম। শুধু ঘুম নেই জুহির চোখে। সুইমিং পুলের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে একমনে ভাবছে সে। কত স্মৃতি...মা বাবা আর সে! একদিকে তার চাকরি, সংসার আরেক দিকে বাবা। সে কি একা ফিরে যাবে? নাকি বাবা কে নিয়ে ফিরবে? অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত বদল করে জুহি। ভোর হয়ে আসে আনন্দ আশ্রমের মসজিদ থেকে ভেসে আসে আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাউম। আজ বুধবার। রৌদ্রজ্বল এক শরতের বিকেলে মেয়ের হাত ধরে রাইয়ান সাহেব কানাডার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। আনন্দ আশ্রমের সব বোর্ডাররা অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বিদায় জানায় তাদের কিছুদিনের সঙ্গী একজন ওল্ডহোম মেট কে।


লেখক: এমবিবিএস চিকিৎসক
অধ্যাপক বায়োকেমিস্ট্রি
আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

নীলাদ্রি থেকে সাদাপাথর.......................শাহানা জাবীন সিমি

নীলাদ্রি থেকে সাদাপাথর.......................শাহানা জাবীন সিমি
আপনি কি পাহাড় পছন্দ করেন? ঝর্ণা? পাথুরে নদী? কিংবা ঘুরে দেখতে চান চা বাগান আর সোয়াম ফরেস্ট? তাহলে এক কথায় আপনার ভ্রমণ তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করে নিতে পারে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট। শ্রীমঙ্গল আগেই ঘোরা হয়েছে তাই দুদিনের ছুটিতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বর্ষার পরপরই চলে গেলাম সিলেট । উদ্দেশ্য ঘুরে দেখা টাংগুয়ার হাওড়, রাতারগুল আর সাদাপাথর।
কথায় বলে ভ্রমণের আনন্দ অনেকাংশে নির্ভর করে ভ্রমণসঙ্গীর ওপর। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হলো না। দীর্ঘদিনের বান্ধবী রিতু সাথে তার পতি ইমতিয়াজ ভাই, আমাদের তিনকন্যা যায়ীমা, লাবিবা আর আদিবা, ইমতিয়াজ ভাইয়ের এক বন্ধু ও বন্ধুপত্নী। আমার কন্যা যায়ীমার বাবার শেষ মুহূর্তে অফিসে একটা জরুরী মিটিং পড়ে যাওয়াতে এ যাত্রা উনি আমাদের সঙ্গী হতে পারলেন না। কি আর করা! একটু মন খারাপ নিয়ে পৌঁছে গেলাম গ্রীনলাইন পরিবহনের বাস টার্মিনালে।

বাসে উঠে বেশ নস্টালজিক হয়ে গেলাম। কারণ দীর্ঘদিন পর আবার ভ্রমণ করছি দোতলা বাসে। মনে পড়লো সেই ছোট বেলায় সত্তরের দশকে গুলিস্হান থেকে ডাবলডেকার বাসে চেপে দাদা দাদীর সাথে প্রায়ই মিরপুরে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়ানোর স্মৃতি। যাই হোক সন্ধ্যা হয়ে যাওয়াতে বাইরের দৃশ্য খুব একটা উপভোগ করা না গেলেও ছয় সাত ঘন্টার ঢাকা সিলেট জার্নি রিতুর সাথে বকবক করে কিভাবে ফুরিয়ে গেলো টেরই পেলাম না। মাঝখানে অবশ্য ডিনারটা সেরে নেয়া হয়েছিল একটা হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে...পরোটা, সবজি, চা আর রিতুর আনা শিককাবাব দিয়ে।

রাত বারোটা নাগাদ সিলেট শহরে পৌঁছে ইমতিয়াজ ভাইয়ের ব্যবস্থা করে রাখা মাইক্রোবাসে চেপে পৌঁছে গেলাম সুসজ্জিত একটি হোটেল মীরা গার্ডেনে। হোটেল চেকইনের ফর্মালিটিস সেরে যে যার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে তলিয়ে গেলাম ঘুমের রাজ্যে। পরদিন সকাল নয়টায় যাত্রা...গন্তব্যে টাঙ্গুয়ার হাওড়।

জম্পেশ একটা বুফে ব্রেকফাস্ট সেরে সিলেট থেকে মাইক্রোবাসে রওয়ানা দিলাম সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর থানায় অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওড়ের উদ্দেশ্য। শহরের মধ্যে দিয়ে চলতে গিয়ে মনে পড়লো... সেই স্কুলে থাকতে বাবা মায়ের সাথে এসেছিলাম সিলেট...ঘুরে বেড়িয়েছিলাম জাফলং আর তামাবিল। পথিমধ্যে সঙ্গী হলো ইমতিয়াজ ভাইয়ের একজন সহকর্মী আর তার পাঁচ বছরের কন্যা। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জের রাস্তা পুরোটা মসৃণ নয়। মাঝে মাঝে বন্ধুর ও চড়াই উতরাই পেরিয়ে ঘন্টা দুয়েক লেগে যায় টাঙ্গুয়ার হাওড়ের ঘাটে পৌঁছাতে। শুনেছি পদ্ম ফুল নাকি সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ফুটে ওঠে আবার দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঁজে যায়। এই দুঘন্টার যাত্রায় অনেকগুলো দিঘীতে পদ্ম ফুটে থাকার সৌন্দর্য চড়াই

উতরাই পথের ঝাঁকুনির কষ্টটা কে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। ঘাটে পৌঁছে একটা ইন্জিন নৌকা সারাদিনের জন্য ভাড়া করে হাওড়ের পানিতে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। এই নৌকাগুলো সাধারণত দোতলা হয়ে থাকে। নিচের তলায় বিছানা পেতে শোওয়ার ব্যাবস্থা, ওয়াশরুম আর কিচেন। আর দোতলার ছাদটিতে রোদ থেকে বাঁচার জন্যে মাথার উপর সামিয়ানা খাটিয়ে পরিপাটি করে বসার ব্যবস্থা...বেশ একটা জমিদারি ভাব। যে যার মতো ছাদটিতে আরাম করে বসলাম। ইন্জিন নৌকার ঘটঘট আওয়াজ প্রথমে একটু বিরক্তির কারণ হলেও যখন নৌকাটি জনবহুল ঘাট ছেড়ে এগিয়ে চললো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারতের মেঘালয় তার সবুজ পাহাড়ের দর্শন দিল তখন টাঙ্গুয়ার হাওড়ের নীল পানি আর সবুজের সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার।

সৌন্দর্য পিপাসুরা বলে থাকে টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ভ্রমণের ভালো সময় শীতকাল তখন এখানে নানা প্রজাতির অতিথি পাখির আগমন ঘটে অথবা বর্ষার শেষে যখন মেঘালয় থেকে উড়ে আসা মেঘ হঠাত্ কিছুক্ষণের জন্য বৃষ্টি ঝরিয়ে সূর্যের সাথে লুকোচুরি খেলে। টাঙ্গুয়ার হাওড় শীতকালে অতিথি পাখিদের জন্য যেমন অভয়ারণ্য তেমনি বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ এর সম্পদ। এই মাছের উপর নির্ভর করে এই হাওড়ের মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। যাইহোক যাত্রা শুরু করেছিলাম রৌদ্রজ্বল নীল আকাশে কিন্তু দুপুরের পর আকাশ জুড়ে কালো মেঘের আনাগোনায় হাওড়ের পানির রঙ বদলানোর খেলা বেশ উপভোগ্য হলো। হায় রে কেনযে কবি হলাম না! হঠাত্ মনে পড়লো এই অঞ্চল তো হাসন রাজার দেশ এবং অদ্ভুত ভাবে সুযোগও হয়ে গেল হাসন রাজার কিছু বাউল গান শোনার। কিভাবে? সেটাই বলছি। টাঙ্গুয়ার হাওড়ে আছে একটা ওয়াচ টাওয়ার যেখানে পর্যটকরা উঠে পুরো হাওড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। আমরাও উঠে পড়লাম ওয়াচ টাওয়ারের চুড়ায়। সেখানে দেখা মিললো কিছু স্থানীয় কিশোরের যারা গেয়ে চলেছে একটার পর একটা বাউল গান...'লোকে বলে লোকে বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা নয় আমার। কি ঘর বানাইবো আমি শূন্যের মাঝার'।

ঘড়ির কাঁটা তখন তিনটার ঘর ছুঁয়েছে ; ওয়াচ টাওয়ার থেকে নেমে নৌকায় ফিরতে ক্ষিদে যেন চনমনিয়ে উঠলো। ফ্রেশ হয়ে নৌকার ছাদেই পাটি পেতে আহারের ব্যবস্থা। বাইন মাছ ও কাইক্কা মাছের দোপেঁয়াজি, আলু দিয়ে দেশি মুরগির ঝোল, সবজি, ডাল এবং ভাত। এতো সুস্বাদু রান্না যে নৌকার রাঁধুনি কে ফাইভ স্টার রেটিং দিতে আমরা কেউ কুণ্ঠিত হলাম না। বিকেলের ফুরফুরে হাওয়ায় চা পান করতে করতে জানতে পারলাম তাহিরপুর সীমান্তে 'নীলাদ্রি' লেকটা একবার দেখে না গেলে নাকি জীবনই বৃথা। অনেকক্ষণ পরে নৌকা থেকে নামতে পেরে তিন কন্যা আর সাথে তাদের দুই মায়েরা ফটোসেশনে ব্যস্ত হয়ে রইলাম। হঠাত্ ইমতিয়াজ ভাইয়ের ডাক শোনা গেল...তোমরা তাড়াতাড়ি এদিকে এসো 'নীলাদ্রি' তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

কে যে রেখেছিল নামটি....নীলাদ্রি!! পাহাড় বেষ্টিত অদ্ভুত সুন্দর নীলাভ সবুজ পানিতে ভরা লেকটি যেন বাংলাদেশের বুকে একটা ছোট্ট কাশ্মীর। এ সৌন্দর্য যে চুপচাপ বসে বসে আস্বাদন করতে হয়। আরো কিছু বিস্ময়কর ঘটনা যে সৃষ্টিকর্তা আমাদের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছিলেন তা কে জানতো? হঠাত্ তাঁর নির্দেশে মেঘ বৃষ্টির দুত যখন অসময়ে শুরু করলো ঝিড়িঝিড়ি বৃষ্টি তখন নিজেদের বাঁচাতে একটা উঁচু টিলার উপরে ছাউনির নিচে সবাই দাঁড়ালাম সেখান থেকে নীলাদ্রি লেক যেন আরো অপূর্ব আরো পরিপূর্ণ। হঠাত্ বৃষ্টির মধ্যেই আকাশে দেখা মিললো সূর্যের...সাথে আমাদের অবাক করে দিয়ে পরপর দুটি রঙধনু। জীবনে রঙধনু তো বহুবার দেখেছি কিন্তু 'ডাবল রেইনবো' এই প্রথম। যাইহোক মনের ক্যানভাসে নীলাদ্রি লেক আর দ্বৈত রঙধনুর ছবি এঁকে আর মোবাইল ক্যামেরার ফ্রেমে এদের সৌন্দর্য কে বন্দী করে শুরু হলো ফিরতি যাত্রা। ফিরতি যাত্রায় বোনাস হিসেবে পেলাম টাংগুয়ার হাওড়ে সূর্যাস্ত দর্শন। দ্বিতীয় দিনের গন্তব্যে রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট আর সাদাপাথর।

রাতারগুল পৃথিবীর হাতে গোনা কয়েকটি প্রাকৃতিক সোয়াম্প ফরেস্টের একটি কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে যারা সুন্দরবন যাননি তাদের জন্য রাতারগুল হতে পারে একটি 'মিনি সুন্দরবন'। সিলেট থেকে মাইক্রোবাসে গোয়াইনঘাট উপজেলায় গোয়াইন নদীর তীরে রাতারগুল পৌঁছাতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে। রাস্তা মসৃণ চাইলে একটু ঘুমিয়েও নিতে পারেন। সোয়াম্প ফরেস্ট ঘুরে দেখতে নৌকা ভাড়া করতে হলো। পশুপাখির অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে এখানে ইন্জিন নৌকা নিষিদ্ধ। নৌকার বৈঠা বেয়ে মাঝি ঘুরিয়ে দেখালো নানারকম জলজ উদ্ভিদে ঠাসা এই বন। যতই ভিতরে ঢুকছি বন যেন গভীর হচ্ছে ; নীল আকাশ হারিয়ে যাচ্ছে সবুজের আচ্ছাদনে। তবে এখানে পাখির কলকাকলি যেমন আনন্দদায়ক তবে সদা সজাগ থাকতে হয় গাছ থেকে ঝুলে থাকা নৌকার মাঝির ভাষায় বিষহীন একধরনের চিকন

সাপের ব্যাপারে যা যখন তখন নৌকার উপর টুপটুপ করে পড়ে হানা দেয়।
রাতারগুল থেকে বেরিয়ে এবারের যাত্রা সিলেটের সীমান্তবর্তী গ্রাম ভোলাগন্জ। রাস্তা মসৃণ; গাড়ীতে বসে চিপ্স, চকলেট; কোল্ড ড্রিঙ্কস খেতে খেতে পৌঁছে গেলাম কোম্পানিগন্জ উপজেলার সর্ববৃহত্ পাথর কোয়ারির এই অঞ্চলে। বড় করে লেখা ভোলাগন্জ "জিরো পয়েন্ট"। সীমান্তের ওপারেই ভারতের মেঘালয় রাজ্য। স্হানীয়দের কাছে এই জায়গাটি সাদাপাথর নামে পরিচিত। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে ঝর্ণার পানির সাথে নেমে আসে পাথর। সেই পাথরই ছড়িয়ে আছে ভোলাগন্জ জিরোপয়েন্টের বিশাল এলাকা জুড়ে। এখানে ভোলাগন্জ বর্ডারের কাছে এসে ইন্জিন নৌকা ভাড়া করতে হলো। ইন্জিন নৌকায় ধলাই নদ ধরে দশ মিনিটের পথ পেরোলেই বিস্তীর্ণ সাদাপাথরের হাতছানি। মেঘালয়ের পাহাড়, ধলাই নদ আর সাদাপাথর মিলে মিশে একাকার। নৌকা থেকে নেমে আরো কিছুক্ষণ কষ্ট করে ছোট বড় পাথরের উপর দিয়ে হাঁটার পর দেখা মিললো স্বচ্ছ শীতল জলধারার। একেবারে সেই কিশোরবেলায় দেখা জাফলং এর মতো। সবাই এখানে ব্যস্ত হলাম শীতল পানিতে পা ডুবাতে। তবে পাথরগুলো অতিরিক্ত পিচ্ছিল হওয়ায় সতর্কতা অবলম্বন খুবই জরুরী । দ্রুতই ঘড়ির কাঁটা এগোতে লাগলো। এবার যে বিদায়ের পালা। তবে একটা কথা বলে রাখি সিলেটের এই দর্শনীয় স্থানগুলি একা ভ্রমণ না করে গ্রুপে ভ্রমণ করলে খরচের দিক থেকেও যেমন সাশ্রয় হবে তেমনি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

সন্ধ্যা ছয়টায় ঢাকা ফেরার বাস। চারটার মধ্যে হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ সেরে একটু জিরিয়ে রওয়ানা দিলাম। এই দুদিনে প্রকৃতি আমাকে দিল অদ্ভুত এক মানসিক প্রশান্তি। বাসে উঠে বসলাম; খুব দ্রুতই গ্রীনলাইন পরিবহনের দোতলা বাস সিলেট ছেড়ে বেরিয়ে গেল ব্যস্ত নগরী ঢাকার দিকে।

ভালবাসার যোগ বিয়োগ................শাহানা জাবীন সিমি

ভালবাসার যোগ বিয়োগ................শাহানা জাবীন সিমি
জ অনেক দিন পর দুপুরে পাক্কা দুঘন্টার একটা ঘুম দিল সে। বেশ ফ্রেশ লাগছে। হাতমুখ ধুয়ে মাইক্রোওয়েভে এক মগ পানিতে দুটো টি ব্যাগ দিয়ে বিকেলের চা টা বানালো।

মিতির যুদ্ধ................শাহানা জাবীন সিমি (ঈদ সংখ্যা ২০২০)

মিতির যুদ্ধ................শাহানা জাবীন সিমি (ঈদ সংখ্যা ২০২০)
পালকিতে চড়া যে এতটা ঝক্কির কাজ সে ব্যাপারে কোনো ধারণাই ছিল না শায়লার। ও মনে করেছিল খাটে ওঠার মতোই উঠে যেতে পারবে চারকোনা বাক্সের মধ্যে। কিন্তু বাঁধ সাধলো মনখানেক পাথর পুঁতি বসানো ওর মিরপুরের বেনারসি শাড়িটা। চারদিকে ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামের মেয়েদের মধ্যে হাসির একটা রোল উঠলো। হঠাত্ করেই কোত্থেকে এগিয়ে এলো রুপম....শায়লার স্বামী; দেখিয়ে দিল কিভাবে পালকিতে উঠতে হয়। বিয়ের সময় করা মায়ের পালকিতে চড়ার ভিডিও দেখে শায়লার পাঁচ বছরের মেয়ে মিতি তার দাদার কাছে বায়না ধরেছে সেও পালকিতে চড়বে। চড়বে সোনা চড়বে তোমার বিয়ের সময় আমি একটা রুপোর পালকি নিয়ে আসবো....মিতি কে তার দাদার সান্ত্বনা! কিন্তু মিতি কে মানায় এমন সাধ্য কার? তাঁর নাতনিটা যে একটু জেদি। তাই ঈদের ছুটিতে বেড়াতে আসা নাতনির মন রক্ষার্থে একটা দুই বেহারার পালকির ব্যবস্থা করেছেন হাসান সাহেব। মিতি উঠে বসেছে পালকিতে আর গ্রামের এক দঙ্গল বাচ্চাকাচ্চা পালকির পেছনে পেছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছে পুরো গ্রাম জুড়ে। রুপম পুরো দৃশ্যটা ভিডিওবন্দি করছে। হাসান সাহেব কিছুদূর দৌড়ে আর না পেরে তাঁরই স্কুলের বারান্দায় একটা চেয়ার পেতে বসে পড়লেন। কি অদ্ভুত সুন্দরই না লাগছে দৃশ্যটা! ধানক্ষেতের আল ধরে ছুটছে পালকিটা আর মিতি সোনা মাঝে মধ্যেই মাথা বের করে দেখছে সবাই ঠিকঠাক মতো তার পালকির পেছনে আসছে কিনা? সবাই আছে কিন্তু দাদা ভাই কেই শুধু দেখা যাচ্ছে না । ধানক্ষেত ঘুরে একসময় পালকি এসে থামলো স্কুলের মাঠে। চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে পালকির সামনে দাঁড়ালেন হাসান সাহেব। আদর করে নাতনি কে পালকি থেকে নামিয়ে কোলে তুলে নিলেন। চারপাশে ভীড় করে থাকা বাচ্চারা অবাক হয়ে দৃশ্য টি দেখছে কারণ তারা হাসান সাহেব কে একরোখা ও বদমেজাজি হিসেবে চেনে; বেহারাদের কে যখন তিনি টাকা দিয়ে বিদায় দিচ্ছেন তখন মিতি তাদের বললো আপনারা কিন্তু আমার বিয়ের সময় আবার আসবেন....'আপনার বিয়ের সময় আরো বড় পালকি নিয়ে আসবানে' বলে বিদায় নেয় বেহারারা।

সন্ধ্যার দিকে একটা জরুরী কাজে ঘন্টা দুয়েকের জন্য বাইরে গিয়েছিল শায়লা। বারবার ঘড়ি দেখছিল। মিতি কে একদম একা বাসায় রেখে এসেছে বলে একটু টেনশন হচ্ছিল। এবার ও' লেভেল দিল মিতি। একমাস পরেই রেজাল্ট। টিভি দেখা, মোবাইলে গেম খেলা, গল্পের বই আর টুকটাক ওভেন কুকিং করেই কেটে যাচ্ছে মিতির ছুটির দিনগুলি। বাইরে থেকে ফিরতেই মাকে একটা সারপ্রাইজ দিল মিতি। এই দুঘন্টার মধ্যেই একটা চকলেট ব্রাউনি বানিয়ে ফেলেছে সে; ওয়াও মামনি গ্রেট!...এই বলে মেয়ের কপালে একটা চুমু দিল শায়লা। রসিয়ে রসিয়ে মা মেয়ে মিলে স্বাদ নিল ব্রাউনিটার। বাবার টা বক্সে উঠিয়ে রেখে ব্যাগ গুছাতে গেল মিতি। কাল এক সপ্তাহের জন্য ও দাদুরবাড়ি যাচ্ছে।

খুব সকালে রওয়না হল রুপম আর মিতি। শায়লার অফিসে দুই একটা জরুরী মিটিং থাকা য় ও আর যায়নি। শায়লা আর রুপম দুজনই আর্কিটেক্ট। ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ের একটা ফার্ম চালায় ওরা। মিতি কে পৌঁছে কালই ফিরবে রুপম। কিছুদিন আগে কেনা নতুন প্রিমিও গাড়ীটা বাবাকে দেখানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছে সে। পাশে রাজকন্যার মতো বসে আছে মিতি। শহর ছেড়ে গাড়ী হাইওয়েতে উঠতেই স্পিড বাড়ালো রুপম, ড্রাইভিংয়ে কনসেনট্রেইট করলো। বাবার সাথে টুকটাক কথা বলছে মিতি আবার কখনো বা আনমনে বাইরে তাকিয়ে রয়েছে সে....খুবই লো টিউনে বেজে যাচ্ছে শ্রীকান্ত আচার্যের গান। হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে রিফ্রেশমেন্টের জন্য থামতে হলো একবার। কিছুক্ষণ পর পর ফোন দিয়ে যাচ্ছেন রুপমের বাবা....আর কতদূর? অপেক্ষা যে শেষ হচ্ছে না।

একটা সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন রুপমের বাবা হাসান সাহেব। রিটায়ারমেন্টের পরে গ্রামেই থাকেন তিনি। এক মেয়ে কানাডায় আর রুপম ঢাকায়। গ্রামে স্কুল করেছেন, মসজিদ করেছেন। অনেক দৌড়ঝাপ করে এবার স্কুলটাকে এমপিও ভুক্ত করতে পেরেছেন। জমিজমা, ফলের বাগান আর দুদুটো পুকুরে মাছ চাষের তদারকি করে চাকরি জীবনের চেয়েও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। ঢাকায় একটু কমই যাওয়া হয়। ছেলে মেয়েরা যখন আসে তখন কয়েকদিন যেন ঈদের আনন্দ নেমে আসে ওনার বাড়িতে। গ্রামের রাস্তাটাও পাকা মসৃণ হওয়াতে ড্রাইভিংয়ে খুব একটা কষ্ট হলো না রুপমের। বাসার কাছাকাছি আসতেই এক দঙ্গল কচিকাঁচা ওদের গাড়ীর পিছনে আসতে লাগলো। হর্ণ শুনে বেরিয়ে এলো মিতির দাদা দাদু। সালাম দিয়ে তাদের জড়িয়ে ধরলো মিতি। বাবার সাথে কুশল বিনিময় করে যখন মায়ের সাথে কথা বলছে রুপম তখন সে খেয়াল করলো বাবা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে তার পার্ল কালারের প্রিমিও গাড়ী টা কে।

পুকুর থেকে তোলা দু তিন রকমের ছোট মাছ, কাতলা মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল, আলু দিয়ে মুরগির পাতলা ঝোল আর লাল শাক ভাজা দিয়ে দুপুরের খাবার খেল ওরা। মিতি এরই মধ্যে ঘুরে ঘুরে গাছ থেকে পেড়ে এনেছে পেয়ারা, আমড়া আর লটকন। বিকেলে চা খেয়ে রুপম বাবা মাকে তার নতুন গাড়ী করে বেড়াতে নিয়ে গেল এদিক ওদিক আত্মীয়ের বাড়ি। বাবা বেরিয়ে যাওয়ার পর মিতি বিকেলে যে একটা ঘুম দিয়েছে তা ভাঙলো একেবারে রাত আটটার দিকে। ঘুম ভাঙতেই মিতির মনে হলো আসার পর থেকে একবারের জন্যও কুসুম কে দেখেনি সে। কুসুম দাদুরবাড়ির বুয়ার মেয়ে তার থেকে চার বছরের ছোট। ছোট বেলার খেলার সাথী। একে ওকে কুসুমের কথা জিজ্ঞেস করলো মিতি কিন্তু কেউ কোনো সদুত্তর না দিয়ে শুধু মুখ টিপে হাসতে লাগল। রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে কিছুক্ষণ টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে ঘুরে ঘুমুতে গেল রুপম। ঠিক করলো সকালে আটটার মধ্যে বেরিয়ে পড়বে সে আবার ৭-৮দিন পর এসে মিতি কে নিয়ে যাবে।

বাবাকে বিদায় দিয়ে সকালের নাশতা সেরে পুকুর পাড়ের পাকুড় গাছের নিচে বানানো বেঞ্চিতে আরাম করে বসলো মিতি। বেশ কিছু গল্পের বই নিয়ে এসেছে সে....পার্সি জ্যাকসন, স্টিফেন কিং আর ফেলুদা সমগ্র। মিতির যেমন ভালো লাগে ফেলুদার গোয়েন্দা কাহিনী আবার সমান ভাবে উপভোগ করে পার্সি জ্যাকসনের গ্রীক মাইথোলজি আর স্টিফেন কিং এর paranormal গল্প গুলো। বাবার জন্মদিনে মায়ের দেয়া ক্যাননের ডিএসএলআর ক্যামেরাটাও সাথে করে নিয়ে এসেছে মিতি। ইচ্ছে আছে ঘুরে ঘুরে কিছু পাখির ছবি উঠানোর। পুকুর পাড়ের এই পাকুর গাছ আর ইউক্যালিপ্টাসের ডালে দোয়েল টিয়া তো বসেই এর আগের বার বুলবুলি আর ঘুঘুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন দাদাজান। নারকেল গাছে বেশ কয়েকটি বাবুই পাখির বাসাও সে আজকে দেখেছে। মিতি যখন পার্সি জ্যাকসনের হিরোস অফ অলিম্পাস সিরিজে বুঁদ হয়ে আছে তখন হঠাত্ করেই কাঁধে একটা হাতের স্পর্শে চমকে উঠল সে! আরে এ যে কুসুম! শুকনো মুখে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। কিরে কুসুম কাল আসার পর থেকে যে তোর দেখা নাই? ১৩ বছরের কুসুম এবার পিএসসি পাশ করেছে। চোখের কোণে পানি চিকচিক করে কুসুমের। পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে হিজিবিজি দাগ কাটতে কাটতে বলে মিতি আপু আমার যে বিবাহ! আঁ বলিস কি? বলে জোড়ে চিত্কার দিয়ে ওঠে মিতি। তুমি আমাকে বাঁচাও আপু... 'আমি আরো পড়বার চাই। কিন্তু বাপজান আমার বিবাহ ঠিক করসে পাশের গ্রামের এক পোলার লগে যার বয়স সতেরো আর হে আগেও একটা বিয়া বসছে। তোমার দাদাজান বিয়ার সব খরচ দিতাসে।' এ যে রীতিমতো বাল্য বিবাহ! ও' লেভেলে child marriage নিয়ে বেশ কয়েকবার রচনা লিখেছে মিতি। ইউনিসেফ বলছে বাংলাদেশে ৬০% মেয়ের ১৮ আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আর গ্রামে ছেলেদের ২১ এর আগে বিয়ের প্রবণতা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেছে।

দুপুরে খাওয়ার টেবিলে দাদার কাছে কুসুমের কথাটা ওঠালো মিতি। আসলে কি মিতি সোনা গ্রামে এই বয়সের মেয়েদের বাড়িতে রাখা খুব ঝামেলা। আশেপাশের বখাটেরা বিরক্ত করে। তাছাড়া ওরা গরীব বেশ কটা ছেলে মেয়ে তাই যত তাড়াতাড়ি পারে বিয়ে দিয়ে মেয়ে কে ঘাড় থেকে নামাতে পারলেই বাঁচে। কিন্তু দাদা দেশের আইনে child marriage যে অপরাধ। আর তাছাড়া কুসুম যে আরো পড়তে চায়। সবই বুঝলাম মিতি কিন্তু আইন করেও যে বাল্য বিবাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না। তাছাড়া কুসুমের মতো গরীব পরিবারের মেয়ের স্কুল কলেজ পাশ করে কি লাভ? তাকে বিয়ে করার জন্য তো অন্তত বিএ পাশ পাত্র লাগবে। গ্রামে কি এই ধরনের ছেলে পাওয়া যাবে? আমি এটা মানিনা দাদাজান। কুসুম এসএসসি পর্যন্ত পড়বে তারপর সে একটা ভোকেশনাল কোর্সে ভর্তি হতে পারে এবং সেটা শেষ হতে হতে ওর ১৮ বছর হয়ে যাবে তখন ওর বিয়ে দেয়ার কথা ভাবা যাবে। দেখো মিতি সোনা ব্যাপারটা এতো সহজ না। ওরা ছেলেকে যৌতুক বাবদ ৫০হাজারের মধ্যে ২৫ হাজার দিয়ে ফেলেছে। একে তো বাল্য বিবাহ তার উপর আবার যৌতুক....থানায় জানালে পুলিশ এসে ওই সতেরো বছরের পাত্র কে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাবে....মিতি মনে মনে ভাবে। মিতি একটা কথা বুঝে উঠতে পারে না তার দাদার মতো সমভ্রান্ত, শিক্ষিত ও প্রভাবশালী মানুষ গুলো কেন এই বাল্য বিবাহ রোধে এগিয়ে না এসে উল্টো আরো নিশ্চুপ থেকে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়? সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষের সাহায্য না পেলে বাল্য বিবাহ আর যৌতুক প্রথা সরকার রুখবে কিভাবে? পরদিন কুসুমের বাবা মন্জুমিয়াকেও বুঝাতে ব্যর্থ হয় মিতি।

তিন চারদিন পেরিয়ে গেছে ; শায়লাকেও ব্যাপারটা জানিয়েছে মিতি। এখন শেষ অস্ত্র হলো রুপম। মিতি ভাবে বাবা যদি দাদা জানকে বুঝাতে পারে। বিকেলের দিকে ক্যামেরাটা নিয়ে একটু বেড়িয়েছে মিতি; সাথে কুসুমও আছে। তেঁতুল গাছের চুড়ায় বসে শিষ দিচ্ছে এক জোড়া ঘুঘু। এতবার উড়ছে বসছে যে ক্যামেরাবন্দি করতে মিতি কে নাকাল হতে হচ্ছে । হঠাত্ করেই মিতির মাথায় একটা বড় ইটের টুকরো দিয়ে দূর থেকে সজোরে আঘাত করে কেউ। ব্যথায় ককিয়ে উঠে ক্যামেরাটাকে সামলে মাটিতে বসে পড়ে মিতি। রক্তাক্ত হয়ে যায় তার হাত! চিত্কার দিয়ে ওঠে কুসুম। শেষ বিকেলের আলোয় হঠাত্ খেয়াল করে ধানক্ষেতের আল ধরে দৌড়ে পালাচ্ছে তার সতেরো বছরের হবু স্বামী!

দাদুর বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে মিতি আর দাদাজানের উপরে রাগে ফুঁসছে; চারটা সেলাই পড়েছে মাথায়। পেইনকিলার আর এন্টিবায়োটিক দিয়েছে ডাক্তার। চিন্তা করে হুড়োহুড়ি করে ছুটে আসবে এই ভেবে বাবা মাকে জানাতে দেয়নি দাদাজান। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা সুখবর পেল মিতি। তার উপর এই আক্রমণ কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি দাদাজান। সেদিন রাতেই কুসুমের বিয়েটা ভেঙ্গে দেন তিনি। পুলিশ কে ফোন দিয়ে ধরিয়ে দেন সেই গুনধর পাত্র কে। খুবই খুশি হয় মিতি। মাথা টা যেন হালকা লাগে। কুসুম এসে জড়িয়ে ধরে মিতি কে। শুক্রবার এসে আদরের মেয়ের এই অবস্থা দেখে খুবই অবাক হয় শায়লা আর রুপম। মা বাবাকে কিছুটা সময় জড়িয়ে ধরে বসে থাকে মিতি। শায়লা তার শশুর কে বলে এখন থেকে গ্রামে বাল্য বিবাহ বন্ধ করতে সে মানুষ কে মোটিভেট করবে। তুমি শুরু কর আমি তোমার সাথে আছি...এই বলে অনুপ্রেরণা দেন শায়লার শশুর ।
রবিবার সকালে দাদা দাদুকে বিদায় জানায় মিতিরা। লাগেজ গাড়ী তে উঠানো হয়ে গেছে; আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আসছি বলে মিতি হেঁটে যায় বাসা থেকে অল্প কিছু দূরে দাদজানের স্কুলে। গতকালই ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছে কুসুম; বিধ্বস্ত চেহারা তে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসতে শুরু করেছে। মিতিকে দেখে হাত নাড়লো সে। লাইনে দাঁড়িয়ে সব ছাত্র ছাত্রীদের সাথে কুসুম গাইছে প্রিয় জাতীয় সঙ্গীত....
"কী শোভা কী ছায়াগো,
কী স্নেহ কী মায়াগো-
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে
নদীর কূলে কূলে।"
গাড়ীতে এসে বসে মিতি। ব্যান্ডেজ করা মাথাটা এলিয়ে দেয় পেছনের সিটে। পার্ল কালারের প্রিমিও গাড়ী টা গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে দ্রুতই এগিয়ে চলে হাইওয়ের দিকে।