Showing posts with label সেমন্তী ঘোষ. Show all posts
Showing posts with label সেমন্তী ঘোষ. Show all posts

নীল নির্জনে...................সেমন্তী ঘোষ

নীল নির্জনে...................সেমন্তী ঘোষ
প্রকৃতির বিমূর্ত বিচিত্র রূপ। একদিকে তার সৃষ্টির মহিমান্বিত মধুর কলতান,অন্যদিকে প্রলয়হারিনি ধ্বংসের সুর।চতুর্দিকে কত বৈচিত্রের সমাবেশ -কল্পনার ইন্দ্রধনুর বর্ণালী। কোথায় মরুর বুকে উঠের সারি,কখনো অরন্যের বুগিয়ালী স্বপ্নসুখ।আবার কখনো সহস্য তুষারধবল শৃঙ্গরাশি উচ্চশির দণ্ডায়মান,কখনো বা দরিয়ার দিগন্ততটে শুভ্র ফেনায়িত তরঙ্গ রাশির উত্তাল সমীরন। প্রত্যেক রূপেই সে অনন্যা। কর্মসূত্রে 'ইনফরমেশন এন্ড টেকনোলজির সেন্টারে'র অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট ম্যানেজার,সহ অধ্যাপিকা হওয়ার জন্য এই অনন্ত চলার পথে বারংবার বিভিন্ন রূপে দেখা সেই প্রকৃতির সাথে__তার সৃষ্টির জলছবির কাহিনী তাই স্বপ্নের বিভোরতায় গল্পের পাহাড় বুনে হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা দখল করে নিয়েছে....

প্রকৃতির ক্যানভাসে স্বপ্নিল সুখ 
অনাহুত আবিলতা দরিয়ার রূপ
বিগলিত অশ্রুর মুখরিত ধ্বনি
"কলমের ডাকনামে" দিনমানে শুনি......

নীল দিগন্তের মাঝে উত্তাল সমুদ্রের শান্ত সমাহিত রূপের সন্ধানে এবারের যাত্রা আন্দামানে।বহুচর্চিত ঐতিহাসিক ও স্বদেশীদের সাক্ষ্য বহন করা পোর্টব্লেয়ারের 'সেলুলার জেল'আর নীল আইল্যান্ডের নিবিড় সমুদ্র তটে।কলকাতা থেকে সকালের বিমানে পোর্টব্লেয়ার। বিমানবন্দরে নামার আগেই বিমান থেকে দেখা যায় সবুজ বনানী ঘেরা বিভিন্ন আইল্যান্ড আর নীলরঙা সমুদ্র। ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপাসাগরের বুকে অবস্থিত ৫৭২ টি দ্বীপের সমষ্টি নিয়ে এই আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। যার মধ্যে যাওয়ার অনুমতি মেলে কেবল মাত্র ৩৮ টি দ্বীপে। এই দ্বীপ গুলির মধ্যে সবথেকে শান্ত সমাহিত রূপে বৈচিত্র্যে ভরা অথৈ নীলের অপার সাগর বেলা নীল আইল্যান্ড। কাজের সূত্রে বারবার আসার জন‍্য এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যাওয়ার সময় ২০১৪, ২০১৭ আর ২০১৯ পরিবর্তনটা বেশি করে যেন চোখে পড়ছিল। কালের নিয়মে পরিবর্তন আসবেই তবুও প্রকৃতির মায়াবী রূপের যে মনোহর ছটা আগে দেখেছিলাম আজ মানুষের ঢল, হোটেলাদি নির্মাণে অনেকটাই ম্লান মনে হল।

এসব দেখে মনে প্রশ্ন জাগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় 'সবুজ দ্বীপের রাজা' তার গৌরব হারিয়ে ম্লান হয়ে যাবে না তো যন্ত্রমানবের রূপায়নে!!!!যদিও পরবর্তী মুহূর্তেই নীলাভ প্রকৃতির সুরেলা ধ্বনি এই প্রশ্ন ভুলিয়ে হৃদয়ের আঙিনায় প্রশান্তির ঢেউ তুলে সব দ্বিধা দূর করে দিল তার অসীম রূপমাধুর্যে।হোটেলে পৌঁছে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে পৌঁছে গেলাম নিরালা নিভৃতে আকাশের নীল আর সমুদের নীলের নীল দরিয়ায়। নিরালা নির্জনে শ্বেতশুভ্র সৈকতবেলা 'করবাইনস কোভ'। প্রকৃতির পরম যত্নে কোমলতায় আচ্ছাদিত এখানকার ঢেউয়ের খেলায় একবার নামলে খুব কম মানুষ এখান থেকে সহজে উঠতে চান।মনে হয় যেন শান্ত বেলাভূমির কোলঘেঁষে চঞ্চল সমুদ্র শখার অনন্তকালের অবিশ্রান্ত খেলায় আরো কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে যাই। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে থেকে হোটেলে ফিরে এসে দ্বিপ্রাহরিক আহার শেষে যাওয়া হল ঐতিহাসিক সেলুলার জেলে।

স্বাধীনতা সংগ্রামের জীবন্ত দলিল। সাগরমুখী পাহাড়ের পিছনেও খাড়া পাহাড়। জানালাহীন সংকীর্ণ সেল। সাগরের রং কালো হোক বা না হোক রক্ত সংগ্রামের ইতিহাসে "কালাপানি"। পাশে রয়েছে ফাঁসি ঘর।উপরে টাওয়ার;যেখান থেকে পূর্বে নজর রাখা হত সমগ্র জেল চত্বরের। সেখান থেকে উন্মুক্ত প্রকৃতির রূপ বিস্মিত করে। বিকেলে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয় বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাস। যা এই অনন্ত সৌন্দর্যের মাঝেও মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া হলো মেরিন পার্কে। সাগরপারের মৃদুমন্দ নির্মল বাতাসের মনোরম পরিবেশ।চোখে পড়বে বিধ্বংসী সুনামির স্মারকরূপে' একটি স্মৃতিসৌধের স্তম্ভ। রাত্রি অতিবাহিত সুখস্মৃতি রোমন্থনে।পরের দিন সকালে যাত্রা করা হল নীল এর উদ্দেশ্য। পোর্টব্লেয়ার থেকে নীলের দূরত্ব প্রায় 37 কিলোমিটার।পোর্টব্লেয়ার বা হ্যাভলক থেকে জাহাজে চেপে আসা যায় নীল আইল্যান্ড। জাহাজের সামনের আর পিছনের ঢেউ খেলানো জলের তোড় ডেকে বসে দেখতে দেখতে আমরা পৌছে গেল নীল দ্বীপে। জাহাজ থেকে নেমে জেটি দিয়ে হেঁটে আস্তে আস্তে চোখে পড়ল স্বচ্ছ নীল জলের নীচে কোরালের রাজ্য। তটভূমি বরাবর সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে স্পিডবোট, গ্লাস-বটম র্বোট, ওয়াটার স্কুটার। সবদিক জুড়ে নারকেল সুপারি সহ বিভিন্ন গাছ গাছালি। সাথে আনা ব্যাগ হোটেলে রেখে বেরিয়ে পড়া হল নীলাভ্র জলের মায়ার টানে। আসমানী নীল আর জলতলের নীলে প্রকৃতির রূপের বাহার। জলের স্বচ্ছ রং এ যারা শুধুমাত্র পাহাড় প্রেমী তারাও এসে প্রেমে পড়ে যাবেন।এখানে বেশ কতকগুলি সমুদ্র সৈকত রয়েছে -ভরতপুর, লক্ষণপুর,সীতাপুর প্রভৃতি।প্রত্যেক জায়গাতেই নীল জলের স্বচ্ছ রূপ। জলের স্বচ্ছতা এতটাই যে গভীর জলে দাঁড়িয়ে নিজের পায়ের পাতা দেখা যায়।বেশ কয়েকজনকে দেখলাম 'স্নরকেলিং' এ যেতে।আমরা গেলাম 'গ্লাসবটমে' চেপে গভীর জলের তলদেশের কোরাল,স্টারফিশ দেখতে।বেশিরভাগই জীবিত কোরালের সমাগম। ফিরে আসার সময় সমুদ্রতটে কিছু শামুক,ঝিনুক,শঙ্খ জমে আছে দেখলাম। সেখান থেকে যাওয়া হলো রক ফাউন্ডেশন দেখতে। অসংখ্য কোরাল, কাঁকড়া,সামুদ্রিক ছোট ছোট প্রাণী,রঙিন মাছ আর পাথুরে বোল্ডারে পরিপূর্ণ অঞ্চল। মুহূর্তকে মুহূর্ত বন্দি করে সেখান থেকে ফিরে এসে সীতাপুর বীচে ঘুরে আসা হলো। চাইলে নীল জলতটৈ নিজেকে ভিজিয়ে নেওয়া যেতে পারে।নীল সবুজের চোখজুড়ানো জলছবি। 

আবারো ফিরে যাওয়া হল লক্ষণপুর বীচে। নীল নির্জন বালুচরে বসে মনে হল সমুদ্রের অসীম জলরাশি যেন সাদা বালির বুকে আলপনা এঁকে দিয়ে যাচ্ছে।প্রাত্যহিক ক্লান্তিময় শহুরে জীবন থেকে দূরে নিস্তব্ধতার মাঝে ঢেউয়ের তালে পৃথিবী যেন তার আপন সৌন্দর্য ছড়িয়ে রেখেছে এখানে। রুপমাধুরীর এক অমোঘ আকর্ষণে স্নিগ্ধ বাতাস অনির্বচনীয় নির্জনতা মুখর হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে সূর্য অস্তাচলে। সমুদ্রের জলে ক্ষণে ক্ষণে সেই রঙের পরিবর্তন। কখনো আবির রাঙালাল,কখনো কমলা,আবার কখনো হালকা লালে।ধীরে ধীরে দূর সমুদ্রের বুকে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম হাসিতে গোধূলি বেলার ঝিরঝিরে সমীরন। মধুর হাওয়া আর নীলাভ স্বপ্নকে সাথে নিয়ে হোটেলে ফিরে আসা হলো। পরেরদিন প্রভাতে একই ভাবে ক্রজে চেপে ফিরে আসা হল পোর্ট ব্লেয়ার।পোর্টব্লেয়ার এসে দেখে নেওয়া হলো এনথ্রপলজিকাল মিউজিয়াম,সামুদ্রিকা নাভাল মিউজিয়াম আর জুওলজিক্যাল মিউজিয়াম। এক মুঠো স্বপ্নসুখের স্মৃতি কে অবলম্বন করে পরের দিনের বিমানে ফিরে আসা হল কলকাতায়। তবুও চোখে লেগে রইল নীল মেঘতটে সাদা বালুকারাশিতে নীল আইল্যান্ডের মোহ........

(চলবে)

ছবি: পৃথ্বীশ ভদ্র

স্বপ্নের স্বর্গরাজ্যে:স্মৃতিকথা...................সেমন্তী ঘোষ

স্বপ্নের স্বর্গরাজ্যে:স্মৃতিকথা...................সেমন্তী ঘোষ
কৃত্রিম হিমালয়,হিমবন্ত হিমালয়,দেবভূমি হিমালয়। দিগন্তপ্রসারী হিমাদ্রি তার সহস্র তুষারধবল শৃঙ্গরাশি নিয়ে উচ্চশিরে দণ্ডায়মান।ধ্যানমগ্ন এক তপস্বী -যুগ যুগ ধরে মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কখনো তার ভয়াল ভয়ার্ত রূপ কেড়ে নেয় অসংখ্য প্রাণ,আবার কখনও সেই অভ্রভেদী চূড়াই মানুষকে বাঁধে প্রাণের সুরে।এবারের পূজায় আকাশচুম্বী অট্টালিকার দৃষ্টিনন্দন থেকে দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে আমাদের যাত্রা মর্ত‍্যের সেই স্বর্গধামে।দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের এক অন্যতম অদ্বিতীয়ম কেদারনাথে।প্রকৃতির ক্রুদ্ধ অভিশাপে ২০১৩ সালে যেখানে হঠাৎই নেমে এসেছিল জলের তোড়,মৃত্যু মিছিলে পরিণত হয়েছিল পুন‍্য তীর্থভূমি ;ধীরে ধীরে দুঃখ দূরে সরিয়ে আজ আবার তা মাটির স্বর্গ হয়ে চোখ মিলেছে এক অনন্ত নন্দনের বুকে।

কেদারনাথে যেতে গেলে প্রথমে পৌঁছাতে হবে হরিদ্বার। হাওড়া থেকে প্রতিদিন হরিদ্বার যায় দুন এক্সপ্রেস। এছাড়াও প্রতি মঙ্গল আর শুক্রবার ছাড়ে হাওড়া দেরাদুন উপাসনা এক্সপ্রেস।এবং মঙ্গল ও শুক্র ছাড়া বাকি দিনগুলো চলে হাওড়া হরিদ্বার কুম্ভা এক্সপ্রেস।অথবা রাজধানী এক্সপ্রেসে চেপে বা বিমানে দিল্লি গিয়ে সেখান থেকে জনশতাব্দীতে চেপে বা গাড়ি ভাড়া নিয়ে পৌঁছানো যায় হরিদ্বার।সেদিনটা হরিদ্বারের 'হর কি পৌড়ি' ঘাট দর্শন করে বিশ্রাম নেওয়াই শ্রেয়। পরেরদিন প্রভাতে সীতাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা। কিলোমিটার হিসেবে যেতে ৮_৮.৩০ঘন্টা লাগার কথা হলেও রুদ্রপ্রয়াগের পর কেদারের দিকে যাওয়ার রাস্তা সরকার থেকে নির্মাণ করার জন্য এবং মাঝে মাঝেই ধ্বস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য রাস্তার গতি বেগতিক হলে তা ১২ থেকে ১৫ ঘন্টাও লাগতে পারে।সীতাপুর ছাড়াও উত্তরকাশী,শোনপ্রয়াগ থেকেও কেদারনাথ যাত্রা শুরু করা যায়।তবে কেউ যদি হেলিকপ্টারে কেদার দর্শনে যাবেন ঠিক করেন তারা অবশ্যই সীতাপুরে থাকতে পারেন কারণ ফাটা সেরসি সহ আরেকটি হেলিপ্যাড তিনটি সীতাপুর থেকে প্রায় সমদূরত্বে।
দিগন্তের নীলাভরণ প্রকৃতি আর মহাদেবের ধ্যানমগ্ন সৌন্দর্যের নিকেতন কেদারে এটা তৃতীয়বার যাত্রা।যতবারই আসি বারবার ফিরে আসার ইচ্ছা জাগে মনের কোণে।সীতাপুরে সেদিনের রাত্রি অতিবাহিত করে প্রকৃতির রূপ আস্বাদনে হাঁটাপথে আমাদের কেদার যাত্রা শুরু হলো। 

সীতাপুর থেকে এক কিলোমিটার শোনপ্রয়াগ। বাস বা প্রাইভেট গাড়ির দু'ই যায়-ব্যবস্থা রয়েছে সরকারি পার্কিংয়ের। আগে গৌরীকুণ্ড পর্যন্ত গাড়ি গেলেও ২০১৩-র বিধ্বংসীকতার পর তা বন্ধ হয়ে এখন শোনপ্রয়াগ পর্যন্ত যাওয়া যায়। শোনপ্রয়াগেই রয়েছে বায়োমেট্রিক পারমিশনের শেষ জায়গা।এছাড়া হরিদ্বার হৃষীকেশ থেকেও পারমিট পাওয়া যায়।শোনপ্রয়াগ থেকে গৌরীকুণ্ড ৫.৫/৬ কিলোমিটার।২০১৬ থেকে গৌরীকুণ্ডের হাফ্ কিলোমিটার আগে পর্যন্ত চলে লোকাল জিপ।গৌরিকুন্ড এর ৫০০ থেকে ৫৫০ মিটার যাওয়ার পর রয়েছে উত্তরাখণ্ড সরকারের কাউন্টার,যেখানে ঘোড়া,ডুলি,পালকির ব্যবস্থা রয়েছে।ঘোড়ার খরচ ২৫০০/ টাকা একপিঠ। ডুলি ৪০০০/ টাকা একপিঠ।আর যারা হেলিপ্যাডে যাবেন তাদের পড়বে ৪৭৫০/ টাকা উভয় পিঠ।প্রত্যেক ক্ষেত্রেই মানি রিসিট(স্লিপ) দেওয়া হয়। 

পৌরাণিক কাল থেকে কেদারনাথের উল্লেখ বিভিন্ন জায়গায়। কখনো মহাভারতে আবার কখনো দেবাদিদেব মহাদেব আর পার্বতীর বিবাহ প্রসঙ্গে-ভ্রাতৃহত‍্যার পাপস্খলনে পাণ্ডবরা এসেছিলেন কেদারধামে,আবার শোনপ্রয়াগ থেকে ৭-৭.৫ কিলোমিটার দূরে প্রাচীন মন্দির 'ত্রিযুগীনারায়নে'স্বয়ং নারায়ন কে সাক্ষী রেখে শিব পার্বতীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল।সেখানে রয়েছে একটি জ্বলন্ত ছোট্ট অগ্নিকুণ্ড 'অক্ষয়ধুনী'-অনন্ত কাল ধরে একইভাবে প্রজ্বলিত তার শিখা। 
গৌরীকুণ্ড থেকেই কেদারের আঁকাবাঁকা চড়াইপথের শুরু।এর ডান দিকে কুলুকুলু শব্দে প্রবাহিত মন্দাকিনীর জলধারা।২০১৩ -র ধ্বংসলীলার পর গৌরীকুণ্ড প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও এখানে থাকা উষ্ণপ্রস্রবণটি আজও প্রসারিত হয়ে মন্দাকিনী তে গিয়ে মিশেছে।ধ্বংসলীলা পারেনি তার গতিপথ রুদ্ধ করতে।২০১৩-র আগে গৌরীকুণ্ড থেকে কেদার ১৪ কিলোমিটার রাস্তা ছিল,সরকারি হিসাবে এখন তা পরিবর্তিত হয়ে প্রায় ১৭-১৮ কিলোমিটার।ঘোড়া সাড়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গিয়ে পৌঁছায় কেদারে।সাধারণ মানুষের হেঁটে যেতে প্রায় লাগে ৬ সাড়ে ৬ ঘন্টা। 
চড়াই রাস্তায় মন্দাকিনী কে ডান পাশে নিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর আসে চিরবাসা ভিউ পয়েন্ট।এখানে একটি হেলিপ্যাড ও আছে তবে তা সাধারণের জন্য ব্যবহৃত হয় না।এই হেলিপ্যাডের উপর দাঁড়ালে প্রকৃতির রূপ লাবণ্যে বিস্মিত হতে হয়।কখনো পাহাড় 
ছাপিয়ে কালো কাজল মাখা আকাশ,কখনো শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গরাশির মনোহরণ রূপ।এখান থেকেই প্রথমবারের জন্য কেদার মন্দিরের পশ্চাতের বরফাবৃত শৃঙ্গের দেখা মেলে।চড়াই পথে শীতল হাওয়ায় মেঘবালিকাকে সঙ্গী করে আরো কিছুদূর যাওয়ার পর বা'হাতে পড়ে চোখ জুড়ানো মিঠাপানি ওয়াটারফল্স।জলাধারে জল মাটির অর্ধেক ভিজা অর্ধেক শুষ্ক রাখলেও দুষ্টু মিষ্টু ঘোড়ার দলের জলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে নিজেদের আর দর্শনার্থীদের ভিজানোর মজাদার দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়।সারথির তাদের আয়ত্তে আনার শতচেষ্টা বিফলে যায়। 
আরো কিছুটা যাওয়ার পর গৌরীকুণ্ড আর কেদারের প্রায় মাঝ বরাবর ভীমবালি।সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে হাজার হাজার দর্শনার্থী অক্ষয় তৃতীয়ার পূজার দিন থেকে কালীপুজোর দিন পর্যন্ত মহাদেবের প্রার্থনায় শংকরের নাম নিয়ে এগিয়ে চলেন এই পথে।এখানে তাই সরকারি চেকপোস্টের সাথে বিশ্রাম নেওয়ার চা-নাস্তার বেশকিছু দোকান রয়েছে।ধ্বংসলীলার পর এই 
ভীমবালির পর থেকেই রাস্তা পরিবর্তিত হয়ে গেছে।পুরানো পথ চলে গেছে রামবারার দিকে,যেখান থেকে কিছুটা যাওয়ার পর স্বামী রামানন্দ সন্ত আশ্রম,কিছু ধর্মশালা রয়েছে।তবে প্রকৃতির তাণ্ডবে রুদ্ধ হয়েছে যাত্রাপথ আজ রামবারার সাথে কেদারের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। 

আমরা এগিয়ে চললাম নতুন পথ ধরে।ভীমবালির এক কিলোমিটার পর রাস্তা ভাগ হয়ে গেল। মন্দাকিনী নদীর ওপর নির্মিত নতুন মেটালব্রিজ অতিক্রম করতেই মন্দাকিনী চলে এলো আমাদের বামদিকে।বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর চোখে পড়ল উত্তরাখন্ড সরকারের নির্মিত রাত্রিযাপনের কটেজ।সাথে লিনচোলি হেলিপ্যাড,লিনচোলী ভিউ পয়েন্ট।সেখান থেকে মন্দিরের পশ্চাতের পর্বত শৃঙ্গ অনেক স্পষ্ট ও বৃহৎ দেখায়।আরো ৩-৪কিলোমিটার হাঁটার পর কেদারনাথ হেলিপ্যাড।মূলত যারা সীতাপুর থেকে হেলিকপ্টারে আসেন তারা এখানে এসে নামেন।তার থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে সরকারি তরফে অস্থায়ী হাসপাতাল।সেখান থেকে ৭০০-৮০০ মিটার দূরত্বে বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে কেদারনাথ মন্দির। 

অপূর্ব নৈসর্গিক শোভার মাঝে প্রস্তর নির্মিত সুশোভন কেদারনাথের মন্দির,যা যাত্রাপথের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই মুছিয়ে দেয়।প্রশান্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে মন্দিরময়।মন্দিরপ্রাঙ্গণে বিরাজমান নন্দীদেব,বেশকিছু ত্রিশূল মন্দিরের চারপাশে।ধ্যানে নিমগ্ন সাধুসন্তের দল।পাশেই পুণ্যার্থীদের সারিবদ্ধ লাইন।তাদের কারও হাতে পূজার ডালি কেউবা মনস্কামনা পূরণে করজোড়ে দাড়িয়ে।প্রবেশ করলাম মন্দিরের ভিতর।প্রস্তরখন্ড রূপে পূজিত মহাদেবেকে স্পর্শ করে জীবনের সব গ্লানি যেন দূর হয়ে গেল।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য পান্ডবদের ধরা দেবেন না বলেই তিনি মহিষ রূপ ধারণ করেছিলেন।সেই মহিষের পশ্চাৎভাগ এখানে মহাদেব রূপে পূজিত।মন্দিরের পশ্চাতে সজ্জিত ও পূজিত বিশালাকৃতির ভীমশিলা,যার জন্য ধ্বংসলীলার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল এই মন্দিরপ্রাঙ্গণ।মন্দির চত্বরে বেশকিছু বসার জায়গা,কেদার মন্দিরকে সামনে রেখে বাঁদিকে তাকালে মন্দাকিনী নদীর ওপারে পাহাড়ের গায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিস্থাপিত 'মেডিটেশন ক্যাম্প' যা লোকমুখে 'মোদি গুহা' নামেও পরিচিত। 

মন্দির চত্বরে বসে প্রাণভরে দেখলাম প্রকৃতিকে।নবারুণ আলোর নীলাকাশের প্রেক্ষাপটে একটু একটু করে অবগুণ্ঠন সরিয়ে উন্মোচিত তুষারগিরি।পড়ন্ত রোদের কিরণছটায় তার মহিমাদীপ্ত উপস্থিতি।সান্ধ্যকালীন ইলেকট্রিকের আলোয় প্রজ্বলিত মন্দিরপ্রাঙ্গণ।সন্ধ‍্যারতি শেষে কেদারের ধর্মশালায় রাত্রিযাপন।(বলে রাখা ভালো পারদ যত নিচে নামে অক্সিজেনের কিছুটা অভাব বোধ হয়)ভোরের প্রস্ফুটিত আলোয় কেদারজীকে প্রণাম জানিয়ে ফিরে আসার পালা. ......
''কতভাবে বিরাজিছ বিশ্বমাঝারে,মত্ত এ চিত তবু তর্ক বিচারে''
চিত্র সৌজন্যঃ পৃথ্বীশ ভদ্র।

দিনমানে দরিয়ায়..................সেমন্তী ঘোষ

দিনমানে দরিয়ায়..................সেমন্তী ঘোষ
শ্চর্য সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যে ভরা অথৈ-নীলের অপার সাগরবেলা প্রত্যেকবারই হৃদয়ের আঙিনায় প্রশান্তির ঢেউ তোলে।কখনো তার উত্তাল সৃষ্টির শৈল্পিক আদল আবার কখনো বা বিপুল বিশালতার মাঝে প্রাণবন্ত নির্মল রূপ। নারিকেল বীথিকায় ছাওয়া রূপালী বালুকাবেলায় কেরালার কোভালাম জলনিধি তেমনি এক শান্ত সমাহিত রুপমুগ্ধতা নিয়ে অভিসারী মনে কল্পকাহিনী রচনা করে। ভারতের দক্ষিণ ভাগের পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত কেরালা রাজ্যের, তিরুবনন্তপুরম জেলার দক্ষিণ ভাগের একটি কোস্টাল অঞ্চল কোভালাম। মূলত হাওয়া বিচ ও সমুদ্র বিচ এই দুটির একত্রিত নাম কোভালাম বিচ।শালিমার থেকে ত্রিবান্দম সাপ্তাহিক দুদিন ট্রেন চলাচল করে এছাড়াও হাওড়া থেকে চেন্নাই পৌঁছাতে পারেন করমন্ডল এক্সপ্রেস করে। সেখান থেকে ত্রিবান্দম।রেল স্টেশন বা শহর থেকে কোভালামের দূরত্ব আনুমানিক ১৪ কিলোমিটার। যারা বিমানে আসবেন কলকাতা থেকে ত্রিবান্দম এয়ারপোর্ট -সেখান থেকে দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার।
ছায়াসুনিবিড় বেলাভূমির শান্ত প্রশস্থ রূপের মাঝে ব্ল্যাক স‍্যান্ড -কালো বালির সাথে নীল জলরাশির স্বর্ণালী মেলবন্ধন। বিচ টিকে বেষ্টন করে রয়েছে সাধারন থেকে উচ্চতম মানের বিভিন্ন হোটেলাদি।সমুদ্রের জলের মোহিত করা রূপ।সারাদিনই চোখে পড়ল মৎস্যজীবীদের অবাধ আনাগোনা। গভীর সমুদ্র থেকে মাছ ধরে নৌকায় প্রত্যাগমনের মনোরম দৃশ্য। বিচের মাঝ বরাবর দ্বীপে Vizhinjam jama Masjid। বিচের উত্তর প্রান্ত ধরে হাঁটলে লাইটহাউস।
নির্দিষ্ট সময়ের ভিত্তিতে সুউচ্চ বাতিঘরের ওপর থেকে নীলকান্ত কোভালামের নীলাভ অনুভূতির মনকাড়া দৃশ্য।এর থেকে আনুমানিক ২০০ মিটার দূরে সামুদ্রা মেরিন একুরিয়াম এর অবস্থান।চারিদিকে ঘুরে এসে সমুদ্র সৈকতে বসে উপলব্ধি করলাম ২০১৮ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন কর্তৃক এটির পৃথিবীর সুন্দরতম বিচের মধ্যে একটির সম্মান পাওয়ার কারণ,এই দৃষ্টিনন্দন মোহিত রূপ আর ঢেউয়ের খেলা। শান্ত -অনুগত ঢেউ। বিচের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের জন্য চোরাবালি বা গভীর খাদ এখানে নেই। তাই সুখের ছোঁয়া লাগে ঢেউয়ের দোলায়। খুব বড় ঢেউ না হওয়ার জন্য ভাসিয়ে বা ডুবিয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ও থাকে না। জলকেলিতে ভরে ওঠে মন ও প্রাণ। নেত্র পল্লবে সুদূরের মায়াঞ্জন।নীল নির্জন বালুচরে সমুদ্রের অসীম জলরাশি যেন কালো বালির বুকে আল্পনা এঁকে দিয়ে যাচ্ছে।
তরঙ্গের নৃত্যচপল ভঙ্গীর বিচিত্র লীলারঙ্গ।প্রাত্যহিক ক্লান্তিময় শহুরে জীবন থেকে দূরে নিস্তব্ধতার মাঝে ঢেউয়ের তালে পৃথিবী যেন তার আপন সৌন্দর্য বিছিয়ে রেখেছে এখানে।রূপমাধুরীর সেই অমোঘ আকর্ষণে স্নিগ্ধ বাতাস অনির্বচনীয় নির্জনতা মুখর হয়ে উঠেছে। অনাদি অনন্ত সৌন্দর্যের রূপবৈভব দেখতে দেখতে সূর্যের ধীরে ধীরে সমুদ্র শায়ন।শেষ বিকেলের আলোর গোধূলিলগ্নে পশ্চিম কোলে সূর্যের ঢলে পড়ায় আবির রাঙা আকাশের রেশ। সমুদ্রের নীল রং কালো বালি সূর্যের আভায় এক মায়াময় জগতের সৃষ্টি। ক্ষণে ক্ষণে রঙ পরিবর্তন।কখনো আবির রাঙালাল,কখনো কমলা,আবার কখনো হালকা লাল। তবুও কিছু আলো যেন অবশিষ্ট রয়ে গেল ঈশান কোণে জমা হওয়া পুঞ্জীভূত মেঘের মতো। সিঁদুর রাঙা অস্তগামী সূর্যের রক্তিম হাসিতে গোধূলিবেলার ঝিরঝিরে সমীরণে প্রণয়ভিসারী হয়ে উঠল মন। হোটেলে ফিরে গিয়ে সেই রাত্রিটা এক মুঠো সুখ স্মৃতিকে অবলম্বন করে হোটেলেই কেটে গেল। নবপ্রভাতে প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচনের সাথে সূর্যোদয় দেখে আবার একই পথ ধরে ফিরে এলাম কলকাতায় . ..... তবুও চোখে লেগে থাকল সেই কদিনের সমুদ্রসৈকতের মাধুর্য.......
দিগন্তের বালুকাবেলায় উত্তাল হওয়া
অচেতন মনে তার রোজ আসা যাওয়া...

চিত্র :পৃথ্বীশ ভদ্র

ফাগুনের আগুন শিখা.................সেমন্তী ঘোষ

ফাগুনের আগুন শিখা.................সেমন্তী ঘোষ
দোল পলাশের পদাবলী, আবির রাঙা কেশ
অভিসারে মাদল সুরে ফাগুনেরই রেশ---

আগুনের সুরে পলাশের ডাকে মন চলে অভিসারে। প্রকৃতিতে লাগে মধুর বসন্তের সাজ সাজ রব। দখিনা বাতাসের সাথে ডানা মেলে ইচ্ছেরা পাড়ি দেয় স্বপ্ন সুখের সন্ধানে।গগনচুম্বী অট্টালিকার দৃষ্টিনন্দন থেকে তাই দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে প্রতিবছরই ফেব্রুয়ারি মার্চ মাস করে আমরা পৌঁছে যাই বড়ন্তি তে।একদিকে যেমন অরণ্যের অসীম রহস্যময়তা তার শান্ত শ্যামল সৌন্দর্য নিয়ে বিরাজমান ,অন্যদিকে তেমনি প্রশস্ত উপত্যকার মাঝে পাহাড়ে ঘেরা দৃষ্টিনন্দন লেক হৃদয়ের আঙিনায় নব নতুনের বার্তা বহন করে আনে। 
বাংলা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৫৬ সালের পহেলা নভেম্বর পূর্বতন বিহার রাজ্যের মানভূম জেলার সদর মহকুমা পুরুলিয়া জেলা নামে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত হয়।সেই পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর মহাকুমার সন্তুরি থানার অন্তর্গত একটি ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম বড়ন্তি। এখনও বেশ কিছু জায়গায় মানভূম লেখা টি চোখে পড়ে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রাতেও রয়েছে মানভূমের ছাপ।
পলাশের বর্ণ মিছিলে যোগদানের জন্য যাতায়াতের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো হাওড়া থেকে ট্রেনে আসানসোল । আসানসোল থেকে গাড়িতে আনুমানিক ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে বড়ন্তি।চারিদিকে সবুজের সমারোহ উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে বড়ন্তি আর মুরাডি পাহাড় দ্বারা আবৃত বড়ন্তি তে পৌঁছাতে আসানসোল থেকে লাগে প্রায় ঘন্টা দেড়েক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ১৬০০ ফুট উচ্চতায় বড়ন্তি পাহাড় ঘেরা রাঙ্গামাটি রাস্তায় চারপাশে রয়েছে ছোট-বড় বেশকিছু থাকার হোটেল।
রূপে রসে বৈচিত্রের লীলা চাঞ্চল্য নিয়ে বহু বিচিত্র সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র এই গ্রামটি।একদিকে শ্যামল গহন বনাঞ্চল অন্যদিকে আদিবাসী মানুষগুলির শিল্পকর্মে রঙিন জীবনের ছোঁয়া_

পাহাড়তলীতে ভূমিপুত্রদের মাটির বাড়ি
আলপনা আঁকা দেওয়াল সারি সারি...

যতবারই বড়ন্তি যাই গ্রাম্য পথের উদাসী হাওয়ায় যেন নিজেকে নতুন করে চিনতে পারি।ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে পলাশরাঙ্গা ফাগুনের মায়ায় চেনা- অচেনা পাখির সুরেলা ডাক কানে ভেসে আসে।মাঝে মাঝে ফ্রেমবন্দি হয় বুলবুলি ,ফ্রিঞ্চ,কোকিল কোয়েল,বি ইটার,ফিঙে ,টিয়া ,দোয়েলের দল।শাল, পলাশ, শিমূল, পিয়াল, মহুয়ার জঙ্গলের মাঝে মাঝে চোখে পড়ে আলপনা আঁকা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাটির বাড়ি।তবুও এত সৌন্দর্য এত আনন্দের মাঝেও গ্রামীণ মানুষগুলোর কষ্টের জীবন মনকে অস্থির করে তোলে।যদিও তাদের হাসিমাখা সরলতা মন ভরিয়ে দেয় ।তাদের রূক্ষ বৈচিত্রহীন জীবনে বসন্তের আগমনে ফাগের রং এর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পলাশের পদাবলী। 
তারা জানে নিজেদের সংস্কৃতিকে কিভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হয় তাই ইট কাঠ কংক্রিট এর জীবন থেকে দূরে আজও বড়ন্তি আপন মহিমায় সেজে রঙিন তানে রূপালী জল ছবি আঁকে। অরন্যের অগ্নিশিখার মাঝে লেকের জলে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি আর সিঁদুর রাঙ্গা অস্তগামী সূর্যের মায়াবী আভায় রচিত হয় স্বপ্নের কথকতা। বড়ন্তির সান্ধ্যকালীন রূপেও বিমোহিত হতে হয়।নিঝুম নিশ্চুপ আঁধার, হিম পড়া মায়াবী সন্ধ্যা।কখনো বা হোটেলের ব্যালকনি থেকে দেখা পূর্ণিমার আছড়ে পড়া জোছনার মোহময়ী বৈভব। দূর থেকে ভেসে আসা ধামসা মাদলের ড্রিম ড্রিম বোল।মাঝে মাঝে কিছু অচেনা-অজানা প্রতিধ্বনি। সারাদিনের স্বপ্নবিভোর বিষন্নতায় রঙিন একগোছা পলাশের ঝাঁজালো গন্ধে অদ্ভুত প্রশান্তি।রাত্রি অতিবাহিত স্মৃতির মননে।প্রভাতের স্বর্ণালী আলোয় নব দিগন্তের নবরূপে সুনির্মল নীলাকাশে ফিরে ফিরে আসার অনন্তের আহ্বান:
মায়াবিনি প্রকৃতির অনন্ত ডাক
পলাশের ফাগে ;আগুনের রাগ।

চিত্র সৌজন্যে :পৃথ্বীশ ভদ্র

রোমাঞ্চের হাতছানি (প্যাংগং লেক)..................সেমন্তী ঘোষ (কোলকাতা)

রোমাঞ্চের হাতছানি  (প্যাংগং লেক)..................সেমন্তী ঘোষ (কোলকাতা)
রোমাঞ্চকর,রোমহর্ষক...প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যে আচ্ছাদিত পৃথিবীর স্বর্গ।এক অপার্থিব মায়াজালে ঘেরা রং-বেরঙের বরফাবৃত পাহাড় আর শীতল মরুভূমির মায়াতান।প্রকৃতির নিরাভরণ রূপে অনুপম ঐশ্বর্যে অতুলনীয় মোহময়তা।কখনো তা মহাদেবের মতো ধ্যানগম্ভীর কখনো বা পার্বতীর মতো লাস্যময়ী। বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্যের মহনীয়তা,রূপের বিচিত্রতায় বৈচিত্র্যময়তা -স্বপ্নবিভোর প্যাংগং লেক।মায়াবী নেশায় চোখ ধাঁধানো নীলের বিচিত্র রং আর কিছু বালুকারাশি। খন্ড খন্ড নীল মেঘের আনাগোনা,রুক্ষতার মধ্যে অপরূপ সৌন্দর্য আর নিঃসঙ্গতার মিলনে নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ হৃদয়.....

"...পাষাণের স্নেহধারা তুষারের বিন্দু
ডাকে তোরে চিতরোল উতরোল সিন্ধু..."

একদিকে নীলাভ প্রকৃতি অন্যদিকে তুষারে ঢাকা গিরিশৃঙ্গ।সমগ্র রাস্তাজুড়ে কর্মরত বি.আর.ও। লে থেকে প্রায় 154 কিলোমিটার দূরত্ব।যেতে লেগে যায় সাড়ে 5 থেকে 6 ঘন্টা।বরফে আচ্ছাদিত রাস্তা অতিক্রম করে প্রথমে পড়ে বাংলা পাস চাংলা পাস।পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম গাড়ি চলার পাস। উচ্চতা
আনুমানিক 17668 ফুট।উচ্চতাজনিত কারণে অক্সিজেনের সমস্যা হয়,তাই বরফ দেখে বেশি উন্মাদনার প্রকাশ না করাই ভালো।রুক্ষ পাহাড়ের ঢাল আর পাহাড়ের চূড়া সবটাই এখানে বরফে মোড়া।রয়েছে সেনাবাহিনীর ক্যাফেটেরিয়া আর মেডিকেল চেকআপ ইউনিট। সেখান থেকে আবারও এগিয়ে চলা,পথে পড়বে তাং সে ;প্যাংগং এর পথে শেষ হেলথ সেন্টার এটি। 
অল্প কিছু গাছপালা থাকায় এখানে শ্বাসকষ্টের সমস্যা কম। যদি কেউ সেরূপ সমস্যায় পড়েন তারা এখানে থেকে পরের দিন এখান থেকেই প্যাংগং দেখে আসতে পারেন। তাং সে কে পিছনে ফেলে বেশ কিছুদূর অগ্রসর হলেই দেখা মিলবে ম্যারমেটের। ইঁদুরের থেকে আকৃতিতে বড় এবং খরগোশের তুলনায় ছোট ভারী সুন্দর দেখতে এক ভীতু প্রাণী। ক্যামেরাবন্দি করার আগেই গাড়ির আওয়াজে ঢুকে পড়ল গর্তের মধ্যে। অবশেষে পৌঁছানো স্বপ্নের প্যাংগং-এ। টেন্টে কর্মরতদের সাদর অভ্যর্থনা। সাজানো গোছানো সুন্দর টেন্ট। প্রবল শীতল বাতাস এখানে অক্সিজেন প্রায় নেই বললেই চলে। অক্সিজেন
সিলিন্ডার সঙ্গে রাখা শ্রেয়। লেকের একদম সামনেই টেন্ট। (যদিও এখন জায়গা পরিবর্তিত হয়েছে )অপূর্ব নীল আবরণের টলটলে জল।
 পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চতম লবণাক্ত জলের হ্রদ। মহীখাত তথ্য অনুযায়ী বর্তমান হিমালয় যেখানে সেখানে ছিল টেথিস সাগর একটি অগভীর সমুদ্র। প্রচণ্ড চাপে সাগরের বুকে পলি জমে হিমালয় পর্বত উত্থিত হয় । চিরকালের জন্য হারিয়ে যায় টেথিস সাগর। কিন্তু হিমালয় তার প্রাকৃতিক স্বভাব ভুলতে পারে না সে কারণেই হয়তো জলের স্বাদ নোনতা।স্বচ্ছ নীল
লেকের গায়েও নুন জমে থাকতে দেখা যায়।এই লেকের 35 শতাংশ ভারতে রয়েছে আর বাকি 65 শতাংশ তিব্বতে চীনাদের অধীনস্থ। বলিউডের বিখ্যাত সিনেমা থ্রি ইডিয়টস'-এর শেষভাগের শুটিং এখানেই হয়েছিল। লেকের জলে বেশ কিছু শিগূল পাখির আনাগোনা এক অন্যরকম মাত্রা বহন করে আনে।জায়গায় চোখে পড়ে আর্মি টহল। 
ধারাবাহিক রুক্ষতার মধ্যে নীলের মহিমা আচ্ছাদিত এই লেক সত্যিই অনন্য। তাই বাঁধা পথের বাঁধন ছেড়ে এক টুকরো স্বপ্ন খুঁজে নিতে 'বসন্তের বিনিদ্র রাত্রি' দূর আকাশের দুরন্ত সীমায় 'অভিসারে চলে _ভিজে শীতল পাহাড়ি হাওয়া কে সঙ্গী করে,মন ক্যামেরার সাথে হাতের ক্যামেরায় বন্দি হয় প্রকৃতির সংরাগের সেসব সুখকর স্মৃতি----

চিত্র ও তথ্য :পৃথ্বীশ।