Showing posts with label স্বাধীনতার গল্প. Show all posts
Showing posts with label স্বাধীনতার গল্প. Show all posts

অনেক মায়ের এক সন্তান........রাকিব শামছ শুভ্র

অনেক মায়ের এক সন্তান........রাকিব শামছ শুভ্র

মি কার ঔরসজাত সন্তান, সেটা মা কখনোই বলতে পারেনি। পারার কথাও না। আমার জন্মটাই যে এক আশ্চর্য! আমি একটা সময় পর্যন্ত মাকে প্রচন্ড ঘৃণা করতাম। নিজেকে অস্পৃশ্য মনে হতো। সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতাম। মায়ের পরিচয় দিতেও লজ্জা পেতাম। কেন আমার সাথেই এমন হলো?

স্বাধীনতার পরপরই মা আমাদের গ্রাম থেকে রাতের আঁধারে পালিয়ে শ্রীমঙ্গল চলে যায়। আমি তখন মাত্র কয়েক মাসের বাচ্চা। মা ওখানে চা বাগানে কাজ নেয়। আমার মায়ের গায়ের রং শ্যামলা কিন্তু চোখা নাক খুব সুন্দর। খুব মায়াময় চেহারা। সহজেই সবার চোখে পরতেন। আর আমার চেহারা? একেবারে ফর্সা, লম্বা ছয় ফুট। দেখলে যে কেউ ভাবে পাঠান!!

আমার বাবা করিম উদ্দিন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সাথে সাথেই এপ্রিলের শুরুতে পালিয়ে ভারত চলে যান ট্রেনিং নিতে। রমিজ চাচা বাবার খুব কাছের বন্ধু ছিলেন। এক সময় মাকে খুব পছন্দ করতেন। মায়ের বিয়ে হয় বাবার সাথে, তখন থেকেই তার হিংসা ছিলোই। বাবা যুদ্ধে যাবার পর থেকেই তার আমাদের বাড়িতে আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিলো। মায়ের কাছ থেকে বাবার খোঁজ জানতে চাইতেন। মা কখনোই বলেনি বাবা কোথায় গিয়েছে। রমিজ চাচা ধারণা করতে পেরেছিলেন বাবা যুদ্ধে গেছেন। একদিন রাতে দরজা ঠকঠকালো। মা ভয়ে ভয়ে দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন কে? বাহির থেকে উত্তর এলো, ভাবি আমি রমিজ দরজা খুলেন। আমার মা সরল বিশ্বাসে দরজাটা খুলে দিয়েছে। দরজা খুলতেই তিন চারজন পাকিস্তানি আর্মি ঘরে ঢুকলো। এরপর টানা সাত মাস আমার মায়ের উপর দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চলেছে। আর এরই ফসল হচ্ছি আমি। নিজেকে ভালোবাসার কোন কারণ আছে কি?

আমি এসব কিছুই জানতাম না। মা নিজের পরিচয় লুকিয়ে চা বাগানে কাজ নিয়েছে। সেখানেও মা খুব শান্তিতে ছিল তা না! বড় বাবু ছোট বাবু সহ আরো অনেকেই মায়ের একা থাকার সুযোগটা নিয়েছে। মা সব সহ্য করেছে শুধু আমার জন্য। মায়ের একটাই ব্রত ছিল, আমাকে মানুষ করতে হবে। আমি মাকে বাবার কথা জিজ্ঞেস করলেই মা এড়িয়ে যেতো। যখন আমার ১১ বছর বয়স! একদিন মা আমাকে ডেকে অনেক কথা বলল। তখন সব কথার মানে বুঝিনি। বরং মায়ের উপর আমার ঘৃণা জন্মেছে রাগ, অভিমান। মনে আছে অনেকদিন মার সাথে কথা বলা বন্ধ রেখেছিলাম।

আমার বাবার পরিচয় না কি মায়েরও জানা নেই। মা মাঝে মাঝে বলতো, মায়ের উপর কতজন যে অত্যাচার করেছে কোন হিসেব নেই। শুধু একজনের কথা আলাদা করে বলতে পারে মা। ইয়াসির খান। সবার মতো সেও মাকে ভোগ করেছে কিন্তু কোথায় যেন তার একটা টান ছিল মায়ের প্রতি। মাঝে মাঝে নিজের খাওয়া থেকে কিছু খাওয়া উঠিয়ে রাখতো মায়ের জন্য। সবাই যখন অত্যাচার করতো, একমাত্র ইয়াসির খানে সে মাঝে মাঝেই ওষুধ খাইয়ে যেত। মায়ের কেন যেন মনে হয়, আমার মধ্যে মা ইয়াসির খানের ছায়া দেখতে পায়। আমার শারীরিক গড়ন রং চেহারার আদল নাকি ইয়াসির খানের সাথে মিলে যায়। আমি বুঝতে পারিনা লোকটাকে কি আমি মায়ের অত্যাচারী হিসেবে ঘৃণা করবো নাকি নিজের বাবা হিসেবে মেনে নিবো? নিজেকে জারজ সন্তান ভাবতে খুব কষ্ট হয়। সবকিছু ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করে।

মা আমাকে কতোটা ভালোবেসেছে তা এখন উপলব্ধি করি। আমি যখন হতবিহ্বল হয়ে যেতাম কিংবা হতাশায় ভুগতাম! মা বলতো, তোর বাবা কে আমি জানি না কিন্তু তুই আমারই ছেলে এটা জানি। তোর কি আমার পরিচয়ে বড় হতে সমস্যা আছে? আমি মেনে নিতাম আবার নিতাম না।

মায়ের আগ্রহে আর পরিশ্রমের ফল আমি আজ পড়াশোনা শেষ করে বড় চাকুরে। এখন আর আমার অতীত কেউ জানতে চায় না। আমার পরিচয়েই আমি পরিচিত। একটা সময় মাকে আমি অভিমানে দূরে সরিয়েছি আর এখন? আমি সারাদিন আমার হারিয়ে যাওয়া মাকে খুঁজি অন্য মায়েদের মাঝে। আমার মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন এগারো বছর আগে। আমি বিয়ে থা করিনি। সারাদেশে চষে বেড়াই আর সেই মায়েদের খুঁজে বের করি, যারা ১৯৭১ এ পাকিস্তানিদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছে এবং এখন কষ্টে দিনাতিপাত করছে। আমি তাদের আমার কাছে নিয়ে আসি। আমার এক মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন এখন আমার কাছে আরো চার মা আছেন। একদিন হয়তো আমার কাছে হাজারো মা থাকবেন। আমি আমার মায়েদের মাঝেই আমার হারিয়ে যাওয়া মাকে পাই। নিজেকে এখন আর একা মনে হয় না। হাজারো বীরাঙ্গনা মায়েদের আদরের সন্তান হয়েই এদেশে আমার বেঁচে থাকা।


বিঃদ্রঃ এটা সত্য ঘটনা না। তবে অনেক সত্য ঘটনা আমরা হয়তো জানিও না।

শিরোনামহীন পর্ব ২................মোহাম্মদ শাব্বির হোসাইন

শিরোনামহীন  পর্ব ২................মোহাম্মদ শাব্বির হোসাইন
ব্দুর রহমান সা‌হেব বন্দী পাক চৌ‌কি‌তে। গত তিন দি‌নে তাঁর ওপর দি‌য়ে অমানু‌ষিক নির্যাতনের ষ্টিম রোলার চ‌লে‌ছে। শারী‌রিকভা‌বে ভীষণ ক্লান্ত তি‌নি। প্রচন্ড ঘুম পা‌চ্ছে কিন্তু শরী‌রের ব্যথায় ঘুমা‌তেও পার‌ছেন না। তারপরও সন্ধ্যার পর থে‌কেই ঘু‌মের ভান ক‌রে রূ‌মের এক কোণায় মে‌ঝে‌তে শু‌য়ে আছেন আর স্ত্রী সন্তা‌নের জন্য দু‌শ্চিন্তা কর‌ছেন। রাত ১১টার পর চারদিকের সব আলো নি‌ভি‌য়ে দেয়া হ‌লো। 
অন্ধকারের ম‌ধ্যেও তি‌নি প‌রিষ্কার দেখ‌তে পা‌চ্ছেন দু'জন সিপাহী পাহারা দি‌চ্ছে। হঠাৎ লক্ষ্য কর‌লেন, তারা ফিস‌ফিস ক‌রে পরষ্পর কথা বল‌ছে। তি‌নি কান খাড়া কর‌লেন, এখন শুন‌তে পা‌চ্ছেন কিন্তু বুঝ‌তে পার‌ছেন না। চার‌দি‌কে তা‌কি‌য়ে নি‌শ্চিত হ‌য়ে নি‌লেন যে, আপাতত আলো জ্বলার সম্ভাবনা নাই। 
এবার উঠে পা টি‌পে টি‌পে এগু‌তে লাগ‌লেন গেটের দি‌কে। হ্যাঁ, এখন প‌রিষ্কার বুঝ‌তে পার‌ছেন তি‌নি। 
১ম ব্যক্তিঃ অপা‌রেশান শুরু হোয়া। ইন সাব‌কো মি‌ত্তি‌কে সাথ পিছাল দো।
২য় ব্যক্তিঃ হামা‌রে সাথ কন্স‌পি‌রেসী? ইতনা বড়া হিম্মত হো তোম কেহ‌তে হো, এবা‌র কো সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। দে‌খো আভি কিত‌নে মজা! আভি পি‌ঞ্জি‌রে মে ছাড়‌তে রা‌হো।
১ম ব্যক্তিঃ আজ এক অফিসার কো কেহ‌তে শুনা কি কালুরঘাট‌সে আজাদী কি এলান কিয়া। শালা, বাঙ্গালী কো মালুম নে‌হি কি পাক আর্মি কেয়া চিজ হ্যায়।
২য় ব্যক্তিঃ শুনা‌য়ে কি কাল এক বকরা কা ব‌লিদান হোগা। বকুল মোল্লাসে এক বিরাট বা‌হিনী বানা‌নে কা কাম শুরু হোয়া।
যা বুঝার আব্দুর রহমান সা‌হে‌বের বুঝা হ‌য়ে গে‌ছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নি‌লেন, মৃত্যু তো নি‌শ্চিতই। দেখা যাক চেষ্টা ক‌রে কিছু করা যায় কিনা। অন্ততপ‌ক্ষে যে ভয়াবহ ষড়য‌ন্ত্রের কথা তি‌নি জান‌তে পে‌রে‌ছেন তা স্থানীয় লিডার‌দের‌কে জানা‌নো দরকার। আর য‌দি কো‌নোভা‌বে বা‌পের ব্যাটা মেজ‌রের সা‌থে সাক্ষাৎ করা যায় তাহ‌লে সব খু‌লে বল‌তে হ‌বে। 

তাঁর মন বল‌ছে এবার কিছু একটা হ‌বেই। মাত্র ক‌য়েক‌দিন আগেই বঙ্গবন্ধু সকল‌কে যার যা আছে তা নি‌য়ে প্রস্তুত হ‌তে ব‌লে‌ছেন। কিন্তু অস্ত্র ছাড়া ঘ‌টি বা‌টি দি‌য়ে তো আর যুদ্ধ হয় না। এবার যে‌হেতু আর্মির একজন মেজর ঘোষণা দি‌য়ে‌ছেন কা‌জেই কিছু একটা নি‌শ্চিত হ‌বে। এখন বা‌কি শুধু সকলে একত্র হওয়া। 
‌তি‌নি ঘ‌রের কোণায় ফি‌রে গে‌লেন। সেখান থে‌কে সিপাহীকে ফিস‌ফি‌সি‌য়ে ডাক‌তে ডাক‌তে এগি‌য়ে এলেন সাম‌নে। বল‌লেন, বাথরূ‌মে যাওয়া প্র‌য়োজন। একজন মুখ ভেং‌চি‌য়ে ঘ‌রের ম‌ধ্যেই কাজ সার‌তে বল‌লেন। তি‌নি কাতরভা‌বে বুঝা‌তে লাগ‌লেন, এটা তার অভ্যাস নাই। অব‌শে‌ষে অন্যজন গেট খু‌লে তা‌কে বাথরূ‌মে যে‌তে দি‌লো আর বলল, কাজ সে‌রে দ্রুত ফির‌তে। 
‌তি‌নি ভেত‌রে ঢু‌কেই আল্লাহর নাম নি‌য়ে ভে‌ন্টি‌লেট‌রে হাত দি‌লেন। সময় অল্প, খুব দ্রুত কাজ সার‌তে হবে। নতুবা একটু প‌রেই দরজায় ধাক্কাধা‌ক্কি শুরু হ‌বে। 
পুর‌নো বি‌ল্ডিং। একটু চাঁড়া দি‌তেই ভে‌ন্টি‌লেট‌রের বড় জানালাটা খু‌লে গে‌লো। কাকতালীয়ভা‌বে তা এতো দ্রুত হ‌লো যে, তি‌নি কিছুটা ভড়‌কেই গে‌লেন। আস্তে ক‌রে জানালার ভার সাম‌লে তা নি‌চে না‌মি‌য়ে রেখে বের হ‌য়ে পড়‌লেন খুব সাবধা‌নে।
একবার শুধু পেছন ফি‌রে দেখ‌লেন। আবছা আলোয় যা দেখা যায় তা দি‌য়ে দে‌খে অনেকটা হামাগু‌ড়ি দেয়ার ম‌তো ক‌রে দ্রুত দৌড় দি‌লেন বাগা‌নের পা‌শে দি‌য়ে। ধরা পড়ার ভ‌য়ে রাস্তা এড়ি‌য়ে চল‌লেন তি‌নি।
মূল গে‌টের কাছাকা‌ছি এসে দেখ‌তে পে‌লেন দু'জন বিশালদেহী সিপাহী ভারী অস্ত্র হা‌তে পাহারা দি‌চ্ছে। চেহারা দে‌খেই অনুমান কর‌লেন, এরা বেলুচ রে‌জি‌মে‌ন্টের হ‌বে। বেলুচরা সাধারণত পাঠান‌দের চে‌য়ে দূর্ধর্ষ হয়। 
‌সেখান থে‌কে কিছুটা বাঁক ঘু‌রে একটা বড় ড্রে‌নের সাম‌নে গি‌য়ে হা‌জির হ‌লেন। খেয়াল ক‌রে দেখ‌লেন ড্রেনটা সাম‌নের পাঁ‌চিলটা ভেদ ক‌রে বে‌রি‌য়ে গে‌ছে বাই‌রে। নে‌মে পড়‌লেন ড্রে‌নে খুব সাবধা‌নে। আস্তে আস্তে হামাগু‌ড়ি দি‌য়ে এগু‌তে লাগ‌লেন। বিশ্রী দূর্গ‌ন্ধে ব‌মি আস‌তে চা‌চ্ছিল কিন্তু পে‌টে কিছু থাক‌লে তো! গত তিন‌দিন পে‌টে তেমন কিছু প‌ড়ে‌নি। বাঙ্গালী মানুষ, সারা‌দি‌নে দুইপিস রু‌টি আর এক দলা গুড় খে‌য়ে কি চল‌তে পা‌রে?
অব‌শে‌ষে পাঁ‌চিলটা পে‌রি‌য়ে বাই‌রে এসে যে‌নো হাঁফ ছাড়‌লেন। কিন্তু এখনই ওপরে ওঠা যা‌বে না। এখনও ঝুঁ‌কি আছে। মূল গেটটা এখান থেকে কা‌ছেই। সুতরাং, আরো কিছু দূর যাবার পর ড্রেন থে‌কে বের হ‌তে হ‌বে।
‌কিছুটা এগি‌য়ে‌ছেন, হঠাৎ পা‌য়ে কিছু একটা ধাক্কা লাগা‌তে শব্দ হ‌য়ে‌ছে। মাথা তু‌লে দেখ‌লেন, একজন সিপাহী এদি‌কে তাকি‌য়ে‌ছে। ভয় পে‌য়ে গে‌লেন। দেখ‌লেন, ঐ সিপাহী পা‌শের সিপাহী‌কে কিছু একটা ব‌লে এদি‌কেই আস‌ছে। এবার তো দম বন্ধ হবার পালা। চিন্তা কর‌ছেন উ‌ঠে দৌড় দি‌বেন কিনা। কিন্তু সেটা কর‌তে গে‌লে তো এক গু‌লি‌তেই ঝাঁঝড়া। সিদ্ধান্ত নি‌লেন দম বন্ধ ক‌রে ব‌সেই থাক‌বেন শেষ দেখার জন্য। সিপাহীটা দ্রুত এগি‌য়ে এলো একদম কাছাকা‌ছি। এবার কাঁধ থে‌কে অস্ত্র না‌মি‌য়ে হা‌তে নি‌য়ে‌ছে।

শিরোনামহীন...............মোহাম্মদ শাব্বির হোসাইন

শিরোনামহীন...............মোহাম্মদ শাব্বির হোসাইন
কাশ চৌধুরী। টগব‌গে গ্রাম্য যুবক। স‌বে কিছু‌দিন হ‌লো এইচএস‌সি পাশ ক‌রে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‌লোকপ্রশাসন বিভা‌গে ভ‌র্তি হ‌য়ে‌ছে। ক্লা‌সের সক‌লের সা‌থেই তার সুন্দর বন্ধুত্ব। তার স্কুল জীব‌নের বন্ধু জাফরও একই বিভা‌গে ভ‌র্তি হ‌য়ে‌ছে। কিন্তু সে অন্তর্মুখী স্বভা‌বের। কা‌ছের বন্ধু-বান্ধব ছাড়া বে‌শি মানু‌ষের সা‌থে সে মিশ‌তে পা‌রে না। কোথা থে‌কে যে‌নো একটা আড়ষ্টতা ভাব এসে তার গলা চে‌পে ধ‌রে। চাইলেও স্বাভা‌বিক হ‌তে পা‌রে না।
যখন দে‌খে আকাশ সক‌লের সা‌থে খুব সুন্দরভা‌বে বন্ধুত্ব কর‌ছে তখন সে খুব কষ্ট পায়। মা‌ঝে মা‌ঝে বন্ধু‌কে হিংসেও কর‌তে থা‌কে। বি‌শেষ ক‌রে যখন আকাশ‌কে মে‌য়ে‌দের স‌ঙ্গে কথা বল‌তে দে‌খে।
তা‌দেরই এক ক্লাস‌মেট, অধরা। ঢাকার অভিজাত এলাকায় বসবাস। দেখ‌তে যেমন সুন্দরী তেমনই আকর্ষণীয়া। টাকাওয়ালা বাবার আদ‌রের দুলালী। ব‌খে এখনও যায়‌নি ত‌বে উচ্চমাত্রার পাঙ্কু। পা‌জে‌রো‌তে চ‌ড়ে ক্যাম্পা‌সে আসে। বন্ধু-বান্ধব‌দের সা‌থে খুব সদ্ভাব, আচর‌ণে ম‌নেই হ‌বে না যে, তার বাবা দে‌শের প্রতি‌ষ্ঠিত অন্যতম একটা গ্রুপ অব কোম্পানীর ম্যা‌নে‌জিং ডাইরেক্টর।

ক্যাম্পাস অনেক‌দিন থে‌কেই শান্ত আছে। ক্লাসগুলোও চল‌ছে একদম ঘ‌ড়ির কাঁটা ধ‌রে। পড়াশুনা এগুচ্ছে, ওদের সক‌লের বন্ধুত্বও গাঢ় হ‌চ্ছে সম‌য়ের সা‌থে পাল্লা দি‌য়ে। 
আকাশ ক্লাস শে‌ষে লাইব্রেরী‌তে গি‌য়ে পড়াশুনা ক‌রে। তার লক্ষ্য একটাই, তা‌কে স‌ত্যিকা‌রের মানুষ হ‌তে হ‌বে। মা'র দেখা স্বপ্ন‌কে বাস্ত‌বে রূপ দি‌তে পারলেই না নি‌জে‌কে যোগ্য সন্তান ব‌লে ম‌নে হ‌বে। বাবা'র কথা তেমন একটা ম‌নে প‌ড়ে না। যখনই বাবা‌কে নি‌য়ে কিছু ভাব‌তে যায় কেবল অস্পষ্ট কিছু স্মৃ‌তি আর মা'র কা‌ছে শোনা গল্পগু‌লো যে‌নো জীবন্ত প্র‌তিক হ‌য়ে চো‌খে ভা‌সে।
তার ম‌তো তার বাবাও ছি‌লেন এক সন্তান। আকা‌শের বয়স যখন তিন বছর তখন চার‌দি‌কে শুরু হ‌লো গন্ড‌গোল! মা'র কা‌ছে আকাশ এমনই শু‌নে‌ছিল। এখনও কিছুটা ম‌নে কর‌তে পা‌রে গ্রা‌মে অনেক‌কেই বল‌তে শু‌নে‌ছে দে‌শে না‌কি গন্ড‌গোল হ‌য়ে‌ছিল। বড় হ‌য়ে আকাশ এখন মেলা‌তে পা‌রে না মানুষ কে‌নো এত বড় একটা ঘটনাকে গন্ড‌গোল না‌মের ছোট্ট একটা শ‌ব্দের ম‌ধ্যে সীমাবদ্ধ রাখ‌তে চায়। একটা শো‌ষিত ও ব‌ঞ্চিত জা‌তির মু‌ক্তির চেষ্টা‌কে কখ‌নো গন্ড‌গোল না‌মের শ‌ব্দের ম‌ধ্যে আট‌কে রাখা রী‌তিমত শহীদ‌দের আত্মার সা‌থে চরম বেঈমানী ম‌নে হয়।

আকাশ এ স‌বের অনেক কিছুই মে‌নে নি‌তে পা‌রে না। ছোট‌বেলা থে‌কেই সে মা'র কা‌ছে শি‌খে‌ছে ধর্ম ছাড়া কর্ম হয় না। সেও যথাসাধ্য চেষ্টা ক‌রে শরীয়‌তের বি‌ধি‌বিধান মে‌নে চল‌তে। সারা‌দিন ক্লাস, লাই‌ব্রেরী ওয়ার্ক, বন্ধু-বান্ধব‌দের সা‌থে কিছু সময় খোশগল্প অথচ এর মা‌ঝেও পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামা‌তে আদা‌য়ে তার কো‌নো গা‌ফিল‌তি হয় না। এজন্য তা‌কে অনে‌কেই পছন্দ ক‌রে ও ভা‌লোবা‌সে। 
এক‌দিন ‌সে লাই‌ব্রেরী‌তে ব‌সে ‌কিছু জরুরী পড়া নোট কর‌ছিল। হঠাৎ ক‌রে কে‌নো জানি, বাবার স্মৃ‌তি এসে উঁকি দি‌তে শুরু করল। মা'র কা‌ছে শুনা গল্প কিছুটা আবছা স্মৃ‌তি। 
২৫ মা‌র্চের কা‌লোরা‌তের পর‌দিন ২৬ তা‌রি‌খেই তার বাবা আব্দুর রহমান সা‌হেব‌কে গ্রেফতার ক‌রে পাকবা‌হিনী। তি‌নি সরকারী চাকুরী কর‌তেন। গতরা‌তের ভয়াবহ ঘটনা‌কে তি‌নি মে‌নে পার‌ছি‌লেন না। সকা‌লে অফি‌সে সহকর্মী‌দের সা‌থে সেসব আলোচনা কর‌ছেন। চার‌দি‌কে থমথ‌মে অবস্থা। কখন কি হয় বলা যায় না, সক‌লেই আতঙ্কিত। 
তাঁরই এক সহকর্মী বকুল মোল্লা, যি‌নি তাঁকে হিংসা কর‌তেন, সময় সু‌যোগ পে‌লেই তাঁর নামে ক‌ল্পিত রটনা রটা‌তেন, তি‌নি গতরা‌তের ঘটনা‌কে সমর্থন ক‌রে দু'চারটা কথা বল‌লেন। ভ‌য়ে কেউ প্র‌তিবাদ কর‌তে না পার‌লেও আব্দুর রহমান সা‌হেব তা সহ্য কর‌তে পার‌লেন না। তি‌নি বল‌লেন, নিরীহ, নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত মানু‌ষের ওপর হামলা শুধু পশুরাই কর‌তে পা‌রে। য‌দি কো‌নো মানুষ ক‌রে, তাহ‌লে তা‌কে কাপুরুষ বল‌লে প্রকৃত কাপুরুষরা লজ্জা পায়। কেননা এটা তা‌দের চে‌য়েও নিকৃষ্ট কাজ। এরপর কিছু বাদানুবাদ, অব‌শে‌ষে অন্য সহকর্মী‌দের মধ্যস্থতায় তখনকার ম‌তো সমাধান।

প‌রে তি‌নি জে‌নে‌ছি‌লেন, বকুল মোল্লা ঐদিনই পাকবা‌হিনীর এক হা‌বিলদা‌রের কা‌ছে সংবাদটা পৌঁ‌ছে দি‌য়ে‌ছি‌লেন আর তার প্রে‌ক্ষি‌তে সন্ধ্যায় তা‌কে বা‌ড়ি থে‌কে টে‌নে-‌হিঁচ‌ড়ে নি‌য়ে যায় হানাদার বা‌হিনী।
গ্রেফতা‌রের তিন দিন পর। গভীর রাত........(চলবে)