Showing posts with label রহিমা আক্তার মৌ. Show all posts
Showing posts with label রহিমা আক্তার মৌ. Show all posts

বর্ন.........................রহিমা আক্তার মৌ

বর্ন.........................রহিমা আক্তার মৌ

পস্থিত সুধী মণ্ডলী, আপনাদের সামনে এখন গল্প পাঠ করতে আসছেন জান্নাতুল ফেরদৌস ইভা।

নাম ঘোষণা করার সাথে সাথে ইভা মঞ্চের পাশে ডায়াসের দিকে এগিয়ে যায়, অবশ্য আগেই সে মঞ্চে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত ছিলো। পূর্বের আবৃত্তিকারের নাম ঘোষণার সময় সঞ্চালক বলেছিলেন,
-- এরপর মঞ্চে আসার জন্যে প্রস্তুত থাকবেন ইভা, জান্নাতুল ফেরদৌস ইভা।
সে কারণেই মানসিক প্রস্তুতি ছিলো ওর। এই প্রথম ভরা হল রুমে গুনি জনের সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে গল্প পড়ে শুনাবে ইভা। এর আগে অনেকবার কবিতা আবৃত্তি করেছিলো। কখনো নিজের কবিতা, কখনো বিখ্যাত কবিদের কবিতা। প্রথম যেদিন ইভা নিজের কবিতা নিয়ে মঞ্চে উঠে ওর দুই হাঁটু কাঁপতে থাকে। সেদিন পাশে ছিলো ফয়সাল আরেফিন। ফয়সালের অনুরোধেই নিজের কবিতা নিয়ে মঞ্চে উঠেছিলো। আজ ইভার পাশে নেই আরেফিন, শুধু পাশে নয় আরেফিন এখন শত শত মাইল দূরে।
স্টেইজের ডানপাশে রাখা ডায়াসে গিয়ে দাঁড়ায় ইভা। ওর বামপাশে প্রায় ১০/১২ টা চেয়ার, শুধু চেয়ার বললে ভুল হবে, এগুলো গদি ওয়ালা চেয়ার। মাননীয় প্রধান অতিথি বিশেষ অতিথি সহ গুণীজনরা বসে আছেন চেয়ার গুলোতে। গুণীজনের কাতারে রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও রয়েছেন। ইভা বলতে শুরু করলো,
-- উপস্থিত সবাইকে শেষ গোধূলির মায়াময় শুভেচ্ছা। আমি জান্নাতুল ফেরদৌস ইভা, পড়ে শুনাচ্ছি আমার লেখা গল্প "পেন্সিল রাবার"।

এই বলেই শুরু করে গল্প পড়া, গল্পটা ২৫০/৩০০ শব্দের হবে। গল্পের অনেক জায়গায় পেন্সিল রাবার শব্দগুলো ছিলো। পড়া শেষ, পুরো হল রুমে হাততালি পড়ে। ইভা মঞ্চ থেকে নামার জন্যে পা বাড়ালো ঠিক তখনি মঞ্চ থেকে এক অতিথি বলেন,
-- মঞ্চে উঠে কিছু বলার আগে বা পড়ার আগে নিজেকে তৈরি করে নিতে হয়। উচ্চারণ ঠিক করে করতে হয়। গল্প পড়ুয়া বার বার পেন্সিল শব্দটা উচ্চারণ ভুল করেছে, সে পেন্সিল এর জায়গায় পেনচিল উচ্চারণ করেছে। এটা ঠিক নয়, ভুল শব্দটা কানে খুব লাগছিলো।
কে এই সমালোচনা করছেন, তার কন্ঠ শুনেই বুঝে ইভা। মঞ্চ থেকে সোজা এসে নিজের জায়গায় বসে। যে হল রুমের সবাই হাততালি দিয়েছে গল্প পড়া শেষ হলে তাদের অনেকেই এখন ইভার দিকে তাকাচ্ছে। এতে ইভার কোন সংকোচ হচ্ছে না। সে স্বাভাবিক ভাবেই বসে থাকে। পরের গল্প পড়ুয়ার নাম ঘোষণা হয়, তিনি মঞ্চে উঠেন। ইভার খুব তাড়া আছে বলেই সঞ্চালক ওকে আগে মঞ্চে উঠতে দেয়। পরের গল্পকারের গল্পটা শুনে ইভা হলরুম ত্যাগ করে।

পরদিন আরেকটা প্রোগ্রামে সেই বিশেষ অতিথি উপস্থিত থাকেন, ইভাও নিমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে যায়। একটু সুযোগ পেয়ে বিশেষ অতিথির পাশে যায়। অমন বিশেষ ব্যক্তিরা কাউকে মনে রাখা অসম্ভব, মনে তাদের না থাকারই কথা। ইভা সালাম দিয়ে পাশে বসে, নিজের পরিচয় দেয়, উনি চেনার চেষ্টা করছেন। তখনি ইভা বলে,
-- গতকাল মঞ্চে যে পেন্সিল উচ্চারণ করতে পারেনি, আমিই সে।
-- ও আচ্ছা, কাল কি মন খুব খারাপ হয়েছিলো।
-- না মন খারাপ হয়নি, তবে আপনার বলার পর মঞ্চে আমি কিছু বলতে চেয়েছিলাম, বলার প্রয়োজন ও ছিলো। কিন্তু পারিনি, নিজের খুব ব্যস্ততা ছিলো বলে চলে যেতে হয়। আর মঞ্চে এত কিছু বলার জন্যে সময় ও থাকেনা। আসলে এই ভুল বা দোষ আমার নয়, এই ভুল এই দোষ আমাদের। এই ভুল এই দোষ আমাদের আঞ্চলিকতার, এটা সবাই জানে, তবে ঠিক ভাবে জানেনা। আমি কোন দিন একটা মঞ্চ পেলে বলবো সেই কথাগুলো।
-- ঠিক আছে বলিও, তবে সংশোধন করে নিও, এতে তোমারই ভালো।
-- দোয়া করবেন, ভালো থাকুন।

একমাস পর......

সেই একই হলরুমে সেই বিশেষ অতিথি সহ অনেক বিজ্ঞজনেরা বসে আছেন মঞ্চে। বলতেই হয় আজকের এই মঞ্চে নক্ষত্রের মেলা বসেছে। দর্শকের কাতারে যারা বসে আছে তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে নির্বাচন করা প্রথম দিকে কবিতা পড়া বা আবৃত্তি করার জন্যে। তাদের সাথে ইভার নামও থাকে। সঞ্চালক একজনকে মঞ্চে ডাকছে অন্য আরেকজনের নাম ঘোষণা দিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলছে। এই মুহূর্তে প্রস্তুত থাকতে বলা হয় জান্নাতুল ফেরদৌস ইভাকে। ইভা সে ভাবেই প্রস্তুত। পূর্বের আবৃত্তিকারকের আবৃত্তি শেষ হলেই সঞ্চালক বলেন,
-- এবার মঞ্চে আসছেন জান্নাতুল ফেরদৌস ইভা।
ইভা মঞ্চে উঠে ডায়াসে গিয়ে দাঁড়ায়, সবার উদ্দেশে বলে,
-- আসসালামু আলাইকুম, শুভ সন্ধ্যা। আমি জান্নাতুল ফেরদৌস ইভা, মঞ্চে খুব একটা পুরানো নয়, সখে দু-চার বার উঠেছি , আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছি। আমার লেখা একটা কবিতা পড়ে শুনাচ্ছি। আমি আগেই সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যদি উচ্চারণে কোন ভুল হয়ে যায়।
এই বলে ইভা কবিতা পড়া শুরু করে, পুরোটাই পড়া শেষ হলেই স্টেইজে থাকা এক নক্ষত্র বলে উঠেন,
-- কই কোথাও তো ভুল উচ্চারণ হয়নি, ঠিকই পড়েছো তুমি।
ইভা মনে অনেক সাহস শক্তি পায়। মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলে,
-- আপনাদের অনুমতি পেলে আমি দু-চারটি কথা বলতে চাই।
নক্ষত্রের দুজন বললেন,
-- অবশ্যই বলবে, বলো।
-- আমি দেশের দক্ষিণ অঞ্চল নোয়াখালীর মেয়ে, ছোট বেলা থেকে কিশোরী বয়স পার করি গ্রামেই। সেখানেই আমার হাতেখড়ি, আমার পড়ালেখা। গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে শহরে আসি।
আঞ্চলিকতার কারণে আমরা কিছু কিছু উচ্চারণ ভুল শিখে এসেছি। এখন কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে, তবে তাও আশানুরূপ নয়। এই ভুল উচ্চারণ গুলো আমার শিক্ষকদের নয়, এগুলো আমার অভিভাবক বা গুরুজনদের ও নয়। এটা আমাদের অদৃশ্য আঞ্চলিকতার। এটা কি দোষ নাকি ভুল তাও আমি বা আমরা জানিনা। কেউ নিয়ম গুলো তৈরি করেনি, তবে কেউ ভুল বলে বা দোষ বলেও ধরিয়েও দেয়নি।
উপস্থিত সবাই ইভার দিকে তাকিয়ে আছে। স্টেইজে থাকা বিশেষ অতিথি, প্রধান অতিথি সহ সকল নক্ষত্ররাজিরা ও মনোযোগ দিয়ে শুনছেন ইভার কথা। সে বলেই চলছে,
গ্রাম ছেড়ে শহরে এলাম, একই ভাবে উচ্চারণ করেই যাচ্ছি। মাঝে মাঝে অন্যদের সামনে কথা বললে ওরা হেসে উঠে, কিন্তু কেনো হাসে তা কেউ বলেনি। আমার বিয়ে হয় উত্তরাঞ্চলে। বিয়ের পরপরই সেখানে যাই। কথা বলতে গেলেই দেখি মাঝে মাঝে কথা শুনে অন্যরা হাসে, আমার কথার বা উচ্চারণের ভুল ধরে। ভুল গুলো ছিলো এমন যে পকেটকে বলতাম ফকেট। ঝাড়ুকে বলতাম জাড়ু। পিতাকে বলতাম ফিতা, আর ফিতাকে বলতাম পিতা। ভাইকে বলতাম বাই, বোনকে বলতাম ভোন। যারা শুনতো, তাদের কেউ কেউ সঠিকটা বলে দিতো। কিন্তু আমি তফাৎ খুঁজে পেতাম না। আমি ভাবতাম 'ব' আর 'ভ' একই তো, 'চ' আর 'ছ' একই তো, 'জ' আর 'ঝ' একইতো, 'প' আর 'ফ' একই তো। আস্তে আস্তে বুঝতে পারি বাংলা বর্নমালার উচ্চারণের কোথায় সমস্যা, এক পর্যায়ে বুঝি এ তো বিশাল সমস্যা। বর্ণ গুলোকে নিজেই খুঁজে বের করি। দেখলাম স্বরবর্ণ গুলো ঠিক থাকলেও ব্যঞ্জনবর্ণ গুলোর গ, ঘ, চ, ছ, ড, ঢ, জ, ঝ, প, ফ, ব, ভ, স, শ, ষ, ড়, ঢ় এর মতো জোড়া বর্ণগুলোতেই সমস্যা। ভাবলাম এটা কি আমার উচ্চারণ ভুল নাকি অন্য কিছু। অন্যরা যখন কথা বলতো আমি মন দিয়ে শুনতাম। অবসর সময়ে এই নিয়ে ভাবতাম। কিন্তু তখন আমার পাশে নোয়াখালীর আমি ছাড়া কেউ ছিলোনা বলে তফাৎ করতে পারিনি। অপেক্ষা করতাম প্রিয়জনদের কাছে আসার।
একমাস থাকার পর আমি শহরে এলাম, নিজের মা ভাই বোন ও এলাকার লোকজনের কথা শুনতে শুনতে আসল বিষয় আবিস্কার করি। দেখলাম আমরা আমরা যখন কথা বলি তখন বুঝতে কারো কোন সমস্যা হচ্ছে না, কেউ কারো দোষও ধরছে না। উচ্চারণের তফাৎ হলেও আমরা ঠিকই বুঝে যাই আমাদের শব্দগুলো বা কথা গুলো। আমাদের কাছে এটাকে হাস্যকর ও মনে হচ্ছে না। একটু একটু করে সংশোধন করা শুরু করলাম নিজেকে।
আমি শহরে থাকলেও মা আর ছোট ভাইরা থাকতো গ্রামে, গ্রাম থেকে ওরা শহরে আসে। ছোট ভাই অমিতকে স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে যাই। স্যাররা অমিতকে কিছু মৌখিক প্রশ্ন করে, তার মাঝে একটা প্রশ্ন ছিলো,,,,
অভিভাবক এর ইংরেজি শব্দ কি ?
অমিত জবাব দিলো, কিন্তু F এর উচ্চারণ P বলল। স্যাররা বললেন হয়নি। আমি স্যারদের বলি,
-- ওকে লিখতে দিন, ও সঠিকটাই লিখবে।
উনারা লিখতে দিলো, অমিত ঠিকটাই লিখেছে। এরপর স্যারদের বলি,
-- এটা ওর ভুল নয়, এটা আমাদের আঞ্চলিকতার প্রভাব, এটা কারো তৈরি করা নয়, এটা একটা চলমান ভাষা বা বর্ণ ব্যবহার। স্যাররা বুঝতে পারেন বিষয়টা।
কথার মাঝে ইভা বলে,
-- মাননীয় অতিথিগণ আমি আপনাদের অনেক সময় নিয়ে নিয়েছি, আর নয়। তখনি সম্মানিত অতিথি বলেন,
-- সমস্যা নেই, তুমি বলো।
ইভা বলতে শুরু করলো,
-- আমি ভুলগুলো অনেকটাই ধরতে পেরেছি, তবে উচ্চারণে সমস্যা রয়েই যায়। আমার সন্তানরা হবার পর ওদেরকে সঠিক উচ্চারণ শিখাতে চেষ্টা করি। ওরা সঠিক উচ্চারণ শিখে। আমি যখন একটু ভুল করি ওরা আমায় ধরিয়ে দেয়। আমার লেখার সময়ে ভুল হলে ওরাই তা ধরিয়ে দেয়। অনেক সময় লেখার আগে বা বলার আগে ভেবে নিই কোনটা ঠিক লিখবো বা বলবো। আমি অনেকের মাঝে উচ্চারণের এই ভুল দেখতে পাই। তাদের অনেকেই যোগ্যতায় কর্মে বা পদবীতে অনেক উপরের অবস্থানে আছেন, কেউ চেষ্টা করেছেন, কেউ এখনো পারেননি। তাদের কারোই লিখতে তেমন সমস্যা হয়না। বলার ক্ষেত্রে সমস্যাটা দেখা যায়। তাই বলে বলছিনা সবার এই সমস্যা হয় বা হচ্ছে। কথায় আঞ্চলিক টান থাকা হলো একটা বিষয় কিন্তু বর্ণের ভুল উচ্চারণ, এটা কি আমাদের ভুল নাকি আমাদের দোষ আজো বুঝতে পারিনা। যে ভাবে আমি আমার বা আমার পরিবারের পরিবর্তন করাতে পেরেছি, সঠিকটা শিখাতে পেরেছি, আশাকরি আগামী প্রজন্ম এই উচ্চারণ গুলোর প্রতি সজাগ হবে। আর ওদেরকে যারা শিখাবেন তারাও প্রতিটি বর্ণের উচ্চারণের তফাৎ বুঝিয়ে শিখাবেন বুঝাবেন।

অমনিই পুরো হল জুড়ে হাততালি পড়ে যায়। স্টেইজ থেকেও জোরে হাত তালি আসে। ইভা বলে উঠে,

-- উপস্থিত বিজ্ঞজনেরা আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি পুরো কথা গুলো শুনার জন্যে। তবে আমি এও বলছি আজ এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে এত কথা বলতে আমার একটুও খারাপ লাগেনি, লজ্জা করেনি, যা সত্য তাই বলেছি। সত্য উচ্চারণে সাহস থাকতে হয়, লজ্জা নয়। কিন্তু সে দিন হল ভরা রুমে আমার একটা বর্ণ উচ্চারণে ভুল হওয়ায় ভরা রুমে তা ধরিয়ে দেয়া কতটা যুক্তিযুক্ত ছিলো তা আপনাদের কাছে রেখে গেলাম। সম্মানিত ব্যক্তি আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে বলতে পারতেন, হয়তো উনি তা ভাবেননি কেনো আমার উচ্চারণে এমন ভুল ছিলো। ধন্যবাদ উপস্থিত সবাইকে, ধন্যবাদ সম্মানিত সবাইকে, ধন্যবাদ এই প্রোগ্রামের আয়োজককে। আরো ধন্যবাদ জানাই যিনি আমায় এই প্রোগ্রামে আশার জন্যে নিমন্ত্রণ করেছেন তাকে।
এই বলে ইভা মঞ্চ থেকে নেমে আসে। কিছুক্ষণ পুরো হল রুম চুপ হয়ে থাকে। ইভা নিজের আসনে এসে বসে আর দম ফেলে, মনে হয় এতক্ষণ দম ধরেই রেখেছিলো। স্বাভাবিক হয়ে এদিক ওদিক তাকায়, ওর পেছনের সিটেই বসে আছে ফয়সাল আরেফিন।
-- আরে তুমি? তুমি কখন এলে ?
আরেফিন ফিসফিস করে বলে,
-- এখানে নয়, একটু পর বাহিরে যাবো। ক্যান্টিনে বসে কফি খেতে খেতে বলবো।
মিনিট ত্রিশ থাকে ওরা রুমে, পরে বেরিয়ে আসে। পাবলিক লাইব্রেরীর ক্যান্টিন থেকে দুটো কফি নিয়ে আসে আরেফিন। বাহিরে খোলা আকাশের নিচে বসে, আরেফিন বলে,
-- ইভা তোমাকে নিয়ে আমার আর ভাবনা নেই, তুমি নিজের জায়গা খুঁজে পেয়েছো, অর্জন করেছো। মঞ্চে উঠতে সেদিন তোমার হাটু কাঁপছিলো, আর আজ তুমি দীর্ঘ সময় ধরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ডায়েসের সামনে এক সত্যের বর্ননা দিলে। আমি আসলে তোমায় এমনটিই দেখতে চেয়েছি।
-- তা ঠিক আছে, আগে বলো তুমি ঢাকায় এলে কবে?
-- গত কয়েকদিন থেকে তোমায় খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ছুটি পাচ্ছিলাম না। এই প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকার নিমন্ত্রণ পাই, তুমি আসবে তাও জানতে পারি। ভাবলাম তোমায় একটা সারপ্রাইজ দিলে কেমন হয়। তাই রাতে রওয়ানা দিলাম। তোমায় চমকে দিব বলেই আগে বলিনি। তোমায় চমক দিতে এসে নিজেই চমকের সাক্ষী হয়ে গেলাম। এক সত্যের সাক্ষী হলাম। আজ রাতের বাসেই চলে যাব আবার। তুমি ভালো থেকো, দেখা হবে হয়তো কোন এক শেষ গোধূলি কিংবা শান্ত বিকেলে।
মাত্র ৩৫ মিনিটের পাশাপাশি বসা দুজনার, কিছু কথা একান্তই নিজেদের, সমান্তরাল রেললাইনের মতো ওদের সম্পর্ক, হাতে হাত নেই, স্বপ্নের বাস্তবায়ন নেই, নেই দেনাপাওনা। তবুও জনম জনমের বন্ধন হৃদয়ের বোঝাপড়া নিয়ে বিদায় দেয় একে অপরকে। দিনটার শেষ এভাবে হবে ভাবেনি ইভা, আরেফিন ও ভাবেনি ইভা নিজেকে এতটা বাস্তববাদী করে গড়ে তুলেছে।

কুমারী মা ও একটি ভ্রুন ...............................রহিমা আক্তার মৌ (সেরা গল্প)

কুমারী মা ও একটি ভ্রুন ...............................রহিমা আক্তার মৌ (সেরা গল্প)
রপর বিশ থেকে পঁচিশটা কল করে সাড়া না পেয়ে নাবিলা কয়েকটা খুদেবার্তা পাঠায়।

"প্লিজ রাকিব কল ধরো।"
"প্লিজ রাকিব কল ধরো, জরুরী কথা আছে।"
রাকিব কল ও ধরেনি খুদেবার্তার জবাব ও দেয়নি। গতমাসের ৯ তারিখে নাবিলার পিরিয়ড হয়, এর আগের মাসে ১১ তারিখে, তার আগের মাসে ১৪ তারিখে। এই ভাবে প্রতি মাসে দুদিন করে এগিয়ে আসে বিশেষ দিনটা। কখনও আবার তিনদিনও এগিয়ে আসে। কিন্তু আজ ১০ তারিখেও পিরিয়ড না হওয়ায় চিন্তায় পড়ে ও। আর সে জন্যেই কল করে যাচ্ছে রাকিবকে।
রাকিব রায়হান একসময় রঙিন পর্দার মানুষ ছিলো, এখন সে ব্যবসায়ী। মাঝে মাঝেই ব্যবসা লাটে উঠে, আবার সময় সময় জোয়ারে ভাসে। রাকিবকে দেখলেই বুঝা যায় কখন তার ব্যবসার কি অবস্থা। নাবিলার অফিসের একটা কাজে দুজনের পরিচয়। পরিচয়ের পর প্রেম ভালোবাসা। দুই পরিবারের সবাই জানে ওদের সম্পর্কের কথা। রাকিবের পরিবারের একটা নিয়ম আছে। ছেলেদের অধিক বয়সে বিয়ে করানো। ওর বয়স ২৮ হলেও তার বড় দুই ভাই এখনো অবিবাহিত।

পরিবারের নিয়ম অনু্যায়ী বড় দুজনের বিয়ে হলেই রাকিব বিয়ে করতে পারবে। একজনের বিয়ে ঠিক হয়েছে, অন্যজনের জন্যে দেখাশুনা চলচ্ছে। রাকিবের জন্মদিন ছিলো গতমাসের ২৪ তারিখে। কয়েকজন বন্ধু আর নাবিলা সহ জন্মদিন পালন করে। জন্মদিনের আনন্দ শেষে রাকিব নিজেই নাবিলাকে বাসায় পৌছে দেবার জন্যে বের হয়, ঠিক তখনি মন এলোমেলো হয়ে যায়। পাশের এক আবাসিক হোটেলে চলে যায় দুজন। সারারাত সেখানে কাটিয়ে বাসায় আসে নাবিলা। এদিকে সারারাত নির্ঘুম কাটে ওর বিধবা মায়ের।
ছোট বেলায় ওদের দুই ভাই বোনকে আর ওর মাকে ছেড়ে বাবা নিরুদ্দেশ হয়। তখন ওদের বয়স মাত্র সাত আর পাঁচ। দুই সন্তান নিয়ে নাহার আক্তার গ্রামে চলে যান। সন্তানদের কথা ভেবেই আবার আসেন রাজশাহী শহরে। প্রায় পরেনো বছর পর ওরা বাবার সন্ধান পায়, কিন্তু কেউ কারো দায়িত্ব নিতে রাজি নয়, বা পরিচয় দিতেও রাজি নয়। এভাবে পার হয়ে যায় বছর তিন। গতবছর নাবিলার বাবা মারা যায়, খবর শুনে ওর মা বিধবার পোষাক পরেন। নাকের ফুল খুলে ফেলেন। বলতেই হয় হায়রে বাঙ্গালী নারী, যে স্বামী সন্তান জন্ম দিয়েই নিরুদ্দেশ সেই স্বামী মরার পর নিজেকে বিধবা পরিচয় দিচ্ছো। নাবিলার ভাই বিয়ে করেছে, চাকরির কারণে বউকে নিয়ে অন্য শহরে থাকে। বিকেল বেলায় রাকিব অন্য নাম্বার দিয়ে কল দেয় নাবিলাকে।

-- হ্যালো নাবিলা কেমন আছো?
নাবিলার মুখে কথা নেই, হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। ওপাশ থেকে রাকিব কিছুই বুঝতে পারছে না। বারবার জিজ্ঞেস করে
-- নাবিলা কি হয়েছে তোমার, তুমি এমন করছো কেনো?
জবাব না পেয়ে রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। নাবিলা কাঁদতেই থাকে প্রায় মিনিট তিন। আস্তে কান্না থেমে আসে।
-- নাবিলা এবার বলো কি হয়েছে, খালাম্মার কোন সমস্যা।
-- না, আম্মা ভালো আছে। তুমি কই ছিলে, তোমার মোবাইল কোথায়? সকাল থেকে আমি কত কল দিয়েছি তুমি ধরোনি কেনো?
-- আস্তে বলো। আমায় তো কিছু বলতে দিবে। সকাল ভোরে বের হয়েছিলাম ব্যবসার কাজে। ছিনতাইকারী আমার সব নিয়ে যায়। সেই থেকে আমি বাইরে, প্রয়োজনীয় কিছু কাগজ হারাই, সে জন্যেই দৌড়াচ্ছি। মোবাইলের সিম গুলো ও তোলা হয়নি। আচ্ছা তোমার কি হয়েছে বলো, এমন করে কি কেউ কাঁদে?
-- রাকিব তোমার সাথে আমার জরুরী কথা আছে প্লিজ কালকেই দেখা করো।
-- তুমি বলো কি হয়েছে, কাল তো আমি সিমগুলো তুলতে যাবো। তুমি তো জানোই আমাদের কাস্টমার কেয়ার গুলোর যে অবস্থা। একটা সিম তুলতে দিনের অর্ধেক পার হয়ে যায়।
-- রাকিব তোমার সিমের চেয়ে ও এই বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
-- বলবে তো কি হয়েছে।
-- রাকিব পিরিয়ডের তারিখ তিনদিন পার হয়ে গেছে, আমার পিরিয়ড হয়নি এখনো।
-- পাগল তুমি, কি বলো এসব, হবে না কেন? দেইখো আজ রাতেই হয়ে যাবে। আচ্ছা তুমি কি আমার নাম্বারে কোন খুদেবার্তা দিয়েছো?
-- দিয়েছি, আচ্ছা এখন যে নাম্বার দিয়ে কথা বলছো এটা কার নাম্বার।
-- এটা আম্মুর নাম্বার। তুমি আবার এই নাম্বারে কল দিও না।
-- আচ্ছা তা না হয় দিবো না, কিন্তু আমি কি করবো।
-- তুমি আরো দুদিন অপেক্ষা করো।

এই ভাবে কথা বলে দুজন বিদায় নিলো। একদিকে রাকিব ব্যস্ত নিজের ব্যবসার কাগজপত্রের খোঁজে, অন্যদিকে কঠিন দিন পার করছে নাবিলা। এমন এক বিষয়, কারো সাথেই শেয়ার করতে পারছে না। এক একটা ঘন্টা যেনো এক একটা দিন পার হচ্ছে নাবিলার। কোথাও যাচ্ছে না, খাওয়া দাওয়া করছে না। যে রাতে পিয়ালী বাইরে ছিলো সে থেকেই মা ওর সাথে অন্যরকম আচরন করছে। দুদিন এই ভাবেই কাটিয়ে দেয়। অফিসেও যায়নি। দুদিন পর ঘন্টাখানেকের জন্যে বের হয়। এলাকার বাইরে গিয়ে দোকার থেকে একটা স্টিক কিনে আনে। ১৩ তারিখ ভোরে টেস্ট করে। কিন্তু কোন রেজাল্ট পায় না। রাকিবের সাথে কথা হয়েছে, তবে আগের মতো নয়। ওর একই কথা," হয়ে যাবে হয়ে যাবে"।
১৩ তারিখে অফিস যায়, দুপুর বেলায় লাঞ্চ করতে গিয়ে হঠাৎ শরীর খারাপ হয়, কেমন জানি লাগছে। তবুও অফিসে থাকে। সন্ধার আগে আগে বাসায় আসে। রাকিবকে জানায়।
-- নাবিলা তুমি দুদিন পর আবার টেস্ট করে দেখো।

দুদিন পরে নাবিলা ঘরে টেস্ট করে, রেজাল্ট পজেটিভ। রাকিবকে কল--
-- ঘরের এমন রেজাল্ট ভুল ও হতে পারে নাবিলা, তুমি হাসপাতালে পরীক্ষা করাও।
-- রাকিব আমার কখনো ২/৪ দিন পিছিয়ে যায় না, বরং এগিয়ে আসে। তুমি বলছো আমি করাবো, তুমি আসবে?
-- আমার আসাটা কি ঠিক হবে?
কথাটা নাবিলাকে কষ্ট দেয়। পরে ভেবে দেখে এই সময়ে ওর না আসাই ভালো। আশেপাশের হাসপাতালে গেলে সমস্যা আছে। দুরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে।
হাসপাতালে পরীক্ষা করতে দিয়ে আসে নাবিলা। আজ রিপোর্ট দিবে, রাকিবকে আসতে বলেছে নাবিলা। ঠিক সময়ে রাকিব চলে আসে। একটা ফাস্টফুডের দোকানে ওরা বসবে বলে ঠিক করা আছে। নাবিলা রিপোর্ট নিয়ে এসেছে। দুজন মুখোমুখি বসা। রাকিব তাকিয়ে আছে নাবিলার মুখের দিকে, আর নাবিলা তাকিয়ে আছে নিজের হাতে থাকা হাসপাতালের খামের দিকে।

এটা এখন শুধু একটা খাম নয়, একটা ভ্রূণের আগমনের খবর। পৃথিবীর এক অনাগত নবজাতকের খবর। রাকিব কি কথা দিয়ে শুরু করবে আজ ভেবে পাচ্ছে না। নাবিলার চোখ থেকে টপ করে একফোঁটা পানি পড়ে খামের মাঝে। রাকিব দেখতে পেয়ে বলে উঠে--
-- নাবিলা রেজাল্ট কি?
-- পজেটিভ।
-- কি করবে ভেবেছো?
-- আমি একা কি ভাববো, আমি জানতাম এমনি কিছু হবে। সেজন্যেই তোমায় ডাকা। রাকিব আমি ঘরে থাকতে পাচ্ছি না, অফিস যেতে পারছিনা। মায়ের মুখোমুখি হতে পারছিনা। সেদিনের পর থেকে মা আমার সাথে ঠিক মতো কথাও বলছে না। তুমি বলো আমি এখন কি করবো।
-- নাবিলা তুমি তো জানো এই মুহূর্তে বিয়ের কথা বাসায় বলা যাবে না। আর এমন খবর জানলে আমাকে বাড়ি থেকেই বের করে দিবে। কোথায় গেলে এই কাজ করা যাবে খোঁজ নাও। প্রয়োজনে আমিও যাবো তোমার সাথে। যে ভাবে হোক বেশিদিন পার হবার আগেই----
নাবিলা খামটা ব্যাগে ঢুকিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। রাকিব একবার ও ভাবেনি নাবিলা এখন চলে যাবে। নাবিলা কিছুই বলছেনা। সোজা বেরিয়ে আসে। রাকিব পেছন পেছন আসে, কিন্তু নাবিলা একবার ও পেছনে তাকায় নি।

ভাবছে রাকিবের মা কে কল করে সব বলে দিবে, আগত সন্তানকে সমাজে পরিচয় দিবে। কিন্তু রাকিব যে এমন করছে। দুদিনে নাবিলা একবার ও কল করেনি রাকিবকে। রাকিব অনেকবার কল করেছে, কল ধরেনি ও। অফিসের নাম্বারে কল করছে, অফিস থেকে জানিয়েছে নাবিলা অফিসে যায় নি। মা ওকে অনেক ধরণের প্রশ্ন করে, কোন জবাব নেই ওর মুখে। ২০ তারিখে নাবিলা একটা হাসপাতালে যাবে, আগে হাসপাতালের নার্সের সাথে কথা হয়েছে। একটা আল্ট্রাসোনোগ্রাম করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। নার্স বলে দিয়েছে সব। রাতে নাবিলা কল করে রাকিবকে--
-- কাল সকাল ১১ টায় তুমি ওভারব্রিজ এর পাশে এসো, আমি তোমায় নিয়ে হাসপাতালে যাবো।

-- কালকেই যেতে হবে নাবিলা, তোমায় কত কল করেছি, তুমি ধরো নি। আমি ব্যবসার জন্যে শহরের বাইরে। প্লিজ তুমি কালকে একাই যাও, আমি পরশু চলে আসছি, তখন যা করার আমি করবো।
নাবিলা কথা বাড়ায় না, কল কেটে দেয়। অফিসে যাবার সময়েই বাসা থেকে বের হয়, মাসের ৩ তারিখে বেতন পেয়েছিলো। বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে সব বকেয়া পরিশোধ করেছে। হাতে যে টাকা তা দিয়ে যাতায়াত খরচ আর টুকটাক সারতে হবে বেতন পাওয়া পর্যন্ত। এতো কিছু হিসাব করলে এখন হবে না। হাসপাতালে পৌছানোর আগেই নার্সের সাথে আবার কথা হয়।ডাক্তার দেখানো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে আজ আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়ে গেলো। ডাক্তার তারিখ দিয়েছে ২২ তারিখে এসে কাজ সারতে হবে। সব মিলিয়ে দশ হাজার টাকা লাগবে। ২২ তারিখে করতে হলে আজই ওকে একটা ইনজেকশন দিতে হবে। সব মিলিয়ে সেদিন ঘন্টা চার ওকে হাসপাতাল থাকতে হবে। নাবিলা ইনজেকশনটা দিয়ে সোজা পার্কে যায়। পাকা একটা বেঞ্চিতে বসে থাকে বিকেল পর্যন্ত। অফিস ছুটির সময় বাসায় ফেরে। আজ ওকে অন্য রকম লাগছে। চেহারায় কোন উচ্ছ্বাস নেই, মলিন এক অন্য নাবিলা। ঘরে ঢুকতেই মা ওকে আগলে ধরে।

-- তোর কি হয়েছে, আমায় বল।
কোন কথা না বলে নিজের রুমে চলে যায় নাবিলা। রাতে খাওয়ার সময় রুম থেকে বের হয়। টেবিলে খাবার রাখা, মা বারান্দায় গিয়ে বসে আছে। নাবিলা মায়ের কাছে যায়।
-- মা মরিচ পিয়াজ বেশি করে দিয়ে আমায় একটা ডিম ভেজে দিবে। খুব খেতে ইচ্ছে করছে।
মা ডিম ভেজে দেয়, নাবিলা আজ অনেক গুলো ভাত খেয়ে মায়ের পাশে ঘুমাতে যায়। মাঝে মাঝেই ওরা একসাথে ঘুমায়। নাবিলার একটা হাত মায়ের পেটের উপর দেয়া, অন্য হাত নিজের পেটে দেয়া। সারারাত কল্পনা করে কাটিয়ে দেয় ও।

সকালে অফিস যাবার আগে রাকিবকে কল দিয়ে সব জানায়। রাকিব সব শুনে চিন্তা করতে নিষেধ করে। টাকার কথা জানালেই রাকিব বলে--
-- আপাতত তুমি কারো কাছ থেকে হাওলাত নাও, আমি পরে দিয়ে দিবো।
-- আমি কোথায় পাবো টাকা, তুমি টাকাটাও দিতে পারবে না। রাকিব সব কি আমার দায়?
বলেই লাইন কেটে দেয়। মিনিট ১০ পরে ওর মোবাইলে খুদেবার্তা আসে-
"আমি কাল ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় থাকবো। পুরোটা সময় তোমার পাশেই থাকবো। "

ঘর থেকে বের হবার আগে মায়ের কাছে যায় নাবিলা। নিজেই জানে মায়ের কাছে কোন টাকা থাকে না। নাবিলার ছোট বেলার দুটি আংটি আর দুই জোড়া কানের দুল আছে মায়ের কাছে। শত অভাবে এই জিনিসটুকু আগলে রেখেছেন মা।
-- মা আমায় একজোড়া কানের দুল দিবে। সময় হলে আমি আবার তোমায় দিয়ে দিবো।
মা কোন কথা না বলে রুমে যায়, এক জোড়া দুল এনে মেয়েকে দেয়।
-- এগুলো তোর, তোর জিনিস তোকে দিতে আমার কোন আফসোস বা সংকোচ নেই। ভালো কাজে লাগাস, এটুকুই বলবো।
নাবিলার খুব ইচ্ছে করছিলো মা কে জড়িয়ে ধরে বলতে--
"মা এর চেয়ে ভালো বা খারাপ কাজ পৃথিবীতে আছে কিনা আমার জানা নেই।"
পাথরের মূর্তির মতো নাবিলা জিনিসটা নিয়ে বের হয়। অফিসে কল করে জানিয়ে দেয় আসতে একটু দেরি হবে। আগে যায় জিনিস বিক্রি করতে। বিক্রি করে সাড়ে এগারো হাজার টাকা পায়। এরপর অফিস যায়। বিকেলে অফিস থেকে সোজা বাসায় আসে। আজো ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খায়। আজ নাবিলা একা ঘুমায়। মাঝরাতে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে, স্বপ্নে দেখে ওরা মা মেয়ে হাত ধরে সাগরের পাড়ে হাটছে। বড় বড় ঢেউ আসে, ও মায়ের হাত শক্ত করে ধরে। জেগে গিয়ে নাবিলা ভাবনায় বসে, তার মানে ওর গর্ভের অনাগত সন্তান এক কন্যা শিশু। সাথে সাথে রাকিবকে খুদেবার্তা পাঠায়--

"তুমি কি এই শহরে এসেছো। কাল দশটায় ওভারব্রিজ এর পাশে দাঁড়াবে, আমি তোমায় তুলে নিয়ে যাব।"
মিনিট খানেকের মাথায় ফিরতি বার্তা আসে-
"আমি এসেছি ঠিক সময়ে আমি থাকবো।"
নাবিলার খুব ইচ্ছে করছে রাকিবের পাশে যেতে, ওর কোলে মাথা রেখে একটু ঘুমাতে। মুহূর্তে ইচ্ছেটা মরে যায়, বুঝতে পারে না কি থেকে কি হতে যাচ্ছে। এই সময়ে নিজেকে শান্ত রাখতে হবে এটা বুঝতে পারছে।

সকাল সকাল উঠে রেডি হয়, মা নিজেই ডিম ভাজি করে নাবিলাকে গরম গরম ভাত দেয়। খেয়েদেয়ে বের হবার সময় মা বলেন--
-- আজ এতো তাড়াতাড়ি বের হচ্ছিস। আচ্ছা যা, ভালো ভাবে ফিরে আসিস। আমি জানি তুই খারাপ কিছু করতে পারিস না, আমি আছি তোর সাথে সুখে দুঃখে।
কিছু না বলে বের হয়ে যায় নাবিলা। ভাবে, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ কাজ। মনে মনে বলে -

"মা এই মুহূর্তে দোয়া ছাড়া আর কিছুই চাই না। ভালোবেসে এক মুহূর্তের আবেগকে আয়ত্বে রাখতে না পেরে আমি যে খারাপ কাজটি করেছি। তাকে মাটিচাপা দিতে পরিবার সমাজ আর এই পৃথিবীর মাঝে নিজেকে ভালো মেয়ে হিসাবে পরিচয় দিতে আর রাখতেই আজ আমি অজানার পথে পা বাড়াচ্ছি মা। যে সন্তানের পিতৃত্বের পরিচয় নেই সমাজে, যে সন্তানকে সমাজ অবৈধ বলে মা, সে সন্তানকে আমি রাখবো কি করে বলতে পারো মা। যাকে ভালোবেসে সব দিয়েছি সে ও আজ অনেক দুরে, বুঝতে পারছিনা এটা কি ওর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নাকি সে পরিস্থিতির স্বীকার।"
ঠিক সময়ে রাকিব আসে, দুজন একসাথে যায় হাসপাতালে। যে পথটুকু একসাথে ছিলো, কেউ কারো সাথে কিছুই বলেনি। হাসপাতালে গিয়ে নার্সের সাথে রাকিবকে পরিচয় করিয়ে দেয়। রাকিব ওর স্বামী নাকি অন্যকিছু হয় তা বলেনি। কাজ খুব দ্রুত হচ্ছে। নার্স বলেছে দুই ঘন্টা নাবিলাকে ভেতরে থাকতে হবে, রাকিব বাইরে অপেক্ষা করবে ততক্ষণ। অতীত আর ভবিষ্যতের কথা ভাবার সময় নেই নাবিলার। নার্সের সাথে ভেতরে চলে যায়।

চোখ খুলে দেখতে পায় একটা এসি রুমে শুয়ে আছে নাবিলা। মনে পড়ে স্কুল জীবনের কথা, তখন ও গ্রামে থাকতো। উপরের ক্লাসের বিথীর পেট বড় দেখে অনেকে অনেক কথা বলেছে। এক পর্যায়ে দশ মাসের সন্তান প্রসব করার জন্যে বিথীর মা দুরের এক আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে যায় বিথীকে। জীবিত হয়ে জন্ম নেয়া শিশুকে ওরা গলা টিপে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়েছে। ঘটনা দুরে হলেও পরে সবাই জেনে যায়।
মনে পড়ে পাশের বাড়ীর ইয়াসমিনের কথা। দাম্পত্য জীবনে কলহ বলে ইয়াসমিন থাকতো নানার বাড়ীতে। একরাতে ওর স্বামী বাবর এসে ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে মিলিত হয়। হবার সময় প্রতিরোধক হিসাবে কনডম ব্যবহার করে। সেই মিলনে ইয়াসমিনের গর্ভে সন্তান আসে। গর্ভের সন্তান যখন আট মাস তখন সব জানাজানি হয়। বাবর সেদিনের ঘটনা অস্বীকার করে। সমাজ ইয়াসমিনকে চরিত্রহীন বলে, সে আঘাত সইতে না পেরে ইয়াসমিন আত্মহত্যা করে। ইয়াসমিনের মৃত্যুর পর বাবর স্বীকার করে সে সন্তান তার নিজের ছিলো। সে রাতে বাবর ইয়াসমিনের সাথে মিলিত হয়েছে। ইয়াসমিন জানে ওরা কনডম ব্যবহার করেছে, আসলে বাবর কনডম ব্যবহার করলেও তা নিজে ফুটো করে নেয়।

একটা ঠান্ডা রুমে শুয়ে কত কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে না রাকিবের মুখটা। নার্স আসে কিছু কথা বলে ওদের বিদায় দেয়। বের হয়েও রাকিবের সাথে কোন কথা নেই নাবিলার। বাসায় আসে দুপুরের পর। দিনের বাকি সময় রুমেই থাকে নাবিলা। নিজের বর্তমানের হিসাব মিলায়, বিথীর মতো অবস্থায় তাকে পড়তে হয়নি। ইয়াসমিনের মতো অকালে নিজেকে শেষ করতে হয়নি। সমাজ কখনোই জানবে না আজ নাবিলা একটা ভ্রুণকে হত্যা করে এসেছে। এই পৃথিবীর আলো দেখার আগে, বাতাস অনুভব করার আগেই তাকে হাসপাতালের ডাস্টবিনে ফেলে এসেছে। কোন কুকুর নিশ্চই বুঝবেনা এটা এক মানব সন্তানের ভ্রুণ ছিলো। কেউই জনতে পারবে না আজ এক কুমারী মা হওয়া থেকে বেঁচে গেলো।

কুপন..........................রহিমা আক্তার মৌ

কুপন..........................রহিমা আক্তার মৌ
জ আমাদের বন্ধুত্বের দশ বছর পূর্ণ হলো। এই বন্ধুত্বের খবর জানেনা একমাত্র তাহসান। পুরো নাম তাহসান আর কিবরিয়া। ঘরে আমি কিবরিয়া নামে ডাকলেও বাইরে সবার কাছে ও তাহসান নামেই পরিচিত। দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে পিকনিকের আয়োজন করা হয় আমার বসবাসের পাশেই।