Showing posts with label তুহিন রহমান. Show all posts
Showing posts with label তুহিন রহমান. Show all posts

শুভ নববর্ষ..............তুহিন রহমান

শুভ নববর্ষ..............তুহিন রহমান
(প্রকাশিত বই থেকে)

হেলা বৈশাখ ১৪২৭
ওর সাথে দেখা হয়েছিলো পহেলা বৈশাখের দিন রমনা পার্কে। দিনটাকে এখনও আমি আমার জীবনের সেরা দিন মনে করি। কয়েকজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে দুটো রিকসায় আমরা সকাল সকাল চলে গিয়েছিলাম রমনায়। উদ্দেশ্য পান্তা ইলিশ খাবো। তখন সুর্য্যমামা সবেমাত্র উঠেছে ওপরে। বাতাসে কেমন একটা ঘ্রান। রাস্তায় অনেক মানুষ। এতো সকালবেলাতেই সবাই একটা আমেজ নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে। মন খারাপ হয়ে গেল। আগেরদিন অনেক পরিকল্পনা করে ভোরবেলা রমনায় যাওয়ার জন্য আগেভাগে ঘুম থেকে উঠেছিলাম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে অনেকেই আমাদের আগে আগে রমনায় পৌছে গেছে। ভোরবেলা গোসল আর শেভ সেরেছি। মুখে মেখেছি মুলতানী মাটি। কাঁচা হলুদও কিছুটা মাখা হয়েছে। পরনে লাল পাঞ্জাবী আর সাদা পায়জামা। আমাকে নিখাদ রাজপুত্রের মতো লাগছে।
ভোরের বাতাসে চুল উড়ছে আমার। পাশের রিকসা থেকে সাগর চেঁচিয়ে উঠলো,‘কিরে রাজপুত্র, আজও কি খালি হাতে ফিরে আসবি নাকি গতবারের মতো? নাকি সাথে রাজকন্যা থাকবে?’
‘ইনশাল্লাহ্ সাথে রাজকন্যা থাকবে!’ আমি হাসলাম। আমার গালে টোল পড়লো। নিশ্চয় দেখতে আমাকে কিছুটা শ্রী কৃষ্ণের মতো লাগছে।
সবাই হৈ হৈ করে উঠলো। আমাকে নিয়ে যতো চিন্তা ওদের। কারন এখনও আমি এনগেজড নই। আমার কোন গার্লফ্রেন্ড নেই। অথচ ওদের সবার কেউ না কেউ আছেই। যার নেই সে অন্তত: ছাদে উঠে পাশের বাড়ির মেয়ের সাথে টাংকি মারে। ববির সাথে তানিয়ার অনেক দিনের সম্পর্ক। একবার কাট্টি একবার ভাব-এই অবস্থা। ইশান প্রেম করে টিনার সাথে। আমরা ওকে অনেক ক্ষ্যাপাই টিনা নামটা নিয়ে। বলি টিনার আকারটা উঠিয়ে দিলে ওর নাম টিন মানে ঢেউটিন হয়ে যাবে। আর ববিকে ক্ষ্যাপাই ছড়া দিয়ে:
ববির বউ তানিয়া
সকল কথা জানিয়া
সংসার করে ববি
বউ এর আদেশ মানিয়া।
ববি হাসে কিন্তু কিছু বলেনা। কি বলবে ও? বলার কিছু আছে নাকি ওর? প্রেম করলে মাথা ঠান্ডা হয়ে যায় আর ছ্যাক খেলে মাথা গরম। কামরুল ওরফে কালা মিয়া ভালোবাসে একটা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যে কিনা এখনও ম্যাট্রিক পাস দুরে থাক ক্লাস টেনেই ওঠেনি। আমরা ওকে ক্ষ্যাপাই নানা নাতনি বলে। একবার নাকি ও লতা মানে ক্লাস নাইনের মেয়েটাকে নিয়ে গিয়েছিলো রমনা পার্কে। তখন অনেকেই ওকে নানা নাতনি বলে কমেন্ট করেছিলো। এই কথা আমাদের কাছে বলার পর থেকেই সে আমাদের কাছেও নানা নাতনি। আমি অবশ্য এসবের চরম বিরোধী ছিলাম, মানে এইসব প্রেম প্রেম খেলার। আমার কাছে এসব হালকা বিষয়কে নিতান্তই ছেলেখেলা বলে মনে হতো সবসময়। আমি গভীরতায় বিশ্বাসী সবসময়। যদি কাউকে পছন্দ হয় তাকে ভালোবাসবো জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত।
শিল্পকলার গলির মাথা পর্যন্ত রিকসা যেতেই আটকে দিলো পুলিশ। রিকসা আর যাবেনা। আমরা নেমে পড়লাম। কেবল আমি ছাড়া আর অন্য তিনজন ছড়িয়ে গেল তিনদিকে। আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম যেখানে রিকসা থেকে নেমেছিলাম সেখানেই। ওদের তিনজনের গার্লফ্রেন্ড ফোন দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে কে কোথায় থাকবে। তিনজন তিনদিকে যেভাবে ছিটকে গেল তাতে মনে হলো ওরা তাদেরকে এতোই গুরুত্ব দেয় যে আমার কথাটা পর্যন্ত মনে থাকলোনা। অথচ রিকসা থেকে নামার আগেও জানতামনা তাদের কেউ এখানে আসবে। এটাই হলো প্রেম। আর প্রেম মানে হলো চরম গোপনীয়তা।
আমি বোকার মতো চারপাশে তাকাচ্ছি। আশেপাশে বেশ মানুষজন জড়ো হয়েছে। সুন্দরী সুন্দরী মেয়েরা হলুদ, সাদা শাড়ী পরে বান্ধবীদের সাথে মজা করছে। চমৎকার সাজ পোশাক সবার। চারপাশে যেন রঙের মেলা চলছে। এখনও মানুষজন তেমন আসেনি। একটুপরই ভিড় জমে উঠবে। আমার দিকে সবাই বেশ অবাক হয়েই তাকাচ্ছে। মেয়েরা তো পারলে দু’বার তাকায়। কেউ কেউ আমাকে নিয়ে বান্ধবীদের সাথে কানে কানে কথা বলে খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ছে। এর কারন আমার নায়ক নায়ক চেহারা। খুব কম মানুষের আমার মতো সুন্দর চেহারা আছে-থ্যাংক গড।
দু’জন মেয়ে আমার পাশ দিয়ে যাবার সময় কি যেন বললো আমি ঠিক শুনতে পেলামনা। শোনার চেষ্টাও করলামনা। কারন মেয়েদের এরকম কমেন্ট শুনে আমি অভ্যস্ত। আমি পকেট থেকে মোবাইল সেট বের করে তিনজনকেই ফোন দিলাম। শালারা ফোন বন্ধ করে রেখেছে। মেজাজটা বিগড়ে গেল আমার। ঝাড়া তিরিশ মিনিট ওদের অপেক্ষা করলাম আমি। তারপর বড়বড় পা ফেলে স্থান ত্যাগ করলাম।
রমনা পার্কের ভেতর অনেক ভিড়। নানা জায়গায় পান্তা ইলিশের আয়োজন। আমি ঘুরতে লাগলাম। এক জায়গায় মেয়েমানুষের সাজ সরঞ্জাম নিয়ে বসেছে কিছু মহিলা। কিছু ছেলে বাঁশি আর ঢাক ঢোল নিয়ে ঢুকেছে ভেতরে। সম্ভবত: তারা এসব বাজাবে আর জমিয়ে আড্ডা দেবে। আমার পাশে এসে গেল রঙের প্যালেট আর রঙ তুলি নিয়ে একটা লোক,‘একটা আর্ট করে দেই স্যার?’
‘আর্ট মানে?’
লোকটা হাতের প্যালেট উঁচু করে দেখালো,‘এইতো স্যার, রঙ দিয়ে ডিজাইন করে দেবো। লেখা থাকবে পহেলা বৈশাখ। একটা একতারার ছবিও থাকবে নাকের পাশে।’
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সকাল বেলা কতো কষ্ট করে ফেসিয়াল করেছি। আর এই ব্যাটা আমার নাকের পাশে একটা একতারা আঁকবে রঙ দিয়ে। ঘুরে অন্যদিকে হাঁটা ধরলাম আমি। সবাইকে বলেছি বটে আমি আজ একজনকে সাথে নিয়ে তবে ফিরবো, বাস্তবে তার ইচ্ছা মোটেও নেই। কথাটা বলা হয়েছে ওদেরকে সুখী করার জন্য। যে প্রেম করে সে চায় সবাই প্রেম করুক। যে বিয়ে করে সে চায়না পৃথিবীর কেউ বিয়ে করুক। এটাই হলো জীবনের গনতন্ত্র।
প্রধান রাস্তার পাশ দিয়ে বাগানের ভেতরে হাঁটছি। লোকজন ভিড় করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। সকাল আটটা বাজে। ফেরিওয়ালা আর খাবারের দোকানদাররা খুব সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জায়গায় জায়গায় চটপটি আর ফুচকার দোকান। হঠাৎ হাত টেনে ধরলো কেউ। ঘুরতেই দেখলাম ইয়ং একটা ছেলে। হাতে সেই রঙের প্যালেট। সাথে সাথে হাত তুললাম আমি,‘আমি ভাই নাকের পাশে একতারা আঁকবোনা।’
‘না না একতারা কেন? আরো কত কিছু আছে বৈশাখের প্রতিক! যেমন ধরুন ইলিশ মাছ, প্যাঁচা, হাতপাখা, ঢেঁকি....।’
‘আরে দাঁড়ান দাঁড়ান।‘ হাত তুললাম আমি।‘আপনার কি মনে হয় আমার মতো একজন নাকের পাশে ঢেঁকি বা ইলিশ মাছ নিয়ে ঘুরবে?’
ছেলেটা অপ্রতিভভাবে হাসলো,‘দেখুন সবাই করছে। একদিনই তো।’
‘এই একদিন নাকের পাশে ঢেঁকি নিয়ে হাঁটতে হবে? কমপালসারি?’
ছেলেটা কি বলবে বুঝতে না পেরে অন্যদিকে হাঁটা দিলো।
আমি আবার হাঁটতে লাগলাম। তিনজনকে দ্বিতীয়বারের মতো রিং করলাম। এবার একজন ছাড়া বাকি দু’জনকেই পেলাম। দু’জনই বললো তাদের মোবাইল বন্ধ ছিলোনা। নেটওয়ার্কের সমস্যা ছিলো। আমি চরম রাগে জানতে চাইলাম তারা এখন কোথায়। কেউ বললো দুই নাম্বার গেটের কাছে। কেউ বললো রমনার ভিতরে যে পানির পাম্পটা আছে সেখানে আছে। তিন নাম্বারের তো পাত্তাই নেই। যতোক্ষন প্রেমিকার জন্য অপেক্ষায় ছিলো ততক্ষন ফোন ছিলো খোলা। আর দেখা হবার পর সব ফোন বন্ধ।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি ওদেরকে খুঁজতে যাবোনা। দরকার হলে একাই থাকবো এখানে। সারাদিন। আবার হাঁটা। মানুষজন বারবার আমার দিকে তাকায় এটা অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। আমি চুইংগাম চিবোতে চিবোতে হাঁটতে লাগলাম। অনেকটা উদাসিনভাবে হাঁটছি। বড়ো পুকুরটাকে কেন্দ্র করে একপাক দিলাম। ইতিমধ্যে জোড়ায় জোড়ায় কপোত কপোতি চলে এসে দখল নিয়ে ফেলেছে পুকুরের পাড়গুলোতে। সাধারন মানুষ শুধু ঘুরছে আর দেখছে। আমার বেশ মজাই লাগছে হাঁটতে। বন্ধু বান্ধব থাকলে কথা বলতে হয়, গল্প করতে হয়। একা থাকলে বরং নিরিবিলি থাকা যায়, চিন্তা করা যায় এবং বেশী উপভোগ করা যায় সবকিছু। আমার জীবনে বড়ো যেসব ঘটনা ঘটেছে এবং যেসব ঘটনা সৌভাগ্য নিয়ে এসেছে সেগুলো ঘটেছে বন্ধু ছাড়া। আমি একা থাকার সময় ঘটেছে।
আবার হাতে একটা টান। আমি জানি কে টান দিয়েছে। সেই প্যালেটআলা কেউ একজন। এরা যে কেন এসব জায়গায় ঘুরঘুর করে আনন্দ নষ্ট করে! আমি রাগ করে ঘুরলাম সেদিকে। হ্যাঁ, প্যালেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তবে লোক বা ছেলে নয় একটা সুন্দরী মেয়ে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে।
‘ভাইয়া, এঁকে দেই?’ মেয়েটা সুন্দর করে হাসলো। ‘শুভ নববর্ষ?’
‘শুভ নববর্ষ?’
‘নাকি ঢোল?’
আমি ঢোক গিললাম।‘আপনি আঁকবেন?’
‘হ্যাঁ, আমি আঁকবো।’
‘না তাহলে প্যাঁচা আঁকতে হবে।’ আমি হাসলাম।‘মানে একটা বার্ন আউল।’
মেয়েটা একটু চিন্তা করলো। তাকে একটু চিন্তিতও দেখাচ্ছে মানে টেনস্ড। মনে হয় প্যাঁচা কখনও আঁকেনি আগে। তারপর হঠাৎ হেসে উঠলো,‘ঠিক আছে আসুন এদিকে। এঁকে দিচ্ছি।’
আমি তারপরও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম,‘আচ্ছা যদি প্যাঁচা না হয়ে ওটা একটা ডাইনোসর হয়ে যায় তখন?’
‘ডাইনোসর হবে কেন?’ মেয়েটা অবাক হয়ে বললো।
‘আপনি যেভাবে চিন্তা করলেন তা’তে ভয় হচ্ছে।’ আমি বললাম।
মেয়েটা খিলখিল হাসিতে ভেঙ্গে পড়লো। ‘যদি দেখি প্যাঁচা হচ্ছেনা তাড়াতাড়ি ওটাকে একটা ঢোল বানিয়ে দেবো।’
‘তাহলে তো আমার গালটাকে শেষ করে দেবেন।’
‘না না শেষ হবেনা।’ মেয়েটা হাসতে হাসতে বললো।‘আপনার গালের ওপর প্যাঁচার চেয়ে ঢোল সুন্দর লাগবে।’
‘না না প্যাঁচাই লাগবে। প্যাঁচা আমার ফেবারিট পাখি।’
‘প্যাঁচা ফেবারিট পাখি?’
‘হ্যাঁ।’
‘কি বলছেন? এতো সুন্দর সুন্দর পাখি থাকতে প্যাঁচা আপনার ফেবারিট পাখি?’
‘ঠিক বলেছেন। প্যাঁচা আমাদের বৈশাখী পাখি। তাছাড়া এটার সাথে আমাদের কালচারের একটা সম্পর্ক আছে।’
‘কিন্তু আপনাকে দেখে তো মনে হয়না এতো একটা বিশ্রী পাখি আপনার প্রিয় পাখি।’
‘ওরে বাবা চেহারা দেখে এতো কিছু বুঝতে পারেন নাকি?’
‘পারি পারি।’
‘দেখি কি পারেন। আমার গালে একটা প্যাঁচা এঁকে দিন।’ আমি বাগানের কিনারে গিয়ে একটা বট গাছের পাশে থাকা বেঞ্চে বসে পড়লাম। মেয়েটা তার প্যালেট আর রঙ তুলি নিয়ে এগিয়ে এলো আমার পেছন পেছন। তার নরোম বাম হাতে আমার মুখটা ধরে তার দিকে ঘোরালো। আমার গালের ওপর নজর দিলো ও। ঝুঁকে পড়লো আমার মুখের ওপর। খুব কাছ থেকে আমি তার মুখটা দেখতে পাচ্ছি। চমৎকার চেহারা, ভ্রু, চোখ, ঠোঁট যেন একটার সাথে একটা অতি সামঞ্জস্যপূর্ন। পাতলা ঠোঁটটা একটু ফাঁক। চমৎকার একটা মেয়েলি সুবাস পাচ্ছি তার গলা আর বুক থেকে। হঠাৎ করে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে নিলাম।
মেয়েটা প্যাঁচা আঁকছে। তার রঙ তুলির টান আমার গালের ওপর সুড়সুড় করছে। আমার বেশ ভালো লাগছে। আমার বড়ো চুল মেয়েটা হাত দিয়ে সরালো। আমার মনে হচ্ছে মেয়েটা বেশ যতœ করে ছবিটা আঁকার চেষ্টা করছে আমার গালের ওপর। নাকি সে একটু বেশী সময় নিচ্ছে? তার কি আমার গালের ওপর ছবি আঁকতে ভালো লাগছে? অনেক কথা ভাবছি আমি চোখ বুঁজে।
তারপর তার ছবি আঁকা শেষ হলো। সে নিচু হয়ে ফুঁ দিয়ে রঙগুলো শুকাতে চেষ্টা করছে। আমার মনে হচ্ছে এই কাজটা সে বাড়তি করছে। ফুঁ দিয়ে শুকানো তো তার দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা। গালের ওপর এক অচেনা নারীর ফুঁ। আমার নিসঙ্গ একাকী হৃদয়টা কেমন যেন মোচড় খেয়ে উঠলো। মনে মনে একটা কবিতা লিখতে শুরু করলাম আমি ঃ
রমনার দখিনা হাওয়ায় যখন মাতলো সারা শহর
তখন সবাই ছেড়ে গেছে আমায়
নিসঙ্গ সবার মাঝেও আমি
একাকী তবে বেশ খোশমেজাজে
কারন?
গালের ওপর এক অচেনা নারীর ফুঁ।
‘আপনার স্কিন খুব সুন্দর। ছেলেদের স্কিন এমন হয়না।’ মেয়েটা বললো।
‘ধন্যবাদ। প্যাঁচা আঁকা হয়েছে?’
‘হ্যাঁ। শেষ।’
‘রঙগুলো কি শুকিয়েছে?’
‘না এখনও শুকায়নি। দাঁড়ান শুকিয়ে দিচ্ছি।’ মেয়েটা নিচু হয়ে আবার ফুঁ দিতে লাগলো।
আমি মনে মনে হাসলাম। রবী ঠাকুরের সেই কথা মনে পড়ে গেল-সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। কথাটা প্রমান করার জন্য বোধহয় মেয়েমানুষের প্রয়োজন। সে আরো এক মিনিট ফুঁ দিলো। আমি নিচু স্বরে বললাম,‘আমার মনে হয় এখনও শুকায়নি।’
মেয়েটার চেহারাটা একটু লাল হয়ে উঠলো সাথে সাথে।
আমি পকেট থেকে আমার স্যামসুং ডুয়োসটা বের করে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে ধরলাম,‘একটা ছবি তুলে দিন আমার গালের। সাথে তো আয়না নেই।’
‘আমার কাছে আয়না আছে, দেখবেন?’ মেয়েটা তার ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে ভেতর থেকে একটা কমপ্যাক্ট পাওডার কেস বের করে খুললো। আয়নাটা বের করে বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে। আয়না দিয়ে দেখলাম চমৎকার একটা প্যাঁচা এঁকেছে মেয়েটা আমার বাম দিকের গালে। তিনটা রঙ ব্যবহার করেছে সে। লাল আর সবুজ রঙে লিখেছে শুভ নববর্ষ। মেয়েটা নিশ্চিতভাবে আর্ট জানে। অসাধারন। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল,‘চমৎকার!’
মেয়েটা হাসলো,‘বললামনা, আঁকতে পারবো আমি।’
‘এটা থাকবেনা বেশিক্ষন। একটা ছবি তুলে দিন।’
মেয়েটা আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে আমার গালের একটা ছবি তুলে দিলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম,‘গালের আর্টের ছবি তো তুললাম এবার আর্টিস্টের একটা ছবি নিতে পারি?’
মেয়েটা তার সুন্দর ঠোঁটটা কামড়ে ধরলো। একটু ভাবলো।‘ঠিক আছে নিন।’ সে পোজ দিলো। আমি তার একটা ছবি নিলাম। ‘আপনার নামটা?’
‘ইরিনা মুম।’ মেয়েটা বললো।‘আনকমন তাইনা?’
‘একেবারে রাশিয়ান বাট আর্টিস্টিক।’ আমি হাসলাম। ‘খুব সুন্দর নাম। আই স্যয়ার।’
মেয়েটা লজ্জা পেলো। আমি তাড়াতাড়ি বললাম,‘এতো সুন্দর একটা আর্ট করলেন কতো দেবো বলুনতো?’
‘আপনার ইচ্ছা।’ সে নিচু মুখে বললো।
‘ঠিক আছে।’ আমি পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দিলাম। মানিব্যাগে গুনে গুনে চারটা পাঁচশো টাকা তিনটে একশো টাকা আর কিছু দশ বিশ টাকার নোট আছে। কিন্তু পাঞ্জাবীর পকেটে হাত ঢুকিয়েই জমে গেলাম। মানিব্যাগটা নেই। ডানদিকের পকেটে হাত দিলাম। সেখানেও নেই। তারমানে পকেটমার হয়ে গেছে। পাঞ্জাবীর পকেট মারা খুব সোজা ব্যপার। এই ভিড়ের ভেতর আমার রোমান্টিক মুডের সুজোগে কেউ মেরে দিয়েছে পকেটটা। আমি শেষ।
মেয়েটা আমার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল ব্যপারটা। আমি কিছু বলার আগেই সে জিজ্ঞেস করলো,‘কি হয়েছে? হারিয়ে গেছে টাকা?’
‘মানিব্যাগ নেই।’
‘ও মাই গড!’
‘সব টাকা সেখানেই ছিলো। ফোনটা অন্য পকেটে ছিলো তাই সেটা বেঁচে গেছে।’
‘তাহলে?’
‘তাহলে আপনার টাকাটা এখনই দিতে পারছিনা।’
মেয়েটা হেসে উঠলো,‘আপনি আমার টাকা নিয়ে চিন্তা করছেন? লাগলে আরো নিন আমার কাছ থেকে।’
‘না না ছিঃ কি বলেন। আমি খুব লজ্জিত। তবে আমার সমস্যা নেই। আমি আমার ফ্রেন্ডদের ডেকে আনছি। ওরা আশেপাশেই আছে।’
ফোনটা তুলতে যেতেই মেয়েটা হাত চেপে ধরলো আমার। আমি স্থির হয়ে গেলাম। ‘বললাম তো টাকার চিন্তা করবেননা। আপনার এতোবড়ো একটা অঘটন ঘটে গেছে আর আপনি ভাবছেন আমি আপনার কাছে টাকা চাইবো?’ ইরিনা অন্যরকম একটা ভঙ্গি করলো যেন ও আমার কতোদিনের চেনা। ‘আপনি বসুন। মানিব্যাগে কি গুরুত্বপূর্ন কিছু ছিলো?’
‘না তেমন কিছুনা। হাজার দু’য়েক টাকা এই আরকি।’ আমি বললাম। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম।‘আমিই কি আপনার প্রথম ক্লায়েন্ট?’
ইরিনা আবার হাসলো,‘এর আগে একটা বাচ্চার গালে একতারা এঁকে দিয়েছি।’
‘তারমানে আমি দ্বিতীয়?’
‘হ্যাঁ। চটপটি খাবেন?’
আমি আড়ষ্ঠভাবে বললাম,‘আপনি খাওয়াবেন কেন? একটু অপেক্ষা করুন আমি আপনাকে খাওয়াবো।’
ইরিনা ভ্রু কোঁচকালো,‘আপনাকে স্মার্ট দেখালেও আপনি আসলে আনস্মার্ট।’
‘একথা কেন মনে হলো?’
‘জানিনা তবে আপনি যেভাবে সংকোচ বোধ করছেন সেটা আপনার চেহারার সাথে মানাচ্ছেনা।’
আমি হেসে উঠলাম। ‘আপনি একজন আর্টিস্ট। আপনার চোখে আসলে পুরো পৃথিবীটাই অন্যরকম।’
ইরিনাও হাসলো,‘চটপটি খাবেন কিনা বলুন।’
‘ঠিক আছে খাবো।’
ইরিনা কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা চটপটির গাড়ির কাছে গিয়ে কিছু বললো। তারপর ফিরে এলো আমার কাছে। হাতের রঙের প্যালেট আর তুলি নামিয়ে রাখলো পাথরের বেঞ্চের ওপর। নিজেও বসলো। আমার দিকে তাকালো,‘আপনি আবার দাঁড়িয়ে গেছেন?
‘না না এইতো বসছি।’ আমি ইরিনার পাশে বসলাম। বললাম,‘আমি কিন্তু একা আসিনি। আমার বন্ধুরাও আমার সাথে এসেছে। মানিব্যাগটার মতো ওরাও হারিয়ে গেছে।’
‘মানে!’
‘আরে ওরাও হারিয়ে গেছে। আমি ওদের তিনজনকে খুঁজে পাচ্ছিনা।’
‘খুঁজে পাচ্ছেননা মানে? ওদের মোবাইল নাম্বার নেই আপনার কাছে?’
‘আছে কিন্তু ফোন দিলে বলছে এখানে আছি সেখানে আছি।’
ইরিনা একটু চিন্তা করে বললো,‘তারমানে তাদের সাথে কেউ আছে?’
‘রাইট ইউ আর!’ আমি বললাম। ‘এই জন্যেই তারা আমার কাছে আসছেনা। একেকজন একেকদিকে চলে গেছে সাথের জনকে নিয়ে।’
ইরিনা ভেবে বললো,‘তারমানে আপনি ছাড়া বাকি তিনজনই এনগেজড?’
আমি মাথা নাড়লাম।
‘একে বন্ধুত্ব বলে? তারা আপনার সাথে এলো আর আপনাকে রেখে চলে গেল?’ ইরিনা এপাশ ওপাশ মাথা দোলালো।‘আপনার এক ফ্রেন্ডের নাম্বার দিন তো?’
আমি ববির নাম্বারটা ডায়াল করে ইরিনার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। ইরিনা আমার ফোনটা তার কানে চাপালো। ওদিক থেকে ববি ফোন রিসিভ করতেই ও বললো,‘হ্যালো,এই মোবাইলটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছি। ডায়েল লিস্টে আপনার মোবাইল নাম্বার ছিলো তাই এই নাম্বারটায় ডায়েল করলাম। আমি এখানে আর দশ মিনিট আছি। প্রয়োজন মনে করলে ফোনটা আমার কাছ থেকে সংগ্রহ করুন। আমি লেকের দক্ষিন পাড়ে পাথরের বেঞ্চে বসে আছি।’
লাউডস্পিকার থাকায় আমি বেশ ভালোভাবে শুনতে পেলাম ববি বলছে,‘ও এটা তো আমার ফ্রেন্ড সায়েমের নাম্বার। আমি আসছি। একটু অপেক্ষা করুন।’
ইরিনা তার ফোনটা কেটে দিয়ে আমার দিকে তাকালো,‘কেমন হলো বলুন তো?’
‘ও মাই গড! আপনার সিচুয়েশন কাভার করার অসাধারন ক্ষমতা তো!’ আমি অবাক হয়ে বললাম,‘এখন তো ও দৌড়ে চলে আসবে।’
‘আসুক না। তারপর দেখুন আমি তাকে কি বলি।’ ইরিনা ফোনটা আমার হাতে ফেরৎ দিলো।
দশ মিনিট পার হবার আগেই দেখতে পেলাম ববি সাথে তানিয়াকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছে। আমার পাশে ইরিনাকে দেখে ও থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তানিয়াকে কিছু একটা বললো নিচু স্বরে তারপর এগিয়ে এলো আমার দিকে,‘কিরে তুই? তোর ফোন নাকি হারানো গেছে?’
আমি জবাব দেয়ার আগেই ইরিনা বললো,‘আপনার বন্ধুকে একা রেখে বান্ধবীকে সময় দিচ্ছেন? ফোন দিলে কখনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে কখনও নিজের লোকেশন বলছেননা। আপনার বন্ধুকে যদি আপনার সাথে নিয়ে যেতেন তাহলে কি খুব একটা সমস্যা হতো? উনি একটু দুরে বসে থাকতেন।’
ববি নিজের কান চুলকালো বোকার মতো। কান থেকে চুলে চলে গেল আঙুল। কি বলবে বুঝতে পারছেনা।
ইরিনা বললো,‘আপনাদের আরো দুই জন কোথায় গেছেন?’
‘আমি বলতে পারবোনা।’ ববির কান চুলকানো থামছেনা। ‘আসলে ওরা কোন দিকে গেছে....।’
‘ঠিক আছে ঠিক আছে। বসুন। চটপটি খান।’
‘না না চটপটি আমরা খেয়েছি।’ ববি আমার দিকে একটু প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো। আমার গালের ওপর প্যাঁচা আঁকা দেখে ও আরও বিশ্মিত হয়েছে।
‘ঠিক আছে তাহলে যান। আপনার বন্ধুর দায়িত্ব এখন আমার হাতে।’ ইরিনা বললো। ও আবার আমার পাশে এসে বসলো। ববি চলে যাওয়ার ভঙ্গি করতেই আমি হাত তুললাম,‘দাঁড়া, আমাকে পাঁচশো টাকা ধার দে। আমি মানিব্যাগ হারিয়ে ফেলেছি।’
‘এক টাকাও না। আপনি যান।’ ববির দিকে তাকিয়ে বললো ইরিনা।‘আমি দেখবো ব্যপারটা।’
ববি আরেকবার আমাদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে তানিয়াকে নিয়ে হাঁটতে লাগলো। ও যার পর নাই বিশ্মিত আমার কাজ কারবারে। হোক বিশ্মিত। ওদের কাজ কারবারে আমিও কি কম বিশ্মিত? ওরা দু’জন বেশ কিছুটা দুরে গেল বটে কিন্তু একেবারে উধাও হলোনা। আমি দেখতে পেলাম ওরা একটু দুরে গিয়ে বসে আমাদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছে। ইরিনা এতোকিছু দেখতে পেলনা-ও আমার জন্য একটা আর নিজের জন্য একটা চটপটির প্লেট নিয়ে এসে পাশে বসলো,‘নিন শুরু করুন। আজকের দিনের প্রথম চটপটি। শুভ নববর্ষ।’
‘শুভ নববর্ষ।’
চটপটি দিয়ে নববর্ষ শুরু করলাম। ইচ্ছা ছিলো পান্তা ইলিশ খাবো কিন্তু আমার বন্ধুদের অন্তর্ধানের কারনে সব ভেস্তে গেল। সকাল ন’টা বাজতে চললো। রমনা পার্ক ভরে যাচ্ছে মানুষে। নানা ধরনের নানা বর্নের চটকদার মানুষ। আজ সবাই হ্যাপি মুডে আছে। কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে, কেউ হৈ হৈ করছে, কেউ দল বেঁধে লাফাতে লাফাতে আসছে, কেউ জোকার সেজে আসছে, তবে বেশীরভাগ আসছে জোড়ায় জোড়ায়।
ববি মনে হয় ইশানকে ফোন দিয়েছিলো। একটু পরে ওকে দেখা গেল। আমাদের সাথে বেশ কিছুটা দুরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে টিনা। আমাদের দিকে ওদের দু’জনার দৃষ্টি। আমি ভাব করলাম যেন ওদেরকে দেখতেই পাইনি। লেকের দিকে মুখ করে বসে থাকায় ভালোই হয়েছে। আমাদের মুখ দেখতে পাচ্ছেনা কেউ। আমি একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলাম ইরিনার সাথে। বললাম,‘যাক এখনও সারাদিন পড়ে আছে। আমি ভেবেছিলাম একা একা ঘুরতে হবে। আপনি মানুষের মুখে ছবি আঁকুন আর আমি এখানে বসে বসে দেখবো-তাও ভালো।’
‘না না ঠিক আছে। আজ আর কিছুই করবোনা। এখানেই বসে থাকবো সারাদিন। ভালোই লাগছে।’ ইরিনা বললো চটপটি খেতে খেতে। ‘আপনার মতোই অবস্থা হয়েছে আমারও। একজনকেও সাথে আনতে পারিনি। সবাই যার যার মতো যার যার পথে চলে গেছে। ভেবেছিলাম আর্ট কেমন করতে পারি একটা এক্সপিরিয়েন্স দরকার। হয়েছে।’
‘দুটো ডিজাইন করে শখ মিটে গেল?’
ইরিনা ওর নিজের হাতের দিকে তাকালো। কিছু রঙ ওর হাতে লেগে আছে। ‘সারা দিন যদি এসব করি তাহলে আর আনন্দ করা হবেনা।’
‘কতোক্ষন আনন্দ করার ইচ্ছে?’
‘সারাদিন। ধুলোয় ধুসরিত একটা দিন। রোদে আর ঘামে ভেজা একটা দিন। গাছের ছায়ায় বসে হাতের তালপাখা দিয়ে বাতাস করার একটা দিন। কপালের চুলগুলো ঘামের সাথে মিশে লেগে থাকবে। কোথাও একটা কোকিল ডাকবে।’
আমি অবাক হয়ে বললাম,‘আপনি তো একজন কবি!’
‘শিল্পী।’ ইরিনা বললো,ওর চোখে খেলা করছে রোমান্টিকতা। ‘যারা ছবি আঁকে তারা স্বপ্ন দেখে। আর এই স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে চায় তারা। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তব থেকে অনেক দুরের পথ। একা একা হেঁটে যেতে হয়-তাই কেউ স্বপ্নের কাছে যেতে চায়না।’
আমি হেসে উঠলাম,‘কি চমৎকার উদাহরন। আপনি ভবিষ্যতে অনেক বড়ো একজন শিল্পী হবেন।’
‘যদি হই আপনাকে নিয়ে প্রথম একটা পোট্রেট করবো। নাম দেবো কবি।’
‘কবি কেন?’
‘কারন আপনাকে দেখে কেমন যেন কবি কবি মনে হয়েছিলো। কেমন ভাবুক ভাবুক একটা ভাব। জীবনের প্রতি আকর্ষনহীন একজন। পকেটমার হয়ে গেছে কিন্তু কোন বোধ নেই।’
‘বোধ থাকবে কিভাবে? তার আগেই তো আপনি চলে এলেন।’
ইরিনা হাসতে লাগলো। ওর চটপটি খাওয়া বাধাগ্রস্থ হলো। ববির পাশে গিয়ে বসেছে ইশান। আমাকে দেখিয়ে কি সব বলছে। এবার আমি সাগরকেও দেখতে পেলাম ওদের মাঝে। তিনজন জোট বেঁধেছে। আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। নিঃসন্দেহে ওদের প্রত্যেকের গার্লফ্রেন্ডের চেয়ে ইরিনা অনেক সুন্দরী।
ছোট্ট একটা ঘটনা অথচ কি অপুর্ব তার আবেশ। জীবনে তো কোন মেয়ের সাথে এভাবে ঘনিষ্ঠভাবে বসিনি। সবসময় নিজের সৌন্দর্য নিয়ে এতোটাই বিমোহিত ছিলাম যে আর কারো দিকে তাকানোর সময় হয়ে ওঠেনি। বলতে গেলে কিছুটা অহংকারীও ছিলাম।
সবাই অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। বোধহয় বলছে অপুর্ব জুটি। দু’জনেই সুন্দর। এমনটা খুব একটা চোখে পড়েনা।
‘সত্যি বলছি আমি বাস্তববাদী নই।’ আমি বললাম। ‘অন্যদের কারো মতো নই। জীবনটাকে আমি অন্যভাবে সাজাতে চেয়েছি সবসময়। আমার চিন্তাধারার সাথে আমি কারও মিল পাইনি।’
খুব কাছ থেকে ইরিনা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ও বুঝতে চেষ্টা করছে আমি কি বলছি। ‘তাহলে আপনিও চেষ্টা করলে আর্ট করতে পারবেন। দেবেন আমার গালে একটা ঢেঁকি এঁকে?’
‘ঢেঁকি? আপনার গালে?’ আমি হেসে উঠলাম।‘ডাক্তারকে ওষুধ দেবো আমি?’
‘দুর! আমি ফাজলামী করছিনা। দেবেন একটা ঢেঁকি এঁকে?’
‘কি বলছেন এসব?’
‘আমি বলছি আপনি আমার গালে একটা ঢেঁকি এঁকে দিন। সবার গালে কতোকিছু লেখা রয়েছে কেবল আমার গালে নেই।’ ইরিনা তার হাতের রঙতুলি বাড়িয়ে দিলো। ‘খাওয়া শেষ করে আমার গালে এঁকে দিন।’
আমার চটপটি খাওয়া শেষ। রঙতুলি হাতে নিয়ে ইরিনার মুখটা ধরলাম এক হাতে। কিছুটা সংকোচ আমাকে বেঁধে ফেললো আস্টেপৃষ্ঠে। ওর নরোম গাল,গা থেকে ভেসে আসা মিস্টি সুবাস আমার মনকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিলো। ভালোলাগার এক অন্যরকম অনুভুতি। ওর গালে আমার হাত। ইচ্ছে হচ্ছে ওর আরো কাছে যেতে। ওর গালে আমার ঠোঁট ছুঁয়ে দিতে। আমি ঢেঁকি আঁকা শুরু করলাম। বৈশাখের ঢেঁকি। বাঙালীর রঙের বাহারী ঢেঁকি। চারপাশের কোলাহল আর আমেজের মাঝে অন্য এক অনুভুতি।
রঙের প্রতিটি টান আমার হৃদয়কে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। তারপর একসময় ঢেঁকি আঁকা শেষ হলো। ইরিনা নিজের আয়নায় গালটা দেখলো তারপর অবাক হয়ে বলে উঠলো,‘আপনিও তো আর্টিস্ট! কি চমৎকার এঁকেছেন।’
সত্যি আঁকাটা সুন্দর হয়েছে। আমি বিশ্বাস করতে পারিনি এতো সুন্দর করে আঁকতে পারবো। আমি গ্রামের ছেলে নই। জীবনে কখনও ঢেঁকি দেখিনি আমি সামনে থেকে। যা দেখেছি ছবিতে বা টিভিতে। তা’তেই এতো চমৎকার হয়েছে আঁকাটা যে আমি নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিনা। ‘ধন্যবাদ দেয়ার দরকার নেই।’ আমি বললাম। ‘যা শিখেছি আপনার কাছ থেকে শিখেছি।’
‘আমার কাছ থেকে?’
‘এই এক ঘন্টায় আমি ছবি আঁকার যে অনুপ্রেরনা পেয়েছি আপনার কাছ থেকে তা থেকেই এঁকেছি এটা।’
ইরিনা একটু হেসে বললো,‘কতো দেবো?’
আমি অবাক হয়ে বললাম,‘কতো দেবো মানে?’
‘আপনি যে আমাকে দিতে চাইলেন তখন। এবার আমি আপনাকে কতো দেবো বলুন?’
আমি হেসে ফেললাম।‘আপনি দিতে চাচ্ছেন আমাকে? হ্যাঁ, দিতে পারেন। বাড়ি ফেরার ভাড়াটা।’
ইরিনাও হাসলো,‘বাড়ি আমি আপনাকে পৌছে দেবো।’
‘আপনি?’
‘হ্যা্’ঁ
‘আপনি আমার বাড়ি যাবেন?’
‘যাবো।’
‘সত্যি?’
‘সত্যি। কারন আমি আপনার মাকে বলবো যেন উনি আপনাকে বাড়ির বাইরে বের হতে না দেন। আপনি নিজেই কখন যে হারিয়ে যান তাই বা কে জানে।’
আমি হা হা করে হেসে উঠলাম। ‘আপনার ধারনা আমি একটা শিশু কারন আমি আমার মানিব্যাগ হারিয়ে ফেলেছি।’
‘ঠিক তাই।’
‘ভুল।’
‘ভুল?’
‘হ্যাঁ, কারন এই আমিই আবার আজ আপনার মতো একজনের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেললাম এই বা কম কিসে?’
ইরিনা মুখ বাঁকালো,‘উঁহু এটা কোন ব্যপার হলোনা। মানুষ এর চেয়েও বড়ো বড়ো কাজ করে।’
‘যেমন?’
‘যেমন মানুষ চাঁদে গেছে, পারমানবিক বোমা বানিয়েছে, কতো কিছু আবিস্কার করেছে আর আপনি?’
‘আমি আবিস্কার করেছি আপনাকে।’
ইরিনা হাসলো,‘এটা কোন আবিস্কার হলো? আমি তো এখানেই ছিলাম।’
‘আমি আপনাকে আবিস্কার করলাম এটাই আমার কৃতিত্ব। আপনি সত্যি বলছেন আমার বাড়ি যাবেন?’
‘অবশ্যই যাবো।’
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম সকাল দশটা বাজতে চলেছে। ববিদের দিকে তাকালাম। ওরা নিজেরা নিজেদের ভেতর কি নিয়ে যেন গল্প করছে আর ফাঁকে ফাঁকে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। একটু পর ববি উঠে এলো। ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ও অন্যদের সাথে কি যেন পরিকল্পনা করে এসেছে। চেহারায় কেন যেন মুখস্ত মুখস্ত একটা ভাব ফুটে উঠেছে।
‘কিরে? কিছু বলবি?’ আমি ববির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম।
ববি আমাকে পাত্তাই দিলোনা। সে ইরিনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,‘আপনাকে তো চিনলামনা, আপনি কি ওর গার্লফ্রেন্ড?’
ইরিনা মূহুর্তে লাল হয়ে গেল। কিন্তু ও সামলে নিয়ে বললো,‘কি হলে আপনি খুশি হবেন?’
‘আপনি যদি ওর গার্লফ্রেন্ড হয়ে থাকেন তবে আমি সবচেয়ে বেশী খুশি হবো কিন্তু সবচেয়ে বড়ো ব্যপার হলো ও আমাদের কাছে কোনদিন আপনার কথা বলেনি। এইটা ও খুব খারাপ করেছে।’ ববির চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ও সিরিয়াসলি বলছে। ‘আমি ওর ক্লোজড ফ্রেন্ড কিন্তু ও আমার কাছেই বলেনি আপনার কথা।’
ইরিনা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো,‘বলেননি কেন?’
আমিও হাসলাম,‘কারন আমি চেয়েছিলাম পহেলা বৈশাখের দিন ওদেরকে সারপ্রাইজ দেবো। তোরা সারপ্রাইজড তো?’
ববি বললো,‘সারপ্রাইজড মানে? আমি তো এখনও বিশ্বাস করতেই পারছিনা যে তোর মতো একটা ছেলে এমন রূপসী একটা মেয়ে বাগাতে পারে। আর তুই তো কোন কথা চাপা রাখতেই পারতিসনা, কিভাবে এমন একটা গল্প চাপা রাখলি বলতো?’
আমি বলার আগেই ইরিনা বললো,‘অনেক কষ্টে। অনেকবার ফোন করে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো আপনাদের বলবে কিনা। আমিই নিষেধ করে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম পহেলা বৈশাখের দিনই ওদেরকে সারপ্রাইজ দিতে হবে। তাই ফোন হারানোর ভান করে আপনাকে ডেকে এনেছিলাম।’
আমি ইরিনার বুদ্ধিমত্তা দেখে হতবাক হলেও মনে মনে ওর প্রশংসা করলাম। এ ধরনের বুদ্ধি সব মেয়ের থাকেনা। মনে মনে আরও আনন্দ লাগছিলো যে ইরিনা নিজেই স্বীকার করলো যে সে আমার গার্লফ্রেন্ড। জানিনা বিষয়টা ও মন থেকে বলছে কিনা। নাকি ওদের সাথে ফাজলামী করছে? যাইহোক, মেয়েটার একটা প্রস্তুতি আছে বলতে হবে। আমার ভালো লাগছে যে আমাকে আর বেশী দুর এগুতে হবেনা।
ববি ইশারায় বাকিদের ডাকলো। সবক’টা এসে ঘিরে দাঁড়ালো আমাদের। ইশান আমার মাথায় একটা খোঁচা দিলো,‘কিরে শালা, তুই আমাদের ঠকিয়েছিস, এখন তোকে এর জরিমানা দিতে হবে।’
‘উনি জরিমানা দিতে পারবেননা কারন ওনার মানিব্যাগ হারিয়ে গেছে।’ ইরিনা আমার হয়ে বললো,‘আমি জরিমানা দেবো।’
‘তাই?’ সাগর পাশ থেকে বললো।‘তাহলে তো আমরা আজ বাইরে লাঞ্চ করছি।’
‘নো প্রবলেম,’ ইরিনা বললো।‘আজ আমরা বাইরে খাবো এবং তারপর ফিরে আসবো আবার। এখানে।’
‘আবার এখানে ফিরে আসবো?’ আমি বললাম।
‘আমরা আজ এখানেই থাকবো সারাদিন। বছরের প্রথম দিন। কবিতা লিখবো। ঘুরবো। চটপটি খাবো। ছবি আঁকবো।’ ইরিনা বললো। ‘আপনি কি বলেন?’
আমি বললাম,‘আমার আপত্তি নেই।’
‘আপনি আপনি কেন?’ ববি বললো,‘তুমি নয় কেন?’
‘সময় হলে।’ ইরিনা বললো।‘আমিই বলবো।’
‘না-না, আজ। আজ যখন এতোকিছু হবে তখন এটা বাকি থাকে কেন?’ ববি বললো।‘আজই তুমি শুরু হবে।’
আমি হাসলাম,‘না আজ নয় অন্যদিন।’
‘না আজই।’ ইশান অনড়, ‘আমরা দেখতে চাই।’
‘এটা একটা বিশেষ দিন।’ ববি আবার বললো।‘নামটাই তো জানলামনা।’
‘ইরিনা।’
‘চমৎকার নাম। তো ইরিনা আমি দেখতে চাই আপনি ওকে তুমি করে ডাকছেন।’
ইরিনাও এক ডিগ্রী বেশী। ও আমার দিকে ফিরে বললো,‘তুমি বলো আমরা কোথায় কি দিয়ে লাঞ্চ করবো?’
আমি হেসে বললাম,‘আপনি খাওয়াবেন আপনিই বলতে পারবেন সেটা।’
‘এ্যাই!’ ববি ধমকে উঠলো,‘আপনি কি? ও তোকে তুমি বলছে আর তুই ওকে আপনি বলছিস?’
‘আচ্ছা তুমি বলবো।’
‘বলবো কি? বল?’
‘আমি একটু দেরি করে বলতে চাইছি।’
‘না-না কোন দেরি নয়। আজ এই শুভক্ষনে বলতে হবে।’ জেদ ধরলো ববি। ‘বল। আমাদের সামনে বল।’
‘আচ্ছা তুমি।’
‘আচ্ছা তুমি কি? একটা সেনটেন্স বল?’
আমি ইরিনার দিকে তাকিয়ে বললাম,‘তুমি যা খাওয়াবে তাই আমরা খাবো।’
ছয়জন একসাথে চিৎকার করে উঠলো। ববি, ইশান, সাগর আর ওদের তিন বান্ধবী। লোকজন অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। মাত্র দুটো ঘন্টা আগেও আমরা কেউ কাউকে চিনতামনা। আর এখন, দু’ঘন্টা পর, একে অন্যকে আমরা তুমি করে বলছি।
একেই বলে ভাগ্য। বছর শুরুর দিনেই তার সাথে পরিচয় এবং দু’ঘন্টা পরই তুমি করে বলা। একে সাহিত্যের ভাষায় কি বলা যেতে পারে তা আমার জানা নেই তবে যদি শিল্পীর তুলি দিয়ে তা প্রকাশ করা হয় সেটা বোধহয় আরও ভালো ফুটবে, কারন আমরা দু’জনই ভালো শিল্পী।
ববি, ইশান আর সাগর তিনজনই পকেট থেকে মোবাইল বের করলো। ববি বললো,‘দু’জন দু’জনার হাত ধর-আমি ছবি তুলবো।’
ও ঘুরে এসে আমাদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো।
অনিচ্ছা সত্বেও আমি ইরিনার হাতে হাত রাখলাম। ইরিনাও একটু সংকোচ করে আমার হাত ধরলো।

দেবী ২...................তুহিন রহমান

দেবী ২...................তুহিন রহমান

চার
সুশীল আর জাহিদ চোখ বড়ো বড়ো করে আছে। হীরা ভাইয়ের অবস্থাও একই। মনে হয় এই সময়ের ভেতর তারা একটা ঢোক পর্যন্ত গেলেনি। অচিনদেব একটু থামতে সুশীল হামলে পড়লো,‘তাহলে আপনি একজন অবতার?’ সে তার দুই হাতের তালু ইতিমধ্যে একত্র করে প্রনামের ভংগি করে ফেলেছে।
‘হ্যাঁ আমি এখন একজন অবতার তবে তোমরা যেমন ভাবো তেমন নয়।তোমাদের হিন্দু ধর্মে দেবী তার অবতারের ওপর ভর দিয়ে মর্তে আসেন। অথচ আমার সাথে আমার দেবী ডোরিনিয়ার কথা হলেও তাকে কোনদিন দেখিনি। সে স্বর্গে থাকে, আমি পৃথিবীতে। চল্লিশ বছর যেদিন পূর্ন হয়েছিল তখন আমি কোলকাতার বেহালার বাড়িতে শুয়ে আছি। তখন গভীর রাত। হঠাৎ আমার মনে হলো বাড়িটা দুলছে।আমি ঘুম ভেঙে দেখলাম চারপাশ অন্ধকার, অথচ আমি বাতি জ্বালিয়ে ঘুমোই। কোথাও কোন শব্দ নেই। চারপাশে যেন আদিম নৈঃশব্দ। সেই দোদুল্যমান অবস্থায় আমি বহুদুর থেকে আসা কোন হ্রদের পানির শব্দ শুনলাম। যেন সেই পানি বহু নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে।সেই সাথে মৃদু টুংটাং।আমার বুকের ভেতর কি একটা শিহরন বয়ে গেল আমি বোঝাতে পারবোনা।এগারো শো বছর আগের সেই শিহরন আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে। আমি সেই টুংটাং শব্দ শুনলাম, তারপর চরম বিশ্ময়ের মধ্যে বুঝলাম ওটা কোন টুংটাং নয়। একজন নারীর গলার স্বর। এটা কিভাবে সম্ভব! একজন নারী এমন অপরূপ গলায় কিভাবে কথা বলতে পারে। এতো মধুর সেই সুর আমি পাগল হয়ে গেলাম। আমার মনে হলো সেই সুর শোনার কারনেই আমার বয়সটা সেখানেই থেমে গেল। আমার শরীরের চামড়া টানটান হয়ে গেল। আমার মস্তিস্কের মৃত নিউরনগুলোও যেন প্রান ফিরে পেল, শরীরের কোষগুলোও যেন সজীব হয়ে উঠলো। এ কোন সাধারন নারী কোনভাবেই নয়। সেই কন্ঠস্বর শোনার সাথে সাথেই আমার জৈবিক কামনা এমন তীব্র আকার ধারন করলো যে সারা শরীর কাঁপতে লাগলো। তোমাদের পার্বতীকে প্রথম দেখার পর শিবের যে অবস্থা হয়েছিল আমার সেই অবস্থা হলো। আমার মনে হলো আমি অজ্ঞান হয়ে যাবো। না, আমি স্থির হলাম অবশেষে। দেবী শুধু একটি কথাই বলেছিল সেই রাতে,‘অচিনদেব তুমি পেরেছ আমাকে জয় করতে।’ অথচ সেই কন্ঠস্বরকেই আমি ধারন করতে পারিনি। একটি বাক্য ধারন করতে গিয়ে আমাকে একটা রাত পাগল হয়ে যেতে হয়েছে।ভাবলাম এভাবে যখনই দেবী আমাকে নির্দেশ দেবে আমি তো তা ধারন করতে গেলে শেষ হয়ে যাবো।দেবীর কন্ঠস্বর আমার জৈবিক তাড়না বাড়িয়ে দেয়। তাহলে তার উপাসনা করবো কিভাবে? আমি তো তার প্রেমে পড়ে যাবো। অবশ্য এই সমস্যার সমাধান হয়ে গেল খুব তাড়াতাড়িই। দেবীও নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিল আমার অবস্থাটা। এর পর যখনই দেবীর নির্দেশ পেয়ে আমি পাগল হয়ে যেতাম সেই রাতেই স্বপ্নে আমার কাছে চলে আসতো অসাধারন রূপসী কোন নারী। আমিও নিবৃত্ত হয়ে যেতাম।এভাবেই শুরু, তারপর এগারোশো বছর একইভাবে পথ চলছি। এখনও সেই কন্ঠস্বর শুনলে আমি উত্তেজিত হয়ে পড়ি। বিশ্মিত হয়ে ভাবি, কিভাবে একই কন্ঠস্বর বারবার আমাকে প্রভাবিত করে। তাহলে ওই উপাসকদের দোষ দেব কিকরে? তারা শুধু শুনেছে তার রূপের কথা, শোনেনি তার কন্ঠস্বর। আর তাতেই তারা তাকে দেখার জন্য জীবন দিয়ে দিয়েছে। তারা পেয়েছিল আমারই মতো অসীম জীবন, পেয়েছিল সুখের জীবন তারপরও তারা একটাই জিনিষ দেখতে চেয়েছিল জীবনে যা তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি মানুষের আজন্ম আকর্ষন থাকে যেমন ছিল আদম আর হাওয়ার। স্বর্গের সুখ তাদের ত্যাগ করতে হয়েছে একটা মাত্র গন্ধম ফলের লোভ সংবরন করতে না পারার ফলে।আমাদের ধর্মে সেই গন্ধম ফল হলো অপরূপা ডোরিনিয়া। আমার দেবী। আমার প্রার্থনার একমাত্র উপাস্য। আমার সহস্র বর্ষীয় জীবনে আর কোন ইচ্ছা নেই। পৃথিবীর একমাত্র লক্ষ্যই আমার শুধু তার উপাসনা করা আর তাকে সুখী করা। আমি জানিনা আমার মতো আর কতোজন তাকে এই মুহুর্তে ভাবছে।’ একটু থামলো অচিনদেব।তার চেহারায় বিভ্রান্তি ফুটলো একটু।মনে হলো দ্বিধা করছে সে কথাটা বলতে, পরক্ষনে সামলে নিল।‘সত্যি কথাটা বলি।হীরা, আমি সত্যিই খুব ক্লান্ত।গত এগারোশো বছর বেঁচে থাকা কিন্তু খুব সাধারন ব্যপার নয়।আমি কিন্তু তোমার মতোই একজন মানুষ, কেবল দেবীর আনুকুল্যে আমি হাজার হাজার বছর বেঁচে আছি এবং থাকবো।তোমাদের মৃত্যুর লাখ বছর পরও এখানে বা পৃথিবীর কোথাও আমাকে থাকতে হবে।এই ভাবনাটা আমাকে কাহিল করছে।আমি আর বইতে পারছিনা এই শেষহীন জীবন।এর ভার অনেক।আমি ইচ্ছে করলেই আত্মহত্যা করতে পারছিনা।কারন আমি তো অমর।দেবী না চাইলে আমি মরতে পারবোনা।কারন আমি তার বার্তাবাহক,তার সব নির্দেশ আমি পালন করি।তাছাড়া আমি তার প্রেমে পড়ে গেছি হীরা যা প্রচন্ড পাপের।একজন মানুষ হয়ে আসলে এই কন্ঠস্বরকে অবজ্ঞা করা অসম্ভব।গত এগারোশো বছর ধরে আমি কামনালিপ্ত যা আমি প্রকাশ করতেও ভয় পাই।ভয় হয় দেবী হয়তঃ ব্যপারটা জানতে পেরেছেন।তিনি ক্ষমারও দেবী।তাই হয়তঃ আমি বেঁচে আছি এখনও নাহয় এতোদিন তো নরকে থাকার কথা।বিশ্বাস করো হীরা ঘুমের মাঝে আমি তাকে দেখি।কষ্টে কান্না করি।এই কষ্ট কাউকে বলতেও পারিনা।কারন কেউ আমার সমসাময়িক নয়।তাই তোমাকে বললাম।আমি দেবীর প্রেমে পড়েছি এটা এখন আমি মাঝেমাঝে জোরে জোরে উচ্চারন করি।দেখি কি বলে দেবী।আমি তো উপাসক নই, আমি ম্যাসেঞ্জার।সে কিভাবে এই সমস্যার সমাধান দেবে জানিনা।গত পঞ্চাশ বছরে সে কোন জবাবও দেয়নি।মনে হয় কোনদিন দেবেওনা।তাকে বলি আমি তাকে দেখতে আসবো একদিন।একবার হলেও আমি তাকে দেখবো।শুধু এক সেকেন্ডের জন্য হলেও তাকে দেখবো।মাত্র এক সেকেন্ড।দেবীর রূপ আমি একনজর দেখবো।তারপর আর চাইনা।তার শারিরিক সৌন্দর্য দেখে আমি আমার জীবনটাকে শীতল করে দেবো।হোক পাপ, হই আজন্ম নরকে পতিত।তবু তাকে আমি একনজর দেখতে চাই।’
হীরাভাই হাত তুললো,‘তুমি বললে যে তুমি তাকে দেখতে যাবে।তাকে কোথায় দেখতে যাবে? স্বর্গে যাবার পথ কোনটা?’
অচিনদেব কি যেন ভাবছে।ভাবছে এদেরকে কথাটা বলা যায় কিনা।তার চোখের পাতা কাঁপছে।তারপর কাঁধ নাচিয়ে উঠে দাঁড়ালো বিছানা থেকে।খোলা দরজায় গিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকালো।সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেক আগেই।প্রকৃতির হালকা আলোর আভা ছাড়া ঘরের ভেতর কেবল মোবাইলের আলো জ্বলছে।‘তার কাছে যাবার একটা পথ আছে।তোমাদেরকে বলি কিন্তু তোমাদের প্রমিস করতে হবে তোমরাই শেষ ব্যক্তি যাদের আমি এই কথাটা বললাম।’
‘আমি প্রমিস করছি।’ হীরাভাই বললো।‘আর ওরাও কথাগুলো গিলে ফেলবে আমি যদি ওদের বলে দেই।’
অচিনদেব ঘুরলো,‘এখান থেকে আরো অনেক পথ দুরে পাহাড়ের উপত্যকায় একটা জায়গা আছে পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।প্রাচীর এতো উঁচু যে একটা পর্বতের সমান।কারো বোঝার সাধ্য নেই যে সেটা পাহাড় নাকি প্রাচীর।পাহাড়ে ওঠা যায় কিন্তু প্রাচীরে ওঠার মতো কোন জিনিষ নেই কারন সেই প্রাচীরের গা অত্যন্ত মসৃন। আর ওপরটা ফাঁকা নয়, পাথর জুড়ে জুড়ে ছাউনির মতো করা।সেটা প্রাকৃতিক নাকি মনুষ্যনির্মিত কেউ বলতে পারেনা।ওখানটাতে যাবার মতো একটাই পথ আছে।আমাদের ধর্মে ওটাই হলো একমাত্র পবিত্র স্থান যা সরাসরি দেবীই দেখাশোনা করেন স্বর্গ থেকে।যেহেতু আমি ম্যাসেঞ্জার তাই আমি জানি।ওখানে বিশাল উদ্যানের ভেতর এক সাদা বাড়ি আছে যার সাতটা খিলানের মতো দরজা।মাঝখানের দরজাটা অন্য ছয়টা দরজা থেকে অনেক বড়ো।পুরো বাড়িটা অজানা কোন কিছু দিয়ে বানানো যার গা থেকে আলোকচ্ছটা নির্গত হয়।এই বাড়িটার ভেতর দিয়ে দেবী সরাসরি চলে আসেন পৃথিবীতে।যদিও আমি কেবল শুনেছি কিন্তু যাচাই করে দেখার সাহস নেই।একদিন যাবো বিষয়টা নিশ্চিত হবার জন্য।’
হীরা ভাই মোচড় দিয়ে উঠলো।‘অচিনদেব তুমি আমাকে কিন্তু অতিমাত্রায় উৎসাহী বানিয়ে ফেলেছো।এর আগে তোমার সাথে এতোদিন ছিলাম কিন্তু এতো কথা বলোনি।’
‘কারন তখন তোমার বয়স ছিল কম।এসব কথা তুমি ধারন করতে পারতেনা।তাই বলিনি।’
হীরাভাই একটা সিগারেট ধরালো,‘কতোজনকে এ পর্যন্ত তুমি তোমাদের ধর্মে কনভার্ট করতে পেরেছো অচিনদেব?’
‘খুবই সামান্য।তাছাড়া আমি ঠিক ম্যাসেঞ্জার হতে পারিনি মনে হয়।দেবী যাকে একবার দুত বানান তাকে সারাজীবন দুত হয়েই থাকতে হয়, তাই রয়ে গেছি।তানাহলে কবেই আমার দুতের চাকরি চলে যেত।আমি গৌরের মতো নিবেদিতপ্রান হতে পারিনি।আমার দীর্ঘ জীবনটাকে আমি ভোগ করেছি বেশী।খুব কমই আমি মানুষের কাছে গেছি আমাদের ধর্মের বার্তাবাহক হয়ে।বেশীরভাগ সময়ই আমি অনন্ত যৌবনকে ভোগ করেছি নানাভাবে।দেবীর দেয়া সুগন্ধ অপব্যবহার করেছি।তবে তিনমাস আগে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।’
‘কি সিদ্ধান্ত?’ জিজ্ঞেস করলো হীরা ভাই।মোবাইলের আলোতে সে সরাসরি তাকিয়ে আছে অচিনদেবের দিকে।
‘আমি আর এই অনন্ত জীবন চাইনা।মুক্তি লাভ করবো এই জীবন থেকে এবং সেটা খুব শীগ্রি।’
‘কিভাবে সম্ভব সেটা?’
‘একটাই পথ দেবীর ওই সাদা বাড়িতে গিয়ে দেবীর সাক্ষাত প্রার্থনা করা।আমি সেখানে যাব।দেখা করবো দেবীর সাথে।আমার দেবী।আমার প্রেমিকা।আমি তাকে ভালবাসি।আমি তার সাথে থাকতে চাই।এছাড়া আমার আর কিছু চাওয়ার নেই এই জীবনে।’
‘কিন্তু সেতো ভয়ানক পাপের কাজ!’
‘আমি জানি।কিন্তু এছাড়া আমার সামনে আর কোন পথ খোলা নেই।এই অসীম জীবনের একটা পরিসমাপ্তি দরকার।যদি দেবী চান তবে আমাকে তার কাছে টেনে নেবেন।যদি চান তবে আমার মৃত্যু দেবেন।সেটা তার বিবেচ্য বিষয়।’
হীরা সুশীল আর জাহিদ নিশ্চুপ।তারা এমন একটা জায়গায় এসেছে যা তাদের মাতৃভুমি থেকে অনেক দুরে।এমন কিছু দেখেছে আর শুনেছে যা কখনও দেখেনি বা শোনেনি।একটা অদ্ভুত অনুভুতি তাদের মনজুড়ে।হীরা ভাই উশখুশ করছে দেখে অচিনদেব বললো,‘আমি বুঝতে পারছি তুমি কি বলতে চাচ্ছো।’
হীরা ভাই থেমে গেল মাঝপথে।অচিনদেব বললো,‘তুমি আমার সাথে যেতে চাইছো আমাদের পবিত্র স্থানে,ঠিক কিনা?’
হীরা ভাই মাথা নাড়লো,‘শুধু আমি নই, আমরা তিনজনই।’
অচিনদেব মাথা নাড়লো,‘সেটা সম্ভব নয়।খুবই ঝুঁকিপূর্ন হবে সেটা তোমাদের জন্য।আমি নিজেই সেখানে কখনও যাইনি।কেবল শুনেছি, আর কিভাবে যাওয়া যায় তা জেনেছি।আমি জানিনা দেবী আমার ভাগ্যে কি রেখেছেন।আমার জীবনের বিনিময়ে আমি তাকে একবারের জন্য দেখতে চাইছি।’
‘আমরাও তাকে দেখতে চাইছি।’
‘তুমি কেন দেখতে চাইছো?তুমি কখনও তার কথা শোনোনি, তার সাথে কথা বলোনি।আমার কথা শুনেই তার ব্যপারে আগ্রহী হয়ে উঠলে?তাছাড়া তুমি একজন মুসলিম, আর ওই ছেলেটাও।’ অচিনদেব আঙুল তুলে জাহিদকে দেখালো।
‘তাতে কিছু যায় আসেনা।’ হীরাভাই বললো,‘যেকোন মূল্যে আমরা ওই পবিত্র স্থানে যেতে চাই।দেখতে চাই তোমার দেবীকে যিনি অপার সৌন্দর্যের অধিকারিনী।’
‘আমি নিশ্চিত নই কি ঘটবে আমার ভাগ্যে।’ অচিনদেব বললো, তার চেহারায় চিন্তার ছাপ।‘তুমি যদি যাও তবে তোমাকে লুকিয়ে থেকে দেখতে হবে এবং যদি আমার কিছু ঘটে যায় তবে পালিয়ে আসতে হবে সেখান থেকে।’
‘অবশ্যই আমরা কোন ঝুঁকি নেবোনা যা তোমার ও আমাদের জন্য ক্ষতিকর।আমরা দুর থেকে তোমাকে অনুসরন করবো যেন আমরা তোমাকে চিনিনা।দুর থেকেই দেখবো যতোটুকু দেখা যায়।’
মাথা নাড়লো অচিনদেব,‘সেজন্য রাতের বেলা যেতে হবে আমাদের।মেনে নিলাম তোমাদের কথা।যেহেতু আমি নিজে নিজের ভাগ্য সম্পর্কে নিশ্চিত নই তাই তোমাদের বিষয়টা তোমরাই সামলাবে।কোন শব্দ বা কোন কথা যেন তোমরা সেখানে না বলো বা না করো এটা প্রতিজ্ঞা করতে হবে।’
‘করলাম,’ হীরাভাই বললো,‘তুমি নিশ্চিত থাকো আমাদের ব্যপারে।তোমার কোন ক্ষতি আমরা হতে দেবোনা আমাদের জন্য।বলো কবে যেতে চাও?’
অচিনদেব কোন চিন্তা না করেই বললো,‘কালকেই।’ এটা সে আগে থেকেই ভেবে রেখে দিয়েছিল।


পাঁচ
গত এগারোশো বছরের কুটিরের মায়া ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে এলো অচিনদেব।তার পিছু পিছু হীরা ভাই, সুশীল আর জাহিদ।শেষবারের মতো ফিরে তাকালো পাহাড়ের ওপরে নীল আকাশের পটভুমিতে দাঁড়িয়ে থাকা কাঠের কুটিরটার দিকে।সামনে অনির্দিষ্ট।চারজন কোন বলেনি সকাল থেকে।কেবল জাহিদ একটু বিব্রত ছিল বিষয়টা নিয়ে।ওর চিন্তা ছিল ফিরে যাবার, কিন্তু সুশীল আর হীরাভাইয়ের অতি উৎসাহে সাড়া দিতে গিয়ে তাকে তাদের সাথে যেতে হচ্ছে।গতরাতে কেবল কিছু ফলটল দিয়ে রাতের খাবার খেতে হয়েছে।এভাবে কখনও রাতের খাবার খায়নি জাহিদ।সকালেও অজানা কিছু রসালো ফল দিয়ে ব্রেকফাস্ট করেছে।পানি খেয়েছে, ইচ্ছে করছে বাড়িতে যেমন পেটভরে পরোটা ডিম ভাজি খায় তেমন কিছু খেতে।আসলে মানুষ যতোই প্রকৃতি প্রকৃতি করুক না কেন, শহরের মানুষ কখনও প্রাকৃতিক হতে পারবেনা।আসলে মানুষ জাতিটাই রোবট হয়ে গেছে।এখন তারা মানুষের তৈরি করা খাবার ছাড়া প্রাকৃতিক খাবার খেতে ভুলে গেছে যে কারনে তাদের ভেতর নানা রোগ বাসা বেঁধেছে।পশুপাখি ফল খায়, মানুষ খায় হটডগ, পিজা, নুডুলস, কফি, কাবাব।ফলে মানুষের ভেতর যে প্রাকৃতিক বল ছিল এখন তা নেই।গত এগারোশো বছর ধরেই ফল খেয়ে জীবন ধারন করছে অচিনদেব।তার ভেতর যে শারিরিক আর মানসিক শক্তি আছে মনে হয় তার চারভাগের একভাগ শক্তিও নেই ওদের কারো ভেতর।তাছাড়া সে তো একজন বার্তাবাহক, সরাসরি দেবীর ক্ষমতা তার হাতে।
অনেক দুর্গম পথ পার হচ্ছে ওরা।জঙ্গলই শেষ হতে চাইছেনা। কুটির থেকে বের হবার পরপরই আলাদা হয়ে গেছে অচিনদেব।এমনভাবে হাঁটছে যেন তাদেরকে চেনেইনা সে।কুটির থেকে বেরুবার আগে সে সবার সাথে হ্যান্ডশেক করেছে।বিদায় নিয়েছে সকলের কাছ থেকে।বারবার একটা কথাই বলেছে যদি দেখে তার কিছু ঘটে গেছে তবে তারা যেন যতো দ্রুত পারে ওই জায়গা ত্যাগ করে নিরাপদে সরে পড়ে।ওরা মাথা নেড়েছে কিছু না বুঝেই।
দুর্গম পথ যে এতোটা দুর্গম হবে ধারনা করতে পারেনি ওরা।দুপুর পার হয়ে বিকেল হয়ে আসছে তবু জঙ্গলই শেষ হয়না।মাঝে মাঝে জঙ্গলের ভেতরই চড়াই উৎরাই পার হতে হয়েছে ওদের।ভেবেছিল কোথাও জঙ্গল ফাঁকা হয়ে আকাশ দেখা যাবে, কিন্তু না, এদিকটায় বনের মাথাগুলো আরো ঘন হয়েছে।কয়েকটা ছোট নালা পেরুতে হয়েছে ওদেরকে।বিকেলের শেষ দিকে আবার থামলো অচিনদেব, পেছনে তাকালো। সে একটা কাঠের গুঁড়ির ওপর বসে পড়েছে।কি একটা আপেল মতো ফল চিবুচ্ছে।জাহিদ বসে পড়লো।হীরাভাই তার ব্যাগ থেকে দু’দিন আগের একটা পাউরুটি বের করলো। এটার কথা মনে ছিলনা তার।হোটেল থেকে একটা জেলির কৌটোও কিনেছিল সে।ওটা দিয়ে তিনজনের খাবার হয়ে গেল মোটামুটি।ব্যাগে পানির বোতল ছিল।বোতলটা খালি করে ফেললো তারা।এখন পানি তেষ্টা পেলে নালার পানিই খেতে হবে তাদের।দেখতে পেল অচিনদেব আবার হাঁটতে শুরু করেছে।ওরাও উঠে পড়লো।সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে জঙ্গল পার হয়ে একটা পাহাড়ের সামনে এসে দাঁড়ালো ওরা।বিকেলের শেষ সুর্যের আলো ছিটকে পড়ছে পাহাড়ের গায়ে, অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।মনে হচ্ছে পৃথিবীতেই যেন স্বর্গ দেখতে পাচ্ছে ওরা।হীরাভাই ফিসফিস করে বললো,‘আমার মন বলছে এসে গেছি সেইখানে যেখানটাতে আসার কথা আমাদের।’
সুশীল আর জাহিদ হীরাভাইয়ের দিকে তাকালো।ওদের চোখে ভয় নাকি উত্তেজনা বুঝতে পারলোনা হীরাভাই।তবে দু’জনই যে বিষয়টা দেখার জন্য মুখিয়ে আছে এটা সত্যি।ওরা এমন একটা জায়গায় এসে গেছে যেখানটাতে আসার জন্য লাখ লাখ রুপি এ পর্যন্ত খরচ করেছে ওরা।এসব জায়গায় এর আগে কখনও মানুষের পা পড়েছে কিনা জানা নেই ওদের।সম্ভবতঃ এখানটাতে কখনও কোন গ্রাম বা উপজাতীয়দের বসতি গড়ে ওঠেনি।তেমন কোন লক্ষন চোখে পড়েনি পথে।এখানকার আকাশ পরিস্কার নীল, তাতে সাদা মেঘ।নীল আকাশের পটভুমিতে লাল পাহাড়ের সারি বহুদুর চলে গেছে।এমন দৃশ্য কেবল বইয়ের পাতায়, ছবিতেই দেখা যায়।পাহাড়ের গোড়ায় দাঁড়িয়ে পড়েছে অচিনদেব।ওপরে যাবার কোন রাস্তা নেই আর।পথ এখানেই শেষ।সাধারন পাহাড়ের গায়ে কোন না কোন পথ থাকে বেয়ে ওঠার। এটার গা একেবারে মসৃন।সবচেয়ে বড়ো ব্যপার এর গায়ে কোন উদ্ভিদও গজিয়ে ওঠেনি।সাধারনত পাহাড়ের গায়ে নানা ধরনের ফুলের গাছ, প্রাচীন বৃক্ষের জন্ম হয়।এটা একদম ন্যাড়া পাহাড়।
অচিনদেব জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের গায়ে দু’হাত মেলে আছে।দুর থেকে বোঝা যাচ্ছেনা সে কি করছে।ওরা কেউ জঙ্গল থেকে বের হয়নি।অচিনদেবের কাছ থেকে ন্যুনতম দু’শো হাত দুরত্ব বজায় রেখে হাঁটছে ওরা।জঙ্গল থেকে বের হলেই যে কেউ দেখতে পাবে তাদের।
‘আমরা দেবীর চোখ এড়াতে চাইছি।’হঠাৎ সুশীল বললো,‘এটা কি সম্ভব? আমরা স্বর্গের প্রবেশদ্বারের কাছে চলে এসেছি।এখান দিয়েই দেবী পৃথিবীতে আসেন।যে বিশ্ব চালায় তার ফাঁকি দিতে চাইছি আমরা।’
অনেকটা স্বগতোক্তির সুরে বললেও জাহিদ আর হীরাভাই দুজনেই অনুভব করলো কথাটা ঠিক।দেবী যেই হোক, তিনি তো আধ্যাত্বিকভাবে ক্ষমতাবান, তিনি যে ধর্মেরই হোক না কেন, মানুষের চেয়ে ক্ষমতাবান।ওরা তার চোখ এড়িয়ে এখানে প্রবেশ করবে এটা কিভাবে সম্ভব?তবে কথাটা বেশী আমল দিলনা কেউ।অচিনদেব কি যেন হাঁতড়াচ্ছে এখন।নাকি দেয়ালে হাত বুলোচ্ছে কিছুই বোঝা গেলনা দুর থেকে।সন্ধ্যার আধাঁর হুট করে নেমে আসে জঙ্গলে।কিছুক্ষন আগের প্রতিফলিত রোদের শেষ অংশ পাহাড় ছেড়ে সরে যেতেই ঝুম করে সন্ধ্যা ঘনালো।অচিনদেবকে এখন একটা সাদা টুকরো বলে মনে হচ্ছে।ওরা জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে অচিনদেবের কিছুটা কাছে চলে এলো।দুরত্ব কমিয়ে আনলো প্রায় একশো হাতের মতো।কাছে আসার পর বুঝতে পারলো পাহাড়ের দেয়ালে কিছু দিয়ে একটা নকশা আঁকছে অচিনদেব।আধ ঘন্টা হয়ে গেছে নকশা এঁকেই যাচ্ছে সে।বিরক্ত হয়ে গেলেও তিনজন স্থানুর মতো দাঁড়িয়েই রইলো।শীতপ্রধান অঞ্চল বলে এদিকটাতে মশার প্রকোপ নেই।তা নাহলে ঠান্ডার সাথে তাদের অস্থির হয়ে যেতে হতো মশার কামড়ে।
আকস্মাৎ সচকিত হয়ে উঠলো ওরা।একটা ঘড়ঘড় শব্দ উঠেছে পাহাড়ের ভেতরে।এমন একটা শব্দ যা অবিশ্বাস্য।মনে হচ্ছে বড়ো বড়ো গিয়ার, চেইন আর লিভার চলছে পাহাড়ের ভেতর।আর তারপরই চমকে উঠলো ওরা যখন দেখলো পাহাড়টার একটা অংশ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।অচিনদেবের একটা কথা মনে পড়লো হীরাভাইয়ের,‘এটা লক্ষ বছর আগে মানুষের উপাসনার মন্দির হিসাবে ব্যবহৃত হতো।তারপর দেবী পূর্বের বার্তাবাহককের মাধ্যমে এটা বন্ধ করে দেবার নির্দেশ দেন কোন কারনে।উপাসকদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু কেউ কেউ কোন না কোন মাধ্যমে জেনে যায় এর কথা।যুগে যুগে কিছু কিছু মানুষ এখানে এসেছে কিন্তু এর অবস্থান নির্নয় করতে পারেনি।’
এ যেন আলীবাবা চল্লিশ চোরের সেই চিচিং ফাঁক! পাহাড়ের দরজাটা হাট হয়ে খুলে গেছে।ঠিক তার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে অচিনদেব।একবার সে পেছনে ফিরে তাকালো।অন্ধকারে ঠিকমতো তাদের দেখতে পেল কিনা কে জানে, হাঁটা ধরলো ভেতরের দিকে।ওরা দেখতে পেল ভেতরটা আলোয় ভরে আছে।আলোর উৎসটা নির্নয় করা যাচ্ছেনা দুর থেকে।তিনজন পড়িমরি করে ছুট লাগালো।অচিনদেব হেঁটে ভেতরে চলে গেছে।তাকে আর দেখা যাচ্ছেনা।তিনজন প্রায় দৌড়ে পাহাড়ের দরজার কাছে এসে গেছে।তারপর তারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো।একি দেখছে! এ কোন জায়গা? অসম্ভব! এতো পৃথিবী হতেই পারেনা!এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কোনভাবেই পার্থিব নয়।কোনভাবেই নয়।এদিকের প্রকৃতি আর ওপাশের প্রকৃতির ভেতর আকাশ পাতাল ব্যবধান।এই বর্ননাতীত সৌন্দর্য ওদের সব ভুলিয়ে দিল।চেতনাবিনাশী এক অভিজ্ঞতা তাদের বিহ্বল করে দিল।কোন কিছু খেয়াল নেই ওদের।তিনজনই যেন কোন প্রতিবন্ধী এমনিভাবে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করলো।কি রূপ এই সৌন্দর্যের! কি আলোকচ্ছটা এই সৌন্দর্যের! অচিনদেব হেঁটে বিশাল উদ্যানের ভেতর চলে গেছে।তিনজন যেন কোন স্বপ্নের ঘোরে নিজেদের লুকানোর কথা ভুলে বসে আছে।হাঁটছে তো হাঁটছেই।কি বিশাল গাছ একেকটা!মনে হচ্ছে একেকটা গাছের বয়স হবে কয়েক লক্ষ বছর!কি বিশাল উদ্যান! একপাশ থেকে অন্যপাশ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছেনা।নীল আকাশ সরাসরি সবুজ উদ্যানে এসে মিলে গেছে।পার্থিব চোখে এমন দৃশ্য ধারন করা অসম্ভব।বাইরের শীতল বাতাস ওদের দেহে কাঁপ ধরিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এখানে তা নেই।বাতাসটা কি মোলায়েম যেন ফুসফুসের গোড়া পর্যন্ত পৌছে যাচ্ছে।মনের ভেতর অপূর্নতা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ওদের, যেন কোন চাওয়া ছিলনা কখনও।
অচিনদেব হাঁটছে তো হাঁটছেই।তার খুব কাছ থেকে তাকে অনুসরন করছে ওরা তিনজন।যতো সামনে যাচ্ছে তত আলোকচ্ছটা বাড়ছে।সামনে একটা নদী দেখা যাচ্ছে।কিংবা রুপোলি ফিতে।নদী এমন হয় ওদের জানা ছিলনা।এত স্বচ্ছ তার পানি যে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।মনে হচ্ছে পানি নয়, তরল কাঁচ গড়িয়ে যাচ্ছে।আর তার কি সুন্দর শব্দ!শুনলে অবিশ্বাস্য অপার্থিব মনে হয়।হঠাৎ অচিনদেব ফিরে এলো তাদের কাছে।তার চোখ জ্বলজ্বল করছে কি এক উত্তেজনায়।‘আমি এই সুর শুনেছিলাম।এই স্রোতধারার টুংটাং শব্দ।আর সেই শব্দের সাথে মিশে ছিল দেবীর কন্ঠস্বর।তারমানে এখান থেকেই আমার সাথে কথা বলতো দেবী।আমি তার অনেক কাছে চলে এসেছি! আমি তার অনেক কাছে চলে এসেছি!দেবী!আমার দেবী!’
অচিনদেব যেন তার সহ্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে এমনি আচরন করছে।তার চোখ বলছে সে আর ধারন করতে পারছেনা।একটা বিশাল মহীরূহ যখন কাটা হয়, হুড়মুড় করে পড়ে যাবার আগে সেটা যেমন একটু একটু নড়ে অচিনদেবকেও তেমনি মনে হচ্ছে।‘ওপাশেই আছে সেই প্রাসাদ!সেখান দিয়েই আসবে দেবী!আমার দেবী।তোমরা চলে যাও।’ বলেই সে হাঁটা ধরলো।নদী নামের রুপোলি ফিতের কাছে গিয়ে নিচু হয়ে আঁজলা ভরে তার পানি পান করলো।তারপর হেঁটে চলে গেল নদীর ভেতর দিয়ে।ওর দেখাদেখি ওরা তিনজন আঁজলা ভরে পানি মুখে দিল।দিয়েই স্তব্দ হয়ে গেল, কি পানি এটা? নাকি কোন ফ্রিজের ভেতর রাখা ঠান্ডা অমৃত সুধা!এক আঁজলা পানিতে তাদের সব তৃষ্না মিটে গেল।শরীরটা এতো হালকা হয়ে গেল মনে হলো এখন ইচ্ছে করলে না খেয়েও কতোদিন পার করে দিতে পারবে।
অচিনদেব পার হয়ে গেছে নদীটা।তাড়াতাড়ি ওরাও হেঁটে পেরিয়ে গেল।নদীর পর থেকে পথটা আরো মায়াময় আরও অপার্থিব।ঘাসগুলো এতোটা সুন্দর যে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে।কিছুদুর এগুতেই সাদা বাড়িটা দুর থেকে দেখতে পেল ওরা।এটা কোন বাড়ি নয়, দেখেই বোঝা যাচ্ছে হয় এমন অচেনা কোন ধাতু দিয়ে বানানো যা আলো ছড়াচ্ছে অথবা এটা কোন বাড়ি নয়, আলোর প্রাসাদ যা কেবল আলো দিয়ে বানানো হয়েছে।বাড়ির পেছনেই নীল আকাশটা যেন নেমে এসে ছুঁয়ে দিয়েছে সবুজ উদ্যানকে।প্রাসাদের দিকে প্রায় তাকানোই যাচ্ছেনা।ওরা যে পথটা দিয়ে এসেছে তা গাঢ় নীল পাথরের পথ ছিল, আর নদীর পর তা হয়েছে রূপালী। ফলে আলোর তীব্রতা আরও বেড়েছে।
‘এ কোথায় এলাম?’জাহিদ ফিসফিস করে বললো।‘আমি এখান থেকে কোনদিন যাবোনা।’
‘আমিও না।’ সুশীল বললো।
হীরাভাই কেবল চুপ।সে সম্ভবতঃ সব অনুভুতিকে নিজের ভেতর চাপা দিয়ে রাখতে চাইছে।জাহিদ বললো,‘ওইযে দেখ, অচিনদেব প্রাসাদের সামনে বসে পড়ছে।ও প্রার্থনা করছে।আমরা ওই পাথরটার পেছনে বসে পড়ি।’
তিনজন একছুটে পড়ে থাকা একটা বোল্ডারের পেছনে চলে এলো।সেটা আসলে কোন বোল্ডার নয়, একটা ঝরনার উৎপত্তিস্থল।ঝিরিঝিরি পানি গড়িয়ে পড়ার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।
বিশাল প্রাসাদের সামনে হাঁটুগেড়ে বসে আছে অচিনদেব।বোল্ডারের পেছন থেকে ওর দিকে তাকিয়ে আছে তিনজন।অচিনদেব তার হাতের তালুদুটো এক করে বুকের সামনে রেখে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতো প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে আছে।কিছুই ঘটছেনা।এক ঘন্টা পেরিয়ে গেল।একইভাবে বসে আছে অচিনদেব।দুই ঘন্টা পেরুলো।জাহিদ বিরক্ত হয়ে গেছে।সে বললো,‘দেবী মনে হয় সাজাগোজা করতেই ব্যস্ত।ভক্তের সাথে সেলফি তুলতে হবেনা?’
‘চুপ!’ হঠাৎ ঠান্ডা গলায় বললো হীরাভাই।‘শোনো!’
সত্যি!শোনা যাচ্ছে কিছুর শব্দ।মনে হচ্ছে শত শত সেনাদল ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে কোন প্রান্তরের বুকে! তীব্র বাতাসের গর্জনের মতো সেই শব্দ।হ্যাঁ বাতাসের গতি বেড়েছে।গাছপালাগুলো নুয়ে পড়ছে বাতাসে।আকাশের নীল রঙ বদলে যাচ্ছে।ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে।বোল্ডারের ওপর মাথা রেখে তারা তাকিয়ে আছে প্রাসাদের দিকে। প্রাসাদটা যেন আরো উজ্জল হয়ে উঠেছে।সেই সাথে শব্দের মাত্রা বাড়ছে।মনে হচ্ছে ঘোড়া ছুটিয়ে সৈন্যদল খুব কাছে চলে এসেছে।ওরা দেখলো প্রার্থনা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছে অচিনদেব, খুব ধীরে সোজা হচ্ছে।ও বুঝে গেছে কিছু একটা ঘটতে চলেছে এখনই।জীবনের হয়তঃ শেষ সীমার কাছেই ওর অবস্থান এখন।সেই প্রস্তুতি নেয়াও শেষ।প্রার্থনার ভংগি থেকেই ও দু’হাত শরীরের দু’পাশে বাড়িয়ে দিল যেন প্রিয় কাউকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছে।
আকস্মাৎ সব শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।পৃথিবীর গতি যেন থেমে গেল।ঘড়ির কাঁটা থেমে গেল ওদের।শরীরের শার্টের বোতামগুলো ফটফট করে ছিঁড়ে চলে গেল।পরনের প্যান্টগুলো টুকরো টুকরো হয়ে গেল।হীরাভাইয়ের চশমা চুর্নবিচুর্ন হয়ে গেল। তিনজনের মাথার চুলগুলো বাতাসের টানে ছিঁড়ে চলে গেল। পায়ের জুতো গলে গেল।তারপরই আলোর প্রাসাদের বিশাল তোরনের নিচে এসে দাঁড়ালেন দেবী!
এক সেকেন্ডের শত কোটি ভাগের এক ভাগ সময়ের জন্য তিন জন দেখতে পেল তাকে।সৌন্দর্যের দেবী ডোরিনিয়াকে।সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সময়ের ভেতর দেখলো মানব ইন্দ্রিয়ের গ্রাহ্যসীমার বাইরের সেই রূপবতীকে যা কোন মানুষ কোনদিনে কল্পনাও করতে পারেনি।সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সময়ের ভেতর তার অচিন্তনীয় শারিরিক রূপের ঝলক দেখলো তারা যা কোন মানব চোখের জন্য বানানো হয়নি।দেখলো অচিনদেব বাতাসে মিশে যাচ্ছে।দেবী তাকিয়ে আছেন তাদের দিকে, মুখে হাসি।আর তারপরই গলে গেল তাদের চোখ, কান।ঠোঁটগুলো গলে গেল, হারালো কথা বলার ক্ষমতা।মাথার কঠিন আবরন গলে গেল।চামড়া পুড়ে গেল দেবীর রূপের তীব্র আলোতে।তাদের সবক’টা ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা হারিয়ে গেল চিরতরে।
বোকার মতো তারা দেবীকে দেখতে এসেছিল।তারা এই সত্যটাকে উপলব্ধি করতে পারেনি যে দেবীর স্বরূপ সহ্য করার মতো শক্তি মানব ইন্দ্রিয়ের থাকতে পারেনা।তারা পড়ে গেল মাটিতে।তারা পুরোপুরি মারা যায়নি তখনও, হয়ত মারা যাবেওনা আর কোনদিন তবে তখন তাদের আর মানুষ বলা যাবেনা।তারা পরিনত হয়েছে তিনটুকরো সাদা পাথরে।অচিনদেব নেই।সে বাতাসে মিশে গেছে।দেবী তাকে গ্রহন করেছেন কিংবা তার অমরত্বের অবসান ঘটেছে।পাহাড়ের বিশাল দরজাটা একা একাই বন্ধ হয়ে যায় যেন কোনদিন সেখানে কোন দরজাই ছিলনা।
সমাপ্ত

দেবী..................তুহিন রহমান

দেবী..................তুহিন রহমান
(প্রচ্ছদের ছবিতে মডেল হয়েছেন কোলকাতার ভ্রমন লেখিকা সেমন্তী ঘোষ)

 
এক
দীর্ঘ সময় নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিল সুশীল, তারপর তাকালো জাহিদের দিকে।‘আমার মনে হয় তুই ঠিক ব্যপারটা বিশ্বাস করতে পারিসনি। এটা জাস্ট ম্যাগাজিন এর কোন পপ আর্টিকেল নয় যে ওরা পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্যই লিখেছে।’
‘তাহলে তুই কি মনে করিস ব্যপারটা ঠিক?’ সুশীলের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো জাহিদ।
‘আমার বিশ্বাসে কিছুই যায় আসেনা।যে লিখেছে সেই লেখককে আমি বিশ্বাস করি কারন উনি আমার পরিচিত।উনি এমন কিছু লিখবেন না যা কেবলই ফিকশন, আমি মনে করি অবশ্যই এর পেছনে কোন সত্য আছে।’
জাহিদ পত্রিকাটার পৃষ্ঠা ওল্টালো। সাপ্তাহিক ঘটনাক্রম। বাপের জন্মে পত্রিকার নামটাও শোনেনি ও। এমন পত্রিকা মনে হয়না এক হাজার কপি বিক্রি হয়।সুশীলের ধারনা এই পত্রিকার লেখক যা লিখেছে তা একেবারে সত্যি।অবশ্য এর পেছনে সুশীলের ধর্ম বিশ্বাসও কাজ করেছে।কোন মানুষ এতোদিন বাঁচে এটা একেবারে অবিশ্বাস্য।হতে পারে লেখক গাঁজায় দম দিয়ে লিখেছে বা কোন ভারতীয় পত্রিকার নকল।হঠাৎ মুখ তুললো জাহিদ,‘আচ্ছা একটা কাজ করলে কেমন হয়?’
‘বল?’
‘আমরা লেখকের সাথে দেখা করি।’
‘কে, মানবদরদী?’
‘এটা কি ওর আসল নাম?’
‘এই নামেই সে অনেক পরিচিত।আমি তাকে চিনি এই নামে। ডাকি দরদী ভাই নামে।’সুশীল বললো,‘তবে তার আসলে নাম কি তা জিজ্ঞেস করিনি কোনদিন।’
‘চল কালই দেখা করি।তাহলে বোঝা যাবে ঠিক নাকি বেঠিক।কাল তো শুক্রবার।ছুটির দিন।বাড়িতে থাকবে আশাকরি।’
সুশীল একটু চিন্তা করে বললো,‘ঠিক আছে, তার তো কোন ফোন নাম্বার আমার কাছে নেই।সরাসরি যেতে হবে তার ডেরায়।ভাগ্য ভাল থাকলে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে।আর না থাকলে ফিরে আসতে হবে।’
‘আমার কোন সমস্যা নেই।’জাহিদ বললো,‘এমন এক গল্প শোনালি যে আমার আর উপায় নেই তার সাথে দেখা না করে।কথায় বলেনা কুকুর মরে কৌতুহলে!’
দু’জন হেসে উঠলো হাঃ হাঃ করে।
----------------------------------------++++-----------------------------------------
সত্যিই বলেছিল জাহিদ। কুকুর মরে কৌতুহলে।এটা বোঝা গেল যখন ওরা মিরপুরে পৌছালো। এমন এক জায়গা যেখানে কাদা ভেঙে যাওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই।ক’দিন আগে বৃষ্টি হয়েছিল, মানুষ চলাচল করতে করতে এখন পাঁকের রূপ নিয়েছে।যেতে যদি হয় তবে জুতো মাথায় তুলে যেতে হবে।আশেপাশে গাছপালাও প্রচুর।মশার আড়তখানা।জাহিদ জিজ্ঞেস করে,‘তুই তো নিশ্চিত এখানে পাওয়া যাবে তাকে?কারন এই কাদা মাড়িয়ে তার বাড়িতে গিয়ে যদি তাকে পাওয়া না যায় তবে এই পা নিয়ে আর ফিরতি পথে আসতে পারবো না।’
সুশীল বলে,‘তুই আল্লাহর নাম নে আর আমি ভগবানের নাম নিই, এছাড়া আর কোন পথ নেই আমার।’
দু’জন স্রষ্ঠার নাম জপতে জপতে কাদার ভেতর নেমে পড়ে। যতোটা ভেবেছিল তেমন পাঁক নয়।পা বড়োজোর গাঁট পর্যন্ত দেবে যাচ্ছে।তবে বেশী খারাপ কাদার দুর্গন্ধটা।মনে হচ্ছে একেবারে পেট পর্যন্ত ঢুকে যাচ্ছে।স্রষ্ঠার নাম নিয়ে ভালোই করেছিল ওরা।বাড়িতেই পাওয়া গেল মানবদরদীকে।একেবারে বুড়ো লোক।খেতে পরতে পায়না বলেই মনে হয়।জীর্নশীর্ন চেহারা।যে শার্টটা গায়ে দিয়েছে সেটা গা থেকে নেমে যেতে চাইছে।এইমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে তার ছাপ স্পষ্ট তার চোখে মুখে।খুব বেশী সিগারেট খাওয়ায় কালো হয়ে গেছে তার ঠোঁট তবে দাঁতগুলো সাদা, পান খায়না সে বোঝা যায়।সুশীলকে দেখে মনে হয় হয় খুশী হলো।হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো।সুশীল বললো,‘দাদা,আপনার সাথে কথা আছে,সময় নিয়ে বলতে হবে।কোথাও বসা যাবে?’
‘হ্যাঁ বসা যাবে মানে, থাকতে চাইলেও দেয়া যাবে।’ মানবদরদী বললো।‘এসো এসো বাড়ির ভেতর এসো।’
সুশীল হেসে বললো,‘তার আগে পা ধুতে হবে দাদা।’
বাড়ির বাইরেটা দেখে দু’জন ভেবে বসেছিল লোকটা অর্ধমৃত।খেতে পরতে পায়না, কোনমতে লেখালিখি করে সংসার চালায়।তাদের ভুল ভাংলো ঘরের ভেতর ঢুকে।আরে!এই লোকতো রীতিমতো ধনী লোক! কি জৌলুস বাড়ির!ড্রইংরূমটাকে বলা যায় রাজকীয়।একা থাকে, সম্ভবত বিয়ে টিয়ে কিছু করেনি।করলেও তার পরিবার এখানে থাকেনা।এই বয়সী একজন মানুষ যদি বিয়ে করে থাকে তবে তার নাতিপুতীর ভারে বাড়িঘর গমগম করার কথা।তা করছেনা, বরং পুরো বাড়ি শান্ত, বলা যায় গোটা বাড়িতে পিন ড্রপ সাইলেন্স।
মানবদরদী ইশারা করলো বসতে।দু’জন দামী সোফার দু’প্রান্তে বসলো।মানবদরদী জোর গলায় ডাকলো,‘রাজু?’
বাড়ির ভেতর থেকে কাজের একটা লোক ছুটে এলো।এই লোকটাও বুড়ো মতো তবে জীর্ন হাতের পেশীবাহুল্য দেখে বোঝা যায় অনেক কাজে সে পটু।মানবদরদী তার দিতে না তাকিয়েই বললো,‘রাজু, ভাইয়েরা এসেছে, কেক, পরোঠা আর ডিমপোচের ব্যবস্থা কর।আর হ্যাঁ, লাল চা দিবি, সুশীল আবার লাল চা ছাড়া খায়না।আশাকরি তার বন্ধুও তার মতো হবে।’
সুশীল অবাক হয়ে বললো,‘দাদা কিকরে বুঝলেন আমি লাল চা ছাড়া খাইনা?’
মানবদরদী হেসে বললো,‘আমি আমার মাথাটাকে তথ্যকেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করি।কারো সাথে মিশলে তার সব তথ্য আমি এই মাথার ভেতর ভরে রেখে দেই যাতে ভবিষ্যতে তার সাথে আবার দেখা হলে নতুন করে তার কাছে জিজ্ঞেস করে কিছু জানতে না হয়।’
‘জাস্ট ওয়াও!’ সুশীল অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মানবদরদীর দিকে।‘আমার সাথে আপনার বোধহয় বছর দুয়েক আগে একবার দেখা হয়েছিল।আপনি সেই তথ্যও আপনার ব্রেনে ভরে রেখে দিয়েছেন? শুনেছি লেখকরা মাথায় কিছু রাখতে পারেনা, একটু উদাসিন স্বভাবের হয়।আপনি তো উল্টো!’
‘হ্যাঁ, তা হয় বৈকি,’মানবদরদী বললো।‘তবে আমার ব্যপারটা ভিন্ন।আমাকে শুধু এই ঘটনা নয়, অনেক ঘটনাই ব্রেনের ভেতর রেখে দিতে হয়েছে।এবং প্রয়োজনে এসব তথ্য আমাকে ব্যবহারও করতে হয়েছে নিজের স্বার্থে।আচ্ছা এবার বলো কি এমন গুরুত্বপূর্ন কথা যার জন্য এতো সকাল সকাল এই কাদা মাড়িয়ে আমার বাড়িতে আগমন।’
‘তবে তার আগে আপনার নাম নিয়ে কিছু জিজ্ঞাস্য ছিল।’ সুশীল বললো,‘আপনার আসল নামটা যদি বলতেন তবে কষ্ট করে এমন দাঁত ভাঙা নামে ডাকতে হতোনা। তাছাড়া নাম দিয়ে অনেক কিছুই আমরা বুঝি যেমন সে কোন ধর্মের মানুষ, কোন স্বভাবের মানুষ ইত্যাদি।আপনার মানবদরদী নামটা একটা ছদ্মনাম।আশাকরি আমাদের কাছে আপনার আসল নামটা বলবেন।’
মানবদরদী হেসে বললো,‘তুমি আর আমি একই লাইনের লোক তাই এই নামে চেন। আমার এলাকার সবাই আমাকে চেনে হীরাভাই নামে।যারা আমার লেখা পড়ে তারা মানবদরদী নামে চেনে।আমি এই দুটো শ্রেনীকে ভাগ করে রেখেছি।তুমি তোমার জানা নাম দিয়ে আমার এলাকায় আমাকে খুঁজে বের করতে পারবেনা।এটাই হলো আমার নামের মাহাত্ম।’ 
হীরাভাই হাঃ হাঃ করে হাসলেন।তার হাসিতে যোগ দিল সুশীল আর জাহিদ।হাসি থামলে হীরাভাই বললেন,‘এবার বলো কি জানতে চাও।’
রাজু নামের বুড়োটা খাবারের ট্রে নিয়ে এলো, আবার আসল কথায় বিঘ্ন ঘটলো। হীরাভাই বললো,‘এসো খেতে খেতে কথা বলি।’
সুশীল একটা কামড় দিল কেকে।তারপর তাকালো হীরাভাইয়ের দিকে।‘গতকাল আমি সাপ্তাহিক ঘটনাক্রমে আপনার লেখা অমর রত্ন লেখাটা পড়ছিলাম….।’
হীরাভাই মাঝপথে হাত তুললো, বুঝে ফেলেছে সুশীল কি বলতে চায়।চায়ের কাপে দীর্ঘ একটা চুমুক দিয়ে সাপপেন্সটাকে মনে হয় জমতে দিল তারপর কাপটা নামিয়ে রেখে বললো, ‘বুঝেছি সেই অচিনদেবের ঘটনাটা তো? আমি ভেবেছিলাম এসব পত্রিকার লেখা কেউ পড়েনা।দেখছি আমার ভাবনাটা ভুল ছিল।আসলে কোন পত্রিকা চলে আর কোন পত্রিকা চলেনা এটা আমি ভাবিনি কখনও।আমি ঘটনাটা শুধু প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম।এবং এখন দেখছি রীতিমতো পাঠক জমিয়ে ফেলেছি!’
‘আসলে এটা এমন একটা ঘটনা যেটা পাঠক কখনও ভুলে যেতে পারবেনা।আমি নিজেও বুঝতে পারিনি এটা কি ফিকশন নাকি সত্যি ঘটনা।’
‘এটা কোন মিথ নয়।একেবারে সত্যি।’চায়ের কাপে আবার চুমুক দিল হীরাভাই।অচিনদেবের ঘটনাটা একেবারে সত্যি।তবে ও যা আমাকে বলেছিল সেটা ঠিক কি বেঠিক তা বিচার করার দায়িত্ব আমার নয়।ভারতের উনত্রিশটি প্রদেশের ভেতর সাতাশটাতেই আমার ঘোরা শেষ।একেবারে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সবকিছু এখন আমার নখদর্পনে।অচিনদেবের ঘটনাটা ছিল নৈনিতালের একটা ঘটনা মানে উত্তরাখন্ডের।সে তো দাবী করে তার বয়স এখন এগারোশো তিয়াত্তর।’
‘মাইগড!আপনি তো লিখেছেন সে দাবী করে চারশো বছর।’
‘চারশো হলেও কথা ছিল।ওটা আমি লিখেছি যাতে কিছুটা হলেও বিশ্বাসযোগ্য হয় কথাটা।কিন্তু এগারোশো বছর তো কাউন্ট ড্রাকুলাও বেঁচে ছিলনা বলেই জানি।তোমরা যতোটুকু ম্যাগাজিনে পড়েছ ঠিক ততোটুকুই আমি জানি।অচিনদেব তার নাম নাকি আমার মতো কোন ছদ্মনাম সে ব্যবহার করে তা জানা নেই আমার তবে তাকে দেখলে তোমার বড়োজোর বছর চল্লিশেক মনে হবে।তেমন হাসিখুশি নয় মোটেও।তার চালচলন দেখলে তোমার মনে হবে কোন বুড়ো।কথাবার্তা তো আরও গম্ভীর আর অভিজ্ঞতায় ঠাসা।’ চা খাওয়া শেষ।হীরা ভাই একটা সিগারেট ধরালেন।মুখভর্তি ধোঁয়া উঠে যেতে দিলেন কড়িকাঠের দিকে।‘তোমার মনে হবে কোন একটা বুড়ো বুঝি এই লোকটার ভেতর বাসা বেঁধে আছে।কি নেই লোকটার ঝুলিতে! একেবারে সেই হাজার বছর আগের পুরোনো সব কথা।শুনতে শুনতে তোমার কান পচে যাবে। সেই মুঘল আমলের কথা, বাবর যখন ভারতবর্ষে এলো কিভাবে শাসন করতো দেশ।তার ছেলে হুমায়ুন তার ভাষায় বেশ কিছুটা অত্যাচারী ছিল।সে সেই সময় হুমায়ুনের কাছে কিছু টাকার জন্য গিয়েছিল কিন্তু হুমায়ুন নাকি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।দান খয়রাত করার তার কোন ইচ্ছাই ছিলনা।তারপর আকবর এল।এল জাহাঙ্গীর।এই লোকটা কিছুটা দান খয়রাত করতেন।অচিনদেবকে কিছু টাকা দিয়েছিলেন তিনি ব্যবসা করার জন্য।তারপর শাহজাহান যখন আগ্রার তাজমহল বানালেন সেখানে সে কি এক কাজ পেয়েছিল।এরপর আর ভারতবর্ষে থাকবেনা বলে নিয়ত করে অচিনদেব।চলে আসে ইউরোপে।সেখানে সবেমাত্র রেনেসাঁর অভ্যুদ্দয় হয়েছে।মানুষজন জ্ঞানবিজ্ঞানে পারদর্শিতা লাভ করছে, হয়েছে মধ্যযুগীয় সভ্যতার পতন।ইউরোপের নানা দেশে সে কাটিয়ে দেয় প্রায় দুশো বছর।জীবনে বিয়ে করবেনা বলে পরিকল্পনা করেছিল।তবে একবার বিয়ে করেছিল মাত্র দেড়শো বছর বয়সে।সেই বৌ মারা যাবার পর আর বিয়ে করেনি।কেনই বা করবে? কয়জনকেই বা করবে? হাজার বছরের জীবনে বৌতো বাঁচবে বেশী হলে ষাট সত্তর বছর।তারপর আবার বিয়ে করতে হবে, এবং আবারও।আর এভাবে প্রতি সংসারে সে জন্ম দিতে থাকবে একের পর এক সন্তান।এভাবে তার সন্তানের চাপেই সমাজ যদি নুয়ে পড়ে বাকি মানুষরা কি করবে।এটাও তার একটা ভাবনার বিষয় ছিল।যতো বয়স বাড়ে মানুষের অভিজ্ঞতাও বাড়ে।দেখা যায় একটা মানুষের বয়স যখন আশি বছর হয় তখন সে অভিজ্ঞতার কারনেই অনেকটা নুব্জ হয়ে যায়।আর এই হাজার বছরের জীবনে অচিনদেব এতোটাই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যে মাঝে মাঝে তার অভিজ্ঞতা কাউকে না কাউকে বলতে হয়। তার অভিজ্ঞতা কাউকে বলতে না পারলে সে বুকফাটা কষ্টে থাকে এবং মাঝে মাঝে আত্মহত্যার বিষয়টাও মাথায় আসে।এবং আত্মহত্যার চেষ্টাও সে করে কিন্তু মরতে পারেনা।যতোবারই মারা যাবার চেষ্টা করে ততোবারই সে বেঁচে যায়।কারন তার মৃত্যু নেই। সে অমর।’
‘অসম্ভব।’ মাঝপথে বলে ওঠে জাহিদ।এতোক্ষন চুপ করে সে শুনছিল হীরাভাইয়ের কথা।থাকতে না পেরে সে প্রায় চিৎকার করে ওঠে।‘এটা কিভাবে হয়? পৃথিবীতে কোন কিছুই অমর নয়।এটা প্রকৃতি কিছুতেই হতে দেবেনা।অবিনশ্বর বলে কোন কিছু নেই পৃথিবীতে।’
‘হতে পারে এটা আমাদের একান্ত নিজের ধারনা।’হীরাভাই তাকান জাহিদের দিকে।মনে হচ্ছে ব্যাঙ্গ করছেন তাকে।‘একজন মানুষ যদি অমর হয় তবে তুমি কিভাবে তা জানতে পারবে? ধরো তোমার পাশের বাসার একজন মানুষ একশো বছর বেঁচে আছেন কিন্তু তুমি তো একশো বছর বেঁচে থাকলেনা।তোমার ছেলে তো বিষয়টা জানলোনা।তোমার নাতিও বিষয়টা জানলোনা যে এই লোকটা তার দাদার সময় থেকে বেঁচে আছে।তার সমসাময়িক কেউ যদি বেঁচে থাকে তবেই না বিষয়টা প্রচার পায়। ধরো এখন যদি টিপু সুলতানের সময়কার কেউ একজন বেঁচে থাকে তবে কি আমরা জানতে পারবো? কিভাবে জানবো? সে যদি বিয়ে না করে এবং তার কোন ছেলে মেয়ে না থাকে এবং তাকে যদি চল্লিশ বছর বয়সের মতো মনে হয় তবে কার বাপের সাধ্য তার আসল বয়স জানে?আছে কোন যুক্তি?’
জাহিদ মাথা নাড়ে।তার মাথায় কোন যুক্তি আসছেনা।‘তবে এটা একেবারে গাঁজাখুরী হয়ে গেলনা যে একটা মানুষ বলা নেই কওয়া নেই একেবারে এগারোশো বছর বেঁচে রইলো?আপনার কি মনে হয়নি লোকটা মস্ত একটা চাপাবাজ?’
হীরাভাই লম্বা করে টান দিলেন সিগারেটে।তার অভিব্যক্তি অনেকটা শার্লক হোমসের মতো শীতল বলে মনে হলো জাহিদের কাছে।দেখে মনে হচ্ছে একেবারে বিশ্বাস করে বসে আছেন তিনি অচিনদেবকে।মাথা নাড়লেন ধীর গতিতে,‘আচ্ছা,’অবশেষে বললেন,‘আমি যদি এই এলাকার কোন মানুষকে বলি আমি একজন লেখক, আর তোমরা আমার লেখা পড়ে ঢাকার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে এসেছ তাহলে মানুষ হাসবে।বিশ্বাস করবেনা তোমাদের কথা।কারন তারা জানে হীরাভাইয়ের অনেক টাকা।তিনি রাতদিন পড়ে পড়ে ঘুমোয় আর সন্ধ্যা হলে প্রভাতী সঙ্ঘে গিয়ে তাস পেটায়।কোনদিন কেউ জানেও না যে মানবদরদী নামে যে লেখকটা তিনি হলেন এই হীরাভাই।তোমরা যতোই বলোনা তারা বিশ্বাস করবেনা।তাহলে কোনটা ঠিক?তাদের কথা নাকি তোমাদের কথা?জবাব দাও?’
সুশীল জাহিদের দিকে আড়চোখে তাকালো।কিছুটা অনুনয়ের ভাব তার চোখে।তার এই দৃষ্টিটা চেনা আছে জাহিদের।তাকে আর এগুতে নিষেধ করছে।জাহিদ চুপ করে রইলো।তাকে চুপ করে থাকতে দেখে হীরাভাই বললো,‘বিশ্বাস হলো সেটাই যা তুমি দেখ।যা অদৃশ্য তা তুমি বিশ্বাস করতে চাওনা।এই একটা কারনে বহু মানুষ নাস্তিক হয়ে যায়।এবং সেই একই কারনে আমি তাকে বিশ্বাস করবো।’
সুশীল চোখ বড়ো বড়ো করে বললো,‘তারমানে আপনি তাকে এখনও বিশ্বাস করতে পারেননি তাইতো?’
‘ঠিক তাই।তবে করবো।’ হীরা ভাই সিগারেট টানছেন ঘনঘন।‘আসল কথাটা তো বলা হয়নি।অচিনদেবের সাথে দেখা হয়েছিল আজ থেকে তেতাল্লিশ বছর আগে,যখন আমার বয়স মাত্র আঠারো কি বিশ বছর।তখনই তার বয়স দেখাচ্ছিল চল্লিশ।এখন যদি তার সাথে আমার দেখা হয় আর সে যদি আগের মতোই থাকে তবে ভাববো সে সত্যি কথাই বলছে।’
বোমা ফাটলো ঘরের ভেতর।চমকে গেল দু’জন।সুশীল আর জাহিদ দু’জনেই সোজা হয়ে বসেছে।‘তারমানে আপনি তার সাথে দেখা করবেন?’ সুশীল উৎসাহে ঝুঁকে পড়েছে একেবারে।
মৃদু হাসলেন হীরাভাই,‘কেন যেতে চাও নাকি অচিনদেবের সাথে দেখা করতে?’ 
‘যেতে চাই মানে!’লাফিয়ে উঠলো সুশীল।‘গল্পটা পড়ার সময়ই আমার ইচ্ছে হচ্ছিল লোকটার সাথে যদি দেখা করতে।আর এই ঘটনা আমার জীবনের সেরা একটা ঘটনা।আমি এর প্রতিটি ঘটনা ভিডিও ধারন করে রাখতে চাই।হোক সে মিথ্যে বা মায়াজালে ঘেরা।এমন একটা ঘটনা ইউটিউবে ছাড়লে তো হাজার হাজার সাবসক্রাইবার জুটবে নিশ্চিত।’
‘আমিও যাবো।’ জাহিদ হালকা গলায় বললো।‘আমি কখনও এর আগে ইন্ডিয়া যাইনি।তুই যদি যাস আমি যাবো।’
সিগারেটটা এ্যাশট্রেতে চেপে নিভিয়ে দিলেন হীরাভাই।বললেন,‘আমার হাতে তো বেশী সময় নেই।আমি আগামী সপ্তাহেই যেতে চাই।তোমাদের ভিসা কি করা আছে?’
সুশীল বললো,‘আমি তো প্রায়ই ইন্ডিয়া যাই।আমার ভিসা আছে সাত মাসের।জাহিদের অবশ্য পাসপোর্ট আছে কিন্তু ভিসা নেই। সেটা আমি ব্যবস্থা করে নিতে পারবো তিনদিনের ভেতর।’

দুই
প্লেন কোলকাতায় নামার আগে একটাও কথা বলেননি হীরা ভাই। প্লেন ল্যান্ড করতেই তিনি বললেন,‘আমার একটা অভ্যাস আছে। প্লেন আকাশে থাকলে আমি কোন কথা বলতে পারিনা। মাটির সাথেই আমার বন্ধুত্ব। আকাশের সাথে নয়।’ বলে হাঃ হাঃ করে হাসলেন তিনি। অবশ্য তার হাসিতে যোগ দিলনা বাকি দু’জন। সুশীল তো সেই প্লেনে ওঠার সময় থেকেই ভিডিও করে চলেছে তার মোবাইলে। এরজন্য মোবাইলের ওটিজি কেবল, কয়েকটা পেন ড্রাইভ নিয়ে এসেছে সাথে।
কোলকাতায় প্লেন একঘন্টার যাত্রা বিরতি। এই এক ঘন্টায় এ পর্যন্ত করা ভিডিওগুলো নিজের গুগল ড্রাইভে আপলোড করে নিল সুশীল। এয়ারপোর্টের ওয়াইফাই বেশ ভালো স্ট্রিমিং করে।এর মধ্যেই তিনজন কিছুটা খাবার খেয়ে নিয়ে পরবর্তী যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিল। এবার একটু লম্বা যাত্রা।কোলকাতা থেকে দেরাদুন এয়ারপোর্ট প্রায় সাড়ে সাত ঘন্টার উড্ডয়ন পথ।
দেরাদুন পৌছুতে পৌছুতে প্রায় রাত হয়ে গেল। সুশীলের মোবাইলের চার্জ শেষ হওয়াতে তাকে আপাতত ভিডিও করা বন্ধ করতে হয়েছে।দেরাদুনে বেশ ঠান্ডা মনে হলো সবারই।হীরাভাই বললেন,‘জায়গাটা হিমালয়ের পাদদেশে তাই এখানে বছরের সবসময়ই ঠান্ডা থাকে।আর এখানে যেসব পশুপাখি দেখতে পাওয়া যায় তা গোটা ভারতবর্ষে পাওয়া যায়না।তোমরা তো জিম করবেটের নাম শুনেছো।তার জন্মস্থান হলো এই উত্তরাখন্ড মানে নৈনিতাল। উনি খুব বড়ো মাপের শিকারী ছিলেন।এখানকার গাড়োয়াল, নৈনিতাল, কুমায়ুন, রুদ্রপ্রয়াগ, চম্পাবত এসব এলাকার নানা জায়গায় বাঘ শিকারের কাহিনী রয়েছে মানুষের মুখে মুখে।ছোটবেলা থেকে এসব কাহিনীর ভক্ত ছিলাম আমি।আর তাই দিল্লীর পরই তালিকায় রেখেছিলাম উত্তরাখন্ডকে।আর এখানে ভারতের সবচেয়ে ভালো আলুর ফলন হয়ে থাকে।এখানকার দৃশ্যও অসাধারন।আরও বড়ো তথ্য হলো এখানে অনেক মন্দির আছে, প্রচুর তীর্থযাত্রী প্রতি বছর এখানে আসে।অচিনদেবের সাথে দেখা করতে হলে আমাদের অনেক হাঁটাপথ পেরিয়ে যেতে হবে।আশা করি তোমরা মানসিক ও শারিরিকভাবে প্রস্তুত আছো।’
দু’নেই ঘাড় বাঁকা করে হ্যাঁ বাচক জবাব দিল।
রাতটা দেরাদুনের নামকরা একটা হোটেলে কাটালো ওরা।সেরাতেও গল্পের আসর বসালো হীরাভাই।ইন্ডিয়ার কোথায় কি আছে না আছে, কোথায় কোন রেস্তোরাঁয় কি খাবার পাওয়া যায়, আসলে দিল্লীর লাড্ডু বলতে কি বোঝায় ইত্যাদি নানা গল্প।পরের দিন সকালে দেরাদুন থেকে একটা ট্যাক্সি নিল হীরা ভাই। যেতে হবে নৈনিতাল পর্যন্ত।সেখানে পৌছুতেই বিকেল হয়ে গেলে হীরাভাই আবারও যাত্রা বিরতির ঘোষনা দিল।নৈনিতালে আরও একরাত।এই রাতে হীরাভাই কঠিন কিছু ভুতের গল্পের ঝুপি খুলে বসলো।জিম করবেটের কোন বইতে মাথা কাটা এক শ্রমিকের লাশ পড়েছিল ট্রেন লাইনের ওপর আর চাঁদের আলোতে সেই কাটা মাথা কিভাবে শিকারীর দিকে ঘুরে যাচ্ছিল তার গল্প, জনি চেকব নামে আরেক শিকারীর ভুত শিকারের গল্প, কতো যে শিউরে ওঠা গল্প জানে লোকটা কে জানে।
পরদিন সকালে নাস্তা করে আবার ট্যাক্সিতে চেপে যাত্রা শুরু হলো।হীরাভাই বললো, ‘এবার আমরা শহরের শেষ প্রান্তে চলে যাবো।আর বলতে পারো সেটাই সভ্যতার শেষ সীমানা।এরপর শুধু হাঁটা পথ।পাহাড়, উপত্যকা, চড়াই উৎরাই আর মেঠো ঘাস বিছানো জঙুলে পথ।’
ভেতরে ভেতরে দমে গেলেও জাহিদ বাইরে থেকে বুঝতে দিলনা যে কিছুটা চিন্তিত।এর আগে সে দেশের বাইরে আসেনি।এবারেই প্রথম তাই একটু ভয় ভয় ভাব আছে তার আচরনে।সুশীল কিছুক্ষন পরপরই ভিডিও করছে।কিছু ভিডিওতে সে নিজের ভয়েসও দিচ্ছে।তারা কোথায় যাচ্ছে না যাচ্ছে সব তুলে রাখছে ভিডিওতে। এমনকি অচিনদেবের বয়স, কতো বছর ধরে সে কি কি করে বেড়িয়েছে পৃথিবীর বুকে যা যা হীরাভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছে সব বলছে সে ভিডিওতে।
‘তেতাল্লিশ বছর অনেকটা সময়।’ হীরাভাই বললো,‘আমি অনেক দৃশ্যই এখন মনে করতে পারছিনা।ঠিক কোনখানে গিয়ে এই পথটা দু’ভাগ হয়ে একটা কুমায়ুনের পথে আরেকটা গাড়োয়ালের পথে গেছে এটা নিয়ে আমি এখন কনফিউজড।’ তারপরও ট্যাক্সি ওদেরকে সঠিক জায়গাতেই নামালো।ট্যাক্সিভাড়া দিয়ে ওরা একটা রাস্তার মাথায় দাঁড়ালো।তখন সুর্য্য একেবারে মধ্যগগনে।‘মনে পড়ছে এটাই সেই জায়গা যেখানে এসে সে আমাকে বিদায় জানিয়েছিল।এখান থেকে তার ডেরায় যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে রাত নামার কথা। একটু দ্রুত হাঁটতে হবে তোমাদের কারন এখানকার জঙ্গলগুলোতে বাঘ থাকে।’
বাঘের কথায় ওরা প্রায় দৌড়ুলো হীরাভাইয়ের পিছনে।শুরু হলো কষ্টের রাস্তা।প্রথমে কাঁটানটে বেছানো গ্রামের পথ, তার দুই মাইল পরেই শুরু হয়ে গেছে পাহাড়ী উঁচু নিচু টিলা টক্কর।এখানকার মাটির রঙ লাল আর সাদা মেশানো।জঙ্গলগুলোও অচেনা গাছ গাছালীতে ভরা।তবে যেদিকে তাকানো যাকনা কেন শুধু শুন্যতা আর শুন্যতা।কোন মানব বসতি নেই।সভ্যতা যেন শেষ হয়ে গেছে হাইওয়ে থেকে এদিকটায় নামার পর পরই।দুই ঘন্টা পর একটা চিকন নদীর কাছে এসে পৌছুলো ওরা।তবে নদী না বলে নালাই বলা ভালো।হাঁটু পর্যন্ত স্বচ্ছ পানি পেরুতে তেমন বেগ পেতে হলোনা ওদের কারোই।নদীর পর গভীর জঙ্গলের দেখা মিললো।এসব জঙ্গলের ভেতর জিম করবেট হয়তঃ একসময় বাঘ শিকার করে বেড়াতো কে জানে।এখানকার জঙ্গলগুলো মূলত শীতকালীন বর্গীয় অঞ্চলের বৃক্ষ দ্বারা পরিপূর্ন ।ইউক্যালিপটাস, বার্চ, পাইন এসব গাছই বেশী বনগুলোর ভেতর। দুপুর তিনটার পর আবার পাহাড়ের দেখা মিললো।তবে এবার পাহাড়গুলো বেশ উঁচু এবং একটার সাথে একটা গায়ে গা লাগানো।হীরা ভাই বললো,‘আমার ব্রেন যদি ঠিক থাকে তবে আমি জায়গামতো এসে পড়েছি।’
জাহিদ জিজ্ঞেস করলো,‘আচ্ছা সে এমন দুর্গম অঞ্চলে কেন থাকে? সে ইচ্ছে করলে তো শহরে গিয়ে থাকতে পারতো।’
হীরাভাইয়ের জবাব দেয়ার আগেই পেছন থেকে কে যেন বললো,‘কারন সে সকলের চেয়ে আলাদা তাই।’
ওরা তিনজনই এমন চমকে উঠেছিল যে আরেকটু হলেই চিৎকার করে উঠতো। সুশীল আর জাহিদ দৌড়ে গিয়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়ালো, যেন কোন বাঘ মানুষের রূপ নিয়ে ঘাড় মটকাতে এসেছে।হীরাভাই লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে।তার চোখে রাজ্যের বিশ্ময়।লোকটাও হাসিমুখে হীরাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।হঠাৎ বিশ্ময় উপেক্ষা করে চিৎকার করে উঠলো মানবদরদী হীরাভাই,‘অচিনদেব!’
--------------++++-------------
সত্যি,গত তেতাল্লিশ বছরে অচিনদেবের চেহারায় একটা আঁচড়ের দাগও পড়েনি।তার চেহারাটা যেন গতকালের দেখা।হীরাভাই তার বিছানার ওপর বসে আছে হাঁটুমুড়ে।ছোট একটা ঘর লাল পাহাড়ের একেবারে চুড়োর কাছাকাছি।বেড়া, পাইন কাঠ আর শক্ত তক্তা দিয়ে বানানো বাড়ি।বিছানাটাও তক্তা দিয়ে বানানো।বিছানার ওপর একটা পুরোনো গদি, কোনকালে সোফা বা নরম সেটির আসন ছিল সেটা।ঘরে বিছানা ছাড়া আর কিছু নেই। একেবারে শুন্য।
‘আমি কিন্তু সবকিছুই স্মরন করতে পারছি।তুমি চলে গেলে আমি ফিরে আসলাম এখানে, আমার বেশ খারাপ লেগেছিল তুমি চলে যেতে।পরে ভাবলাম এটা এমন আর কি, এই জীবনে তো কতো জনকেই হারালাম। সব কি আর ফিরে পাওয়া যায়?’অচিনদেব মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে,‘এই বাড়িতেই কাটিয়ে দিলাম একটা লম্বা সময়।বাগানে চাষ করি, পাহাড়ীয়াদের কাজে সাহায্য করি।অবসর সময়ে বই পড়ি।এভাবেই কেটে যাচ্ছে।তা তুমি কি মনে করে হঠাৎ?’
হীরাভাই একটা সিগারেট ধরলো,‘আমি রিসেন্টলি তোমাকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম পত্রিকায়।এই দু’জন সেই লেখাটা পড়ে আমার কাছে এসেছে।আমি তোমার কথা এদেরকে বললাম।অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম তোমার সাথে দেখা করবো, এরা যখন এসেছে আর তোমার ব্যপারে যথেষ্ঠ ইন্টারেস্ট আছে তাই ভাবলাম তোমার এখানে নিয়েই আসি।’
অচিনদেব গম্ভীর মুখে বললো,‘কাজটা ভালো করনি।আমি নিরিবিলি মানুষ নিরিবিলি থাকতেই পছন্দ করি।এসব কথা অনেক মানুষ পড়বে, তারা আমাকে খুঁজতে আসবে।আমার শান্তি নষ্ট হবে।এই পৃথিবীর মানুষকে জানানোর জন্য আমার গোপন কথা তোমার কাছে বলিনি হীরা।’
‘আহা, কি ভাবছো তুমি?আমি কি তোমার ঠিকানা দিয়েছি নাকি? আমি শুধু গল্পের স্টাইলে ইন্ডিয়ার উত্তরাখন্ডের নাম করেছি।উত্তরাখন্ড কি আর হাতের তালুর মধ্যে রাখা মোয়া নাকি যে ইচ্ছে হলেই ভেঙে চুরে দেখা যাবে।’
অচিনদেব কিছু বললোনা।অনেকটা আয়েসী ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে বসলো বিছানাতে।সুশীল আর জাহিদ খুবই বিশ্মিত এই অচিনদেবকে দেখে।তাদের কাছে মনেই হচ্ছেনা এই লোকটার বয়স চল্লিশ বছর।তার গায়ের হলদে রঙ, টানটান চামড়া দেখে বেশী হলে ত্রিশ ভাববে লোকে।তবে তারা বেশীক্ষন বিশ্ময় ধরে রাখতে পারলোনা, একসময় বিশ্ময় সাগরে গিয়ে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগলো।এই অচিনদেব একাধারে সামাজিক, বৈষয়িক, অর্থনীতিবিদ, গানিতজ্ঞ, বিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, জ্ঞানী, সমরবিদ, পুরাতত্ববিদ, ইতিহাসবেত্তা, মনোবিজ্ঞানী এবং কল্পনা বিশারদ ও ভবিষ্যতবেত্তা।অসীম তার জ্ঞান।কোন মানুষ জ্ঞানের দিক থেকে তার সমকক্ষ হবে এটা চিন্তাও করা যায়না। এ যেন প্রকৃতির এক অপার রহস্য।কিভাবে একজন মানুষ সব বিষয়ে পারদর্শী হয়? এটা তো শুধু মুখের কথা নয়, এটা সে প্রমান দিচ্ছে প্রতি পদে পদে।বিষয়বস্তু যে দিকেই গড়াক না কেন সে কাউকে এগুতে দিচ্ছেনা, লুফে নিয়ে তার বক্তব্য শুরু করে দিচ্ছে।আর তার বক্তব্য তো যা তা বক্তব্য নয়, একেবারে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন।তার যতো জ্ঞান বলা চলে সবই প্রাকটিক্যাল কারন প্রতিটা বক্তব্যের সাথে সে উদাহরন জুড়ে দিচ্ছে।তাজমহল বানানোর পেছনে কি টেকনিক ছিল তাও সে বর্ননা করলো।অথচ আকবর নাকি এরচেয়েও বড়ো তাজমহলের ডিজাইন করেছিল যা কারো জানা নেই। এবং সেই তাজমহলের ডিজাইন বানানো হয়েছিল হাতির দাঁত দিয়ে, যা করেছিল দুইজন ইউরোপিও ডিজাইনার।টিপু সুলতান যে বন্দুকের গুলিতে প্রান হারিয়েছিলেন তা নাকি একটা গাদা বন্দুক ছিল।টিপুর ছিল সাতটা ছেলে আর একটা মেয়ে যা ইতিহাসে পাওয়া যায়না।ইতিহাস বলে তার ছিল তিন ছেলে।অথচ টিপু সুলতানের ছেলে দিলওয়ার সুলতানের সাথে অচিনদেবের সখ্যতা ছিল।তার ছেলে প্রিন্স মুনওয়ার সুলতানের কবর আছে কোলকাতার বেহালার ফকিরপাড়ার কবরস্থানে যা কেউ জানেনা।প্রিন্স মুনওয়ার সুলতানই ছিলেন ভারতের সর্বশেষ মুসলিম প্রিন্স।তারপর কথাবার্তা এগুলো কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কার নিয়ে।অচিনদেবের বয়স যখন চারশো বছর তখন কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কার করেন।কলম্বাস ৩রা অগাস্ট ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিস্কার করেন।কলম্বাস নাকি আসলে একজন জলদস্যু ছিলেন।তিনি মূলত এশিয়ার দেশগুলো থেকে দামী দামী রত্ন আর পাথর ডাকাতী করার উদ্দেশ্যে তিনটা বিশাল রনপোত নিয়ে বেরিয়েছিলেন।সফল হতে পারেননি এবং আমেরিকা আবিস্কার করে বিখ্যাত হয়ে যান এই জলদস্যু।এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কথা এল।এল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই অঞ্চল থেকে সরে গেলেন অচিনদেব চিনে।সেখানে প্রায় বিশ বছর থাকার পর চলে এলেন আবার এখানেই।তখন ব্রিটিশদের রাজত্ব।জিম করবেটের সাথেও অচিনদেবের পরিচয় ছিল।জিম করবেট নাকি তার এই বাড়িতে একদিন পুরো সময় অপেক্ষা করেছিলেন একটা মানুষখেকো বাঘের জন্য।পরবর্তীতে তিনি বাঘটাকে শিকার করেন আর সেই কাহিনী কুমায়ুনের মানুষখেকো লিখে বিখ্যাত হয়ে যান।তবে মারা যাবার আগে সেই বাঘটা অচিনদেবকে আক্রমন করে এবং অচিনদেবের একটা পা খেয়ে ফেলে।
অচিনদেবের কথা শুনে চট করে সুশীল আর জাহিদ তার পায়ের দিকে তাকায়।হীরা ভাই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার পায়ের দিকে।তারপর বিশ্ময় কাটিয়ে উঠে বললো,‘একি কথা!আমাকে তো কখনও বলোনি যে এটা তোমার নকল পা?’
মৃদু হাসলো অচিনদেব।খোলা দরজা দিয়ে সামনে দিগন্ত বিস্তৃত উপত্যকার দিকে তাকালো।সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।নীড়ে ফিরতে শুরু করেছে হিমালয়ান পাখির দল।তার উক্তিটাকে ফিসফিস বলে মনে হলো,‘না এটা আমার নকল পা নয়।’ বললো সে,‘আসল পা।আমার শরীরের একটা অঙ্গ কোন কারনে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মুহুর্তের মধ্যে তা আবার গজিয়ে যায়।অনেকটা টিকটিকির লেজের মতো।’

তিন
হাঁ হয়ে থাকা তিন জোড়া চোখের সামনে দিয়ে সে উঠে গেল।কাঠের বিছানার নিচ থেকে একটা ভোজালী মতো ধারালো জিনিষ বের করলো।‘এটা আমার রাখার দরকার নেই আত্মরক্ষার জন্য তবে এটা দিয়ে আমি গাছের ডাল কাটি আর মগডাল থেকে ফল টল পেড়ে খাই।আমার কথা বিশ্বাস করবেনা তাই আমি এটা তোমাদের দেখাচ্ছি।’ বলে ভোজালিটা দিয়ে অচিনদেব তার বাম হাতের কব্জিতে পোঁচ দেয়।মুহুর্তের মধ্যে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে।হায় হায় করে ওঠে হীরা ভাই।সুশীল আর্তনাদ করে অন্যদিকে তাকিয়েছে।জাহিদকে দেখে মনে হচ্ছে ও বমি করে দেবে এখনই।অচিনদেব ছুরি চালাতেই থাকে।ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার বাম হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। টপ করে কব্জিটা কেটে পড়ে যায় সুশীলের পায়ের কাছে।জাহিদ চিৎকার করে ওঠে।তার শরীর কাঁপছে তেজপাতার মতো।দেখে মনে হবে ও ইচ্ছে করে নাড়াচ্ছে।আসলে ও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রন হারিয়েছে নিজের ওপর থেকে।সকলের বিশ্মিত দৃষ্টির সামনে অচিনদেবের হাত থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেল দশ সেকেন্ডের মধ্যে।তারপর তারা যা দেখলো তা পৃথিবীর কোন মানুষ ইহলোকে দেখেছে বলে মনে হয়না।তারা দেখলো অচিনদেবের বাহুর কাটা জায়গাটা থেকে আবার একটা কব্জি গজাতে শুরু করেছে।ত্রিশ সেকেন্ডের ভেতর আরেকটা কব্জি ঠেলে বেরিয়ে এল ওর।দেখে বোঝা যাবেনা একটু আগে ভোজালি দিয়ে ওখানটাতে পোঁচ দিয়েছিল অচিনদেব।সে হাসলো,‘আমার শরীরের কোন অঙ্গে কোন সমস্যা দেখা দিলে আমি সেটা কেটে ফেলে দেই।আবার নতুন একটা পাই।’
তিনজনই বাকরুদ্ধ, বিশ্মিত আর আতংকিত।তাদের দৃষ্টি দেখে বোঝা যায় তাদের ভেতর কি বিস্ফোরন ঘটেছে।‘তুমি মানুষ নও।’অনেকটা নিশ্চিত হবার সুরে বললো হীরা ভাই।‘গতবারে এসব তুমি আমাকে দেখাওনি।তুমি হয় জিন না হয় দানব।’
হাঃ হাঃ করে হাসলো অচিনদেব।‘না দাদা আমি জিন নই বা দানবও নই।আমি তোমাদের মতো একজন রক্ত মাংসের মানুষ।’
‘অসম্ভব!মানুষ হলে এসব কি ঘটছে?মানুষ হলে তুমি কি এগারোশো বছর বাঁচতে?মানুষ হলে তোমার হাত কেটে গেলে কি আবার সেটা গজিয়ে যেত?কিভাবে সম্ভব?তুমি অনেক কিছুই আমার কাছে বলেছিলে যা আমি লিখেছি কিন্তু তুমি এটা বলোনি কিভাবে এসব সম্ভব হয়েছে।এখন আমি বিশ্বাস করছি আসলেই তুমি এগারোশো বছর বেঁচে আছো। তোমার কোন অলৌকিক ক্ষমতা আছে যার কারনে এতোসব ঘটছে।সেটা আমাদের বলো।’ হীরা ভাই বললো।
দাঁত দিয়ে ঠোঁটটা কামড়ে ধরলো অচিনদেব।‘তুমি কি সত্যিই শুনতে চাও?’
তিনজনই একসাথে মাথা নাড়লো।
‘ঠিকআছে। তাহলে শোনো।আমার জন্মের সালটা আমার মনে নেই এখন আর।তবে যখন আমার বয়স প্রায় ত্রিশ বছর তখন আমি কোলকাতা থেকে এই অঞ্চলে আসি জাস্ট ঘোরার জন্য।আমি ছিলাম খুবই ভ্রমন পিপাসু আর একরোখা।যা আমি চাই তা যেকোন উপায়ে আমি পেতে চাই।এখনও তার একচুল পরিবর্তন হয়নি।এখনও আমি এমনি।সে যাই হোক, মা বাবা আমার কাজে কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।তাদের চেহারা এতোদিনে আমার আর মনে নেই।আমি ছিলাম তাদের একমাত্র সন্তান।আমি যা আবদার করতাম তা দেবার জন্য তাদের যুদ্ধের শেষ ছিলনা।ত্রিশ বছর বয়স থেকেই আমি ভারতবর্ষের নানা অঞ্চল ঘুরতে থাকি।অনেকটা তোমার মতোই ছিল আমার নেশা।সেই নেশার মতো ঘোরার আকর্ষন থেকেই আমি এই অঞ্চলে এসেছিলাম সেই আটশো তিয়াত্তর শতকে।আমি ছিলাম অনেকটা উগ্র স্বভাবের।কখনও ধর্ম বিশ্বাস ছিলনা আমার মধ্যে।আমার মা বাবা ছিলেন উল্টো। তারা ছিলেন প্রচন্ড ধর্মবিশ্বাসী। এমন কোন পুজো নেই যে তারা পালন করতেন না।এসব পুজো টুজোকে আমার একেবারেই বিশ্বাস হতোনা।একটা মাটির দেবতা কি এমন ক্ষমতা রাখে।এইযে তোমরা নামাজ পড়ো রোজা রাখো এসব কার জন্য করো?একজন স্রষ্ঠার উদ্দেশ্যে করো,তাইতো?আমার বিশ্বাস ছিল যে, স্রষ্ঠা বলে কিছু নেই।ইশ্বর বলে কিছু নেই।যা হয়েছে তা এমনি এমনি হয়েছে।হয়তো একটা শক্তি আছে যা সফটওয়্যারের মতো,সেটা নির্দিষ্ট নিয়মে সবকিছু পরিচালিত করে।আমি যখন আসি এখানে তখন এই অঞ্চল আরো অনেক অনুন্নত ছিল।ভারতের এসব অঞ্চলে কিছু সংখ্যক আদিবাসী ছাড়া প্রচুর পর্তুগীজ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মানুষ বাস করতো।এরা চেষ্টা করেছিল এই অঞ্চলে বড়ো বড়ো কিছু শিল্প কলকারখানা স্থাপন করে এসব অঞ্চলকে আধুনিক করে ফেলতে।কি কারনে যেন তারা সফল হতে পারেনি।সম্ভবতঃ তাদের দেশের সরকার টাকা পয়সা দিয়ে তাদেরকে সহায়তা করতে চায়নি।কিছুদিন পরই এই অঞ্চলে অজানা এক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে আর দলে দলে মানুষ পরপারে যেতে থাকে। এসব রোগগুলো ছড়িয়েছিল সেই সব বিদেশী লোকগুলোই। এর ফলে শুধু তারা নয়, দেশী মানুষগুলোও সংক্রমিত হতে থাকে।দেখতে দেখতে গ্রামকে গ্রাম জনশুন্য হতে থাকে।দলে দলে মানুষ পালাতে থাকে অন্য কোন নিরাপদ জায়গার খোঁজে।আমি তো তখন এসব ব্যপারে একেবারে উদাসিন।মৃত্যুর কোন ভয় কখনও আমার মধ্যে ঘাঁটি গাড়েনি।চিন্তা করলাম এখানে না থেকে তাদের গ্রামে গিয়ে ব্যপারটা দেখতে হবে যে কি কারনে তারা সবাই মারা যাচ্ছে।একদিন পাঁচ মাইল দুরের সেমবাই গ্রামে গেলাম।পর্তুগীজ গ্রাম ছিল এটা।এখন মাত্র দু’তিন জন মানুষ অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছে।যাদের গায়ের রঙ ছিল সাদা তাদের গায়ের রঙ হয়ে গেছে লাল।লাল চামড়ায় গোল গোল দাগ ফুটে আছে।চামড়াগুলো কুঁচকে গেছে যেন প্রত্যেকটা মানুষের বয়স একশো বছর ছাড়িয়ে গেছে।চেহারা দেখে মনে হচ্ছে যেন মিশরের মমি।আমাকে দেখে একজন কি যেন বলার চেষ্টা করলো।আমি বুঝলাম, সে আমাকে চলে যেতে বলছে।আমি তার আরও কাছে গেলাম, হিন্দীতে বললাম,‘আমি জানতে চাই আপনার কি হয়েছে।এটা কি ধরনের রোগ?’
লোকটার কথা বলার ক্ষমতা নেই একেবারে, চিঁচি করছে গলা।কথা বলতে পারবেনা।ওঠার ক্ষমতা নেই, খাওয়ার ক্ষমতা নেই, পান করার ক্ষমতা নেই।এটা কি রোগ।সারা ঘর খুঁজে এক কলস পানি পেলাম, সেখান থেকে একটা পাত্রে কিছুটা পানি নিয়ে তার মুখে দিলাম।তার পানি পান করার শক্তিও নেই।পানিটা গলার ভেতর যেতেই বিষম কাশি কাশতে লাগলো লোকটা।চোখমুখ লাল হয়ে শক্ত হয়ে থাকলো।পেছন থেকে পায়ের শব্দ পেলাম।ঘুরতেই দেখলাম চমৎকার চেহারার এক লোক হাসিমুখে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।কি অদ্ভুত সুন্দর তার মুখমন্ডল আর আবয়ব যেন কোন সিনেমার নায়ক।পোশাকটাও তেমনি।‘আমাদের কিছু করার নেই ওদের জন্য।সরাসরি ডোরিনিয়ার অভিশাপ, এভাবেই ওরা মারা যাবে।মারা যাবার আগ পর্যন্ত কোন কিছু খেতে পারবেনা এবং পান করতেও পারবেনা।আর এর ফলে ওরা পরজন্মে শান্তি পাবে।’ সে বললো।‘চলে আসুন, ওদেরকে একটু শান্তিতে মরতে দিন।’
আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে লোকটার পেছন পেছন বেরিয়ে এলাম কুটির থেকে।গ্রামের উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়লো লোকটা।ঘুরলো।নিজের বুকে আঙুল দিয়ে বললো,‘আমি গৌর।তোমার নাম কি?’
‘আমি অচিনদেব,’ আমি বললাম।‘পাঁচমাইল দুরে থাকি।আপনি বললেন ডোরিনিয়ার অভিশাপ।এটা কি?’
গৌর হাসলো,‘ডোরিনিয়ার নাম শোনেননি আপনি?’
‘নাতো!আমি হিন্দু, মোটামুটি সব দেবতা দেবীর নাম জানি।এই নামে কোন দেবতা বা দেবী নেই আমাদের।’
‘আমি হিন্দু ছিলাম তবে এখন নেই।আমাকে সিলেক্ট করা হয়েছে একজন বার্তাবাহক হিসাবে।আমি এখন সরাসরি ডোরিনিয়ার বার্তাবাহক,তোমরা যাকে অবতার বলো।মুসলমানরা যাকে বলে নবী।’
আমি সোজা হয়ে গেলাম।বলছে কি লোকটা!দেখে তো পাগল টাগল বলে মনে হচ্ছেনা।রীতিমতো সুপুরুষ এবং সৌম্য ভদ্রলোক।তার চোখমুখ থেকে যেন কোন এক আলোকচ্ছটা বেরুচ্ছে।এই ধরনের লোকরা সাধারনত মিথ্যেবাদী টাইপের হয়না।তার হাঁটাচলা, দাঁড়ানো বা কথা বলার স্টাইল খুবই উন্নত এবং রুচিশীল।তাছাড়া তার শরীর থেকে খুব সুন্দর একটা গন্ধ বেরুচ্ছে, মনে হচ্ছে খুব চেনা আবার পরক্ষনে মনে হচ্ছে অচেনা।গন্ধটা কখনও তীব্র হয়ে উঠছে আবার কখনও মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে।তার চোখের রঙটাও যেন আলাদা, সেই রঙের ভেতর কেমন এক আবেশ।ভ্রুটা বাঁকানো ধনুকের মতো, চোখের পাতাগুলো বড়ো বড়ো।কি এক নির্লিপ্ততা তার তাকানোর ভঙ্গিতে অথচ গভীর সেই দৃষ্টি আমাকে ভেদ করে চলে গেছে যেন বহুদুরে।মনের ভেতর থেকে কে যেন বললো এই লোকটা কোন সাধারন লোক নয়।এর কাছ থেকে তুমি অনেক কিছু পেতে পার।
‘হ্যাঁ, আমি একজন বার্তাবাহক বা ম্যাসেঞ্জার।ডোরিনিয়ার পক্ষ থেকে বার্তা নিয়ে পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌছে দেয়াই আমার কাজ।’ গৌর সরাসরি তাকিয়ে আছে আমার দিকে।ওর চোখের পাতা পর্যন্ত কাঁপছেনা।‘ডোরিনিয়া আমার দেবী।আমি তার উপাস্য এবং বার্তাবাহক।চির শান্তির দেবী ডোরিনিয়া।তার রাজ্যে, তার ধর্মে কোন অশান্তি নেই।অতি শান্তির ধর্ম ডোরিনিয়ান। যে এই ধর্ম গ্রহন করবে সে পাবে পরম শান্তি এবং তুমি হয়ত বিশ্বাস করতে পারবেনা তার জন্য পরকালেও অপার শান্তি নিশ্চিত হয়ে যাবে।এই যে মানুষগুলো দেখছো সবাই তার উপাস্য ছিল একসময়।কিন্তু কালক্রমে এরা কিছু নিষিদ্ধ কাজ করেছে যার জন্য তাদের এই অবস্থা।’
আমি গৌরের সম্মোহনী শক্তির কাছে যেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছি যে আমাকে পুরোপুরি তার কথা শুনতে হবে।গৌর বলে চললো,‘তোমার মনে অনেক জিজ্ঞাসা জড়ো হয়েছে আমি দেখতে পাচ্ছি।আমাকে বলতে হবেনা আমি এক এক করে পুরো ঘটনাটা বলে যাই তারপর তোমার প্রশ্নের উত্তর দেবো।যদি তোমার শোনার শক্তি থাকে তবে আমি একটানা তিন চারদিন বা টানা এক সপ্তাহ কথা বলে যাবো।ডোরিনিয়া সৌন্দর্যের দেবী।পৃথিবীর সমস্ত নারীকে একস্থানে জড়ো করলে আর বীপরিতে যদি ডোরিনিয়া থাকে তবে সৌন্দর্যে সমস্ত নারী ম্লান হয়ে যাবে।তার সৌন্দর্যে গাছে ফুল ফোটে।তার শরীরের সুবাসে বসন্তকাল আসে পৃথিবীতে।তার শরীরের গঠন এতো নিখুঁত যে পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত নারীর চেয়ে এককোটি তেইশ লক্ষ গুন নিখুঁত সে।এই সৌন্দর্যের কারন আছে, ডোরিনিয়া ঈশ্বরের নিজের সৌন্দর্যে সৃষ্টি।যার রূপ বর্ননাতীত। ঈশ্বর নিজে যেমন সৌন্দর্যের আধার, তিনি তার সৌন্দর্যের অর্ধেক দান করেছেন ডোরিনিয়াকে।তাকে সুন্দরী বললে পাপ হবে, কারন সে সুন্দরী নয়, সে সসীম মনুষ্যকল্পনার বাইরের সৌন্দর্য যা ভাবা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।আমরা তা নিয়ে ভাবতে চাইনা।আমি তার উপাসনা করি এবং সে নিজে আমাকে তার বার্তাবাহক মনোনীত করেছে।আমি সারাজীবন তার বার্তাবাহক হিসাবে কাজ করে যাবো যা করে আসছি গত তিন হাজার বছর ধরে।’
আমি একটা ধাক্কা খেলাম।বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম।চেষ্টা করলাম মুখ খোলার।কিন্তু দেখলাম আমার ঠোঁটদুটো একে অন্যের সাথে জোড়া লেগে গেছে।ভয় পেয়ে গেলাম এই ভেবে যে আমার বোধহয় ওদের মতো রোগ দেখা দিয়েছে।গৌর আমার মনের কথা বুঝতে পেরে হাসলো,‘ভয় পাবার কোন কারন নেই।সাময়িকভাবে আপনার কথা বলার শক্তি কেড়ে নিয়েছি আমি।কারন আমি চাইনা আপনি আমার কথার মাঝে কথা বলে বাধা সৃষ্টি করেন।আমার কথা শেষ হবার পর আপনি কথা বলতে পারবেন আগের মতো।আপনি শুনে অবাক হচ্ছেন যে আমি কিভাবে তিন হাজার বছর বেঁচে আছি।এক সময় আমি আপনার মতো মানুষ ছিলাম।আপনার মতো সাধারন স্বপ্ন ছিল আমারও।আজ নেই।আজ সেই স্বপ্নময়তাই বাস্তব।ডোরিনিয়া আমাকে অমরত্ব দান করেছে।আমাকে তার পায়ের কাছে স্থান দিয়েছে।আমার কাজ শুধু পৃথিবীর মানুষের কাছে তার বার্তা পৌছানো।আমাদের ধর্মের অনুসারী অনেক কমে গেছে।আগে অনেক মানুষ তার উপাসনা করতো কিন্তু পৃথিবীতে নানা ধর্মের আবির্ভাবের ফলে এই ধর্ম আজ বিলীন হয়ে যেতে বসেছে।তাই আমাকে ম্যাসেঞ্জার বানানো হয়েছে যাতে আমি পৃথিবীর মানুষের কাছে তার বার্তা পৌছে দিতে পারি।পৃথিবীতে এই হানাহানি, যুদ্ধ, অন্যায়, লোভ লালসার মূল কারন হলো মানুষের মধ্যে সৌন্দর্যের অভাব।মানুষ যদি সৌন্দর্য চিনতো সুগন্ধ চিনতো তাদের ভেতর পাপ করার প্রবনতা কমে যেত।আমি তাদের সঠিক বার্তা দিয়ে যাই। কেউ শোনে আবার কেউ শোনেনা।কিন্তু আমি আমার কাজ করে যাই।তিন হাজার বছর ধরে এই কাজই করে যাচ্ছি আমি।দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা ছাড়াও আমাকে আরও অনেক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যা পৃথিবীর কেউ বিশ্বাস করবেনা।আমার ঘুমের দরকার নেই, খাবারও তেমন প্রয়োজন নেই, পিপাসাও তেমন পায়না।আমার বিয়ে করার প্রয়োজন নেই অথচ আমি যদি চাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারীকেও এনে আমার সামনে দাঁড় করাতে পারি, তাকে দিয়ে যে কোন কাজ করাতে পারি।কিন্তু যে শারিরিক তৃপ্তির জন্য আমি তাকে আনবো তা দেবী আমাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দান করেন তাই নারীর শারিরিক সাহচর্যের দরকার হয়না।এটা আপনার কল্পনার বাইরে।আর দেবীর দেয়া এই শারিরিক তৃপ্তির কাছে পৃথিবীর সব তৃপ্তি ম্লান, অসহায়।তাই বলে ভাববেন না যে দেবী সরাসরি আমার বিছানায় আসেন। এটা ভাবাও পাপ।আমার প্রয়োজনের মুহুর্তে আমি সেই আনন্দ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুভব করতে পারি যতোক্ষন চাই।আমি না ঘুমিয়ে ঘুমন্ত, না খেয়েও খুধা নিবারিত, না পান করেও আকন্ঠ তৃপ্ত, কোন নারীসঙ্গ ছাড়াও নিবৃত্ত।এটা বোঝার মতো শক্তি এই মুহুর্তে আপনার নেই।এর বিনিময়ে আমি দেবীর বার্তাবাহক হয়ে কাজ করে যাই। যেখানে দেখি পাপ, পংকিলতা সেখানে ছুটে যাই, মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করি কোনটা ঠিক কোনটা ভুল।এসব কথা বললে মানুষ আমাকে মারতে আসে।যারা পংকিলতায় ঢুবে আছে তারা কি সহজে আমার কথা বিশ্বাস করবে?অনেকেই হত্যা করার জন্য চেষ্টা করেছে আমাকে।তারা দা তলোয়ার দিয়ে কুপিয়েছে আমাকে, পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে আমাকে, বিষ দিয়ে মারার চেষ্টা করেছে, ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছে আমার ওপর দিয়ে।কোন লাভ হয়নি,পরে আমার অপরিসীম ক্ষমতা দেখে তারা হার মেনে নিয়েছে।গ্রহন করেছে দেবীর বশ্যতা।দেবী যাকে বর দিয়েছেন তাকে কি হত্যা করা যায়?আমি অমর।পৃথিবীর সব কিছু ধ্বংশ হয়ে যাবে কিন্তু আমি থাকবো।হ্যাঁ, এবার আসল কথায় আসি।আমাদের ধর্মে পাপ কি।আমাদের ধর্মে কোন পাপ নেই।হত্যা ছাড়া যা কিছুই করেন তা সহজেই আমরা মেনে নেই।আর দেবীর উপাসনা করতে হবে সপ্তাহে একবার।তাহলে আপনার মনে কোন পাপ জন্ম নেবে না।কিন্তু সমস্যা এক জায়গাতেই।সেটা হলো ঈশ্বরের উপাসনা করা যতোটা সহজ দেবীর উপাসনা তত সহজ নয়।বিশেষ করে যদি সে হয় সৌন্দর্যের দেবী।আপনি পুরুষ তাই আপনার ইচ্ছে হবেই তাকে দেখার।একদিন না একদিন তাকে আপনি দেখতে চাইবেন।আর এই চাওয়াটা আসে আপনার মনের গোপন পংকিলতা থেকে। একসময় আপনারও ইচ্ছে হবে এই অপরিমেয় সৌন্দর্যের অধিকারিনীকে দেখার।আর তখনই পাপের আধার পূর্ন হয়ে যায়।কামনার দৃষ্টিতে আপনি যখন একজন উপাসক হয়ে দেবীকে খুঁজবেন তখন সেটা হবে বর্ননাতীত পাপ।এই লোকগুলো সেই পাপ করেছিল।এদেরকে দান করা হয়েছিল অমরত্ব আর অসীম আনন্দের জীবন, কিন্তু তা তারা পরিহার করে দেবীর রূপের সাগরে ঢুব দিতে চেয়েছিল।এর প্রতিদানে এরা এখন সবাই মারা যাচ্ছে।আর এটা তাদের পাপের ফল, এখানে আমি আপনি সবাই অসহায়।দেবীর কোন রাগ বা প্রতিহিংসা নেই।তিনি অসীম ধৈর্যশীলা।তিনি চেষ্টা করেছেন এদেরকে ফিরিয়ে আনতে।আমাকে পাঠিয়েছেন এদের কাছে।আমি গত একশো বছর ধরে চেষ্টা করেছি কিন্তু কাজ হয়নি।এরা দেবীর রূপ দেখার চেষ্টা করেছে একশো বছর ধরে প্রতিদানে তাদের এই অবস্থা।ডোরিনিয়ার রূপ ঈশ্বর ছাড়া কেউ দেখতে পায়না বা দেখতে পারেনা।তার রূপ সহ্য করার ক্ষমতা মানুষের ইন্দ্রিয়ের নেই।তাই সে চেষ্টা না করাই ভাল।’
বোবার মতো তাকিয়েই আছি আমি গৌরের দিকে।খেয়ালই নেই কখন রাত হয়ে গেছে।কিন্তু কি আশ্চর্য্য, এই অন্ধকারের ভেতর তাকে দেখতে পাচ্ছি আমি একেবারে পরিস্কারভাবে যেন সুর্যের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা।আমার ঠোঁটদুটো তখনও আঠা দিয়ে বন্ধ করা।চেষ্টা করলাম, নাহ পারা যাচ্ছেনা।কথা বলার কোন শক্তি নেই আমার তখনও।গৌর বললো,‘এখন কাজের কথায় আসি।পৃথিবীতে যতো ঘটনা ঘটে তা স্বয়ং ডোরিনিয়া জানেন।তিনিই ভাগ্য নিয়ন্ত্রক, তিনিই বিধাতা।তিনি মানুষকে পছন্দ করেন, তিনি নির্ধারন করেন কে কোন ভুমিকায় অবতীর্ন হবে। তিনিই আপনাকে পছন্দ করেছেন একজন বার্তাবাহক হিসাবে, অনেকটা আমারই মতো।তাই তার ইচ্ছাতেই আপনি এই অঞ্চলে এসেছেন, তার ইচ্ছাতেই আমি এখানে এসেছি আপনাকে সব খুলে বলার জন্য।আপনি যদি চান তবে আপনি আমার মতো হতে পারবেন।আমার মতো হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকবেন পৃথিবীতে।পাবেন আমারই মতো ক্ষমতা।আপনি কি তা পেতে চাননা?’ 
ঠোঁট নাড়লাম।হ্যাঁ মুখ নাড়তে পারছি আমি!কথা বলতে পারছি!আমার ভেতর প্রবল এক আনন্দ, যেন লটারীর টিকিট পেয়েছি আমি।আমি তো নাস্তিক, আমার ধর্মে কোন বিশ্বাস নেই।কিন্তু এই বিষয়টা অন্যরকম।এই ধর্মটা আলাদা।এখানে সপ্তাহে একদিন ডোরিনিয়াকে ডাকতে হবে।বিনিময়ে আমি পাবো অসীম ক্ষমতা, অমরত্ব!কোন কিছু চিন্তা না করেই বললাম,‘রাজী না হবার কোন কারনই নেই।’
‘এটা আপনার সৌভাগ্য যে আপনাকে ওদের মতো শুধু উপাসক হতে হয়নি।আপনাকে সে একজন ম্যাসেঞ্জার হিসাবে পছন্দ করেছে, উপাসকদের অনেক ওপরের আসন হলো বার্তাবাহক।আপনি সরাসরি ডোরিনিয়ার কাছ থেকে নির্দেশ পাবেন।কি করতে হবে, কখন করতে হবে সব সেই আপনাকে বলে দেবে।কিভাবে সে বলবে সেটা আপনি নিজেই দেখতে পাবেন।শুধু আপনাকে আমার সামনে হ্যাঁ বলতে হবে।একটা শব্দই বলবেন “হ্যাঁ”।
‘হ্যাঁ।’ জোরে বললাম আমি।মনে হলো বেশী জোরেই বলে ফেলেছি।আমার আর তর সইছিলো না।
গৌর হাসলো।খুব সুন্দর হাসি।‘তবে হ্যাঁ, ঠিক আজ থেকেই আপনি সব শক্তি পাবেননা, যেদিন আপনার চল্লিশ বছর পূর্ন হবে ঠিক সেদিনই আপনি পাবেন এই ক্ষমতা।আমার আর কোন ভুমিকা নেই আপনার আর দেবীর মাঝখানে।আজ থেকে আমি মুক্ত।গত বারো বছর ধরে দেবীর নির্দেশ পেয়েছি আপনার ব্যপারে।বারো বছর ধরেই অপেক্ষায় আছি আপনি কখন এখানে আসবেন।আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি।এবার আমি চলে যাবো।আরেকটা কথা, এই এলাকা অনেক শ্বাপদ সংকুল। তবে কোন ভয় পাবেন না।কেউ কিছুই করতে পারবেনা আপনার।আজ থেকে আপনার সকল ভাল মন্দ সব ডোরিনিয়ার হাতে।তিনি ছাড়া আপনার ক্ষতি করতে কেউ পারবেনা।আমি চললাম।হয়ত: আবার কোন একদিন পথ পরিক্রমায় আপনার সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে। আসি।’
গৌর চলে গেল অন্ধকারের ভেতর।ঘুটঘুটে আঁধারের ভেতর একা আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।আমার কাছে কোন আলো নেই, তখনও টর্চ জিনিষটা আবিস্কার হয়নি।মানুষ মশাল জ্বেলে পথ চলতো। তবে বিষম বিশ্ময়ের সাথে দেখলাম যে আমি অন্ধকারে পথ চলতে পারছি! চোখের সামনেটা পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।একটু পরেই পুরোপুরি দেখতে পেলাম সবকিছু।মনে হচ্ছে একেবারে দিনের আলোয় দাঁড়িয়ে আছি আমি।বুঝতে পারলাম মহাক্ষমতাবান ডোরিনিয়ার একজন বার্তাবাহক হিসাবে শপথ নিয়ে ফেলেছি আমি।আমার এখন অসীম ক্ষমতা।’

(চলবে........)

আকস্মাৎ একজন...............................................তুহিন রহমান (মেঘ অরণ্য বই থেকে)

আকস্মাৎ একজন...............................................তুহিন রহমান (মেঘ অরণ্য বই থেকে)
র সাথে যেদিন দেখা হলো সেদিন কোন জাতের গোলাপ ফুটেছিলো তা জানিনা তবে সেদিন ছিলো শনিবার এই ব্যপারটা আমি নিশ্চিত। পল্টনের মোড়ে কিছু ঈদ কার্ড খোঁজার জন্য গিয়েছিলাম। ঈদের বাকি চার দিন। অফিস থেকে চেক পেয়েছি বেতন বোনাসের। চেক নিয়ে প্রাইম ব্যাংকের পল্টন শাখা থেকে পঁচিশ হাজার টাকা তুলে বেরিয়ে আসলাম বাইরে তারপর ঈদ কার্ড কিনে এক প্লেট গরম গরম মোরগ পোলাও আর এক গ্লাস হিম শীতল পেপসি মেরে দিয়ে যখন বাইরে বেরুলাম তখন আকাশ কালো করে টপ টপ করে বৃষ্টি ঝরা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম যাত্রীরা টপাটপ রিকসায় উঠে পড়ছে। কেউ কেউ আগেভাগেই প্লাস্টিক পেপার গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছে। আমি খালি রিকসা না পেয়ে দ্রুত গতিতে হাঁটতে লাগলাম আজাদ প্রোডাক্টস এর পাশ দিয়ে নয়া পল্টনের দিকে। কিন্তু বিধি বাম। কয়েক পা যেতে না যেতেই মুষলধারে বৃষ্টি নামলো। এতোটাই হঠাৎ করে যে আমি সামনে দৌড়াবো নাকি পেছনে দৌড়াবো বুঝতে না পেরে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম একটা হোটেল ধরনের জায়গা খোলা রয়েছে। সাধারনত: গরীব লোকদের খাওয়ার জন্য এ ধরনের হোটেল করা হয় ফুটপাথের ওপর। কোন মানুষজন নেই, একেবারে খালি। সেদিকেই ছুটলাম। হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। ছোট হোটেল, উপরে টিনের ছাউনি। একটা  মাত্র টেবিল। সিগারেট বিক্রির টংকে ম্যানেজারের কাউন্টার ধরনের কিছু একটা বানানো হয়েছে। সেখানে বসে আছে টেকো মাথার একটা বুড়ো। কিছুটা ভিজে গেছি আমি। পকেট থেকে রুমাল বের করে সবেমাত্র টেবিলে বসতে যাবো কেউ একজন হুড়মুড় করে আমার গায়ের ওপর এসে পড়লো। রেগেমেগে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে যাবো ফ্রিজ হয়ে গেলাম। একটা অনিন্দ সুন্দরী মেয়ে আমার গায়ের ওপর এসে পড়েছে। বাইরের প্রচন্ড বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য দৌড় দিয়ে ভেতরে ঢুকে সম্ভবত: আমার গায়ের ওপর টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেছে। 
মেয়েটা আমার গায়ের ওপর পড়ে গিয়ে হতবাক হয়ে গেছে। তার সারা শরীর বৃষ্টির পানিতে চপচপে ভেজা। মাথার চুল বেয়ে গড়িয়ে নেমে ভ্রু টপকে গলার কাছে পড়ছে পানি। মনে হচ্ছে এই মাত্র শাওয়ার সেরে বেরিয়ে এসেছে। পরনে হালকা নীল রঙের একটা শাড়ী। বাম হাতে একটা চিকন ঘড়ি যেন তার কবজিতে বসার অপেক্ষাতেই ছিলো। মেয়েটা ঢোক গিলে বললো,‘আমি আসলে এতো জোরে ঢুকেছি...।’ 
আমি তাড়াতাড়ি হাত নাড়লাম,‘ইট’স অলরাইট।’
মেয়েটা নাছোড়বান্দা,‘আমি সত্যি বলছি আমি স্কিড করে একেবারে আপনার ওপর এসে পড়েছি। আসলে বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচার জন্য...।’
আবার হাত তুলে তাকে থামালাম আমি। ‘আহা আমি বললাম তো যে আমি কিছু মনে করিনি।’
‘আপনার কি খুব  জোরে লেগেছে?’গলায় একই সুর বজায় রেখে মেয়েটা বললো। ‘আমার কনুই তো আপনার পিঠের ওপর আঘাত করেছে।’
‘আমার গন্ডারের চামড়া।’ বলে হেসে উঠলাম আমি। মেয়েটাও হাসিতে যোগ দিলো কিন্তু তার ভেতর কেমন এক আড়ষ্ঠতা। হয়ত: আমাকে আঘাত দিয়ে ফেলেছে বলে।
এবার পরিপূর্নভাবে আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। অদ্ভুত সুন্দর একটা মেয়ে। যাকে বলে ন্যাচারাল বিউটি। সবচেয়ে সুন্দর তার ভ্রুদুটো। এমনভাবে বাঁকানো যেন ছিলায় টান খাওয়া দুটো ধনুক তার কপালের ওপর বসানো। আম কাট মুখমন্ডল একেই বলে বোধহয়। চেহারায় কোথাও কোন খুঁত নেই। ঠোঁটদুটোকে এক করলে হয় তাকে প্রজাপতির মতো লাগবে নাহয় দুটো কমলালেবুর কোষা। আমার সবচেয়ে বড়ো দোষ হলো আমি মেয়েমানুষের শরীরের দিকে তাকাইনা। আমার সব কাব্য তার চেহারাকে কেন্দ্র করেই, তাই অন্য কেউ হলে যেখানে তার দেহকেন্দ্রিক রূপ লাবণ্যে বিমোহিত হয়ে কবিতা লিখতো বা তাকে তানপুরার সাথে তুলনা করে মহাকাব্য লিখে ফেলতো সেখানে আমি তার শরীরের দিকে তাকালামনা একপলকের জন্যও। 
আমি তাড়াতাড়ি বললাম,‘আপনি তো একদম ভিজে গেছেন। নিন এই রুমাল দিয়ে চুলটা মুছে ফেলুন।’
মেয়েটা আমার হাত থেকে রুমালটা নিয়ে তার চুলগুলো ঘষে ঘষে মুছতে লাগলো।
আমি টেবিলে বসে পড়লাম। এমন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে যে আমার কাছে মনে হচ্ছে এই বৃষ্টি জীবনেও থামবেনা। সেই সাথে ঠান্ডা বাতাস আসছে দক্ষিন দিক থেকে।
ভিতরে বৃষ্টির ছাঁট আসছে দেখে বুড়ো লোকটা গিয়ে চাটাই এর ছাউনিটা একটু নামিয়ে দিয়ে ফিরে এলো। আমি দেখলাম মেয়েটা তালপাতার মতো কাঁপছে। বৃষ্টিতে পুরোপুরি ভিজে না গেলেও তার উপরের অংশ বেশি ভিজেছে। 
আমি আমার শার্টটা খুলে বাড়িয়ে দিলাম মেয়েটার দিকে,‘আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে। এটা গায়ে চাপিয়ে নিন।’
‘না না ঠিক আছে। আমার ঠান্ডা লাগছেনা।’
‘আমি দেখতে পাচ্ছি আপনি ঠকঠক করে কাঁপছেন আর বলছেন যে আপনার ঠান্ডা লাগছেনা। নিন পরে নিন।’
সলজ্জ ভঙ্গিতে মেয়েটা শার্টটা পরে নিলো। তার আসলেই বেশ ঠান্ডা লাগছে। বৃষ্টি ভেজা শরীরে ঠান্ডা বাতাসের যে কি কামড় তা আমি বুঝি। 
আমি বুড়ো লোকটাকে বললাম,‘ভাই চা হবে?’
দেখলাম লোকটা আমার দিকে বড়বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। কি যেন বলার অপেক্ষায় আছে। আমার সাথে চোখাচোখি হতে কি যেন বলতে চাইলো, তার আগেই মেয়েটা ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে চেয়ে বললো,‘নিতান্ত বাধ্য হয়েই আমি এখানে বসেছি ভাইয়া। তা নাহলে এখানে ঢুকতামনা।’
আমি তাড়াতাড়ি তাকালাম মেয়েটার দিকে। তার চেহারাটা লাল দেখাচ্ছে। ‘আমি ঠিক বুঝতে পারিনি কি বলতে চাইছেন আপনি।’
‘সবার চরিত্র তো এক রকম নয় ভাইয়া। আপনি একবারও আমার দিকে তাকাননি আর ওই বুড়ো ভাম ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে চোখ সরাতে ইচ্ছেই করছেনা। মানুষ এতো বেহায়া হয় কি করে?’
আমি চোখে রাগ ফুটিয়ে লোকটার দিকে তাকাতে লোকটা চোখ সরিয়ে নিলো। আমি নিচু স্বরে বললাম,‘সব আলুর দোষ বুঝলেন, সব আলুর দোষ।’
মেয়েটা অবাক হয়ে বললো,‘কিসের দোষ বললেন?’
আমি হেসে উঠলাম,‘না কিছুনা। আপনি বুঝবেননা।’
‘বুঝবোনা কেন অবশ্যই বুঝবো।’ মেয়েটা তার সুন্দর ভ্রু দুটো পাকালো।‘আলুর দোষ মানে কি?’
‘তাহলে তো ঠিকই শুনেছেন, না শোনার ভান করছেন কেন?’ আমি বললাম।
‘আচ্ছা থাক বলার দরকার নেই। এভাবে এখানে ভিজে শাড়ি পরে বসতে চাইনি আমি যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে যাই বা কোথায়।’ মেয়েটা বললো। ‘আশেপাশে তো কোন ভালো জায়গাও নেই যে বসবো।’
‘ঠিক বলেছেন একদম।’ একটু চুপ থেকে আমি বললাম,‘আপনার নামটাই তো জানা হলোনা।’
‘আমার নাম বর্ষা।’
আমার আনন্দে হাততালি দিতে ইচ্ছা হলো এমন কোইন্সিডেন্স দেখে। উল্লসিত গলায় বললাম,‘আরে কি আশ্চর্য! বর্ষায় ভিজে বর্ষা বসে আছে আমার সামনে!’
মেয়েটা হেসে ফেললো,‘এখন আপনি যদি বলেন আপনার নাম বিদ্যুৎ তবে বেশী অবাক হবোনা আমি।’
‘হা: হা: হা: হা:।’ অট্টহাসি দিয়ে উঠলাম আমি।‘আরে না, এতো তেজ নেই আমার। নাম হচ্ছে বখতিয়ার।’
মেয়েটা নাক সিঁটকালো,‘সত্যি বলছেন আপনি? এমন নাম মানুষের হয়? আপনার চেহারা দেখে তো মনে হয়না এরকম উদ্ভট একটা নাম দিয়েছেন আপনার বাবা।’
‘তবে কেমন হবে বলে আপনার ধারনা?’
‘এই ধরুন রায়ান, জিয়ান, সায়হাম, কিংবা হিন্দী সিনেমার ঐ বস্তাপচা রাহুলই হোকনা কেন অন্তত: আপনার ঐ সদরঘাট মার্কা নাম থেকে তো ভালো।’
আরেকবার আমি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম,‘আসলেই আমার ভালো নাম বখতিয়ার। তবে কলিং নেম একটা আছে যেটাকে আপনি মোটেও সদরঘাট মার্কা বলতে পারবেননা।’
‘কি সেটা?’
‘তিয়া।’
‘তিয়া?’
‘হ্যাঁ তিয়া। কেন বিশ্বাস হচ্ছেনা?’
‘বিশ্বাস হচ্ছে কারন পৃথিবীতে কেউ যদি তার নাম তেলাপিয়া বা তেলাপোকা রাখে তবে আমার করার কি আছে তিয়া ভাই।’
‘দেখুন আর হাসতে পারছিনা। চা খাবেন বর্ষা আপা?’
‘কি? বর্ষা আপা? আপনি কি আমাকে আপনার চেয়ে বয়স্ক ভাবছেন নাকি?’
‘আরে কিছুই ভাবছিনা। চা খাবেন?’
‘খাবো।’
আমি চায়ের কথা বলতে যাচ্ছি দেখলাম টেকো বুড়ো আগেই চা বানিয়ে ফেলেছে। বাইরের বাতাস থেকে বাঁচতে আমার দিকে আরেকটু চেপে এলো বর্ষা। আমার দিকে চেয়ে বললো,‘আপনার শার্টটা না থাকলে কিন্তু আমি একদম ঠান্ডায় জমে যেতাম।’
‘থাক ধন্যবাদ দেয়ার দরকার নেই।’
বুড়ো দু’কাপ চা দিয়ে গেল আমাদের সামনে। চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,‘পড়াশোনা শেষ করেছেন?’
‘না এখনও করিনি।’ বর্ষা বললো। ‘থার্ড ইয়ার ফাইনাল দিয়েছি।’
‘ভাইবোন ক’জন আপনারা?’
‘চার ভাই বোন।’
‘বাবা কি করেন?’
বর্ষা একটু মাথা নিচু করলো। ‘কিছু করেননা।’
‘রিটায়ার্ড?’
‘না।’
‘তবে?’
‘পঙ্গু। অসুস্থ। প্যারালাইসিসে পড়ে আছেন পাঁচ বছর ধরে।’
থমকে গেলাম কথাটা শুনে। মেয়েটা এতো সহজ সরলভাবে তার অসহয়াত্বের কথাটা বলে ফেলবে ভাবতে পারিনি। অন্তত: আমি হলে এভাবে বলতামনা। মুখে বললাম,‘সরি বর্ষা। এখন তাহলে আপনাদের পরিবার কিভাবে চলে?’
বর্ষা মাথা নিচু করে রাখলো। চায়ে চুমুক দেবার কথা বেমালুম ভুলে বসে আছে। আমি বললাম,‘তোমার কোন ভাই নেই?’
বর্ষা এপাশ ওপাশ মাথা দোলালো। নেই।
 ‘এদিকে এসেছিলেন কেন?’
‘সামনে ঈদ তো তাই একটা জিনিষ বিক্রি করতে এসেছিলাম।’ বর্ষা বললো।‘এভাবে বাড়ির জিনিষপত্র বিক্রি করে কোনমতে বাজার করতে হয়। আমি একটা টিউশনি করি। আমার আরেক বোনও টিউশনি করে। এভাবে সংসার চালানো যায়না ভাইয়া। বাবার অনেক ওষুধ লাগে। সামনে ঈদ। কিভাবে কি করি বুঝতে পারিনা। মা বললো তার একটা নেকলেস বিক্রি করে দিতে। গত সপ্তাহে আমার বোনের একটা আংটি বিক্রি করেছি।’
বিশ্ময় বাঁধ মানছেনা আমার। আমি এতো অসহায় একটা মেয়েকে দেখছি অথচ কি অসম্ভব রূপসী সে! ভাবতেও পারছিনা যে হয়ত: এখনও না খেয়ে আছে। পেটে খিদে কিন্তু টাকা নেই ব্যাগে। তাড়াতাড়ি বললাম,‘কিছু খেয়েছেন?’
‘খেয়েছি।’ মেয়েটা শুকনো মুখে বললো।
‘মিথ্যে বলছেন। আপনি কিছু খাননি।’
‘বাসায় গিয়ে ভাত খাবো।’
‘তাতো খাবেনই। কিন্তু যে বৃষ্টি যাবেন কিভাবে?’
‘আমি এখন যাবোনা। অপেক্ষা করবো একজনের জন্যে।’ বর্ষা বললো।
অজান্তেই বুকের ভিতর একটা খোঁচা লাগলো। কার জন্য অপেক্ষা করবে বর্ষা? নিশ্চয় তার ভালোবাসার কেউ আছে। আহ্ কি ভাগ্যবান পুরুষ সে। এমন সুন্দরী এক নারীর মন পেয়েছে সে। জিজ্ঞেস করলাম,‘সে কখন আসবে?’
‘জানিনা।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো বর্ষা। ‘আমাকে ফোনে বললো দুপুরে যেতে। আমি সেই বারোটা থেকে অপেক্ষা করতে করতে বিকাল হয়ে গেল।’
‘আশ্চর্য তো! কেমন মানুষ সে?’ আমি রেগে উঠলাম। ‘আপনি যে বৃষ্টিতে ভিজে বসে আছেন খেয়াল নেই তার?’
‘খেয়াল রাখার প্রয়োজনটাই বা কি? সেতো আমার কেউ নয়। আমাকে বসিয়ে রাখতে পারলে আরো কম দামে ছেড়ে দেবো তারই অপেক্ষায় আছে সে।’
‘কি ছেড়ে দেবেন?’
‘বললামনা ঐ নেকলেসটা। দেড় ভরি আছে ওতে। এখন পঞ্চাশ হাজার টাকা ভরি। আর সে দিতে চায় মাত্র তিরিশ হাজার। মানে আমার লস পঁয়তাল্লিশ হাজার। তারপরও অপেক্ষা করছে যদি আরেকটু দাম কমাই। আজ আমার টাকার খুব দরকার তাই তার কাছে এসেছি।’
আমার কথা বলার ভাষা নেই। প্রথম দেখায় আমি বুঝতেই পারিনি মেয়েটা এতো নিডি। আমি বললাম,‘আমি কি কিছু করতে পারি আপনার জন্য?’ তারপরও মনে একটা আনন্দ, যাক সে তার বয়ফ্রেন্ডের জন্য অপেক্ষা করছেনা।
আর তার বয়ফ্রেন্ড হয়ত: এখনও নেই। চট করে নিজেকে সামলে নিলাম আমি। বললাম,‘আচ্ছা, কোথায় তার দোকান, আমি কি কিছু করতে পারি আপনার জন্য?’
বর্ষা বাইরের দিকে তাকালো। বৃষ্টি আর বাতাসের গতি মনে হয় বাড়ছে। সন্ধ্যার মতো অন্ধকার হয়ে গেছে আশপাশটা। মাথা নাড়লো সে,‘না এই বৃষ্টির মধ্যে অপেক্ষা করতে পারেন আমার সাথে। যতক্ষন সে না আসে।’
‘আচ্ছা বোকা মেয়ে তো তুমি!’ রেগে উঠলাম আমি অনেকটা।‘কোন মেয়ে কি এতোটা বোকা হয়?’
বর্ষা চুপ করে থাকলো।
‘আমার কাছে অবাক লাগছে। এতো বড়ো একটা জিনিষ যার দাম অনেক বেশী সেটা তুমি এতো কম দামে ছেড়ে দিতে চাইছো। তুমি শুধু তার জন্যে কেন অপেক্ষা করছো? অন্য কোন সোনার দোকান নেই? আরও কোন দোকান ঘুরে দেখ তারা তোমাকে আরও বেশী দাম দিতে পারে।’ আমার স্মরন নেই কখন যে আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছি আমি।
মেয়েটা মাথা নিচু করে থাকলো।‘ভাইয়া আমার জায়গায় আপনি হলেও তাই করতেন। এই জিনিষ নিয়ে দোকানে দোকানে ঘোরা সম্ভব নয় আমার জন্য।  আর এভাবে ঘুরতে ঘুরতে যদি আমার পেছনে ছিনতাইকারী লেগে যায়? তাহলে তো সব হারাবো আমি।’
‘সেটা ঠিক।’ আমি চায়ে চুমুক দিলাম। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম মেয়েটাকে সাহায্য করবো আমি। কিন্তু কিভাবে করবো সেটা ভেবে বের করতে পারলামনা। বললাম,‘এক কাজ করুন আমাকে জিনিষটা দিন, আমি ওটা বিক্রি করার চেষ্টা করি।’
এক কথায় রাজি হয়ে গেল মেয়েটা। হাতের ব্যাগটা খুলে ভেতর থেকে নেকলেসটা বের করলো। চমৎকার ডিজাইনের সোনার নেকলেস। একনজর দেখলেই বোঝা যায় পুরাতন আমলের অথচ বাইশ ক্যারেটের সোনা। আমার যদিও এসব ব্যাপারে অভিজ্ঞতা কম তারপরেও অনভিজ্ঞ চোখে যতটুকু চিনলাম তাতেই বুঝলাম যে নেবে জিনিষটা তার পোয়াবারো। বর্ষা নেকলেসটা তুলে দিলো আমার হাতে। আমি তার সরলতায় বিশ্মিত ও হতভম্ব হলাম। বোকা মেয়ে, চেনেনা জানেনা একটা মানুষকে কিভাবে এতো টাকা দামের জিনিষটা দিয়ে দিতে পারে। আমি নেকলেসটা আমার প্যান্টের পকেটে রাখলাম।
মেয়েটা ওটা নিয়ে একবারও কোন কথা বললোনা। রবং সে প্রসঙ্গ বদলে ফিরে গেল তার পরিবারের কথায়। জানাল কতো কষ্টে তার বোন পরীক্ষা দিচ্ছে। তার বাবা তাকে কতো নৈতিকতা শিক্ষা দেয় প্রতি দিন। ‘বাবা বলে কাউকে কখনো মিথ্যা আশ্বাস দিতে নেই।’ বর্ষা বলে চলে। ‘বাবা বলে তোমার চলাফেরায় আরও সাবধানী হতে হবে যেন তোমাকে দেখে অন্য কোন মানুষ ভুল মেসেজ না পায়। বাবা আরও বলে এই বয়সটা ভুল করার বয়স। কিন্তু এই বয়সে ভুল করলে সারা জীবনে শোধরানো যায়না।’
‘আপনার বাবা একদম ঠিক কথা বলেন।’ আমি বললাম।‘আমার মা আপনার বাবার মতোই কথা বলেন।’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ। যাবে আমাদের বাড়িতে?’
‘যাবো। অন্যদিন। আজ তো বুঝতেই পারছেন কি বড়ো বিপদে পড়েছি।’
‘এটা কোন বিপদ নয়। আমি আছি না!’ আমি উঠে দাঁড়ালাম। ‘তুমি বসে বসে চা খাও আরেক কাপ, দেখবে আমি বিশ মিনিটে কাজ সেরে চলে আসবো।’
উঠে দাঁড়াতে দেখলাম মেয়েটা কেমন যেন একটু উশখুশ করছে। করাটাই স্বাভাবিক। এতো দামের একটা জিনিষ দু’মিনিটের পরিচয়ে একজনের কাছে তুলে দিয়েছে যার বাড়িও সে চেনেনা। আমি হাসলাম,‘কোন চিন্তা করোনা। ঢাকায় আমি নতুন নই। আমি তোমার এটা নিয়ে পালিয়ে যাবোনা। আচ্ছা ঠিক আছে এই নাও।’
পকেটে থাকা বেতনের পঁচিশ হাজার টাকা বের করে বাড়িয়ে দিলাম বর্ষার দিকে। ‘এটা রাখো। আর যা বিক্রি করতে পারবো সবটাই তোমাকে দিয়ে দেবো। এটা সিকিউরিটি হিসাবে তোমার কাছে রাখো।’
মেয়েটার চেহারা লাল হয়ে উঠেছে।‘কি যে বলেন ভাইয়া। আমি আপনাকে কেন বিশ্বাস করবোনা?’
‘না না ঠিক আছে এটা রাখোনা তোমার কাছে। দেখবে এটা এক লাখ টাকায় বিক্রি করে দেবো আমি। তুমি পারবেনা কারন ওরা তোমাকে দেখলেই বুঝে ফেলবে তোমাকে ঠকানো সহজ হবে।’ 
মেয়েটা ইতঃস্তত করে টাকাটা নিলো। বাইরে বৃষ্টি কমেছে। আমার গায়ে শার্ট নেই। ভেতরের গেঞ্জিটায় কয়েকটা ফুটো হয়ে আছে। মা বেশ ক’দিন বলেছেন সেলাই করে দেবার জন্য। আমাকে প্রতিদিন বাইরে যেতে হয় তাই আর সেলাই করা হয়নি। এখন মনে হলো কি ভুলটাই না করেছিলাম সেদিন। মা যদি সেলাই করে দিতো তাহলে মেয়েটার সামনে ছেঁড়া গেঞ্জি পরে বসে থাকতে হতোনা। আমাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে বর্ষা নিজের গা থেকে শার্টটা খুলে দিলো। এছাড়া আর করার কিছুই নেই আমার। এখান থেকে বেরুতে গেলে আমাকে শার্ট পরতে হবে। 
আমি শার্ট পরে নিলাম। বর্ষা অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভীষন মায়া হলো আমার মেয়েটার জন্য। সে হয়তো ভাবছে আমি ওকে পঁচিশ হাজার টাকা দিয়ে বাকি টাকাগুলো মেরে দেবো আমি। কিন্তু আমাকে বিশ্বাস করা ছাড়া তার আর কিছু করারও নেই। আর বিশ্বাস না করলে তার হয়ত: আজ রাতে পেটে ভাতও জুটবেনা।
‘যত তাড়াতাড়ি পারি আমি চলে আসছি। তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো।’ শেষবারের মতো তার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির মধ্যে নেমে পড়লাম আমি।



আমার শার্টের ভেতর কেমন যেন এক উষœতা, কেমন এক সুবাস। মেয়েটা কিছু সময়ের জন্য আমার শার্টটা পরেছিলো তাতেই...।
আমি অনেক কষ্টে অন্যদিকে মনোযোগ দিলাম। হেঁটে নেমে এলাম পুরানা পল্টন এর মেইন রোডে। উল্টো দিকে বায়তুল মোকাররম। সারি সারি স্বর্নের দোকানগুলো যেন রূপকথার রাজকন্যার মতো হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে আমার অপেক্ষায়। রাস্তা পার হয়ে আমি মার্কেটের সামনে এলাম। একটা স্বর্নের দোকানে ঢুকে পড়লাম। বৃষ্টিতে আটকা পড়া মানুষজন মার্কেট ছেড়ে নেমে পড়েছে রাস্তায়। দোকানে কাস্টমার নেই। তিন চারজন সেলসম্যান বসে বসে চা খাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে কাউন্টারের পিছনে। 
‘আমি একটা নেকলেস বিক্রি করবো।’ আমি বললাম। 
লোকগুলো তেমন কোন আগ্রহ দেখালো না আমার কথায়। আমি ভেবেছিলাম একথাটা শোনার সাথে সাথে তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর। তারা আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে এসব তারা প্রতিদিন শুনে দেখে অভ্যস্ত। একজন বয়স্ক সেলসম্যান আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো। তারমানে দেখতে চাইছে জিনিষটা। আমি পকেট থেকে বের করলাম বর্ষার নেকলেসটা। লোকটা আমার হাত থেকে নেকলেসটা নিলো তারপর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বললো,‘আপনার বাড়ি কি বগুড়া ভাই?’
আমি অবাক হলাম। ‘না তা হবে কেন?’ ভ্রু কুঁচকে বললাম।
লোকটা মাথা নাড়লো।‘অনেক দিন পর এই জিনিষ দেখলাম। কতো টাকা নিয়েছে আপনার কাছ থেকে?’
‘কতো টাকা মানে?’
‘মানে এটা তো সোনার নেকলেস নয়। ইমিটেশনের। তবে খুব যতœ করে বানানো যাতে আসল না নকল চেনা না যায়। দেখলেন না আমার চিনতেও কতো সময় লাগলো।’
‘পাগল নাকি? এটা একজনের মানে খুব গরিব এক পরিবারের শেষ সম্বল। এটা বিক্রি করে তাদের সংসার চলবে।’
‘তাদের সংসার যে এবার খুব ভালোই চলবে তা খুব বুঝতে পারছি।’ লোকটা দাঁত বের করে হাসলো। ‘আপনার চেহারা দেখেই বিষয়টা অনুমান করে নিয়েছি আমি। এসব তো কম ডিল করিনা রে ভাই। আপনি বড়া ঠকা ঠকে গেছেন এবার।’
আমি হতবাক, বিশ্মিত ও হতভম্ব। কি বলবো বুঝতে পারছিনা। বড় ঠকা বলতে কি মিন করতে চাইছে লোকটা? 
লোকটাও বুঝতে পারলো আমি তার কথা ঠিকমতো গিলতে পারিনি। সে বললো,‘মানে যে আপনাকে এটা দিয়েছে সে কতো টাকা রেখে দিয়েছে আপনার কাছ থেকে?’
‘না টাকা রাখবে কেন? আমি নিজে...।’ আমার কথা আটকে গেল মাঝপথে। লোকটার হাত থেকে নেকলেসটা ছোঁ মেরে নিয়েই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এলাম বাইরে। ছুটলাম যেদিক থেকে এসেছিলাম সেদিকে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিটা আবার বাড়তে শুরু করেছে। আমার কোনদিকে হুঁশ নেই। পাগলের মতো ছুটলাম পুরানা পল্টনের গলির দিকে। 

হোটেলের লোকটা আমার দিকে বোবার মতো তাকিয়ে থেকে বললো,‘আমি কিন্তু আপনাকে ইশারা করতে চাইছিলাম ভাইজান। সে আমার ইশারা বুঝতে পাইরা আপনারে অন্য কথায় নিয়া গেল, কইল আমার চোখ খারাপ। আপনে বুঝবার পারেন নাই।’
আমি হাঁপাচ্ছি,‘কোনদিকে গেছে সে?’
লোকটা উল্টোদিকে ইশারা করলো,‘হ্যার গাড়ি দাঁড়াই ছিলো ওদিকে। আপনি যাইতেই হ্যায় গাড়িতে উইঠাই চইল্লা গেল।’
আমি পকেট থেকে নেকলেসটা বের করলাম,‘ও যেসব কথা বললো সব কি মিথ্যা?’
‘কইতে পারুমনা ভাইজান। হ্যাদের গ্রুপ অনেক বড়ো আর শক্তিশালী। আপনে ওরে কতো দিসেন ভাইজান?’
‘পঁচিশ হাজার।’
‘ইশ ঈদের আগে আপনেরে এক্কেরে খালি কইরা দিয়া গেসে।’লোকটা মাথা নাড়লো।‘আমার সন্দেহ হইসিলো হ্যার কথা হুইনা। আমি বেশি কথা কইলে হয়ত: আপনে আমারে মাইর দিতেন। তাই কিছু কইতে সাহস পাই নাই।’
আকাশ তো অনেক আগেই আমার মাথায় ভেঙ্গে পড়ে আছে। ওটাকে সরানো দরকার। মনে মনে চিন্তা করলাম কোথায় যাই। এতো টাকা বোকার মতো হারালাম। চুপচুপে ভিজে ঝড়ো কাকের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। বাড়ি গিয়ে মায়ের সামনে পড়ার মতো সাহস রইলোনা বুকে। আগামীকাল ঈদের শপিং করতে যাবার কথা। তাছাড়া পাত্রী পক্ষ আসবে আমাকে দেখার জন্য। কোথায় পাবো টাকা? মায়ের জন্য একটা শাড়ী কেনার কথাও আছে। বর্ষার জন্য কিছু একটা করতে চাইছিলাম অথচ বর্ষার মতো আমার নিজেরই অবস্থা এখন। রাস্তায় নেমে এলাম আমি। বৃষ্টি আবার কমেছে। ভেজা শার্ট পরে হাঁটতে লাগলাম বাড়ির দিকে। এখন মনে হচ্ছে সুবাস নয়, পচা দুর্গন্ধ আসছে শার্টটা থেকে। মেয়েটা আমার পঁচিশ হাজার টাকা নিয়ে নকল সোনার একটা গহনা ধরিয়ে দিয়ে গেছে আমাকে। যাই হোক, ধরা একটা খেয়ে গেছি। এটা নিয়ে বেশিক্ষন ভাবা যাবেনা। টাকা হাতের ময়লা। এখন কোথাও থেকে ঈদের শপিং করার টাকা ম্যানেজ করতে হবে। একটা রিকসা ডেকে উঠে বসলাম আমি।


আমি চলে যাবার পর পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করলো হোটেলের বুড়ো লোকটা। বাইরে বেরিয়ে এদিক সেদিক তাকালো তারপর একটা নম্বরে ডায়েল করলো। আরেকটা বাড়ির ভেতর থেকে বর্ষা হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসে ঢুকলো বেড়ার হোটেলটাতে। হাতব্যাগ থেকে রাবার ব্যান্ডে বাঁধা নোটগুলো তুলে দিলো লোকটার হাতে,‘এসব আমি আর করতে পারবোনা বাবা।’ রাগ দেখিয়ে বললো সে। ‘তোমার বানানো কথা বলে মানুষকে এভাবে ঠকানো পছন্দ করিনা আমি।’
‘কি করবো রে মা? এই ছোট্ট জায়গার দাম হইলো বিশ লাখ টাকা। মাসে দিতে হয় পনেরো হাজার টাকা। তোদের পড়াশোনা,খাওয়া দাওয়া এসব কোত্থেইকা চালাই?’
‘এটাই শেষ। আর পারবোনা।’ গজ  গজ করতে করতে বললো বর্ষা। পা বাড়ালো রাস্তায়।
‘মা তানিয়া।’ পেছন থেকে ডাকলো বুড়ো।
‘বলো?’
‘এই পাঁচশো টাকা তোর কাছে রেখে দে। এতো কষ্ট করলি।’
‘লাগবেনা। বাড়ি ফেরার সময় আমার জন্য কিছু ফুল কিনে এনো। আজ আমার জন্মদিন।’