Showing posts with label ফিচার. Show all posts
Showing posts with label ফিচার. Show all posts

এক করোনা যোদ্ধা ওসি মিজানুল..................প্রতিবেদন

এক করোনা যোদ্ধা ওসি মিজানুল..................প্রতিবেদন
কদিকে অপরাধী নিয়ে দৌড়ুদৌড়ি, অন্যদিকে অদৃশ্য এক শত্রুর সাথে যুদ্ধ। সাধারন মানুষ হলে তার সাথে পেরে ওঠা যায় কিন্তু যে বস্তু দেখা যায়না তার সাথে লড়াই করা আর বাতাসের সাথে লড়াই করা এক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

চলুন ঘুরে আসি ...................................(ঈদ সংখ্যা ২০২০)

চলুন ঘুরে আসি ...................................(ঈদ সংখ্যা ২০২০)
পানিহাটা তারানি, শেরপুর
বন, পাহাড়, নদী আর ঝরনাই পানিহাটা। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী জনপদ। শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার এবং শেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নে অবস্থিত এ পর্যটন এলাকাটি।
উত্তরে নীলাভ-সবুজ তুরাকে আবছা আবরণে জড়িয়ে নিয়েছে কুয়াশার মতো মেঘ কখনো বা কুয়াশা নিজেই। দূরের টিলাগুলো কেবলই লুকোচুরি খেলে এরই আড়ালে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ছোট ছোট পাহাড়গুলোকে ফাঁকি দিয়ে তুরার অববাহিকা থেকে সামনে সোজা এসে পশ্চিমে চলে গেছে পাহাড়ি নদী ভোগাই। একপাশে তার কাশবন আর অপর পাশে শত ফুট উঁচু দাঁড়িয়ে থাকা সবুজে জড়ানো পাহাড়। নদীর টলটলে স্বচ্ছ পানির নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে নুড়ি পাথরগুলো। সামনের একশ গজ দূরে ভারত অংশে পিঁচঢালা আকাবাঁকা রাস্তা পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে গেছে পাহাড়ের বুকচিরে। আর মাঝেমধ্যেই হুসহাস করে ছুটে চলছে মালবাহী ট্রাকগুলো। চতূর্দিকে ছোট ছোট অসংখ্য পাহাড়ের সারি। পূর্ব দিকের কয়েকটি পাহাড়ের গা ঘেঁষে ভোগাই নদীতে এসে মিশেছে ছোট একটি পাহাড়ি ঝরণা। সেগুন, গজারী আর আকাশমনির বড় বাগানে ঘুরতে ঘুরতে শোনা যাবে পাখ-পাখালির কিচির মিচির। রয়েছে নানা প্রজাতির পাহাড়ি গাছ-গাছরা। কখনো কখনো বিশেষ করে, ধানে থোর আসার সময় কিংবা ধান পাকার সময় দূরের গহীন পাহাড় থেকে বন্যহাতির আওয়াজও মিলে মাঝেমধ্যেই। কখনো বা দূর থেকে তাদের দেখাও মেলে ভাগ্যবানদের।
এখানেই রয়েছে খ্রিষ্টানদের উপাসনালয়, ছোট একটি চিকিৎসা কেন্দ্র, বিদ্যালয় আর ছোটছোট শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য হোস্টেল। সেখানে শিশু-কিশোরদেরকোলাহল। সামান্য পূর্বদিকটায় এগুলে উপজাতিদের বসবাসস্থল ফেক্কামারী। উপজাতীয়রা মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় পড়ে থাকার নাম ‘ফেক্কা’। আর তাই পাড়াটি পানিহাটার অংশ হলেও ফেক্কামারী নামে স্থানীয়রা ডাকেন। প্রায় ৪৫-৫০টি পরিবার পাহাড়বেষ্ঠিত এ পাড়ায় মিলেমিশে বসবাস করে। সহজেই আপন করে নেয় তারা সবাইকে।
ফেক্কামারীর কিছুটা পূর্বদিকে পানিহাটা বিল। বিলের চতূর্পাশ ঘেঁষে রয়েছে পাহাড়ের সাড়ি। এ বিলকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে ফিসারী। বাইরে থেকে কেউ বুঝতেই পারবে না যে এতটুকু ভিতরে একেবারে জিরোপয়েন্ট সংলগ্ন এমন নান্দনিক দৃশ্য বা ঘুরে দেখার মতো জায়গা থাকতে পারে। তারানী পাহাড়ের ঢালে ভোগাই নদীর ঠিক উল্টো পাশে মেঠোপথের গা ঘেঁষে রয়েছে পাহাড়বেষ্ঠিত সবুজ গালিচা বিছানো খেলার প্রশস্ত মাঠ। যেখানে বিকেল হলেই পাহাড়ি বালকরা মেতে ওঠে খেলায়। সন্ধ্যা অব্দি চলে তাদের কোলাহল। দর্শনার্থীরা চাইলে এ মাঠে বসেই খাওয়া-দাওয়া বা আড্ডা দেওয়ার কাজও সাড়তে পারেন অনায়াসেই। এসব মিলে প্রকৃতি প্রেমীদের প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করে অপরূপা পানিহাটা-তারানি পাহাড়। অবশ্য পানিহাটা নামেই পরিচিতেরা জানেন। কিন্তু সৌন্দর্য্যের ভাগটা শুধু পানিহাটাই নিতে পারেনি। এর একটা অংশে ভাগ বসিয়েছে তারানি গ্রামের পাহাড়। তাই দর্শণার্থীদের জন্য পানিহাটা-তারানি দুটোই উপভোগ্য।

ফ্রুটস ভ্যালি
মাধবপুর থেকে শায়েস্তাগঞ্জে আসার পথে শাহজিবাজার ফ্রুটস ভ্যালি। এটির অবস্থান রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশে শাহজিবাজার গ্যাস ফিল্ডের ভেতরে। ৫ একর জমির উপর ফ্রুটস ভ্যালিটি নির্মাণ করা হয়েছে। মূল পরিকল্পনা হয় ২০০৩ সালে। বাস্তবায়নের দায়িত্ব পান হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের উপ-ব্যবস্থাপক এটিএম নাছিমুজ্জামান। তাকে সহযোগিতা করেন গ্যাস ফিল্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এটি মূলত একটি পরিত্যক্ত একটা কূপ। এমনিই পড়ে ছিল। কতিপয় কর্তাব্যক্তি উদ্যোগ নিলেন এখানে ভিন্ন কিছু করা যায় কি না। পরিকল্পনামাফিক কাজ শুরু হলো। এবং ২০০৫ সালের ২২ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলো ফ্রুটস ভ্যালি। হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থানার শাহজীবাজারের গ্যাস ফিল্ডে এর অবস্থান। ১৬০টির মতো দেশী-বিদেশী ফলগাছের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই ভ্যালি।
ছোট সিড়িগুলো দিয়ে যখন উপরে উঠবেন তখনই মনে হবে উপরে না জানি কি সুন্দর কিছু অপেক্ষা করছে। এবং আপনার অনুমান মিথ্যা হবেনা। টিলার চূড়ায় উঠেই মনটা ভাল হয়ে যাবে। ভ্যালিকে খুব সুন্দর এবং আকর্ষণীয়ভাবে সজ্জিত করা হয়েছে। চাইনিজ নির্মাণশৈলী, আপেল, আনারস, আঙ্গুর লতার তোরণ ইত্যাদি বিশেষত শিশুদের জন্য দারুন চিত্তাকর্ষক।
বিদেশী ফলগাছ যেমন- কফি, রুটি ফল, সবুজ আপেল ইত্যাদির পাশাপাশি রয়েছে দেশীর প্রায় হারিয়ে যাওয়া ফল ঢেউয়া, ঢেফল, থৈকর ইত্যাদির গাছ। বর্তমানে ভেষজ উদ্ভিদের জন্য আলাদা জায়গা নির্ধারণ করে চলছে গাছ লাগিয়ে পরিচর্যা। নিয়মিত নতুন নতুন ফলের গাছ সংযোজন হচ্ছে। নাম ফলক থেকে জানা গেল দেশী-বিদেশী প্রখ্যাত ব্যক্তিদের হাতেও প্রচুর গাছ লাগানো হয়েছে।
উদ্ভিদকূলের পাশাপাশি এখানে ঠাঁই পেয়েছে প্রাণীকূলও। কালিম, টার্কি, চিনে হাঁস, ঘুঘু, ময়না, লাভবার্ড, খরগোশসহ গিনিপিগও আছে। দু’টো কালিমকে দেখলাম ঘর বাধাঁর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রয়েছে একটি পরিবেশবান্ধব কটেজ। সিলেটী বেত, শীতল পাটি, গাছের বাকল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই কটেজ। ভিতরে প্রবেশের সাথে সাথেই আপনাকে অদ্ভূত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিবে। এখানে দাড়িয়ে উপভোগ করা যাবে চারিপাশের রাবার বাগান।
বর্তমানে করোনার কারনে যদিও এসব অঞ্চলে বাস সার্ভিস বন্ধ রয়েছে তারপরও আপনি চাইলে যে কোন সময়ে নিজের গাড়িতে করে ঘুরে আসতে পারবেন এখান থেকে।

মহেশখালী দ্বীপ
বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ী দ্বীপ কক্সবাজারের মহেশখালী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরা এ জায়গাটিতে রয়েছে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের চমৎকার চমৎকার সব মন্দির। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারিদিকে বিস্তীর্ণ সমুদ্রের দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া জলরাশি দেখা যায় কেবল মহেশখালী থেকেই। পাহাড়, দ্বীপ আর সাগরের এই মিলনস্থলে প্রতিদিনই বহু পর্যটক ভীড় করে সোন্দর্য দর্শনে।
মহেশখালী স্টেশনে নেমে একটি রিকশা ঠিক করতে পারেন সারা দিনের জন্য। রিকশাওয়ালাই গাইড করবে আপনাকে। স্টেশন থেকে প্রথমেই চলে যান বৌদ্ধ মন্দিরে। এখানে সোনালী রঙের দু’টি বৌদ্ধ মন্দির দেখতে খুবই সুন্দর। এছাড়া এখানেই রয়েছে ব্রোঞ্জ নির্মিত বিশাল বৌদ্ধ মূর্তি। মন্দির এলাকায় প্রবেশের আগেই জুতা খুলে রেখে যেতে হবে। এখান থেকে বেরিয়ে সামনেই পড়বে উপজাতীয়দের তৈরি তাঁতবস্ত্রের দোকান।
বৌদ্ধ মন্দির থেকে বেরিয়ে চলুন মহেশখালীর আকর্ষণ-আদিনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে। রিকশা আধাঘন্টা চললেই পৌঁছে যাবেন আদিনাথ মন্দিরের পাদদেশে। এই আদিনাথ মন্দিরটি কয়েকশ’ বছরের পুরনো। মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত আদিনাথ মন্দিরে অবশ্যই উঠবেন। ভূমি থেকে ৬৯টি সিঁড়ি অতিক্রম করে উঠে পড়ুন আদিনাথ মন্দিরে। এই মন্দিরের ভেতরেই রয়েছে অষ্টভুজা দুর্গা মন্দির। আদিনাথ মন্দির থেকে আরেকটু সামনেই পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে আরেকটি মন্দির। এটি দেখতেও ভুলবেন না। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মন ভরে দেখে নিন চারপাশের সমুদ্রকে।
আদিনাথ মন্দির থেকে নেমে চলে আসুন জেলে পাড়ায়। এখানকার জেলেদের জীবনযাপনের সাথে পরিচিত হতে পারেন। এছাড়া সমুদ্রের পাড়ে দেখতে পারবেন বিচিত্র শামুক আর ঝিনুক। মহেশখালীর যে-কোনো রেস্টুরেন্টে খেয়ে নিতে পারেন মজার মজার সামুদ্রিক মাছ। কম দামে এখানে খেতে পারেন মজাদার রূপচাঁদা বা কোরাল। যারা শুঁটকি পছন্দ করেন তারা এখান থেকে কিনতে পারেন নানান ধরনের শুঁটকি।
মহেশখালীর আদিনাথ বাজার, জয়ের খাতা, হরিয়ার চরা, জেমঘাট, পাকুয়া, মাতার বাড়ি, পশ্চিমপাড়া প্রভৃতি জায়গাগুলোও চমৎকার। এসব জায়গায়গুলোতে ঘুরেও পেতে পারেন ভিন্ন স্বাদ ও অভিজ্ঞতা।
মহেশখালী যেতে প্রথমে যেতে হবে কক্সবাজার। ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে পারেন স্থলপথ, রেল পথ কিংবা আকাশ পথে। ঢাকা থেকে কক্সবাজারের পথে যে সব এসি বাস চলাচল করে তা হলো- গ্রীন লাইন, নেপচুন, সোহাগ পরিবহন। ভাড়া ৪৮০ থেকে ৫১০ টাকা এবং নন এসি বাসে ভাড়া ৩০০ টাকা। সৌদিয়া, এস আলম, ইউনিক, চ্যালেঞ্জার প্রভৃতি নন এসি বাস চলে কক্সবাজারের পথে। কক্সবাজার নেমে কস্তরী ঘাট যেতে হবে রিকশায়। মহেশখালী ঘাট বললেও সবাই চেনে। কস্তরী ঘাট থেকে মহেশখালী স্পীড বোট কিংবা লঞ্চেও যাওয়া যায়। স্পীড বোটে মহেশখালীর ভাড়া জনপ্রতি ৫০ টাকা আর পথ মাত্র ১৫ মিনিটের। লঞ্চে ভাড়া ১৫ টাকা, সময় এক ঘন্টার মতো।
মহেশখালীতেই রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা আছে। মহেশখালীতে মোটামুটি ভালো থাকার হোটেল হলো ‘হোটেল সি গার্ডেন’। কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে থাকতে পারেন। এখানে অসংখ্য সব ভালোমানের হোটেল আছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেল শৈবাল, লাবনী, প্রবাল ছাড়াও বেসরকারি হোটেলগুলো হলো হোটেল সী গাল, হোটেল সায়মন, হোটেল সী প্যালেস, হোটেল মেরিন প্লাজা, মিডিয়া ইন্টারন্যাশনাল, জিয়া গেস্ট হাউজ, সোহাগ গেস্ট হাউজ, গ্রীন অবকাশ রিজোর্ট, নিটল বে রেস্ট হাউজ প্রভৃতি। এসব হোটেলে ৩০০ থেকে ৫০০০ টাকায় রাত্রি কাটানোর ব্যবস্থা আছে।

বগা লেক
বান্দরবনে যে কয়েকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে বগালেক তার মধ্যে অন্যতম। প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে এখানে পাহাড়ের উপর জলরাশি সঞ্চার করে তৈরি করেছে হ্রদ। সমুদ্র সমতল হতে প্রায় ১৭০০ ফুট উপরে পাহাড়ের চুড়ায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই অত্যাশ্চার্য হ্রদটি। বিষয়টি যতটা না অবিশ্বাস্য, যতটা না অলৈাকিক তার চাইতেও বেশী এর সৌন্দর্য। শান্তজলের হ্রদ আকাশের কাছ থেকে একমুঠো নীল নিয়ে নিজেও ধারন করেছে সে বর্নিল রং। পাহাড়ের চুড়ায় নীল জলের আস্তর নীলকাশের সাথে মিশে তৈরি করেছে এক প্রাকৃতিক কোলাজ। মুগ্ধ নয়নে দেখতে হয় আকাশ পাহাড় আর জলের মিতালী। প্রকৃতি এখানে ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছোঁয়া।
যেন তুলির আঁচড়ে বগালেকের পুরো জায়গা সেজেছে ক্যানভাসের রংয়ে আর প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে এঁকেছে জলছবি। এ এমনই এক ছবি যে দেখামাত্র ভ্রমন পিপাষুর তৃষ্ণা মিটে যায় মুহুর্তের মাঝে। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আসার ক্লান্তি হারিয়ে যায় হ্রদের অতল গহ্বরে। সবকিছু মিলে এ যেন এক সুন্দরের লীলাভূমি।
বগালেককে অনেকে ড্রাগনলেকও বলে থাকে। বান্দরবন জেলা হতে ৭০ কিলোমিটার দুরে রুমা উপজেলার কেওকারাডাং পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এটি। এই হ্রদটি তিনদিক থেকে পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত। বগালেকের গভীরতা গড়ে আনুমানিক ১৫০ ফুটের মত।
কোথাও কোথাও এর গভীরতা ২০০ ফুটেরও বেশী। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি লেক। এর আশেপাশে পানির কোন উৎসও নেই। সম্ভবত বৃষ্টির জলই এর একমাত্র উৎস। তবে বগালেক যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে যা বগাছড়া (জ্বালা-মুখ) নামে পরিচিত।
সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এই লেকের পানি প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসে ঘোলাটে হয়ে যায়।
। আর লেকের সাথে সাথে আসে পাশের নদীর পানিও ঘোলাটে রং ধারন করে। কারণ হিসেবে মনে করেন এর তলদেশে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ রয়েছে। এই প্রস্রবণ থেকে পানি বের হওয়ার সময় হ্রদের পানির রঙ বদলে যায়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প রয়েছে বগালেকে। এখানে পৌছানোর পরে ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হয়। আর্মি ক্যাম্পের ডানদিকে সরুপথ ধরে এগুলে বমদের গ্রাম আর সোজা লেক ধরে এগিয়ে গেলে সিয়াম দিদির কটেজ। পাশেই লরাম রেষ্ট হাউজ। লরাম রেষ্টহাউজে আপনি রাত্রিযাপন করতে পারেন। সামান্য অর্থের বিনিময়ে অসামান্য একটি রাত্রিযাপন করতে পারেন এখানে। পাশাপাশি খাবারের কাজটি সেরে নিতে পারেন সিয়াম দিদির হোটেলে। সিয়াম দিদি এখানকার একটি স্কুলের শিক্ষিকা। তার একটি কটেজ রয়েছে যেখানে আপনি আতিথেয়তা গ্রহন করতে পারবেন। খাবারে পাবেন মোটা লাল চালের ভাত, ডাল, ডিম ভাজা সাথে হয়তো পাহাড়ি কোন শাক । দীর্ঘ পথ ট্রাকিং করে আসার পর এ খাবারকে মনে হবে অমৃত ।
বমদের পাশাপাশি বগালেকের ঠিক উল্টো দিকে পাহাড়ের ঢালুতে মুরংদেরও একটি গ্রাম রয়েছে। বগালেক হতে পাহাড়ী ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেলেই মুরংদের এই গ্রামটি পাওয়া যাবে। প্রায় মিনিট বিশেক লাগে এখানে পৌছাতে। এরা শিক্ষাগত দিক থেকে বমদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। এখনো পুরোপুরি সভ্য হয়ে ওঠেনি। তাই তাদের সাথে আচরণে কিংবা ছবি তোলার ক্ষেত্রে সাবধান থাকা ভাল।
সকাল, সন্ধ্যা বা রাতে প্রতি বেলায়ই বগা লেক নতুন রূপে ধরা দেয়। এর সৌন্দর্য কাগজে কলমে লিখে আসলে বোঝানো সম্ভব নয়। এক কথায় কল্পনার বাহিরে। সকালের উজ্জ্বল আলো যেমন বগালেককে দেয় সিগ্ধ সতেজ রূপ। ঠিক তেমনি রাতের বেলায় দেখা যায় ভিন্ন এক মায়াবী হাতছানি। রাতের বগালেক দিনের বগালেক হতে একেবারেই আলাদা। আর যদি রাতটি হয় চাঁদনী রাত তবে এটি হতে পারে আপনার জীবনের সেরা রাতের একটি। কি অসাধারণ সে রূপ!
নিকষকালো অন্ধকার রাতে পাহাড়ের বুক চিরে হঠাৎ একফালি চাঁদ মৃদু আলোর ঝলক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বগালেকের শান্তজলে। মৃদুমন্দ বাতাসে ছোট ছোট ঢেউয়ে দুলতে থাকে পানিতে চাঁদের ঝরে পড়া আলোকরাশি। নিজেকে নিজে হারিয়ে ফেলতে হয় এমন রূপে। চারিদিক নিস্তব্দ, নিথর, জনশুন্য। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে সেই নির্জন বেলায় বগালেকের পাড়ে বসে জোৎনাস্নানের অভিজ্ঞতা একেবারেই অন্য রকম। মুহুর্তের মাঝেই যেন প্রেম হয়ে যায় প্রকৃতি আর মানুষের। প্রহরের পর প্রহর অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকতে হয় সে মায়াবী রূপের দিকে।
বগালেকে সারা রাতই আর্মিরা পাহারা দেয়। সুতরাং নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার কোন কারন নেই। আপনি চাইলে ক্যাম্পের পিছনে বনে বসেও দেখতে পারেন জোৎস্না রাতের রূপ। সেও এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। চারদিকে জঙ্গলের গাছপালা, পাশেই শুকনো ঝর্না, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর উপরে সয়ম্বরা চাঁদ। ভাবুন তো কি অসাধারণ সে অনুভূতি আর অপুর্ব সে রাত।
বগা লেকের জন্ম ইতিহাস নিয়ে স্থানীয় আদিবাসী গ্রামগুলোয় একটি মজার মিথ প্রচলিত আছে, সেটা অনেকটা এই রকমঃ “অনেক অনেক দিন আগে একটি চোঙা আকৃতির পাহাড় ছিল। দুর্গম পাহাড়ের ঘন অরণ্য। পাহাড়ের কোলে বাস করত আদিবাসীর দল। ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা। পাহাড়ি গ্রাম থেকে প্রায়ই গবাদিপশু আর ছোট বাচ্চারা ওই চোঙ্গা আকৃতির পাহাড়টিতে হারিয়ে যেত। গ্রামের সাহসী পুরুষের দল কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে দেখতে পায়, সেই পাহাড়ের চূড়ার গর্তে এক ভয়ঙ্কর দর্শন বগা বাস করে। বম ভাষায় বগা মানে ড্রাগন। কয়েকজন মিলে ড্রাগনটিকে আক্রমণ করে হত্যা করে ফেলে। ফলে ড্রাগনের গুহা থেকে ভয়ঙ্কর গর্জনের সঙ্গে আগুন বেরিয়ে আসে। নিমিষেই পাহাড়ের চূড়ায় মনোরম এক পাহাড়ি লেকের জন্ম হয়।”
তবে প্রকৃত অর্থে বুৎপত্তিগত কারন বিশ্লেষন করতে গিয়ে বাংলাদেশের ভুতত্ববিদগন এমনই ধারনা করেন যে, বগাকাইন হ্রদ (বগা লেক) মূলত মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। তবে অনেকে ধারনা করেন এটি মহাশূন্য থেকে ছুটে আসা উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলেও সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। কেউ কেউ আবার ভূমিধ্বসের কারণেও এটি সৃষ্টি হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে কোন না কোন প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারনে এই পাহাড় চুড়ায় এমন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।
দুই ভাবে যাওয়া যায় বগালেক। যে ভাবেই যেতে চান না কেন, প্রথমে আপনাকে বান্দরবন হতে চান্দেরগাড়ীতে করে যেতে হবে রুমা।
অসংখ্য গর্তে এবং বাঁকে পরিপূর্ণ উঁচু নিচু এই রাস্তা দেখে সহজেই বুঝতে পারবেন পাহাড়ি জীবন কত কঠিন! রুমা থেকে নৌকাতে করে যেতে হবে রুমা বাজারে, প্রায় ১ ঘণ্টার মত লাগে নৌকাতে। এই নৌকা ভ্রমনটা আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ নৌভ্রমন হবে সন্দেহাতীতভাবে। রুমা বাজারে থাকার জন্য কিছু হোটেল আছে, তবে দিনের মধ্যেই বগালেক চলে যাওয়া উচিত, রুমা বাজারে অবশ্যই বিকাল ৪ টার মধ্যে পৌছাতে হবে, ৪ টার পরে সেনাবাহিনী আর নতুন কোন চান্দের গাড়ি বগালেক এর উদ্দেশে রওয়ানা দেওয়ার অনুমতি দেয় না।
রুমা বাজার থেকে চান্দের গাড়িতে ৪ ঘণ্টা লাগে বগালেকে যেতে । এটা নিঃসন্দেহে বাস্তবের রোলার কোস্টার। রাস্তায় দেখবেন পাহাড়ি জীবনধারা, পার্বত্য বনাঞ্চল, হাতি। সবচেয়ে অবাক হবেন, এই খাড়া পাহাড়ে গাড়ি কিভাবে উঠবে? প্রতিটা বাঁকেই আপনার মনে হবে, এইবারই বুঝি গাড়িটা নিচে পড়ে যাবে। ড্রাইভার গুলি খুবই দক্ষ সুতরাং তেমন কোন সমস্যা হয়না।
দ্বিতীয় পথটি ঝুকিমুক্ত কিন্তু দীর্ঘ আর কষ্টের। রুমা বাজার হতে ঝিরি পথ ধরে হেটে যেতে হয় বগালেক। এই পথটি প্রায় ১৮ কিলোমিটার লম্বা। সময় লাগবে প্রায় ৮ ঘন্টা। যারা শারীরিক ও মানসিক ভাবে খুবই শক্ত এবং জীবনে রোমাঞ্চকর যাত্রার সম্মুখীন হতে চান কেবল তারাই এই পথে যাবার চিন্তা করবেন। এটি রিতিমত চ্যালেঞ্জ। এই পথে পাড়ি দিতে হবে কমপক্ষে ৫০টির মত ঝিরি, বহু উচুনিচু পাহার, পাথুরে পিচ্ছিল পথ, জঙ্গল আর ছোট বড় অনেক ঝর্না। পথটি যেমন কষ্টকর তেমনি তেমনি দৃষ্টিনন্দন ও আহা মরি সুন্দর। প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী আপনার কষ্টকে পুরোই ভুলিয়ে দেবে। ছোট ছোট ঝিরি, ঝর্না আর উপজাতী গ্রাম আপনাকে মুগ্ধ করবে।

পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ কক্সবাজার........................................সম্পাদকের কলমে (ঈদ সংখ্যা ২০২০)

পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ কক্সবাজার........................................সম্পাদকের কলমে (ঈদ সংখ্যা ২০২০)
ক দিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত, অন্য দিকে উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি। মাঝখানে মসৃণ পথ যেন মিশে গেছে অজানায়! এই পথ ধরে চলতে চলতে কখনও সমুদ্রের লোনা বাতাসের ঝাপটা ছুঁয়ে যাবে আপনাকে, কখনও সবুজ পাহাড়ের সতেজতায় ভরে উঠবে মন। হ্যাঁ, বুঝতে পারছেন আমি কোন রাস্তার কথা বলছি। আমি বলছি বঙ্গোপসাগরের পাশ দিয়ে কক্সবাজারের কলাতলী সৈকত থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ রোডের কথা। আপনার খুবই অবাক লাগবে যখন শুনবেন কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত এবং একই সাথে সেখানকার মেরিন ড্রাইভ রোডও পেয়েছে একই খেতাব। পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ সড়ক। একটি এলাকার দু’ দু’টি বিশ্ব রেকর্ড আর বুঝি কোথাও মিলবেনা।
সত্যিকথা বলতে কি, কক্সবাজার বাংলাদেশের এমনই এক সৈকত যা নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হতে চায়না যে এমন টানা তটরেখায় আপনি হেঁটে চলে যেতে পারবেন যতোদুর চোখ যায়। পৃথিবীর অনেক দেশেই সৈকত আছে এবং তা বেশ সুন্দর, কিন্তু কক্সবাজারের মতো এমন বিন্যস্ত দৃশ্যাবলী সেখানে বিরল।
এই নিয়ে কক্সবাজারে মোট আটবার ভ্রমন করেছি। প্রতিবারই এই মেরিন ড্রাইভ দিয়ে সুগন্ধা বিচ থেকে টেকনাফ পর্যন্ত চলে গেছি। পথে থেমেছি হিমছড়ি, ইনানী বিচ, তারপর চলে গেছি সাবরাং বেড়ি বাঁধ পর্যন্ত। ওটাকে বলা হয় জিরো পয়েন্ট। ওখান থেকেই বাংলাদেশের শুরু।
সৌন্দর্য পুরোপুরি প্রাকৃতিক। এখানকার কোথাও কৃত্তিম সৌন্দর্য দেখবেন না। আপনি যখন কলাতলী বা সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে যাত্রা করবেন ইনানী অভিমুখে তখন আপনার দুইপাশে থাকবে পাহাড় নয়তো সমুদ্র। বাম পাশে কখনও সবুজ পাহাড়, সফেন ঝর্না, আর ডানপাশে নীল সমূদ্র। আর পুরোটা পথই এই দুটো জিনিষ আপনার সঙ্গী হয়েই থাকবে। যারা পাহাড়কে ভালোবাসে তারা এর অকৃত্তিম রূপে মুগ্ধ হবে। যারা সমুদ্র ভালবাসে তারা কাছ থেকে এর আঁকবাঁক, তটভুমিতে আছড়ে পড়া ঢেউ, ঝাউবন দেখে মোহিত হবে।
মেরিন ড্রাইভ রোড দিয়ে যেতে যেতে বিস্তৃত সাগরের সব সৌন্দর্য এবং জেলেদের সাগরে মাছ ধরার দৃশ্য উপভোগ করা যায় । সেই সাথে সমুদ্র সৈকতে দেখা মিলবে টেকনাফ গর্জন ফরেস্ট খ্যাত চির হরিৎ বন । চলতি পথে আরো দেখতে পাবেন রেজু খাল আর সমুদ্রের মিলন স্থলের এক পাশে সারি সারি সুপারি গাছ, অন্য পাশে ঝাউ বন । দুই পাশে আছে শ্বাস মূলীয় বন । এখান থেকে বেশি দূরে নয় ইনানী সমুদ্র সৈকত । ভাটার সময় ইনানীর সৈকতে জেগে ওঠা মৃত প্রবালের মাঝে সময় ভালোই কাটবে । ইনানী থেকে সামান্য সামনে জালিয়াপালং ধরে এগিয়ে গেলে দেখা পাবেন পাহাড় কোলের নির্জন মেরিন ড্রাইভ । সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন ছাড়া এখানে আর কোনো শব্দ পাওয়া বিরল । তবে এখানকার সমুদ্রে চিংড়িপোনা সংগ্রহে ব্যস্ত মানুষের দেখা মিলবে।
পৃথিবীর আর কোন দেশে এতো দীর্ঘ কোন মেরিন ড্রাইভ নেই এটা সর্বজনস্বীকৃত। আর সেই সাথে এতো দীর্ঘ সময় ধরে বর্নালী সৌন্দর্য উপভোগ সেটাও কোথাও পাবেন না।
২০১৬ সালে এই রাস্তার অনেক স্থান সেনাবাহিনী অধিগ্রহন করে নেয় এবং এটির উন্নয়ন করতে শুরু করে। ২০১৭ সালের ৬ মে এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন। তাই উদ্বোধনের পরই পর্যটকদের সুবিধার জন্য কক্সবাজার থেকে সাগরঘেঁষে টেকনাফমুখী
তবে আপনি যদি অল্প সময় নিয়ে কক্সবাজার আসেন তবে টেকনাফ যাবার দরকার নেই কারন যাওয়া আসাতেই আপনার দশ ঘন্টা চলে যাবে। পর্যটকদের মূল আগ্রহ কক্সবাজার, হিমছড়ি এবং ইনানী বিচ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। আপনারও এই পর্যন্ত ভ্রমন সীমাবদ্ধ রাখা দরকার, আর বিশেষ করে যদি পরিবার নিয়ে আসেন তবে টেকনাফ পর্যন্ত যাওয়ার একেবারে দরকার নেই।

আমার মনে হয় মেরিন ড্রাইভ সড়কে প্রকৃতি নিজের হাতে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে। এখানকার মেরিন ড্রাইভ সড়কে বিশেষ বাস সেবা চালুর নির্দেশনা দেয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তারই ধারাবাহিকতায় এবার থাইল্যান্ডের অনুভূতি দিতে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভে চালু হচ্ছে ট্যুরিস্ট ক্যারাভ্যান। ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে এটি চলাচল করবে কলাতলী থেকে টেকনাফ জিরো পয়েন্ট হয়ে আবার কলাতলী পর্যন্ত। ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২,০০০ টাকা জনপ্রতি। সঙ্গে থাকবে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, বিকেলের স্ন্যাক্স, এন্ট্রি টিকিট ও সাইটসিন দেখার সুযোগ।ভাড়া একটু বেশি মনে হলেও এতে ওয়াইফাই, লাইব্রেরি, ওয়াশরুমও থাকবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে যাত্রা শুরু করবে এ ক্যারাভ্যান। ফলে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়ক অনায়াসেই ভ্রমণ করতে পারবেন পর্যটকরা। যদিও এর আগে অন্যান্য কোম্পানি মেরিন ড্রাইভে তাদের বাস সেবা চালু করেছে।
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত এতদিন সত্যি অবহেলিত ছিল। কক্সবাজারে অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন ছিল না তেমনি ছিল না ভালমানের যোগাযোগ ব্যবস্থাও। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাওয়ার রাস্তার যে বেহাল দশা ছিল, সেটা চিন্তা করলেই ভ্রমণের আনন্দ অনেকটা ম্লান হয়ে যেত ভ্রমণপিপাসুদের। বর্তমান সরকারের ঐকান্তিকতায় একদিকে সবুজঘেরা পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্রের ঢেউ পর্যটকদের জন্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সমুদ্রের তীর আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে তৈরি ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ নিঃসন্দেহে পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। মেরিন ড্রাইভ সড়ক এখন শুধু কক্সবাজার বা গোটা দেশের নয়, বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় ও নান্দনিক একটি সড়কে পরিণত হয়েছে। পুরো দেশের পর্যটনের বিকাশের ক্ষেত্রে এই সড়ক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

জীবনানন্দ দাসের কবিতায় বহুবিধ শব্দমালা................শেখ শাহিনুর রহমান (ঈদ সংখ্যা ২০২০)

জীবনানন্দ দাসের কবিতায় বহুবিধ শব্দমালা................শেখ শাহিনুর রহমান (ঈদ সংখ্যা ২০২০)
সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশ মানেই নান্দনিক উপমার বিশাল এক সমাহার। রবীন্দ্রোত্তর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় সূক্ষ্ম ও গভীর অনুভবের এক জগৎ ফুটে আছে। গ্রাম বাংলার প্রকৃতির যে ছবি তিনি কবিতায় এঁকেছেন, তার তুলনা তিনি নিজেই। আর এই প্রকৃতির সাথে মিশিয়েছেন অনুভব আর বোধ; যা একত্রে কবিতা অনন্য এক শিল্প হয়ে ধরা দিয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বৈশিষ্ট্য ‘চিত্ররুপময়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, জীবনবাবু সম্পর্কে প্রথম মন্তব্য করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১৫ সালে ষোলো বছরের জীবনানন্দ কিছু কবিতা পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যটি রূঢ় হলেও এ থেকে স্পষ্ট বুঝা যে জীবন বাবুর কবিতায় নতুনের ছোয়া ছিলো। ‘তোমার কবিত্বশক্তি আছে তাতে সন্দেহ মাত্র নেই। কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারিনে। ’উপমা, চিত্রকল্প,  প্রতীক সৃজন, রঙের ব্যবহার, অনুভব সব মিলিয়ে জীবনানন্দ তৈরি করেছেন অপ্রতিম কবিভাষা। তাঁর ব্যবহৃত উপমাগুলো প্রতিষ্ঠিত অন্য কবিদের থেকে ব্যতিক্রম। এছাড়াও নান্দনিকতাঋদ্ধ এসব উপমা জীবনানন্দ দাশের কবিতা বিশেষভাবে শনাক্ত করতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। জীবনানন্দ দাশের অন্যতম পাঠকপ্রিয় কবিতা ‘বনলতা সেন-এ বলেছেন:‘...পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন। ’পাখির নীড়ের সাথে চোখের তুলনা! কী অদ্ভুতভাবে ভেবেছেন কবি। পাখি যেমন তার নিজ বাসায় শান্তি পায়, আনন্দ পায় ঠিক তেমনি বনলতার চোখে আনন্দ, শান্তি। এই শান্তির চোখের কথাই অসাধারণ ব্যঞ্জনায় তুলে ধরেছেন ‘পাখির নীড়’ উপমায়।
কখনো কখনো চোখের উপমা ‘বেতের ফল’ হয়ে ধরা দিয়েছে। ‘তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে! (হায় চিল) আবার ‘রাত্রিদিন’ কবিতায় দেখা যায় জীবনের স্বচ্ছতা বাড়াতে ‘শিশির’ উপমা হিসেবে এনেছেন। জীবনের স্বচ্ছতা শিশিরের মতো। লিখেছেন:‘একদিন এ জীবন সত্য ছিলো শিশিরের মতো স্বচ্ছতায়।’কখনোবা শিশিরের জল তাঁর কবিতায় ‘কাঁচের গুঁড়ি’, আবার কখনো ‘বরফের কুচি’ হয়ে দেখা দেয়। আবার স্বচ্ছতার উপমা বুঝাতে ‘নক্ষত্র’ও এসেছে। একই শব্দের উপমায় একেক জায়গায় একেক নতুন শব্দজুড়ে দিয়েছেন কবি।সন্ধ্যা নামার দৃশ্যে কবি এঁকেছেন পেঁচার পাখা;‘দামামা থামায়ে ফেল- পেঁচার পাখার মতো অন্ধকারে ডুবে যাকরাজ্য আর সাম্রাজ্যের সঙ! ’পেঁচার পাখা ছাড়াও কবি অন্ধকারকে আলোর রহস্যময়ী সহোদর বলেছেন ‘নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতায়। শিশিরের শব্দের মতন মনে হয়েছে কখনওবা। জীবনানন্দ দাশ কত সূক্ষ্মভাবেই তাঁর কবিতা কেবল উপমার প্রকাশ দিয়েই অন্যমাত্রায় নিয়েছেন। ‘নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতাটির প্রায় অংশজুড়েই পরাবাস্তবতার ছাপ। পরাবাস্তবতা লিখতে গিয়েও জীবনানন্দ চিত্রকল্প তৈরি করেন: ফাল্গুনের অন্ধকার নিয়ে আসে সেই সমুদ্রপারের কাহিনী,অপরূপ খিলান ও গম্বুজের বেদনাময় রেখা, লুপ্ত নাশপাতির গন্ধ, অজস্র হরিণ ও সিংহের ছালের ধূসর পান্ডুলিপি, রামধনু রঙের কাচের জানালা, ময়ূরের পেখমের মতো রঙিন পর্দায় পর্দায় কক্ষ ও কক্ষান্ত থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের ক্ষণিক আভাস আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়। ‘শিকার’ কবিতায় কবির চোখে ভোর আর ভোরের আকাশে তারার উপমা এসেছে নান্দনিকরূপে ভোর;আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল:চারিদিকে পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ। একটি তারা এখনো আকাশে রয়েছে: পাড়াগাঁর বাসরঘরে সবচেয়ে গোধূলি-মদির মেয়েটির মতো। তাছাড়াও সূর্যকে সাজিয়েছেন নানান ভাবে।
কখনো আবার সূর্য নিজেই হচ্ছে অন্যের অলংকার। যেমন:‘সোনার বলের মতো সূর্য’-এখানে কবি সূর্যকে দেখছেন সোনার বলের মতন করে। আবার এই সূর্যই হচ্ছে প্রেয়সীর সুন্দর বর্ণনার সাজসরঞ্জাম, ‘সূর্যের রশ্মির মতো অগণন চুল’। রোদও এসেছে এখানে শরীরের রঙ বুঝাতে, রৌদ্রের বেলার মতো শরীরের রঙ।অন্যক্ষেত্রে কবি রোদের রং বর্ণনা করেছেন, রোদের নরম রং শিশুর গালের মতো লাল।জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নদীর কথাও এসেছে বারবার ‘মধুকুপী ঘাস-ছাওয়া ধলেশ্বরীটির কালীদহে ক্লান্ত গাংশালিখের ভিড় ’কিংবা ‘পৃথিবীতে ম্রিয়মান গোধূলি নামিলে নদীর নরম মুখ দেখা যাবে-’ বা ‘বিকেলের নরম মুহুর্ত; নদীর জলের ভিতর শম্বর’ কোনো কবিতায় নদীর এ ঢেউ গোলাপী বর্ণ লাভ করে। কখনোবা প্রিয়তমার সাথে গভীর মিল খুঁজে পেয়েছেন তিনি। নদী-নক্ষত্র জীবনান্দ দাশের কবিতায় প্রবল প্রভাব বিস্তার করে আছে। প্রিয়ার অপেক্ষায় বসে কবি শোনান, ‘বসে আছি একা আজ, ওই দূর নক্ষত্রের কাছে।’ এছাড়া ফুলের বন্দনাও করেছেন জীবনানন্দ দাশ। এখানেও তিনি অন্য কবিদের থেকে আলাদা। তিনি গোলাপ, জুঁই, হাস্নাহেনায় মাতাল হননি। তিনি মাতাল হয়েছেন চালতা, ভাঁট, চাঁপা, কাঁঠালীচাপা, অপরাজিতা, মচকা, করবী, সজিনা ফুল এ। রজনীগন্ধা তাঁর কবিতায় ব্যথিতা কারো জন্য উৎসর্গ করেন। নারকেল ফুলের সুন্দরও দেখেন তিনি। নদী, ফুল, গুল্ম, লতা ছাড়াও জীবনানন্দ দাশ চিত্রকল্প সৃষ্টিতে লক্ষ্মীপেঁচা, চিল, ইঁদুরকেও ব্যবহার করেছেন সফলতার সাথে। তাঁর এমন নান্দনিক উপমা প্রয়োগ এবং চিত্রকল্প সাধারণ পাঠকের কাছে ধরা দেয় অসাধারণত্ব নিয়ে। আর জীবনানন্দ হয়ে ওঠেন আধুনিক মন ও মননের প্রতিভূ।