বন্ধুত্ব.............আরিফা সানজিদা
আক্ষেপে কথোপকথোন....................আরিফা সানজিদা
প্রকৃতির শোধ...............আরিফা সানজিদা
“তারপর অনেকগুলো আঁকিবুঁকি, কাছে নিয়ে মিলানোর চেষ্টা করল সুহৃদ, বুঝতে পারলো ভালবাসি লেখা। পরের পৃষ্ঠায় ও ঠিক এমন ভাবে আঁকিবুঁকি। একের পর এক পৃষ্টা উল্টাতে লাগল আর লেখাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো, সুহৃদের মনে হল অক্ষর গুলোর উপর জলের ফোটা ফোটা,পরক্ষণে টের পেল ওর চোখ থেকে টুপটুপ জলের ফোটা গড়াচ্ছে।ও কান্না মুছলো না, ডাইরির মাঝে বিষাদগ্রস্ত হয়ে ডুবে যেত লাগল জলের ফোয়ারা মেখে, অনুপমার অনুভূতির শব্দঁগাথায়।”
সকাল সকাল
কুরিয়ার সার্ভিস অফিস থেকে ফোন এলো, ঘুমে চোখ মেলে তাকাতে পারছে সুহৃদ! অনেকটা
বিরক্তি নিয়ে ফোনটা ধরলো।ওপাশ থেকে শুনতে
পেল আপনার একটা পার্সেল এসেছে, একটু কষ্ট করে নিয়ে যাবেন।সুহৃদ ভাবতে লাগলো কে পাঠালো পার্সেল আবার, পরিচিত কেউ পাঠালে তো ফোন দিয়ে
বলত। অনেকটা অবাক হলো আবার খুব আগ্রহ হলো বিষয়টা
জানার জন্যে।
বিকেলের রোদ পড়ে
এলো, সুহৃদ হাঁটছে কুরিয়ার অফিসের দিকে, ছোট্ট একটা
পার্সেল,
হাতে নিতেই মনে হল একটা
বই। বিরক্তিভাব নিয়ে মনে মনে বলল একটা বইয়ের জন্যে
এতদূর হেটে আসাটাই বৃথা গেল তাও কে পাঠিয়েছে তার ইয়ত্তা নাই।
অনুপমার বান্ধবী
নিলা, সেদিন বিয়ের অনুষ্ঠানের পর ওর রুমে গিয়ে ডাইরি টা পেয়েছিল, অনুপমা শ্বশুর
বাড়ি থেকেই নরওয়ে চলে যাবে, ডাইরিটা যাকে নিয়ে লিখেছিল অনুপমা সেই মানুষটিকে নিলা খুব
ভালভাবেই চিনে,সুহৃদের ঠিকানায় নিলা ই ডাইরিটা পাঠিয়েছে।
র্যাপিং পেপারটা
এক হিঁচকে টানে ছিড়ে ফেলল অনুপম, না এটা বই ছিল না একটি ডাইরি। পৃষ্ঠা ওল্টাতেই বড় বড় অক্ষরে দেখতে পেল লেখা 'Beloved Diary '। তারপর ছোট অক্ষরে এলোমেলো ভাবে লেখা
'' নিয়ন আলোয় ডাইরির ভাজে তোমায় চিঠি লিখছি ডাকবাক্স
বিহীন মনের ঠিকানায়, সবটুকু অনুভূতি দিয়ে লেখা শব্দ ছুঁয়ে দেখো বাতাসে, বেনামী খড়কুটো
ভেবে ছিঁড়ে দিও তখন। আমার কাকতাড়ুয়ার
অপেক্ষার দিনে এই চিঠি, আমি আর তোমাকে ঘিরে থাকা অনুভূতিগুলো পাহারা দিয়ে আগলে রাখে বুকের ভেতর শূন্যতাদের!
লেখাগুলো কেমন
যেন বিঁধে যাচ্ছিল ওর বুকের মাঝখানটায়, অথচ সুহৃদ জানে ও বেশ শক্তপোক্ত মানুষ। ও দ্রুততার সাথে পৃষ্ঠা গুলো উল্টাচ্ছিল কিন্তু লেখাগুলো
গভীর রেখাপাতে মুড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। অনুপমার সাথে যোগাযোগ নাই তাও বেশ কয়েকবছর হলো, ঠিক মনেও নাই ওর কথা, তবে মাঝেমাঝে
মনে পড়ত অনুর সাথে এমন টা না করলেও তো হত! এইটুকুই, এর বেশি আর কিছু করেনি সুহৃদ!
দ্বিতীয় পৃষ্ঠা উল্টালো,
শুধু একটা তারিখ লেখা আর লেখা-
'কেমন আছো প্রিয়?'
তারপর অনেকগুলো আঁকিবুঁকি, কাছে নিয়ে মিলানোর চেষ্টা করল সুহৃদ, বুঝতে পারলো ভালবাসি লেখা। পরের পৃষ্ঠায় ও ঠিক এমন ভাবে আঁকিবুঁকি। একের পর এক পৃষ্টা উল্টাতে লাগল আর লেখাগুলো চোখের
সামনে ভেসে উঠতে লাগলো, সুহৃদের মনে হল অক্ষর গুলোর উপর জলের ফোটা ফোটা,পরক্ষণে
টের পেল ওর চোখ থেকে টুপটুপ জলের ফোটা গড়াচ্ছে।ও কান্না মুছলো না, ডাইরির মাঝে বিষাদগ্রস্ত হয়ে ডুবে যেত লাগল জলের ফোয়ারা মেখে, অনুপমার অনুভূতির শব্দঁগাথায়।
অভিযোগ, অভিমান, ঘৃণা, ভালবাসা সব ধরনের অনুভূতিই লেখা ছিল, ওর উদ্দেশ্যই বলা একেকটি শব্দ শেলসমের মত বিঁধতে
লাগল:
"প্রিয়!
ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে,বৃষ্টির ছন্দে নিঃশ্বাসের উঠানামায় তোমার নামের আওয়াজ
ধ্বনিত হচ্ছে মনের গভীরে! তোমাকে সারাদিন মনে নিয়ে হাটি, কাজে মন নাই, ঘুমিয়ে শান্তি নাই, সবখানে তুমি! আমি জানিনা কেন এত এত এত ভালবাসি তোমাকে! যখনি তোমার দুয়ারে ভালবাসা কাঙাল রুপে হাজির হই; অবহেলার সুনামি বইয়ে তাড়িয়ে দাও। কোথাও যাব বল? যাওয়ার জায়গা নাই, আমি ভেঙ্গে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাই, টুকরো অংশ কুড়িয়ে আবার যাই, আবার ভেঙ্গে দেও। ভেঙ্গে ভেঙ্গে আমি গুড়ো হয়ে গেছি সেই কবে, তোমার দুয়ারে পরে থাকি, তুমি ফিরিয়ে দেও। আমি আর তোমার দুয়ারে যাব না, যখনি বলি মনের কথা খুব করে শাসিয়ে দেও, আমার অভিমান অভিযোগ সব যেন আমারই, তুমি হয়ত কাউকে ভালবাস, আমি বুঝতে পারি। আমি তাই চলে যাব অনেক দূরে, দূরে থেকেও ভালবাসা যায়! কই তুমি দেখতে পাচ্ছ? পাবেনা, আমি অনুভব করছি আমি
কত ভালবাসি!এটাই আমার প্রাপ্তি, আমি লিখছি তোমাকে নিয়ে, এখানে কথা ফুরায় না আমার, আর তুমি ধমক দিয়েও ছুড়ে ফেলোনা আমায়, আমার নিত্যদিনের ডাইরি তুমি! ভালবাসার রংতুলি, যেমন খুশি রাঙ্গাবো, কেউ জানবে না, কেউ দেখবেনা, শুধু মনের ভিতরের তুমি আর তোমার ভালবাসার পাগলি আমি
ছাড়া!
কি করছ এখন তুমি? টেলিপ্যাথি দিয়ে খুঁজে দেখতে পাচ্ছি, তুমি বসে আছ আনমনে, কি যেন ভাবছ! কি ভাবছ? আমার কথা কখনো মনে
পড়ে? আমাকে কখনো অনুভব কর তুমি? জানিনা কিচ্ছু জানিনা, আমি শুধু তোমাতেই মগ্ন থাকি, তুমি ভালবাস কিনা উত্তর খুঁজিনি, তবে বুঝেছি তুমি আমাকে কখনওই চাওনি, খুজনি, আমার ব্যথায় নিলাভ হওনি। আমি কেবল ভেঙ্গে চুড়ে আমাকেই বর্ণনা করেছি। আমি এখন আড়ালে চলে এলাম, এবার একটু খুঁজবে কি? আমি ভাল আছি, আমার মন খারাপ নিয়ে
ভাল থাকি,
আমি একদিন চলে যাব ধরা ছোঁয়ার
বাইরে,
এত নিকটে ছিলাম বুঝোনি, তাই হারিয়ে গেলাম অন্য মঞ্জিলে! কথা বলতে
ইচ্ছে করছে, থাক আজ! পাগলের প্রলাপ কে শুনবে আর।।। সাবধানে থেকো, নিজের যত্ন নিও! ( ২৭/১০/২০১৬)
৩০/১০/২০১৬
৩/১১/১৬
তারিখগুলো মিলিয়ে
দেখল সুহৃদ ঠিক তিনবছর আগের লেখা, ভীষণ রকম অবহেলা তোলা ছিল অনুর জন্যে। যা কিছু বলত, কেবল বলা ই ছিল! একেক করে মনে পড়ে যাচ্ছে।মেয়েটার পাগলামি গুলো ভীষণ পীড়া দিয়েছিল তখন, সম্পর্কটা
ভেঙ্গে দিয়েছিল সুহৃদ ই।কিন্তু তখনো তো
অনেক কিছু বলত; কেবল হুম হ্যা বলেই এড়িয়ে যেত!
"তোমাকে খুব মনে পড়ছে, মন খুলে কতদিন কথা বলিনা। কি এক গোপন ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছি, এর নাম জানা নেই! এর শেষ কোথায় জানা নেই। আমি হেরেছি নিজের
কাছে, নিজের ব্যক্তিত্ব এর কাছে, কিন্তু ভালবাসার কাছে আমি বড্ড দূর্বল। এই ব্যথা ঠিক কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে জানা নেই। তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে খুব। আমার কোন কান্নাই যে তোমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। এই নিঃশব্দ কান্না কিভাবে স্পর্শ করত? আমি ভুলতে পারিনা , আমি ছাড়তে পারিনা তাই নিঃশব্দে ভালবেসে যাই। এই ভালবাসার কে কি নাম দিবে জানিনা। আমি একা, এই রাতের ঝিঝিপোকার শব্দের মত একা, এই শব্দ কেউ শুনেনা। আমার দীর্ঘশ্বাস জানে
এই ব্যথার অনল, পুড়ে কেমন দগ্ধ হয়ে
আছে মন। কেন করছি আমি? কিসের জন্যে জানা নাই। এই মায়া থেকে মুক্তি চাই, এই কষ্ট থেকে মুক্তি চাই। আমি বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে চাই!
২৩/১১/১৬
৩/১২/১৬
৫/১২/১৬
১৮/১২/১৬
২০/১২/১৬
দু' একলাইন
কবিতার লাইন, দৈনন্দিন কথা এসব লেখা ছিল অনেক পাতায়।সুহৃদ একটা বিষয় খেয়াল করল লেখার কোথাও ঘৃণা নাই, কেবল অভিমান আর অভিযোগ আর
শূন্যতার ছড়াছড়ি। এভাবেই কি মানুষের
অনুভূতি গুলো হয় অপরজন ছেড়ে গেলে? এই মানুষটি কে সুহৃদ কষ্টের সিঁড়িতে তুলে দিল? খুব
অপরাধী লাগছে।
সুহৃদ ভাবতে লাগল এই অপরাধী লাগা এই অনুশোচনা শব্দে
পরিণত করলে কেমন হত? অনুর অভিমান রা খিলখিলিয়ে হাসতো? অনুর অভিমান ভালবাসার কাছে
এই অনুশোচনা চোখ মেলে তাকাবার সাহস পাবেনা। অনু কি এখনো এভাবে লিখে? কিভাবে লিখবে ডাইরীটা তো এখন সুহৃদের কাছে, বাকী
পাতা গুলো যদি লিখত কেমন হত ওর শব্দগুলো? সুহৃদের এই মুহুর্তে সে অনুভূতিগুলো খুব ছুঁয়ে
দিতে ইচ্ছে করছে, বলতে ইচ্ছে করছে আমি যাইনি কোথাও।
অনু বাকি পৃষ্ঠাগুলো
কেন লিখলোনা? সুহৃদের মনে হল এই পৃষ্ঠাগুলো অনুশোচনায় ভরিয়ে দেয়ার জন্যেই অনু লিখেনি। অনু কি এখনো এমন করে চায়? মানুষ একসময় অনুশোচনা
করে পিছনের আকুতির জন্যে, সেই অনুশোচনা গুলো যদি হয় নিজেকে অপরাধী ভাবা তবে সেটার থেকে
পরম তিক্ত কষ্ট আর নেই। এই অনুশোচনা
সুহৃদের পাওনা ছিল!
অনু জিতে গেছে, সুহৃদ স্পষ্ট দেখতে পেল ওর অভিমানরা হাসছে। সুহৃদ পৃষ্ঠা গুলো উল্টাতে লাগল! এ কেমন শাস্তি! নিজের স্বার্থের জন্যে সেই অনুকে কষ্ট দিল! ডাইরীটা স্পর্শ করতে ওর ভয় করছে এখন, এই বুঝি শেষ পাতায় লেখা ভেসে উঠবে আমি তোমাকে ক্ষমা করিনি! অনু যদি ক্ষমা করে দেয় তবে প্রকৃতি? প্রকৃতি তো কাউকে ছাড় দেয়না! প্রকৃতি এই শোধ তুলে দিল? নিজের ভিতর নিজে পিষ্ট হওয়া? প্রকৃতির শোধ বড়ই সুষ্ঠ.......
অনুশোচনাই প্রায়শ্চিত্ত............................আরিফা সানজিদা
নীলু সেই লালশাড়ি পরে ঘর থেকে বের হয়, একটা মানুষ আর কত অনুশোচনা করবে? নীলুর ছিল অপেক্ষা আর ফারহানের অনুশোচনা, অপেক্ষা আর অনুশোচনার দেয়াল ভেঙ্গে আজ নতুন একটা কিছুর সূচনা হতে যাচ্ছে? পাঠক কি নাম দেবে এর? দুটি মানব-মানবী এই মুহুর্তে দু'জনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, দুজনেই শিশুর মত হাউমাউ করে কাঁদছে, হঠাৎ বৃষ্টিটাও থেমে গেল, দুজনের কানা দুজন শুনতে পেল, বৃষ্টি আড়াল করেনি মোটেও! দুটি মানুষের এই কান্না কতইনা অব্যক্ত কথা বলে গেল, বলে গেল তাদের অসহায়ত্বের কথা, একাকীত্বের কথা, অনুশোচনার কথা, অপেক্ষার কথা, ভালবাসার কথা! কিন্তু তা কেউ শুনতে পায়নি, ভাষা হয়না যার কোন। পৃথিবীর সব থেকে গভীরতম অনুভূতি গুলো এমনই হয় যা কোন ভাষায় প্রকাশ করা যায়না, প্রকাশ করতে হয় স্পর্শে, অনুভূতিতে।
একজন কুহু অথবা সহস্র হৃদয়ের কান্না........................আরিফা সানজিদা
-না! এ জীবন চাইনা আমার! চাইনা! চাইনা! সুন্দর একটা জীবন চেয়েছি আমি, একটি
স্বপ্ন, অনেকগুলো সম্ভাবনা। তবে কেন এমন হলো, হে খোদা! এ কোন পাপের শাস্তি আমায় দিলে? মানবজন্ম ঘেন্নার আমার।
ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে কুহুর গলার স্বর। আয়নার সামনে দাঁড়ায় গিয়ে, সেই নখের আঁচড়; সেই ছিঁড়ে
যাওয়া ক্ষত এখনো স্পষ্ট। শকুনের নখের আঁচড় যে শরীরে বিঁধেছে সে শরীর জানে কতটা ঘৃণায়, কতটা অশুচিতে
বেঁচে থাকতে হয়।
দৌঁড়ে স্নানাগারে যায় ; ঝর্ণা ছেড়ে জল ঢালে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়, কত জল ঢাললে ধুয়ে মুছে যাবে সব? কুহু আবার কাঁদে, জলের সাথে মিশে যায় এই কান্না। ভাবে এইমাত্র যে নিউজটা দেখলাম সেই মেয়েটিও কি এমন কাঁদছে এখন? মেয়েটির
পাশে যেয়ে বসতে ইচ্ছে হয় কুহুর, মাথার ধারে বসে চুলে বিলি কেটে দিতে ইচ্ছে করে ; তারপর বুকের সাথে লেপ্টে ধরে আর্তনাদে মেতে উঠে
মেয়েটার কষ্ট লাঘব করে দিতে, মেয়েটার আর কুহুর কান্নার
জলের রঙ যে এক, দুজনের জল মিশে অভিশাপ হত;বারুদ হত; বর্ষণ হত;সেই বারুদ নরপিশাচদের কলিজা ভষ্ম করে দিত। কত অশ্রুর অগ্নিতে বারুদ হয় কুহু জানেনা, একজনম কি কেটে
যাবে তাতে? তাও চায় যেন নরপশুগুলো বিনাশ হয়, এভাবে বুক ফুলিয়ে না হাঁটে।
গোধূলির বেলা পড়ে এলো, সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলো আকাশে।বেলকনির গা ঘেষে দাঁড়ায় কুহু,এই বেলকনি কত আনন্দ ব্যথার সঙ্গী; এই গ্রীল আর কুহুর দু'হাতের স্পর্শ
জানে।
ভাবতে থাকে সেই দিনগুলির কথা, কত সুন্দর ফুরফুরে দিন ছিল। সাড়া পাড়া মেতে উঠত কুহুর আনাগোনায়। মা-বাবার একমাত্র কন্যা ও, কিসের অভাব ছিল ওর? গান গাইতে
জানে, ছবি আঁকতে জানে, কতইনা গল্প - কবিতা লিখত কুহু, পড়াশুনায় ও প্রথম সারির ছিল। ক্লাস মাতিয়ে রাখত যেই মেয়েটি সেই মেয়েটির ভাষা এখন কেউ
পড়তে জানেনা। কত ছেলে এই মেয়েটির চোখের
দিকে তাকিয়ে কত প্রেমের কবিতা লিখেছিল-
- উপমায় তুমি অনন্যা প্রিয়া, চোখের তারায় হারাতে দিবে?
-দৃষ্টি মেলোনা, ঐ চোখে ভষ্ম হয়ে যাব, দাবানল বইবে বুকের পাঁজরায়।
-তোমার চোখের কাজলে লেপ্টে রইব, ঐ চোখে জল এনে মুছে দিওনা রেখা।
আর ও কত ছন্দে,কত উপমায় সেই কবিতা দেয়ালে দেয়ালে লেখা হত। আর এখন? সেই চোখের নীচে কালচে দাগ,কেউ কি প্রেমে পড়ে? ছন্দ আনে মনে?
বাবা বলত, মেয়েটা হলো হরিণের ডাগর ডাগর চোখের, ঠিক ওর দাদীর মত। বাবা চুমু খেত অজস্র সেখানে, বাবার চুমুর সেই ছোঁয়া মুছে
গেছে অশ্রুর দাগে। বাবা চোখের দিকে তাকায়না
কতদিন। তাকায়না নাকি তাকাতে
পারেনা? বাবার বুকের পাজরায় ও কি বাণ ছুটে এমন? নাকি বাবার মনে প্রশ্ন আসে কেন আমি
কুহুর বাবা হলাম?
বাবার চোখ দেখেছিল কুহু সেদিন,ঠিক দুবছর তিনমাস আটদিন
আগের সেই ঘটনার পরে,সেই চোখে ছিল সমাজে মুখ দেখাবার লজ্জা,ভয়, চাপা কান্না- ছিল প্রতিবাদী দাবানলের অগ্নিসম রূপ। সমাজের কোন কোন শুভাকাঙ্ক্ষীরা এসে বলেছিল থানা পুলিশ হন, এই পিশাচদের ছেড়ে দেয়া চলবে না, এর একটা বিহীত করতেই হবে। বাবা ঠিকই জানত এখানে এই নরপশুদের শাস্তি হয়না।শুধু হয় পত্রিকার শিরোনাম, মামলায় কাগজে সীলমোহর তারপর
আর খোঁজ মিলেনা।
সেদিনের ঠিক দুদিন আগে রোজকার মতন কুহু বের হয়
ক্যাম্পাসে, মোড় ঘুরতেই কানে আসতে থাকে শিষের আওয়াজ এ যেন নিত্যদিনের। প্রতিবাদ করতেই ফুসলে উঠে নরপিশাচগুলো তারপর?
তারপর কুহু আর ভাবতে পারেনা, ঠিক দুদিন পর বাবার বুকের
এসে কানায় ভেঙ্গে পড়ে -
-বাবা! সব শেষ আমার, সব শেষ!এ সমাজ আমায় বাচঁতে দিলনা বাবা! আমায় ক্ষমা কর
বাবা।
বাবা সেদিন শুধু নির্বিকার চোখে তাকিয়ে রইল, কিছু বলবার
ভাষা যে নেই।হুশ ফিরতেই দেখে তার বুক
খালি,দৌড়ে যায় কুহুর ঘরে কেবল ফাঁস পড়ল গলায়। এক ঝটকায় খুলে ফেলে ওড়নার প্যাচ। শুধু বলল, মা তুই অন্তত বেঁচে থাক,যে সমাজ তোকে বাঁচতে
দিলনা সেই সমাজ ছেড়ে এ শহর ছেড়ে অনেক দূরে গিয়ে বাঁচ মা, তুই শুধু বেঁচে থাক মা! নইলে যে আমার পুরষত্ব বিলীন হয়ে যাবে। সেদিন বাবা মেয়ে কেঁদেছিল, সেই কান্নার জলের মত এত পবিত্র এত স্নিগ্ধ এত স্বচ্ছ আর কি হতে পারে? সেই কান্নার সাক্ষী হয়েছিল দেয়ালের ঘড়ি, জানালার
পর্দা, বেলকনির গ্রীল আর ঘড়ির আড়ালের টিকটিকিটা।
এই খবর বাতাসের আগায় পৌছে গেল আনাচেকানাচে, এখানে ওখানে ফিসফিসানি মেয়েটা....?শুধু পৌঁছল না
বাবা মেয়ের বেঁচে থাকার যে যুদ্ধটা শুরু হল সেই খবরটা।
দুদিনবাদে সৌমিকের ফোন যার সাথে ভালবাসা ছিল, যার সাথে বিয়ের কথা পাকা হয়ে আছে সেই ভরসা করার, বুকের গহীনে আশ্রয় দেয়া মানুষটির ফোন:
-কুহু! মা-বাবা বিয়েটা মেনে নিলনা যে আর!
আর কিছু বলেনি সৌমিক, জানতে চায়নি কুহু তুমি
কেমন আছ? কুহু তুমি কি বেঁচে আছ? একবারের জন্যেও বলেনি, আমি তোমার সাথে আছি কুহু,
এ অশুচি এই দাগ যে কেবল দেহের; আমাদের যে আত্মার সম্পর্ক। সমাজের এই দেয়া নাম যে কেবল ই নাম, এ সমাজ ছেড়ে অন্য
সমাজে বসত গড়ব আমরা যে সমাজে নরপিশাচরা নেই, চোখের জল মুছে ফেল কুহু এই যে আমি
তোমার আছি! কুহু কাঁদেনি একটুও তার
যে কান্নার ভার শুরু হল সেই কান্নার সাথে ভালবাসার মানুষ চলে যাওয়ার যে কান্না তা
যে কেবলই বেমানান! শুধু মনে মনে বলল, পৃথিবীর
সব পুরুষ ই কি এক? নাহ তা কি করে হয়,বাবা তো এক নয়, যে পুরুষদের জন্যে মৃত্যু পথে
যাত্রা করলাম অন্য পুরুষ যে আমায় বাঁচিয়ে রাখল।সেদিন যদি বাবা এই বিদেশ বিঁভুইতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত না
নিত তবে সেই সমাজ বাঁচতে দিতনা যে।
এমন ঘটনা রোজ দেখতে পায় কুহু, কুহু শুধু কাঁদে তখন। এই দুই বছরে কত যে লোমহর্ষক ঘটনা পড়েছে পত্রিকা গুলোয়,কেউ গলায় ফাঁস দেয়,কেউ বিচার চায়,কেউ সমাজের
গঞ্জনা সয়, কেউ বিচার পায় আবার কেউ নরপিশাচদের হাতেই বলি হয়। কি করুন সে মৃত্যু! কুপিয়ে,আগুনে পুড়ে, খন্ড-বিখন্ড
সে লাশ পঁচে গলে মিশে যায় কখনো জলে কখনো মাটিতে। কুহুর ও ইচ্ছে করে সেই লাশের মিছিলে অংশ নিতে, সেই মাটিতে সেই জলে সেই গোরে ফুলশয্যা রচে দিতে,
বিলবোর্ড টানিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় এখানে একটা নারী ঘুমিয়ে আছে যার জীবন হওয়ার কথা ছিল
ফুলের মত সুগন্ধিময়,পবিত্র। কুহুর ইচ্ছে করে মৃত্যুর সাথে লড়াই করা এই বীরকন্যাদের নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা
করতে সেই রণে নরপিশাচদের খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে
মেরে ফেলতে তারপর জিন্দা করে আগুনে পোড়াতে,প্রস্তরবর্ষণে
মস্তক থেথলে দিতে কিংবা লাঞ্ছনা-গঞ্চনায় সমাজের দেয়ালে দেয়ালে এঁটে দিতে।একবার অন্তত একবার যেন বুঝতে পারে এই সম্ভম হরণের
আর্তনাদ!
কুহু আবার কাঁদে, এ কান্নার রং পরাজয়ের রং! নরপিশাচদের শাস্তি দিতে না পারার পরাজয়, কুহু
কাঁদে গভীর মুনাজাতে কাঁদে, অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদে, সিলিং ফ্যানে
ঝুলতে না পেরে কাঁদে। কখনো এ কান্নায় অশ্রু হয়
কখনো রক্তক্ষরণ। দৌঁড়ে যায় স্নানাগারে,জল
পড়ে,মুছে যায়না দাগ;অশুচি লাগে!কুহু
আবার কাঁদে,অশ্রু মিশে যায় জলের সাথে।
