Showing posts with label আরিফা সানজিদা. Show all posts
Showing posts with label আরিফা সানজিদা. Show all posts

বন্ধুত্ব.............আরিফা সানজিদা

বন্ধুত্ব.............আরিফা সানজিদা
পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নাই যে জীবনে বন্ধু শব্দটির সাথে পরিচিত হয়নি। জগতের সব থেকে সুন্দর,মধুরতম, গভীর এবং আত্মীক সম্পর্ক বলে যদি থাকে সেটা বন্ধুত্ব। বন্ধু শব্দটায় ই কেমন প্রাণ জুড়িয়ে আসে, ভেঙ্গেচূড়ে খুচরো পয়সার মত নিজেকে জমা রাখা যায় তো বন্ধুর কাছেই। তীরবিদ্ধ হওয়ার দিনে যে ঢাল হয়ে যায় সামনে সে একজন সত্যিকার বন্ধু, রক্তাক্ত হওয়ার দিনে যে মলম লাগিয়ে দেয় ক্ষতস্থানে সেই একজন বন্ধু। জগতে মানুষ যত দ্রুতই স্বার্থপর হয়ে উঠুক না কেন একজন সত্যিকার বন্ধু বোধকরি ততটাই আপন হতে থাকে। পুঁচকি মেয়েটাকে সেই একযুগ আগে স্কুলের মাঠে গোল্লাছুটের সার্কেলে পেয়েছিলাম, কাঁধের উপর বেণুনি নাচিয়ে ভোঁ দৌড়ে যেতেই হিঁচকে টেনে ফেলে দিয়েছিল যে মেয়েটি সেই মেয়েটির সাথে কোমড় বেঁধে ঝগড়ায় নেমেছিলাম, ওর চোখ দিয়ে তখন জলের ফোয়ারা নেমে কপোল ভিজিয়ে মুখ ফুলিয়ে দিয়েছিল, তখন শক্ত করে হাত মুঠোয় বন্দি করে খেলার মাঠ ছেড়েছিলাম।সেই মুঠোয়বন্দী শক্ত হাতদুটি অবিকল তেমন ই আছে। সময়ের পরিক্রমায় কত বন্ধু এসে গেছে, স্বার্থের খেলায় জিতে গেছে, পাটকেল ও ফিরিয়ে দিয়েছে প্রতিদানে কিন্তু এই একজোড়া হাত শত হার-জিতের, মান-অভিমানের,দুঃখ-সুখের, উল্লাস-বিপত্তিতেও ফারাক হয়নি। শৈশবের বন্ধুটি হারিয়ে যায় কৈশোরে,কৈশোরের বন্ধুটি হারিয়ে যায় যৌবনে,কিংবা কখনো যৌবনের বন্ধুটি হারিয়ে যায় বৃদ্ধকালে। কিন্তু এমন ও হয় শৈশবের বন্ধুটি কৈশোরে,যৌবনে এবং বৃদ্ধকালের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানোর দিনেও থাকে এমন বন্ধুত্ব ঠিক কতটাই না অমর হয়? স্কুলের বেঞ্চিতে যার পাশে বসতে না পারলে স্যারের লেকচারে মন দিতে পারতাম না, একদিন ক্লাসে যে কোন একজন উপস্থিত না হলে মন ভেঙ্গে আসতো সেই বন্ধুটিকেই ভালবাসি আমি, ক্লাসের নোটখাতা যার ব্যাগে তুলে দিতাম তার সাথে আমার নিঃস্বার্থ ভালবাসা। কৈশোরের নানানরকম ভুলের দিনে যে দুজন দুজনের দিকে নজর রাখতাম সেই আমার এই বন্ধুটি। যার সাথে থাকলে ভরসা পায় পরিবার, চোখবুঝে বলতে পারে 'ওর সাথে আছে ও' সেই আমার বিশ্বস্ত বন্ধু। অজস্র দিনে বলা হয়না কখনো ভালবাসি বন্ধু তোকে, যে বন্ধুর ভালবাসা পাওয়ার জন্যে প্রেমিকের মত হাহাকার জমাতে হয়না তার মত আপন জগতে কেই বা আছে! মা-বাবার পরে যদি কাউকে জায়গা দিতে বলা হয় এই মানুষটিকেই দিব আমি। উচ্চশিক্ষার জন্যে যখন মা-বাবার কোল ছাড়ি তখন এই একজোড়া হাত ই ছিল সবসময়ের জন্যে, মা-বাবাও নিশ্চিন্তে থাকে ওরা দুজন একসাথে আছে! শহরের ইট-পাথর-কংক্রিটের রাস্তায় অজস্রবার হোঁচট খেয়ে দিনশেষে গল্প জোড়া হয় এই মানুষটির সাথেই। অজস্রবার ভেঙ্গে পড়ার দিনে এই মানুষটির কাঁধে মাথা রেখেই আমি সাহস নিতে পারি। সবাই যখন ফিরিয়ে দেয় এই বন্ধুটির কাছে গিয়ে বলি তুই তো আছিস! 

কোন এক হিম-শীতল দিনে, কুয়াশার চাদরে যখন আকাশের একপ্রান্ত ঢাকা, প্রকৃতি সকল দহন, বর্ষা আর নীল ঝরিয়ে ক্লান্ত ঠিক তখন শীতের জমে যাওয়া দিনে সমস্ত দাবানল,রোদ বরফের ঠিক এমন দিনে এই পৃথিবীতে তোর আগমন! সকল কুয়াশা ভেদ করে প্রভাতের কিরণ উঁকি দিয়েছিল খুশিতে তোদের জানালায়। জীবনে যতই খরতা,দাবানল, বর্ষা আসুক যাক তুই থাকবি কোমল, উষ্ম রোদের মত। সেদিনের কান্নার আওয়াজ ধ্বনিতে উল্লাসে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল আপনজনেরা, হাঁটিহাঁটি পা পা করে যতই বড় হওয়া শুরু প্রতিবছর জন্মদিনে কত আনন্দ! 

এই জন্মবার্ষিকীতে ঘুম নেই আপনজনদের চোখে, হাসপাতালের এ মোড়ক থেকে অন্য মোড়কে ছুটে বেড়াচ্ছে! আমার কলিজায় ও ভেদ হয় তোর বিনিদ্র-মৃত্যু যন্ত্রণার কষ্টের ভাগীদার না হতে পেরে। একাকাশ, একসমুদ্র আর এক পৃথিবী সমান ভালবাসা উজাড় করে দিলে তুই সুস্থ হবি তো? আমার সমস্ত যাচনা, সমস্ত প্রার্থনা, সমস্ত ত্যাগ, সমস্ত ভালবাসা তোর নামে উজাড় করে দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালাম। এই বদ্ধদিন একদিন শেষ হয়ে যাবে প্রিয়, এই একলা থাকার দিন, এই যন্ত্রণা, ক্রন্দনের দিন, এই শ্বাসকষ্টে আটকে থাকা দিন তারপর আমরা আর কোনদিন আটকে থাকবোনা, গাঙচিলের বেশে উড়ে বেড়াবো মুক্ত-আকাশে। আমাদের প্রতিবন্ধকতার দিন সামলে নিব সুনিপুণভাবে! বন্ধু তুই ছিলি, তুই আছিস, তুই থাকবি সমস্ত জায়গা জুড়ে, সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে, সমস্ত মায়া জুড়ে আর যোজন যোজন মুহুর্ত জুড়ে থাকবে আমাদের অমর-বন্ধুত্ব! 

' একচিলতে মিষ্টি উষ্ম রোদের কিরণ ছড়িয়ে থাকুক জীবন জুড়ে'!!

আক্ষেপে কথোপকথোন....................আরিফা সানজিদা

আক্ষেপে কথোপকথোন....................আরিফা সানজিদা
-কিভাবে সময় কাটাচ্ছো ইদানীং? 

-এইতো লেখালিখি,টুকটাক গল্প পড়ি, বইয়ের ভাজে ভবিষ্যৎ খুঁজি, বিকেল বেলায় সূর্যের ডুবে যাওয়া দেখি আর রাতের আধারে বেলকনিতে বসে অন্ধকার দেখি!! আর তোমার তো বেশ যাচ্ছে দিন, বন্ধু বান্ধব হৈ,হুল্লোড় বেশ তো কাটাচ্ছো তাইনা?হাহা সময় পাও এসবের মাঝে নিজের অস্তিত্ব খোঁজার? 

-ভালোই তো হেয়ালি সুরে কথা বলতে শিখেছো দেখছি! কাব্যিক সুরে, তো কাব্যগ্রন্থ বের করলেই তো পার! 

- হাহা! মাঝে মাঝে এমন হেয়ালি হতে হয়, তা না হলে একাকিত্ব কাটানো যায়না! আর হ্যাঁ লিখছি তো আমি। 

- কি লিখো? 

- এইতো দু দন্ড লাইন, অনুভূতিকে শব্দচয়নে রূপান্তর, ঝলসে যাওয়া হৃদয়কে টেনেটুনে বাক্যতে পরিণত করা; এইতো এসব লিখছি! 

- শুনাবে একলাইন? 

- এখন তোমার যাচ্ছে বেশ দিন, ঝলসানো এই পোড়া বুকে কি হবে আর বিলীন! 

শান্ত চোখের চাহনি দিয়ে শীতল করবে কি? 

একটুখানি পাশে বসে দেখো ভেজা আঁখি!! 

- সবখানেই কি আমাকে টেনে আনো? 

- হুম! তোমাকে ছাড়া সবকিছুই যে অপরিপূর্ণ! এই যে আমি নিস্পলকে আকাশ দেখি তার পিছনে রয়েছে তোমার শূন্যতা! 

এই যে আমি কাজল চোখে কান্না লুকাই তার পিছনে তোমার উপেক্ষা, এই যে আমি বইয়ের ভাজে মুখ লুকিয়ে থাকি এর পিছনে ও আছে দূরে যাওয়ার প্রচেষ্টা! কিসে বলবে তুমি নেই? 

- জানো এসব না আমার ভালো লাগেনা, এসব কাব্যিকতা কেবল শুনতেই ভালো লাগে জীবন চলে না এসব দিয়ে। 

- জীবনটা কি খুব বেশি বড়? আমার এই ব্যকুলতা শুনে এক জীবন কাটিয়ে দেয়া যায়না কি? 

- না যায়না! 

- খুব কঠিন তুমি! 

- জীবন মানুষকে কঠিন করে দেয়! একদিন দেখবে তোমার এ আবেগ থাকবেনা, তখন বুঝবে জীবন কি। 

- হুম জীবন কঠিন মানলাম, আমি কঠিন হব তবে কি রাখা যায়না সেই জীবনে আমাকে পাশে? 

- সবার সবকিছু ভালোলাগেনা! জীবনকে গুছিয়ে নাও আর কতবার বলব তোমাকে। 

- হুম, ঠিক বলছ! সবার সবকিছু ভাললাগেনা! এই যেমন আমাকে তোমার ভাললাগেনা! একজীবনে পাবে এতটা আকুলতা কোথাও? 

- জানিনা! আজ উঠি আমি। 

- যদি না পাও তবে এসো দীর্ঘ আলোকবর্ষের পর কোন এক ক্লান্তি লগন গোধূলির সন্ধ্যায় সেদিন আমি লিখে দেব একখানি আকুলতা প্রেম উপাখ্যান-- দেখো কতকাল কাটিয়েছি তব পথ চেয়ে ঝাপসা চোখে কালি জমে হয়েছে ক্ষীণ, দেখো আজও চিনেছি তোমায়,মন থেকে হওনি এতোটুকু বিলীন! 

জানো সেদিন তোমার অজান্তে তোমারে চোখের কোণে একফোঁটা নোনা জল জমবে! সেদিন বুঝবে আমি ছিলাম কতটা তোমার!! 

- ভালো থেকো! 

-খুব তাড়া? ডাকছে তোমায় আড্ডা- হৈ হুল্লোড়? তবে যাও!ভাল থেকো আদিত্য!

প্রকৃতির শোধ...............আরিফা সানজিদা

প্রকৃতির শোধ...............আরিফা সানজিদা

 

তারপর অনেকগুলো আঁকিবুঁকি,  কাছে নিয়ে মিলানোর চেষ্টা করল সুহৃদ, বুঝতে পারলো ভালবাসি লেখা। পরের পৃষ্ঠায় ও ঠিক এমন ভাবে আঁকিবুঁকি। একের পর এক পৃষ্টা উল্টাতে লাগল আর লেখাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো, সুহৃদের মনে হল অক্ষর গুলোর উপর জলের ফোটা ফোটা,পরক্ষণে টের পেল ওর চোখ থেকে টুপটুপ জলের ফোটা গড়াচ্ছেও কান্না মুছলো না, ডাইরির মাঝে বিষাদগ্রস্ত হয়ে ডুবে যেত লাগল জলের ফোয়ারা  মেখে, অনুপমার অনুভূতির শব্দঁগাথায়

কাল সকাল কুরিয়ার সার্ভিস অফিস থেকে ফোন এলো, ঘুমে চোখ মেলে তাকাতে পারছে সুহৃদ! অনেকটা বিরক্তি নিয়ে ফোনটা ধরলোওপাশ থেকে শুনতে পেল আপনার একটা পার্সেল এসেছে, একটু কষ্ট করে নিয়ে যাবেনসুহৃদ ভাবতে লাগলো কে পাঠালো পার্সেল আবার, পরিচিত কেউ পাঠালে তো ফোন দিয়ে বলতঅনেকটা অবাক হলো আবার খুব আগ্রহ হলো বিষয়টা জানার জন্যে

বিকেলের রোদ পড়ে এলো, সুহৃদ হাঁটছে কুরিয়ার অফিসের দিকে, ছোট্ট একটা পার্সেল, হাতে নিতেই মনে হল একটা বইবিরক্তিভাব নিয়ে মনে মনে বলল একটা বইয়ের জন্যে এতদূর হেটে আসাটাই বৃথা গেল তাও কে পাঠিয়েছে তার ইয়ত্তা নাই

অনুপমার বান্ধবী নিলা, সেদিন বিয়ের অনুষ্ঠানের পর ওর রুমে গিয়ে ডাইরি টা পেয়েছিল, অনুপমা শ্বশুর বাড়ি থেকেই নরওয়ে চলে যাবে, ডাইরিটা যাকে নিয়ে লিখেছিল অনুপমা সেই মানুষটিকে নিলা খুব ভালভাবেই চিনে,সুহৃদের ঠিকানায় নিলা ই ডাইরিটা পাঠিয়েছে

র‍্যাপিং পেপারটা এক হিঁচকে টানে ছিড়ে ফেলল অনুপম, না এটা বই ছিল না একটি ডাইরিপৃষ্ঠা ওল্টাতেই বড় বড় অক্ষরে দেখতে পেল লেখা 'Beloved Diary 'তারপর ছোট অক্ষরে এলোমেলো ভাবে লেখা

''  নিয়ন আলোয় ডাইরির ভাজে তোমায় চিঠি লিখছি ডাকবাক্স বিহীন মনের ঠিকানায়, সবটুকু অনুভূতি দিয়ে লেখা শব্দ ছুঁয়ে দেখো বাতাসে, বেনামী খড়কুটো ভেবে ছিঁড়ে দিও তখনআমার কাকতাড়ুয়ার অপেক্ষার দিনে এই চিঠি, আমি আর তোমাকে ঘিরে থাকা অনুভূতিগুলো পাহারা দিয়ে আগলে রাখে বুকের ভেতর শূন্যতাদের!

লেখাগুলো কেমন যেন বিঁধে যাচ্ছিল ওর বুকের মাঝখানটায়, অথচ সুহৃদ জানে ও বেশ শক্তপোক্ত মানুষও দ্রুততার সাথে পৃষ্ঠা গুলো উল্টাচ্ছিল কিন্তু লেখাগুলো গভীর রেখাপাতে মুড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছিলঅনুপমার সাথে যোগাযোগ নাই তাও বেশ কয়েকবছর হলো, ঠিক মনেও নাই ওর কথা, তবে মাঝেমাঝে মনে পড়ত অনুর সাথে এমন টা না করলেও তো হত! এইটুকুই, এর বেশি আর কিছু করেনি সুহৃদ!

দ্বিতীয় পৃষ্ঠা উল্টালো, শুধু একটা তারিখ লেখা আর লেখা-

'কেমন আছো প্রিয়?'

তারপর অনেকগুলো আঁকিবুঁকিকাছে নিয়ে মিলানোর চেষ্টা করল সুহৃদ, বুঝতে পারলো ভালবাসি লেখাপরের পৃষ্ঠায় ও ঠিক এমন ভাবে আঁকিবুঁকিএকের পর এক পৃষ্টা উল্টাতে লাগল আর লেখাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো, সুহৃদের মনে হল অক্ষর গুলোর উপর জলের ফোটা ফোটা,পরক্ষণে টের পেল ওর চোখ থেকে টুপটুপ জলের ফোটা গড়াচ্ছেও কান্না মুছলো না, ডাইরির মাঝে বিষাদগ্রস্ত হয়ে ডুবে যেত লাগল জলের ফোয়ারা  মেখে, অনুপমার অনুভূতির শব্দঁগাথায়

অভিযোগ, অভিমান, ঘৃণাভালবাসা সব ধরনের অনুভূতিই লেখা ছিল, ওর উদ্দেশ্যই বলা একেকটি শব্দ শেলসমের মত বিঁধতে লাগল:

"প্রিয়!

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে,বৃষ্টির ছন্দে নিঃশ্বাসের উঠানামায় তোমার নামের আওয়াজ ধ্বনিত হচ্ছে মনের গভীরে! তোমাকে সারাদিন মনে নিয়ে হাটি, কাজে মন নাই, ঘুমিয়ে শান্তি নাই, সবখানে তুমি! আমি জানিনা কেন এত এত এত ভালবাসি তোমাকে! যখনি তোমার দুয়ারে ভালবাসা কাঙাল রুপে হাজির হই; অবহেলার সুনামি বইয়ে তাড়িয়ে দাও কোথাও যাব বল? যাওয়ার জায়গা নাই, আমি ভেঙ্গে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাই, টুকরো অংশ কুড়িয়ে আবার যাই, আবার ভেঙ্গে দেও ভেঙ্গে ভেঙ্গে  আমি গুড়ো হয়ে গেছি সেই কবে, তোমার দুয়ারে পরে থাকি, তুমি ফিরিয়ে দেও আমি আর তোমার দুয়ারে যাব না, যখনি বলি মনের কথা খুব করে শাসিয়ে দেও, আমার অভিমান অভিযোগ সব যেন আমারই, তুমি হয়ত কাউকে ভালবাস, আমি বুঝতে পারি  আমি তাই চলে যাব অনেক দূরে, দূরে থেকেও ভালবাসা যায়! কই তুমি দেখতে পাচ্ছ? পাবেনা, আমি অনুভব করছি আমি কত ভালবাসি!এটাই আমার প্রাপ্তি, আমি লিখছি তোমাকে নিয়ে, এখানে কথা ফুরায় না আমার, আর তুমি ধমক দিয়েও ছুড়ে ফেলোনা আমায়, আমার নিত্যদিনের ডাইরি তুমি! ভালবাসার রংতুলি, যেমন খুশি রাঙ্গাবো, কেউ জানবে না, কেউ দেখবেনা, শুধু মনের ভিতরের তুমি আর তোমার ভালবাসার পাগলি আমি ছাড়া!

কি করছ এখন তুমি? টেলিপ্যাথি দিয়ে খুঁজে দেখতে পাচ্ছি, তুমি বসে আছ আনমনে, কি যেন ভাবছ! কি ভাবছ? আমার কথা কখনো মনে পড়ে? আমাকে কখনো অনুভব কর তুমি? জানিনা কিচ্ছু জানিনা, আমি শুধু তোমাতেই মগ্ন থাকি, তুমি ভালবাস কিনা উত্তর খুঁজিনি, তবে বুঝেছি তুমি আমাকে কখনওই চাওনি, খুজনিআমার ব্যথায় নিলাভ হওনি আমি কেবল ভেঙ্গে চুড়ে আমাকেই বর্ণনা করেছি আমি এখন আড়ালে চলে এলাম, এবার একটু খুঁজবে কি? আমি ভাল আছি, আমার মন খারাপ নিয়ে ভাল থাকি, আমি একদিন চলে যাব ধরা ছোঁয়ার বাইরে, এত নিকটে ছিলাম বুঝোনি, তাই হারিয়ে গেলাম অন্য মঞ্জিলে!  কথা বলতে ইচ্ছে করছে, থাক আজ! পাগলের প্রলাপ কে শুনবে আর।।। সাবধানে থেকো, নিজের যত্ন নিও!    (  ২৭/১০/২০১৬)

 শুভসকাল! তোমাকে ভেবে একটা বেলিফুলের মালা গেঁথেছিলাম, এসব বড্ড ছেলেমানুষিসবাই বলে এই যুগে সত্যি ভালবাসতে নেইনিলা বলে এখনো কেন পড়ে আছি? উত্তরটা দিতে পারিনি ও বলে ভুল মানুষ কে ভালবেসেছি, কথাটা যাচাই করার অনুধাবন শক্তি নাই আমারভালবাসা আমার কাছে অন্যরকম  আমি এখনো বড্ড ছেলেমানুষিকি করবো বলো? সত্যিই ভালবাসি আগের থেকেও বেশি  ভালবাসা ঢাক ঢোল পিটানোর জিনিস না, আগে শুধু জানতাম সবাই জানুক এখন বুঝি গোপনেও ভালবাসা যায় এই অভিযোগ গুলি কাকে শুনাই আমি? তোমার নামে অনেক অভিযোগ আছে, যখন বলতাম অপমান করেছো, আঘাত দিয়েছো কথা দিয়ে এখন বলবো না কিছুই সব অভিমান অভিযোগ নিয়ে সরে আসতেছি,  ঘুম ভাঙলে কবিতা শুনাতাম, কবিতা তুমি বুঝোনা এসব ছেলেমানুষি  কিছু জিজ্ঞাসা করোনা উত্তর জানা নাই তোমাকে দেখার জন্যে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকে!

                                       ৩০/১০/২০১৬

  তোমাকে খুব মনে পড়তেছে, কথা বললে ভাল লাগত কিন্তু কত আর বেহায়ার মত এমন করবতুমিও বিরক্ত হও পিছনের কথাগুলো মনে করে দীর্ঘশ্বাস নেই সব মনে আছে, এখন লিখতে ইচ্ছে করছেনা  ভাল লাগছেনা যত্ন নিয়ো!

                               ৩/১১/১৬

তারিখগুলো মিলিয়ে দেখল সুহৃদ ঠিক তিনবছর আগের লেখা, ভীষণ রকম অবহেলা তোলা ছিল অনুর জন্যেযা কিছু বলত, কেবল বলা ই ছিল! একেক করে মনে পড়ে যাচ্ছেমেয়েটার পাগলামি গুলো ভীষণ পীড়া দিয়েছিল তখন, সম্পর্কটা ভেঙ্গে দিয়েছিল সুহৃদ ইকিন্তু তখনো তো অনেক কিছু বলত; কেবল হুম হ্যা বলেই এড়িয়ে যেত!

                      

"তোমাকে খুব মনে পড়ছে, মন খুলে কতদিন কথা বলিনা কি এক গোপন ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছি, এর নাম জানা নেই! এর শেষ কোথায় জানা নেই আমি হেরেছি নিজের কাছে, নিজের ব্যক্তিত্ব এর কাছে, কিন্তু ভালবাসার কাছে আমি বড্ড দূর্বল এই ব্যথা ঠিক কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে জানা নেই তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে খুব আমার কোন কান্নাই যে তোমাকে স্পর্শ করতে পারেনি এই নিঃশব্দ কান্না কিভাবে স্পর্শ করত? আমি ভুলতে পারিনা , আমি ছাড়তে পারিনা তাই নিঃশব্দে ভালবেসে যাই এই ভালবাসার কে কি নাম দিবে জানিনা আমি একা, এই রাতের ঝিঝিপোকার শব্দের মত একা, এই শব্দ কেউ শুনেনা আমার দীর্ঘশ্বাস জানে এই ব্যথার অনল, পুড়ে কেমন দগ্ধ হয়ে আছে মন কেন করছি আমি? কিসের জন্যে জানা নাই  এই মায়া থেকে মুক্তি চাই, এই কষ্ট থেকে মুক্তি চাই আমি বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে চাই!

                            ২৩/১১/১৬

 "তুমি আমাকে মিস না করলেও আমি তোমাকে খুব মিস করব করছি, আমার প্রতিটা কথা, প্রতিদিন খোঁজ নেয়া  তোমার কাছে নিছক কথা হলেও আমার ছিল একেকটা অনুভূতি কত বাহানায় রোজ পেতে চাওয়া! কি করে ভুলে থাকব আমি? তুমি ভুলে যাবে, ভুলেই গেছ!অনেক টা দিন কেটে যাবে, অনেক সময়! তোমাকে ভালবেসে তোমাকে মনে রেখে আমিই কষ্ট পাচ্ছি! থাক না জীবন জুড়ে এই ব্যথা, এই না বলা কথা! কেউ জানল না, কেউ শুনল না তুমি তো ভাল আছ, ভাল থাকছো, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছ এতেই আমি সুখি কাছ থেকে দেখে দূর থেকেও ভালবাসা যায় আমি কেউ ছিলাম না তোমার, কখনোই ছিলাম না এর থেকে পরম তিক্ত সত্য আর কি আছে জগতে? তুমি বিহীন কি জঘন্য জীবন আমার যদি জানতে!! থাক নাই বা জানলে

                               ৩/১২/১৬

 " জানোসেই ময়নাপাখিটা কথা বলতে শিখেছে, প্রথম ডাক টা সুহৃদ!

                           ৫/১২/১৬

 'তোমাকে খুব মিস করছি, অনেক এবং অনেক তুমি আমার হওনি কেন? হলে কি হত! কিছু হত তাই হওনি হয়ত তোমাকে সব বলা হয়ে গেছে, হয়ে গেলে কি বলতাম? তুমি কি বলতে? তোমার কিছু বলার ছিল? ছিল না তো যতটা কষ্ট উপেক্ষা পেয়েছি নতুন করে পাওয়ার, নতুন করে বইবার সামর্থ্য আমার নাই কথারা থেমে গেছে, সব কথা তো আমারই ছিল তোমাকে আমি পড়তে পারিনি এটা আমার ব্যর্থতাএকজীবনে কেউ কি কাউকে পুরোটা পড়তে পারে? কিংবা কিছুটা? তোমার আমি কিছুই বুঝলাম না আমার মনে হয় আমি খুব স্বার্থপর গোছের মানুষ, শুধু নিজের অনুভূতির কথাই ভেবে গিয়েছি তোমার কথা শুনিনি, বুঝতে চাইনি যে তোমার ও ভালোলাগা আছে সবসময় ভেবেছি তুমি আমার আমাকেই ভাববে কি হয়েছে এত অধিকার দেখিয়ে? কি হয়েছে এত ভালবেসে? পেরেছি কি ধরে রাখতে? শেষমেশ কতটা দূরত্ব  এমন টা আমি চাইনি জীবনটা টা খুব ছোট এমন গভীর কিছু বয়ে বেড়ানোর সাহস শক্তি সবারই হয়ে যায় মাঝেমাঝে মনে হয় আমি খুব দূর্ভাগ্য নিয়ে এসেছি আমার চারপাশ টা ঝটলা লাগে, কেউ আমাকে সত্যি সত্যি উদ্ধার করত আহ কি ভালো থাকা! আহ কি কষ্ট! তোমাকে ছুঁয়ে না দেখার! তবে আমি ছুঁইতোমাকে অনবরত ছুঁয়ে যাই এটাই আমার প্রাপ্তি,এটাই পাওয়া!

                         ১৮/১২/১৬

 "প্রতিদিন এই সময়টায় তোমাকে প্রচণ্ডরকম মিস করি, কেমন শূন্যতা আমাকে আঁকড়ে ধরে; জগতের কোন কিছুই যেন দূর করতে পারেনা এই যন্ত্রণা  বিছানায় ছটফট করতে থাকি কুঁকড়ে যাই ডানাকাটা পাখির মত অনেক কষ্ট হয় বুকের মাঝখানটায় অনেক সময় লেগে যায় এই শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে তুমি একটু ধরা দিবে আমার কাছে? তোমাকে পরখ করে দেখতাম কি আছে তোমার মাঝে? যার রেষ আমাকে বেপরোয়া করে তুলে এভাবে তুমি কি শুনতে পাচ্ছ এ আহবানকি নিদারুণভাবে তোমাকে চাইছি, কি গভীর ভাবেতুমি কি একবার আসবে?  তুমি বধির তুমি এই ডাক শুনোনা, তুমি বোবা আমার এত এত আকুতির প্রত্যিুত্তর দিবেনা

                          ২০/১২/১৬

 

দু' একলাইন কবিতার লাইন, দৈনন্দিন কথা এসব লেখা ছিল অনেক পাতায়সুহৃদ একটা বিষয় খেয়াল করল লেখার কোথাও ঘৃণা নাই, কেবল অভিমান আর অভিযোগ আর শূন্যতার ছড়াছড়িএভাবেই কি মানুষের অনুভূতি গুলো হয় অপরজন ছেড়ে গেলে? এই মানুষটি কে সুহৃদ কষ্টের সিঁড়িতে তুলে দিল? খুব অপরাধী লাগছে

 

 সুহৃদ ভাবতে লাগল এই অপরাধী লাগা এই অনুশোচনা শব্দে পরিণত করলে কেমন হত? অনুর অভিমান রা খিলখিলিয়ে হাসতো? অনুর অভিমান ভালবাসার কাছে এই অনুশোচনা চোখ মেলে তাকাবার সাহস পাবেনাঅনু কি এখনো এভাবে লিখে? কিভাবে লিখবে ডাইরীটা তো এখন সুহৃদের কাছে, বাকী পাতা গুলো যদি লিখত কেমন হত ওর শব্দগুলো? সুহৃদের এই মুহুর্তে সে অনুভূতিগুলো খুব ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছে, বলতে ইচ্ছে করছে আমি যাইনি কোথাও

অনু বাকি পৃষ্ঠাগুলো কেন লিখলোনা? সুহৃদের মনে হল এই পৃষ্ঠাগুলো অনুশোচনায় ভরিয়ে দেয়ার জন্যেই অনু লিখেনিঅনু কি এখনো এমন করে চায়? মানুষ একসময় অনুশোচনা করে পিছনের আকুতির জন্যে, সেই অনুশোচনা গুলো যদি হয় নিজেকে অপরাধী ভাবা তবে সেটার থেকে পরম তিক্ত কষ্ট আর নেইএই অনুশোচনা সুহৃদের পাওনা ছিল!

 অনু জিতে গেছে, সুহৃদ স্পষ্ট দেখতে পেল ওর অভিমানরা হাসছেসুহৃদ পৃষ্ঠা গুলো উল্টাতে লাগল! এ কেমন শাস্তি! নিজের স্বার্থের জন্যে সেই অনুকে কষ্ট দিল! ডাইরীটা স্পর্শ করতে ওর ভয় করছে এখন, এই বুঝি শেষ পাতায় লেখা ভেসে উঠবে আমি তোমাকে ক্ষমা করিনি! অনু যদি ক্ষমা করে দেয় তবে প্রকৃতি? প্রকৃতি তো কাউকে ছাড় দেয়না! প্রকৃতি এই শোধ তুলে দিল? নিজের ভিতর নিজে পিষ্ট হওয়া? প্রকৃতির শোধ বড়ই সুষ্ঠ.......






অনুশোচনাই প্রায়শ্চিত্ত............................আরিফা সানজিদা

অনুশোচনাই প্রায়শ্চিত্ত............................আরিফা সানজিদা
নীলুর বয়স ৩৬ এর কোঠা ছুঁইছুঁই , শ্যামলা লম্বা লাবণ্যময়ী চেহারা, কোঁকড়ানো চুলে বেশ স্নিগ্ধময়ী লাগছে এখনো, চোখে চিকন ফ্রেমের বাধানো চশমা; এই বয়সে এসে যেখানে সংসার,স্বামী, সন্তান সামলানোর কথা সে এখন বই পড়ার অভ্যাসে ব্যস্ত, রন্ধ্রে রন্ধ্রে অস্থিমজ্জায় বইয়ের নেশা মিশে আছে এখনো যেন। বারান্দার পাশের রুম টায় মস্ত বড় লাইব্রেরি বানিয়ে রেখেছে সেই বার বছর আগে থেকে, নীলু বলে এই ঘরটা হলো স্বর্গীয় অনুভূতির জায়গা, এখানে এলে আমি হারিয়ে যাই জ্ঞানের রাজ্যে, কবিতার রাজ্যে, রূপকথার রাজ্যে। বইয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা এই মানুষটির মনে গভীর কোন দুঃখ- কষ্ট আছে কিনা কেউ পড়তে জানেনা। অবশ্য এই বয়সে এসে কি কেউ দুঃখ - কষ্ট হিসেব করে? এই বয়সটা হলো দুঃখ-কষ্ট হিসেব করার মাঝামাঝি একটা বয়স, কখনো অতীতের স্মৃতি হাতড়ে বেড়িয়ে সময় কাটানো কিংবা অন্তিম যাত্রার অপেক্ষা করা। মানুষ আর কদিন ই বা বাঁচে?সেই হিসেব করলে তার এখন তিন ভাগের এক ভাগ বয়স হাতে আছে, এটাও বা কম কিসে। নীলু জানেনা নীলু কিসের অপেক্ষায় বেঁচে আছে। মানুষের অপেক্ষা গুলো ও কি আপেক্ষিক ?নীলু তা জানেনা। দুঃখ-কষ্ট, ভালবাসা, অভিমান এই জিনিসগুলো আপেক্ষিক হয়; তবুও একদিন অভিমান রা হারিয়েও যায়, কষ্টরা একদিন মিলিয়ে যায় দীর্ঘশ্বাসে, ভালবাসাও একদিন ঢেউ খেলানো বন্ধ করে দেয়, মনের সেই কল্পনায় কিংবা বাস্তবতার সমুদ্রে; কখনো বা তলিয়েও যায় আবার কখনো চর জাগিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে ভাবলেশহীন ভাবে। কিন্তু অপেক্ষারা? অপেক্ষাদের শেষ কোথায়? অপেক্ষাদের জন্যে যদি একটা বিরাম চিহ্নের জন্ম হত!অপেক্ষার পাশে কি আদৌ বিরাম চিহ্ন টেকে? টেকেনা। হারিয়ে যায় কেবল হারিয়ে যায় ,জীবনের মতই হারিয়ে যায়। পৃথিবীতে অপেক্ষাদের থেকে জঘন্যতম অনুভূতি আর কি হতে পারে? একবার যে অপেক্ষায় নিজেকে বন্দি করে সে নিজেকেই বন্দি করে ফেলে ধূসর ছায়ায়, বন্দি জিনিস যে ক্ষয় হয়, নীলু কি নিজের সুখের ক্ষয় করেনি এতদিন? তবুও কেন অপেক্ষা করতে ভাললাগে তার? নীলু জানে শুধু অপেক্ষা ই বেঁচে থাকে এখন সে! 

নীলু কি ফারহানের জন্য এখনো অপেক্ষা করে? ফারহান কি হয় নীলুর? প্রেমিক? ভালবাসার মানুষ? আমরণের সঙ্গী কিংবা স্বামী? নীলু হাসে, চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে আসে ক্রমশ, চোখ থেকে খুলে হাতে নেয় সেটা, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মুখ থেকে একটা আওয়াজ বের হয় 'এই দীর্ঘশ্বাসটার নাম ই বোধ করি ফারহান'। 

আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নেয় সে, এই বয়সের চোখের কান্না যে কাউকে দেখাতে নেই নীলু তা বেশ ভালভাবেই জানে। আর দেখবেই বা কে? ওর যে কেউ ই নেই। শেষ যে বার এই অশ্রু কোন মানুষ দেখেছিল তা ছিল ফারহান,তারপর আর কেউ দেখেনি।সেই ছোট্টবেলায় মাকে হারায় নীলু, বাবা ছিল স্কুল টিচার, মা বাবা কিংবা বন্ধু বলতে সে শুধু বাবাকেই চিনত। 

প্রতিবার বইমেলায় নিয়ে যেত বাবা,কতশত বই কিনত। বাবা বলত বই পড়লে কি হয় জানো মামনি? বই হচ্ছে আলো,মনের আলো! যত বই পড়বে তত তোমার মন আলোকিত হবে। বুদ্ধিতে দীপ্তিতে তুমি হবে সেরা থেকে সেরা। তুমি উড়তে থাকবে উঁচু থেকে উঁচুতে, বই শব্দটি এসেছে বহি থেকে, আর বহি শব্দটি আরবী শব্দ ওহি থেকে এসেছে, এই নামটিতে তাই অলৌকিকতার সুঘ্রাণ বয়! তুমি যত বই পড়বে বই তত তোমাকে নিয়ে উড়াল দিবে অচেনা অজানা রাজ্যে সেখানে গেলে তুমি বুঝবে কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ, তোমাকে উদার করবে বই, করবে নমনীয়। টুক করে যখন মন খারাপ হবে তুমি বই হাতে নিবে এক নিমিষে মন ভালো হয়ে যাবে। আরো কত কি বলত! ছোট্ট নিলু অত কি বুঝত তখন? রূপকথার রাজা রাণীদের বই পড়ে বাবাকে বলত বাবা আমি যদি রাজকন্যা হতাম যাদুর ছোয়ায় আমার ঘুম ভাঙত কিন্তু তুমি হচ্ছ আমার সোনাজাদু বাবা! 

নীলুর স্মৃতিপট টা একেক করে সামনে ভাসতে লাগল, সেই নীলু আর এই নীলুর মাঝে বেশ পার্থক্য! কিশোর বয়স পার হতেই নীলুর চোখ খুলে যেতে লাগল, যত বইয়ের সাথে সখ্যতা বাড়ছে ও ততই মগ্ন হতে শুরু করে। কিশোরী নিলুর মাঝে তীব্র স্বপ্ন ঝেঁকে বসে, বাবার দেখানো পথে চলতে থাকে নীলু। কিন্তু হঠাৎ একদিন বাবাও চলে গেলেন মায়ের চলে যাওয়া পথে! নীলু হয়ে গেল বেশ গম্ভীর, মামার কাছে মানুষ হওয়া নীলুর জগৎ টা ক্রমান্বয়ে গণ্ডীতে চলে এলো। তারপর? 

নীলু উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল, ঘুঘু ডেকে উঠল শিমুল গাছটা থেকে, দুপুরের এই সময়টায় রোদের মতই খাঁখাঁ করতে থাকে বুকের চারিপাশ, তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠে মন, শূন্যতা ঘিরে ধরে। চায়ের কাপে চুমুক রাখলে এই তৃষ্ণা কি কাটবে? খাঁখা রোদে কেউ চা পান করেনা,নীলু করে। সে একজন কলেজের লেকচারার, প্রতিদিন কলেজ থেকে ফিরে এসে সে এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে, আজ আর কলেজ নেই কিন্তু রোজকার অভ্যাস তাকে টানছে। এই অভ্যাস কি চায়ের অভ্যাস নাকি বুকের ভিতর যে শূন্যতা হাহাকার করে সেই শূন্যতা, সেই একাকীত্ব হাতড়ে বেড়ানোর অভ্যাস? একা থাকতে থাকতে ও কি একা থাকাটা অভ্যাস হয়ে যায় মানুষের? এই খারাপ লাগা, এই বুকের ভিতর হাসফাশ করা তো নিত্যদিনকার রুটিন, তাও কেমন গা ছাড়া ভাব নিয়ে নীলু থাকে। নীলু কি একজন সঙ্গীর সঙ্গ কখনো কামনা করেনা? ভালোথাকার চেয়ে আত্মসম্মান বড় হয়ে উঠলে আদৌ কি ভাল থাকা হয়?কিন্তু নীলুর এতেই তৃপ্তি! যে মানুষটি ছিল আশ্রয়, ছায়া, অভ্যাস, মায়া,প্রেম, ভালবাসা তার কাছে যখন আত্মসম্মান টিকানোর প্রশ্ন আসে তখন মানুষ কি করে? 

নীলু ভাবে আজ কি হল ওর,অতীত আজ কেন তাড়া করছে!চায়ের কাপে চুমুক রেখে চোখ বুলাতে লাগল সেই সেই আবেগময় ভালবাসার দিনগুলিতে, একে একে মনে করত লাগল জীবনের সেই রক্তক্ষরণের মুহুর্তগুলোর কথা। ক্যাম্পাসের সব থেকে দুর্দান্ত বাকপটু আর আসর জমানো ছেলে ছিল ও, হাসিয়ে মাতিয়ে রাখত গোটা ক্লাস,গিটারে সুর তুলত বিকেলের ক্যান্টিনে। আর নীলু তখন কিনা সবুজ ঘাসের মাঠের এককোণে বসে জীবনানন্দের কবিতা আওড়াতো, হুমায়ন আহমেদের রুপা পড়ে হিমুর জন্যে অপেক্ষার অনুভূতি কল্পনা করতো, কখনো দুইলাইন কবিতা লিখে নিজেই নিজের কাছে লজ্জা পেত, দুই মেরুর দু'জন ছিল নীলু আর ফারহান, শান্ত চুপচাপ স্বভাবের এই মেয়েটার প্রেমে পড়ল নাকি সে। যে মানুষটার কাঁধে থাকত গিটার,যাকে খুঁজে পাওয়া যেত আড্ডার আসরে তার এখন লাইব্রেরিতে নিত্য আসা যাওয়া। গুটিকতেক কবিতা মুখস্থ করে আওড়ায় বন্ধুদের সাথে, রাশিরাশি বই মালঞ্চে সাজিয়ে উপহার দেয়। 

ধীরে ধীরে নীলুও ভাবতে লাগল ফারহান কে নিয়ে, শৈশব, কৈশোরে বাবা আর বই ছাড়া বন্ধু ছিলনা কেউ, চারপাশে একটা দেয়াল ছিল। কেউ দেয়াল ডিঙানোর সাহস করেনি, সেই দেয়াল ধীরে ধীরে ছেদ হতে লাগল ফারহানের পদচারণায়। তারপর আর কোন বাধা ছিল না ওদের মাঝে। গভীরতম সেই বন্ধুত্ব সেই ভালবাসা মুগ্ধ করেছে আশপাশ, নীলু প্রচন্ড অভিমানে যখন গাল ফুলাত ফারহান জীবনান্দের বনলতা সেন কবিতাটি কয়েকশবার আবৃত্তি করে অভিমান ভাঙাত। নীলুর আবদার গুলি ছিল যতসব আজগুবি আজগুবি, এই কিনা হুমায়ন আহমেদের রুপা পড়া শুরু করল অমনি মাথায় ভুত চেপে বসত নীল শাড়ি পড়ে ফারহানের সাথে বকুলফুল কুড়াবে। এমন আরো আরো পাগলামি, সাহিত্য পড়া মেয়েরা নাকি এমন ই হয় নীলু এটা ভেবে নিজেই লজ্জা পায় আবার। 

হুট করে একদিন বর্ষার ভোরবেলায় ফারহান ভাবে আজ ওরা বিয়ে করবে, ভ্যানভরতি কদমফুল নিয়ে এসে হাজির হয়, লালশাড়ি পড়িয়ে সেই কদমফুলের মাঝে বসিয়ে সারা শহর ঘুরে বেড়ায়, নীলু হাসে শুধু হাসে। প্রশ্ন ছুড়ে দেয় ফারহানের দিকে এই যে আমরা বেমানান ভাবে বিয়ে করছি তাও আবার বর্ষায়, এই বর্ষার বৃষ্টির মত যদি আমাকে কাঁদতে হয়? ফারহান ভ্যান থামিয়ে নীলুকে নামিয়ে আনে, মুখ থেকে জলের ফোটা মুছিয়ে দেয়, বলে যতই দুঃখ-কষ্ট আসুক তোমার জন্যে আজকের দিনটার মতই ভালবাসা থাকবে। নীলু হাসে! চোখ থেকে অশ্রু বের হয়, এ যে আনন্দাশ্রু! পরম প্রাপ্তির কান্না। 
ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে ফারহান, একঘেয়েমি লাগে নীলুকে। বইয়ের তাক থেকে ছুড়ে ফেলে বই, নীলু হা করে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলতে পারেনা, মনের মাঝে ঝড় বয়ে যায়, মেঘ জমে, জল পড়ে। নীলু সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে, ফারহান ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। নীলু অশ্রু মুছে না কপোল থেকে, জল শুকিয়ে দাগ পড়ে যায়। নীলু আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, বুঝতে পারে না ওর ভুল কোথায়। 

রাত যত বাড়ছে, নীলুর অস্বস্তি লাগছে তত। এপাশ-ওপাশ করতে থাকে, বিছানা ছেড়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরের ল্যাম্পপোস্ট গুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলো দিচ্ছে।নীলু ভাবে ওদের কি ঘুম পায়না? ওদের কি কোন কষ্ট আছে? নীলুর এই মুহুর্তে ল্যাম্পপোস্টের নিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে, মা মারা যাওয়ার সময় নীলু নাকি চিৎকার দিয়ে কেঁদেছিল তারপর থেকে এমন বোবাকান্না। নীলু অপেক্ষা করে, ফারহান ফিরেনা। ও কি করবে বুঝতে পারেনা, ও কি মামার ওখানে ফিরে যাবে? কি বলবে সেখানে গিয়ে? না! ও কারো কাছে বোঝা হয়ে থাকতে চায়না, বিয়ের দু'বছর পর কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে! আজকে মায়ের কথা মনে পড়ছে নীলুর, মায়ের বুকে মুখ লুকাতে ইচ্ছে হচ্ছে! মায়ের আদর পায়নি নীলু। নীলু এই মুহুর্তে ভাবে ওর মত চরম দুঃখী এ জগতে কে আর আছে? যার মনের দুঃখ খুলে বলার মত একটা আপন মানুষ নেই তার মত অভাবী কেউ নেই। নীলুর এটাও মনে হচ্ছে এখন ও আসলে অভাবী মেয়ে! 

সময় গড়িয়ে যায়, একা থাকায় অভ্যস্ত হয় নীলুও। ফারহানের খোঁজ করেনা, কেন খুঁজবে? যে কোন কারণ না দেখিয়ে, না বলে এভাবে ছেড়ে চলে যায় তাকে খুঁজে কি হবে! কিন্তু সেই মানুষটির কি একবার ও মনে পড়েনা? নীলু কি আদৌ কোন অর্থ বহন করেনি ফারহানের কাছে? প্রতি শুক্রবারে কল্যাণপুর বৃদ্ধাশ্রমে যায় নীলু, এখানে কত মা -বাবারা থাকে, সন্তানরা তাদের সুখের জন্যে এখানে রেখে যায়। নীলু তাদের মা ডাকে বাবা ডাকে, বুকে জড়িয়ে নেয়, গল্প করে। শান্তি পায়, ভাললাগে! ভাবে আজ যদি আমার মা-বাবাও বেঁচে থাকত? এত অভাববোধ, এত শূন্যতাবোধ কি থাকত! 
রাস্তার পথশিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, টাকা দেয়, কখনো টিফিনক্যারিতে খাবার বহন করে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দেয়, শিশুরা ডাক দেয় মা! নীলুর মন ভরে যায় কাণায় কাণায়! বছর দুয়েক পর দরজার কড়া নাড়ে কেউ, নীলু গিয়ে সামনে তাকায়, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আবছা,অস্পষ্ট একটা ঘোরে পরে যায় মুখ থেকে কথা বেরোয় না! 
-নীলু আমাকে ক্ষমা করো, আমি ভুল ছিলাম, আমি ভেবেছিলাম তুমি শান্ত, সরল, গম্ভীর আমায় সুখী করতে পারবেনা তাই আমি মোহের পিছনে ছুটেছি, মস্ত বড় অন্যায় করেছি তোমার সাথে, আমাদের প্রতিজ্ঞার সাথে! আমি বিয়ে করেছিলাম অনুপমা কে, ও এ যুগের আধুনিক মেয়ে,কিন্তু ভালবাসা ছিল না সেখানে। তুমিই ঠিক ছিলে ; আমি ফিরে এসেছি তোমার কাছে, আমাকে দূরে তাড়িয়ে দিওনা! 
-কেন এসেছো? কার কাছে এসেছো? তুমি কি আমার কেউ? কেউ হও? তোমাকে দেখেই বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল,প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হচ্ছিল কোথায় ছিলে? কেন আসোনি এতদিন? বলতে ইচ্ছে করছিল তোমাকে না দেখতে দেখতে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে, অপেক্ষা করতে করতে আমার চোখ চাতক হয়ে রক্ত ঝরেছে অশ্রুর বদলে, বুকের ভিতরের হাহাকার আমায় পুড়িয়ে মেরেছে অজস্রবার! কিন্তু দেখো আমি কিছুই বলতে পারিনি, বরং ঘৃণা হচ্ছে খুব ; কিন্তু তোমাকে অসম্ভব রকম ভালবাসি! যখন কেউ প্রিয় মানুষকে দেখে তার কাছে তেষ্টার কথা, ভালবাসার কথা, অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে চোয়াল শক্ত করে ফেলে ঘৃণা ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকায় তখন সেখানে ভালবাসা থাকলেও থাকে আত্নসম্মান, থাকে অধিকারের প্রশ্ন! সেই অধিকার তুমি হারিয়েছো! না তুমি আমায় ছেড়ে গিয়েছিলে আর না অধিকার ছেড়েছিলে! যেদিন অনুশোচনা করতে করতে মনে হবে তোমার থেকে অভাবী, দুঃখী, অসহায় আর কেউ নেই সেদিন ফিরে আসবে, সেদিন তোমাকে ক্ষমা করব! 

ফারহান চলে যাওয়ার পর নীলু চিৎকার দিয়ে কাঁদে দীর্ঘ ২০ বছর পর! তারপর থেকে প্রতিবছর ওদের বিবাহবার্ষিকীতে ফারহান আসে, ক্ষমা চায়, অনুশোচনা করে, কাঁদে, চলে যায়। নীলু থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে যেন জগতে ওর কিছু করবার নেই, কিছু চাইবার নাই, কিছু দেবার নেই ,কিছু পাওয়ার নেই! 
নীলুর চা ঠান্ডা হয়ে যায়, বিকেলের রোদ পড়ে আসে, চোখে ক্লান্তি ঘুম ঘুম ভাব নেমে আসে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টায়, ফারহানের আসার দিন গুনে,এবার বিবাহবার্ষিকী বর্ষার মৌসুমে পড়বে। নীলু আলমারির দরজা খুলে সেই লালশাড়িটা নামায়, বুকের সাথে লেপ্টে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে! 
সকাল থেকে মুষলধারায় বৃষ্টি, সারারাত নীলুর ঘুম হয়নি, ভাবে এই বৃষ্টিতে ফারহান আসবে কিভাবে? বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় দেখে একটা কদমভরতি ভ্যান, পাশে ফারহান দাঁড়ানো, তাকিয়ে আছে বেলকনির দিকে। কিছুটা বয়স্কের ছাপ শরীরে পড়েছে, খোঁচা খোঁচা দাড়ি।খুব অসহায় লাগছে ওকে, নীলু ওর মন দেখতে পায় স্পষ্ট ; যেন বলছে নীলু লাল শাড়ি পড়ে এসো আজ সারা শহর ঘুরব আমরা। 

নীলু সেই লালশাড়ি পরে ঘর থেকে বের হয়, একটা মানুষ আর কত অনুশোচনা করবে? নীলুর ছিল অপেক্ষা আর ফারহানের অনুশোচনা, অপেক্ষা আর অনুশোচনার দেয়াল ভেঙ্গে আজ নতুন একটা কিছুর সূচনা হতে যাচ্ছে? পাঠক কি নাম দেবে এর? দুটি মানব-মানবী এই মুহুর্তে দু'জনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, দুজনেই শিশুর মত হাউমাউ করে কাঁদছে, হঠাৎ বৃষ্টিটাও থেমে গেল, দুজনের কানা দুজন শুনতে পেল, বৃষ্টি আড়াল করেনি মোটেও! দুটি মানুষের এই কান্না কতইনা অব্যক্ত কথা বলে গেল, বলে গেল তাদের অসহায়ত্বের কথা, একাকীত্বের কথা, অনুশোচনার কথা, অপেক্ষার কথা, ভালবাসার কথা! কিন্তু তা কেউ শুনতে পায়নি, ভাষা হয়না যার কোন। পৃথিবীর সব থেকে গভীরতম অনুভূতি গুলো এমনই হয় যা কোন ভাষায় প্রকাশ করা যায়না, প্রকাশ করতে হয় স্পর্শে, অনুভূতিতে। 
ভ্যানে উঠতেই ঝুম বৃষ্টি নামল, নীলু সারা শহরে কদম ফুলের পাপড়ি ছিটাচ্ছে আর হাসছে, একই রকম দৃশ্য ঠিক বারো বছর আগে যে ঘটেছিল, এই দুটি নর-নারীর যাত্রা কোথায় তারা তা জানেনা, শুধু গেয়ে উঠল মনে মনে-' এই পথ যদি না শেষ হত তবে কেমন হত তুমি বলোনা!' 
আকাশ গুড়ুম শব্দে ঢেকে বলে উঠল ওদের মনের সুরে সুর মিলিয়ে ভালবাসলে ক্ষমা করে দিতে হয়, অনুশোচনার থেকে বড় প্রায়শ্চিত্ত, ক্ষমার থেকে বড় মাহাত্ম্য আর অপেক্ষার থেকে মধুরতম গরল অনুভূতি জগতে আর কিছু নেই! জীবন যে একটাই! 

একজন কুহু অথবা সহস্র হৃদয়ের কান্না........................আরিফা সানজিদা

একজন কুহু অথবা সহস্র হৃদয়ের কান্না........................আরিফা সানজিদা

ফে
ইসবুকে নিউজফিড স্ক্রল করতেই আটকে গেল কুহুর দৃষ্টি, হাতে কাঁপন শুরু হল,ক্রমশ
নিঃশ্বাস ভারি হয়ে  গলায় ধলা পাকানো অনুভূব ক্রমশ অবশ করে তুলছিল কুহুর সমস্ত স্বত্বাকেচোখের পাপড়ি কখন যে ভিজে বর্ষণ শুরু হলো কুহু তা টের পায়না, একি চোখের বর্ষণ নাকি বুকের ভিতর  ছলাৎ ছলাৎ জলের ধ্বনি? নিঃশব্দ এই জলের ফোয়ারা কখনো দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয়ে অভিশাপ ছুড়ে আকাশপানে তবুও কিঞ্চিৎ হয়না শোধএই জন্মে কি শোধ হওয়া আর সম্ভব? আর সম্ভব? নিশ্চুপ এই কান্না গগন বিদারক আর্তনাদে পরিণত হল তারপর:

-না! এ জীবন চাইনা আমার! চাইনা! চাইনা! সুন্দর একটা জীবন চেয়েছি আমি, একটি স্বপ্ন,  অনেকগুলো সম্ভাবনাতবে কেন এমন হলো, হে খোদা! এ কোন পাপের শাস্তি আমায় দিলে? মানবজন্ম ঘেন্নার আমার

ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে কুহুর গলার স্বরআয়নার সামনে দাঁড়ায় গিয়ে, সেই নখের আঁচড়; সেই ছিঁড়ে যাওয়া ক্ষত এখনো স্পষ্টশকুনের নখের আঁচড় যে শরীরে বিঁধেছে সে শরীর জানে কতটা ঘৃণায়, কতটা অশুচিতে বেঁচে থাকতে হয়

দৌঁড়ে স্নানাগারে যায়  ; ঝর্ণা ছেড়ে জল ঢালেঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়, কত জল ঢাললে ধুয়ে মুছে যাবে সব? কুহু আবার কাঁদে,  জলের সাথে মিশে যায় এই কান্নাভাবে এইমাত্র যে নিউজটা দেখলাম সেই মেয়েটিও কি এমন কাঁদছে এখন? মেয়েটির পাশে যেয়ে বসতে ইচ্ছে হয় কুহুর, মাথার ধারে বসে চুলে বিলি কেটে দিতে ইচ্ছে করে ; তারপর বুকের সাথে লেপ্টে ধরে আর্তনাদে মেতে উঠে মেয়েটার কষ্ট লাঘব করে দিতে,  মেয়েটার আর কুহুর কান্নার জলের রঙ যে এক, দুজনের জল মিশে অভিশাপ হত;বারুদ হত; বর্ষণ হত;সেই বারুদ নরপিশাচদের কলিজা ভষ্ম করে দিতকত অশ্রুর অগ্নিতে বারুদ হয় কুহু জানেনা, একজনম কি কেটে যাবে তাতে? তাও চায় যেন নরপশুগুলো বিনাশ হয়, এভাবে বুক ফুলিয়ে না হাঁটে

গোধূলির বেলা পড়ে এলো, সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলো আকাশেবেলকনির গা ঘেষে দাঁড়ায় কুহু,এই বেলকনি কত আনন্দ ব্যথার সঙ্গী; এই গ্রীল আর কুহুর দু'হাতের স্পর্শ  জানে

ভাবতে থাকে সেই দিনগুলির কথা, কত সুন্দর ফুরফুরে দিন ছিলসাড়া পাড়া মেতে উঠত কুহুর আনাগোনায়মা-বাবার একমাত্র কন্যা ও, কিসের অভাব ছিল ওর? গান গাইতে জানে, ছবি আঁকতে জানে, কতইনা গল্প - কবিতা লিখত কুহু, পড়াশুনায় ও প্রথম সারির ছিলক্লাস মাতিয়ে রাখত যেই মেয়েটি সেই মেয়েটির ভাষা এখন কেউ পড়তে জানেনাকত ছেলে এই মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে কত প্রেমের কবিতা লিখেছিল-

- উপমায় তুমি অনন্যা প্রিয়া, চোখের তারায় হারাতে দিবে?

-দৃষ্টি মেলোনা, ঐ চোখে ভষ্ম হয়ে যাব, দাবানল বইবে বুকের পাঁজরায়

-তোমার চোখের কাজলে লেপ্টে রইব, ঐ চোখে জল এনে মুছে দিওনা রেখা

আর ও কত ছন্দে,কত উপমায় সেই কবিতা দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতআর এখন? সেই চোখের নীচে কালচে দাগ,কেউ কি প্রেমে পড়ে?  ছন্দ আনে মনে?

বাবা বলত, মেয়েটা হলো হরিণের ডাগর ডাগর চোখের, ঠিক ওর দাদীর মতবাবা চুমু খেত অজস্র সেখানে, বাবার চুমুর সেই ছোঁয়া মুছে গেছে অশ্রুর দাগেবাবা চোখের দিকে তাকায়না কতদিনতাকায়না নাকি তাকাতে পারেনা? বাবার বুকের পাজরায় ও কি বাণ ছুটে এমন? নাকি বাবার মনে প্রশ্ন আসে কেন আমি কুহুর বাবা হলাম?

বাবার চোখ দেখেছিল কুহু সেদিন,ঠিক দুবছর তিনমাস আটদিন আগের সেই ঘটনার পরে,সেই চোখে ছিল সমাজে মুখ দেখাবার লজ্জা,ভয়, চাপা কান্না- ছিল প্রতিবাদী দাবানলের অগ্নিসম রূপসমাজের কোন কোন শুভাকাঙ্ক্ষীরা এসে বলেছিল থানা পুলিশ হন,  এই পিশাচদের ছেড়ে দেয়া চলবে না, এর একটা বিহীত করতেই হবেবাবা ঠিকই জানত এখানে এই নরপশুদের শাস্তি হয়নাশুধু হয় পত্রিকার শিরোনাম, মামলায় কাগজে সীলমোহর তারপর আর খোঁজ মিলেনা

সেদিনের ঠিক দুদিন আগে রোজকার মতন কুহু বের হয় ক্যাম্পাসে, মোড় ঘুরতেই কানে আসতে থাকে শিষের আওয়াজ এ যেন নিত্যদিনেরপ্রতিবাদ করতেই ফুসলে উঠে নরপিশাচগুলো তারপর?

তারপর কুহু আর ভাবতে পারেনা, ঠিক দুদিন পর বাবার বুকের এসে কানায় ভেঙ্গে  পড়ে -

-বাবা! সব শেষ আমার, সব শেষ!এ সমাজ আমায় বাচঁতে দিলনা বাবা! আমায় ক্ষমা কর বাবা

বাবা সেদিন শুধু নির্বিকার চোখে তাকিয়ে রইল, কিছু বলবার ভাষা যে নেইহুশ ফিরতেই দেখে তার বুক খালি,দৌড়ে যায় কুহুর ঘরে কেবল ফাঁস পড়ল গলায়এক ঝটকায় খুলে ফেলে ওড়নার প্যাচশুধু বলল, মা তুই অন্তত বেঁচে থাক,যে সমাজ তোকে বাঁচতে দিলনা সেই সমাজ ছেড়ে এ শহর ছেড়ে অনেক দূরে গিয়ে বাঁচ মা, তুই শুধু বেঁচে থাক মা!  নইলে যে আমার পুরষত্ব বিলীন হয়ে যাবেসেদিন বাবা মেয়ে কেঁদেছিল, সেই কান্নার জলের মত এত পবিত্র এত স্নিগ্ধ এত স্বচ্ছ আর কি হতে পারে? সেই কান্নার সাক্ষী হয়েছিল দেয়ালের ঘড়ি, জানালার পর্দা,  বেলকনির গ্রীল আর ঘড়ির আড়ালের টিকটিকিটা

এই খবর বাতাসের আগায় পৌছে গেল আনাচেকানাচে, এখানে ওখানে ফিসফিসানি মেয়েটা....?শুধু পৌঁছল না বাবা মেয়ের বেঁচে থাকার যে যুদ্ধটা শুরু হল সেই খবরটা

 দুদিনবাদে সৌমিকের ফোন যার সাথে ভালবাসা ছিল, যার সাথে বিয়ের কথা পাকা হয়ে আছে সেই ভরসা করার, বুকের গহীনে আশ্রয় দেয়া মানুষটির ফোন:

-কুহু! মা-বাবা বিয়েটা মেনে নিলনা যে আর!

আর কিছু বলেনি সৌমিক,  জানতে চায়নি কুহু তুমি কেমন আছ? কুহু তুমি কি বেঁচে আছ? একবারের জন্যেও বলেনি, আমি তোমার সাথে আছি কুহু, এ অশুচি এই দাগ যে কেবল দেহের; আমাদের যে আত্মার সম্পর্কসমাজের এই দেয়া নাম যে কেবল ই নাম, এ সমাজ ছেড়ে অন্য সমাজে বসত গড়ব আমরা যে সমাজে নরপিশাচরা নেই, চোখের জল মুছে ফেল কুহু এই যে আমি তোমার আছি! কুহু কাঁদেনি একটুও তার যে কান্নার ভার শুরু হল সেই কান্নার সাথে ভালবাসার মানুষ চলে যাওয়ার যে কান্না তা যে কেবলই বেমানান!  শুধু মনে মনে বলল, পৃথিবীর সব পুরুষ ই কি এক? নাহ তা কি করে হয়,বাবা তো এক নয়, যে পুরুষদের জন্যে মৃত্যু পথে যাত্রা করলাম অন্য পুরুষ যে আমায় বাঁচিয়ে রাখলসেদিন যদি বাবা এই বিদেশ বিঁভুইতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত না নিত তবে সেই সমাজ বাঁচতে দিতনা যে

এমন ঘটনা রোজ দেখতে পায় কুহু, কুহু শুধু কাঁদে তখনএই দুই বছরে কত যে লোমহর্ষক ঘটনা পড়েছে পত্রিকা গুলোয়,কেউ গলায় ফাঁস দেয়,কেউ বিচার চায়,কেউ সমাজের গঞ্জনা সয়, কেউ বিচার পায় আবার কেউ নরপিশাচদের হাতেই বলি হয়কি করুন সে মৃত্যু!  কুপিয়ে,আগুনে পুড়ে, খন্ড-বিখন্ড সে লাশ পঁচে গলে মিশে যায় কখনো জলে কখনো মাটিতেকুহুর ও ইচ্ছে করে সেই লাশের মিছিলে অংশ নিতে, সেই মাটিতে সেই জলে সেই গোরে ফুলশয্যা রচে দিতে, বিলবোর্ড টানিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় এখানে একটা নারী ঘুমিয়ে আছে যার জীবন হওয়ার কথা ছিল ফুলের মত সুগন্ধিময়,পবিত্রকুহুর ইচ্ছে করে মৃত্যুর সাথে লড়াই করা এই বীরকন্যাদের নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করতে সেই রণে নরপিশাচদের  খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলতে তারপর  জিন্দা করে আগুনে পোড়াতে,প্রস্তরবর্ষণে মস্তক থেথলে দিতে কিংবা লাঞ্ছনা-গঞ্চনায় সমাজের দেয়ালে দেয়ালে এঁটে দিতেএকবার অন্তত একবার যেন বুঝতে পারে এই সম্ভম হরণের আর্তনাদ!

কুহু আবার কাঁদে, এ কান্নার রং পরাজয়ের রং! নরপিশাচদের শাস্তি দিতে না পারার পরাজয়, কুহু কাঁদে গভীর মুনাজাতে কাঁদে, অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদে, সিলিং ফ্যানে ঝুলতে না পেরে কাঁদেকখনো এ কান্নায় অশ্রু হয় কখনো রক্তক্ষরণদৌঁড়ে যায় স্নানাগারে,জল পড়ে,মুছে যায়না দাগ;অশুচি লাগে!কুহু আবার কাঁদে,অশ্রু মিশে যায় জলের সাথে